


নন্দলাল বসুর এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে চলে যাওয়ায় কলাভবন ঘিরে রবীন্দ্রনাথের আশা যেন নিভে গেল। নিজের ইচ্ছেয় নন্দলাল চলে গিয়েছিলেন বলে মনে হয় না। অবনীন্দ্রনাথ একটা চিঠি দিয়ে তাঁকে কলকাতায় ডেকে নেন। ঘটনার সময়ে রবীন্দ্রনাথ কি আশ্রমে ছিলেন না? যদি থাকেন তাহলে কি তাঁর সঙ্গে দেখা না-করেই চলে গেলেন নন্দলাল?
৩.
কলাভবনের প্রথম অধ্যক্ষ কে ছিলেন? সাধারণভাবে আমাদের মনে হবে নিশ্চয়ই নন্দলাল বসু! কিন্তু ইতিহাস তা বলছে না। রবীন্দ্রনাথ চাইলেও, শুরুতে সে-ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি তাঁর। ওদিকে কলকাতার শিকড় একেবারে ছিন্ন করে শান্তিনিকেতনে চলে আসা নন্দলালের পক্ষেও সহজ ছিল না। এর অন্যতম কারণ অবনীন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর প্রিয়তম শিষ্যটিকে হাতছাড়া করতে গোড়ায় একেবারেই রাজি ছিলেন না।
বিষয়টা আরেকটু খোলসা করে বলা যাক। আজকে যাকে ‘কলাভবন’ হিসেবে জানি, শুরুতে তার নাম কলাভবন ছিল না। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ আলাদা করে একটা চিত্রকলা বিভাগ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ভবিষ্যতে সেইটিই ‘কলাভবন’ নামে পরিচিত। জামাতা নগেন্দ্রকে এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন– ‘নন্দলাল আর সুরেন চিত্রকলা শেখাবেন।… নন্দলালের কাছে মদনাপল্লি থেকে একজন ছাত্র আসার কথা আছে।’ অর্থাৎ চিত্র বিভাগের কাজ বেশ এগিয়ে চলেছে। বিনোদবিহারী অবশ্য তাঁর স্মৃতিকথায় এই চিত্রকলা বিভাগকে ‘কলাভবন’ নামেই অভিহিত করেছেন। তাঁর স্মৃতি-আলেখ্য অনুসারে– ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রমের পুরনো কাঠামো নতুন করে গড়বার সূচনা যখন, সেই মুহূর্তে আমি ব্রহ্মচর্যাশ্রমে যোগ দিয়েছিলাম। কলা, সংগীত এবং গবেষণা– এই তিনের সংযোগে বিশ্বভারতীর কল্পনা রবীন্দ্রনাথের মনে জেগেছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বেই কলাভবনের সূচনা হয়।’

বিনোদবিহারী তাঁর কলাবিভাগে যোগদানের যে-গল্প শুনিয়েছেন, সে-ও বেশ আকর্ষণীয়। তিনি বলেছেন, ‘‘সকালে ক্লাসে চলেছি যথারীতি বই-আসন নিয়ে, এমন সময় ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের সঙ্গে শালতলায় আমার সাক্ষাৎ। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ আমাকে বলেন, ‘গুরুদেব কলাভবন খুলেছেন, আমরা যারা ছবি আঁকতে চাই, সেখানে যেতে পারি। আমি চলে গেছি, তুমিও চল।’ আমার চেয়ে তাঁর উৎসাহ বেশি। তিনি তখনই আমাকে নিয়ে গেলেন তৎকালীন অধ্যক্ষ বিধুশেখর শাস্ত্রীর কাছে। ক্লাসের বইখাতা আসন তখনও আমার হাতে। ‘কলাভবন’ বলে নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে– এ খবর শাস্ত্রীমশাই জানতেন না। যাই হোক, বাড়ি থেকে অনুমতিপত্র আনিয়ে দেব, এই প্রতিশ্রুতিতে কলাভবনে যোগ দেবার অনুমতি পেলাম। এরপর ধীরেনকৃষ্ণই আমাকে নিয়ে গেলেন জগদানন্দবাবুর কাছে। জগদানন্দবাবু শুনে অবাক, ‘কলাভবন, সে আবার কবে হল?’ সব শুনে জগদানন্দবাবু অনুমতি দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আমরা ছাত্রাবাস থেকে বাক্স-বিছানা দু’জনে ধরাধরি ক’রে শমীন্দ্র-কুটির উপস্থিত হলাম। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ বললেন, ‘তুমি ও আমি এ ঘরেই থাকব।’’

কলাভবনের প্রথম যুগের ছাত্র বিনোদবিহারীর কথায় কলাভবনের ছাত্র হিসেবে এমনি করেই তাঁর যোগদান। তাঁর লেখা থেকে বোঝা যাচ্ছে, চিত্রকলা বিভাগ ওরফে কলাভবন তখনও স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেনি। শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রমের দায়িত্বে ছিলেন জগদানন্দ রায়, এবং পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী ছিলেন গবেষণা-সহ অন্যান্য বিভাগের অধ্যক্ষ। সদ্যসূচিত কলাভবন ছিল তাঁরই অধীনে। বিনোদের লেখায় আরও জানতে পারি, শমীন্দ্র-কুটির বা কলাভবনের ছাত্রাবাসের কাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। বিনোদবিহারী এবং ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ সেই অসমাপ্ত ছাত্রাবাসেই প্রবেশ করেছেন। বিনোদ জানিয়েছেন, ‘শমীন্দ্র-কুটির তখনো তৈরি হচ্ছে। চারদিকে ভারা বাঁধা এবং চুনবালি, ইট ইত্যাদি ছড়ানো।’ তাছাড়া, বিনোদ এবং ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ কলা বিভাগে যোগ দেওয়ার আগে অসিতকুমার হালদার কলকাতা থেকে যে তিনজন ছাত্রকে পাঠিয়েছেন, তাঁরা তখন থাকেন পাশের ঘরে। বিনোদের কথায়, ‘পাশের ঘরে থাকেন অর্ধেন্দুপ্রসাদ, হীরাচাঁদ ও কৃষ্ণকিংকর এবং সকলেই আমার চাইতে বয়সে বেশ বড়। কলকাতার আর্ট-স্কুলে অসিতবাবুর কাছে তাঁরা শিখছিলেন এবং অসিতকুমারের কথামতোই তাঁরা শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন।’ তাহলে দেখা যাচ্ছে, কলাভবনের প্রথমবেলার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন অর্ধেন্দুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, হীরাচাঁদ দুগার, কৃষ্ণকিংকর ঘোষ ও ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মা। এঁদের সঙ্গে এবারে যোগ দিলেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়।

বিনোদবিহারীর স্মৃতিকথা থেকে চোখ সরিয়ে সেই সময়ে শান্তিনিকেতনের অন্যান্য খবরাখবরের দিকে তাকাই। এই পর্বের গড়ে ওঠা চিত্রকলা বিভাগ প্রসঙ্গে ‘আশ্রম সংবাদ’-এ বলা হয়েছে, নন্দলাল এবং সুরেন কর এখানে চিত্রবিদ্যার পাঠ দেবেন। এই সময়েই রানুকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন বিশ্বভারতীর সামগ্রিক বিদ্যাচর্চার কথা। বলছেন, ‘এখানে আজকাল অধ্যয়ন অধ্যাপনার খুব ধুম পড়ে গেচে। পালি প্রাকৃত সংস্কৃত সিংহলী বাংলা ইংরেজি দর্শন ব্যাকরণ অলঙ্কার ইত্যাদি চলচে। ছবি ও গানও জমে উঠেচে’ ইত্যাদি।
তরুণ শিল্পী সুরেন কর যদিও সেই সময় রবীন্দ্রনাথের আশ্রমে ছিলেন। তবে নন্দলাল কলকাতা থেকে এসেছেন জুন মাসের শেষ দিকে। সময়ের হিসেবে ১৯১৯ সালের জুন মাসের শেষে নন্দলাল শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের গরমের ছুটির পর জোড়াসাঁকোর ‘বিচিত্রা’ স্কুল থেকে শান্তিনিকেতনের চিত্রকলা বিভাগে যোগ দিয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই ব্যবস্থায় অবনীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রবিকা’র মুখের ওপর কিছু বলতে না-পারলেও মনে মনে একেবারেই খুশি ছিলেন না। যদিও নন্দলাল শান্তিনিকেতনে ছবি আঁকা শেখাতে শুরু করলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা যেন এতদিনে সার্থক রূপ পেল। নন্দলাল যোগ দিলেন বটে, তবে বেশিদিন শান্তিনিকেতনে থাকতে পারলেন না। হঠাৎ গুরু অবনীন্দ্রনাথের ডাক পেয়ে কলকাতায় ফিরে গেলেন। আর গেলেন একেবারে হঠাৎ, কাউকে কিছু না-জানিয়ে। সে এক আলোছায়ার গল্প, সেটা এখানে সেরে রাখি।
নন্দলাল তো গরমের ছুটির পরে শান্তিনিকেতনের কাজে যোগ দিলেন, তারপর পুজোর ছুটির আগে পর্যন্ত রইলেন। তারপর সেই যে পুজোর ছুটিতে কলকাতায় গেলেন– ব্যস, আর ছুটির শেষে ফিরলেন না। এদিকে রবীন্দ্রনাথ তখন শিলং, গৌহাটি, আগরতলা হয়ে পুজোর ছুটির পরে, নভেম্বরের শেষে শান্তিনিকেতনে প্রত্যাবর্তন করেছেন। ফিরে শুনলেন, পুজোর ছুটির পরে বিদ্যালয় খুললেও নন্দলাল আর কাজে যোগ দেননি। স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত হতাশ এবং ক্ষুব্ধ হলেন। তীব্র অভিমানের সঙ্গে পরম বন্ধু C. F Andrews-কে চিঠিতে জানালেন, ‘Boys have come from holydays and our works have commenced… Nandalal has left this place. He has his employment in Calcutta. This has been a lesson to me’.

নন্দলাল এমন অপ্রত্যাশিত ভাবে চলে যাওয়ায় কলাভবন ঘিরে রবীন্দ্রনাথের আশা যেন নিভে গেল। নিজের ইচ্ছেয় নন্দলাল চলে গিয়েছিলেন বলে মনে হয় না। অবনীন্দ্রনাথ একটা চিঠি দিয়ে তাঁকে কলকাতায় ডেকে নেন। আবার বিনোদবিহারীর লেখা একটু অন্যরকম– যা আর কারও লেখায় নেই। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্র হিসেবে বিনোদের সেই বিবরণ নিঃসন্দেহে জরুরি। যাই হোক, বিনোদবিহারীর বয়ান এই রকম– ‘বিশ্বভারতীর… অপরিণত অবস্থায় নন্দলাল ও তাঁর ভ্রাতা (মাসতুতো ভাই) সুরেন্দ্রনাথ কর শান্তিনিকেতনে যোগ দেন শিল্পীরূপে। একটি চিত্র-প্রতিযোগিতার ঘোষণা থেকে ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ছাত্ররা নন্দলালের উপস্থিতি প্রথম জানলেন। সম্ভবত ছাত্রদের মধ্যে সৃজনী শক্তির অনুসন্ধান ছিল এই প্রতিযোগিতার লক্ষ্য। প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল এইরূপ: ১, ইলেকট্রিক পোস্ট, ২, গোরু-মোষ, ৩, গাছ ও ফুল। ব্রহ্মচর্যাশ্রমের অধিকাংশ ছাত্র এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়েছিলেন। প্রতিযোগিতা সম্বন্ধে কোনো সিদ্ধান্তে উপস্থিত হবার পূর্বেই অকস্মাৎ নন্দলাল তাঁর তিনজন ছাত্রসহ আশ্রম ত্যাগ করেন এবং পরে তাঁরা সোসাইটিতে যোগ দেন।’

নন্দলালের এই হঠাৎ অন্তর্ধান আমাদের অবাক করে। ঘটনার সময়ে রবীন্দ্রনাথ কি আশ্রমে ছিলেন না? যদি থাকেন তাহলে কি তাঁর সঙ্গে দেখা না-করেই চলে গেলেন নন্দলাল? কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে ঠিক কী হয়েছিল– এইসব নানা প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খেতে থাকে। এখনও মনে হয়, নন্দলালের এভাবে চলে যাওয়ার নেপথ্যে ঠিক কী কারণ থাকতে পারে! অথচ নন্দলাল বরাবর রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে, শান্তিনিকেতনের প্রকৃতির মধ্যে অবগাহিত হতে চেয়েছিলেন। ভিতরে ভিতরে শান্তিনিকেতনের প্রতি বিশেষ টান অনুভব করছিলেন। ১৯১৬ নাগাদ রবীন্দ্রনাথ যখন নন্দলাল, মুকুল দে আর সুরেন করকে শিলাইদহে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন– নন্দলালের জন্য সে হয়ে উঠেছিল মুক্তির আনন্দ। সে-কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। লিখেছেন, “পদ্মার পরিবেশ দেখাবার জন্যে কবি আমাদের ডাকলেন শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে। গেলুম আমি সুরেন কর আর মুকুল দে। সুরেন আগেই গিয়েছিল কবির সঙ্গে। তখন শীতকাল।… নেমেই দেখি কবি স্বয়ং এসেছেন আমাদের নিয়ে যেতে। তাঁর পিছু পিছু হাঁটছি, হঠাৎ দেখি কী, এক ঝাঁক বালিহাঁস উড়ে গেল ঠিক আমাদের মাথার ওপর দিয়ে। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম। আমার গতিক দেখে কবি বললেন– ‘চলো না, আরও কত দেখবে’। পদ্মার ধূ ধূ চর। নানা পাখি চড়ে কত। সকালে আসে, সন্ধ্যায় ফেরে। তাদের গতিবিধি সব জানা ছিল কবির। সে সব তিনি আবিষ্ট হয়ে দেখতে বলতেন আমাদের।’’

শিলাইদহে প্রকৃতির সেই উন্মুক্ত কোলে এসে নন্দলালের মনে হয়েছে, ‘আমাদের হল হাতে-কলমে নেচার স্টাডির সেই হাতে-খড়ি। আগে ছবি আঁকতুম শাস্ত্র পুরাণ পড়ে। অবনীবাবু পণ্ডিত রেখে পড়াতেন। আইডিয়া পেতুম তখন বই থেকে। কিন্তু এখানে গুরুমশাই হলেন পদ্মার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর তার ব্যাখ্যাতা হলেন বিশ্বকবি। এ মণিকাঞ্চনযোগ দুর্লভ। আমাদের এই সৌভাগ্যের সীমা নাই।’
এ হেন নন্দলাল বীরভূমের প্রকৃতি আর রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য ত্যাগ করে কাউকে কিছু না-জানিয়ে হঠাৎ শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে গেলেন কেন? এ প্রশ্ন বারবার উঠে আসে।
…………………………….
লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত সমস্ত ছবিই নন্দলাল বসুর
………………………….. গল্পকলার অন্যান্য পর্ব …………………………….
প্রথম পর্ব। কলাভবন শুরুর নেপথ্যে এক দরদি শিক্ষক
দ্বিতীয় পর্ব। নন্দলাল বসু ও কলাভবনের শুরুর দিনগুলি
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved