

আমি রবীন্দ্র সদন, শিশির মঞ্চ ইত্যাদি জায়গায় এবং অন্যত্রও শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে কবিতা পড়তে দেখেছি। সবসময়ই মত্ত অবস্থায়। শক্তি যখন কবিতা পড়তে ঢুকতেন, তখন তাঁর সঙ্গে একদল অল্পবয়সি তরুণকে দেখেছি। ’৭৩ থেকে ’৮৩– এই সময়টা তো দেখেইছি। কিন্তু তারপর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাপাঠ শোনা বন্ধ করে দিলাম। কেন বন্ধ করে দিলাম?
সে কতরকম বাজি ফাটে কালীপুজোয়। শব্দবাজি হোক, বা নিঃশব্দ আলোর বাজি। মাপও নেই, মার্জনাও নেই। বাজি যখনই ফাটে, তখন সে কিন্তু পাওয়ার রেডিয়েট করে। ছোট্ট ছোট্ট ফুলকি ছড়িয়ে। ওই ফুলকির অর্থ ক্ষমতা। এমন অনেক মানুষ থাকেন, যাঁর স্বর উচ্চগ্রামের, অর্থাৎ তিনি কথা বললে চারপাশ তটস্থ হবেই। চারপাশে সকলেই যেন শুনতে পায় তাঁর কথা, এইদিকেই নজর বক্তার।
এ লেখায় আমি তিনজনের কথা বলব। তিনজনই অত্যন্ত গুণী। প্রথমে, কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায়। তাঁর অভিনয় আমি দেখেছি মঞ্চে, সিনেমাতেও। দেখেছি তাঁর খবরপাঠ। ‘খোঁজখবর’-এ তিনি সংবাদপাঠ করতেন। সম্প্রতি, বহুদিন পর, তাঁর দেখা পেলাম ‘আড্ডা স্টেশন’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলের পডকাস্টে। পডকাস্টের সঞ্চালক, এক তরুণী, প্রশ্ন করছেন যে, ‘এখন খবর পড়ার, সঞ্চালনা করার যে স্টাইল, লোকজন চেঁচিয়ে খবর পড়ছে– এই ব্যাপারটা আপনার দেখে কেমন লাগে?’ কৃষ্ণকিশোর খুব শান্ত হয়ে, নরমভাবে বললেন, ‘একটু অস্বস্তি লাগে। হয়তো খুব সাধারণ ঘটনা, সেটাই এত চিৎকৃতভাবে ধরা হচ্ছে।’ কিছুক্ষণ পর কৃষ্ণকিশোর বলবেন, ‘এর নিশ্চয়ই প্রয়োজন আছে, কিন্তু আমাকে বললে আমি পারব না।’

কৃষ্ণকিশোরের সংবাদপাঠ আমি দেখতাম একটাই কারণে– ওই বলাটার মধ্যে আমি একটা অভিনয় দেখতে পেতাম। হাতে কাগজ নিয়ে, পাতা উল্টে, মাঝে মাঝে তাকাতেন দর্শকের দিকে। মানে, আমাদের দিকে– যারা ওর কাছে ‘অদৃশ্য’। তিনি এই সাক্ষাৎকারেই তরুণ চক্রবর্তী এবং দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম করেছেন। এঁদের সংবাদপাঠও শুনেছি এবং নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এঁদের থেকে পৃথক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা যায় কৃষ্ণকিশোরকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় খ্যাতি তুঙ্গে ওঠে দেবদুলালের, তাঁর গলায় আবেগকম্পন ধরা পড়ত। সে কম্পন, মুক্তিযুদ্ধের কম্পনের সঙ্গে মিলেও যেত– তাই সে মুহূর্তে তা ছিল জরুরি। তরুণ চক্রবর্তীর কণ্ঠনিক্ষেপ জোরের সঙ্গে করা। কিন্তু রাগের চিৎকারের থেকে কয়েক ধাপ নীচে। কৃষ্ণকিশোর, সেখানে একদম, যাকে বলে আন্ডারটোন, যাকে লো-কি। খোঁজখবরে, তিনি ‘পর্দাফাঁস’ নামেরও একটি অনুষ্ঠান করতেন। যেখানে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হত সমাজের দুর্নীতির কথা। নানা ব্রেকিং নিউজ, নানা অজানা-অচেনা, অকস্মাৎ খবরের ধাক্কা। অথচ, কৃষ্ণকিশোর, গলায় অতিরিক্ত জোর না-দিয়ে, খবরটা এমনভাবে ছেড়ে দিতেন, যাতে জোরটা দর্শক-শ্রোতার ভিতরে গিয়ে একটা তোলপাড় তৈরি করে। সেজন্য দরকার হত এক এক পলক তাকানো, হাতের কাগজ থেকে চোখ তুলে। কিন্তু সেই চোখ তোলা মোটেই ঘন ঘন নয়। ফলে অনেক দেরিতে এসে পড়া ওই পজ বা বিরতি– সংবাদপাঠে একটা নম্র কিন্তু অবশ্য়মান্য বাঁক নিয়ে আসে।
কৃষ্ণকিশোর পডকাস্টে বলছেন, ‘সময়টা তো এখন বদলে গিয়েছে। এখন সকলে এটাই (এই ‘চিৎকার’, যে শব্দটা একবারও কৃষ্ণকিশোরের মুখে শোনা যায়নি ) শুনছেন। প্রায় সমস্ত চ্যানেলই তো সংবাদপাঠের এই প্রক্রিয়াকে জরুরি মনে করছেন, মনে করছেন, এভাবেই বলা উচিত। একেবারেই প্রয়োজন যদি না হয় এই উচ্চস্বরের, তাহলে এটা সকলে গ্রহণ করছেন কেন?’ পদ্ধতিটিকে তাই ‘ভুল’ বলতে পারছেন না কৃষ্ণকিশোর। পাশাপাশি আমার মনে পড়ছে যে, টেলিভিশনে প্রায় সব চ্য়ানেলেকর সঞ্চালকই ধমক দিয়ে কথা বলেন, বিশেষত যখন চলে বিতর্কসভা।

কৃষ্ণকিশোর প্রধানত একজন অভিনেতাই। তাঁর যে সঞ্চালকের ভূমিকা, তাও তো ছিল গলারই কাজ। কিন্তু কখনও মনে হয়নি ‘গলাবাজি’। এখন প্রায় প্রতি সন্ধ্যায়, নানা সংবাদমাধ্যমে, মূলত টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় কি চিৎকৃত স্বরের প্রকাশ দেখতে পাই না আমরা?
‘গলাবাজি’ করার মধ্যে আসলে ‘পাওয়ার রেডিয়েট’ করা আছে, যে-পাওয়ারটা হয়তো যিনি চিৎকার করছেন, তাঁর নিজস্ব নয়, ধার করা। চ্যানেল-সংস্থা নিশ্চয়ই চেয়েছে এমনটা। তবে ধারের বারুদ নিয়ে গলাবাজি শেখাচ্ছে এই সময়টাই। কারণ ‘অ্যাগ্রেসিভ’ না-হলে, এ যুগে নাকি আরও ওঠা যাবে বেঁচেবর্তে থাকা যাবে না।Yej
ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রধান ব্যক্তিত্ব কৌশিকী চক্রবর্তীর একটি ভিডিও চোখে পড়ল সেদিন। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে তিনি পোস্ট করেছেন সেই ভিডিও। খানিকটা যে দুঃখিত, মর্মাহত, তা বোঝা যাচ্ছিল শুরু থেকেই, তাঁর চোখমুখ দেখে। তিনি বলছেন, ‘আপনাদের সামনে আজকে আসতে বাধ্য হয়েছি। দুটো ক্লিপিং দেখুন।’ সেই প্রথম ক্লিপিংটিতে দেখা গেল তিনি গান গাইছেন। তান করছেন তীব্র গতিতে। ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, দরবার ফেস্টিভালের একাংশ, যা তিনি গেয়েছিলেন। এই ক্লিপিং সরে গিয়ে চলে আসে আরেকটি ক্লিপিং। ‘ভানমতী’ নামের একটি মিউজিক ভিডিওর। অত্যাধুনিক পোশাক, পাশ্চাত্য নৃত্যে কুশল কয়েকজন যুবক নাচছেন। নেপথ্যে চলছে কৌশিকীরই ওই দরবার ফেস্টিভ্যালের গান, কিন্তু সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাশ্চাত্য গানের ধরনে ‘বিট’। কোনও সন্দেহ নেই যে, এই নাচে গুণপনা যথেষ্টই রয়েছে, রয়েছে ফিটনেসও, তা সত্ত্বেও, একটা বড় রকমের অস্বস্তি জাগিয়ে তুলছে তা। কেন?
কৌশিকী বলছেন, ‘আমার গান নিয়ে কেউ এমন যে করেছেন, আমাকে জানানো হয়নি।’

বলছেন, শাস্ত্রীয় সংগীত একজনের তৈরি নয়। কোনও এক শিল্পীর, এক কালখণ্ডে নির্মিত হতে পারে না। শত শত বছর ধরে সংগীতগুণীরা এই গান গাইতে গাইতে এসেছেন। কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্র তাঁদের বাহন। সেই সংগীত ঘুরতে ঘুরতে আজকের শিল্পীর গলায়।
মনে পড়ে, পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার, গত বছরই ওঁর আস্তানায় যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সেদিন, বাজিয়ে শুনিয়েছিলেন মল্লারের একটি প্রকার। বড়জোর আধঘণ্টা। তারপর বলেছিলেন, এই রাগের নাম ‘চারযুগী মল্লার’। অর্থাৎ, চারজন যোগী একসঙ্গে বসে সেই মল্লার তৈরি করেছিলেন। ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ সাহেবকে বাবা আলাউদ্দিন শিখিয়েছিলেন এই মল্লার। আলী আকবর খাঁ সাহেবের প্রত্যক্ষ ছাত্র হিসেবে পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ এই রাগ কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন। কত যুগ ধরে এই শাস্ত্রীয় সংগীত তৈরি হচ্ছে। চর্চা হচ্ছে। সাধনা হচ্ছে। এবং এই সাধনাই একজন গানের চর্চাকারীকে ‘যোগী’তে পরিণত করে।

কৌশিকী চক্রবর্তী এরপর যে কথাটা বলছেন, তা শুনে, আমার অশ্রুগ্রন্থি শিথিল হয়ে এসেছিল। যদিও আমি গানবাজনার লোক না। উনি বললেন, ইংরেজিতে হলেও. তার অর্থ হয় এই যে, একেকটা স্বরের জন্য ‘হার্ডওয়ার্ক’ দরকার। ওস্তাদরা যাকে বলেন ‘মেহনত’। ওই যে অত দ্রুত তান করছেন কৌশিকী চক্রবর্তী, একটা স্বরও বিন্দুমাত্র সরছে না, তার জন্য তো মেহনত রয়েছে। কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর, সুবিনয় রায়ের একটিমাত্র উক্তি দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। উনি বলেছিলেন, ‘মোহরের স্বরস্থান ছিল নিখুঁত।’ গুলাম আলী খাঁ সাহেবের একটা কিস্সা এখানে না-বলে পারছি না। একদিন বাড়িতে রেওয়াজ করছেন তিনি। রেওয়াজের মাঝেই ফিল্মের গান ভেসে আসছে বারবার। সেই গান লতা মঙ্গেশকরের। বারবার খাঁ সাহেবের রেওয়াজে বাধা তৈরি করছে এই দ্বিতীয় সুর। খাঁ সাহেব বিরক্ত হচ্ছেন, ধৈর্যভঙ্গ হচ্ছে তাঁর। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি বলে উঠেছিলেন, ‘শালী সুর সে কভি নেহি হটতি!’ একথা লতা মঙ্গেশকরের কানে পৌঁছয়। খাঁ সাহেবের থেকে পাওয়া উক্তিকে তাঁর গায়িকা জীবনের বিরাট প্রাপ্তি বলেই মনে করেছিলেন তিনি।

সুর থেকে কক্ষনও না-সরা– একথা আমি কৌশিকী চক্রবর্তীর সম্বন্ধেও বলতে পারি। ১৯৯৮ সালের এক সন্ধেবেলা, ১৭ বছরের কৌশিকী ‘সংগীত রিসার্চ অ্যাকাডেমি’র পৃষ্ঠপোষকতায় যখন প্রথমবার জনসমক্ষে গাইছিলেন, তিনি গেয়েছিলেন ‘শ্রী’ রাগ। তখনও তাঁর গলায় স্বর নিখুঁত জায়গায় লেগেছিল। পরবর্তী সময়ে, তাঁর গলায় হয়তো অলংকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সুরকল্পনা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এসব তিনি কীভাবে পেলেন? ওই সাধনা করেই তো। যোগী হয়েই।
তাই, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মধ্যে যে পাশ্চাত্য বিট ও পাশ্চাত্য নৃত্যের ওই প্রদর্শন, ছুটকো কৌতুক– তাতে অপমানিত বোধ করেছেন তিনি। প্রতিবাদ করেছেন জনসমক্ষে, নিজের ভিডিওর মাধ্যমে। ‘আদিম লতাগুল্মময়’ কাব্যগ্রন্থে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘শোনো আমি আজ এই ধর্মে বড় লাঞ্ছনা দেখেছি’। এই কাব্যগ্রন্থ প্রথম যখন পড়ি, তখন শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে আলাপ হয়নি। পরে, যখন পরিচিত হলাম, জিজ্ঞেস করেছিলাম শঙ্খ ঘোষকে, যে, ‘আপনি তো ধর্মে বিশ্বাস করেন না, আপনি এই কথাটা লিখলেন? আপনাকে তো নাস্তিক বলেই জানি।’ উনি বলেছিলেন, ‘নাস্তিকের কি ধর্ম থাকতে পারে না? কবিতাই কি তোমার কাছে একটা ধর্ম নয়?’

কৌশিকীর কাছে সংগীতও এরকম একটা ধর্ম। সেই ধর্মের পক্ষে উনি কথা বলছেন। প্রথম ক্লিপিংয়ে, যেখানে কৌশিকী গাইছেন, তা সংগীত। আর পরবর্তী মিউজিক ভিডিওতে তা হয়ে দাঁড়ায় ‘গলাবাজি’। এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে, কৌশিকী এক্ষেত্রে নিজের শিল্পীত কোটর ভেঙে বেরতে চাইছেন না। শ্রাবণী সেনের ‘কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসার ঘায়ে’– এই গানের সঙ্গে কৌশিকী শাস্ত্রীয় সংগীতের বিস্তার বন্দিশ গেয়েছেন। তখন কিন্তু ‘গলাবাজি’র আবহ তৈরি হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, একই রাগের দু’রকম প্রকাশ। এক রবীন্দ্রনাথে। আরেক শাস্ত্রীয় সংগীতে। দু’টি নদী মিশে গেল। ফলে ‘ফিউশন’-এর সঙ্গে কৌশিকী শুধু পরিচিতই নন, অংশগ্রহণও করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে, তিনি অপমানিত বোধ করছেন। বলছেন, ‘আমার অপমানের থেকেও, অপমান করা হয়েছে শাস্ত্রীয় সংগীতকে।’
১৯৭৩ সাল। তখন আমার একটা কবিতাও বেরয়নি। শীতকাল। গায়ে সোয়েটার। পঞ্চাশের কবিদের, অর্থাৎ যাঁরা মূলত কৃত্তিবাসের কবি, তাঁদের একটা কবিসম্মেলন ছিল। শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আলোক সরকার– এঁরা ছিলেন না বটে, তবে তারাপদ রায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, নবনীতা দেবসেন, কবিতা সিংহর মতো অনেকেই ছিলেন। বিড়লা অ্যাকাডেমি প্রেক্ষাগৃহের একতলায় সেই কবিসম্মেলন। খবর পেয়ে চলে গিয়েছি সেখানে। কী করে পেয়েছিলাম খবর? বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল দৈনিক পত্রিকায়। দু’টি দৈনিক পত্রিকা তখন সবার হাতে হাতে– একটি ‘যুগান্তর’, অপরটি ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’। দ্বিতীয় পাতায় প্রচুর নাটকের, অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন থাকত।

কবিসম্মেলন ধীরে ধীরে শেষের দিকে ঢলে পড়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাপাঠ দিয়ে সাঙ্গ হবে তা। ঠিক তার আগেই স্টেজে ঢুকে এলেন প্যান্ট-শার্ট পরা শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সেই প্রথম দেখছি তাঁকে। কবিতা পড়েছি আগেও। স্টেজে চেয়ার রাখা। কিন্তু শক্তি চেয়ার অস্বীকার করলেন। মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে পড়লেন তিনি। প্রেক্ষাগৃহে হইহই। আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন, নামিয়ে দাও। অর্থাৎ, মাইকটা ওঁর মুখের কাছে এনে দিতে হবে। উনি বই খুলেছেন, পাতা ওল্টাচ্ছেন। কেউ একটা, দর্শকদের ভিড় থেকে, চিৎকার করে বললেন, ‘দাঁড়িয়ে পড়ুন।’ শক্তি একমনে পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন, ‘কেন হাওয়া দিচ্ছ বাবা!’ বললেন গলা না-চড়িয়ে, ধীরেসুস্থেই। তুমুল হর্ষধ্বনি উঠল প্রেক্ষাগৃহে!
পরে, আমি রবীন্দ্র সদন, শিশির মঞ্চ ইত্যাদি জায়গায় এবং অন্যত্রও শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে কবিতা পড়তে দেখেছি। সবসময়ই মত্ত অবস্থায়। শক্তি যখন কবিতা পড়তে ঢুকতেন, তখন তাঁর সঙ্গে একদল অল্পবয়সি তরুণের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। এই ছেলেদের বদলে বদলে নতুন মুখ চলে আসত। কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা পড়তে উঠছেন, কিন্তু সঙ্গে দল নেই, এমন হয়নি। ’৭৩ থেকে ’৮৫– এই ১২ বছর সময়টা তো দেখেইছি। কিন্তু তারপর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাপাঠ শোনা বন্ধ করে দিলাম। কেন বন্ধ করলাম? কারণ আমার মনে হত যে, উনি যখন কবিতা পড়ছেন, যেন ধমক দিয়ে দিয়ে পড়ছেন। ‘অবনী বাড়ি আছো’-তে ‘ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়ি’– এই বাক্যটিও তিনি ধমকের ভঙ্গিতেই উচ্চারণ করতেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর, একটি তথ্যচিত্র দেখি– ‘ক্রিমেট মি, ও ফায়ার!’। শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে এই তথ্যচিত্রটি বানিয়েছিলেন বিষ্ণু পালচৌধুরী। বেশিরভাগ শুটিংই সম্ভবত শান্তিনিকেতনে। একটা দৃশ্যে একটা গাছের ডালে থুতনি প্রায়-রেখে আস্তে আস্তে বলছেন কবিতা। ওখানেও শক্তিকে খানিকটা কৃত্রিম লেগেছিল। শক্তি তো অভিনেতা নন।

’৯০ সাল। ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়ে গিয়েছে ততদিনে। ওঁর বাড়ি গিয়েছি। আমি ওই একদিনই ওঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। জন্মদিনে। ২৫ নভেম্বর। তখন লেখালিখি করে সামান্য যা উপার্জন হত, তা দিয়ে একটা খদ্দরের জহরকোট কিনেছিলাম। দাম ছিল ৪৬ টাকা। দেশ-এ কবিতা লিখে তখন পেতাম ১০০ টাকা। একবার ওই লেখার টাকা দিয়েই মা’কে শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম। ’৯০ সালে মা নেই, শক্তি ছিলেন। তাই শক্তির জন্য জহরকোট। শক্তি জহরকোটের প্যাকেট খুব অধৈর্যের মতো ছিঁড়লেন। তারপর সেই জহরকোট পরে, থম মেরে বসে রইলেন। একেবারে ছেলেমানুষ!
অনেক বছর পরে, মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের ‘আন্তরিক পর্যটনে’ যখন বেরল, জানতে পারলাম সেসময় শক্তির দু’-তিনবার স্নায়ুরোগের চিকিৎসা হয়ে গিয়েছে। আমি যখন দেখতে শুরু করেছি, সেসময় শক্তি চট্টোপাধ্যায় পা ঘষে ঘষে হাঁটেন। মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় পাওয়া যায় যে, ‘শক্তির চোখের তারা মাঝে মাঝে স্থির হয়ে যেত।’
সেই ’৯০ সালে, জন্মদিনে, শক্তি এক জায়গায় বসে রয়েছেন। চুপ। একফোঁটাও পান করেননি, তখনও। বিকেল চারটে, সাড়ে চারটে। মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় আমাকে অনুরোধ করলেন, ‘তুমি এসেছ, তুমি একটু নিজের কবিতা পড়ো না!’ সে বছরই আমার একটা কবিতার বই বেরিয়েছিল। ‘আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো’। খুব আশ্চর্য করে দিয়ে মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় সেই বইটার একটা কপি আমাকে এনে দিলেন। ‘এই তো তোমার বই। পড়ো।’
ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তার মানে কি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও পড়েছেন? আমি পাতা উল্টে ন-চারটে কবিতা পড়লাম। ছোট ছোট। তখন মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায় খানিকটা গম্ভীর গলায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বললেন, ‘শক্তি, এবার তুমি কবিতা পড়ো। জয় পড়ল। তুমি পড়বে না?।’
শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ এনে দেওয়া হল। পাতা উল্টে শক্তি কবিতা পড়তে শুরু করলেন। ‘একটি চূড়া, স্থির যেন সে একটি চূড়ার মতো।’ পড়লেন দুটো- তিনটে-চারটে কবিতা। শান্তভাবে। ‘অবনী বাড়ি আছো’ বা জনপ্রিয় কবিতাগুলো পড়েননি সেদিন। সেবারে শক্তি, মাটিতে বসে, যে-কবিতা পড়েছিলেন, তার প্রথম কবিতাও ছিল ‘একটি চূড়া, স্থির যেন সে একটি চূড়ার মতো।’ তখন ‘একটি চূড়া’ তিনি বলেছিলেন, চিৎকার করে। সেই প্রথম আমি ‘শক’ খেতে শুরু করেছিলাম। চূড়ার মতো স্থির থাকা তো শক্তির সেই কবিতা পড়ার মধ্যে আসছিল না। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, এটাই হয়তো পাঠ। যদিও আমি এই পাঠের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিতে পারিনি।

এর ১৭ বছর পরে, স্নায়ুরোগগ্রস্ত, চিকিৎসাধীন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে, বিন্দুমাত্র আসব পান না-করা শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে দেখলাম, তাঁর ভরাট গলায় তিনি খুব আস্তে আস্তে যেন নিজেকেই শোনাচ্ছেন তাঁর কবিতা। সেই ঘরে উপস্থিত মীনাক্ষীদি, আর বোধহয় একজন দু’-জন কেউ। তখন, ওই চূড়ার স্থিরতা, ধরা পড়েছিল শক্তির কণ্ঠে। যা হয়তো স্নায়বিক অসুস্থতার কারণেও এসে পড়েছিল তাঁর ভিতর। শক্তির এইদিনের কবিতাপড়া ‘গলাবাজি’ নয়। মত্ত অবস্থায় যখন স্টেজে পড়তেন শক্তি, তা হত গলাবাজি।
এক সময় ‘সোনার বাংলা’ নামের এক পত্রিকা বেরত। সম্ভবত, তা সম্পাদনা করতেন পূষণ গুপ্ত। সেই পত্রিকার এক সাংবাদিক, তপশ্রী গুপ্ত, একবার শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি যে কবিতা পড়েন, আপনার কবিতাগুলো এরকমভাবে চেঁচিয়ে পড়েন কেন?’ শক্তি প্রথমটা চুপ করে যান। তারপর কিছুটা আনমনাভাবে বলেছিলেন যে, ‘আমার ভেতরে কেউ একজন আছে, যাকে আমি দেখতে পাই না। তাকে আমি ডেকে তুলতে চাই। এবং যখন পানমত্ত থাকি তখন আমার তাকে বারবার ডাকতে ইচ্ছে করে।’
বড় কবি না-হলে, এমন উত্তর দেওয়া অসম্ভব!
সেজন্যেই শক্তি অনেক সময়ই ‘অবনী বাড়ি আছো’– একথাটা খুব জোরের সঙ্গে ছুড়ে দিতেন। ওই সাক্ষাৎকারে আমি ওঁর চিৎকারের একটা যুক্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু সবসময়ই যে তিনি এমনটা করেছেন, তা নয়। অনেক সময়ই শ্রোতাদের কাছ প্রবল হর্ষধ্বনি পাওয়ার জন্য, তাদের আরও উজ্জীবিত করার জন্য তাঁর ধমক-নিক্ষেপ। কেউ কেউ তো হাততালির দ্বারা উদ্দীপিতও হন। তা তো অপরাধের নয়। আবার হাততালি বিষণ্ণও করে কাউকে। কবি মানস রায়চৌধুরী লিখেছিলেন, ‘পৌরজনতার তালি কে চেয়েছে?’

এই যে হাততালিতে বিষণ্ণ হয়ে পড়ার কথা বললাম, এমন কি সত্যিই কেউ আছেন? কবিদের মধ্যেই? হ্যাঁ। প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত। তিনি হাততালির আওয়াজ শুনলে বিষণ্ণ হয়ে পড়তেন। ’৭৩ সালের যে-অনুষ্ঠানের কথা বললাম, সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রণবেন্দু দাশগুপ্তও। তিনটে কবিতা পড়েছিলেন। কবিতা পড়ার পর, ওখানে উপস্থিত তাঁর বন্ধু-কবিরা হাততালি দিয়েছিলেন। খুব গম্ভীর হয়ে সেদিন বেরিয়ে গেলেন প্রণবেন্দু, হাঁটতে লাগলেন একা একা।
পরে, প্রণবেন্দুর সঙ্গে আলাপ হয়। ’৭৮ বা ’৭৯ সালে। আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তিনি একলা হেঁটে বেরিয়ে পড়েছিলেন সেদিন! প্রণবেন্দু বলছিলেন, ‘কবিতা পড়ার পর, অত আওয়াজ আমি নিতে পারিনি তখন। সেজন্যই, আপনমনে, হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি চলে আসি।’
কবিতাপাঠ, সংবাদপাঠ, এমনকী, বিতর্কসভায় বক্তব্য পেশ করা– এই সব কিছুর জন্যই গলা উঁচু করার দরকার তখনই হয় যখন নিজের বলা কথাগুলির ওপরে নিজেরই বিশ্বাস থাকে না। বিশ্বাস থাকে হাততালির প্রতি। তাই গলাবাজি!
এর বাইরে এক আলো-অন্ধকার বাগান আছে। শিল্পের বাগান। হ্যাঁ, বলাও শিল্প। কিন্তু যিনি বলেন তিনি কি শিল্পী? পর্দায় বা মঞ্চে এলেই শিল্পী?
এ প্রশ্নেই আজ থেমে যাই।
………………………………..
অনুলিখন: সম্বিত বসু
……….পড়ুন বাজিকর মিনি সিরিজের অন্যান্য লেখা……….
১। ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে
২। শিল্পের রং, শিল্পীর রংবাজি
৩। সোজা থাকলেই বিপদ
৪। ফাঁকিবাজিকর
৫। ধাপ্পাবাজির পাঠশালা
৬। অবাক দলপান
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved