


রোববার.ইন-এ এবার মাঝে মাঝেই গল্পের আসর। তবে, শুধুই রবিবার করে। কেমন লাগছে সেইসব গল্প আপনাদের? জানাতে পারেন [email protected]এই মেল আইডিতে। গল্প পাঠাতেও পারেন আমাদের। গল্পের শব্দসীমা ২০০০। পাঠাতে হবে ইউনিকোড, ওয়ার্ড ফাইলে। সঙ্গে পরিচয় ও ফোন নাম্বার দিতে ভুলবেন না।
চৈত্রবিকেলে গঙ্গার তীরে এক বেশ্যার সঙ্গে বসেছিল রবীন্দ্র মালাকার। আজ সে পরেছে ফুলহাতা জামা, লাল-হলুদ মিশেলের; ফানেলের শার্ট। পরনে কালো প্যান্ট। চোখে সুরমা। মাথায় যথারীতি সেই কাউবয় টুপি। টুপিটি এমনই যে, তার দিকে তাকালে আগে সেই ঢেউ-খেলানো টুপির দিকে চোখ যায়। বেশ্যাটিরও গেল। সে বলল, এমন জমকালো টুপিটি হাতালে কোত্থেকে! রবীন্দ্র কোনও উত্তর দিল না। সে তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে মিটিমিটি হাসতে লাগল। গঙ্গার জল নেমে যাচ্ছে এই বিকেলে। রবীন্দ্র মনে মনে হিসেব করল, তার মানে জোয়ার আসতে সেই রাত আট-টার আশপাশে। জল এতটাই নেমেছে যে পাড়ের কাদা-মাটি-ইট-মালসা– সব বেরিয়ে পড়েছে। একটা পুরুষ্টু সাদা বক গঙ্গার জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে তার বাসার প্রতি ফিরে চলেছে।
বেশ্যাটির নাম তরুলতা। এটিই তার আসল নাম কি না, সেটা কেউ জানে না; রবীন্দ্রও নয়। বেশ্যাদের দেহটাই লাগে, নাম নয়, তাই নাম নিয়ে কেউই ভাবিত নয়। না পাড়ার মেয়েরা, না মেয়েটি নিজে, আর রবীন্দ্রর তো কথাই নেই! আজকে সে রবীন্দ্রকে ডেকেছে একটিই কারণে। সামনেই বিধানসভার ভোট। আর এখন ‘সার’ নিয়ে রাজ্যে যা চলছে, তা সবাই জানে। তরুলতার ভোট আছে কলকাতায়। কিন্তু সেখানে তরুতলা যেতে পারে না আজ তিনমাস হয়ে গেল! ভোটের খাতায় তার নাম আছে। সে ভোট দিতে কলকাতায় যেতে চায়, এবারের ভোট সে মিস করতে চায় না। কিন্তু সে বেশ জানে, সেখানে তাকে পেলে একেবারে মেরেই ফেলবে মধু সাঁধুখা। আর কোনও ছাড়ছোড় নেই।
মধু সাঁধুখা আর কেউ নয়, কলকাতায় যে বেশ্যাবাড়িতে তরুলতা ঘরভাড়া নিয়ে থাকত, সেই বাড়ির নিচে মধু সাঁধুখার দোকান আছে। মদের দোকান। নিজের জন্য ও খদ্দেরদের জন্য মদ তরুলতা সাঁধুখার দোকান থেকেই আনায়। কিন্তু তবুও কেন কে জানে, মধু একদিন তার কানের গোড়ায় এমন সাঁটিয়ে থাপ্পড় মারল যে, বারান্দায় ছিটকে পড়েছিল তরু। কান আর গাল নীল হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ সাড় ছিল না তার। তারপরে যে-সে বেঁচে ফিরেছে, তার জন্য ভগবানকেই ধন্যবাদ দেয় তরু।
মধু সাঁধুখা একজনের ‘বাবু’। মেয়েটি বাংলাদেশের। তরুর পাশের ঘরেই ভাড়া নিয়ে থাকে সেই মেয়েটি– নাম শবনম খাতুন। সেদিন তার ঘর বেরিয়ে মধু যাচ্ছিল তরুলতার ঘরের সামনে দিয়ে। ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল তরুতলা। তার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বারান্দা পেরচ্ছিল মধু সাঁধুখা। তারপরে আচমকা ঘুরে গিয়ে থাপ্পড়টা মারে। তরুলতা আজও বুঝতে পারে না, তার কী দোষ ছিল। সেই থেকে খ্যাপা কুকুরের মতো মধু সাঁধুখা তাড়া করে ফিরেছে তরুলতাকে– মারবে বলে।
রবীন্দ্র মালাকারের সঙ্গে তরুলতার পরিচয়টা একটু অদ্ভুত ভাবে। মাঝে-সাঝে যখন মেয়েদের পাড়াতে যায় রবীন্দ্র; চেনাজানা মাসির কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মাসির হাতে পাঁচটা গুটকার প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলে, নতুন মেয়ে এল? এই করেই তার সঙ্গে তরুলতার পরিচয়। সেবার তরুলতার ঘরেই মাসি তাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘এই মেয়েটি লাইনে পুরাতন হলেও এখেনে নতুন। যাও, দেখতে ভালো। তোমার ভালো লাগবে।’
তা দেখতে এখনও সুন্দর তরুলতাকে। বছর ৪২ বয়স হল তরুলতার, চেহারাটাকে এখন ছিপছিপে রেখেছে কচি মেয়েদের মতো। গায়ের রং ফরসা, চোখ-মুখে টান আছে। আর আছে ভদ্র ও রুচিশীল ব্যবহার। অন্য মেয়েদের মতো খদ্দেরদের দিকে সে তেড়ে যায় না বা গালিগালাজ করে না। প্রথম দিনেই তার সঙ্গে জমে গেল রবীন্দ্রর। তার ঘরে ঢুকে বিছানায় জমিয়ে বসল রবীন্দ্র। তরুলতা বলল, ‘তুমি মাল খাও?’ রবীন্দ্র উত্তর করেছিল, ‘মাল কে না খায়!’
‘আনাব?’
‘আনাও। কিন্তু আমার কাছে বাড়তি পয়সা নেই।’
শুনে থমকে গিয়েছিল তরুলতা। এ আবার কীরকম খদ্দের রে বাবা! বেশ্যাবাড়ি এসেছে ভোগ করতে, মাল খাবে, তাও বেশ্যার পয়সায়!
তরুলতা আর কিছু ভাবেনি। তক্তপোশের তলা থেকে বের করেছিল বাংলা মদের বোতল। মদ ছাড়া তরুলতার চলে না। দিনের বেলাতেই সে মদ খেয়ে ফিটিং হয়ে থাকে। বাংলাই খায়। ওসব শৌখিন পচা আঙুরের রসে তার নেশা জমে না। প্রতিদিন সে একটি করে বড় বোতল কেনে। পাঁচশোর। বেশ্যাপল্লির ভেতরে সেই বোতলের দাম ২২০ টাকা। সারাদিনে সে সেই বোতল শেষ করে ফেলে। রাতে দিকে, খদ্দের থাকলে, তাকে ছেড়ে ফোন করে দেয়, দোকানের ছেলে বিল্টু এসে দিয়ে যায়। রাতে সে একাই বসে ঢুকুঢুকু মদ খায় আর মনে পড়ে কলকাতার কথা। কলকাতায় শেঠবাগান গলিতে থাকার সময় সে খেত বটে। তবে এমনি করে নয়।

সেদিন চলে যাওয়ার সময় রবীন্দ্র তার ফোন নম্বর নিয়েছিল। বলেছিল, ‘পয়সা থাকলে আসব, নইলে নয়। আর যদি ফোন করি, কথা বলবে?’ তরুলতা উত্তর করেছিল, ‘ঘরে লোক না-থাকলে বলব।’
তারপর থেকে অনেকবার ফোনে কথা হয়েছে, মাঝে দু’-চারবার গিয়েছিল রবীন্দ্র। ফোনে টাইম ফিট করেই গিয়েছিল। তারপরে আজ, এই বিকেলে, গঙ্গার ধারে তরুলতা তাকে ডেকেছে কিছু কথা বলার জন্য। সেই কথা আর কিছুই নয়, ভোটের দিন তরুলতা কলকাতা যাবে, সকাল সকালই যাবে; যাবে, ভোটটা দিয়েই চলে আসবে। রবীন্দ্র সঙ্গে থাকলে একজন সঙ্গী হয় আর সাহস পায় সে।
রবীন্দ্র বলে, ‘খরচ?’
‘আমার।’
গঙ্গার জলে একটা মাছরাঙা ঝাঁপ দিল। সেদিকে তাকিয়ে রবীন্দ্র বলে, ‘খদ্দেরপাতি এখন কেমন তোমার?’ ঠোঁট উল্টে তরুলতা বলে, ‘কলকাতার জুলুস এখানে কম। তাছাড়া রোজার মাস চলছে, খদ্দের কম। দিনে একটা কি দুটো– অনেকের তাও হয় না।’
‘এখানে এসে তোমার তাহলে লস হল বলো!’
‘আর তোমার লাভ।’
শুনে হাসল রবীন্দ্র। বলল, ‘লাভ কেন?’
‘ওই যে, ঢুকুঢুকু।’
‘বেশ্যাপাড়ায় যেতে যে ইচ্ছে করে না, তা নয়। তবে আমি খুব কম যাই– তুমি তো জানোই।’
‘কেন?’
হাসল রবীন্দ্র। হেসে, পকেট দেখাল। ফাঁকা।
‘আর মদ খাওয়া? মাগনায়?’
‘তুমিই প্রথম খাওয়ালে।’
‘আগে যখন আসতে?’
রবীন্দ্র লাজুক মুখে বলে, ‘মদের কথা বললেই মেয়েরা টাকা চাইত। না দিলেই রেগে লাল! বলত, হারামি মিনসে!’ শুনে তরুলতা হা হা করে হাসে। বলে, ‘তা তুমি একটু হারামিই আছ।’ রবীন্দ্র বলে, ‘মেয়েরা বলত, যা করার পাঁচ মিনিটে করে বেরিয়ে যাও।’
‘আর টাকা? দিতে তখন?’
‘ওটা আগেই নিয়ে নিত। তারপরে বাকি কাজ। কিন্তু তুমি দেখি অন্যরকম। তাই তোমাকে ভালো লেগে গেল। তোমার ফোন নম্বর নিলাম। এটা ঠিক, তোমার সঙ্গে কথা বললে আমার ভালো লাগে।’
‘এবার আমার কাজটা করে দাও। ভোটের দিনে আমাকে সঙ্গে নিয়ে চলো। ভোট-টা দিই। এবারে ভোট দেওয়াটা খুব দরকার। না-দিলে যদি নাম বাদ দিয়ে দেয়, তখন! যদি ধরে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়, তখন!’ রবীন্দ্র হেসে বলে, ‘তাহলে ভালোই হবে। তোমার পাশের ঘরের বাংলাদেশের মেয়ের হাত ধরে তুমি সে দেশে চলে যাবে। আর সঙ্গে আমিও যাব।’
‘সেখেনে তুমি গিয়ে কী করবে?’
‘বা-রে! সেখেনে একটা গাছের নিচে তোমার জন্য একটা চালাঘর বাঁধতে হবে নে!’
তখন হা হা করে হাসে তরুলতা। বলে, ‘তুমি কিন্তু খুব রসিক মানুষ। জানো, এবারে আমার ভাইয়ের লস হয়েছে।’
‘লস কেন?’
‘প্রচুর আলু ফলেছে, দাম নেই। বাজারে দেখছ না, চন্দ্রমুখী আলু আট-টাকা কেজি দরে বিকোচ্ছে! এমন হয়েছে কোনওদিন? একবস্তা আলুর দাম ৭০ টাকা! ভাবতে পারছ? আর সামনে ভোট বলে, কোনও নেতাই মাথা ঘামাচ্ছে না, কেবল মাইক ফুঁকে যাচ্ছে– আমাদের ওদিকে তিনজন চাষি আত্মহত্যা করেছে। কী করবে?’
‘তবে চল, আমরাও সুইসাইড করি।’
‘মরণ! কথার কী ছিরি! কখন কোথায় কী বলতে হয়, এই বুড়ো বয়সেও শিখলে নে?’
শুনে রবীন্দ্র ফিকফিক করে হাসে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে তরুলতা বলে, ‘আচ্ছা, কীরকম একটা গন্ধ আসছে না?’
‘গন্ধ?’ বলে নাক দিয়ে জোরে জোরে বাতাস নিল রবীন্দ্র। বলল, ‘কই?’
‘পাচ্ছ না?’
‘না।’
‘পাবে কী করে, মুখে সব সময় গুটকা পুরে রেখেছ। বাতাস টানলে নাকে গুটকার গন্ধ ঢুকে যায়!’
রবীন্দ্র আবার মুচকি হাসে। এদিক-ওদিক তাকায়। আকাশ দেখে। সেখানে মেদুরতা। আকাশের বর্ণ না নীল, না সাদা বা না অন্যকিছু। এইসব মিশেলে আকাশ এক অদ্ভুত রং ধারণ করেছে, যে-রঙের নাম জানে না সে।
‘কী হল? যাবে না?’
‘কখন বললুম যে, যাব না?’
‘তবে হাসলে যে?’
‘ও কিছু নয়, কিছু নয়। সেই মাঝিটা বলছিল–’
‘মাঝি!’
‘ও কিছু নঙ, ও কিছু নয়।’
‘কীসব ভুলভাল বকছ তুমি! যাবে কি না ঠিক করে বলো! ভোট দিতে গিয়ে পরান চলে গেলে আমাকে আর দেখতেও পাবেনে, কথাও বলতে পারবেনে আমার সঙ্গে।’
‘যাব যাব।’
‘ঠিক বলছ?’
‘আরে হ্যাঁ। তুমি জাহান্নমে যেতে বললেও যাব।’
তরুলতার বাড়ি আরামবাগের এক গ্রামে। সে ফাইভ পাশ। প্রথম যৌবনে বিয়ে হয়েছিল। সে বিয়ে টেকেনি। পেট চালাতে সে যৌনকর্মীর কাজ বেছে নেয়। সে-যে এই কাজ করে, তার বাড়ির লোক জানে। দরকারে বাড়িতে টাকা পাঠায়। সেখানে মা, ভাই, ভাইয়ের পরিবার থাকে। বাড়ির লোক কলকাতা গেলে তার ঘরেই থাকে। তখন কাজ বন্ধ রাখতে হয় তরুলতাকে। মধু সাঁধুখার সঙ্গে ঝামেলার পরে সে ভাইয়ের বাড়ি, আরামবাগের গ্রামে চলে যায়। কিন্তু সেখানেও নিস্তার নেই। মধু সেখানেও লোক পাঠিয়েছে তাকে মারার জন্য। কোনওক্রমে সে পালিয়ে বেঁচেছে। তারপরে গঙ্গার ধারে, এই পাড়ায় এসে উঠেছে। আর কলকাতায় যে ঘরে সে দেহব্যবসা চালাত, তা তালামারা অবস্থায় পরে আছে আজ তিনমাস, যেতেই পারছে না। সেখানে ঘরে তার প্রচুর জিনিসপত্র, নগদ টাকা ও কিছু গয়না আছে। আর আছে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড। এই অবস্থায় সে কলকাতা যেতেও পারছে না মধুর ভয়ে। নাগালে পেলেই তাকে মেরে দেবে।
রবীন্দ্র বলে, ‘তোমার ওপর অত রাগ কেন তার?’
‘জানি না।’ বলে তরুলতা মাথা নাড়ে।
‘মারার জন্য লোকই পাঠাচ্ছে কেন?’
‘সে-ও আমার অজানা।’
‘হুম! ভারি গোলমেলে ব্যাপার। তোমার সঙ্গে এমন শত্রুতা তার, অথচ… সেটাই হচ্ছে কথা!’
‘গন্ধটা কীসের বলত?’ বলে নাক টানে তরুলতা। মুখে আঁচল চাপা দেয়। বলে, ‘প্রদীপ নিভে গেলে পোড়া সলতের গন্ধ যেমন এ-ও তেমনই!’
শুনে রবীন্দ্র আকাশের দিকে তাকায়। গঙ্গার ধারে বসলে এই হয়, অনেকটা আকাশ দেখা যায়। আকাশের বাহার, তার রূপ-রস-গন্ধ। সঙ্গে নদী, তার প্রবাহ আর নৌকার ভেসে যাওয়া। তখন ভারি মজাদার লাগে জীবনটাকে।
‘তুমি কি কলকাতা যেতে ভয় পাচ্ছ?’
‘আরে না না’, বলে মিচমিচ করে হাসে রবীন্দ্র।
‘তবে?’
‘আমি কাউকে ভয় পাই না। কে কোথাকার মধু সাঁধুখা…’
‘সত্যি পাচ্ছ না?’
‘পাব কেন?’
‘যদি মেরে দেয়।’
‘দিলে দেবে।’
‘কাকে?’
‘আমাকে। আমাকেই। তুমি তখন দৌড়ে পালিও।’
‘তোমায় ফেলে রেখে?’
‘হ্যাঁ, তাতে কী?’
‘যা–’
‘যা কীসের? এমন তো কতই হয়।’
‘তোমার ভোটে নাম আছে?’
‘আছে।’
‘আমারও আছে। কিন্তু কার্ড… তুমি গন্ধটা পাচ্ছ না?’ বলে মুখটা বিকৃত করে তরুলতা। বলে, ‘উঃ, কী পচা গন্ধ! বাতাস নেওয়া যাচ্ছে না, বমি উঠে আসছে। কীসের গন্ধ?’
রবীন্দ্র চুপ করে থাকে।
‘জানো?’
‘কী জানি!’
‘তুমি জানো। কী পুড়ছে?’
‘কে জানে!’
‘অনেক লোক এবারে নাকি ভোট দিতে পারবে না?’
‘হতে পারে সেইসব মানুষজন তাদের বাতিল ভোটার কার্ড পুড়িয়ে দিচ্ছে।’
‘যা, তুমি খুব আং-বাং কথা বলো! ওয়াক্!’
রবীন্দ্র হি হি করে হাসে। আকাশে দেখে। সামনের আকাশ পরিষ্কার, আগের মতোই রং ধরে আছে। কিন্তু তার বাঁ-দিকের আকাশ? আকাশের দিকে মুখ উঁচিয়ে থাকা লম্বা থেকে সরু হয়ে যাওয়া চোঙাটা সব গাছের মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে, দেখা যাচ্ছে। তাতে এবার ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। আগে যা ছিল সামান্য, চোখ এড়িয়ে যেত, এবার সেখানে কালো ধোঁয়া প্রকট। তরুলতা গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে তা দেখে ফেলে। বলে, ‘কীসের ধোঁয়া ওটা? কী পুড়ছে ওখানে!’
‘মানুষ।’ নির্বিকার গলায় বলে রবীন্দ্র।
‘মানে!’
‘ওটা শ্মশান।’
‘তুমি আমাকে শ্মশানে এনে বসালে! আজব মানুষ তুমি।’
‘শ্মশান এই ঘাট-টা নয়। এটা শিবমন্দির ঘাট। শ্মশানঘাট খানিকটা দূরে। নদী এখানে বাঁক নিয়েছে বলেই শ্মশানটা মনে হচ্ছে পাশেই।’
‘আশ্চর্য!’ তরুলতা উঠে পড়ে। পিছু পিছু রবীন্দ্রও। বলে, ‘রেগে গেলে?’
‘রাগব না? মুখে বলো ভালোবাসি, এদিকে এক শ্মশানে এনে বসিয়ে রেখে মানুষ পোড়ার গন্ধ শোঁকাচ্ছ! এতবার করে বলছি, কীসের গন্ধ, ততবার তুমি উত্তর করছ মন্দিরে প্রদীপ নিভে গিয়েছে, ও হল সলতে পোড়ার গন্ধ! কোন লগ্নে জন্ম তোমার?’
‘আমি যাব।’
‘জাহান্নমে যাও।’
‘আহা, কলকাতা যাওয়ার কথা বলছি।’
তরুলতা তার হাঁটা থামায় না। তবে গতি শ্লথ। সন্ধে নেমেছে। রাস্তায় কোথাও আলো কোথাও আঁধার। একটি বন্ধ বাড়ির দরজায় মাথায় ঝাড় হয়ে ফুটে আছে অজস্র মাধবীলতা ফুল। এক-একটি ঝাড়েই ফুটেছে সাদা-গোলাপি ফুল, একত্রে। আর কী সুবাস তার! গোটা এলাকাটা মাতোয়ারা হয়ে আছে সেই গন্ধে। আর যেন সেই গন্ধের টানেই দাঁড়িয়ে গেল তরুলতা।
রবীন্দ্র বলে, ‘রাগ কোরো না সোনা, ওখানে, ওই ঘাটে সবাইকেই একদিন যেতে হবে। তুমি রূপ নিয়ে পুড়বে, আমি এই কুৎসিত রং নিয়ে; ভোটার কার্ড থাকলেও পুড়বে, না ভোট দিলেও– তখন সবারই দেহ পুড়ে ওই– মন্দিরের নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো গন্ধ বেরুবে। ঠিক কি না?’
তরুলতা উত্তর করে না। অন্ধকার বাড়ি, অন্ধকার ঘর। শ্বেতপাথরের ফলকে উত্তীর্ণ বাড়ির নাম: শেষের কবিতা। সদর দরজার ছাদ ঝেঁপে যে-ফুল ফুটে আলো হয়ে আছে এই অন্ধকারেই। গঙ্গার ধারে মজবুত দোতলা সেই বাড়ি– অন্ধকার, দরজা-জানালা সব ভেতর থেকে বন্ধ। দেখেই বোঝা যায়, লোক থাকে না অনেক দিনই, হয়তো তার মৃত্য পরোয়ানা জারি হয়ে গিয়েছে; প্রোমোটারের লোকজন যখন ভাঙবে তখন আকাশে পাকিয়ে উঠবে মৃত্যুর ধুলো।
‘দাও দিকিনি, কলকাতার ঠিকানাটা আর তোমার ঘরের চাবিটা… আমি কালই সেখেনে গিয়ে এনে দেব। পরে যখন ভোট দিতে যাবে, আমি সঙ্গে থাকব– এখন আগেভাগেই এনে দিই কার্ডটা।’
তরুলতা সাড়া দেয় না। দেখা যায়, বন্ধ বাড়িটার গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সে মুখ উঁচু করে ফুলের গন্ধ শুঁকছে। গন্ধটা ভালো লাগে রবীন্দ্ররও। এমনি করে কোনও দিন সে ফুলে গন্ধ নেয়নি দেহের ভিতর। আহা, জীবন ভরে যায়!
তাদের পিছনে ঢং ঢং করে আওয়াজ হয়। জীবন সম্পর্কে এতদিনের অভিজ্ঞ রবীন্দ্ররও বুঝতে ভুল হয়ে যায়, শব্দটা মন্দিরে পুজো শেষের; নাকি আসছে শ্মশান থেকে– একটি দেহ পুড়ে ছাই হল বলে।
অলংকরণ দীপঙ্কর ভৌমিক
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved