Exploring the Life and Art of Dileep Chinchalkar। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তুলি-কলমের বহুমুখিতা

অনেক দূরের কোনও কঠিন লক্ষ্য স্থির করে সেখানে পৌঁছনোর নিরানন্দ দৌড়ে যখন ক্লান্তি কিংবা হতাশা আসে, তখন সহজ আনন্দের কথা বড় আরাম দেয় মনকে। প্রতিদিন দৈনন্দিন একঘেয়েমি, দুঃখ, বিচ্ছেদ, হতাশার যে-জীবন তার মধ্যে থেকে কণা কণা সৌন্দর্য দেখতে পেতেন দিলীপ চিঞ্চলকর– শিল্পী আর অসাধারণ কার্টুনিস্ট। কিন্তু সর্বোপরি আশ্চর্য এক সৌন্দর্য-লেখক।

শেষ আপডেট: মে ২০, ২০২৬, ২০:৪৬   
Facebook WhatsApp Messenger

১৩.

নয়ের দশকে একটা পোস্টার আমরা খুব ব্যবহার করতাম– সামনে একটা ট্রাক যাচ্ছে, নানা জিনিসপত্রে বোঝাই, কারখানার শেড, বাঁধের স্লুইস গেট ইত্যাদি এগজস্ট পাইপ থেকে কালো ধোঁয়া বেরচ্ছে পিছনে সাইকেলে করে আসছে খাটো ধুতি আর মাথায় পাগড়ি-পরা গাঁয়ের একটা বুড়ো মতো লোক তার মুখ ট্রাকের ধোঁয়ায় ঢাকা নিচে লেখা আছে, ‘বুরি নজর ওয়ালে, তেরা মুঁহ কালা’ কাউকে কিচ্ছু বোঝাতে হত না এক ধাক্কায় উন্নয়নের সব গল্প সাফ আর্টিস্টের নাম দিলীপ চিঞ্চালকর বাস ইন্দোর

কেবল অসাধারণ সব কার্টুন নয়, ছোটদের পত্রিকা ‘চকমক’ একসময়ে ঝলমল করত দিলীপের আঁকায় ভারতের প্রথম পরিবেশ আলোচনার বই– ‘হমারা পর্যাবরণ’ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন দিলীপের তুলি-কলমের বহুমুখিতা তবুও দিলীপ ছবির চেয়েও বেশি পরিচিত ছিলেন লেখার জন্য

প্রতিদিনের জীবনের অসংখ্য ছোট-বড় মুহূর্তের ভিতর থেকে অবলীলায় এক অদ্ভুত আলো বার করে আনতেন দিলীপ, যা পাঠকের চোখকে বদলে দেয় হিন্দি থেকে বহু অনুবাদের কাজ করা সত্ত্বেও দিলীপের লেখা কখনও অনুবাদের কথা ভাবিনি আমি খুব ইচ্ছে হয়েছে আমার, স্বভাষাভাষীরা পড়ুন সেই সব আশ্চর্য লেখা, যা জীবনের সমস্ত ধুলোর ওপর মণির বিভা মেখে দেয়, কিন্তু অনুবাদ করার কথা ভাবিনি প্রথমেই বুঝে নিয়েছি, সব কাজ করা যায় না আর আমার ‘অওকাত’ নিয়ে খুব সামান্যই করা যায়

zoom
ছোটদের পত্রিকা ‘চকমক’ ঝলমল করত দিলীপ চিঞ্চালকারের আঁকায়

অদ্ভুত একটা জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল দিলীপের লেখা ওর বাবা ছিলেন ইন্দোর আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল একেবারেই উদাসীন নন পরিবার সম্পর্কে, কিন্তু শিল্পী হিসাবে সুপরিচিত আর খুব ব্যস্ত মা আর দিলীপ বাড়িতে নিজেদের জগতে খুশি কিন্ত ক্লাস এইটে ওঠার পর ঠিক হল– ভালো স্কুলে পড়াশোনা করার জন্য তাকে পাঠানো হবে দেরাদুন অনেক দূর তিনদিনের পথ যেতে যেতে তার সবসময়েই মনে হল– মায়ের যে খুব কষ্ট হবে! বড্ড একা একা লাগবে মায়ের কী করা যায় তাহলে? কেমন করে সে এত দূরে থেকেও মায়ের মন খুশি রাখতে পারে? উপায় পাওয়া গেল বাবাকে বলে অনেকগুলো খাম পোস্টকার্ড আনানো গেল প্রথমেই শুরু হল মা-কে চিঠি লেখা প্রতিদিন একটা করে প্রথমটা গেল বাবার হাতে করেই তিনদিনের দিন বাবা যখন পৌঁছবেন, তার পরের দিন থেকে রোজ একটা করে চিঠি যাবে মায়ের নামে দিলীপ লিখে দিয়ে আসবে সুপারের অফিসে

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

উপায়ের ব্যবস্থা তো হল, কিন্তু রোজ মাকে লিখবে কী? একটা কথা সেই ছোট্ট দিলীপের মাথাতেও পরিষ্কার, মা জানতে চায় যে, দিলীপ ভালো আছে আর খুশিতে আছে খুশি থাকার কথাই লিখতে হবে রোজ প্রথম দিন লেখা হল সন্ধেবেলা পৌঁছে কেমন দেখা গেল হোস্টেলটা, সেই কথা পরের দিন সকালে উঠে কী কী করতে হয় আর কী খেতে দিয়েছে হোস্টেলে, সেই কথা তার পরের দিন ক্লাসের বন্ধুদের কথা কিংবা বাগানে কেমন আবিষ্কার করা গিয়েছে টুনটুনি পাখির বাসা সপ্তাহে ছ’-দিন এই লেখার বিষয় খুঁজতে খুঁজতে কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা গেল– আর নিজে খুঁজে বার করতে হচ্ছে না, যেমনটি লিখতে চায় সেরকম নানা বিষয় নিজের থেকেই সামনে দেখা যাচ্ছে ঠিক যেমন ঝরা ধান কুড়িয়ে শীলবৃত্তির জীবনধারণ করে যে-মানুষ, সাধারণ চোখে যাকে মনে হবে খালি মাঠ, সেখানে বহু ঝরা ধান তার চোখে ধরা দেবে, প্রায় সেরকমই রোজকার জীবনের যা কিছু ভালোমন্দ, তার ভিতরের সহজ আনন্দের জিনিসই দেখতে পেতে লাগল দিলীপ, তার সেই প্রথম বড় হওয়ার সময় থেকে

এই চিঠি লেখা হয়ে উঠেছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ বার্ষিক ছুটি ছাড়া সারা বছর, প্রতিদিন স্কুল জীবনভর স্কুল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যখন বিদেশ গেল, দৈনিক চিঠি লেখার রুটিন রয়ে গেল প্রায় একই রকম মা সে-সব চিঠি সযত্নে রেখে দিতেন শুধু নয়, মাঝে মাঝে আত্মীয় বন্ধুদের দেখাতেনও সেগুলো একটা সময়ের পরে সেই পিতৃবন্ধুদের মধ্যেই কেউ কেউ সেই সব মন ভালো করে দেওয়ার চিঠিগুলো গুচ্ছ করে ছাপিয়ে দেন দিলীপের কথায়, ‘যে ইঞ্জিনিয়ারিং উচ্চশিক্ষার জন্য আমাকে বিদেশে পাঠানো হয়, তা আমাকে চার আনারও খাবার জোগায়নি কখনও আমি শেষ পর্যন্ত করলাম সেই লেখা আর ছবি আঁকার কাজ’ মন ভালো করার লেখা অনেক দূরের কোনও কঠিন লক্ষ্য স্থির করে সেখানে পৌঁছনোর নিরানন্দ দৌড়ে যখন ক্লান্তি কিংবা হতাশা আসে, তখন সহজ আনন্দের কথা বড় আরাম দেয় মনকে প্রতিদিন দৈনন্দিন একঘেয়েমি, দুঃখ, বিচ্ছেদ, হতাশার যে-জীবন তার মধ্যে থেকে কণা কণা সৌন্দর্য দেখতে পেতেন দিলীপ চিঞ্চালকর– শিল্পী আর অসাধারণ কার্টুনিস্ট। কিন্তু সর্বোপরি আশ্চর্য এক সৌন্দর্য-লেখক। সেইসব চিঠি থেকে প্রকাশিত হয় সংকলন। দিনে দিনে সেগুলো ছড়িয়েছে অসংখ্য মানুষের হাতে প্রাণে ভাবনায় চেনা-অচেনা অগণিত মানুষের বিষাদ মুছে তোলার সেই রচনা-মঞ্জুষা।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

কী লিখেছেন দিলীপ? অনুবাদ নয়, এক দুটো বিষয় উল্লেখ করি শুধু–

ক. বাড়ির উঠোনে এসে পড়া আহত কবুতর যখন সেরে উঠল একটু যত্নেই, তখন সে আর বাড়ি যেতে চায় না এই উঠোন ঘরবারান্দা– এখানেই ঘুরে বেড়ায় এমনকী বাঘের মতো বড় কুকুর টাইগারের পিঠেও উঠে বসে মাঝে মাঝে আর অচেনা এই শত্রুর সামনে দিশেহারা টাইগার কেঁউ কেঁউ করে কাঁদে

খ. অঘ্রান মাস শেষ হয়ে আসছে, বাতাসে শীতের আভাস সন্ধের মুখে হাঁটতে গিয়ে শোনা গেল, ঝোপের পিছনে বাগানে কোনও লোক জোরসে কল খুলে নর্মদাস্তোত্র গাইতে গাইতে নিজের মনে স্নান করছে ১৫ মিনিট পর ফেরার সময়ও শোনা গেল সেই একইরকম জলের কলকল আওয়াজ আর অদৃশ্য লোকটির বেশ তৃপ্তির স্বর এই ঠান্ডায়, এই সাঁঝের মুখে! কী এমন আনন্দ পাচ্ছে! একবার ইচ্ছে হল, এখুনি পরীক্ষা করে দেখি একবার তবু তখনকার মতো বাদ রেখে, পরদিন সকালে মন শক্ত করে একটু তেল মেখে একবারেই ঝপাস করে মগ ভর্তি ঠান্ডা জল ঢেলে দিলাম মাথায় তারপরে পুরো বালতিটাই ঢাললাম ওরকম করে দারুণ লাগল শেষ করে নিজের মনটা যেন কীরকম ভালো হয়ে গেল

zoom
দিলীপ চিঞ্চালকার

ঠিকই বলে লোকে, সবচেয়ে বড় আনন্দের জিনিসগুলো বিনামূল্যেই পাওয়া যায় বিনামূল্যে না কি অমূল্য! কে জানে! আমি নিজের জন্য আরও কয়েকটা এরকম খুশি হওয়ার কাজের লিস্ট বানিয়েছি– রাতের আকাশে তারা দেখা এটা যে কী ভালো লাগে! কী বিরাট এই ব্রহ্মাণ্ড, মনে হয় ভোর হতে দেখা ঠিক কখন গাছপালা কালো কালো ছায়ামূর্তি থেকে সবুজ হতে শুরু করল সেটা দেখা এটা করতে পারলে সারাদিন আর অত গরম লাগে না সকালে নিজের ঘর-বারান্দা-উঠোন ঝাঁট দিয়ে সাফ করা

১৯৯৯ সালে আমরা যখন FAO থেকে সংগঠিত ভারতের নানা দূর অঞ্চলের প্রাচীন জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা দেখতে যাই, যার কথা আমার ‘জলের নাম ভালোবাসা’ বইয়ে আছে, সেই যাত্রাকালে প্রায় প্রতিদিন ওই ভ্রাম্যমাণ টিমের নিজস্ব নিউজ বুলেটিন বেরত। লেখা আর ছবিতে সাজানো সেই কাগজ তৈরি করার জন্য প্রায়দিনই রাত জাগতেন সোপান আর দিলীপ। আবার সারাদিন হাসিখুশি।

zoom
দিলীপ চিঞ্চালকারের লেখা বই

এইসব সহজ ভালোলাগার কথা ভেবে বার করতেন না দিলীপ, ওঁর বাঁচাই ছিল ওইরকম সাদামাটা কিন্তু শান্তিতে ভরা বাড়িটির নাম ছিল ‘গোরৈয়া’, মানে চড়ুইপাখি ওটাই দিলীপের একমাত্র কন্যাটিরও নাম রঙিন কামিজ আর সাদা পায়জামা পরা প্রসন্ন মুখ এই বন্ধুটি ছিলেন খুব মৃদুভাষী আর রসিকও ৭০-এ পৌছনোরও আগে ক্যানসারে চলে যাওয়ার আগে পর্যন্তই

___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___

১২. শিকড়ের খোঁজে ফেরা

১১. ইনি আমার মাসি, আর আমি এনার দিদি!

১০. অন্য এক ঘরের সন্ধানে

৯. সেই কবে একটা যুদ্ধ হয়েছিল

৮. যুদ্ধের যে গল্পে বীরত্ব নেই, মনখারাপ আছে

৭. কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!

৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা

৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি

৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই

৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান

২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের

১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম

artist Author Chakmak Magazine Dileep Chinchalkar hamara paryavaran Indian Artist Indian Author Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on