


ইস্টবেঙ্গল যত সাফল্য পেয়েছে দু’-দশকে, তার কয়েকগুণ বেশি ব্যর্থতায় ডুবেছে। আর যত ব্যর্থতার অন্ধকার এসেছে, তত মানুষ গোল হয়ে বসেছে কোনও অলীক মোমবাতির চারপাশে। আর তত ইস্টবেঙ্গল একটা ফুটবল ক্লাবের বাইরে গিয়ে হয়ে উঠেছে ছিন্নমূলের ‘আইডেন্টিটি’।
কিশোরভারতীর সিমেন্টের গ্যালারিতে চাপড় মেরে হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছেন বছর ৬২-র প্রৌঢ়। বিলাপ করছেন। কাছে গিয়ে শুনি, বলছেন, ‘সবাই আওয়াজ দেয়, সবাই আওয়াজ দেয়, আমরা কিছু জিতি না, আমার ৬২ বছর বয়স হয়ে গেল, মরার আগে ভাবিনি আমরা চ্যাম্পিয়ন হব!’
এই কান্না নিশ্চিত শুনতে পাচ্ছিলেন সুদূর সিরিয়া থেকে এককালে এ-তল্লাটে এসে পড়া রিফিউজি– মাহমুদ আল আমনা। ক্ষণকাল পরেই যাঁর পোস্ট, ‘We have won!’ মনে পড়ে– আল আমনা– আপনি, কেবল আপনি মতি নন্দীর বুড়ো ঘোড়ার মতো লড়ে গিয়েছিলেন মিনার্ভার হয়ে চেন্নাই সিটির বিরুদ্ধে। ইস্টবেঙ্গল-খালিদ জামিল-আমনা-কাটসুমি– শেষ অবধি না-হওয়া। আপনার ইস্টবেঙ্গল– আপনার উদ্বাস্তু স্মৃতির গায়ে চেনা মাটির গন্ধ– আপনি জানকবুল লড়লেন, ইস্টবেঙ্গলে না-থেকেও ইস্টবেঙ্গলের জন্য, হল না! এই না-হওয়া, আমাদের আজন্ম সম্বল যেন!

ইউসুফ ইয়াকুবু। ঘানা। যেবার ওঁর মা মারা গেল, সেদিন ম্যাচ। বাড়ি না-ফিরে ম্যাচটা খেলল। জোড়া গোল। সেবার কথা দিয়েছিল ইয়াকুবু– তাও লিগ আসেনি!
ট্রেভর জেমস মরগ্যান– ডানকার্কের চক্রব্যূহে আটকে পড়া লাল-হলুদ জনতাকে এত কিছুর স্বপ্ন কি আপনি দেখাননি? সুভাষ-স্ট্যানলি-ডি’রাইডার যুগের পর ইস্টবেঙ্গল জনতাকে বাঁচাতে যে এক্সক্যাভেশন আপনি চালালেন, তা কি একেবারেই ব্যর্থ? না বোধহয়। কলকাতা লিগ-শিল্ড-ডুরান্ড-ফেড কাপ– সবই জিতিয়েছিলেন, কিন্তু আসেনি কেবল একটি জিনিস- লিগ! সালগাঁওকর ম্যাচ, যা আপনার বুকে নেপোলিয়নের স্পেনীয় ক্ষতের মতো দগদগে। ২-০ লিড। ড্র হলে কার্যত চ্যাম্পিয়ন। আপনি তুলে নিলেন রলি-টলি জুটিকে। রবিন সিং-টোলগে ওজবে। ইস্টবেঙ্গলের পুরনো বাঘ ইয়াকুবু গোলের মালা পরিয়ে দিল। স্বপ্ন ভেঙে চৌচির! বিশুদা– একটা মারকাটারি ডার্বি জয়– সেই চড়া স্টেটমেন্ট– ‘ইস্টবেঙ্গল কাঁপে না কাঁপায়!’– ডো ডং হিউন-বার্নার্ড মেন্ডি– ব্যর্থ একটা মরশুম। গিয়েও যায় না কেউ!

ইস্টবেঙ্গলের খেলা শেষে ফেরার পথে সুরজিৎদা একদিন কবিতা আবৃত্তি করছিল ঘোরের মধ্যে–
‘গায়ে-হলুদ-দেওয়া বিকেলে
একটা দুটো পয়সা পেলে
যে হরবোলা ছেলেটা
কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত–
তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো…’
দিন। মাস। বছর। কোচের পর কোচ। প্লেয়ারের পর প্লেয়ার। যুবভারতীর আপার টায়ার। ৯৪ মিনিটে গোল খেয়ে প্রায় বাস্তবের হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে দেওয়া শরীরটা নিয়ে যখন দত্তাবাদ পেরিয়ে এগতাম, অলকের চায়ের দোকান-গুমটির পাশে ধপ করে বসে ভাবতাম– কাল কী হবে? সব স্বাভাবিক? উঁহু! অফিস-বাড়ি। ভুলে যেতে হবে। লাগাতার ডার্বি হারের পর কোনও খামখেয়ালি নন্দকুমারের চকিতে গোলের মতো বিস্ময়কর কিছু চাইনি তো– চেয়েছিলাম একটা লিগ। কেউ পারল না!
‘ইস্টবেঙ্গলকে ছেড়ে দেব শালা!’– বিরক্ত হয়ে একদিন বলেছিল সৌরীনদা। আমরাও। পারিনি! অসহ্য ব্যথার মতো হার সারা গায়ে জড়িয়ে ফের মাঠে… ফের দৌড়। সুকান্তদা বলত, ‘না-জিতলে কেউ মনে রাখে না’; স্বপ্নদীপদা হেরে যাওয়া ডার্বি শেষে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে একেকদিন অদ্ভুত শান্ত, শুধু জিজ্ঞেস করত, ‘কোথায় নামবি?’– সলিল চৌধুরীর গান– ‘এই রোকো-পৃথিবীর গাড়িটা থামাও, আমি নেমে যাব– আমার টিকিট কাটা অনেকদূরে…’

কতদূর? বসিম রশিদের মার্কিন মুলুকের জীবন থেকে ফেলে আসা শৈশবের চেয়েও দূরে? নোয়াখালির আটচালায় রেখে আসা মেজদিদার পানের বাটার কথা দিদা বলেছিল মারা যাওয়ার আগের দিন– তার চেয়েও কি দূরে?
এডমন্ড লালরিনডিকা– একটা লজ্জাজনক হার মেনে যাওয়া ডার্বিতে নেমে একাই উত্তাল করবে গ্যালারিকে, তারপর পা ভাঙবে– সে শব্দ শোনা যাবে মিডল টায়ার থেকে। সেই ভাঙা পায়ে অ্যাসিস্টও করবে– কিন্তু ম্যাচ জিতবে না। ছ’বছর পর ফিরে আসবে। বড় ম্যাচের অসমাপ্ত কাজ শেষ করে কর্নার ফ্ল্যাগ তুলে এনে পুঁতে দেবে মাঠে, যেন সমস্ত প্রান্তিকতার বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষেরই ব্যারিকেড বসাচ্ছে ছোটখাটো চেহারার মিজো স্নাইপার। সুমনের গানের মতো: ‘মানিয়েরা মেনে নেয় একধার থেকে/ কেউ কেউ যায় তবু প্রতিবাদ রেখে…’।

অস্কার ব্রুজো ম্যাচ শেষে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না এত ভিড়! মানুষের মাথার কার্পেটে ঢেকে গিয়েছে মাঠ। অস্কার জানেন, ভয়ানক ইনজুরিতে নিজের খেলোয়াড়ি জীবনে ইতি টেনে যেদিন তিনি প্রফেশনাল কোচিংয়ে আসেন, সেদিন থেকেই লেখা হয়ে গিয়েছিল ললাটলিখন– নইলে যে-হাঁসফাঁস শিকল ভেঙে মরগ্যান-রাইডার-বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য-সাতৌরি-আলেহান্দ্রো-ফাউলার-কুয়াদ্রাত– আরও কয়েক ডজন কোচ বেরতে পারেননি– রেলিগেশন ফাইট করা ইস্টবেঙ্গলকে নিয়ে, তিনি ২২ বছরের এ-জগদ্দল পাথর সরাবেন দেড় মরশুমেই।
টিনটিনদা লিখেছে, ‘বাবাকে খুব মিস করি এমন দিনে।’
বাবারা কি আল মাহমুদের কবিতার মতো কোনও জাদুকাঠি?
‘হাজার যুগের সূর্যতাপে/ জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে/ কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!’
মাঠের পাশে, চেনা চেনা মুখ আমাদের কয়েক প্রজন্মের উদ্বাস্তুর আদল যেন। কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল সব্বাই। আমার মনে পড়ে, কত কত মানুষের কথা! সুফিয়ান– মাঠে আলাপ– কতকাল দেখা নেই। দেখা হয় না গৌরবের সঙ্গে কতদিন! নিশ্চিত আজ সবাই আনন্দে মেতেছে।

ইস্টবেঙ্গল যত সাফল্য পেয়েছে দু’-দশকে, তার কয়েকগুণ বেশি ব্যর্থতায় ডুবেছে। আর যত ব্যর্থতার অন্ধকার এসেছে, তত মানুষ গোল হয়ে বসেছে কোনও অলীক মোমবাতির চারপাশে। আর তত ইস্টবেঙ্গল একটা ফুটবল ক্লাবের বাইরে গিয়ে হয়ে উঠেছে ছিন্নমূলের ‘আইডেন্টিটি’। যার সঙ্গে ফুটবল-খেলিয়ে ক্লাবের সম্পর্ক কম। সে মোমবাতি বিশ্বাসের সলতেতে জ্বলে যাচ্ছে– অনির্বাণ!
আজ মাঠে, জয়ের পর অচেনা হাজার হাজার মানুষকে বুকে জাপটে নিচ্ছে সবাই। বৃত্ত আরও আরও বড় হচ্ছে। এতদিন ধরে এই মানুষই তো দিয়েছে ইস্টবেঙ্গল– আমাদের। জাপটে ধরার মতো মানুষ। একটা সময়ে, যখন পড়শি ক্লাব ট্রফি জিতেছে, সাফল্য পেয়েছে, আমরা বিশ্বাস রেখেছি মানুষে। কান্না মিথ্যে হয় না। যখন দিনের পর দিন আইএসএলে সফল একটা দল ‘ইনস্ট্যান্ট নুডলস’-এর মতো জামা বদলে হয়ে গিয়েছে পড়শির দল, ইস্টবেঙ্গল সেদিনও ভরসা রেখেছিল বিশ্বাসে, ‘সাফল্যের শর্টকাট নেই…’; সে-বিশ্বাসটুকু আগলে লেসলি ক্লডিয়াসে পুলিশের ডান্ডা খেয়ে দৌড়ে বাবুঘাট আসার স্মৃতিও ফিকে হয়নি একটুও। ফিকে হয়নি, প্রত্যেকটা ডার্বি– প্রত্যেকটা জরুরি ম্যাচ অনভিজ্ঞতা, খারাপ টিমের কারণে হেরে বুকের পাঁজর থেকে হাড় খুলে খুলে সযত্নে রেখে দেওয়ার রাতগুলো। সেই সমস্ত ভাঙাচোরা বুকে বহুযুগের ওপার থেকে যেন আষাঢ় এল।
ইস্টবেঙ্গল জিতে গিয়েছে! কেরিয়ার ফিনিশ করে দেওয়ার হুমকির মুখে দাঁড়ানো আনোয়ার আলি– ‘ইস্টবেঙ্গল অউর মোহনবাগান ফ্যানস কি বিচ মে বহুত জ্যাদা ডিফারেন্স হ্যায়’ বলা আনোয়ার আলি, আস্ত একটা মরশুম মাথায় আইসপ্যাক বেঁধে ডিফেন্স করে যাওয়া আর্জেন্টাইন সিবিয়ে জিতে গিয়েছে। ইঞ্জিনের মতো উইংয়ে ওঠানামা করা পড়ন্ত বেলার বিপিন জিতে গিয়েছে। জিতে গিয়েছে খারাপ কিপিংয়ে কেরিয়ার শেষ হতে বসা প্রভসুখন গিল। জিতে গিয়েছে বল পায়ে ধরলেই দর্শকদের বিদ্রুপ শোনা নন্দকুমার। জিতে গিয়েছে মিডিয়ার সামনে না-আসা লাজুক স্বভাবের স্কাউট থাংবোই সিংটো।

ইস্টবেঙ্গল– ইউসিআরসি আন্দোলন– একেকটা জলাজমি সাফ হয়ে গড়ে ওঠা কলোনি– মাটি, নিজের জমি, একটা কুলেন্দু সোম-যোগেন মণ্ডল-একেকটা বিজয়গড়– সব মিলে মিশে যায় মানুষের উচ্ছ্বাসে। আর মিলে যায় কেনিয়ার দাদাব। যেখানে উদ্বাস্তু কলোনিতে পায়ে একটা ফুটবল নিয়ে নেমে পড়ে হাজার হাজার শিশু। ইস্টবেঙ্গল আমার-ইস্টবেঙ্গল তোমার– ইস্টবেঙ্গল ওই শিশুটিরও-ইস্টবেঙ্গল গায়ে প্লাস্টিক জড়িয়ে জার্সি বানানো ছোট্ট মুর্তাজার।
ইস্টবেঙ্গলের ২২ বছরের যন্ত্রণামুক্তির জয়সূচক গোলে তাই এক উদ্বাস্তুর পায়ের ছোঁয়াই তো নিয়তি। বাসিম রশিদের গায়ে ওই একখণ্ড প্যালেস্তাইনের পতাকা– লাল-হলুদের জান– ভিটেমাটি ছেড়ে আসা দুনিয়ার সমস্ত রিফিউজির শেষ আশ্রয়– সাতক্ষীরার মাটি– ছিন্নমূল ইস্টবেঙ্গলের ফুরিয়ে যাওয়া ২২টা বছর দিয়ে বুকের ভিতর গড়ে ওঠা স্মৃতির দেশ…
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন অর্পণ গুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved