Robbar

সেইসব হকারেরা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 27, 2026 4:59 pm
  • Updated:May 27, 2026 5:15 pm  

হকার, হকার, হকার। একজীবন, ট্রেনজীবন। কু ঝিকঝিক। বিক্রিবাট্টা। হাঁকডাক। চিরুনি, সেফটিফিন, ঝালমুড়ি, ছুরি, কলম। কলম থেকে লেখা। লেখা সীমান্ত ছিঁড়ে চলে যায়।

জয় গোস্বামী

৬.

হ্যাঁ, যা বলছিলাম। হকার। ট্রেনে উঠেছে।

‘এ-ই-ই রা-শিয়ান বইগুলো নিয়ে যাবেন-ন, এই রা-শিয়ান বইগুলো…’
কেউ কেউ নিচ্ছেন। কম দামে হার্ডকভার বই, ঝকঝকে বাঁধাই। দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়– আবার সে ‘রা-শিয়ান ব-ই’ হাঁকতে হাঁকতে চলে যাচ্ছে। তার ওই ডাকের পাশ দিয়েই ভেসে আসছে আরেকটি ডাক:
‘কাঁচ/ড়াপাড়ার son/পাপড়ি, এক/দম ফ্রেশ, কাঁচ/ড়াপাড়ার son/পাপড়ি এক/দম ফ্রেশ (এবার ব্যক্তিগত স্বরে) নেবেন্নাকি একটা?’

আমি ভাবছি, আরে এ তো চলন্ত মঞ্চ! একজন করে আসছে, পারফর্ম করছে, সে মিলিয়ে যেতে যেতেই আরেকজন। কতরকম কণ্ঠ, স্বরগ্রাম, শরীরী ভাষা, কানেক্ট করার কতই কৌশল! চলমান থিয়েটার একেবারে! আমি দেখছি, এই লেফট উইং দিয়ে ঢুকছে আর ওই রাইট উইং দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

একজন ঢুকল: মুউ-কসুদ্দি আছে, মুউ-কসুদ্দি, মু-কসুদ্দি… নমুনা খান? নমু-না? বি-ই-‘না’মূল্যে! দন্ত্য-ন-টা স্পষ্ট নয়, অনেকটা ‘ল’-এর কাছাকাছি, (যাঁরা নস্য়ি নেন, তাঁদের ‘ন’টা একসময় অর্ধেক ‘ল’ হয়ে যায়।) আর দন্ত্য-স-টা ‘S’-এর মতো!

আমি যাত্রী। সঙ্গে ভাই। তখন এদিক-সেদিক আমার লেখা ছাপা হচ্ছে। আমায় তখন অল্পস্বল্প অজানা যাত্রী চিনতে পারতেন। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু ছাত্রীও। ওই যেমন হয়, ছেলেটা যেন চেনা-চেনা। আর আমি, ভিতরে ভিতরে গুটিয়ে যেতে থাকি। ভয়ানক কুণ্ঠা। কেউ আমাকে লক্ষ্য করলেই একটা অস্বস্তি, একটা হীনম্মন্যতা– ইশকুল পাশ না-করার দরুন আমাকে তাড়া করে বেড়ায় সারাজীবন।

ওই হকার এসেছে এর মধ্যে।

‘মু-কসুদ্দি, মু-কসুদ্দি’– এক হাতে ধরা একটি প্যাকেট, অদ্ভুত কায়দায় নাকের ডগায় দোলাচ্ছে… আর বলছে, ‘নমুনা খাবেন? নমু-না?’

ভাইয়ের একটা স্বভাব ছিল। আমি যদি কখনও একটু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠি কোথাও, বিশেষত প্রকাশ্য সমাজে, সেই মুহূর্তে আমায় ছোট করা। পরবর্তী কালে আমি দেখেছি, যে-সমস্ত জায়গায় আমি গুরুত্ব পেয়েছি, একটা অপমান অপেক্ষা করে থেকেছে আমার জন্য। সেই অপমান তখন আর ভাইয়ের থেকে আসছে না। আসছে সহকর্মী, আধা-পরিচিত– এইরকম কারও কারও থেকে।

মেয়েরা রয়েছে ট্রেনে। তাদের কারও কারও চোখ আমার দিকে। ভাই হঠাৎ বলে উঠল, ‘নমুনা খাবি তো? নমুনা? এই যে, একে দিন, এ নমুনা খাবে।’

আমি বোবা। আর ওই যে মেয়েরা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল– কারও চোখে হয়তো কিছুটা সম্ভ্রম, কারও চোখে খানিক মুগ্ধতা– তারা ফেটে পড়ল হাসিতে!

সেই হাসি কিন্তু মুগ্ধতার হাসি নয়।

(নেপথ্যে এক কবিতা ভেসে আসে যেন)

চলচ্ছবির এই যে মূর্তিখানি
মনেতে দেয় আনি,
নিত্যমেলার নিত্যভোলার ভাষা
কেবল যাওয়া আসা–
মঞ্চতলে দণ্ডে পলে ভিড় জমা হয় কত!
পতাকাটা দেয় দুলিয়ে
কে কোথা হয় গত!…

ইস্টিশান: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ট্রেন ছিল আমার কাছে মঞ্চের মতো। আমি নীরব দর্শক। কিন্তু আমার ভাই আমাকে দর্শক আসন থেকে তুলে মঞ্চে ছুড়ে ফেলল। এক ঝটকায় ওই চলমান থিয়েটারের চরিত্র হয়ে গেলাম আমিও।

মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের নাটক ‘রাজরক্ত’। প্রযোজনা: থিয়েটার ওয়ার্কশপ। সাতের দশক। বিভাস চক্রবর্তী যে-চরিত্রটি করতেন, তার নাম ‘দ্বিতীয়’। অন্যতম প্রধান চরিত্র কিন্তু। ‘আয়না চুড়ি স্নো হিমানী’ বলে বলে ফেরি করতে করতে ঢুকতেন। আমি ঠিক এইরকম হকার প্রত্যক্ষ দেখেছি। কৃষ্ণনগর-শান্তিপুর-রানাঘাট লোকালে। পিঠে কঞ্চির তৈরি সিঁড়ি বাঁধা। সিঁড়ির ধাপে ধাপে ঝুলছে সেফটিপিন, চিরুনি, আয়না, মনিহারি জিনিসপত্তর– এমনকী, ছুরি, কলমও।

তারপর এল ঝালমুড়ি। ঝালমুড়ির খুবই চাহিদা। দু’হাতে কূল পাচ্ছে না। একজন ভারি গলায় বলল, ‘কাজ করতে দিবি তো!’ এই ঝালমুড়ি বিক্রেতা তরুণ। সে হালকা করে জবাব দিল, ‘সকাল থেকে তো অনেক কাজ করেছেন। এবার আমায় একটু করতে দিন!’

লালগোলা প্যাসেঞ্জার চলত স্টিম ইঞ্জিনে। এই তরুণ হকাররা অনেকেই এক কামরা থেকে আরেক কামরায় যেত জানলার শিক ধরে ঝুলতে ঝুলতে। একটা জানলা থেকে আরেকটা জানলা, ধরে ধরে। কখনও জানালার ধারে সিট পেয়েছি, হঠাৎ দেখছি একটা মুঠো। হ্যাঁ, এই কথাগুলো তো আপনাকে আগে বলেছি, তাই না? কিন্তু তখন কী মনে হত, তা বলিনি।

সে সময়টায় নকশাল আন্দোলনের বারুদ সবে ফুরিয়েছে। আমার মনে হত এই হল সেই মুঠো– যা আকাশের দিকে উত্থিত থাকে। এইখানে এসে চলন্ত ট্রেনের রড আঁকড়ে ঝুলছে। এই হল সর্বহারা। এই যাতায়াতের সময় একবার সে মিস করল…

আর তারপর কী হল সে তো জানেনই আপনি।

দুই.


অর্ক দেবের কাছে পেয়েছিলাম হারুকি মুরাকামির একটি বই। নাম: ‘নভেলিস্ট অ্যাজ এ ভোকেশন’ (২০১৫)। সে-বইতে মুরাকামি জানিয়েছেন যে, তিনি প্রথম জীবনে একটি পাবে কাজ করতেন। বিভিন্ন টেবিল থেকে ছোট ছোট গল্পের টুকরো তাঁর কানে এসে পৌঁছত। পাব থেকে বেরিয়ে তিনি দেখতে যেতেন তাঁর প্রিয় দলের বেসবল খেলা। ম্যাচ দেখার সময় উত্তেজনায় তাঁর বুক ধকধক করত। বাড়ি ফেরার পথে হাঁটতে হাঁটতে মুরাকামি ভাবতেন এই বুক ধকধক করা উত্তেজনার সঙ্গে ওই গল্পের টুকরোগুলো যোগ করা যায় না? যা তিনি পেয়েছিলেন পাবের টেবিল থেকে? মুরাকামি তাঁর প্রথমদিকের বইগুলোকে বলেছেন ‘কিচেন’ নভেল। কেন? কারণ, তাঁর লেখার সময় ছিল রাত্রি। থাকার জায়গা ছোট। কিন্তু লিখতে গেলে তো আলো জ্বালাতে হবে। অন্ধকার ঘরে ঘুমন্ত স্ত্রীকে রেখে তিনি ঢুকে পড়তেন রান্নাঘরে। দরজা বন্ধ করে কিচেনে বসে সারা রাত ধরে লিখতেন তাঁর প্রথম দিকের বইগুলো। তাই– কিচেন নভেল। জানেন, এই ‘কিচেন’ কথাটি থেকে আমার মনে আসছে আরেকজন তাঁর ছোটবেলার জীবনকে বর্ণনা করেছিলেন ‘ইটালিয়ানস ইন হেলস কিচেন’– এই নামে। পুরো অধ্যায়টির নামই ছিল তাই। তাঁর বালকবয়সে মা আর ভাইবোনদের ছেড়ে বাবা অন্যত্র উধাও! এই বালক দুপুরে স্কুল করার আগে-পরে ট্রেনের জানলায় জানলায় প্রাণপণে ফেরি করতেন খবরের কাগজ। তিনি শ্রমিক মায়ের সন্তান, যে মা চাইতেন বড় হয়ে ছেলে ‘রেল-রোড ক্লার্ক’ হবে। এই ছিল মায়ের সর্বাধিক উচ্চাশা। তাঁকে ফিরতে হত যে বস্তিতে, যে জীবনে, সেটাকেই তিনি বর্ণনা করেছেন– ‘ইটালিয়ানস ইন হেলস কিচেন’। এই কথাগুলি পাওয়া যায়, ‘দ্য গডফাদার পেপারস অ্যান্ড আদার কনফেশনস’ নামে তাঁর একমাত্র আত্মজীবনীমূলক বইতে। আপনারা বুঝতেই পারছেন, সেই লেখক– মারিও পুজো।

সম্প্রতি পাশ্চাত্যে, শুরু হয়েছে একটি নতুন আন্দোলন– সাহিত্যের। নাম ‘ডার্টি লিটারেচর’। এই মুভমেন্টের প্রধান একজন নারী– এইচ. ডি. কার্লটন। জন্মেছেন ১৯৯৬ সালে। এখন বয়স মাত্র ২৯। তাঁর ‘স্যাটানস অ্যাফেয়ার’ (২০২৩) ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী। ম্যালিস, ডেথ, ডেভিস– এরা এসে দেখা দিচ্ছে এদের বিভিন্ন বইয়ের মধ্যে। বলছেন যে, এগুলি ‘ফিলদি সিরিজ’। প্রকাশিত হচ্ছে ১, ২ এইরকমভাবে, ক্রমানুসারে। পড়লে বোঝা যায়, আত্মজীবন, বন্ধুজীবন এবং অন্যজীবনের ভাঙা ভাঙা টুকরো মিশিয়ে এই ‘ডার্টি সেক্রেট’।

এখানে একটা কথা, বলে নেওয়া দরকার– এই আন্দোলনে যাঁরা অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই নারী। সোফি লার্ক, তাঁর বয়স এখন ৩৭, লিখেছেন ‘দ্য সিনারস ডুয়েট’ (২০২১) নামে একটি বই। দুটো আলাদা আলাদা লেখা– ‘দেয়ার আর নো সেইন্টস’ এবং ‘দেয়ার ইজ নো ডেভিল’ এই বইতে মিশেছে।

৩৪ বছর বয়সি রিনা কেন্ট লিখছেন ‘গড অফ ম্যালিস’ (২০২২), এ বছরের মার্চেই বেরিয়েছে তাঁর ‘হান্ট দ্য ভিলেন’। ‘‘ডেথ’স অবসেশন’’ (২০২৩)– লিখেছেন অ্যাভিনা গ্রেভস। অ্যাভিনা তাঁর বয়সের ব্যাপারটি জনসমক্ষে এড়িয়ে গিয়েছেন। হারলে লারোক্স, বয়স ৩৪, লিখছেন– ‘দ্যাট সিক লাভ’ (২০২৩)।

এতগুলো যে বইয়ের নাম বললাম, একটু লক্ষ করুন, নামেই কি চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে না আন্দোলনের গোত্র? মেয়েদের স্ট্রাগলের কথাই তো আসছে এই গোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তাঁরা খোলাখুলি জানিয়ে দিচ্ছেন যে, একে আমরা বলছি– ‘ডার্টি লিটারেচার’।

এইবার, আজকের, পাশ্চাত্যের ডার্টি লিটারেচরের ভিতরকার যে ঘূর্ণি, তার সঙ্গে ওই ৪০-৫০ বছর আগেকার হকারদের জীবিকা অর্জনের জন্য ট্রেনে ঝুলে থাকা– আকস্মিক পতনে মৃত্যু– যা ভবিতব্য– যদি তাদের মেলাতে পারতাম কোনওভাবে, তাহলে তৈরি হত আরেকটা নতুন ধরনের নাটক। আমার মনে মনে। মনে মনে কি নাটক তৈরি হয় না? দুই আলাদা সমাজ, আলাদা ব্যবস্থা, আলাদা সময়। ওই স্ট্রাগলের কথা লিখছেন বলেই তো নাম হচ্ছে ‘ডার্টি লিটারেচর’। এদিকে ওই ঝালমুড়ি বিক্রেতার মুঠো, পিঠে কঞ্চি নেওয়া সেফটিপিন, কলম-ছুরি বিক্রেতা, মুখশুদ্ধি– এই দুটো রকমের স্ট্রাগলের কি একটা সংঘর্ষ বা মিলন ঘটানো যায় না? এইসব আমার মাথায় ঘোরে, মুরাকামির মতোই। মনের মধ্যে তৈরি হয়ে ওঠে দুই সময় দুই দেশে তৈরি হওয়া সাহিত্য আন্দোলন এবং জীবনসংগ্রহের মুখোমুখি ধাক্কা লাগার নাটক।

আগের দিন যখন ওই ঝালমুড়ি বিক্রেতার হাত ফসকে যাওয়ার পরের পরিণতিটুকু বললাম শেষ-দুপুরে, সেদিন সন্ধের মুখে আমি বসেছিলাম এক যুবকের সঙ্গে। তার সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে ন’বছর পর। আমরা দু’জনেই এই মহানগরের বসবাসকারী হলেও, দেখা হচ্ছে, কিন্তু, ন’বছর– পর।

তার সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল ‘স্থানাঙ্ক’ বলতে আমি কী বুঝি, তাই নিয়ে। গণিতের মতো মানবজীবনেরও ‘স্থানাঙ্ক’ থাকে। এক-এক জনের এক-এক স্থানাঙ্ক। ট্রেনের ওই ঝালমুড়ি বিক্রেতার স্থানাঙ্ক আর আমার স্থানাঙ্ক এক ছিল না। যুবকটি বসেছিল আমার টেবিলের বিপরীতে। অর্থাৎ, আমরা মুখোমুখি। ছেলেটি সহজ-সরল। ও বলল, ‘এখন আপনার আর আমার স্থানাঙ্ক এক।’

আমি তাকালাম টেবিলের নিচের দিকে। ছোট দোকান। টেবিলের নিচটা অন্ধকার। সেই মাটি আমাদের পাড়া। পা মেঝে স্পর্শ করে আছে। হঠাৎ আমার মনে হল, আমি যেন একটা ফাটলের ওপর ঝুলছি। আমি সাহিত্যসমাজের সম্পূর্ণ বাইরে নিয়ে এসেছি নিজেকে। আর এই যুবকটি সাহিত্যসমাজের মধ্যে সবে ঢুকতে শুরু করেছে। ধরা যাক, একজন উঠছে, একটা পাহাড়ের চূড়ার দিকে। কিছুটা উঠেছে সে। কিন্তু যে আপাত স্থবির শিলাখণ্ডের সঙ্গে সে কথা বলছে, আসলে তা সেখানে উপস্থিত নেই। সেই স্থবির তার ভারী ওজন নিয়ে তখন চূড়া থেকে স্বেচ্ছায় গড়িয়ে নামছে অন্ধকার খাদের ভিতর… একজন উঠছে, আরেকজন শৃঙ্গের উল্টোদিকে গড়িয়ে পড়ছে, কী করে এক হয় তাদের স্থানাঙ্ক? ঠিক শৃঙ্গের বিপরীতেই সাহিত্যসমাজ থেকে বেরিয়ে আসা আমি। কিন্তু আসলে যে বেরতে পারিনি, সে মুহূর্তে বুঝলাম, আবার। গলায় একটা ফাঁস আর ঝুলন্ত শরীরটা পা-ছটফট, পা-ছটফট। কিন্তু যেহেতু সে প্রাণপণে পালাতে চাইছে, তাই মুন্ডুটাকে ফাঁসের ওপর রেখে তার বাকি শরীর আলাদা হয়ে তলিয়ে যাক না নিচের অন্ধকারে! তক্ষুনি ওই কফি-দোকানে টেবিলের ওপর যুবকের কাছ থেকে কাগজ-কলম চেয়ে ওইখানেই এই পা-ছটফট লেখা।

কবন্ধ
জয় গোস্বামী

গহ্বর ওহ্ গহ্বর আহ্ গহ্বর
ফাটল ফাটল ফাটল, বল্‌ তারপর!

ধাক্কা ধাক্কা ফাটলে ঝুলে পড়
মোটা দড়ার মাথায় ঝুলছে ধড়।

পা ছটফট হাত পিছনে পিছমোড়া
এক ঝটকায় ছিঁড়ল দড়ির ফাঁসগোড়া

ফাঁসে আটকে কালো কাপড় ঢাকা
মাথা দুলছে গোল চাঁদ না টাকা

কেউ কিছু পায়নি দেখতে পায়নি সব অন্ধ
হাঁ গহ্বর ও গহ্বর তলিয়ে যায় কবন্ধ

আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এই পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে, এটা কবিতা হয়নি ঠিকই, কিন্তু সেই হকারের মতো শিক আঁকড়ে ধরার এবং ফসকে যাওয়ার ভয়সমেত শূন্য ঝুলন্ত পা লাইনগুলোর মধ্যে ছটফট করছে। কবিতাটির শেষে আপনি একটা দাগ দেখতে পাবেন। অর্থাৎ স্ক্যান ঠিকমতো হয়েছে কি না, পরীক্ষা করে দেখছিলাম তাই। সবসময় তো পুনর্পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়।

ধরুন, আপনি যখন আমার দিকে তাকান বা আমি যখন আপনার দিকে, প্রথম আমরা কী দেখি? দেখি মুখ। কথাবার্তা হচ্ছে মুখ দিয়ে। মুখের দিকে তাকিয়ে, মুখোমুখি। মুখ দিয়ে চিনতে পারা। মুখটা থাকে সামনের দিকে।

কিন্তু সমস্ত শরীরের তুলনায় মাথাটি সবচেয়ে ছোট। পুরুষ ও নারী– উভয়েরই। তাদের মুখটা দেখা যায়। মাথাটা। খুব ছোট অংশ হলেও। কারণ মাথার তুলনায় বাকি শরীরটা তো অনেক বড়, আগেই বলেছি। ক-এ স্ক্যানশন পড়ছে এই কারণে যে, ‘কবন্ধ’ থেকে ক আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ক ছোট, একটি বর্ণ। বন্ধ বড়, দু’টি বর্ণ। ক আলাদা হয়ে গেল। সত্যিই ‘ক’ বন্ধ হয়ে গেল।

আর ক-অক্ষর গোমাংস আমি, এটাকেই আপাতত আমার আত্মপক্ষ বা সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সামনে ফেলে দিয়ে আজকের মতো কথা বন্ধ করি।

কৃতজ্ঞতা: শৈবাল বসু

জয়ের সঙ্গে একক অন্যান্য পর্ব

প্রথম পর্ব: সদ্যবৈধব্য চিনতে আমার কখনও ভুল হয়নি

দ্বিতীয় পর্ব: জটলার মাঝে করতালি

তৃতীয় পর্ব: কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়?

চতুর্থ পর্ব: নরহিংসা, বুঝস না, নরহিংসাহ!

পঞ্চম পর্ব: হায়, গৃহহারা!