Robbar

হায়, গৃহহারা!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 18, 2026 5:42 pm
  • Updated:May 18, 2026 6:27 pm  

আমি চমকে উঠলাম। ওই অবাঙালি মহিলা ভিক্ষুকজীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, আমি যেমন এখন অসম্মানে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, আরেকজন তখনও হয়নি, উৎপাটিত হওয়ার ক্ষত তখনও সে বয়ে বেড়াচ্ছে, দু’জনের কলহের মাঝে এমন একটা উক্তি। পথবাসী মানুষের উক্তি। আমি ইচ্ছে করেই ‘পথবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করছি বারবার। রবীন্দ্রনাথের শব্দ তো। পথবাসী। গতিহীন। তারপর গৃহহারা। এর সঙ্গে যুক্ত আছে একটা ‘হায়’!

প্রচ্ছদ: দীপঙ্কর ভৌমিক

জয় গোস্বামী

শৈবাল বসু

৫.

জয়দা, আমরা যারা আপনার রানাঘাট লোকাল পড়েছি এবং আমার যেমন অনেকবার সুযোগ হয়েছে আড্ডার ফাঁকে আপনার মুখে হকারদের নানা স্বরের, নানা ভঙ্গির ডাকগুলি শুনতে পাওয়ার, আজ যদি সেসব নিয়ে একটু বিশেষ করে বলেন…

শৈবাল, লোকাল ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে শুধু রেল-হকার নয়, খুব ছেলেবেলায় ভিক্ষুকদের ভিক্ষে চাওয়ার নানা ডাক আমার কানে বাজে। ট্রেনের হকার ছাড়াও ট্রেনের ভিক্ষুকদেরও দেখেছি, আবার পাড়ার ভিক্ষুকদের স্বরও শুনেছি। আমাদের পাড়ায় একজন ভিক্ষুককে দেখতাম– একটা নীল শার্ট পরা, খালি পা মানুষ। তিনি যেভাবে বলতেন, ওরকম আমি কোনও ভিক্ষুককে বলতে শুনিনি।

কী রকম?

‘মাআ জননীগণ এ-ই ভিখরিটিকে/ একটুউ/ ভিক্ষে/ দিন!… ভিখরিটা/ কিছু/ খেয়ে; বেঁচে; থাকুক!! মাআ: জননী…’
এইরকম ভাববাচ্যে ভিক্ষে চাইতে আমি কাউকে দেখিনি। ভিক্ষে পাওয়া হলে সে পাশের বাড়িতে যেত, ঠিক এক সুরে ডাকত…
‘মা-আ: জননীগণ/ এ-ই ভি…’

আরেকটা বিষয়। ’৭১ সালে তো মুক্তিযুদ্ধ হয়, ওই সময় দলে দলে উদ্বাস্তু আসতে শুরু করে। তার আগে থেকেই, মানে ’৬৯-’৭০ সাল থেকেই অনেক হিন্দু এপারে আসতে শুরু করেন। তাদের থাকার জায়গা ছিল না, কিছু ছিল না। আমি তো স্টেশনে স্টেশনে ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের রানাঘাট স্টেশনটা ছিল বড়। তার চাইতেও বড় স্টেশন ছিল কৃষ্ণনগর। এইসব স্টেশনে অনেক পথবাসী মানুষ একটা বিছানা পেতে আশ্রয় নিতেন। অনেক সময় টিকিট কাউন্টারের পাশে তারা বিছানা পেতে থাকতেন।

উনিশ শতকীয় চিত্র, ইন্ডিয়ান স্কুল

এইসব পথবাসী মানুষ কি রানাঘাটের স্থানীয় পথবাসী, না কি ছিন্নমূল হয়ে আসা মানুষ?

ছিন্নমূল হয়ে আসা মানুষ। তাদের পাশ কাটিয়ে টিকিট কাটতে হত। আমার একটা গল্প আছে ‘ঘোড়াওয়ালা’ নামে। সেখানে, আমার ‘রানাঘাট লোকাল’ বইতে এ-রকম স্টেশনে থাকা মানুষের কথা আছে। তাদেরও তো ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য একটু বাইরে যেতে হয়, তারা করত কী, একেকজন উঠে একটু চলে যেতেন। হয়তো একটু খাবার জোগাড় করতে। এরকম দেখতাম আমি। আমি হয়তো বসে একটা কবিতা লিখছি, একটা ছোট-খাতা বের করে, যার সঙ্গে ওই জনজীবনের সম্পর্ক নেই। এবার দেখছি একজন ফিরে এসেছেন নিজের জায়গায়। একদিন একজন মহিলা, তার বয়স কত হবে, ওই ষাট-টাট, চটে মোড়া মলিন একটি বিছানা পেতে ওখানে বসল, তারপর শুয়ে পড়ল। আমার চোখের সামনে হচ্ছে এসব। খানিক বাদে আর একজন এল। মহিলা। তার সঙ্গে এর বচসা শুরু হল। মানে, তার ‘জায়গা’ জবরদখল হয়েছে। জায়গা তো এই দু’জনের কারওর নয়। স্টেশনের জায়গা। এই মহিলা ভিক্ষায় বেরিয়েছিল। এসে দেখে তার জায়গা দখল করেছে আরেকজন। দু’জনের প্ৰবল বচসা শুরু হল। সে অনেক কিছু বলছে। কেউ কারও জায়গা ছাড়ছে না।

–তুমি ওই পাশটায় যাতি পারো না?

–তুমি যাও না ক্যান। ফ্যানের তলায় হুতি (শুতি) পারবা।

এই বচসার মাঝে এমন একটা কথা শুনলাম, শৈবাল, যেটা আমার জীবনের ক্ষেত্রে খাটে। মানুষ যখন উৎখাত হয়, কখনও নিজের চাকরি থেকে, নিজের প্রতিষ্ঠা থেকে। দেশ থেকে তো বটেই। তখন তার পুরাতন জায়গায় যে কত গরিমা ছিল, সে-কথা সে বারেবারে বলতে থাকে।

–আমারও বাড়ি আছিল, পুকুর আছিল… মাছ হইত!

অপরপক্ষ অবাঙালি। সে শুনতে শুনতে অনেকগুলি কথা শোনার পর হঠাৎ বলে উঠল, খুব আস্তে, ‘অত যদি সুখ কপালে, তবে কেন চট বগলে?’

ওই যে পথবাসী মানুষের সেই চটে মোড়া বিছানা!

আমি চমকে উঠলাম। ওই অবাঙালি মহিলা ভিক্ষুকজীবনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে, আমি যেমন এখন অসম্মানে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, আরেকজন তখনও হয়নি, উৎপাটিত হওয়ার ক্ষত তখনও সে বয়ে বেড়াচ্ছে, দু’জনের কলহের মাঝে এমন একটা উক্তি। পথবাসী মানুষের উক্তি।

আমি ইচ্ছে করেই ‘পথবাসী’ শব্দটা ব্যবহার করছি বারবার। রবীন্দ্রনাথের শব্দ তো। পথবাসী। গতিহীন। তারপর গৃহহারা। এর সঙ্গে যুক্ত আছে একটা ‘হায়’!

ছবি: গুন্টার গ্রাস

জয়দা…

বলুন…

নাহ, কিছু না।… রবীন্দ্রনাথের কথা ভাবছি জয়দা। গানটার কথা। পথবাসী, গতিহীন। এই দু’টি শব্দকে যেটুকু স্পেস দিলেন, সমান স্পেস। ছয় মাত্রা করে। তারপর ‘গৃহহারা’ শব্দে ‘হারা’তে জুড়লেন একটি ১২ মাত্রার তান। সকল গৃহ হারালো যার, তার হাহাকার যেন যেন ছড়িয়ে গেল ওই তানে…

হ্যাঁ, শৈবাল। ওই তানে সুরের একটা উত্থানপতন আছে। গতিহীন মানে, যার জীবনটা আটকে গিয়েছে। ওদের তো আটকে গিয়েছে জীবনটা। তারপর ওই উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে চলা…

আর ওই তিনটি শব্দ, তার প্রত্যেকটির আগে একটি করে ‘হায়’! তিনটি ‘হায়’ তিনরকম। কীরকম জানেন? যে বছর আমি ওই পথবাসী ভিক্ষুকদের দেখছি, তার পরের বছরই আমি ‘বহুরূপী’র ‘রাজা অয়দিপাউস’ দেখব। তিনটে ‘হায়!’ লক্ষ করবেন শৈবাল, নাটক প্রায় শেষদিকটায় পৌঁছে গিয়েছে, তখন ইয়োকাস্তের কণ্ঠে একটা ‘হায়’ শুনি আমরা। সেই নারী তখন হৃদয়ঙ্গম করে নিয়েছেন যে, তিনি কোনও মহাদৈবনিক্ষেপিত দুর্ভাগ্যের শিকার অর্থাৎ, একইসঙ্গে জননী এবং স্ত্রী, তখন তাঁর স্বামীকে, যে তাঁর সন্তানও, তাঁকে বলা– ‘হায় রে অভাগা’ বা পাশাপাশি ‘হায় অয়দিপাউস! আমি তোমাকে কেবল একটি কথাই বলতে পারি, হায়!’ আর নাটক যখন অন্তিমের প্রায় মুখোমুখি তখন অয়দিপাউসও বুঝেছেন, তিনি দৈবনির্দিষ্ট অভিশাপে কী কাজে না-জেনে লিপ্ত হয়েছেন! ইয়োকাস্তের মৃতশরীরের কবরী থেকে খুলে নেওয়া কাঁটা দু’চোখে বিঁধিয়ে নিজেকে অন্ধ করছেন, তখন কোরাসের সমবেত ঊর্ধ্বগামী একটি ‘হা-য়’ বলে ওঠা, আর ঠিক তারপর ‘হা-য় রাজা! এ তুমি কী করলে! এ কি তুমি ভা-লো করলে!’

আর নাটক যখন মধ্যপথে, যখন ইয়োকাস্তের কাছ থেকে রাজা লাইউসের মৃত্যুবিবরণ একটু একটু করে জানতে পারছেন অয়দিপাউস, তখন তাঁর চমকে চমকে ওঠার সঙ্গে ‘হায়, জিউস!’ বা শুধু ‘হায়’– এগুলি অপেক্ষাকৃত দ্রুত বলা…

রবীন্দ্রগানের তিনটি ‘হায়’-এর সঙ্গে বহুরূপী অভিনীত তিনটি ‘হায়’ যেন একটা যোগসূত্র তৈরি করে। সবটাই দৈবনির্দিষ্ট দুর্ভাগ্যের ফল। আপনি একটু বুঝিয়ে বলবেন শৈবাল, স্বরের বিজ্ঞানের দিক থেকে এই ‘হায়’গুলির বিভিন্নতা কীভাবে আসে? জানতে ইচ্ছে করছে।

আমি কী আর বলব জয়দা! আপনি তো পুরোটাই কণ্ঠে প্রকাশ করলেন! আপনি তো জানেন কোরাস-সহ পুরো নাটকটা এক ধরনের স্বরসংগতিতে বাঁধা। কণ্ঠের নানা পর্দা ছুঁয়ে বাচিক অভিনয়ের এই যে-বিন্যাস, এ-যেন অনেকটা অর্কেস্ট্রার মতো। ওই কোরাসের ‘হায়’ রাজাটা দেখুন, ‘হা’-এর স্বরটা মধ্যসপ্তকের উপরের ‘সা’ থেকে যেন গড়িয়ে আছড়ে পড়ল ‘য়’-এ পেতে রাখা নিচের ‘সা’-তে।

আর তৃপ্তি মিত্র! একেকটি ‘হায়’-তে স্বরপ্রয়োগ করছেন ‘সা’ আর পঞ্চম জুড়ে। কখনও ‘পা’ থেকে ‘সা’-তে নামছে ওঁর ‘হায়’, কখনও ‘সা’ থেকে ‘পা’! একটা মীড় আর ট্রেমেলো আছে তাতে। আর শম্ভু মিত্র! ওঁর ওই দ্রুত ‘হায়’গুলি মন্দ্র থেকে মধ্যসপ্তকে যায়, কখনও মন্দ্রের পঞ্চম হয় ওঁর ‘হায়’-এর উৎসস্বর। সেই উৎসার ‘য়’-তে গিয়ে যেন বিদ্ধ করে ‘সা’-কে, ওঁর কণ্ঠের জোয়ারি যেন তানপুরার মতো বেজে ওঠে…