


সেই প্রথম আবদুল্লার মুখের কথা থেকে পরের পরের প্রজন্ম জেনে এসেছে কোথায় ছিল তাঁর গ্রাম। ফাতিমা নিজের দেশে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত লেখিকা। নিজের সামর্থ হতেই তিনি এসেছেন সেই আবদুল্লার দেশের মাটি দেখতে। হাওড়া জেলার খুরিগ্রাম। কলকাতা থেকে দূরে নয় সে-জায়গা। দু’দিন আগে কলকাতায় পৌঁছে কাবেরীকে সঙ্গে নিয়ে খুরি গ্রাম দেখে এসেছেন তিনি।
১২.
২০১৩ সাল। ম্যাক্সমুলার ভবনে একটা অনুষ্ঠানের শেষে শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল একজন আমেরিকান লেখকের। গায়ের রং রঙিন, যাকে বলে ‘কালারড’। মাথায় এক ঝাঁকা চুল। হাসিমুখ। নাম ফাতিমা শেইখ। রাজু রমন কিছু কথা বললেন পরিচয় সূত্রে, যার প্রথমটিই ছিল যে, নাম এরকম হওয়া সত্ত্বেও ইনি ধর্মে রোমান ক্যাথলিক। তাহলে কেন এরকম ‘মুসলিম’ নাম? সেই কারণটিই এঁর পরিচয়। বহুকাল আগে এদেশ থেকেই আমেরিকা গিয়েছিলেন ফাতিমার পূর্বপুরুষ, তাই এদেশে এসেছেন ফাতিমা। এখানকার কয়েকজন কবি-লেখকের সঙ্গে কিছুটা আলাপও করতে চান।
আগে থেকে ঠিক করা প্রোগ্রাম মতো সেই শনিবার আমার বাড়িতে এলেন ওঁরা দু’জনে। ফাতিমা আর তাঁর এই যাত্রার পুরোটা ক্যামেরাবন্দি করবেন আমাদের পরিচিত ডকুমেন্টারি ছবি-করিয়ে কাবেরী ক’ল। কাবেরী তাই প্রথম থেকেই ফাতিমার সঙ্গী। বাড়িতে বসে চায়ের আড্ডায় শুনলাম এক অদ্ভুত অতীত-যাত্রার গল্প।

১০০ বছর আগে হাওড়ার এক গ্রাম থেকে বন্ধুর সঙ্গে কলকাতা ডকে আসে অতি দরিদ্র এক তরুণ– আবদুল্লা। বাড়ি পালানো বন্ধুর কাছে সে শুনেছিল তার ভাগ্যান্বেষণ করতে জাহাজে করে বিদেশে পালানোর বিবরণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগেকার সেই সময়ে, হাতে-গোনা দু’-চারজন হলেও, এরকম কাজ করেছিল এদেশের চূড়ান্ত হতাশ, অতি দরিদ্র কিছু তরুণ। আবদুল্লাও তা-ই করে। যে কোনও উপায়ে আমেরিকাগামী এক মালজাহাজে উঠে পড়ে সে। অমানুষিক কষ্টের ছিল সেই যাত্রা। ফাতিমা তাঁর পরিবারে শোনা গল্পের ভিত্তিতে সেদিন বলেছিলেন, কীভাবে সত্যি সত্যিই জীবন্মৃত অবস্থায় পূর্ব উপকূলের কোনও বন্দরে পৌঁছয় আবদুল্লা। খাটিয়ে একটি কালো মেয়ে করুণাবশত তাকে রক্ষা করে। সঙ্গে নিয়ে যায়, খাবার দেয়। আশ্রয় দেয় নিজের বাড়িতেও। শেষপর্যন্ত আবদুল্লাকে বিয়ে করে সেই ক্যাথলিক মেয়েটি। তারপর যেমন হয়, বাড়ি, দেশ, পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে আসা অসহায় একজন মানুষ, আর সেই অন্যদেশের একজন খাটিয়ে একা মানুষ মিলে গড়ে তোলে নিজেদের এক পরিবার। সেসব অন্তত পাঁচ প্রজন্ম আগেকার কথা। আবদুল্লার মায়ের নাম ছিল ফাতিমা। প্রবাসেও সেই মায়ের জন্য বুঝি বুক পোড়াত তার। সেই প্রথম দম্পতি নিজেদের প্রথম কন্যার নাম রেখেছিলেন ফাতিমা। তারপর থেকে প্রত্যেক প্রজন্মেই চলে এসেছে এই নিয়ম– একটি ছেলের নাম হবে আবদুল্লা, পরের প্রজন্মে তার মেয়ের নাম ফাতিমা। সেই হিসেবমতো আমাদের কাছে আসা এই লেখক ফাতিমা কোনও এক আবদুল্লার কন্যা। তাঁর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলের নাম ইতিমধ্যেই আবদুল্লা।
সেই প্রথম আবদুল্লার মুখের কথা থেকে পরের পরের প্রজন্ম জেনে এসেছে কোথায় ছিল তাঁর গ্রাম। ফাতিমা নিজের দেশে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত লেখিকা। নিজের সামর্থ হতেই তিনি এসেছেন সেই আবদুল্লার দেশের মাটি দেখতে। হাওড়া জেলার খুরিগ্রাম। কলকাতা থেকে দূরে নয় সে-জায়গা। দু’দিন আগে কলকাতায় পৌঁছে কাবেরীকে সঙ্গে নিয়ে খুরি গ্রাম দেখে এসেছেন তিনি। কাবেরী কিছুটা ধরিয়ে দেন যে, আজকের খুরিগ্রাম দেখে বোঝা যাবে না ১০০ বছর আগেকার গ্রামকে। বদলে গিয়েছে গ্রামের লোকজনও। এখনকার মানুষরা ১০০ বছর আগেকার নন, সেইসব পরিবার স্থানচ্যুত হয়েছে দেশভাগের সময়। কাজেই দেশ ছেড়ে যাওয়া সেই তরুণের মা-বাবার দুঃখের কোনও প্রত্নচিহ্নও নেই। হয়তো ঢাকা পড়েছে অন্য দেশ ছেড়ে আসা লোকেদের দুঃখের স্মৃতির নিচে। ফাতিমার কাছে এই অভিজ্ঞতা তাই কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক। সে খুশি, পরিতৃপ্ত, প্রথম আবদুল্লার মুখ থেকে তাঁদের পরিবারে চলে আসা সেই গল্পের খুরিগ্রামে আসতে পেরে। এখানে একবার আসা তাঁর নিজের জীবনের এক সাধ ছিল। ফিরে গিয়ে তিনি নিজের পরিবারকে সেই পুরনো স্মৃতিকে ঘিরে এই নতুন উপকথার বর্ণনা দিতে পারবেন। প্রসঙ্গত উঠে এসেছিল আমাদেরও না-দেখা, কিন্তু শুনতে শুনতে বড় হওয়া আরেক দেশ ছেড়ে আসার প্রসঙ্গ। তা ফাতিমার পরিবারের মতো অত প্রাচীন নয়। সেকথা উঠলে চোখে জল আসা মহিলা-পুরুষদের আমরা ছোটবেলায় দেখেছি।

ঠিক হল পরের দিন রবিবার, সকালবেলা কফিহাউসে যাব আমরা। বাংলা সাহিত্যের সেই নাগরিক আঁতুড় ওই মার্কিন মহিলা সাহিত্যিককে দেখানোর জন্য। কাবেরী নিজেও কফিহাউস দেখেছে মাত্র একবার। তারও উৎসাহ প্রচুর। যাওয়া হল, সকালবেলার প্রায় খালি কফিহাউসে বসেও তার আয়তন, অসংখ্য চেয়ারটেবিল দেখে সন্ধ্যাবেলার ভিড়ের কিছু আন্দাজ পেয়ে যাকে বলে ‘ইম্প্রেসড’– তা-ই হল ফাতিমা। সাতের দশকের সময়ে এই জায়গাটার ভূমিকা তাঁকে কিছুটা বোঝানোর চেষ্টা করা গেল। তিনি বললেন, ছয়ের দশকের সরবোর্ন ইউনিভার্সিটি দেখতেও গিয়েছিল পরে। যেখান থেকে জাঁ পল সার্ত্রের নেতৃত্বে ছয়ের দশকের যুবছাত্র আন্দোলন শুরু হয়।
দু’দিন পর নিজের দেশে ফিরে গেল ফাতিমা নামের সেই হঠাৎ এসে পড়া ইতিহাসের টুকরোটি। বহুজনের মতোই ফাতিমার সঙ্গেও, এক-দুটো মেইল চালাচালির পর আর যোগাযোগ থাকেনি। কেবল তাঁর দিয়ে যাওয়া নিজের লেখা উপন্যাসটি রয়ে গিয়েছে। হাওড়ার খুরি নামক গ্রামের শতবর্ষ আগে ছেড়ে যাওয়া কোনও একজন মানুষের, শিকড় ছিঁড়ে পৃথিবীর অন্য কোণে আবার শিকড় নেওয়া সংসারের এক লেখক সদস্যের চিহ্ন হিসাবে।
___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___
১১. ইনি আমার মাসি, আর আমি এনার দিদি!
৮. যুদ্ধের যে গল্পে বীরত্ব নেই, মনখারাপ আছে
৭. কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!
৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা
৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি
৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই
৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান
২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের
১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved