


খেয়াল করে দেখলে মনে হয়, অসিতকুমার বেশিদিন স্থিরভাবে কোনও কাজ করতে পারেননি, তাঁর চাকরির জায়গা বদল হয়েছে বেশ ঘন ঘন। ইতিমধ্যে নন্দলাল শান্তিনিকেতনে ছবি আঁকা শেখানোর কাজ শুরু করেছেন এবং শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলেও গিয়েছেন। নন্দলাল চলে যাওয়ার অসিতকুমার পুনরায় আর্ট কলেজের চাকরি ছেড়ে কলাভবনে যুক্ত হতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ খুশি হয়েছেন। নন্দলাল ফিরে গিয়েছিলেন নভেম্বরের শেষে। জানুয়ারির গোড়াতেই রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে অসিতকুমারের শান্তিনিকেতনে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
৪.
নন্দলালের শান্তিনিকেতন ত্যাগ রবীন্দ্রনাথের মনে দুর্মর আঘাত হেনেছিল। এর নেপথ্যে ছিল অবনীন্দ্রনাথের ভূমিকা। তিনিই প্রিয়তম শিষ্যটিকে চিঠি লিখে কলকাতায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। যদিও অবনের সেই চিঠির খোঁজ পাওয়া যায় না। নন্দলাল চলে যাওয়ার অব্যবহিত পরে রবীন্দ্রনাথের একটা চিঠি আসে অবনীন্দ্রনাথের কাছে। সে সাধারণ একখানা চিঠি নয়, দুর্জয় পত্রাঘাত!
রবীন্দ্রনাথের পাঠানো চিঠির বক্তব্য থেকে অবনের চিঠির বিষয়টি আন্দাজ করা যায়– যে-চিঠি তিনি শান্তিনিকেতনে নন্দলালকে লিখেছিলেন। এ-ও স্পষ্ট যে, অবনের সেই চিঠি ‘রবিকা’র কাছে পৌঁছেছিল। নন্দলাল নিশ্চয়ই তা আশ্রমে রবীন্দ্রনাথের জন্য রেখে এসেছিলেন। যাই হোক, অবনকে লেখা ‘রবিকা’র এ-চিঠির ভাষা যেন অন্য অক্ষরে গড়া। রবীন্দ্রনাথ জাপানযাত্রী পর্বেও অবন-গগনকে বকুনি দিয়েছেন, তবে সে বকুনিতে ছিল শিল্পের খাতিরে তাঁদের দক্ষিণের বারান্দা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য তিরস্কার। কিন্তু এখানে চিঠির ভঙ্গি একেবারে আলাদা। স্নেহের অবনকে লেখা এ-চিঠিতে আছে তীব্র অভিমান জড়ানো চাপা ক্রোধের ঝলক। যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি ছাপিয়ে অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের ক্ষতি।

আরেকটা বিষয়ও খেয়াল করতে হয়। আগের সব চিঠির শুরুতে রবীন্দ্রনাথ সম্বোধন করেছেন ‘অবন’ বা ‘কল্যাণীয়েষু অবন’। এবারের তারিখহীন সেই দীর্ঘ চিঠিতে কেবল লেখা হয়েছে ‘কল্যাণীয়েষু’, প্রাপকের নামই এখানে লেখা নেই। চিঠি শুরু হয়েছে এই ভাবে–
‘কল্যাণীয়েষু/ নন্দলালকে যে চিঠি দিয়েচ সেইটি পড়ে বড় উদ্বিগ্ন হয়েচি। তার জন্যে আমাকে অনেক ব্যবস্থা ও খরচ করতে হয়েচে এবং আশাও অনেক করেছিলুম। আমার আশা আমার নিজের জন্য নয়– দেশের জন্যে, তোমাদেরও জন্যে। এই আশাতেই আমি আর্থিক অসামর্থ্য সত্ত্বেও বিচিত্রায় অকৃপণভাবে টাকা খরচ করেছিলুম।… সাহিত্য শিল্প প্রভৃতি সমস্ত সৃষ্টির জিনিষ স্বাধীনতাপ্রসূত– তার গৌরবই তাই। এই গৌরব যদি আমরা দেশের লোক নিজের চেষ্টায় অর্জন করি তাহলেই সেটা যথার্থ national হয়। যাই হোক, এই মনে করেই আমি ক্ষতিকে ক্ষতি বলে মনে করিনি– আজও করিনে। কলকাতায় ভাল করে শিকড় লাগল না বলেই এখানে কাজ ফেঁদেচি। সফলতার সমস্ত লক্ষণই দেখা দিয়েচে। ছাত্রেরা উৎসাহিত হয়েচে, শিক্ষকেরাও– একটা atmosphere তৈরি হয়ে উঠবে। নন্দলালের নিজের রচনাও এখানে যেমন অব্যাহত অবকাশ ও আনন্দের মধ্যে অগ্রসর হচ্চে এমন কলকাতায় হওয়া সম্ভবপর নয়– সেইটিই আমার কাছে সবচেয়ে লাভ বলে মনে হয়। নন্দলাল এখানে সম্পূর্ণ স্বাধীন– বাহির থেকে তার উপরে কোনো দায়িত্ব চাপানো হয়নি– তাছাড়া এখানে তার নিজের কাজের ব্যাঘাত করবার কোনো প্রকার উপসর্গ নেই’।

এরপরে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, শান্তিনিকেতনে ইংরেজি ও সংস্কৃত সাহিত্যচর্চায় নিয়মিত যোগ দেওয়ায় নন্দলালের শিল্পীসত্তা, তার প্রতিভার যে বিকাশ ঘটছে, সেটাও খুব বড় দিক। শান্তিনিকেতনের শিল্পচর্চার সঙ্গে সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্টের চিত্রচর্চার মূল ফারাকের দিকেও অঙ্গুলিনির্দেশ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বলেছেন, “তোমাদের সোসাইটি প্রধানত চিত্র প্রদর্শনীর জন্যে – এখান থেকে তার ব্যাঘাত না হয়ে বরঞ্চ আনুকূল্যই হবে। তার পরে নন্দলালের লম্বা লম্বা ছুটি আছে। প্রয়োজনমতো কখনও কখনও সে ছুটি বাড়াতেও পারে। অর্থাৎ, আমার বক্তব্য এই যে, নন্দলাল এখানে থাকাতে তোমাদেরই কাজের সুবিধে হচ্চে– অথচ এ’তে আমার আনন্দ। যদি তোমরা এর ব্যাঘাত কর তাহলে আমার যা দুঃখ এবং ক্ষতি তাকে গণ্য না করলেও এটা নিশ্চয় জেনো নন্দলালের এতে ক্ষতি হবে এবং তোমাদেরও এতে লাভ হবে না।”
তবে সাংসারিক নন্দলালের যদি আর্থিক দিক বড় হয়ে ওঠে, সেখানে তিনি কোনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে রাজি নন। একথা স্পষ্টই অবনকে জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘যদি সাংসারিক উন্নতির টানে নন্দলালের এই সুযোগ গ্রহণ করার প্রয়োজন হয় তাহলে কোনো কথাই নেই– কিন্তু আমার একান্ত অনুরোধ এই, তুমি তার গুরু হয়ে তাকে এক্ষেত্রে ডেকো না– কেননা তোমার ইচ্ছা তাকে বিচলিত করবে– অর্থের প্রয়োজন না থাকলেও করবে।’ এর পরে লিখেছেন অভিমানসিক্ত সেই শব্দগুচ্ছ: ‘নন্দলালের পরে আমার কোনো জোর নেই– কিন্তু ওর পরে আমার অনেক আশা আছে– নিশ্চয় জেনো, সে আমার কাজের দিক থেকে নয়– দেশের দিক থেকে। গবর্নমেন্টের সঙ্গে আমি অর্থের প্রতিযোগিতা করতে পারব না– অন্য সকল বিষয়েই মঙ্গল কামনা এবং সম্মিলিত তপস্যার দ্বারা আমরা ওর যে সাহায্য করতে পারব টাকার দ্বারা তা কখনই হবে না। এখানে আমরা স্বার্থচিন্তা ত্যাগ করে ঈশ্বরের নাম করে যে সাধনায় প্রবৃত্ত হয়েচি, টাকার চেয়ে তার কি বড় inspiration নেই– আর সেই inspirationই কি সমস্ত সৃষ্টিকার্যের সবচেয়ে বড় প্রেরণা নয়?’

চিঠির শেষপ্রান্তে এসে রবীন্দ্রনাথ ছুড়েছেন তাঁর চূড়ান্ত অস্ত্র, একেবারে আজকের ক্রুজ-মিসাইলের মতো শব্দাস্ত্র– ‘আমার কথাটাকে তোমরা বড় করে এবং মনকে নিরাসক্ত করে চিন্তা কোরো– তবু যদি তোমাদের অনুরূপ ইচ্ছা হয় তবে তাই ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করব, এ পর্যন্ত যেমন একলাই আমার সব কাজ করেচি, এই চেষ্টাতেও আবার সেই রকম একলাই চলতে থাকব। ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন। ইতি শুভানুধ্যায়ী– শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’।
আর একটা বিশেষ দিক এখানে লক্ষ করার মতো। অবনীন্দ্রনাথকে লেখা এই চিঠির আগে ও পরের বাকি সমস্ত চিঠির শেষে তিনি লিখেছেন ‘রবিকাকা’। এই একটি মাত্র চিঠিতে পারিবারিক সম্পর্কের সমস্ত চিহ্ন মুছে দিয়ে শেষে তিনি লিখেছেন ‘শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। চিঠির এই টেক্সটের দিকে তাকিয়ে মনে হয়– কলাভবন তো বটেই, সমগ্র ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসে এ-এক জরুরি চালচিত্র। তবে রবীন্দ্রনাথ কখনওই থেমে যাওয়ার পাত্র নন। সাময়িকভাবে হলেও কলাভবনের দায়িত্ব সামলাবে কে, এই ভাবনা তাঁর মনে হয়তো বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
তবে এই অসময়ে হাল ধরেছিলেন ঠাকুরবাড়ির আরেক তরুণ শিল্পী অসিতকুমার হালদার। পারিবারিক সম্পর্কে তিনি মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কন্যা শরৎকুমারীর পুত্র। তাঁর ছোটবেলা কেটেছে জোড়াসাঁকোতেই। সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ হলেন অসিতের দাদা, ‘রবিদাদা’ বলেই সম্বোধন করতেন অসিতকুমার। সময়ের নিরিখে অসিতের সঙ্গে শান্তিনিকেতনের যোগ অনেকদিনের। কলাভবন শুরু হওয়ার কিছু আগেই শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন। কলকাতায় আর্ট কলেজের পাঠ সারা হলে অসিত তাঁর ‘রবিদাদা’র কাছে দরবার করেন কাজের জন্য। ১৯১১ সালের সেপ্টেম্বরে লেখা একটা চিঠিতে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছেন, ‘পূজার ছুটির আর দেরি নেই। অর্থাৎ পরে কার্তিকের মাঝামাঝি তোর সম্বন্ধে সমস্ত ঠিকঠাক করা যাবে। ইতিমধ্যে আমি কলকাতায় গেলে মোকাবিলায় সকল কথা ঠিক হয়ে যাবে’।

এখানে জানিয়ে রাখা দরকার, ছোটকাকা নির্মলচন্দ্র হালদারের পরামর্শে অসিত শান্তিনিকেতনে যোগ দিতে চেয়েছেন। কাকা অসিতকে বলেছিলেন, “রবিবাবুর সংস্রবে তোর একটা মস্ত উপকার হবে সে বিষয় সন্দেহ নেই। তাতে তোর আধ্যাত্মিক জীবনে উপকারটা বাদ দিলেও তোর art-এর বিশেষ উপকার হবেই হবে।… রবিবাবুর কাছে তুই এ-সব বিষয় যা শিখবি তা’ এ ভারতে অতুলনীয়।” বলা বাহুল্য, নির্মলচন্দ্রের পরামর্শ পরবর্তীকালে অসিতের শিল্পীজীবনের অন্যতম নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। এরপর ১৯১৪ নাগাদ অসিতকুমার পাকাপাকি ভাবে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন।
সদ্যবিবাহিত তরুণ শিল্পী তাঁর ‘রবিদাদা’র কাছে বেশি মাইনের আবদার করলে রামগড় থেকে রবীন্দ্রনাথ এই বলে তাকে সামলেছেন যে, ‘ওখানে তোর কাজ খুবই লঘু– বলতে গেলে কিছুই নেই। বোলপুরে তুই বিনা ব্যাঘাতে নিজের কাজ ও মনের উন্নতি করতে পারবি এই লক্ষ্য করেই আমি তোকে টেনেছি। বস্তুত ওখানে তুই নিজেরই কাজ করচিস। যদি তোকে মোটা মাইনে দিই তাহলে সেটা কেবল যে বিদ্যালয়ের উপর ভার চাপানো হবে তা নয় সমস্ত শিক্ষকদের কাছেই সেটা অসঙ্গত ঠেকবে। সকলেই মনে করবে আত্মীয় বলে তোকে আমি বিদ্যালয় থেকে পালন করচি। তাদেরও দাবী যখন বাড়বে আমি তার জবাব দিতে পারব না। তাই বলচি ওখানে যা পাচ্চিস সেটা ঠিক কাজের বেতন মনে করিস নে ওটা খোরাকির মত।’
সে-চিঠিতে আরও বুঝিয়ে বলেছেন, ‘তারপরে ওখানে তুই অখণ্ড অবসরে যে সব ছবি আঁকবি নিশ্চয়ই ক্রমশ তার দ্বারা তোর আর্থিক অবস্থার উন্নতি হতে পারবে।’

রবীন্দ্রনাথের এই চিঠি থেকে পরিষ্কার, বিদ্যালয়ের আর্থিক দুরবস্থা সামলাতে এই জাতীয় বিচিত্র এডমিনিস্ট্রেটিভ ঝক্কি কৌশলে তাঁকে সামাল দিতে হয়েছে! তবে কিছুকাল শিক্ষকতার পরে অসিত কলকাতায় ফিরে জোড়াসাঁকোর ‘বিচিত্রা’তে যোগ দিয়েছেন। ‘বিচিত্রা’ স্কুলে কাজের ধারায় তখন ভাটার টান। ফলে ১৯১৮ সালে ‘বিচিত্রা’ থেকে অসিত যোগ দিলেন কলকাতা আর্ট কলেজে। কলেজের নতুন অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউনের আমন্ত্রণে তিনি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ শুরু করলেন। অর্থাৎ, খেয়াল করে দেখলে মনে হয়, অসিতকুমার বেশিদিন স্থিরভাবে কোনও কাজ করতে পারেননি, তাঁর চাকরির জায়গা বদল হয়েছে বেশ ঘন ঘন। ইতিমধ্যে নন্দলাল শান্তিনিকেতনে ছবি আঁকা শেখানোর কাজ শুরু করেছেন এবং শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলেও গিয়েছেন। নন্দলাল চলে যাওয়ায় অসিতকুমার পুনরায় আর্ট কলেজের চাকরি ছেড়ে কলাভবনে যুক্ত হতে চাইলে রবীন্দ্রনাথ খুশি হয়েছেন। নন্দলাল ফিরে গিয়েছিলেন নভেম্বরের শেষে। জানুয়ারির গোড়াতেই রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে অসিতকুমারের শান্তিনিকেতনে আসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সে-চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে লিখেছেন, ‘বিশ্বভারতীতে কাজ করা স্থির করেছিস জেনে খুব খুসি হলুম। বিশ্বভারতীর জন্যে আমি মাসে পাঁচশো টাকা খরচ করচি কিন্তু এর আয় কেবলমাত্র মাসিক ৪৫ টাকা। তাই তুই যে ৮০ টাকা দাবী করেচিস তা দেবার সাধ্য আমার নেই– নন্দলালকে মাসিক যে ষাট টাকা করে দিচ্ছিলুম তোকেও তাই দিতে পারি।’
এই সময় অসিতের বাগ গুহার ছবি অনুলিখন করতে যাওয়ার কথা। সেখান থেকে ফিরে এলে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে কলাভবনে যোগ দিতে বলেছেন। অবশেষে ১৯২০-র ফেব্রুয়ারিতে অসিতকুমার শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছলেন।
………………………….. গল্পকলার অন্যান্য পর্ব …………………………….
প্রথম পর্ব। কলাভবন শুরুর নেপথ্যে এক দরদি শিক্ষক
দ্বিতীয় পর্ব। নন্দলাল বসু ও কলাভবনের শুরুর দিনগুলি
তৃতীয় পর্ব। নন্দলাল বসুর অন্তর্ধান রহস্য
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved