Robbar

লেখার বিরতিও আসলে লিখনপদ্ধতি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 4, 2026 11:31 am
  • Updated:July 4, 2026 11:31 am  

তারকোভস্কি লিখেছিলেন, শিল্পের কাজ উত্তর দেওয়া নয়; মানুষের আত্মাকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। বুদ্ধদেব গুহর চিঠিটিও আমার কাছে তেমনই একটি প্রশ্ন। এটি কোনও বিদায়পত্র নয়, কোনও ক্লান্তির বিবরণও নয়। এটি যেন এক শিল্পীর আত্মার দিকে ফিরে তাকানোর মুহূর্ত। যেন তিনি বলছেন– আমি লিখতে জানি, তাই থামতেও জানি।

রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

একটা চিঠি কখনও কখনও একটা সময়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

সেই চিঠি শুধু একজন লেখকের ব্যক্তিগত ক্লান্তির কথা বলে না; বলে একটি সময়ের, একটি সভ্যতার ক্লান্তির কথাও। বহু বছর আগে বুদ্ধদেব গুহ আমার বাবাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। দীর্ঘদিন সেটি আমার কাছে ছিল কেবল একটি ব্যক্তিগত স্মারক। আজ এত বছর পরে মনে হয়, সেটি আসলে এক নীরব ভবিষ্যদ্বাণী।

চিঠিটি পড়তে পড়তেই হঠাৎ ফিরে গেলাম নিজের যৌবনে। তখন আমি প্রেসিডেন্সি কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। বাবা ‘আনন্দমেলা’-র সম্পাদক। কলেজ ম্যাগাজিনে লিখি, নাটক করি, দু’-একটি লিটল ম্যাগাজিনেও লেখা বেরিয়েছে। অথচ কোনওদিন বাবাকে বলিনি, ‘আমাকেও আনন্দমেলায় লিখতে দাও।’ হয়তো অহংকার ছিল, হয়তো আত্মসম্মান। হয়তো বিশ্বাস করতাম, সাহিত্য যদি আসে, নিজের পথেই আসুক। তাই তখন আমার ঝুলিতে ছিল তিনটি বিশাল শূন্য– কোনও উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত লেখা নেই, কোনও বই নেই, কোনও নাট্য পুরস্কার নেই। পরিচয় ছিল, কিন্তু পরিচিতি ছিল না। আজকের ভাষায় যাকে বলে ‘লবি’, ‘যোগাযোগ’, ‘প্রচার’– তার কোনওটাই আমার ছিল না। হয়তো সেই অদক্ষতার মধ্যে এক ধরনের আত্মসম্মান লুকিয়ে ছিল।

লেখকের বাবা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা বুদ্ধদেব গুহর চিঠির লেফাফা

বাবাই একদিন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বুদ্ধদেব গুহর সঙ্গে। আমরা সবাই যাঁকে স্নেহ করে ডাকতাম– লালাজ্যেঠু। তাঁর শায়েরির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম প্রথম দেখাতেই। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ঋজুদা তখন আমাকে সেভাবে টানেনি। পরে বুঝেছি, একজন তরুণ পাঠকের অস্থিরতা অনেক সময় লেখকের সীমাবদ্ধতা নয়; পাঠকের নিজেরই যাত্রাপথ। তারও কিছুদিন পরে, এক বর্ষার দুপুরে, কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই বেরিয়ে পড়লাম। পকেটে পাঁচ-ছ’শো টাকা। কাউকে কিছু না বলে। কলকাতার কোলাহল, থিয়েটারের অন্তহীন রাজনীতি, প্রতিষ্ঠানের মেকি সংস্কৃতি, বৃত্তের ভিতরে বৃত্ত– সবকিছু যেন হঠাৎ অসহ্য হয়ে উঠেছিল।

তখনও ইন্টারনেট আমাদের জীবনে ঢোকেনি। শিল্প করে জীবিকা নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব। আর যাঁরা পারতেন, তাঁদের অনেককেই দেখতাম ক্ষমতার করিডরে ঘুরে বেড়াতে। অলিপাবে গা ঘেঁষে বসে থাকা, প্রভাবশালীদের তেল মাখানো, নাট্যকার কিংবা সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষ হয়ে ওঠার শর্টকাট শেখা– সে-শিক্ষা আমার বাবা-মা আমাকে দেননি। হয়তো সে কারণেই বোকা ছিলাম। সেই বোকামির মধ্যেই ছিল একরাশ অহংকার। আজও আছে।

বুদ্ধদেব গুহর লেখা চিঠি

ট্রেনে চেপে পৌঁছে গেলাম শান্তিনিকেতন। তারপর মাসানজোর। পালামৌ। গালুডি। চাইবাসা। হলুদপুকুর। একা। কোনও সঙ্গী ছিল না। অথচ সেই একাকিত্বের মধ্যেই প্রকৃতি যেন আমাকে আশ্রয় দিতে প্রস্তুত হয়ে বসেছিল। মনে হচ্ছিল, বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’, সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ আর জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ এক অদ্ভুত বাস্তবতায় এসে মিশে গিয়েছে! প্রকৃতি যেন পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে জিজ্ঞেস করছিল– ‘এতদিন কোথায় ছিলি? নাগরিক জীবন ছাড়বি কবে?’

ঠিক এই সময়েই আবার ফিরে আসে বুদ্ধদেব গুহর সেই চিঠি। চিঠিটা পড়ে আমার হঠাৎ মনে পড়ে গেল আর এক মানুষের কথা– গুন্টার গ্রাস। আমি তখন কিশোর। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেব। নোবেলজয়ী লেখক কলকাতায় এসেছেন। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। লোকাল ট্রেনে আমরা শিয়ালদহের দিকে ফিরছি। তিনি জানলার বাইরে তাকিয়ে আছেন। কখনও খাতায় লিখছেন, কখনও ছবি আঁকছেন। খুব কম কথা বলছিলেন।

কথায় কথায় কেউ তাঁকে বলেছিল, বাংলায় বহু লেখক বছরের পর বছর লিখে চলেন, বই প্রকাশ করেন। গ্রাস বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তাঁরা কি নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় পান?’ তারপর একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন– ‘আবর্জনা!’ আমরা কেউ কোনও উত্তর দিতে পারিনি। পরে সেই নীরবতা থেকেই জন্ম নেয়– ‘শো ইয়োর টাং’।

গুন্টার গ্রাস

আজ এত বছর পরে মনে হয়, গ্রাসের সেই মন্তব্য আর বুদ্ধদেব গুহর সেই চিঠি– দু’টি আলাদা ঘটনার মধ্যে অদ্ভুত এক সেতুবন্ধন রয়েছে। দু’জনেই যেন একই কথা বলছিলেন– সৃষ্টির জন্য কখনও কখনও থামতে হয়। নীরব হতে হয়। নিজের ভিতরের শব্দ আবার শুনতে হয়। হয়তো সেই কারণেই বুদ্ধদেব গুহ বিরতি চেয়েছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, কলমেরও বিশ্রাম দরকার। শিল্পীরও একান্ত নির্জনতা দরকার। মহৎ শিল্পীরা জানেন, কখন থামতে হয়।

উইলিয়াম ফকনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে দীর্ঘ সময় প্রায় নীরব ছিলেন। প্রচলিত একটি কাহিনি আছে– কেউ তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘নতুন কী লিখছেন?’ তিনি না কি মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘ভাবছি।’ হয়তো ভাবা– এই সহজ কাজটাই আজ সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।

সাহিত্যের ইতিহাস খুলে বসলে একটি আশ্চর্য বিষয় চোখে পড়ে। আমরা প্রায়ই সেইসব লেখকদের নিয়ে আলোচনা করি, যাঁরা অসংখ্য বই লিখেছেন; অথচ অনেক সময় ভুলে যাই সেই বিরল মানুষদের, যাঁরা না-লেখাকেও তাঁদের সৃষ্টির অংশ করে তুলেছিলেন। তাঁরা জানতেন, নীরবতা কোনও শূন্যতা নয়; নীরবতাও এক ধরনের ভাষা। যেমন, একটি চলচ্চিত্রে আলো যতটা জরুরি, ততটাই জরুরি ছায়া; তেমনই একজন লেখকের জীবনে প্রকাশিত বইয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ সেই অপ্রকাশিত দিনগুলি, যখন তিনি কেবল দেখছেন, শুনছেন, ভাবছেন, নিজের ভিতরের ভাঙাগড়া অনুভব করছেন।

উইলিয়াম ফকনার

সময়কে ধীর করে দেওয়ার এই ক্ষমতাই বড় শিল্পীদের আলাদা করে। আজকের পৃথিবী যেখানে প্রতিদিন নতুন বিষয়বস্তুর দাবি উঠছে, সেখানে তাঁরা যেন ইচ্ছে করেই ঘড়ির কাঁটা খুলে টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলেন। যেন বলছিলেন– সৃষ্টি কোনও কারখানা নয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময় অন্তর নতুন পণ্য বেরবে। সাহিত্য কোনও মাসিক উৎপাদনের তালিকাও নয়। সে অনেক বেশি ঋতুর মতো; কখনও বর্ষা, কখনও দীর্ঘ খরা, কখনও কুয়াশায় ঢাকা ভোর।

দিল্লি বিমানবন্দরে একবার অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গে উড়ান ধরার আগে কিছুক্ষণ কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। অত্যন্ত শান্ত গলায় তিনি বোঝাচ্ছিলেন, কীভাবে বিশ্বায়ন ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করছে। বিস্মিত হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, যে বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, সেই বিষয়টিরই যেন জীবন্ত প্রতীক তিনি। ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ প্রকাশিত হওয়ার পর বইটি বুকার পুরস্কার পেল, পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হল, তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিল। আজকের সময় হলে হয়তো প্রকাশক, বাজার, সামাজিক মাধ্যম– সবাই তাঁকে প্রতি বছর একটি করে নতুন উপন্যাস লিখতে বাধ্য করত। হয়তো কয়েক মিলিয়ন ডলারের অগ্রিমও তাঁর সামনে এসে হাজির হত। কিন্তু তিনি সেই সহজ পথ বেছে নেননি। উপন্যাস থেকে তিনি প্রায় দুই দশক দূরে সরে গেলেন। রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখলেন, আন্দোলনের পাশে দাঁড়ালেন, রাষ্ট্র, যুদ্ধ, পরিবেশ, গণতন্ত্র নিয়ে কথা বললেন। তারপর প্রায় ২০ বছর পরে ফিরে এলেন ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ নিয়ে। এই বিরতি কোনও অনুপস্থিতি ছিল না; এটি ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল বিবর্তনের সময়। তিনি যেন নিজের ভাষাকে নতুন করে জন্ম দিতে চেয়েছিলেন।

একটা প্রশ্ন না করে পারি না– আমরা কী শিখলাম? আদৌ কি কিছু শিখলাম? কিছু না বলেও অরুন্ধতী রায় আমাদের কী বার্তা দিয়ে গেলেন? সেই বার্তা কি আজকের সাহিত্যিকদের কাছে পৌঁছেছে?

বাংলা সংস্কৃতির বৃহৎ উৎসব এন.এ.বি.সি.-র আমন্ত্রণে একবার গিয়েছিলাম টেক্সাসের হিউস্টনে। ইস্তানবুল থেকে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের TK-33 বিমানে টানা ১৬ ঘণ্টার দীর্ঘ উড়ান। সেই যাত্রাপথেই পড়ছিলাম হার্পার লি-র ‘টু কিল আ মকিংবার্ড’। একটি উপন্যাসই তাঁকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল, যেখানে অধিকাংশ লেখক সারা জীবনেও পৌঁছতে পারেন না। অথচ সেই অভূতপূর্ব সাফল্যের পর তিনি প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন। দশকের পর দশক কোনও নতুন উপন্যাস প্রকাশ করলেন না। পৃথিবী অপেক্ষা করল। সেই অপেক্ষার মধ্যেই তাঁর কিংবদন্তি আরও ঘনীভূত হল। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, প্রত্যেক নীরবতাকে শব্দে ভরাট করা জরুরি নয়।

প্রেসিডেন্সি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংবিধান– এসব পড়তাম। অনেকের কাছেই বিষয়গুলো ছিল ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার মতো। তবু আমার মন পড়ে থাকত গল্পের বইয়ের পাতায়। কত নাম, কত লেখক! তাঁদের মধ্যেই একজন রালফ এলিসন। ‘ইনভিজিবল ম্যান’ পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই সময় এই পৃথিবীতে বাস করতেও যেন লজ্জা হচ্ছিল। একজন কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের আত্মপরিচয়ের সন্ধান এবং ধীরে ধীরে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার বেদনা আমার নিজের যন্ত্রণারও অংশ হয়ে উঠেছিল। সেই উপন্যাসের পরে রালফ এলিসন আর কোনও পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস প্রকাশ করেননি। অথচ একটি বই দিয়েই তিনি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ী করে গিয়েছেন।

আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক ফ্রানৎস কাফকার জীবদ্দশায় প্রকাশিত রচনার পরিমাণও বিস্ময়করভাবে অল্প। এমিলি ব্রন্টি লিখেছেন মাত্র একটি উপন্যাস– ‘উদারিং হাইটস’। জে. ডি. স্যালিঞ্জার ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’-এর সাফল্যের পরে ক্রমশ নিজেকে জনজীবন থেকে সরিয়ে নিলেন। তিনি লিখতেন, কিন্তু প্রকাশ করতেন না। যেন সাহিত্যকে বাজারের নয়, আত্মার সঙ্গে কথোপকথন হিসেবেই দেখতে চেয়েছিলেন।

মিলান কুন্দেরাও উপন্যাসের মধ্যে দীর্ঘ বিরতি নিয়েছেন। তাঁর কাছে লেখা মানে ছিল না পাঠকের ক্ষুধা মেটানো; লেখা মানে ছিল নিজের প্রশ্নের কাছে ফিরে যাওয়া। কারণ মহৎ সাহিত্য কখনও পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে জন্মায় না; জন্মায় লেখকের অস্তিত্বগত অস্বস্তি থেকে।

এইসব লেখকদের পাশে দাঁড়িয়ে বুদ্ধদেব গুহর সেই চিঠিটি যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হঠাৎ মনে হয়, তিনি আসলে লেখালিখি থেকে বিরতি নিতে চাননি; তিনি হয়তো শব্দের দূষণ থেকে দূরে সরে যেতে চেয়েছিলেন। নিজের ভাষার শ্বাসপ্রশ্বাস আবার শুনতে চেয়েছিলেন। যে মানুষ সারা জীবন বন, নদী, পাখি, বৃষ্টি, নিঃসঙ্গতা নিয়ে লিখেছেন, তিনি হয়তো বুঝেছিলেন– বনেরও তো নির্জনতা দরকার। প্রতিটি গাছ যদি একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করে, তবে জঙ্গল আর জঙ্গল থাকে না; মেলায় পরিণত হয়।

আজকের কলকাতার সাহিত্য জগতের দিকে তাকালে কখনও কখনও মনে হয়, আমরা যেন মেধাহীনতার শুকনো মালা গলায় পরে আয়নায় তাকাতে ভুলে গিয়েছি! ছোট ছোট গোষ্ঠী, ক্ষণস্থায়ী প্রচার, ১৫ মিনিটের খ্যাতির দৌড়– সবকিছু মিলিয়ে সাহিত্য যেন ক্রমশ বাজারের পণ্যে পরিণত হচ্ছে। কিংবদন্তিদের নামকে ঢাল করে নিজেদের দৃশ্যমান করার প্রবণতা বাড়ছে; অথচ প্রকৃত প্রচারবিমুখ কবি-লেখকেরা ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছেন। যারা কলমকে আগলে রাখেন মেধা দিয়ে, মনন দিয়ে, নীরবে, তাঁদের কণ্ঠস্বর যেন ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

বুদ্ধদেব গুহ

১৯৯২ সালের কথা ভাবুন। কোথায় ইন্টারনেট? কোথায় সামাজিক মাধ্যম? কোথায় ওয়েব পত্রিকা? কোথায় প্রতিদিনের প্রচারের উন্মাদনা? ‘হাইপ’ শব্দটি যেন তখনও অভিধানের অন্ধকারে ঘুমিয়ে ছিল। লেখক কম ছিলেন, পাঠক বেশি। আজ যেন গল্পটা সম্পূর্ণ উল্টো। লেখকের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ, অথচ পাঠক খুঁজে পাওয়াই যেন লটারির পুরস্কার জেতার মতো দুর্লভ। প্রায় সকলেই লেখক, কবি, চলচ্চিত্রকার, সমালোচক, প্রভাব সৃষ্টিকারী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক। কিন্তু পাঠক কোথায়?

অনেক বছর আগে লালাজ্যেঠুকে একদিন বলেছিলাম, ‘ঋজুদা একটু পুনরাবৃত্তিময় হয়ে যাচ্ছে।’ আজ ভাবলে শরীর কেঁপে ওঠে। কী ভয়ংকর দুঃসাহস ছিল! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তিনি একটুও বিরক্ত হননি। মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘চেষ্টা করব, তোর মনমতো লিখতে।’ এখন ভাবি, কী অসাধারণ উদারতা! মহৎ মানুষেরা সম্ভবত এ-কারণেই মহৎ– তাঁরা সমালোচনাকে অপমান বলে মনে করেন না; বরং তাকে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন।

সাহিত্য কি শেষ পর্যন্ত খ্যাতির আর এক নাম? যদি তাই হত, তবে এত প্রচারবিমুখ লেখক বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে থাকতেন না। তাঁরা জানতেন, কোলাহল নয়, সময়ই একজন লেখকের প্রকৃত বিচারক। সেই কারণেই বুদ্ধদেব গুহদের মতো মানুষ আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁরা জানতেন, পরবর্তী বইয়ের চেয়ে পরবর্তী চিন্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর এই সময়েই এসে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

কয়েকজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক আমাকে বলেছেন, তাঁদের কাছে আসা লেখার ৯০-৯৫ শতাংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লেখা। যদি সত্যিই তা-ই হয়, তবে আমরা এক ভয়ংকর সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মৌলিক লেখালেখি কি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে? সহায়িকা একসময় যেমন চিন্তার পরিবর্তে মুখস্থ বিদ্যাকে উৎসাহিত করেছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি তেমনই কল্পনাশক্তির জায়গা দখল করে নেবে? এই কারণেই আজ ঋত্বিক ঘটকের সেই কথাটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়– ‘ভাবো, ভাবো, ভাবা অভ্যাস করুন।’ এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন শিল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে।

সাহিত্য কেবল ভাষা নয়; সাহিত্য হল মননের দীর্ঘ একাকিত্ব। একটি বাক্য লেখার আগে একজন লেখক যে নীরবতার ভিতর দিয়ে হেঁটে যান, সেই পথ কোনও যন্ত্র চেনে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাক্য লিখতে পারে, তথ্য সাজাতে পারে, অনুকরণ করতে পারে। কিন্তু কোনও যন্ত্র কি কখনও সেই নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে পারবে, যেখান থেকে জন্ম নেয় বনলতা সেন? অথবা কাফকার দুঃস্বপ্ন? অথবা জীবনানন্দের ঘাসের ভিতরে লুকিয়ে থাকা বিষণ্ণতা?

কখনও কখনও আমার মনে হয়, একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর লেখা নয়; তাঁর নীরবতা। আমরা লেখার ইতিহাস লিখে রাখি, কিন্তু না-লেখার ইতিহাস কেউ লেখে না। অথচ যে মানুষটি জানেন কখন কলম নামিয়ে রাখতে হয়, তিনিই হয়তো সবচেয়ে গভীরভাবে কলমকে শ্রদ্ধা করেন। নদী যেমন সারাবছর প্লাবন আনে না, তেমনি মহৎ সাহিত্যও প্রতিদিন জন্মায় না। তারও ঋতু আছে, জোয়ার আছে, দীর্ঘ অনাবৃষ্টিও আছে। আজকের সময় সেই অপেক্ষাকে ভুলে গিয়েছে! আমরা ফল চাই, কিন্তু বীজের অন্ধকারে শুয়ে থাকার ধৈর্য চাই না।

আমার বারবার মনে পড়ে আন্দ্রেই তারকোভস্কির চলচ্চিত্রের কথা। সেখানে দৃশ্যের চেয়ে সময় বড়। ঘটনাহীনতার মধ্যেই ঘটনা ঘটে। একটি শুকনো গাছ, জানলার কাচ বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটা, পরিত্যক্ত একটি বাড়ি, বাতাসে দুলতে থাকা ঘাস– এইসব আপাত-নিরর্থক মুহূর্তই শেষ পর্যন্ত মানুষের ভেতরটাকে বদলে দেয়। সাহিত্যও কি ঠিক তেমন নয়? ভালো লেখা শেষ পর্যন্ত তথ্য নয়, অভিজ্ঞতা। কাহিনি নয়, প্রতিধ্বনি। শব্দ নয়, শব্দের পরে যে নীরবতা থেকে যায়, তারই নাম সাহিত্য।

সম্ভবত সেই কারণেই বুদ্ধদেব গুহর চিঠিটি আমাকে এত তাড়া করে। সেটি যেন কাগজে লেখা নয়, সময়ের গায়ে লেখা। আজ যখন চারদিকে প্রতিদিন নতুন বই, নতুন কবিতা, নতুন ঘোষণা, নতুন আত্মপ্রকাশ, তখন সেই পুরনো চিঠিটি যেন ধীরে ধীরে এসে কানে ফিসফিস করে বলে– সব লেখা জরুরি নয়। সব প্রকাশও নয়। আমরা কি সত্যিই সৃষ্টি করছি, না কি কেবল উৎপাদন করছি? এই প্রশ্নটাই আজ সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিকর।

খ্যাতি বড় আশ্চর্য জিনিস। সে প্রথমে হাত ধরে, পরে গলা চেপে ধরে। সে শিল্পীকে শিল্প থেকে সরিয়ে শিল্পীর ছবির দিকে নিয়ে যায়। ধীরে ধীরে লেখকের চেয়ে লেখকের উপস্থিতি বড় হয়ে ওঠে। সাহিত্য তখন আর পাঠকের অন্তর্জগতে ঘটে না; ঘটে প্রচারের মঞ্চে। হয়তো তাই পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক শব্দ এখন ‘সম্পৃক্ততা’। কত মানুষ পড়ল, কত প্রশংসা এল, কত ভাগ করে নিল– এই সংখ্যার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সেই একমাত্র পাঠক, যিনি গভীর রাতে একটি বাক্য পড়ে নিঃশব্দে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকেন। একজন সত্যিকারের পাঠক কখনও ভিড় নন। তিনি একা। লেখকও একা। সাহিত্যের সবচেয়ে গভীর সংলাপও ঘটে এই দুই নিঃসঙ্গ মানুষের মধ্যে।

তারকোভস্কি লিখেছিলেন, শিল্পের কাজ উত্তর দেওয়া নয়; মানুষের আত্মাকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। বুদ্ধদেব গুহর সেই চিঠিটিও আমার কাছে তেমনই একটি প্রশ্ন। এটি কোনও বিদায়পত্র নয়, কোনও ক্লান্তির বিবরণও নয়। এটি যেন এক শিল্পীর আত্মার দিকে ফিরে তাকানোর মুহূর্ত। যেন তিনি বলছেন– আমি লিখতে জানি, তাই থামতেও জানি। আজ এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দাঁড়িয়ে সেই বাক্যটির ওজন আরও বেড়ে যায়। কারণ যন্ত্রের কোনও নীরবতা নেই। সে ক্লান্ত হয় না, অপেক্ষা করে না, বর্ষার গন্ধ শুঁকে হঠাৎ শৈশবে ফিরে যায় না। সে উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রশ্নের ভিতরে বাস করতে পারে না। হয়তো ভবিষ্যতের বাংলা সাহিত্যকে বাঁচাবে নতুন প্রযুক্তি নয়, নতুন প্রকাশনাও নয়, বাঁচাবেন সেই বিরল মানুষগুলো, যারা এখনও কোনও তাড়াহুড়ো ছাড়াই একটি বাক্য লিখতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে পারেন। কারণ তাঁরা জানেন, ভাষারও একটি ঋতুচক্র আছে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়– সহায়িকার যুগে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে, ক্ষণস্থায়ী খ্যাতির যুগে, মেধা ও মনন কি সত্যিই বিলুপ্তির পথে?

তারকোভস্কি লিখেছিলেন, মানুষ শিল্পের কাছে যায় নিজের হারিয়ে যাওয়া সময়টুকু ফিরে পেতে। আমার মনে হয়, সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের নামই বিরতি। সেই বিরতির মধ্যেই লেখক ধীরে ধীরে নিজের ভিতরের বনভূমিতে ফিরে যান– যেখানে কোনও ওয়াই-ফাই পৌঁছয় না, কোনও নোটিফিকেশন বাজে না, কোনও ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ নেই। আছে কেবল বাতাসে দুলতে থাকা শালপাতা, দূরে এক অচেনা পাখির ডাক, আর একটি সাদা কাগজ– যার ওপর এখনও একটি শব্দও লেখা হয়নি। হয়তো সেখান থেকেই আবার শুরু হয় প্রকৃত সাহিত্য।

এখনও কি কোথাও, কোনও মানুষ আছেন, যিনি  সমস্ত কোলাহল থেকে বহু দূরে, একটি সাদা কাগজের সামনে বসে নিঃশব্দে ভাবছেন? আমার বিশ্বাস, বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ এখনও সেই মানুষটির হাতেই।

…………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

…………………………