


কিন্তু বুদ্ধ-জীবনের ছবিগুলি ছাড়াও তাঁর অত্যন্ত পছন্দের কাজ ছিল পেনসিল বা কালিতে দ্রুত হাতে করা স্কেচ। এগুলি সবই মুখচিত্র। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতোই অতসী বড়ুয়ার চিত্রভাণ্ডারেও কত যে মুখের ছবি! তার কোনও তালিকা অবশ্য নেই। তার মধ্যে রয়েছেন শ্রীলঙ্কার ডাক্তার মালালাশেখর, ব্যারন জয়তিলক, জাপানি বিদ্বজন ডাক্তার ইচিমুরা, কম্বোডিয়ার পিট চিন হুস, তাইল্যান্ডের রাজকুমারী পুন দিসকুলকে, ফরাসি সুজ়ান কার্পেলে। তাঁর আঁকা বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতির তালিকা শুনলে অবাক হতে হয়।
কী অদ্ভুত সমাপতন! ১৯২১ সালে প্রকৃতার্থে কলাভবনের যাত্রা শুরু। আর সেই বছরেই ৪ সেপ্টেম্বর কলাভবনের তৎকালীন অধ্যক্ষ অসিত হালদার ও তাঁর স্ত্রী সরোজবাসিনীর ঘর আলো করে জন্ম নিলেন ফুটফুটে ফুলের মতো মেয়ে– ‘অতসীলতা’ নামটি আবার বড়দাদু রবীন্দ্রনাথের দেওয়া।

অসিত হালদার ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সেজদিদি শরৎকুমারীর দৌহিত্র। শান্তিনিকেতনে জন্ম। শিল্পী অসিতকুমারের কন্যা। ঠাকুর পরিবারের সাংস্কৃতিক ভাবনার পরোক্ষ প্রভাব তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ছোটবেলা থেকেই তাই রংতুলির মায়াজালে ধরা দিয়েছিলেন। অসিতকুমারের দ্বিতীয় সন্তান হলেও তিনি ছিলেন তাঁর প্রথম কন্যা। শান্তিনিকেতনে মীরা দেবী, প্রতিমা দেবী আদরে আদরে ভরিয়ে রাখতেন তাঁকে। আশ্রমের অন্য বাসিন্দারাও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি ছিলেন পিয়ারসন সাহেবের ‘প্রিয় বান্ধবী’। ছোট্ট অতসীকে ওই নামেই ডাকতেন সাহেব।

১৯২৩ সালে অসিতকুমার পাড়ি দিলেন বিলেতে। শান্তিনিকেতনের পাটও চুকল অচিরে। বিদেশ থেকে ফিরে অসিত হালদার যোগ দিলেন জয়পুররাজের আর্ট স্কুলে। এখানেই তাঁর স্ত্রী তিনটি শিশু সন্তান রেখে প্রয়াত হন। মাতৃহারা অতসীর সঙ্গী হল ছবি আঁকা। বাবার কাছে এ ব্যাপারে অসীম প্রশ্রয় পেতেন। আজীবন মেয়েকে ছবি আঁকায় প্রাণিত করেছেন অসিতকুমার। কিন্তু হাতে ধরে কোনওদিন আঁকা শেখাননি। আশৈশব ছবির সঙ্গে ঘরবসত যার, ছবির প্রতি যার নাড়ির টান– ভারতশিল্পের নতুন ধারাটিকে আদ্যন্ত আত্মস্থ করার এতখানি সুযোগের তিনি যে সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করবেন, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
……………………………………………………………………………………….

জয়পুরের অধ্যায়ও শেষ হল। লখনউতে প্রতিষ্ঠা হল নতুন একটি আর্ট স্কুলের। আর সেখানকার প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে লখনউ পৌঁছলেন অসিতকুমার। ১৯২৫ সাল। সেই বছরই তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। পাত্রী তাঁর বিধবা ছোট শ্যালিকা সরসীবালা। মাতৃহারা শিশুরা অবশ্য স্নেহের স্বাদ পেলেন না। অতসী মন দিলেন পড়াশুনায়। ওখানকার লা’ মার্টিনিয়ার স্কুলে বাবা ভর্তি করে দিলেন তাঁর আদরের অতুকে। সাগ্রহে সানন্দে লক্ষ করতে লাগলেন পড়াশুনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শিল্পচেতনার বিকাশ।
কিন্তু আবার পালাবদলের পালা শুরু হল অতসীর জীবনে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে, ১৯৩৭ সালে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হলেন– চট্টগ্রামের এক বৌদ্ধ পরিবারের ছেলে ব্যারিস্টার ড. অরবিন্দ বড়ুয়ার সঙ্গে।
বৌদ্ধশাস্ত্রে অগাধ জ্ঞান অরবিন্দ-র। সেই বিয়ে উপলক্ষে নন্দলাল বসু, অবন ঠাকুর ছাড়াও এসেছিলেন দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরী, কালিদাস নাগ, নরেন্দ্রদেব, রাধারাণী দেবী, কালিদাস নাগ প্রমুখ। শরীরী অসুস্থতার জন্য আসতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু দু’কলি আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন। এবার কলকাতার ভাড়াবাড়িতে শুরু হল অতসীর জীবনের নতুন অধ্যায়।
রবীন্দ্রনাথের সেই আশীর্বাণী– ‘পূর্ণতা আসুক আজি তোমাদের তরুণ জীবনে আনন্দে কল্যাণে প্রেমে শুভ লগ্নে শুভ সম্মিলনে’ ধীরে ধীরে সত্য হয়ে উঠল তরুণী অতসীর জীবনে। স্বামীর সাহচর্যে ধীরে ধীরে বুদ্ধজীবনী তথা বৌদ্ধধর্মের সম্বন্ধে গভীরভাবে আগ্রহী হয়ে উঠলেন তিনি। বুদ্ধজীবন বা তার চিত্র-প্রতিরূপের সঙ্গে আবাল্য পরিচিতি অবশ্যই ছিল অতসীর; কারণ অজন্তা এবং বাগ গুহায় গিয়ে সেগুলির প্রতিলিপি প্রস্তুত করেছিলেন অসিতকুমার হালদার। কিন্তু সে দেখা যতটা দর্শনের আনন্দে, ততটা হয়তো মননের গভীরতায় নয়।
এখন যেন গভীরভাবে বুদ্ধদেবকে জানলেন, উপলব্ধি করলেন তাঁর বাণী। তাই কি তিনি বেছে নিলেন মধ্যমপন্থা– সংসারের, সন্তানের, সামাজিক ক্রিয়াকর্মের দায়িত্ব সামলে, মধ্যাহ্নের অলস বিস্তারে তুলে নিলেন প্রিয় রঙের বাক্সটি। অলস দুপুরে হয়ে উঠল রঙিন, আনন্দময়। সেই থেকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত এই আনন্দলোকের দ্বার ছিল অবারিত। অবিশ্বাস্য শোনালেও জীবনব্যাপী চর্চায় এঁকেছেন প্রায় তিন হাজার ছবি। অধুনা প্রচলিত অ্যাক্রলিক ছাড়া, সমস্ত মাধ্যমে এঁকেছেন– কখনও তুলি-কালিতে, কাগজে, কখনও-বা তেলরঙে ক্যানভাসে, কখনও-বা টেম্পারা পদ্ধতিতে, গুয়াশ এবং জলরঙে এঁকেছেন কাগজে। এছাড়া ক্রেয়ন পেনসিলেও করেছেন বেশ কিছু ড্রয়িং ও স্কেচ। আবার ‘কৃষ্ণ অ্যান্ড দ্য ডিভোটি’ অথবা ‘ডিভোটি উইথ দ্য ল্যাম্প’-এর মতো কিছু ছবি আঁকা চাইনিজ ইংকে।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সততই দু’টি স্তরে প্রবহমান। প্রায় একযুগ লোকচক্ষুর অন্তরালে শিল্পসাধনা করার পরে গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে সহসা এক সুপরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন অতসী বড়ুয়া। এর আগে চিত্রশিল্পী অতুল বসু ও রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর প্রেরণায় চারের দশকের গোড়ায় কলকাতার কমলালয় ভবনে অনুষ্ঠিত এক সর্বভারতীয় চিত্র-প্রদর্শনীতে অতসীদেবীর তিনটি ছবি স্থান পায়। এবং তাঁর ‘ভগবান বুদ্ধের জন্ম’ শিরোনামের চিত্রকর্মটি অসাধারণ প্রশংসা লাভ করে।

এই ছবিটি দেখলে বোঝা যায় একান্ত চর্চায় কীভাবে এক নিজস্ব শৈলী তৈরি করেছিলেন অতসী। কম্পোজিশনের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যণীয়। গাছের ডাল ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন মায়াদেবী, ছোট্ট শিশুটি সাখীদের হাতে ধরা। জন্ম-মুহূর্তকে আড়াল করার জন্য কানাতটির কোমলরং যেন সূর্যোদয়ের অভয় উজ্জ্বল। তার বাইরে আবছা মানুষ্যমূর্তি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু এই অংশটি রানি ও তাঁর সখীদের নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ। উদিত সূর্যের স্ফুরিত রশ্মি ছাড়া বুধের জন্মের সঙ্গে জড়িত অলৌকিক ঘটনাগুলির কোনও ব্যবহার করেননি তিনি। অথচ সখীদের অভিব্যক্তি ও করজোড়ে নমস্কারের ভঙ্গিতে বোঝা যায়, এ কোনও সাধারণ শিশু নয়। রানির অভিব্যক্তি ও স্নেহক্ষরিত দৃষ্টি বড় মায়াময়। কম্পোজিশনের ধরনে নব্যবঙ্গীয় শিল্পশৈলীর ছাপ থাকলেও পোশাক (বিশেষত সখীদের), মুখভাব ও গড়ন বাগ গুহার শৈলী মনে পড়ায়। অজন্তার তুলনায় বাগ গুহার শৈলী কম আলংকারিক, বরং কিঞ্চিৎ বাস্তবধর্মী।

তবে অতসীর ছবির আবেগময়তা ও গীতিকাব্যিক ব্যঞ্জনা একান্তই তাঁর নিজস্ব অনুভূতির ফসল। এই নিজস্ব বয়ানের গুণেই প্রশিক্ষিত শিল্পীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার আসরে বাজিমাত করে একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের একাদশ বার্ষিক প্রদর্শনীতে তাঁর বুদ্ধের জন্মের ছবিটি ‘বিশেষ পুরস্কার’ পায়। ১৫০০ টাকার আর্থিক পুরস্কারও লাভ করেন। এভাবেই শুরু।
১৯৪৯-এ মহবোধি সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া, কলকাতা, ‘Atasi Barua, Life of the Buddha In Twelve Illustrations’ নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। পরেই বেলগাছিয়া দিগম্বর জৈন মন্দিরের জন্য তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের জীবন-কাহিনি আঁকতে অনুরোধ আসে। সেই অনুরোধ রক্ষার্থে যত্ন নিয়ে পার্শ্বনাথের বেশ কয়েকটি ছবি আঁকেন তিনি। সোসাইটির তরফে বুদ্ধবিষয়ক ১২টি ছবির একটি অ্যালবাম প্রকাশ করা হয়। এই ছবিগুলি মহাবোধি সোসাইটিতে প্রদর্শিত হলে তা উচ্চ প্রশংসা লাভ করে।

যেমন উপরের ছবিটিতে বিভিন্ন শিষ্যকে উপদেশ দিচ্ছেন বুদ্ধদেব। তাদের পোশাক, অলংকার ভিন্ন; বিচিত্র তাদের অভিব্যক্তি। কারওর মুখে নিবেদন, শ্রদ্ধাভক্তি ফুটে উঠেছে; কেউ ঈষৎ অন্যমনস্ক। সূক্ষ্ম রেখা ও কোমল রঙের ব্যবহারে ব্যক্তির নম্রভাবটি ফুটিয়ে তুলেছেন। মাঝখানের মূর্তিটি কম্পোজিশনটিকে যেন মাঝখান থেকে ভাগ করে দিয়েছে এবং ছবির মূল ভাবটি অর্থাৎ বুদ্ধ ও ভক্তের মেলবন্ধনের ভাবটি প্রস্ফুট করে তুলেছে। আগের ছবির মতোই এক উজ্জ্বল হলুদের ব্যবহার আলোকিত করে রেখেছে চিত্রপট। এই পর্যায়ের একেবারেই অন্য ধরনের একটি ছবি, বুদ্ধের নয় সিদ্ধার্থের, উল্লেখযোগ্য।
গোপা যশোধরার সঙ্গে আংটি বিনিময় করছেন সিদ্ধার্থ। এই ছবিটি বিষয়ভাবনার দিক দিয়ে একেবারেই ব্যতিক্রমী। অজন্তার শৈলীতে এখানে থামের ব্যবহার করে ছবিতে গভীরতা সৃষ্টি করা হয়েছে। ছবিটিতে আলোছায়ার ব্যবহার অনবদ্য। সিদ্ধার্থের হাতের পাতা এবং যশোধরার মুখের একাংশে আলোর উচ্ছ্বাস এই আনন্দ মুহূর্তের গুরুত্বের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যশোধরার অভিব্যক্তি আরও সুন্দর আভিজাত্যময়, সিদ্ধার্থের শরীরী ভাষা রাজোচিত। দাসীর মুখ প্রত্যাশিতভাবে ভাবলেশহীন। প্রতিটি রেখার ব্যবহার অনবদ্য, সূক্ষ্ম তুলির টানে ফুটিয়ে তুলেছেন পোশাক এবং প্রতিটি অলংকরণের নকশা এমনকী যশোধরার মসলিন ওড়নাটির আভাসও দিয়েছেন বড় সুন্দর করে। ছবিটি দেখতে দেখতে মনে হয় শিল্পী যেন বড় যত্নে সাজিয়েছেন তাঁর নায়ক-নায়িকাকে।

এই পর্যায়ের আর একটি ছবি– বুদ্ধদেবের মহাপরিনির্বাণের দৃশ্য। শান্ত, স্নিগ্ধ এক জ্যোতি যেন ঘিরে রেখেছে ছবিটিকে। সব ক’টি ছবিতেই প্রকৃতির আভাস আনা হয়েছে, কিন্তু সেগুলি সবই সবুজ পাতা। এখানে সারিবদ্ধ গাছের কাণ্ডগুলিকে পশ্চাৎপট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আর অদ্ভুত দক্ষতায় বুদ্ধদেবের মাথার জ্যোতিপ্রভাকে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের সঙ্গে, অর্থাৎ এভাবেই ঘিরে থাকবেন তিনি তাঁর শিষ্যদের আশ্রয় হয়ে। এই ছবিটির পুষ্পবিন্যাস নব্যবঙ্গীয় শৈলী মনে করায়। এখানেও সেই উজ্জ্বল হলুদ রঙের আভা– যা বুদ্ধদেবের ও নবীন সন্ন্যাসীদের পোশাকে ব্যবহার করা হয়েছে, এক অদ্ভুত দ্যুতিতে দীপ্যমান।

এই অ্যালবামটি প্রকাশিত হওয়ার পর বেলগাছিয়ার জৈন মন্দিরের তরফ থেকে তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের জীবনভত্তিক কিছু ছবি করে দিতে অনুরোধ আসে। চমৎকার সেইসব ছবি পরে জয়পুরী পদ্ধতিতে মার্বেল পাথরে খোদাই করে, ‘মার্বেল রিলিফ ভাস্কর্য’ বা ম্যুরালে রূপান্তরিত করেন অতসী। আজও সেগুলি কলকাতার দিগম্বর জৈন মন্দিরের দর্শকদের মুগ্ধ করে। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর ছবিতে শান্ত রসেরই সমারোহ, কিন্তু প্রয়োজনমতো বীভৎস বা ভয়ানক রসের প্রকাশও দেখা যায়। যেমন পার্শ্বনাথের নরক দর্শনের ছবিটি। সেটি এত ভয়ংকর যে তা দেখে একটি শিশু আঁতকে উঠেছিল। এ ইতিহাস তাঁর মুখেই শোনা।
……………………………………………………………………………………….

……………………………………………………………………………………….
অতসী প্রদর্শনী করেছেন বিশ্বের নানা জায়গায়। ১৯৫০-এ স্বামীর সঙ্গে কলম্বোতে গিয়ে প্রদর্শনী করেছেন; স্থানীয় কাগজগুলোতে তাঁর বুদ্ধ সিরিজের ছবিগুলি দেখে প্রদর্শনী সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত আলোচনা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার ‘আর্টিস্টস সোসাইটি’-র সদস্য হন। এই সমিতির উদ্যোগে তাঁর চিত্রকর্ম ভারতের বোম্বে, দিল্লি ও লখনউ এবং বিদেশের কলম্বো, তেহরান, কায়রো, ব্যাংকক ও টোকিওর মতো বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত হয়। তিনি প্রথম ভারতীয় মহিলা-শিল্পী, যাঁর ছবি এশিয়ার এতগুলি দেশে প্রদর্শিত হয়। অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের সদস্য হিসেবে তাঁর সক্রিয় ভূমিকাও উল্লেখ্য। রাণু মুখার্জি সভাপতি থাকাকালীন সহ-সভাপতি হিসেবে তাঁর উদ্যোগী ভূমিকা ছিল যথেষ্ট প্রশংসার্হ।
১৯৭২-এ বুদ্ধগয়ায় আয়োজিত একক প্রদর্শনীতে প্রশংসিত হয় বুদ্ধদেবের জীবন নিয়ে করা তাঁর কাজ। হিরোশিমার বুদ্ধমন্দিরেও আছে তাঁর কাজ। নানা দেশে যেমন ঘুরেছেন তিনি, তেমনই নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে এঁকেছেন ল্যান্ডস্কেপ। সেখানে কিন্তু তাঁর শৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন। রঙের দাপটে সেখানে রেখার গুরুত্ব ঢাকা পড়ে যায়। গভীর অনুভবময় উপস্থাপনায় দর্শকমন মুহূর্তের জন্য স্বাদ পান মানস ভ্রমণের, মনে মনে পৌঁছে যান নেপাল কিংবা পুরীতে।

বিস্তীর্ণ প্রান্তরে একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি মন্দির। যেন চারপাশের নিতল নির্জনতার মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়ানো এই মন্দিরটি ল্যান্ডস্কেপে আলাদা মাত্রা যোগ করে। রঙের ব্যবহার অনেকটাই ইম্প্রেশনিস্টিক। ছোট ছোট রঙের ছোপ দিয়ে তিনি ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন।
কিন্তু বুদ্ধ-জীবনের ছবিগুলি ছাড়াও তাঁর অত্যন্ত পছন্দের কাজ ছিল পেনসিল বা কালিতে দ্রুত হাতে করা স্কেচ। এগুলি সবই মুখচিত্র। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতোই অতসী বড়ুয়ার চিত্রভাণ্ডারেও কত যে মুখের ছবি! তার কোনও তালিকা অবশ্য নেই। তার মধ্যে রয়েছেন শ্রীলঙ্কার ডাক্তার মালালাশেখর, ব্যারন জয়তিলক, জাপানি বিদ্বজন ডাক্তার ইচিমুরা, কম্বোডিয়ার পিট চিন হুস, তাইল্যান্ডের রাজকুমারী পুন দিসকুলকে, ফরাসি সুজ়ান কার্পেলে। তাঁর আঁকা বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতির তালিকা শুনলে অবাক হতে হয়– চতুর্দশ দলাই লামা, হো চি মিন, আম্বেদকর, সুনয়নী দেবী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হিমাংশু রায়-দেবিকা রানি, অতুলপ্রসাদ সেন, পাহাড়ি সান্যাল, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অনাগারিকা গোবিন্দ, মীরা দেবী, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুল বসু, মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় ও তাঁর কন্যা সুচিত্রা মিত্র, ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ক্ষিতিমোহন সেন, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রথীন মৈত্রের আনন্দময়ী মা, শান্তিদেব ঘোষ প্রমুখ। এর প্রত্যেকটিই তাৎক্ষণিক ও খুব দ্রুত হাতে করা। রেখার অনবদ্য গতিশীল চলনে তিনি সুন্দর ফুটিয়ে তোলেন চরিত্রের মূলভাবটি। প্রতিমা দেবী কিংবা সুনয়নী দেবীর মতো তিনিও আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছিলেন। প্যাস্টেলে আঁকা সূক্ষ্ম রেখায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর শান্ত সমাহিত ভাবটি।

আবার পরিণত বয়েসের যামিনী রায়ের ছবিটিতে কিঞ্চিৎ বিষন্ন, চিন্তাশীল অথচ শান্ত শিল্পীর ভাবটি বড় সুন্দর ফুটে উঠেছে। যামিনী রায়ের এই প্রতিকৃতিটি করা ১৯৬৬-তে। যামিনী রায় তখন বৃদ্ধ, মুখোমুখি আঁকা এই ছবিটির প্রতিটি চামড়ার ভাঁজ দ্রুত চলনশীল রেখায় ধরা দিয়েছে। ছবিটির বাঙ্ময় নীরবতা দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়।

আরও বেশ কয়েক বছর আগে করা (১৯৬৩) সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি আবার হাফ প্রোফাইলে করা। ঠাকুরবাড়ির এই বিদ্রোহী সন্তান আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে বাঙালি হিসেবে সমধিক আলোচিত। সৌম্যেন্দ্রনাথের প্রবীণ বয়েসের এই প্রতিকৃতিতে তাঁর দূরাগত ক্লান্ত দৃষ্টি যেন অতীতচারী; অথচ ঠোঁটের দৃঢ়তা বোঝায় এ এক ব্যতিক্রমী মানুষ।

কৃষ্ণের ছবির কথা আগেই বলেছি। এছাড়াও ‘অভিসারিকা’, ‘বাসকসজ্জা’ নায়িকার রূপভেদ ধরা দেয় তাঁর ছবিতে। ‘বাসকসজ্জা’ নামক এই ছবিটিতে যেমন এক শৃঙ্গারের দৃশ্য ফুটে উঠেছে। ধূপের ধোঁয়া শুকনো হচ্ছে, চুল প্রসাধনের নানা জিনিস চরিদিকে ছড়ানো। এখানেও প্রত্যেকটি চরিত্র যথাযথ অভিব্যক্তির গুণে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর হয়ে উঠেছে। শেষের দু’জনের সাজসজ্জা শেষ, তারা যেন একটু অধৈর্য। রঙের অনবদ্য ব্যবহারে ছবিটিতে যেন স্বর্ণাভা ফুটে উঠেছে। এ ছবিতেও আলোর ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। জানলার ফাঁক দিয়ে একটি গাছ উঁকি দিচ্ছে। তার পাতাতেও নানা রং, সেও যেন উৎসবের প্রস্তুতিতে সজ্জিতা। অদ্ভুত লাবণ্যময়তা ছবিটিকে মধুর রসসিক্ত করে তুলেছে। আসলে ছবিটি প্রাত্যহিক চিরচেনা দৃশ্য। পোশাক বদলে দিলেই তারা ইতিহাসের পাতা থেকে নেমে এসে মেয়েলি আড্ডার ছবি হয়ে উঠবে।

নিজের শৈলী বিকাশের পাশাপাশি অতসী কালীঘাট পটুয়াদের আদলে ব্যঙ্গচিত্রধর্মী কাজও করতেন। একটি ছবিতে যেমন দুই মহিলাকে আক্ষরিক অর্থেই চুলোচুলি করতে দেখা যায়, আর মেঝেতে পড়ে আছে ছটফট করছে একটি রক্তাক্ত মাছ। এ সেই চেনা দৃশ্যের এক শৈল্পিক রূপায়ণ।
রেখার ওপর অসামান্য দক্ষতা ছিল তাঁর; আর ছিল ছবির প্রতি অসীম ভালোবাসা। পরিণত বয়সে অশক্ত শরীরেও ছবি এঁকেছেন নিয়মিত। মায়ের মৃত্যুর তীব্র বেদনা থেকে, দীর্ঘ জীবনের অসংখ্য ঘাত-প্রতিঘাতে তাঁর একমাত্র আশ্রয় ছিল ছবি। এ তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণনা, যেখানে ব্যথা সেখানেই নিবিড় আশ্রয়ে তাঁকে ঘিরে রেখেছে ছবি। মনের দোসর বলেই তাকে বাঁধা যায় না কোনও নির্দিষ্ট তকমায়। বিদেশে ভ্রমণ করেছেন, স্বচক্ষে দেখেছেন আধুনিক ইউরোপীয় ছবি, কিন্তু সেখান থেকে গ্রহণ করার মতো কিছু পাননি। ভারতশিল্পের রসসম্পদকে নিজের মতো করে আত্মস্থ করে বুনে গিয়েছেন নিজস্ব চিত্রভাষ্য।
……………………………………………………………………………………….

……………………………………………………………………………………….
অন্তর থেকে সুন্দর ছিলেন তিনি। বুদ্ধের বাণী তাঁর জীবনচর্যায় মিলে গিয়েছিল, তাই ব্যক্তিগত জীবনের নানা উত্থানপতনেও তিনি সংযম হারাননি। বদল হয়নি তাঁর শান্ত অচঞ্চল প্রকৃতি। দেশে-বিদেশে নানা আলোচনাসভায় অংশগ্রহণ করেছেন, বেতারে ছবি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সযত্নে রক্ষা করেছেন বাবার ছবি, ডায়েরি, চিঠিপত্র। অতসী সেই যুগের শেষ প্রতিনিধি, যেখানে নীরবে কাজ করে যাওয়াই ছিল দস্তুর। হাজারের বেশি আঁকা ছবি, কিন্তু প্রচারের আলো কখনওই আকৃষ্ট করেনি তাঁকে। তাঁর নিভৃত প্রাণে শিল্পদেবতার আসন তাই চিরদিনই পাতা, আপন মনের একটি কোনায়– যেখানে সকল দুঃখের প্রদীপ নিবেদন করে এক শান্তরসলোকে উত্তীর্ণ হন তিনি।
তথ্যসূত্র:
১. বিস্তৃত শিল্পসাধিকা, ঋতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সানন্দা, মার্চ, ২০২৩
২. অতসী বড়ুয়ার শিল্প পুনরাবিষ্কার, শিল্পী দাস, হেরিটেজ ল্যাব
৩. কলকাতার কড়চা, আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৫ নভেম্বর, ২০১৫
৪. সোমা সেনের সঙ্গে বাংলার নারী-শিল্পীদের জীবন আবিষ্কার, DAG World
…………… পড়ুন চিত্রার্পিত কলামের অন্যান্য পর্ব ……………
পর্ব ৮ : শান্তা দেবী: প্রবাসী শিল্পস্মৃতি
পর্ব ৭ : আধুনিক ভাস্কর্যের লীলাভূমি
পর্ব ৬ : প্রথম বাঙালি মহিলা ইলাস্ট্রেটর
পর্ব ৫ : গোপেশের খল ক্লাউনেরা
পর্ব ৪ : নন্দলালের ছাত্রী থেকে সশস্ত্র বিপ্লবী
পর্ব ৩ : অরুন্ধতীর ছবি: আলো ক্রমে আসিতেছে
পর্ব ২ : আমিনা করের ছবি যেন জীবনানন্দের কবিতা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved