
আর পাঁচটা হিন্দুপুজোর সঙ্গে গাজনের পার্থক্য আছে। গাজনে ব্রত-চর্যার পাশাপাশি আত্মনির্যাতন তথা বাণফোঁড়া, বিভিন্ন ধরনের ঝাঁপ অনুষ্ঠান, ভাঙা নামক নানাবিধ লোকায়ত অনুষ্ঠান, যেমন– লাকরা-ভাঙা, ঢেলাভাঙা, ধুলোভাঙা, সিদ্ধিভাঙা ইত্যাদি দেখা যায়। অন্যদিকে, ধর্মরাজের গাজনের সঙ্গে শিবের গাজনের অনেকাংশে মিল থাকলেও অমিল আছে প্রধানত শ্মশান সংস্কৃতির প্রসঙ্গে। শিবের গাজনে শ্মশান-কেন্দ্রিক প্রাচীন বোলান গান, নরমুণ্ড নিয়ে নাচ, কৃত্যা ইত্যাদির ঘনিষ্ঠ যোগ দেখা যায়।
প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: সুরিত দত্ত
২৭.
রাঢ় বাংলার সার্বজনীন বৃহৎ উৎসব দু’টি; ‘বড় পরব’ অর্থাৎ, শারদীয়া দুর্গাপুজো এবং ‘চোত-পরব’ বা শিবের গাজন। দু’টি উৎসবের ব্যাপ্তিকাল চারদিন। দুর্গাপুজোর মতো শিবের গাজনের চারদিনের উৎসব হল ফল বা জাগরণ, শিবের স্নানযাত্রা বা জল-সন্ন্যাসী, নীলপুজো ও নীলাবতীর বিয়ে এবং চড়ক।
তবে দুর্গাপুজোয় তারিখের বা মাসের হেরফের হলেও শিবের গাজনের তারিখ ও মাস নির্দিষ্ট; সমানে মাস অর্থাৎ, ৩০ দিনে হলে ২৭-৩০ চৈত্র আর ৩১-এ মাস হলে ২৮-৩১ চৈত্র পর্যন্ত শিবোৎসব পালিত হয় সাড়ম্বরে।

‘গাজন’ শব্দটির মূলে রয়েছে গর্জন। গর্জন মূলত ভক্ত বা সন্ন্যাসীদের তারস্বরে শিবের নাম-ডাক বা গান। এক একটি গাজনে সর্বাধিক পাঁচ শতাধিক সন্ন্যাসী বা ভক্ত হন। সুতরাং, ভক্তদের সমস্বরে শিবের নাম-ডাকের গর্জন থেকে ‘গাজন’ শব্দটি আসতে পারে। অনেকে লোকনিরুক্তি করে লিখেছেন, গাঁ-জনের উৎসব বলেই এর নাম ‘গাজন’। কিন্তু শহর মফস্সলেও গাজন উৎসব আজও পালিত হয় জাঁকজমকের সঙ্গে।
শিবের গাজনের অন্যতম অর্চনীয় দেবতা ও ভোটিব বৃষভ বা ষাঁড়। হরপ্পা সভ্যতায় প্রত্ন-শিবের সঙ্গে ষাঁড়ের যোগ দেখা গিয়েছে। রাঢ়বঙ্গে শিবের গাজনে কাষ্ঠনির্মিত বৃষভটি ভক্তদের কাঁধে চেপে গ্রাম পরিক্রমা করেন। তাঁর নাম বাণেশ্বর। অর্থাৎ, বৃষভের প্রতীকে শিব অর্চিত হচ্ছেন।

‘গাজন’ শব্দটির প্রাচীন উল্লেখ সতেরো শতকের পূর্বে সাহিত্যে দেখা যায় না। উৎকল অঞ্চলে এবং মেদিনীপুরের কিছু স্থানে শিবের গাজনের মতো উৎসবের নাম ‘শাহীযাত্রা’। মালদহ অঞ্চলে শিব-গাজনের নাম ‘গম্ভীরা’। ‘গম্ভীরা’ শব্দটির মূলে রয়েছে ভূগর্ভস্থ মন্দির। কিন্তু শিবপুরাণ অনুসারে, মহাদেবের অপর নাম ‘গম্ভীরা’। শাহীযাত্রা প্রাচীন সাহিত্যে বর্ণিত ‘শিবযাত্রা’র অর্বাচীন নাম। আর পাঁচটা হিন্দুপুজোর সঙ্গে গাজনের পার্থক্য আছে। গাজনে ব্রত-চর্যার পাশাপাশি আত্মনির্যাতন তথা বাণফোঁড়া, বিভিন্ন ধরনের ঝাঁপ অনুষ্ঠান, ভাঙা নামক নানাবিধ লোকায়ত অনুষ্ঠান, যেমন– লাকরা-ভাঙা, ঢেলাভাঙা, ধুলোভাঙা, সিদ্ধিভাঙা ইত্যাদি দেখা যায়। অন্যদিকে, ধর্মরাজের গাজনের সঙ্গে শিবের গাজনের অনেকাংশে মিল থাকলেও অমিল আছে প্রধানত শ্মশান সংস্কৃতির প্রসঙ্গে। শিবের গাজনে শ্মশান-কেন্দ্রিক প্রাচীন বোলান গান, নরমুণ্ড নিয়ে নাচ, কৃত্যা ইত্যাদির ঘনিষ্ঠ যোগ দেখা যায়। যার উৎস আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আদিম আদিবাসীদের পালিত কৃত্যা ও উৎসব। পরন্তু, দক্ষিণ রাঢ়ে যেমন ধর্মরাজের গাজন তেমনই উত্তর রাঢ়ে শিবের গাজন বহু বর্ণময় লুপ্ত ও লুপ্তপ্রায় লোকধর্মের আকরের ভাণ্ডার। পূর্বোল্লিখিত নানা ধরনের ভাঙা জাতীয় লোকানুষ্ঠানগুলি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে এমন সিদ্ধান্তে আসা অস্বাভাবিক নয়।

শিব সুপ্রাচীন লোকদেবতা। মহেঞ্জোদারো থেকে প্রাপ্ত স্টিয়াটাইট পাথরে খোদিত চতুষ্কোণ শিলমোহরে ত্রিমুখ-বিশিষ্ট দ্বিশৃঙ্গযুক্ত দ্বিভুজ এক দেবতা বা দেবতাকল্প পুরুষমূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি নাতি উচ্চাসনের ওপরে যোগাসনের ভঙ্গিমায় বসে দুই বাহু প্রসারিত করে জানুতে ন্যস্ত করেছেন। এই ধরনের একাধিক সিলমোহরে অনুরূপ পুরুষ-মূর্তির সঙ্গে ত্রিশূল ষাঁড় ইত্যাদি খোদিত হয়েছে, যার সঙ্গে পৌরাণিক শিবের ঘনিষ্ঠ যোগ লক্ষ করেছেন গবেষকরা।
ঋকবৈদিক সাহিত্যে পাওয়া যায় রুদ্রদেবতাকে। তাঁর বহুবিধ বিশেষণের মধ্যে ‘শিব’ শব্দটিও উল্লিখিত হয়েছে। রুদ্র অন্যতম প্রধান ভয়ানক বৈদিক দেবতা। তাঁর রুদ্ররূপ উপমিত হয়েছে, প্রলয়ংকর ঝড় ঝঞ্ঝা অশনিপাত, ভয়াবহ অগ্নিদাহ, মৃত্যু আনয়নকারী সংক্রামক ব্যাধিপুঞ্জ রূপের সঙ্গে। ‘রুদ্র’ শব্দটির অর্থ রোদন বা কান্না।

রুদ্রদেবতার মঙ্গলকারী রূপের বিশেষণ হিসেবে ‘শিব’ শব্দটি প্রযুক্ত হয়েছে ঋকবেদের দশম মণ্ডলের ৯২ সংখ্যক সূক্তের ৯ নম্বর ঋকে। পরে রুদ্রের বিশেষণ শিব ক্রমশ বিশেষ্যপদে পরিণত হল। রুদ্র হল শিবের বিশেষণ; যেমন রুদ্র-শিব। শিবের গাজনে অ-বৈদিক বা লৌকিক, বৈদিক, পৌরাণিক শৈবসংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক শৈবমতবাদ খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে চলে আসছে। এ-বিষয়ে পাণিনির ‘অষ্টাধ্যায়ী’ গ্রন্থে শৈবসাধকদের সংক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে। পাণিনি ৪/১/১১২ সূত্রে ‘শিবাদিভ্যোন’ শব্দের উল্লেখ করেছেন। শিবাদিভ্যোন হল শৈবসাধক। তাঁদের হাতে থাকত শূল ও দণ্ড। পাণিনির সূত্র ব্যাখ্যাকালে পতঞ্জলি শিবভক্তদের নাম উল্লেখ করেছেন ‘শিবভাগবত’। শিবভাগবতদের হাতে থাকত লৌহশূল ও দণ্ড। পরিধেয় বস্ত্র বলতে পশুর চামড়া। শৈবধর্মের প্রাচীন শাখাটির নাম পাশুপতধর্ম। গবেষকদের মতে, পাশুপত ধর্ম জনপ্রিয় করে তোলেন শিবাবতার রূপে পূজিত শৈবসাধক লাকুলিশ।

লাকুলিশের প্রভাব সমগ্র ভারতবর্ষ-সহ বাংলায় ব্যাপকভাবে ছিল। তার প্রমাণ মেলে বর্ধমান জেলার বরাকরের নিকটবর্তী বেগুনিয়া গ্রামের শিবমন্দিরের শিখরে খোদিত দণ্ডধারী লাকুলিশের মূর্তিটি। খোদ কলকাতায় তিনি কালীঘাটের ভৈরবরূপে পূজিত হচ্ছেন নকুলেশ্বর নামে। কলকাতার নামকরণ নিয়ে নানা পণ্ডিত নানা রকমের ব্যাখ্যা করেছেন। অনেকের মতে, কালীতীর্থ থেকে কলকাতা নামটি এসেছে। কালীতীর্থের প্রহরী হলেন নকুলেশ্বর ভৈরব। প্রসঙ্গত, কালীঘাট থেকে গুপ্তযুগের একগুচ্ছ মুদ্রা পাওয়া গিয়েছিল।
পাশুপত ধর্ম মূলত পঞ্চবিভাগে বিভক্ত– কার্য, কারণ, যোগ, বিধি এবং দুঃখান্ত। কার্য হল তিন প্রকার– বিদ্যা, কলা ও পশু। পশু হল জীব বা জীবাত্মা। বিদ্যা তার গুণস্বরূপ। কলাসমূহ পশুরূপকে আশ্রয় করে থাকে। পশু বা জীব যতদিন কলাসমূহের অধীনে থাকে ততদিন সে শুদ্ধ থাকে না। যখন কলার বন্ধন থেকে পশু মুক্ত হয়, তখন সে শুদ্ধ হয়ে ওঠে। এটাই পাশুপত ধর্মের মূল দর্শন।

বিধি হল– পশু বা সাধকের উন্নতি উৎকর্ষ ইত্যাদি সম্পাদনকারী ধর্মাচারণ প্রণালী। মূল বিধিগুলির নাম চর্যা। এটিও দু’টি ভাগে বিভক্ত– ব্রত ও দ্বার। ভস্মস্নান, হাস্যগীত, জিভের সাহায্য তালুতে আঘাত করে ষাঁড় বা বৃষভের আওয়াজের অনুকরণ করা ইত্যাদি। শৈবশাস্ত্রে একে বলা হয়েছে ‘হুড়ুক্কু ধ্বনি’। রয়েছে বিবিধ মুদ্রায় শিবের প্রণাম ও যোগাসন।
বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের সমসাময়িক আরেকটি ধর্মমত ভারতে জনপ্রিয় ছিল। তার নাম আজীবিক ধর্ম। এই ধর্ম মূলত বেদবিরোধী এবং নিয়তিবাদ নিয়ন্ত্রিত ছিল। আজীবিক ধর্মের প্রধান ধর্মাচার্য মঙ্খলি গোসাল ছিলেন জৈনধর্মের তীর্থঙ্কর মহাবীর বর্ধমানের সমসাময়িক। অনেকে মনে করেছেন, আজীবিক ধর্ম আদিতে শিবপূজক ছিল।

আজীবিকরাও শৈবমতাবলম্বীদের মতো বেত্রদণ্ডধারী পরিব্রাজক ছিলেন। আজীবিক ধর্মবিশ্বাসীদের কণ্টকশয্যায় শয়ন, কাঁটায় গড়াগড়ি, আদিরসাত্মক সংগীতে আসক্তি ইত্যাদি লক্ষ করা যায়। আজীবিক ধর্মের মঙ্খলি গোসাল শেষজীবনে মদ্যপান করতেন ও আদিরসাত্মক সংগীত গাইতেন। বাংলাতেও গুপ্তযুগে এদের আশ্রম গড়ে উঠেছিল। সেই আশ্রমে পূজিত হতেন যক্ষ মণিভদ্র।
শিবের গাজন খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে উপরিউক্ত একাধিক বৈশিষ্ট্য আজও লক্ষ করা যায়। যেমন শিবের গাজনে আদিরসাত্মক গান-বাজনা, গর্জন করা বা তারস্বরে শিবনাম ডাকা, উন্মত্তবৎ আচরণ ইত্যাদি। আদি রসাত্মক ও পাগলের মতো আচরণকারী ব্যক্তিকে ‘চোতকাপ’ বা ‘চোতক্ষেপা’ বলে। চোতকাপ বর্তমানে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রতে পরিণত হয়েছে।

এখন চোতকাপের অর্থ এক ধরনের ‘সং’। কেউ মাথা ন্যাড়া করে অদ্ভুত সাজে। কেউ আদিরসাত্মক অঙ্গভঙ্গি করে। কেউ নগ্ন থাকে। উত্তর রাঢ়ের ফল উৎসবের রাতে গাজনতলা মাতিয়ে রাখে চোতকাপ। গ্রামবাসীরা এর মধ্যে কোনও অশ্লীলতা দেখেন না।
শিবের গাজনে লিঙ্গরূপের মূর্তি বেশি পূজিত হচ্ছে। এছাড়াও আরও নানা রূপে রূপান্তরে তিনি পূজিত হন। প্রাচীন পাথরের মূর্তি ও মৃৎমূর্তি; যেমন উমা আলিঙ্গন বা হরগৌরী। হরগৌরী মূর্তিতে শিবের গাজন দেখা যায় মুর্শিদাবাদের পোচপাড়া গ্রামে। মূর্তির উচ্চতা প্রায় সাড়ে চার ফুট। কাটোয়া অঞ্চলের মণ্ডলগ্রামে হরগৌরী মূর্তিতে শিবের গাজন হয়। উচ্চতা সোয়া দু’-ফিট। মালদহের গম্ভীরায় মাটির হরগৌরী মূর্তিতে গম্ভীরা উৎসব পালিত হয়।
পূর্ববর্ধমানের কেতুগ্রামের গুড়পাড়া, কেচুনে, মঙ্গলকোটের কুন্দাগ্রামে নব্যপ্রস্তর যুগের হাতিয়ার বা সেল্ট শিবলিঙ্গ হিসেবে পূজিত হন। এগুলি বহুপূর্বে গ্রামবাসীরা মরা নদীর গর্ভ থেকে উদ্ধার করে শিবলিঙ্গ আকারে পুজো করে আসছেন। ত্রিভুজাকৃতি গঠন। অনেকে মনে করেন, এগুলি লাঙলের ফাল হিসাবে নব্যপ্রস্তর যুগে ব্যবহৃত হত।

সিন্ধুসভ্যতায় লিঙ্গের মতো প্রত্নবস্তু পাওয়া গিয়েছে এবং ঋকবেদে লিঙ্গদেবতাকে শিশ্নদেবতা বলা হত। শিশ্নদেবতাকে আর্যরা প্রথমদিকে খুব একটা পাত্তা দিতেন না। প্রখ্যাত গবেষক প্রিজুলুস্কি, তাঁর ‘নন এরিয়ান লোনস ইন ইন্দো এরিয়ান’ প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন ‘লাঙ্গল’ বা ‘লিঙ্গ’ অস্ট্রো এশিয়াটিক শব্দ। লাঙ্গলের ফাল বা প্রাকৃত লিঙ্গ থেকে শিবলিঙ্গ ভাবনা জেগেছিল। কেননা উভয়ের কাজ হল ভূমি বা নারীর যোনি কর্ষণ। শিবায়ণকাব্য অনুসারে, মর্তে কৃষিকাজ প্রবর্তন করেছিলেন স্বয়ং মহাদেব। ভীম ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী। কৃষিদেবতা হিসাবে ভীমের পুজো এখনও হয় বাংলার বিভিন্ন স্থানে। শিবের গাজনে কৃষি সংস্কৃতি লক্ষ করা যায়– ঢেঁকিমঙ্গলা, শিবের চাষাবাদ, ঢেলাভাঙা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে।
অনেক স্থানে বৌদ্ধ বা জৈনধর্মের তীর্থঙ্করদের শিবজ্ঞানে পুজো করা হচ্ছে। যেমন মঙ্গলকোট থানার শঙ্করপুরে জৈন তীর্থঙ্কর ন্যাংটেশ্বর শিবরূপে পূজিত হচ্ছেন। নিকটবর্তী কুন্দাগ্রামে ঋষভনাথ ব্রহ্মেশ্বর রূপে শিবের গাজনে পুজো পান। মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে একাধিক বুদ্ধমূর্তি শিবে রূপান্তরিত হয়েছেন। কোথাও আবার ভোগবিষ্ণুমূর্তি শিবজ্ঞানে আরাধিত হয়েছেন। যেমন মুর্শিদাবাদ জেলার সোনারুন্দি গ্রামে বিষ্ণুমূর্তি শিবের গাজনে পূজিত হচ্ছেন।

বুদ্ধদেবকে যেমন বিষ্ণুর অবতার ভাবা হয়েছে, তেমনই শিবরূপেও কল্পিত হয়েছেন বৌদ্ধ বজ্রযান শাখায়। কান্দি শহরের পশ্চিমে কানা ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে প্রাচীন গ্রাম লাহেরপাড়া। এখানে একটি অদ্ভুত বৌদ্ধ ধ্যানস্থ মূর্তি দেখা যায়। উচ্চতা সোয়া দু’-ফুট। তিনি প্রস্ফুটিত পদ্মের ওপর ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় উপবিষ্ট। তাঁর কপালে শৈবচিহ্নের তিলক। গলায় জড়ানো সাপ। মাথার ওপরে বুদ্ধের মহানির্বাণের চিত্র। দু’-পাশে বোধিসত্ত্বের মূর্তি। ইনিও শিবের ধ্যানে পূজিত হচ্ছেন। কান্দির রুদ্রেশ্বরের গাজন বুদ্ধের মূর্তিতে অনুষ্ঠিত হয়।
প্রাচীনকালে শিবকে কেন্দ্র করে যে বাৎসরিক উৎসব হত, তার নাম গাজন নয়। প্রাচীন সাহিত্যে তাকে বলা হয়েছে ‘মহ’ বা ‘যাত্রা’। যেমন রুদ্রমহ বা শিবমহ। ‘মহ’ শব্দের উৎস বৈদিক ‘মখ’ শব্দ থেকে। পরে শব্দটির অর্থ উৎসবে পরিণত হয় রুদ্রমহ বা শিবযাত্রার পাশাপাশি নাগমহ, মুকুন্দমহ, যক্ষমহ ভূতমহ ইত্যাদি প্রাচীনকালে সর্বভারতীয় উৎসব ছিল।

জৈনসাহিত্য থেকে জানা যায়, শিবের মন্দিরের নাম ছিল ‘রুদ্রঘর’। তবে তিনি একা পূজিত হতেন না। রুদ্রমহে শিবের সঙ্গে পূজিত হতেন আদ্যা চামুণ্ডা বা দুর্গা ইত্যাদি। জৈনগ্রন্থ ব্যবহার-ভাষ্যে লিখিত হয়েছে, সেকালে রুদ্রের মন্দির-নির্মাণে ব্যবহার করা হত মৃত মানুষের করোটি এবং অস্থি। রুদ্রের মূর্তি কাঠের তৈরি হত। একালেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। শিবের গাজন মানেই শিব-শক্তি বা হরপার্বতীর বাৎসরিক উপাসনা। রুদ্র বা শিবের মূর্তি কাঠের তৈরি বাণেশ্বর। এবং শিবের সঙ্গে নরমুণ্ড পুজোর যোগ গাজনে দেখা যায়।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved