


হঠাৎ আবিষ্কার করেছি, কোথা থেকে যেন দুটো ছোট্ট ভাইবোন আসে। উমেশ নেই দেখলে ঘরে ঢুকে আমার সঙ্গে গল্প করে, উমেশকে দেখলে ছুট্টে পালিয়ে যায়। ওরা না কি পাশের বাংলোয় থাকে। ওদের মায়ের নাম পুতুল। ভালোই লাগে ওদের সঙ্গে গল্প করতে। অবশ্য একটু কথা বলবার পরই বেশিরভাগ দিন ঘুমিয়ে পড়ি আমি। একদিন হঠাৎ উমেশের চেঁচামিচিতে নজর পড়ে দুই মূর্তি বাগানের গেটে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়ানো। সুযোগ পেলেই ছুট লাগাবে এরকম ভাব।
১৬.
’৭৫ সালে ঝাড়খণ্ডের একটা অদ্ভুতরকম ফাঁকা জায়গায় থাকার ব্যবস্থা হল। আমার পেটে একটা বড় অপারেশন করতে হয়েছে। ডাক্তার তো বলেই খালাস, একমাস বেডরেস্ট ইত্যাদি। কিন্তু সে বেডের ব্যবস্থা কোথায়! সপ্তাহখানেক থাকা হল একঠাঁই, কিন্তু সেখানে থাকে দু’টিমাত্র তরুণ। তারা খুবই চায় সাহায্য আর যত্ন করতে, কিন্তু নিজেরা ছোটবেলা থেকে বোনকে কিংবা মাকেও কখনও কাজকর্মে সাহায্য করেনি, শুয়ে থাকা রুগীকে আর কী করে যত্ন করবে! সাতদিনের মাথায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হল। তিনি দেখে বললেন, স্টিচ সেপটিক হয়ে গিয়েছে, মরার সম্ভাবনা প্রচুর। একখানা শহুরে মেয়ে দূর কোলিয়ারিতে মরলে প্রচুর বখেড়া, তার চেয়ে অন্য কিছু ভাবতে হল। বিচিত্র এক ক্যাম্পে একরকম চিকিৎসা করিয়ে নিয়ে যাওয়া হল অন্য একটা জায়গায়। এটা অনেক সুরক্ষিত, মানে যারা স্বস্তিতে থাকেন তাদের পক্ষে নিরুপদ্রব, সুব্যবস্থিত। অবশ্য চলৎশক্তিহীনদের পক্ষেও। এক সঙ্গীর সঙ্গে পৌঁছলাম, শরৎকালের এক শেষ দুপুরে। দূরে দূরে থাকা কয়েকটা বাংলো গোছের বাড়ি। একটা থেকে অন্যটা খুব একটা দেখাও যায় না। মাঝখানে বেশ ঝোপঝাড়। ভদ্রলোকের নাম ধরা যাক– মুখার্জিদা। সরকারি কোলিয়ারির ম্যানেজার গোছের কিছু। সকলের মুখেই শুনি– ‘সাহেব’। সঙ্গী পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর তিনি জানালেন, এ বাড়িতে আমি সম্পূর্ণ নিজের সুবিধেমতো থাকতে পারি। রান্না তথা ঝাড়ামোছা করার একটি লোক থাকবে। মুখার্জিদা নিজে থাকতে পারবেন না, তাঁকে এখন কিছুদিন কোলিয়ারিতে টানা নাইট ডিউটি করতে হবে। উনি সেখানে প্রয়োজনমতো অফিসার্স রেস্টহাউসে বিশ্রাম করতে পারবেন। কোনও সমস্যা হবে না। তবে শনি-রবিবার অবশ্যই আসবেন। বোঝা গেল। ওই অবস্থার মধ্যেও কিঞ্চিৎ কৌতুকও বোধ হল, অকৃতদার সজ্জন মানুষটির নিজের চরিত্র এবং মহিলার নিরাপত্তাবোধ রক্ষার একান্ত আগ্রহ দেখে।
গরমে, অসুস্থতায় বেশ ক্লান্ত ছিলাম। শুনলাম, জলের কোনও সমস্যা নেই এখানে। ভেতরের উঠোনে, স্নানঘরে, সব জায়গায় পরিষ্কার জল ভরা আছে। স্নানঘরে ঢুকতে গিয়ে বেরিয়ে আসতে হল। মাঝখানে বেশ খানিকটা বালি স্তূপ করে রাখা, তার ওপরে ঢাকা দেওয়া মস্ত মাটির জালা। স্পষ্টতই জল ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা। কিন্তু তার পাশে বিড়ে পাকিয়ে ফণা গুটিয়ে বসে আছে কালো আর মেটেহলুদে মেশা এক হৃষ্টপুষ্ট সাপ। গৃহকর্তাকে বলতে তিনি নির্বিকার উদারতায় বললেন, হ্যাঁ, ও মাঝে মাঝে আসে। চলে যাবে। সন্ধের মুখে উমেশ এল। শুনলাম, আগামী কিছুদিন সে-ই আমার অভিভাবক ও বন্ধু। যা কিছু আমার দরকার উমেশকে বললে ও করে দেবে। রান্না করতে জানে। ঘরদোর পরিষ্কার করা, কাপড় কাচা– সব কিছু যত্ন করে করে। মুখার্জিদা বলে দিলেন, দিদি থাকবে। অসুখ করেছে, ‘পেট মে ভারী আপরেশন’ হয়েছে। ডাক্তার বলেছে বিছানায় শুয়ে থাকতে। উমেশ যেন ঠিকমতো দেখভাল করে। উমেশের সরল গম্ভীর তরুণ মুখখানা ভারি সদয়ভাবে দিদির দিকে তাকাল।
দিদি যেন ওঠাউঠি না করে, কোনও কাজে হাত না দেয়, উমেশ যত্ন করে রান্না খাওয়া করায় যেন– ইত্যাকার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন দু’জনে। সঙ্গী অবশ্য যাওয়ার আগে তাকিয়ে গেলেন কিছুটা উদ্বিগ্ন চোখেই।
গৃহস্থালীতে জিনিসপত্রের কিছুমাত্র অভাব নেই। আতপ চাল, মুগ ডাল, পোস্ত আলু কুমড়ো, দেওয়ালের শেলফে দারুণ ভালো ঘি। নতুন আনিয়ে রাখা চা পাতা। চিনি। উমেশকে জিজ্ঞেস করলাম কী রান্না করবে রাতের জন্য?
–ডাল ভাত আলুপোস্ত?
বাঃ। পরদিন সকালে নিশ্চিন্ত সবুজ ঘেরা চারপাশ দেখে ভাবছি, অন্যরা কে কোথায় কেমন আছে এখন… উমেশের আবির্ভাব। দুধ চিনি মেশানো সযত্ন চা। গরম রুটি, আলুসবজি। ক্লান্তি আর ব্যথা মিলে ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম জাগা। দুপুরে ডাল ভাত আলুপোস্ত। খেয়ে আবার শুয়ে থাকা। রাতে, উমেশ? কেয়া পকায়েগা?
–আলুপোস্ত ডাল ভাত, দিদি।
দু’দিন পর বোঝা গেল সে বেচারি ওই দুটো ব্যঞ্জন ছাড়া আর কিছু বানাতে জানে না। কুমড়ো সেদ্ধ করে দিতে পারে। এখানে কোনও বাজার দোকান নেই। সপ্তাহে একদিন হাট বসে। সেইখানে ‘মাঝি মেয়েরা’ মাছ মাংস সবজি নিয়ে আসে। কিন্তু এই বাড়ির সাহেব হাটে যায় না। মাছ মাংস খায় না তো। সাধু আদমি আছে। উমেশ কাজ করে রেখে সন্ধেবেলা বাড়ি চলে যায়, পরদিন সকাল আটটা নাগাদ আসে। শনিবার বিকেলে বাড়ি গিয়ে রবিবার সে আর ফিরল না। একেবারে সোমবার সকালে কাঁচুমাচু শুকনো মুখে হাজির।
–কী হয়েছে, উমেশ?
–শাশুড়ির ভীষণ অসুখ হয়। রাতেই ডাক্তারের কাছে নিতে হয়েছিল। ওষুধ দিতে হল। এখন ভালো আছে।

মুখার্জিদা এলেন সোমবার সকালের দিকে। সব খোঁজখবর নিলেন– কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো? উমেশ ঠিক কাজ করছে? রান্নাবান্না করছে? কোনও অসুবিধে নেই, জানাতে হল। বললাম, উমেশের বাড়ির বিপদের কথা। শুনে ভদ্রলোকের মুখ লাল হয়ে গেল– শাশুড়ির অসুখ করেছিল? ভেতরের বারান্দায় গিয়ে হুঙ্কার দিলেন, উমেশ? শনিবার হপ্তা তুলেছিস? উমেশ নতমস্তক। আমি একটু বিরক্ত হচ্ছি। বেচারির বাড়ির বিপদে ওরকম ধমকানোর কী আছে? আমার তো অসুবিধে কিছু হয়নি। মুখার্জিদা একই রকম গলায় বললেন, দিদি যতদিন আছে ফের একদিনও যেন না শুনি রবিবার শাশুড়ির অসুখ করেছিল!
এদিকে ফিরে একটা জবরদস্ত ‘হুঁ!’ করে নিজের মনেই গজগজ করলেন, হপ্তা পেয়েই আর বাড়িও যাবে না…! বুঝলাম। ভাবলাম, উমেশ বেচারা আমাকে কতখানি নভিস বলে বুঝে নিয়েছে। মুখার্জিদা নিজে চা খান না, কিন্তু আমার জন্য ধানবাদ থেকে ভালো চা পাতা আনিয়েছেন। রাগসংগীত ভালোবাসেন। আবার আমাদের বিপদ বরণ করা জীবনযাত্রা সম্পর্কে এক রকমের শ্রদ্ধা মেশানো কৌতূহলও আছে। জিজ্ঞেস করলাম এখানকার স্থানীয় বসতি সম্পর্কে। শুনলাম, এদিকে বসতি তেমন নেই। এই কয়েকটা বাংলো আর সামনের নিচু জমিতে রেললাইন। ওখান দিয়ে রোজ সকালে দুটো আর বিকেলে দুটো প্যাসেঞ্জার গাড়ি যায়। কিন্তু এখানে কোনও স্টেশন নেই। স্টেশন আরও দু’ কিলোমিটার দূরে, যেখানে কোলিয়ারির শ্রমিকরা থাকে, সেই দিকে। ওখানেই ছোট সাঁওতাল গ্রাম আছে। তাছাড়া ওখান থেকেই কয়লার লোডিং হয়। সেই মালগাড়িগুলোকেও ঠিক দেখা যায় না বটে, তবে শোনা যায়। প্রচুর কালো ধোঁয়া ফেলতে ফেলতে চিৎকার করে লাইন পার করে দিনে দু’বার।
শুয়ে থাকারও তো সীমা আছে। একটু একটু উঠে ঘরের বাইরে ওই ফাঁকা জায়গার ঝোপঝাড়ের মধ্যে যাই। হেমন্তের রোদ্দুর মন ব্যস্ত করে দেয়। আর ভালো লাগে না এইভাবে থাকতে। সঙ্গী আসেন এক-দু’বার। ওষুধ পৌঁছনোর জন্য। আমিও উদ্গ্রীব হয়ে থাকি ওদের খবরের জন্য।
হঠাৎ আবিষ্কার করেছি, কোথা থেকে যেন দুটো ছোট্ট ভাইবোন আসে। উমেশ নেই দেখলে ঘরে ঢুকে আমার সঙ্গে গল্প করে, উমেশকে দেখলে ছুট্টে পালিয়ে যায়। ওরা না কি পাশের বাংলোয় থাকে। ওদের মায়ের নাম পুতুল। ভালোই লাগে ওদের সঙ্গে গল্প করতে। অবশ্য একটু কথা বলবার পরই বেশিরভাগ দিন ঘুমিয়ে পড়ি আমি। একদিন হঠাৎ উমেশের চেঁচামিচিতে নজর পড়ে দুই মূর্তি বাগানের গেটে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়ানো। সুযোগ পেলেই ছুট লাগাবে এরকম ভাব।
–কী হয়েছে উমেশ? কেন বকছ?

উমেশ বেশ রাগত গলায় বলে: দেখো দিদি, কী করৈছে। সাহব কো কী কহব হামি?
ওর হাতের দিশায় তাকিয়ে দেখি, আমি যে খাটে ঘুমিয়েছিলাম, তার তলা থেকে ঘরের চৌকাঠ হয়ে বাগানের গেট অবধি সরু সাদা লাইন। কী এটা? নজর করে দেখি– চিনি। এবারে চোখে পড়ে দুই খুদের দু’ হাত ভর্তি চিনি, মুখেও তাই। এত চিনি! কোথা থেকে এল? উমেশের রাগে গজগজ করা থেকে যা উদ্ধার হয়– মুখার্জিদা বছরের শুরুতে ১৬ কেজির টিন ভরে এক টিন চিনি কিনে খাটের নিচে রেখে দেন। যেহেতু উনি আর উমেশ ছাড়া এ বাড়িতে কেউ আসে না, ফলে দায়িত্বের ব্যাপারে উমেশ নিশ্চিন্তে থাকে। এই বাচ্চাদুটো ওই পাশের বাংলোর পালিত সাহেবের। উমেশের মতে ওরা খুবই দুষ্টু। আমার কাছে আসে বলে উমেশ কিছু বলে না। কিন্তু আমার ঘুমিয়ে পড়ার অবসরে দু’জনে প্রাণপণে চিনি উৎসব করেছে। উমেশ এখন সবচেয়ে চিন্তিত যে, সাহেব তার ওপরে সংসারের সব দায়িত্ব ছেড়ে যান। এতগুলো চিনি লোকসানের কী জবার দেবে সে? এইসব কথার ফাঁকে সেই দুই চিনিচোর হাওয়া। উমেশকে বহু সান্ত্বনা দিয়ে সুস্থির করা গেল যে বাচ্চারা তো বাচ্চাই হয়। ওদের যখন ২০ বছর হবে, তখন কি আর ওরা মুঠো করে চিনি খাবে? উমেশ বুকে হাত দিয়ে বলুক দেখি যে, কোনওদিন দাদির তৈরি আচার থেকে এক টুকরোও তুলে খায়নি কখনও? এই কথাটিতে যেন এক উৎসমুখ খুলে যায়। উমেশ দুপুরবেলা বসে বসে ওর পুরো দেহাতি ভাষায় বলতে থাকে ওর গ্রাম, ওদের জঙ্গল, সেইখানের ছোট ছোট খেতজমির কথা। কোলিয়ারির হাতে জমি বেচে দিলে একজনের চাকরি হবে– এইজন্য সে সংসারের বড় ছেলে, ওর মাইনে পাওয়া চাকরির কথা। ওদের গ্রামে সোহরাই পরবের কথা। ছট পুজোর কথা। ছুটি নিলে মাইনে নেই বলে বাড়ি যেতে-না-পারা কষ্টের গল্প বলে। আমার একবার খুব ইচ্ছে করে ওকে আমার নিজের পরিচয় বলি। বলি যে, আমি মুখার্জি সাহেবের বোন নই, আমি ওদের নিজেদের লোক। কিন্তু বলতে পারি না। আরও অনেকগুলো মানুষের বিশ্বাস আর নিরাপত্তার প্রশ্ন।
আরও সপ্তাহখানেক পরে আমার নির্জনবাসের অন্ত হয়। মুখার্জিদা ছিলেন না। তাঁর কথামতো উমেশ ভোরবেলা ব্যাগসুদ্ধ আমাকে হাজারিবাগের বাসে তুলে দিয়ে আসে। সত্যিকারের যত্ন আর আবেগে ওর মুখখানা ম্লান। আমারও মন ভরে যায় ভালোবাসায়। আর দেখা হয়নি কখনও সেই দু’ রকম দু’টি মানুষের সঙ্গে– যাঁদের একজন বিপদের ঝুঁকি জেনেবুঝে, অন্যজন না জেনেও একজন অপরিচিত মেয়েকে অত যত্নে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন।
___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___
১১. ইনি আমার মাসি, আর আমি এনার দিদি!
৮. যুদ্ধের যে গল্পে বীরত্ব নেই, মনখারাপ আছে
৭. কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!
৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা
৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি
৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই
৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান
২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের
১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved