Robbar

এ শহরের একজন আশ্চর্য গাইড

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 6, 2026 8:05 pm
  • Updated:June 6, 2026 8:36 pm  

ওইখানে লিপটন কোম্পানির এত বড় বিজ্ঞাপন ছিল, কেটলি থেকে চা ঢেলে পড়ত। এই ময়দানের ওই পাশ দিয়ে ট্রাম চলত। ফুটবল খেলার দিনে ঘোড়সওয়ার পুলিশ ঘুরত লাঠি নিয়ে। এখানে এত লোকজন, দোকান ছিলই না। দেশভাগের পর লোক আসা শুরু হল। সে যে কত লোক! তখনও ট্রেন আসত ওইপার থেকে শিয়ালদা। ট্রেন উপুড় করা লোক। সে লোক অবশ্য এইখানে না, সে আসত যাদবপুর, বরানগর।

জয়া মিত্র

১৪.

হাওড়া স্টেশন থেকে বেরিয়ে, উঠে বসেই ট্যাক্সির বয়স্ক চালককে গন্তব্য বলে দিয়েছি। কোনও জবাব না-পেয়ে আরেকবার শুধোলাম, গলফ গ্রিনের রাস্তা দিয়ে বাঘাযতীন যাব। চেনেন তো? ঈষৎ ঝাঁঝিয়ে ওঠা জবাব এল– ‘হ্যাঁ রে বাবা!’

আগে বারদুয়েক নিজে ভালো করে রাস্তা না-চেনার খেসারত নিয়েছে এ শহরের ট্যাক্সি, তাই ভয় ছিল, কিন্তু ওই ‘হ্যাঁ রে বাবা’ শুনে আর কথা বাড়ালাম না। আমি না-বাড়ালে কী হবে, এবারে তিনিই বাড়ালেন। কয়েক বছর আগে হাওড়া স্টেশন থেকে বেরিয়ে সেই দুর্গন্ধময় ছোট টানেল পার হয়ে যেখানে ব্রিজে ওঠার মোড়, তার ঠিক আগেটায় স্বগতোক্তি শুনলাম– ‘রাস্তা যে কে চেনে!’ তারপর সওয়ারির উদ্দেশে, ‘এই যে জায়গাটা দেখছেন, ৫০ বছর আগে এইখানে কী ছিল জানেন?’

অবশ্যই জানি না। 

‘হোগলার জঙ্গল ছিল এইসব জায়গায়, বুঝলেন? স্টেশনের বাইরে চারিদিকে কাদা, জলা জায়গা। দিনে ১০-১২টার বেশি ট্যাক্সিও আসত না এইখানে।’

বলে কী! মাথার ভেতরে নানারকম সুতোয় জট পাকাতে লেগেছে– জলা ছিল এইসব জায়গায়! যখনকার কথা ইনি বলছেন, তার আগে কি তাহলে আরও বেশি ছিল? হতে কি পারে? গঙ্গার পাশের নিম্নভূমি, বৃষ্টির অনেক জল জমে থাকত? না কি অনেক আগে এতখানিই ছিল সুন্দরবনের জোয়ার জলের বিস্তার। তাই হাওড়া? ‘হাওর’ মানে যে সাগর, সেকথা তো জানি। শিলচরে এখনও বড় বিল বা জলাকে ‘হাওর’ বলেন ওঁরা। এতদিন এত ব্যাখ্যা শুনেছি এই হাওড়া নামের, তার আসল মানে তাহলে এই? এইজন্যই কলকাতার আশপাশে আরও এতগুলো হাওড়া?

শিল্পী: শান্তনু দে

যতক্ষণে এতসব ভেবে পুলকিত হচ্ছি, কথক কিন্তু এগিয়ে গেছেন অনেকখানি–

‘এইসব জায়গায় এত লোক আসা শুরু হল তো দেশভাগের পর। সব জায়গায় মানুষ ভরে গেল। করে কী! নিজেদের ঘরবসত ছেড়ে আসা, কোথাও থাকতে তো লাগে? তখন সাহেবদের এইসব বড় বড় অফিসবাড়িও তৈরি হত চুনসুরকি দিয়ে। সিমেন্ট তো আসল যুদ্ধের সময়ে। এই যে দেখছেন রাইটার্স বিল্ডিং, এর পুরনো অংশ হল ওই পিছন দিকটা, যেখানে জ্যোতিবাবু বসেন। ওই বিল্ডিংও চুনসুরকির, ওপরটা শুধু সিমেন্ট দিয়ে মাটি করা।’

ততক্ষণে চমকে ওঠায় ধাতস্থ হয়েছি কিছুটা। তাই চমৎকৃত হই ওই ‘সিমেন্ট দিয়ে মাটি করা’য়। আমরা যেমন মাটি দিয়ে ‘প্লাস্টারিং’ বলি, অনেকটা তাই। রেডরোড পার হবার সময় রেলওয়ে বুকিং অফিসের পাশ থেকে বাঁ-দিকে হাত দেখিয়ে–

‘ওইখানে লিপটন কোম্পানির এত বড় বিজ্ঞাপন ছিল, কেটলি থেকে চা ঢেলে পড়ত। এই ময়দানের ওই পাশ দিয়ে ট্রাম চলত। ফুটবল খেলার দিনে ঘোড়সওয়ার পুলিশ ঘুরত লাঠি নিয়ে। এখানে এত লোকজন, দোকান ছিলই না। দেশভাগের পর লোক আসা শুরু হল। সে যে কত লোক! তখনও ট্রেন আসত ওইপার থেকে শিয়ালদা। ট্রেন উপুড় করা লোক। সে লোক অবশ্য এইখানে না, সে আসত যাদবপুর, বরানগর।’

কথায় কথায় গড়িয়াহাট পার। যোধপুর পার্ক।

“এইখানটা ছিল একটা জলা জায়গা। মশা আর ঝোপজঙ্গলে ভরা। তার মধ্যে একদিন শিয়ালদা স্টেশনে অপেক্ষা করছি, এক ভদ্রলোক নামলেন। তখনও দেশভাগ হয় নাই। কিন্তু নানারকম গোলমাল হচ্ছে রোজই। বাতাসে নানা কথা ওড়ে। তখন ছিল এতটুকু প্ল্যাটফর্ম, তার বাইরেই রাস্তা। সেইখানেই আমাদের জনাকয় ট্যাক্সিওয়ালা। বেশ ভালো জামাজুতো পরা, হাতে ব্যাগ, ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন। আমার কাছেই এলেন সরাসরি। বললেন, ‘গড়িয়াহাট যাব’।
গড়িয়াহাটের রেললাইন পার করে হালতুর কাছে নামলেন। আমাকে বললেন, ‘আমি আবার তিনটের ট্রেন ধরে ফিরব। তুমি কি আমারে নিয়ে যাবা?’ আমি আর আপত্তি করব কেন? রাজি হয়ে গেলাম।
তারপর চলল এইরকমই। সপ্তাহে তিনদিন ভদ্রলোক আসেন, আবার বিকেলের ট্রেন ধরে ফিরে যান। আমি ভাড়ার টাকাটা রোজ নিই না। গরিব লোক, ওই ক’টা টাকা কোথা দিয়ে হাত গলে যাবে। টানা কয়েকদিন এতখানি রাস্তার ভাড়া– জমা হলে একটু তো চোখে দেখা যাবে।
কথা হয়েছে, ওঁর কাজ শেষ হলে যেদিন থেকে আসা বন্ধ হবে, তখন আমাকে সবটা ভাড়া একসঙ্গে দিয়ে দেবেন। উনিও রাজি হলেন। তখন এরকম হত, বুঝলেন?
দেখি, লোক লাগিয়ে জঙ্গল কাটান। একপাশে একটা ইঁটের ঘর বানিয়েছেন। তার মধ্যে চেয়ার-টেবিল। জায়গাটা এক-একদিন দেখি মাপামাপি হয়। কিন্তু সে একেবারে কাদাজল-ভরা জায়গা। যেমন এপাশে হালতু, তেমনি এইপাশটা।
প্রায় মাসখানেক পরে একদিন ফেরার সময় বললেন, ‘তুমি মানুষটা ভালো। কোনওদিন জানতে চাও না যে এখানে আমি কী করি!’ আমি আর কী বলব, চুপ করেই থাকলাম।
উনি বললেন, ‘এই জায়গাটা আমি কিনেছিলাম অনেক কাল আগে। পড়ে ছিল। কিন্তু দেশে অশান্তি, এখন অনেক লোক যাদের উপায় আছে ওধার থেকে সব চলে আসবে। এইসব জায়গা বিক্রি হয়ে যাবে। সেই ব্যবস্থা করছি।’
খানিকক্ষণ পর হঠাৎ বললেন, ‘তুমি এখানে একটু জায়গা নেবে?’
আমি একেবারে অবাক। বলি, ‘এইসব জায়গার কত দাম! আমি কী করে নেব?’
‘অত বেশি কিছু দাম না। আমি তো এখনও কিছুদিন আসব। তোমার যে টাকা আমার কাছে জমা হচ্ছে, তার সঙ্গে আরও যে টাকা পাবে, তাতে হয়ে যাবে।’
তারপর খুব হাসলেন, ‘তোমাকে বাকিটা না হয় আমি সস্তায় দিয়ে দেব। নিয়ে নাও।’
রাজি হয়ে গেলাম। জমি-জায়গা বলতে তো কিছু নাই। আজ হোক না কাদাঝোপ, উনি তো বলছেন এইসব জায়গায় লোক এসে পড়বে। কেনা হয়ে গেলে আর খারাপ কী! আমি রাজি হতে একদিন একবিঘা জমির মালিকানা স্বত্বের এক কাঁচা কাগজ সই করিয়ে আমার হাতে দিয়ে দিলেন। আমিও ঘরে বলে সে দিলাম রেখে।
আরও কয়দিন পর সে ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার কাজ আপাতত শেষ হয়েছে। সব কাগজপত্র পাকা হয়ে গেল। এরপর লোক যদি কেনে তখন আবার আসা লাগবে। তোমাকে তোমার হিসাবপত্র বুঝিয়ে দেব।’
চলে যাওয়ার আগের দিন আমাকে জমি রেজিস্টারির রসিদ আর আরও শ’খানেক টাকা দিয়ে বললেন, ‘আমি বলি, এই টাকা দিয়ে ওইখানে একটা কাঁচাঘর দরজা করে রাখো।’…”

শিল্পী: শান্তনু দে

হাঁ করে শুনতে শুনতে সেলিমপুরের মুখ ছাড়িয়ে আনোয়ার শা’ রোডের লাইট। আমি জিজ্ঞেস না-করে পারলাম না, কী হল তারপর যোধপুর পার্কের সেই একবিঘা জমির? 

“হল আর কী! ছয় মাসের মধ্যে স্রোতের মতো মানুষ আসতে শুরু করল। কোনও খালি জায়গা আর বসত করতে বাকি থাকল না। সেই সময়ে আমার কাকার ছেলেরা সব এসে পড়ল ঘর-পরিবার নিয়ে। কারওর থাকার কোনও জায়গা নাই। তারা কোথা থেকে খবর নিয়ে এল, বনগাঁয়ের কাছে পাঁচ-সাতবিঘা মতন ফসলি জমি ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছে একঘর মুসলমান। বাঙাল মানুষ, চাষের জমির বড় খিদে। এইখানে কবে বাড়ি হবে, কে থাকবে! এই জমি বেচে নিয়ে নিলাম সেই জমি। তার মধ্যে এর দাম উঠেছে অনেক। খুড়তুতো ভাইয়েরা এখনও থাকে সেই বনগাঁতেই। আমার মা-বাবাও কিছুদিন ছিল। তারপর নিজের পরিবার হল। এই কাজ চলে না কলকাতা ছাড়া। কলকাতাতেই পাকাপাকি এখন।
এই যে দেখছেন আনোয়ার শা’ রোড, এ এরকম ছিল না। যাদবপুরের দিক থেকে যখন চওড়া করা হল, তার আগে ওই টালিগঞ্জের টিপু সুলতানের মসজিদের মোড় থেকে ওই রাস্তা ছিল অনেক সরু, এই থানার পিছনের জায়গায় ছিল একটা ছোট মাজার। সেটাকে বাঁচিয়ে রাস্তা চওড়া করা হল বলে এইখানটা একটু বাঁকা, দেখছেন তো…”

প্রায়ই এত আফশোস হয়, কেন যে মোবাইল নম্বরটা নিইনি! এত অবাক হয়ে শুনছিলাম, যে খেয়াল ছিল না। এ শহরের একজন আশ্চর্য গাইডের সঙ্গে সেদিন দেখা হয়েছিল আমার।

___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___

১৩. তুলি-কলমের বহুমুখিতা

১২. শিকড়ের খোঁজে ফেরা

১১. ইনি আমার মাসি, আর আমি এনার দিদি!

১০. অন্য এক ঘরের সন্ধানে

৯. সেই কবে একটা যুদ্ধ হয়েছিল

৮. যুদ্ধের যে গল্পে বীরত্ব নেই, মনখারাপ আছে

৭. কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!

৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা

৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি

৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই

৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান

২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের

১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম