Robbar

ইতিহাসের স্বর ও লিপি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 15, 2026 8:44 am
  • Updated:April 15, 2026 11:20 am  

গত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে তিনি ১০০ ছুঁলেন। সেইদিনই সতেজ সুরেলা কণ্ঠে হলভর্তি দর্শকের শোনালেন গান। গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনের মঞ্চে তাঁর বেহাগ রাগের পরিবেশন মিনিট চল্লিশ ধরে মুগ্ধ রেখেছিল উপস্থিত সকলকে। এই সেদিন অবধি তিনি ছিলেন সল্টলেক-নিবাসী, আপাতত এসে রয়েছেন পুত্রের বাড়িতে। দক্ষিণ কলকাতায়। সেই আবাসেই দিন কয়েক আগের এক বিকেলে, তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এল নানা কথা। নববর্ষের দিনে পাঠকদের জন্য রইল শতবর্ষীয় কিংবদন্তি, পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার।

স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

দীর্ঘ ১০০ বছর ধরে কলকাতার নানা ঠিকানায় আপনি থেকেছেন। শহরের নানা প্রান্ত শুনেছে আপনার রেওয়াজ, কণ্ঠ। উত্তর কলকাতার টেগোর ক্যাসেল স্ট্রিট থেকে বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিট– আপনার ছোটবেলার দিনগুলো ঠিক কেমন ছিল?

টেগোর ক্যাসেল স্ট্রিটে জন্ম হলেও, স্মৃতি নেই। ‘ছোটবেলা’ বলতেই মনে পড়ে বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিট। পাঁচ বছর বয়সে হাতেখড়ি, সেই সঙ্গে সা রে গা মা শেখারও শুরু। বাবা (সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) কাগজের টুকরোয় সা রে গা মা লিখে আঠা দিয়ে সেগুলিকে হারমোনিয়ামের পর্দায় জুড়ে দিলেন। সেই দেখে দেখে গানের পথ চলা শুরু। আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন। দিদি আর আমি একসঙ্গে রেওয়াজ করতাম। তিনতলা‌ বাড়ি। বাড়ির মালিক জানকীবাবু থাকতেন রাস্তার উপরের একটি বড় বাড়িতে।
এক মুসলমান ফকির আসতেন পাড়ায়। একহাতে জ্বলন্ত প্রদীপ আর অন্যহাতে চামর। তাঁকে খুব ভয় পেতাম। মা বলতেন, ‘ওই দ্যাখ, মুশকিল আসান আসছে। তোকে ধরিয়ে দেব।’ দুপুরবেলায় ‘ভালো নাচবি খাঁদিরে’ হেঁকে হেঁকে ফেরিওয়ালা আসত। রকমারি পসরা। রবারের তৈরি এরোপ্লেন, পাখি– এইসব খেলনা দেদার বিক্রি হত।

জানকীবাবুর বাড়ির একাংশ আর পাশের গলি।

তবে ছোটবেলায় দেখা সবকিছুই যে খুব সুন্দর, এমনটা বললে ভুল হবে। একবার দোলের দিন পাশের পাড়ার কয়েকজন মিলে একজন আলাভোলা গোছের লোককে পাকড়াও করে, এক হাঁড়ি বিষ্ঠা তার মাথার উপর চাপিয়ে, সেই হাঁড়ি সবাই মিলে লোকটির মাথার উপরেই ভেঙেছিল! নিজেদের জাতির উপর ঘেন্না ধরে যাওয়ার মতো ঘটনা। এসব আকছার ঘটত তখন।

বিষ্ণুপুর ঘরানার সংগীতের ঐতিহ্য সুপ্রাচীন

সব মিলিয়ে একটা অন্যরকম সময়। তখন ছুটি পড়লেই সপরিবার যেতাম দেশের বাড়ি, বিষ্ণুপুরে। ওখানকার খোলামেলা আবহাওয়া, গড়, টেরাকোটার মন্দির, গানের আবহ– এসব কিছুদিন ভালো লাগলেও, ক’দিন বাদ থেকেই কলকাতার জন্য ভীষণ মনকেমন করত।

শৈশবের রঙিন দিনগুলিতে বিষ্ণুপুরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে অমিয়রঞ্জন (নভেম্বর, ১৯৩৬)*

ছেলেবয়সের আরেকটা ঘটনাও খুব মনে পড়ে, ১৯৩৪ সালের ভয়ংকর ভূমিকম্প! কলকাতায় তা টের পাওয়া গেলেও মুঙ্গের একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি মুঙ্গের গিয়েছিলাম তার অনেকটা পরে। তখনও পর্যন্ত এরকম বিপর্যয় চাক্ষুষ দেখার সুযোগ হয়নি। গিয়ে দেখি মুঙ্গের সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ! ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে কেবল। হাতে-গোনা কয়েকটি বাড়ি গোটাগুটি রয়েছে।

১৯৩৪ সালের ভয়ংকর ভূমিকম্পের পর মুঙ্গের শহর

বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিট সোজা গিয়ে যেখানে বিডন রো-র সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে, সেখানে ছিল প্রচুর বড়লোকদের বাস। ডানদিকে ভদ্রপাড়া আর তার ঠিক উল্টোদিকে প্রচলিত ভাষায় ‘খারাপ পাড়া’। আমাদের বাড়ির একজন কাজের লোক, সে খুব জানত– বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিট দিয়ে যদি বিডন পার্কে যাই তাহলে তা দিব্য যাওয়া যায়, কিন্তু সে ইচ্ছে করে ও-পথে না-গিয়ে আমাদের ওই ‘খারাপ পাড়া’ (গরানহাটার রাস্তা) দিয়েই রোজ বিকেলে পার্কে নিয়ে যেত। আমি দেখতাম, ওই পথে প্রায় প্রত্যেকটি বাড়ি লোকে বোঝাই। মেয়েরা সেজেগুজে রাস্তায় সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখন সব বুঝতাম না, কিন্তু ব্যাপারটা গোলমেলে, সে আভাস টের পেতাম। অদ্ভুত বৈপরীত্য! একদিকে দেহোপজীবিনীদের হাতছানি, অন্যদিকে নিস্তরঙ্গ মধ্যবিত্ত জীবন। এরই মাঝবরাবর অবস্থিত ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে পড়াশুনো করত উত্তর কলকাতার ছেলেপুলেরা।

ওরিয়েন্টাল সেমিনারি

আপনি নিজেও তো ওরিয়েন্টাল সেমিনারির ছাত্র ছিলেন। স্কুলজীবন কেমন ছিল আপনার?

হ্যাঁ, আমি বেশ কিছুদিন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে পড়ার পর ক্লাস এইটে অন্য স্কুলে চলে যাই। শ্যামবাজারের পার্ক ইন্সটিউশন। যাই হোক, ওরিয়েন্টালের সে সময়ে খুব দাপট! বিরাট তিনতলা বিল্ডিং, বাঘা বাঘা সব মাস্টারমশাই পড়াতেন সে ইশকুলে। ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে পড়াশুনোর পাশাপাশি খেলাধুলোর খুব চল ছিল। ইশকুল ছিল নিজস্ব খেলার মাঠ। ফুটবল গ্রাউন্ড, ব্যাডমিন্টন কোর্ট– দুই-ই ছিল, সেইসঙ্গে আলাদা জিমন্যাশিয়াম। ফলে বিকেলটা বেশ এনজয় করতাম আমরা। ফুটবল গ্রাউন্ডেই বেশিরভাগ সময়টা কাটত। ইশকুলের স্পোর্টসও ছিল দেখার মতো। কীভাবে যেন স্কুলে চাউর হয়ে গিয়েছিল যে, আমি গাইয়ে বাড়ির ছেলে। ব্যস, পরদিনই একজন স্যর এসে ধরেছেন– ‘অ্যাই, তোর বাবাকে এই গানটা দিবি, দিয়ে বলবি এতে সুর বসিয়ে দিতে। আর তুই এটা গাইবি স্কুলের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামে।’ গানটার কথাগুলো এখনও মনে আছে, ‘আয় তোরা কে পাগল হবি।’ বাবা সে গানে সুর করে দিয়েছিলেন আড়ানা-র উপর। মুশকিল বাধল অনুষ্ঠানের দিনে। আমার ডাক পড়েছে যথাসময়ে। স্টেজে গাইতে হবে আমায়। ভয়ে ভয়ে মঞ্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। এমন সময় চোখের সামনে থেকে পর্দা উঠে গেল। এ কী! দর্শকাসন যে লোকে লোকারণ্য! দেখে আমি রীতিমতো নার্ভাস! ঘাবড়ে গিয়ে পড়িমড়ি সোজা উইংসের দিকে দৌড়! কিন্তু বিধি বাম। শিক্ষক এবং অন্যান্য লোকজন তাড়া দিয়ে ফের আমায় স্টেজেই ঠেলে দিলেন। বিষম পরিস্থিতি। আমি একবার এগিয়ে, আবার পিছিয়ে, শেষমেশ স্টেজের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে কোনওমতে গানটা গাইলাম। গান যেমনই হোক, অনেকের ভালো লেগেছিল। প্রাইজ-টাইজও পেয়েছিলাম সেদিন।

অমিয়রঞ্জন, তখন ক্লাস সেভেনের ছাত্র

অপূর্ব সব শিক্ষক পেয়েছি। তাঁদের মধ্যে খুব মনে পড়ে ভূষণচন্দ্র রায়ের কথা। উনি ছিলেন আমাদের হেডমাস্টারমশাই। শর্ট-হাইট, কিন্তু চেহারার মধ্যে গাম্ভীর্য ছিল খুব। আমরা ভয় পেতাম। স্যররা ছিলেন ভয়ানক কড়া, তাঁদের শাসনের বহরও ছিল তেমনই। হয়তো ক্লাসে কোনও একটি ছাত্র বানান ভুল করেছে, অমনি স্যরের হাঁক শোনা যেত, ‘অ্যাই গোবিন্দা, বেঞ্চের উপর! বেঞ্চের উপর!’ অর্থাৎ বেঞ্চের উপর উঠে দাঁড়ানোর নির্দেশ। ছেলেটি মুখ চুন করে বেঞ্চে উঠে দাঁড়াতেই, আরেকটি ছাত্রকে স্যর ডেকে বললেন, ‘ও কিচ্ছু বানান শেখেনি, ওর কান মুলে দে।’ অন্য ছেলেটি জো পেয়ে এমন জোরে কান মুলেছে যে গোবিন্দর চোখ বেয়ে দরদর করে জল। পরে গোবিন্দ ধাতস্থ হয়ে বলেছিল, ‘আমারও টার্ন আসবে, তখন দেখে নেব!’ এখন এসব ভাবলে গল্পকথা বলে মনে হয়। 

আর ছিল ‘গাধার টুপি’ মাথায় পরানো। কথায় কথায় এই শাস্তি বরাদ্দ হত তখন। সেই টুপি পরিয়ে দোষী ছাত্রদের ইশকুলের গোটা হলঘর ঘোরাতেন একজন মাস্টারমশাই। অন্যান্য ছাত্র সব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত আর হাসত। তখনকার দিনে এমন সব অদ্ভুত ব্যবস্থা ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে।

অতীতের পার্ক ইনস্টিটিউশন

আপনাদের বাড়ি গানের বাড়ি। বাংলার একমাত্র ধ্রুপদী সংগীত ঘরানার উত্তরাধিকারী আপনি। মল্লরাজার সভাসদের উত্তরসূরি আপনার পিতা ছিলেন প্রদ্যোৎকুমার ঠাকুরের সভাগায়ক। বিষ্ণুপুর ঘরানার ইতিহাস, আপনার নিরবচ্ছিন্ন চর্চা এবং বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের সংগীত-শিক্ষার বহমান ধারা সম্বন্ধে যদি বলেন…

শুধু তাই-ই নয়, আপনাকে বলি, আমার দাদু, বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবাদপুরুষ, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছিলেন বর্ধমান মহারাজার সভাগায়ক। ওরকম পণ্ডিত লোক আমি দেখিনি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ভয়ংকর শ্রদ্ধা করতেন দাদুকে। দাদু আমায় অসম্ভব স্নেহ করতেন। একদিন আমি আবদার করে বললাম, ‘দাদু, আপনি কেদার রাগের উপরে একটা গান আমাকে দিন। এমন গান, যা আমার বাবা অথবা কাকা (রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়) জানেন না, এবং কোনও বইয়েও যে গান লেখা নেই!’ দাদু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সে গান গেয়ে শুনিয়ে দিলেন, তারপর বললেন, ‘লেখো, গানের কথাগুলো মন দিয়ে লিখে নাও।’ আমিও দ্রুতবেগে সে গানখানা নোট করে নিলুম– ‘ও জানে না রে, এরি মায়ে আপন কো’। এ যে কত বড় সম্পদ আমার কাছে!

বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রবাদপুরুষ, পণ্ডিত গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার ছোটবেলা থেকেই দাদুর এই বিপুল খ্যাতির বহরটা আমি টের পেয়েছিলাম। বিশেষ করে একটি করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলতেই হয়– তখন দাদু ছ’ নম্বর বার বিবাহ করেছেন। একটি প্রথম সারির দৈনিকে সে খবর ফলাও করে ছেপেছে। পরদিন স্কুলে গিয়ে ক্লাসে ঢুকতেই মাস্টারমশাই হেসে হেসে বলে উঠলেন, ‘কী রে, তোর দাদু এ কী কাণ্ড করল? শেষে ৬০ বছর বয়সে গিয়ে আবার বিয়ে!’– পুরো ক্লাসের সামনে এমন কথা শুনে আমি একেবারে অপ্রস্তুত। কী বলব, বুঝতেই পারছিলাম না। সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। এর বহু পরে, যখন আমি শাস্ত্রীয় সংগীতের অধ্যাপনা করি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে, তখন শেষ বয়সে দাদুকে একবার হুইলচেয়ারে করে আনা হয়েছিল ক্যাম্পাসে। ওঁকে দেখতে ভিড়ে ফেটে পড়েছিল জোড়াসাঁকো চত্বর।

তানসেন বংশের গায়ক বাহাদুর খাঁ

যতদূর জানি, তানসেন বংশের একজন গায়ক বাহাদুর খাঁ-র হাত ধরে বিষ্ণুপুর ঘরানার সূত্রপাত ঘটে। সে সময়ে ধ্রুপদের চর্চা শুরু হয়, এরপর রামশঙ্কর ভট্টাচার্যের গায়নশৈলীর হাত ধরে বাংলার একমাত্র সংগীত ঘরানা পরিপূর্ণ রূপ পায়। তারপর ক্রমানুযায়ী অনন্তলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়দের প্রতিভায় ভিত শক্ত হয় এই ঘরের।

পণ্ডিত রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

যে-কথা আগেই বলছিলাম, আমি ছোটবেলা থেকে বাবার কাছেই গান শিখেছি। সেতার শিখেছি। বাবা রোজ আমাকে নিয়ে বসতেন। ছোট থেকেই ভালো ভালো গান শোনার সুযোগ পেয়েছি। বাবা ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন। তামাক খেতেন গড়গড়ায়, নলের মুখে ছিল রুপোর হাতি খোদাই করা নকশা। যেদিন অনুষ্ঠান থাকত, সেদিন দুপুর থেকে বাবা নিজের হাতে কাপড় কুঁচোতেন। একটা পাল্লাদার শাল গায়ে দিতেন, যার দাম সেই আমলেই ছিল হাজার টাকা। শিকারের শখ ছিল, সেজন্য ওয়েবলি স্কটের একটি ডাবল ব্যারেল বন্দুকও ব্যবহার করতেন। রাগ চেনানোর জন্য বাবার একটা সুন্দর ও সহজ পদ্ধতি ছিল– যে রাগগুলো শিখেছি, তার থেকে একটা মনে মনে বেছে নিয়ে এসরাজে বাজিয়ে বলতেন, ‘বল তো এটা কোন গানের মতো?’ হয়তো বললাম, এটা ‘সুমরন কীজে রামচন্দ্রকো’-র মতো, বাবা খুশি হয়ে বলতেন, ‘মনে রাখবি, একে ইমন বলে, ভুলিসনি।’ বাবার হাতের লেখায় আমার ছেলেবেলাকার গানের খাতাটি সযত্নে রেখে দিয়েছি। তাতে প্রতি রাগের আরোহণ, অবরোহণ, বাদী-সম্বাদী, গাওয়ার সময় ও রূপ লেখা আছে। তার সঙ্গে আছে গান আর ছোট ছোট তানও। খাতাটির ঐতিহাসিক মূল্য আমার কাছে অপরিসীম।

তরুণ বয়সে অমিয়রঞ্জনের পিতা, পণ্ডিত সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়*

কোনও দিন ভালো গাইতে পারলে বাবা বলতেন, ‘দ্যাখ, কী সুন্দর শুদ্ধ সুর লাগিয়েছিস– এইটাই হচ্ছে আসল গান।’ আবার মারধরও খেয়েছি। একবার পঞ্চম ঠিক করতে গিয়ে উল্টে খরজে চাপ পড়ে গেল। বাবার হাতে তখন একটা হাতুড়ি ছিল– সরাসরি মাথায় ফটাস্ করে মারলেন! আমি এমন চিৎকার করলাম যে, মা দৌড়ে চলে এলেন। মা আসতেই বাবা বললেন, ‘দাঁড়িয়ে কী দেখছ? যাও, বরফ নিয়ে এসো।’ আর একদিন রাতে বাড়ি ফিরে বাবার প্রথম প্রশ্ন– ‘অমিয় গান সেধেছে আজ?’ মা বললেন, ‘না।’ ব্যস, অমনি চুলের মুঠি ধরে ঘুম থেকে টেনে তুলে বাবা আমায় বসিয়ে দিলেন রেওয়াজে। তখন এমনই শাসন ছিল…

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ

এইরকম কঠোর শাসন যে শুধু আমাদের বাড়িতেই বা ঘরানাতেই ছিল তা নয়– একবার সরোদিয়া শ্যাম গঙ্গোপাধ্যায় নিজের কপালের দাগ দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এই দাগটা দেখছ? আলাউদ্দিন খাঁ-এর লাঠির ঘায়ে হয়েছে।’ ওঁর থেকে শুনেছিলাম, একবার মাইহারে বাবা আলাউদ্দিন খাঁ শ্যামবাবুকে বলেছেন কয়েকটি বোল সরোদে অভ্যাস করতে। শ্যামবাবু তা করেননি। সপাটে লাঠির বাড়ি পড়ল মাথায়! আলাউদ্দিন হুকুম জারি করলেন, সেদিন শ্যামবাবুর খাওয়া বন্ধ। শাস্তি হিসেবে সারারাত ধরে রেওয়াজ করতে বলে ওঁকে ঘরে বসিয়ে, বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে চলে গিয়েছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ। তারপর ঘণ্টাখানেক কেটেছে, এমন সময় শ্যামবাবু খেয়াল করলেন তালা খোলার আওয়াজ। ঘরে ঢুকলেন গুরু আলাউদ্দিন। শিষ্যের দিকে তাকিয়ে করুণ হেসে বললেন, ‘আমিও আজ খাইনি রে।’ ভাবতে পারা যায়! এ অন্য জগৎ। এমন গুরু-শিষ্যের যোগ আজকের দিনে কোথায় হবে? সে পরিবেশ, পরিস্থিতি, সে মানসিকতা এবং সর্বোপরি অমন অসীম প্রতিভাধর শিল্পীরাও আজকের দিনে আর নেই।

ব্যক্তিগত কথনভঙ্গিমা। ছবি: সুখময় সেন

আপনি যে স্কুলে পড়েছেন, ঘটনাচক্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সেই বিদ্যালয়েরই প্রাক্তনী। রবীন্দ্রনাথকে আপনি জীবদ্দশায় কখনও চাক্ষুষ দেখেছেন?

জীবদ্দশায় ওঁকে স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। যদিও রবীন্দ্রনাথ এবং ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে আমাদের পরিবারের ওতপ্রোত যোগাযোগ ছিল‌। তবে ওঁর শেষযাত্রা দেখেছি। মৃত্যুদিনটা ভীষণরকম স্পষ্ট মনে আছে। ১৯৪১, আগস্ট মাসের ৭ তারিখ। খবরের কাগজে রোজই বেরচ্ছে রবীন্দ্রনাথের শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর। তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। সেদিন স্কুলে গিয়েই টের পেলাম অবস্থা অন্যদিনের তুলনায় অনেক বেশি থমথমে। এগারোটা-সাড়ে এগারোটা থেকেই ছোটাছুটি বাড়ল। স্কুলে টেলিফোন ছিল না, ছিল স্কুল সেক্রেটারির বাড়িতে, পাশেই। দু’-চারজন করে ছুটে যাচ্ছে খবর জানার জন্য। টেলিফোন লাইন তখন পাওয়া দায়, এদিকে ওই একটি লাইনের প্রবল চাহিদা। তাই অপারেটর নিজেই জানিয়ে দিচ্ছিল– ‘টেগোরস্ কন্ডিশন ইজ সিরিয়াস’। প্রথমের দিকে খবর ছিল এই। সুর পালটে গেল খানিকক্ষণের মধ্যেই– ‘টেগোরস্ কন্ডিশন ইজ্ গ্রেভ্’– এর কিছু পরেই বজ্রাঘাতের মতো এল ঘোষণা– ‘টেগোর ইজ্ নো মোর’। হ্যারিসন রোড আর সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ঠিক জাংশনে একটা বাড়ি ছিল, হয়তো এখনও আছে। ওই বাড়ি থেকেই অপারেটররা টেলিফোন রিসিভ করত এবং লাইন জয়েন করত। যাই হোক, স্কুলে খবরটা আসতেই পরিবেশ বদলে গেল। আমাদের বাংলার স্যর, আশুবাবু খবর শুনেই বলে উঠলেন, ‘এই যে রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন, আগামী ১০০ বছরের মধ্যে এমনটি আর কেউ আসবেন না।’ স্কুল ছুটি হয়ে গেল। আমরা চার-পাঁচজন ছাত্র ছুটলাম। জোড়াসাঁকোয় পৌঁছে ভিড় ঠেলে কোনওমতে উঠলাম মহর্ষি ভবনের দোতলায়। যে-ঘরে রবীন্দ্রনাথ শায়িত সে ঘরে চেষ্টা করেও ঢুকতে পারলাম না‌। প্রবল ভিড়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টাও পুরোপুরি সফল হয়নি। শেষমেশ বারান্দায় একপাশে এসে দাঁড়ালাম। চোখের সামনে দেখলাম বিচিত্রা ভবনের লোহার গেট একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল ভিড়ের চাপে। আশ্চর্য ব্যাপার, রবীন্দ্রনাথের মরদেহ হঠাৎই একেবারে তড়িঘড়ি করে বের করে নিয়ে যাওয়া হল দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলি দিয়ে সোজা ট্রামরাস্তায়। আমরাও দৌড়লাম। দেখি শবযাত্রা বাঁদিকে ঘুরে গেল আদি ব্রাহ্ম সমাজের দিকে। তখন আমরা গণেশ টকিজের পথ ঘুরে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের দিকে। একটা গাড়িবারান্দার তলায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ ততক্ষণে খবর পেয়েছি, এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একরাশ জনতার ভিড় নিয়ে আমাদের চোখের সামনে ইউনিভার্সিটির দিকে চলে গেল রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রা।

শেষযাত্রায় রবীন্দ্রনাথ (১৯৪১)


কিন্তু যতটা ভিড় বলা হয়, ততখানি জনসমুদ্র হয়নি কবিগুরুর শেষযাত্রায়। অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের পথেও কিন্তু সারা কলকাতা ভেঙে পড়েনি। বরং এর পরের পর্বেই হয়েছিল চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা– একদল লোক বেলাগাম বর্বরতার সঙ্গে মরদেহের থেকে দাড়ি ছিঁড়ে নিয়েছিল। সেসব খবর আমরা পরে পেয়েছি। যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে জনসমাগমের চেয়ে পরবর্তী সময়ে বিধানচন্দ্র রায়ের শেষযাত্রায় অনেকগুণ বেশি মানুষ যোগ দিয়েছিলেন বলে আমার ব্যক্তিগত ধারণা।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সময়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কলকাতায় বোমা পড়ে তার পরের বছর। সেই সময়ের কোনও বিশেষ ঘটনা আপনার মনে পড়ে? কেমন ছিল সার্বিক পরিস্থিতি?

ততদিনে আমরা বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিট থেকে চলে এসেছি ২৫-ই বলরাম বসাক স্ট্রিটে। আমি তখন মাঝেমধ্যেই সিনেমা দেখতে যাই, বাড়িতে লুকিয়ে। অশোক কুমারের হিন্দি ফিল্ম দেখেছি প্যারাডাইসে, ছবি বিশ্বাসের ‘প্রতিশ্রুতি’ ছবিটা সিনেমা হলে বার তিনেক দেখা হয়ে গিয়েছে। ছবিবাবুর অ্যাক্টিং, ওঁর স্টাইল নকল করতে তখন আমাদের প্রজন্ম পাগল। অতটা প্রভাব আমাদের মধ্যে বোধহয় উত্তমকুমারও বিস্তার করতে পারেননি। পাশাপাশি গানের অনুষ্ঠানও শুনতে যাচ্ছি নিয়মিত।

ছবি বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি (১৯৪১) ছায়াছবির বুকলেট

একদিন কলেজ স্ট্রিটের অ্যালবার্ট হলে (আজকের কফি হাউস) সরস্বতী রাণের গান শুনতে গিয়েছি। গান শুনে শ্রোতারা মুগ্ধ। এমন সময় অনুষ্ঠানের এক উদ্যোক্তা মঞ্চে উঠে ঘোষণা করলেন, ‘একটা খারাপ খবর আছে। ব্রিটেন জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।’ খবরটা শোনামাত্র সকলের মধ্যে থাকা আনন্দের ভাবটা যেন হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেল। পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হল। বোমার আতঙ্কে তখন কলকাতা কাঁপছে। রোজ সন্ধের সময় উৎকণ্ঠা। একদিন সত্যি সত্যি সাইরেন বেজে উঠল। বাড়িতে ধড়ফড়িয়ে সকলে নেমে এলাম সিঁড়ির তলায়‌‌। কানে তুলো গুঁজে জড়োসড়ো। হঠাৎ মনে হল প্লেনের আওয়াজ পাচ্ছি, শব্দটা বাড়ছে। কানে এল খানিক দূরে বিকট ‘বুউউম’ আওয়াজ। সে প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়! খানিক বাদে প্লেনের আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। অল ক্লিয়ার পেতে খানিক হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সবাই। পরদিন ঘুম ভাঙতেই শুনি– হাতিবাগানে বোমা পড়েছে। আমাদের বাড়ি থেকে সাত-আট মিনিটের পথ। ছুটলাম সেখানে। চারপাশে লোকের ভিড়। হাতিবাগান বাজারের মাঝখানে ছাদে একটা বড় আকারের গর্ত হয়ে গিয়েছে। খবর পেলাম, একজন আলুওয়ালা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, তার হাতের একখানা আঙুল নাকি বোমায় উড়ে গিয়েছে। বোমায় যে ধ্বংসস্তূপ দেখব বলে ভেবেছিলাম, ততটা গুরুতর ক্ষয়ক্ষতি চোখে পড়েনি। কিন্তু কলকাতায় রাতারাতি ইভ্যাকুয়েশন শুরু হয়ে গেল। সব লোক পালাচ্ছে কলকাতা ছেড়ে। যাদের দেশ আছে তারা দেশে, যাদের নেই তারা মফস্‌সলের কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে। আমরাও পাততাড়ি গুটিয়ে চললাম বিষ্ণুপুর।

কলকাতায় সে সময় বোমার ভয়ে জারি করা হয়েছিল এইরকম সতর্কীকরণ

বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে বিকেলবেলায় ঘোড়ার গাড়িতে রওনা হওয়া গেল। বড়বাজারে এসে মনে হল, কলকাতা বুঝি সেদিনই খালি হয়ে যাবে। ঘোড়াগাড়ির মিছিল চলেছে হ্যারিসন রোডের উপর দিয়ে। গাড়ির মাথায় মাথায় মালপত্র ঠাসা। সবাই ছুটেছে হাওড়া স্টেশনের দিকে। স্টেশনে এক মজার ব্যাপার হয়েছিল, আমার ঠাকুমা ছিলেন সঙ্গে, ওঁকে দেখে ট্রেনে এক মেমসাহেব আমায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘হু ইজ শি?’ ইংরেজি জানলেও বলায় অতটা সড়গড় ছিলাম না। এদিকে কত্তামার ইংরেজিটা ভুলে মেরেছি, কোনওমতে বললাম, ‘শি ইজ মাই ফাদারস্ মাদার!’ মেমসাহেব হেসে বললেন, ‘ওহ্, ইয়ু মিন গ্র্যান্ডমাদার?’ আমার তখন খানিক আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে, মাথা নেড়ে বললুম, ‘ইয়েস।’

চারের দশকে কলকাতার হ্যারিসন রোড

বাবা তখনই আমাদের সঙ্গে যাননি, ওঁর সেদিন রেডিও প্রোগ্রাম ছিল‌। কিন্তু এমনই বরাত, সেদিন রাতেই বোমা পড়ল রেডিও স্টেশনের খুব কাছে, বাবা অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন। সেবার বিষ্ণুপুরে পৌঁছে দেখা গেল আমাদের গোটা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রায় সকলেই এসে হাজির হয়েছেন পৈতৃক ভিটেয়। ওই যুদ্ধের আবহে বিষ্ণুপুরের ওস্তাদ পাড়া যেন হঠাৎ করেই তার জৌলুস ফিরে পেল। এত গাইয়ে-বাজিয়ের সমাগমে সুরে ভরপুর হয়ে উঠেছিল বিষ্ণুপুর।

কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা (১৯৪৬)

কলকাতায় ফিরে আসার কয়েক বছরের মধ্যে দেখলাম মন্বন্তর, চারিদিকে দু’মুঠো চালের জন্য হাহাকার। ‘ফ্যান দাও, ফ্যান দাও’ হাঁকে ভরে গিয়েছিল কলকাতার অলিগলি। গলা দিয়ে খাবার নামতে চাইত না সে সময়ে। সেই ক্ষত শুকনোর সময় পেল না, বেধে গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সে এক ভয়ংকর সময়। চোখের সামনে নিরীহ এক মুসলমানকে নির্মমভাবে খুন হতে দেখেছি রামধন মিত্তির লেনের কাছে। তখন বয়স পরিণত হওয়ায় এ জাতীয় ঘটনা মনকে ভীষণরকম নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। তারও অনেকটা পর স্বাধীনতা এসেছিল এক মধ্যরাতে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার, এই এতরকম পট-পরিবর্তনের মাঝেও আমার গানের চর্চা কিন্তু কখনও থেমে থাকেনি।

সংগীত পরিবেশনরত প্রবাদপ্রতিম তারাপদ চক্রবর্তী

কোন কোন শিল্পীর প্রভাব আপনার গায়নশৈলীতে সবচেয়ে বেশি? আপনার সুদীর্ঘ শিল্পীজীবন এবং কর্মজীবনে একাধিক নক্ষত্রের সংস্পর্শে আপনি এসেছেন, সেইসব স্মৃতি থেকে কিছু যদি বলেন…

তারাপদ চক্রবর্তী আর আমির খান– এই দু’জনের কথাই প্রথমে মনে পড়ে। আমির খানের গান প্রথমবার শুনে আমি তো একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এত সূক্ষ্মভাবে, এত গভীরে গিয়ে গান করা– এভাবে খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছেন। সত্যিই আশ্চর্য গায়কি। আসলে গাইয়ে বাড়ির ছেলে হলে যে রকম করে সংগীতের ভিতরে ঢোকা যায়, সেই সুযোগ অন্যদের খুব একটা হয় না– এই বিশ্বাসটা তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল। বাড়িতে বাবা একটা গ্রামোফোন কিনেছিলেন, আর সেটা চালাতেন আমার কাকা– আমি তখন নিজে চালাতে পারতাম না। একদিন ফৈয়াজ খাঁ-র একটা রেকর্ড বাজালেন। যেভাবে তিনি সা-কে আন্দোলিত করে কোমল রে ছুঁয়ে রাগ টোড়ির রূপটা তুলে ধরলেন, সেটা শুনে দেখি কাকা যেন কেঁপে উঠলেন। তখনই প্রথম বুঝলাম, এই হচ্ছে সত্যিকারের ভালো গান। ভালো গানের এমনই মানসিক প্রভাব পড়ে– এই শিক্ষাটা সেখান থেকেই। ফৈয়াজ খাঁ-র গান শুনেও নকল করতে খুব ইচ্ছে হত, কিন্তু বুঝতে পারতাম ও জিনিস সহজে হওয়ার নয়। অসাধারণ সে গায়কি!

উস্তাদ আমির খান

গ্রামোফোন আসার পর থেকেই আসল শেখা শুরু– কাকে ভালো বলা হয়, কাকে মন্দ, সেই বোধ তৈরি হতে লাগল। ফৈয়াজ খাঁ, আব্দুল করিম খাঁ, নারায়ণরাও ব্যাস, পটবর্ধনের গান, এনায়েৎ খাঁ-র সেতার, ইমদাদ খাঁ-র সুরবাহার– এই সব শুনেই ভিত গড়ে উঠেছিল। ক্লাসিক্যাল গানের পাশাপাশি বাংলা আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, পুরাতনী গানও খুব শোনা হত। আঙুরবালা, ইন্দুবালার গান আমার মা শুনতে খুব ভালোবাসতেন। ‘সাঁঝের তারকা আমি পথহারা হে’, ‘যদি চিরসুন্দর নাহি হবে গো’, ‘ফুলের বনে যায় রে চলে দিনগুলি’ বা ‘আমার জীবন নদীর ওপারে’ গানগুলি ছিল ভীষণ প্রিয়। বাবার এক ছাত্র, প্রতাপদা, খুব ভালো কত্থক নাচ জানতেন, গাইতেনও চমৎকার। প্রতাপদার গলায়  ‘যতনে গাঁথা মোর কুসুমমালা, দিও না ফেলে’ গানটিও বারবার শুনতে ইচ্ছে হত। তারপর তো পঙ্কজকুমার মল্লিক, কমল দাশগুপ্ত তাঁদের সুরের ঝরনাধারায় ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন আমাদের কৈশোর। ওয়েস্টার্ন কর্ড মিলেমিশে গেল ভারতীয় গানে। একটা সময় গলার কম্পন বা ‘ট্রেমেলো’ খুব জনপ্রিয় হয়েছিল জগন্ময় মিত্রের মতো নামকরা শিল্পীদের গায়নের দৌলতে।

বাংলা গানের রথী-মহারথী: (বাঁ-দিক থেকে) পঙ্কজকুমার মল্লিক, কমল দাশগুপ্ত, মিস্ আঙুরবালা, মিস্ ইন্দুবালা, জগন্ময় মিত্র

একবার হীরাবাই বরদেকর-এর গান ছিল ভদোদরার মিউজিক কলেজে। সেখানে নানাজি নামে এক ভদ্রলোক এমনভাবে মাথা নেড়ে যাচ্ছিলেন– মনে হচ্ছিল, মাথাটা বুঝি খুলেই যাবে! গান শেষ হতেই তিনি বললেন, ‘অভি আপ মেহেরবানি করকে জয়জয়ন্তী শুনাইয়ে।’ তখন হীরাবাই বললেন, ‘তো ম্যায়নে ক্যায়া শুনায়া!’ অর্থাৎ, এতক্ষণ তবে কী শুনলেন!

মার্গসংগীতের নক্ষত্ররা:(বাঁ-দিক থেকে)ফৈয়াজ খাঁ, নারায়ণরাও ব্যাস, আব্দুল করিম খাঁ, বড়ে গুলাম আলি খাঁ, হীরাবাই বরদেকর

অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্স নিয়ে একটা গল্প বলি। এটা শুনেছিলাম ভলেন্টিয়ার বীরেশ রায়ের থেকে। তখন এই প্রোগ্রাম হত কলেজ স্ট্রিটের কাছেই এক সিনেমাহলে। সেখানে এসে একদিন বড়ে গুলাম আলি খাঁ জিজ্ঞেস করলেন, ‘লালাবাবু (দামোদর দাস খান্না) কোথায়? ওঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ সংস্থার একজন জানালেন, লালাবাবু ভেতরে আছেন। তিনি ভেতরে গিয়ে দাঁড়াতেই লালাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কে?’ বড়ে গুলাম আলি বললেন, ‘গুলাম আলি খাঁ। লাহোর থেকে এসেছি। আপনাকে চিঠিও দিয়েছিলাম– মনে নেই?’ লালাবাবু তখন বললেন, ‘এই বছর আর প্রোগ্রাম হবে না, আগামী বছরে হবে।’ গুলাম আলি অনুরোধ করলেন, ‘এত দূর থেকে এসেছি, আমায় খালি হাতে ফিরিয়ে দেবেন?’– অবশেষে কোনওভাবে তিনি সুযোগ পেলেন। সেদিন আগে হাফিজ আলি খাঁ-র সরোদ শেষ হল। তারপর গুলাম আলির গান হওয়ার কথা। কিন্তু হাফিজ আলি উঠে যেতেই পর্দা নামল, আর গুলাম আলি মঞ্চে এসে দেখলেন– পুরো হল ফাঁকা, একজন শ্রোতাও নেই। তবু তিনি ভীমপলশ্রী ধরলেন। কী অপূর্ব সুর! এক আবর্তন শেষ করে চোখ খুলে দেখেন, পুরো হল ভরে গেছে। এই জায়গাটাই আসল, অহংকার থাকলে এমন করে গাওয়া যায় না। তাই শিল্পীর জন্য নিরহংকারী হওয়াটা খুব জরুরি।

বলছেন শতবর্ষীয় অমিয়রঞ্জন। ছবি: সুখময় সেন

আপনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের পাশাপাশি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের প্রতি এক আশ্চর্য অনুসন্ধিৎসা বজায় রেখেছেন প্রথম থেকেই। সেই জানার আগ্রহ থেকেই কি মেডিকেল কলেজে যেতেন পাঁচের দশকে? সংগীতের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাও কি এসেছিল সেই পথেই?

শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, শশীভূষণ দাশগুপ্তের মতো শিক্ষকদের ক্লাস করার সুযোগ হয়েছিল আমার। ফলে মনের মধ্যে গভীর সাহিত্যবোধ যে তৈরি হয়েছিল এতে কোনও সন্দেহ নেই। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষা আর শব্দের ব্যবহার আমাকে ভীষণ টানত। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ভাষণে সেই একই ঝলক আমি পাইনি। তিনিও অত্যন্ত সুন্দর লেকচার দিতেন, কিন্তু শ্রীকুমারবাবুর ভাষার যে আকর্ষণ, তা আলাদা। একবার শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষে একটি সভায় শ্রীকুমারবাবুর বক্তৃতা শোনার সুযোগ হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স অনেকটাই হয়েছে, তবুও ভাষার সেই দীপ্তি একটুও ম্লান হয়নি। আমরা প্রত্যেকে স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম।

(বাঁ-দিক থেকে) সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুকুমার সেন

সেই সঙ্গে সুকুমার সেনেরও নাম করতে হয়। অমন পণ্ডিত মানুষ খুব কমই দেখেছি। গানচর্চা করতে গিয়ে তার নেপথ্যের বিজ্ঞানের প্রতি অসীম আকর্ষণ অনুভব করেছিলাম। প্রখ্যাত সংগীত-পরিচালক নচিকেতা ঘোষ ছিল আমার বন্ধুস্থানীয় এবং ডাক্তারির কৃতী ছাত্র। এইসব মিলিয়েই চলে যেতাম আর জি কর মেডিকেল কলেজে। বইপত্র ঘেঁটে বুঝতে চেষ্টা করতাম স্বর-প্রক্ষেপের প্রক্রিয়া। একদিন ওই মেডিক্যাল কলেজে বসেই বই থেকে এঁকে এনেছিলাম কান আর গলার ছবি। গান গাইব আর তার রহস্য জানব না তা কি হয়!

পাঁচের দশকে আর জি কর হাসপাতালে বসে অমিয়রঞ্জনের আঁকা কান গলার অভ্যন্তরীণ গঠনের ছবি।*

পিএইচডি-র গবেষণা শুরু করি এরও অনেকটা পরে। ততদিনে অধ্যাপনার জগতে পুরোপুরি জড়িয়ে গিয়েছি। ডিগ্রি কোর্সের ক্লাস পুরোদমে চলছে, এরই মাঝে একদিন সাধনদা, অর্থাৎ ড. সাধন ভট্টাচার্যের সঙ্গে দেখা। উনি ছিলেন বাংলা ও নাটকের অধ্যাপক। এস্থেটিক্‌স নিয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য। মূলত ওঁর উৎসাহ এবং গাইডেন্সেই সংগীতের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আমি আমার গবেষণার কাজটি সম্পূর্ণ করতে পেরেছিলাম।

সমাবর্তনে ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়ার দিনে অমিয়রঞ্জন (১৯৬৮)*

বিশ্বযুদ্ধ, রায়ট, স্বাধীনতা পেরিয়ে নকশাল আমলে শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চায় কি ভাটার টান এসেছিল? গানবাজনার জন্য কতটা প্রতিকূলতা ছিল সে সময়?

১৯৪৬ নাগাদ একটা রাজনৈতিক পরিকল্পনা ভীষণরকম ছড়িয়েছিল। শরৎচন্দ্র বসু আর সোহ্‌রাওয়ার্দী মিলে প্রস্তাব দিয়েছিলেন এপার বাংলা ওপার বাংলা মিলিয়ে এক ‘অখণ্ড বাংলা’ গড়ে তোলার। সে সময়ে কাগজে বিস্তর লেখালেখি হয়েছিল এই নিয়ে। তারপর কেমন যেন সব থিতিয়ে গেল। দেশভাগ আটকানো গেল না। ততদিনে ফিল্মের গান এবং আধুনিকের জোয়ার এসে গিয়েছে। ভারতীয় মার্গসংগীতের প্রজ্ঞার সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে পাশ্চাত্যের হার্মোনাইজেশন।

(বাঁ-দিক থেকে) শরৎচন্দ্র বসু আর হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী

তখন আধুনিক গানের একটা ভীষণ পরিবর্তন আসছে। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, পঙ্কজকুমার মল্লিকের দেখানো পথে সেই পরিবর্তনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন সুধীরলাল চক্রবর্তী। ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’, ‘এক হাতে মোর পূজার থালা’ ইত্যাদি গান তখন গ্রামোফোন বা রেডিওর কল্যাণে ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছে। সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে উৎপলা সেনের গাওয়া গান সে সময় খুব হিট করেছিল। আমার খুব ভালো লাগত আধুনিক গান।

(বাঁ-দিক থেকে) ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ও সুধীরলাল চক্রবর্তী

সেই সময় আমি একটা আধুনিক গানে সুরও দিয়েছি– ‘কাছে গেলে মোর স্বপন ভাঙিয়া যায়।’ সেই গান নিয়ে একদিন গেলাম বিনয় অধিকারীর বাড়ি। তখনকার দিনে উনি রেডিওর বেশ নামকরা শিল্পী ছিলেন। থাকতেন হাওড়ার সালকিয়ায়। আমায় দেখে খুব খুশি, গান শুনে আরওই উৎফুল্ল। কথা দিলেন গানখানা তিনি রেডিওতে গাইবেন এবং নিজের ছাত্রছাত্রীদেরও শেখাবেন। ১৯৫০ নাগাদ এই গানটিও বেশ খানিক জনপ্রিয় হয়েছিল। তখন আমি রেডিওতে নিয়মিত শিল্পী হয়েছি। পাশাপাশি চলছে স্নাতকোত্তরের পাঠ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তিন পর্বের অমিয়রঞ্জন (বাঁ-দিক থেকে) ১৯৪৫-এ স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র, তারপর ১৯৪৯ ও ১৯৫১ সালে তোলা ছবি*

নকশাল আমলে আমি রবীন্দ্রভারতীর লেকচারার, পরীক্ষা চলছে। আমি গার্ড দিয়ে হল থেকে বেরনোর পর ড. মানস রায়চৌধুরী গার্ড দিতে গিয়েছিলেন। ওঁর কড়া ইনভিজিলেশন পছন্দ না হওয়ায় ছেলেরা মানসবাবুর মাথা সজোরে ঠুকে দিয়েছিল দেওয়ালে! এসব ঘটনা নকশাল আমলে হামেশাই ঘটত। একদিন ভজন গানের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা নিচ্ছি। নানারকমের ভজন শুনছিলাম– তুলসীদাস, সুরদাস– ভালো লাগছিল। একটি মেয়ে দেখি খুব হাত নেড়ে গান গাইছে। এত আবেগে আত্মহারা? আরে দেখি দেখি হাতটা, চেটোতে কী লেখা– পুরো গানটা? তাই ভাবি, এর তো শুধু হাত নড়ে না, চোখও নড়াচড়া করে! প্র্যাকটিকালেও টুকলি? বাধ্য হয়েই মেয়েটিকে বললাম, ‘তোমাকে তো পাশ করাতে পারছি না।’ মেয়েটি লজ্জায় মাথা নিচু করে রইল, তারপর উঠে বেরিয়ে গেল।

আপনার তানকর্তবের খ্যাতি সুবিদিত। সুপ্রভা সরকার থেকে অজয় চক্রবর্তী– বহু বিশিষ্ট শিল্পী আপনার কাছে তালিম নিয়েছেন। আপনার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে কিছু বলবেন?

ছোটবেলায় আমি নিজে নারায়ণরাও ব্যাস-এর তান অনুসরণ করতাম। একবার বম্বেতে একটা অনুষ্ঠানে গান গাইছি, দেখি, হঠাৎ নারায়ণরাও ব্যাস নিজে এসে বসেছেন শুনতে! তাঁর সামনে গান করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিলাম– সেটা একটা আলাদা উপলব্ধি। শ্রোতাও নানা রকমের হয়। আমি নিজে শ্রোতাদের খুব লক্ষ করতাম– কে কোথায় মাথা নাড়ছে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে– এসবই আমার কাছে শেখার বিষয় ছিল।

(বাঁ-দিক থেকে) সুপ্রভা সরকার, অজয় চক্রবর্তী, রামানুজ দাশগুপ্ত

আমার তানের প্রভাব হয়তো নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের গানে কিছুটা পড়েছে। সবাই পারে না, কারণ দুরন্ত বেগে তান গলায় তোলা সহজ নয়। আমার ভাই নীহাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, পুত্র শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় এরা দীর্ঘদিন শিখেছে আমার কাছে। বাংলা গানের ‘বড়দি’ ওরফে সুপ্রভা সরকারকে কিছুদিন শেখানোর সুযোগ হয়েছিল অ্যাকাডেমির গোড়ার দিনগুলিতে। অজয় চক্রবর্তী, রামানুজ দাশগুপ্ত এঁরাও আমার কৃতী ছাত্র। মণিমঞ্জুষা মজুমদার, সংগ্রামী লাহিড়ী, মীরা দত্ত রায়, মনোজিৎ মল্লিক, দিলীপ কর্মকার-সহ আমার আরও অনেক ছাত্রছাত্রীই সুনামের সঙ্গে গান গেয়ে চলেছেন।

পুত্র শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক ঘরোয়া মুহূর্তে অমিয়রঞ্জন (২০২৪)

মার্গসংগীত সম্বন্ধে নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কতখানি? যাঁরা এখনও চর্চা করছেন তাঁদের মধ্যে কতটা সম্ভাবনা রয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

আজকাল সেই গভীর মনঃসংযোগ নিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীত শোনার প্রবণতা খুব একটা দেখা যায় না– এমনটাই মনে হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতার একটা স্বতঃস্ফূর্ত শিক্ষাও তৈরি হয়, ফলে তারা কিছুটা ঠিকই বুঝতে পারেন, যদিও সবটা নয়। খেয়ালের মূল রসের নাগাল সহজে পাওয়া যায় না। তার নিজস্ব গঠন, তার অন্তর্গত সৌন্দর্য অটুটই থাকবে। ভবিষ্যতেও সেই স্বরূপ বজায় থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস। খেয়ালকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। যখন আমরা গোয়াবাগানের কাছাকাছি থাকতাম, তখন দেখেছি, পূর্ণশ্রী সিনেমা হলের সামনে হিন্দি ছবি দেখার জন্য বিশাল ভিড়। অথচ কাছেই আরেকটা প্রেক্ষাগৃহে সত্যজিৎ রায়ের ছবি তেমন চলছে না। ফলে যা জনপ্রিয়, তাই-ই যে শ্রেষ্ঠ এমনটা আমি মানতে নারাজ।

রবীন্দ্রভারতীতে এমএ-র ক্লাস নেওয়ার সময়ে (১৯৭৯)*

আসলে আজকের ব্যস্ত জীবনে পড়াশুনো, চাকরিবাকরি সামলে কেউ হয়তো অনেকদিন অবধি ক্লাসিক্যাল গানের চর্চা বা তালিম কষ্ট করে চালিয়ে গেল, তারপর একটা সময়ের পর আর পেরে উঠল না। তাদের আগ্রহ কম বা ট্যালেন্ট নেই, একাগ্রতা নেই এমনটা আদৌ নয়। বর্তমানে আমারই এক ছাত্র, বেশি বয়স নয়, কী অপূর্ব গান গেয়ে শোনাল সেদিন! কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতির চাপ সামলে কতদিন সেটা পেরে উঠবে ওটাই মস্তবড় সমস্যা। কিন্তু তবুও আমি আশাবাদী।

শিক্ষাদানের ধারা অব্যাহত: ২০২৫-এ গানের ক্লাস নিচ্ছেন অমিয়রঞ্জন

১০০ বছর বয়সে, গত ২১ ফেব্রুয়ারি গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশনে খেয়াল পরিবেশন করলেন। কেমন অভিজ্ঞতা? রাগ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনও বিশেষ ভাবনা ছিল?

সেদিনের গানের কথা বলতে গেলে, খুব যে ভালো গেয়েছি, এমন দাবি করব না; মোটামুটি হয়েছে বলাই ঠিক। শ্রোতাদের কাছ থেকে কোনও দুর্নাম আসেনি। এটাই বড় কথা। আর সেটাকে আমি আমার পিতৃপুরুষের সৌভাগ্য বলেই দেখি। কারণ সমালোচনা হওয়াটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু সেদিন তা হয়নি– এটাকেই ভাগ্য বলব। হয়তো আমার বয়সের ব্যাপারটা ভেবেই শ্রোতারা এতখানি বাড়তি ভালোবাসা দিয়েছেন। তাঁদের সকলের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ।

ভিড় ছিল প্রচুর, হাততালিও কম পড়েনি। কিন্তু শুধু ভিড় বা হাততালি দিয়ে কোনও গানের আসল সার্থকতা বিচার করা যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, শ্রোতা ভরপুর, প্রশংসাও হচ্ছে, অথচ গানের যে গভীর রসাস্বাদন– সেটা হয়তো পুরোপুরি ঘটল না। গানকে বিচার করা সত্যিই কঠিন। আবার এমনও হয়, খুব ভালো গানও শ্রোতারা সেইভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। কারণ, একজন শ্রোতার শুধু রসবোধ থাকলেই হয় না– সেই রস উপভোগ করার ক্ষমতাও থাকতে হয়।

শতবর্ষের অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশনরত (২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)*

সেদিন রাগ বেহাগ গেয়েছিলাম। প্রস্তুতি ছিল, তবে রাগ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আলাদা কোনও ভাবনা মাথায় আসেনি। মোটের উপর সেদিন আমার নিজের ভালোই লেগেছিল– এইটুকু বলতে পারি।

বিশেষভাবে স্মরণীয় সংগীত পরিবেশনের কোনও স্মৃতি?

আমার প্রথম অনুষ্ঠানের কথা বলি। ১৯৩৪ সাল। আমার জ্যাঠামশাই তখন লিলুয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাস্টার। লিলুয়া ইনস্টিটিউটেই তিনি নিজের উদ্যোগেই এক জলসার আয়োজন করেন। বাবা আমার নাম দিয়ে দিলেন। সাত বছর বয়সে মঞ্চে গান গাইলাম, ধ্রুপদ। একটি সান্ত্বনা পুরস্কারও বোধহয় পেয়েছিলুম সেইবার।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত ১৯৩৪ সালে লিলুয়ায় আয়োজিত সংগীত প্রতিযোগিতার ছবি। সামনের সারিতে এগিয়ে বসে আছেন সাত বছরের অমিয়রঞ্জন*

নারায়ণরাও ব্যাস-কে গান শোনানোর বিরল অভিজ্ঞতার কথা তো আগেই বলেছি। ১৯৬১ সালে শিলিগুড়িতে মিউজিক কনফারেন্স। শেষদিনে আমার অনুষ্ঠান ভীমসেন যোশির পরে। রীতিমতো নার্ভাস লাগছে। ‘জো ভজে হরিকো সদা’ দিয়ে আসর মাত করে অনুষ্ঠান শেষ করলেন যোশিজি। এবার আমার পালা। স্টেজে তখনও পর্দা ওঠেনি। তানপুরোর তারে টোক দিয়ে দেখি ডি-শার্পে বাঁধা। এদিকে আমি সি-শার্পের গাইয়ে। জেদ চেপে গেল। কারণ সমস্ত আসর তখন ডি-শার্পে টানটান। নামালেই আসর চুপসে যাবে। রাত তিনটে নাগাদ প্রায় ফাঁকা হলে গাইতে শুরু করলাম ভৈরব– ‘বালমুরে মোরে সৈঁয়া।’ খানিকক্ষণ চোখ বুজে গাওয়ার পর চোখ খুলে দেখি হল ভরে গিয়েছে। গান শেষে প্রচণ্ড হাততালি। উদ্যোক্তারা বলেছিলেন, ভীমসেনজির পরে আপনি যে আসরটা এমনভাবে ধরে ফেলবেন, তা ভাবিনি। আজও এটি আমার জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি।

ভীমসেন যোশির সঙ্গে শিলিগুড়িতে (১৯৬১)

প্রখ্যাত সেতারবাদক পিতার সুযোগ্য পুত্র হয়েও সেতার বাজালেন না। সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা ভাষায় খেয়াল গাইলেও, আপনি বরাবর হিন্দি ভাষায় খেয়াল প্রচলনের পক্ষে। এই বিরোধী মনোভাবের নেপথ্যে কি কোনও বিশেষ কারণ ছিল?

আমি খুব তাড়াতাড়িই বুঝে গিয়েছিলাম, বাবার মতো হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রায় পাঁচ বছর সেতার শিখেছিলাম, কিন্তু তারপর আর এগিয়ে নিয়ে যাইনি। বাবার মতো বহুমুখী প্রতিভা আমার নেই।

গানের আসরে বাবার সঙ্গে হারমোনিয়ামে সঙ্গত করছেন পুত্র অমিয়রঞ্জন

একদিন জ্ঞানবাবুর (জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ) বাড়ির কাছে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় রবিশঙ্কর এসে পড়লেন। জ্ঞানবাবু আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এ হচ্ছে সত্যকিঙ্করবাবুর ছেলে, ভালো গান করে।’ শুনে রবিশঙ্কর অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনি সত্যকিঙ্করবাবুর ছেলে, আর আপনি কি না সেতার বাজালেন না!’

(বাঁ-দিক থেকে) পণ্ডিত রবিশংকর ও আচার্য জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ

ওই একটা কথাতেই বোঝা যায়, বাবার সেতারকে তিনি কত উচ্চতায় দেখতেন! বাবাকে আমি খুব ভয় পেতাম, শ্রদ্ধাও করতাম। কিন্তু ওঁর সব ধারণার সঙ্গে সহমত হতে পারিনি। বাবা সবসময় বাংলা ভাষায় খেয়াল গাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এই নিয়ে আকাশবাণীর সঙ্গে ওঁর মতবিরোধ ঘটেছিল। খেয়াল গান সেই সুলতানি আমল থেকে হয়ে আসছে হিন্দিতে, ফলে আমাদের কান ওই শব্দ-সুরের বাঁধুনিতে এমন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে যে তাকে নতুন করে বাংলায় ঢেলে সাজাতে গেলে কানে অন্যরকম ঠেকতে বাধ্য। কবীর সুমন সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা খেয়ালকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য প্রভূত চেষ্টা করছেন। সেই গান আমিও শুনেছি। সুমনবাবু বাবাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন বলে জানি। কিন্তু আমি এখনও মনে করি, খেয়াল গানে বিস্তারের সময় সুর বজায় রেখে বাণীর যে ডিসটর্শন বা বিকৃতি, তার জন্য হিন্দি ভাষাই উপযুক্ত, বাংলা নয়। একটা উদাহরণ দিই: বাবার আরেক ছাত্র নীলমণি সিংহের থেকে শোনা ‘একি তন্দ্রা বিজড়িত আঁখিপাতে’ গানটি মালকোষ রাগে আধারিত। এবার এই গানের বিস্তার করতে গিয়ে কোনও গায়ক যদি অনবরত ‘তন্দ্রা বিজরিত, তন্দ্রা বিজড়িত’ গেয়ে বিস্তার অংশটুকু করেন, তাহলে গানের অর্থের সঙ্গে পরিবেশনের একটা সরাসরি সংঘাত বেধে যায়। অত তান করলে তন্দ্রা ছুটে যাওয়ার উপক্রম হয় আর কী! অথচ হিন্দিতে এ জাতীয় রিপিটেশন বা ডিসটর্শন অত্যন্ত স্বাভাবিক শোনায় কানে।

নিবিষ্ট মনে। ছবি: সুখময় সেন

আপনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে কিছু রাগের স্থায়িত্ব পাওয়ার ব্যাপারে। সেকথা মাথায় রেখে আপনি নিজে বিষ্ণুপুর ঘরানার চিরাচরিত ভঙ্গি বা গায়নপদ্ধতিতে যে সব পরিবর্তন এনেছিলেন, সেই প্রয়োগের নেপথ্যের ভাবনার বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বলবেন?

আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর না থাকলে বিষ্ণুপুর ঘরানার পূরবী রাগের এই বিশেষ রূপটা আজকের শ্রোতারা আদৌ গ্রহণ করতেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। পূরবীর যে নিজস্ব আবেদন, সেটা অন্যভাবে একই গভীরতায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ সেই অন্তর্নিহিত মাধুর্য খুব সূক্ষ্মভাবে অনুধাবন করে নিজের সৃষ্টিতে গ্রহণ করেছিলেন। আমি শুনেছি, তিনি প্রায়ই আমার সেজদাদু, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়-কে অনুরোধ করতেন বিষ্ণুপুর ঘরানার বিভিন্ন রাগের বন্দিশ শোনাতে। সেজদাদু ওঁর অসাধারণ স্মরণশক্তির জন্য বিভিন্ন রাগ নির্ভুলভাবে পরিবেশন করতে পারতেন। কোনও সুর রবীন্দ্রনাথের ভালো লাগলে তিনি তার স্বরলিপি চাইতেন। এরপর নিজেই বাণী রচনা করে, সেই রাগের চলন অনুযায়ী নতুন সুর নির্মাণ করতেন।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রচলিত পূরবী রাগে শুদ্ধ ধৈবতের ব্যবহার নেই, কিন্তু বিষ্ণুপুর ঘরানায় তা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূরবী-নির্ভর গানে শুদ্ধ ও কোমল– উভয় ধৈবতেরই প্রয়োগ করেছেন (যেমন, ‘তুমি তো সেই যাবেই চলে’)। এই সৃজনশীল প্রয়াসের মধ্য দিয়েই তিনি পূরবী রাগকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রচনা ও সুরসৃষ্টির ব্যাখ্যা আসলে নির্দিষ্ট কোনও কাঠামোয় বাঁধা যায় না। তাঁর গান শুনলে শ্রোতা তাঁর বাণী, শব্দবিন্যাস এবং সুরের মেলবন্ধনে এমনভাবে আবিষ্ট হয়ে পড়েন যে, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

বিষ্ণুপুরে সংগীত পরিবেশন (১৯৬১)*

বিষ্ণুপুর ঘরানার বহু রাগেই আলাদা স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। যেমন, বৃন্দাবনী সারঙ-এ শুদ্ধ-‘নি’ ব্যবহার হয় আমাদের ঘরে, যদিও প্রচলিত রূপে দুই-‘নি’-ই চলে। আবার ছায়ানট গাইবার সময় আমরা কোমল ‘নি’ দিই না, অথচ মালবিকা কাননের গলাতেও কোমল-‘নি’ বাদ দিয়ে গাওয়া ছায়ানট শুনে ভীষণ ভালো লেগেছিল। রামকেলি রাগে বিষ্ণুপুর ঘরের ধারায় কড়ি মধ্যমের ব্যবহার ছিল না। কিন্তু সময় বদলেছে– সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দুই মধ্যমের ব্যবহারও এখন স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে আজ যদি আমি রামকেলিতে সেই দুই মধ্যম ব্যবহার না করি, শ্রোতারা হয়তো আমাকে গ্রহণই করবেন না। এটা আমার প্রথম থেকেই মনে হয়েছিল। বাবা মানতে চাইতেন না। তাই ওঁর সঙ্গে সরাসরি বিরোধে যাইনি কখনও, কিন্তু নতুন নতুন বন্দিশ শেখার চেষ্টা করতাম। কারণ, সেগুলি না জানলে রাগের ভেতরে গভীরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। পরিবর্তনকে অস্বীকার করলে নিজেকেও প্রাসঙ্গিক রাখা যায় না– এই বিশ্বাস থেকেই ধীরে ধীরে আমি আমার নিজস্ব ঘরানার গণ্ডি কিছুটা ছাড়িয়ে এসেছি।

বহু-যুগের ওপার হতে। দুই সময়ের ছবি

এআই এবং প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির দরুণ উচ্চাঙ্গ সংগীতের আবেদন কি আদৌ বাড়ছে নতুন প্রজন্মের কাছে? বহু ধরনের গান, বহু শৈলীতে সহজেই শুনতে বা শিখতে পারার দরুণ কি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে কোনও নির্দিষ্ট ঘরানার স্বকীয়তা?

প্রযুক্তি এক ধাক্কায় সংগীত-চর্চার ধারাকেই বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে বিলম্বিত খেয়ালের চল এখন বেড়ে গিয়েছে। আগে এর তেমন অস্তিত্বই ছিল না। তানের দিকটাও আগের মতো আর নেই। অর্থাৎ গোটা গানটাকে বিগত যুগের রীতি মেনে সাদামাটা না রেখে, আরও বড় করে, বিস্তারিত করে গাওয়ার ঝোঁক তৈরি হয়েছে। আজকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদারমনস্ক, গ্রহিষ্ণু ভাব বেড়ে যাওয়ার দরুন তারা নানান জিনিস শুনছে, দেখছে, গ্রহণ করছে। ক্রমশ বিভেদ কমে আসছে। রেডিও, রেকর্ড, টেলিভিশন, ইউটিউব-সহ নানা মাধ্যমে আদানপ্রদানের ফলে আগ্রা ঘর ও অন্যান্য ঘরানার সংগীত-চেতনা বা ট্রিটমেন্ট মিলেমিশে গিয়েছে। আগের মতো গোঁড়ামির প্রশ্নই ওঠে না। যা পড়ে আছে তা হল স্টাইল। গানের ঢং বা ভঙ্গি। গায়কের উপর রাগের স্ট্যান্ডার্ড চেহারা কেমন হবে, তা নির্ভর করে। খুব এলেমদার গাইয়ের করা সামান্য ডিভিয়েশনও চট করে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে গৃহীত হয়ে যায়।

অমিয়রঞ্জনের পরিবার: চার প্রজন্ম একসঙ্গে*

এখনও রোজ রেওয়াজ করেন?

এখন বয়স ও শারীরিক কারণে, সপ্তাহে রোজ না হলেও, নিয়ম করে তিনদিন বসি। সকালে উঠে আধ ঘণ্টা থেকে চল্লিশ মিনিট রেওয়াজ হয়েই যায়। তবলাবাদক ছাড়াও কিছু শ্রোতা আসেন শুনতে। ছাত্রছাত্রীদের শেখানোর সময়ও গান গাই ওদের সঙ্গে। নিজের গান নিয়মিত রেকর্ড করে রাখি। পুরনো রেকর্ডিং শুনে ভুলত্রুটি সংশোধন করি। আজকাল মাঝেমধ্যে খেই হারিয়ে যায়। পুরনো কথা মনে করতে সময় লাগে। বয়স তো কম হল না। তবে গানটাকে আমি শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো করে নিয়েছি। আমি ঈশ্বর-বিশ্বাসী নই, কোনও গোঁড়ামিকে কখনও প্রশ্রয় দিইনি। গানই আমার ধ্যান। যা কিছু ভালো, যা কিছু কার্যকরী তা আমি আজীবন আহরণ করেছি, করে চলেছি।

বাড়িতে রেওয়াজ করছেন অমিয়রঞ্জন (২০২৫)*

শেষ প্রশ্ন, শতবর্ষ পার করেছেন। চমৎকার কথা বলেছেন। এত স্মৃতি। শরীর-মন এতকাল ধরে সজীব রাখলেন কীভাবে?
চর্চা, চর্চা, চর্চা। 

‘*’ চিহ্নিত ছবিগুলি পণ্ডিত শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত।
ঋণ স্বীকার: পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পরিবার, সুখময় সেন