
সাংবাদিক গৌরদার জীবনে সবচেয়ে বর্ণময় অধ্যায়টি ছিল ১৯৭৫ সালে দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থার সময়। সেসময় তাঁর লেখার অংশ বাদ দেওয়া, লেখা বাতিল হওয়া শুরু হয়। এই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গৌরদা মাথা ন্যাড়া করেছিলেন। কেউ জিগ্যেস করলে বলতেন, একজন লেখকের কলমের স্বাধীনতা হরণ করা মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়। সেজন্যই তিনি মস্তক মুণ্ডন করেছেন। সেইসঙ্গে এটাও জানিয়ে রাখতেন এতে কাজ না হলে তিনি গলায় কুকুরের বকলস পরে ঘুরবেন।
৬১.
দে’জ পাবলিশিং শুরু করার পরের বছর জুন মাসে আমি একটি বই ছাপলাম, যার নামটা বেশ চমকপ্রদ– ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’। নাম-গল্পটি ছাড়াও এই বইতে ছিল ‘হঠাৎ জোয়ার’, ‘আরশোলা’, ‘চার প্রৌঢ়ের বারমাস্যা’, ‘সাঁকো’, ‘আলমারি’, ‘যাহা যায়’– এই ছ’-টি গল্প। গৌরকিশোর ঘোষ তখন লেখক ও সাংবাদিক হিসেবে রীতিমতো বিখ্যাত। তার ঠিক আগের বছর মুক্তি পেয়েছে গৌরকিশোরের গল্প নিয়ে তপন সিংহের ছবি ‘সাগিনা মাহাতো’।

দিলীপকুমার অভিনীত সে-ছবি আমিও দেখেছিলাম। সে-সময় সদ্য গড়ে ওঠা প্রকাশনা থেকে গৌরকিশোরের বই পাওয়াটা বেশ সম্মানের ব্যাপার ছিল। গৌরদা ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’ বইটিতে জানিয়েছিলেন– ‘এই কাহিনীগুলির পটভূমি কলকাতা/ রচনাকাল ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০।’ সময়কালটা দেখেই বুঝতে পারা যায় সেটা বাংলার সমাজ এবং রাজনীতিতে একটা অস্থির সময়। বিশেষ করে গৌরদার মতো সমাজসচেতন সাংবাদিক ও মরমি লেখক যে সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন, তা তো সহজেই অনুমান করা যায়।
সাতের দশক থেকেই সাংবাদিকদের রোল মডেল ছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ আর বরুণ সেনগুপ্ত। গৌরদা নিজের মানবদরদি রাজনৈতিক বিশ্বাসকে সম্বল করে আক্ষরিক অর্থে কলম হাতে লড়ে গিয়েছেন যাবতীয় সমাজ-রাজনৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে। সে-লড়াই জারি ছিল আজীবন। ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’ গল্পটি সে-সময়ের শহর কলকাতার ছবি অত্যন্ত মুনশিয়ানায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল ছোট্ট-ছোট্ট কয়েকটি ‘দৃশ্যে’। বিপ্লবের নামে যে-সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা তাঁর একটি ছোট্ট অংশে নজর দিলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। এই গল্পটির ৩৬ নম্বর দৃশ্যে তিনি লিখছেন–
‘কলেজের প্রিনসিপাল উদ্ভ্রান্তের মত এগিয়ে এলেন। বললেন, ল্যাবরেটরি ভেঙে তচনচ করে ওরা চলে গেল। ওরা সংখ্যায় ছিল বারজন। আমার কলেজে? অধ্যাপক ত্রিশজন, ছাত্রসংখ্যা সাড়ে সাত শ’ আর অশিক্ষক কর্মীর সংখ্যা সাতাশ। আর দারোয়ান মালী দশজন।
কাতরভাবে প্রধান শিক্ষক উদ্ভ্রান্তের মত এগিয়ে এলেন। বললেন, পরীক্ষার হল ভেঙে তচনচ করে দিয়ে ওরা চলে গেল। ওরা সংখ্যায় ছিল দশজন। পাঁচ শ’ ছাত্র পরীক্ষায় বসেছিল।
খবরের কাগজের এডিটার এগিয়ে এলেন, বললেন, জনসাধারণের বিবেক বলে কিছু আছে না কি যে, তা জাগ্রত করার জন্য কলম ধরব? আসলে কী জানেন, এখন এগেন্স্ট্ কারেন্ট্। সকলেরই মোরেল ভেঙ্গে গেছে। খবর রাখি তো। এখন কিছু কমিট না করাই ভাল। সময় আসুক, তখন দেখবেন, একেবারে আগুন ছুটিয়ে দেব। বলি, আমি যে, লিখব, আমার লাইফের গ্যারানটি কে দেবে ? আরে মশাই, কাশী মিত্তিরও চিনি, আর নিমতলাও চিনি। নিতান্ত মরে আছি, তাই পথটা দেখাতে পারছিনে। হেঃ!
কলেজের প্রিনসিপ্যাল: ঠিক বলেছেন। আমি যে কিছু করব, আমায় প্রোটেকশান কে দেবে?
প্রধান শিক্ষক: তাই তো মশাই ওসব কোনও ঝামেলায় জড়িয়ে পড়িনে আমি। আমি শিক্ষাব্রতী। ছাত্রদের কিসে ভাল হয়, তাই দেখাই আমার কাজ। আমি তাই কষে এমন সব নোটবই লিখে যাচ্ছি, যা পড়লেই সিওর সাকসেস।…’

‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’ বইটির জন্য চমৎকার একটি মলাট এবং টাইটেল পেজের অলঙ্করণ করে দিয়েছিলেন পূর্ণেন্দুদা। বইটি আমি ছেপেছিলাম বিডন স্ট্রিটে নিরঞ্জন বোসের নর্দার্ন প্রিণ্টার্স থেকে। বইটির উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন–
“চলার পথের সাথী প্রিয়বন্ধু
মানবদরদী
জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা যে শুধু হাসত
স্মরণে
আর
গভীর মন্দ্রস্বরে বলত
‘হিউম্যানিসটের কাছে সব দেশই স্বদেশ’
তাই যে
এক বাংলা
দুভাগ হবার পর
ওপারেই থেকে গেল
এবং
যাকে ইয়াহিয়ার সৈন্যবাহিনী
২৫ মারচ ১৯৭১-এর মসীলিপ্ত রাত্রে
হত্যা করেছে
ঢাকায়
অকারণে”

বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন অগ্রণী সেনানী ছিলেন। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী যে-গণহত্যা চালায় তাতে তিনি শহিদ হন। সেসময় জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে আবাসিক শিক্ষক ছিলেন।
আমার সঙ্গে গৌরদার আলাপ আনন্দবাজার দপ্তরেই। শুরুর বছরে সন্তোষকুমার ঘোষের ‘সোজাসুজি’ এবং ১৯৭১-এর এপ্রিলে ‘শেষ নমস্কার শ্রীচরণেষু মা-কে’ বই দুটি করায় আনন্দবাজার দপ্তরে প্রথম থেকেই আমার যাতায়াত ছিল। সেভাবেই গৌরদার সঙ্গে আমার আলাপ। এক মাথা কোঁকড়া চুলের ঋজু ব্যক্তিত্বের মানুষটির দু’-আঙুলের ফাঁকে সব সময় একটা চুরুট থাকত। পরে যখন আমাদের দোকানে আসতেন তখন বেশিরভাগ সময় দেখতাম বেতের বাঁটওয়ালা একটা বড়ো কালো ছাতা তিনি পিঠে ঝুলিয়ে আসতেন। আনন্দবাজারে যেমন, তেমনই আটের দশকে আমহার্স্ট স্ট্রিটে, সিটি কলেজের পাশে লাহাবাড়িতে ‘আজকাল’ পত্রিকার দপ্তরেও গৌরদার কাছে আমার প্রায় নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল।

গৌরদার জন্ম এখনকার বাংলাদেশের যশোরে হলেও তিনি অনেকদিন কাটিয়েছেন নবদ্বীপে। সেখানেই তাঁর স্কুলের পড়াশোনা। ১৯৫২ সালে পরিবারের সবাইকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসার আগে পর্যন্ত নবদ্বীপই ছিল তাঁর বাড়ি। খুব অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব এসে পরে তাঁর কাঁধে। আর তিনি শত সংকটেও চিরকালই ছিলেন দায়িত্ব সচেতন এবং লক্ষ্যে অবিচল একজন মানুষ। ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরেই তাঁর লেখাপড়ায় ছেদ পড়ে। পরে যদিও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন, কিন্তু ততদিনে গোটা দুনিয়া জুড়ে শুরু হয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফলে আবার তাঁকে ঝাঁপাতে হয় জীবনযুদ্ধে। সে-সময় নানা রকমের কাজ করেছেন। কখনও ইলেকট্রিক মিস্তিরির ফিটার, কখনও হোটেল-রেস্তঁরায় বয়ের কাজ, ভ্রাম্যমাণ নাচের দলের ম্যানেজারি। আবার সেইসঙ্গে গৃহশিক্ষকতা, ছাপাখানায় প্রুফ দেখা– হরেক কাজ। তবে যত কষ্টই হোক, এই সময়ের অভিজ্ঞতাই নিশ্চয় তাঁকে লেখক হিসেবে গড়েছিল। জীবনের নানারকম আলো-আঁধারি দেখতে-দেখতে তৈরি হয়েছিল তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ।
গৌরদার মেয়ে সোহিনী ঘোষ একটি লেখায় তাঁর বাবার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে জানিয়েছেন–
“দারিদ্র্যের কারণে প্রথাগত শিক্ষার দৌড় থেমে গিয়েছিল আইএসসি-র পরে। কিন্তু সম্পর্কে ছেদ পড়েনি শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সঙ্গে। গৌরীপ্রসাদ বসু, নবদ্বীপ বকুলতলা ইংলিশ হাইস্কুলের তরুণ ইংরেজি-শিক্ষক, ছিলেন আদর্শবাদী এবং বামপন্থায় বিশ্বাসী। গৌরকিশোর এবং গৌরীপ্রসাদের সম্পর্ক নেহাৎ বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকল না। গৌরকিশোরের কৈশোর মূলত তাঁরই অধ্যাপনায় ক্রমশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে লাগল। স্কুলপাঠ্যের বাইরের বিশাল পাঠ-বিশ্বের সন্ধান দিলেন তিনি ছাত্রকে। শুধু তাই নয়, সেসময়ের নিষিদ্ধ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের সভ্য করলেন। গৌরকিশোর মাস্টারমশাইয়ের উৎসাহে ও আগ্রহে স্থানীয়ভাবে একটি ছাত্র ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়ে তাকে সাফল্যমণ্ডিত করে তুললেন। তখন তাঁর বয়স মাত্রই পনেরো। প্রশাসনের বিরোধিতা করার প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন তিনি গৌরীপ্রসাদ বসুর কাছ থেকেই। ব্রিটিশ শাসনকালে নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হয়ে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ব্যারাকপুর জুটমিলে কাজ করতে গিয়ে দিনের পর দিন মার খাওয়া, হাজতবাস করা, রেলকর্মীদের মধ্যে সংগঠন তৈরি করার দায়িত্ব নিয়ে লালমণির হাটে ধর্মঘটের আয়োজন করা, ব্রিটিশ পুলিশের তাড়া খেয়ে স্বাধীন কোচবিহারে আশ্রয় নেওয়া– এসব নানা কাজের মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। কাজের সূত্রে তিনি দেখলেন, কীভাবে কমিউনিস্ট পার্টি স্বাভাবিক নেতৃত্বকে গলা টিপে হত্যা করে নিজেদের স্বার্থ কায়েম করার হিংস্র চেষ্টা চালিয়ে যায়। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘সাগিনা মাহাতো’ তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।… গৌরকিশোরের মোহভঙ্গ হচ্ছিল।”
এদিকে আমাদের দেশের প্রথম যুগের কমিউনিস্ট মানবেন্দ্রনাথ রায়– ১৯২০ সালে যিনি রাশিয়ার তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেছিলেন, কমিনটার্ন থেকে ১৯২৯-এর ডিসেম্বরে বহিষ্কৃত হবার পর ১৯৪০ সালে ‘র্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি’ (পরবর্তীকালে ‘র্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’) তৈরি করেন। মোহভঙ্গের পর গৌরকিশোর তাঁর মাস্টারমশাই গৌরীপ্রসাদ বসুর সঙ্গে সেই দলে আসেন। মানবেন্দ্রনাথ রায়ের মানবতাবাদী ভাবনা গৌরকিশোরকে আকৃষ্ট করেছিল। পরে অবশ্য গৌরীপ্রসাদ বসু ফের কমিউনিস্ট পার্টিতে ফিরে যান। কিন্তু গৌরকিশোর থেকে যান মানবেন্দ্রনাথের সঙ্গেই। এসময়েই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় শিবনারায়ণ রায়ের। সারাজীবন গৌরকিশোরের সঙ্গে শিবনারায়ণের বন্ধুত্ব ছিল অটুট। পরে গৌরকিশোর রাজনীতি ছেড়ে দিলেও ‘র্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থেকে গিয়েছিল।
গৌরদা শুধুমাত্র সাহিত্য বা রাজনৈতিক সাংবাদিকতায় নিজেকে আটকে রেখেছিলেন, তা নয়। বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবাশিস ভট্টাচার্য ‘আপসহীন মানবতাবাদী’ নামে একটি লেখায় তাঁর আরেকটি দুঃসাহসিকতার কথাও জানিয়েছেন– ‘চিফ রিপোর্টার শিবদাস ভট্টাচার্য নাকি গৌরকিশোরের জ্বালাতনে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁকে ‘জব্দ’ করতে দুর্গম নন্দাঘুণ্টি শৃঙ্গ অভিযান রিপোর্ট করতে পাঠিয়েছিলেন। ভাগ্যিস পাঠিয়েছিলেন! তাই বাংলা সংবাদপত্রে একটি পর্বত অভিযানের ওইরকম রিপোর্ট স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৬০। আনন্দবাজার পত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতায় পর্বত অভিযান, নন্দাঘুণ্টি। গৌরদার বড় মেয়ে সাহানা তখন নিতান্ত শিশু। ছোট মেয়ে সোহিনী সদ্য জন্মেছে। স্ত্রী এবং মায়ের উপর সংসারের ভার ছেড়ে দিয়ে গৌরকিশোর পাহাড়ের পথ ধরলেন। সঙ্গী চিত্র সাংবাদিক বীরেন সিংহ। পাহাড়ে যাওয়ার কোনও অভিজ্ঞতা গৌরদার ছিল না। ভয়ে ভয়ে যাত্রা শুরু। শেষ সাফল্যের চূড়ায়।’

গৌরদা এই অভিযানের কথা লিখেছেন ১৯৬২ সালের এপ্রিলে, আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত ‘নন্দকান্ত নন্দাঘুন্টি’ বইয়ে। সে-বইটির উৎসর্গের পাতায় তিনি লিখেছিলেন– ‘বাংলাদেশের প্রথম পর্বতারোহীদল/ ও/ তাঁদের পৃষ্ঠপোষক/ শ্রীঅশোককুমার সরকার/ মহাশয়কে’।

দে’জ পাবলিশিং থেকে গৌরদার দ্বিতীয় বই– ‘এই দাহ’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩-এর মে মাসে। এই উপন্যাসটি খুব সম্ভবত আমি পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম। তারপর দীর্ঘ বিরতি। আমি ফের গৌরদার বই পাই ১৯৯২ সালে। সেবার নববর্ষে দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয় গৌরকিশোর ঘোষের তিনটি গল্পের সংকলন– ‘তলিয়ে যাবার আগে’। এই বইতে তাঁর ‘বাঘবন্দী’ এবং ‘তলিয়ে যাবার আগে’ গল্পটির সঙ্গে আরেকবার ছাপা হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’। বাংলা গল্পে এই গল্পটি সব দিক থেকেই প্রথা-ভাঙা ছিল। তাই হয়তো তিনি পুনরায় এই গল্পটি নতুন বইয়ে দিয়েছিলেন।

‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’ গল্পটি সম্পর্কে স্বপ্নময় চক্রবর্তী ‘মেরুদণ্ডহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে’ শীর্ষক লেখায় জানিয়েছেন– “গৌরকিশোর ঘোষের এই গল্পটির নামকরণও সে সময়ের ব্যতিক্রম। প্রথা বিরুদ্ধ। ‘পশ্চিমবঙ্গ এক প্রমোদ তরণী হা হা’– এই নামটি দীর্ঘ বলেই অভিনব নয়। এর অভিনবত্ব হচ্ছে শেষকালে হা হা শব্দটি যুক্ত করে দেওয়া। এই হা হা শব্দে যেন লেখক বলছেন দেখো কী আনন্দ। বীভৎস আনন্দ। পশ্চিমবঙ্গ একটি প্রমোদ তরণী, কিন্তু এই তরণীটা ডুবতে বসেছে। সেই ‘তলিয়ে যাবার আগে’ গল্পটির আত্মাটি যেন ভর করে আছে এই প্রমোদ তরণীটির মধ্যে। তারপর হা হা শব্দটির ব্যঞ্জনা– দেখো আমি একটা বেলুন ফাটিয়েছি হা হা কিংবা আমার তিন বছরের বাচ্চাটা অনেক কথা বলতে শিখে গেছে হা হা নয়। এই হা হা শব্দের অন্তর্লীন হাহাকারটা পাঠককে অন্য এক বিষন্ন অনুভূতি দেয়। যেন গল্পটি বলছে– এই যে পশ্চিমবঙ্গ, তোমার গর্বের পশ্চিমবঙ্গ, কী হাল হয়েছে দেখো, ডুবছে, আমরা তবু প্রমোদে মন ঢেলেছি। এই রবীন্দ্রগানটি কি স্মৃতিতে ভেসে ওঠে না– ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন, তবু প্রাণ কেন কাঁদেরে। চারিদিকে হাসিরাশি তবু প্রাণ কেন কাঁদেরে।’ এই গল্পটির মধ্যেই আছে– ‘বীণা তবে রেখে দে, গান আর গাস নে। কেমনে যাবে বেদনা।’ গৌরকিশোরের কলমের কালিতে বেদনাই মেশানো ছিল। এই প্রমোদ তরণীর তলছিদ্রটি আমরা বুঝতে পারছি না। এখনও রগড় দেখছি। হা হা। একটি ব্যঙ্গ, একটি বিদ্রুপ, এবং সেটা হাহাকার মেশানো। সত্যি বলতে কী, এই নামকরণটির একটা প্রভাব পরবর্তীতে পড়েছে। আরও কিছু গল্পের শেষে হা হা যুক্ত হয়েছে। ‘বালিকাটি ধর্ষিত হল গতকাল সন্ধ্যায় হা হা’ এই নামের একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে, কোনও লিটল ম্যাগাজিনে। লেখকের নাম মনে নেই। সত্তরের দশকে অনেক গল্পের নামে আগে বা পরে এবং, তবু, ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগও দেখতে থাকি।’

সাংবাদিক গৌরদার জীবনে সবচেয়ে বর্ণময় অধ্যায়টি ছিল ১৯৭৫ সালে দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থার সময়। সেসময় তাঁর লেখার অংশ বাদ দেওয়া, লেখা বাতিল হওয়া শুরু হয়। এই রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গৌরদা মাথা ন্যাড়া করেছিলেন। কেউ জিগ্যেস করলে বলতেন, একজন লেখকের কলমের স্বাধীনতা হরণ করা মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়। সেজন্যই তিনি মস্তক মুণ্ডন করেছেন। সেইসঙ্গে এটাও জানিয়ে রাখতেন, এতে কাজ না হলে তিনি গলায় কুকুরের বকলস পরে ঘুরবেন!
জরুরি অবস্থার সরব বিরোধিতার কারণে ১৯৭৫ সালে পুজোর ঠিক আগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তখন মুখ্যমন্ত্রী। জ্যোতির্ময় দত্তের ‘কলকাতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল কিশোর ছেলেকে লেখা বাবা গৌরকিশোরের একটি চিঠি। সেখানে প্রতিবাদ করা হয়েছে বাক্স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে। জেলে থাকাকালীন গৌরদা হৃদরোগে আক্রান্তও হয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে এক বছর পর তিনি প্রেসিডেন্সি জেল থেকে ছাড়া পান। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর গৌরদার বিখ্যাত রচনা সংকলন ‘আমাকে বলতে দাও’ প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দ পাবলিশার্স থেকে। এই বইয়ের ভূমিকায় তিনি যা লিখেছিলেন, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় গৌরদার এই বইয়ের নামকরণের আঁতের কথা। তিনি জানিয়েছিলেন–
‘আমার এই রচনা সংগ্রহের নাম রেখেছি, “আমাকে বলতে দাও”। কেননা মানুষের এই ধ্বনি আবহমান। বনচারী বানরগোষ্ঠীরই একটি প্রজাতি মানুষ বিবর্তন-ক্রমে যেদিন সুসংবদ্ধ ভাষা সৃষ্টি করে ফেলল, আমার মতে, পণ্ডিত ব্যক্তিগণ এই অজ্ঞানের প্রগল্ভতা যেন ক্ষমা করেন, মানুষ সেইদিন থেকেই প্রকৃতপক্ষে মানুষ হল। কেননা সেইদিন থেকেই মানুষ তার অবিচ্ছিন্ন, অসংলগ্ন ভাবনার নানা স্রোতকে একটি নিটোল চিন্তায় পরিণত করতে পারলে ভাষারই সহায়তায়। সে শুধু ভাবতে শিখল তাই নয়, নিজের চিন্তা সেই ভাষারই বাহনে অন্যের কাছেও পৌঁছে দিতে সমর্থ হল। প্রথমে ছিল মুখের ভাষা। তারপর শ্রুতি ও স্মৃতির যুগও উত্তীর্ণ হল মানুষ তার অত্যাশ্চর্য সৃজনী প্রতিভায় লিপি আবিষ্কার করে। বিস্ফোরণ ঘটল মানুষের ভাবুকতায় এবং চিন্তায়, জীবনযাত্রায় এবং সভ্যতায়। মানুষ আধুনিক জগৎকে দ্রুত এগিয়ে আনতে লাগল।
ভাষা একই সঙ্গে জ্ঞানের স্রষ্টা এবং তার বাহন। ভাষা সত্য অন্বেষণের অন্তহীন যাত্রায় মানুষের একমাত্র অবলম্বন। সেই কারণেই মানুষের বলবার অধিকার, মানুষের মত প্রকাশের অধিকার মানুষ হিসেবে তার বেঁচে থাকার অধিকারের তুল্যই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত আমি তাই মনে করি। কোনও মানুষই অভ্রান্ত হতে পারে না, নতুন অভিজ্ঞতায় জাত নতুন জ্ঞান সর্বদাই পুরানো ধ্যান, ধারণা ও আদর্শের অসারতা ধরিয়ে দেয় এবং মানুষে সেই মত নিজেকে পরিবর্তিত করে। এই খাপ খাওয়ানোর অমিত ক্ষমতাই মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মানুষের অন্তঃসলিলা যুক্তিবোধ এবং কল্যাণবুদ্ধি মানুষকে অতীতেও সংকটমুক্ত করেছে। ভবিষ্যতেও করবে!’

সাংবাদিক সেমন্তী ঘোষ তাঁর ‘এক সাংবাদিকের সত্য-যাত্রা’য় গৌরকিশোর ঘোষকে ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’ হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন। গৌরদা সম্পর্কে তাঁর বিশ্লেষণ–
“গৌরকিশোর ঘোষ আমাদের দেশের সমাজ ও তাদের রাজনৈতিক অভিভাবকদের দেখে বুঝেছিলেন যে ‘জনসাধারণের অজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাঁদের ক্ষমতার সৌধ রচিত হয়েছে,’ এবং সেই জন্যই নেতানেত্রীরা ‘জনসাধারণের এই অজ্ঞতাটাকেই টিকিয়ে রাখবেন।’ অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের এই অজ্ঞতা কোনও নির্দিষ্ট বা অপরিবর্তনীয় বস্তু নয়, তা আসলে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরই একটা অংশ। সুতরাং তার বিপ্রতীপ কোনও কর্মকাণ্ড যদি তৈরি করতে চেষ্টা করেন কেউ, তবে সবচেয়ে প্রথমে দরজা-জানালা খুলে দিতে হবে, কথা চালিয়ে যেতে হবে, একটা ঠেলা দিয়ে যেতে হবে। আর এইটাই হতে পারে তাঁর মতো সাংবাদিকের কাজ। এবং তাঁদের মতো সাংবাদিকদেরই বুঝতে হবে যে, কাজটা প্রথমত এবং প্রধানত রাজনৈতিক, কারণ রাজনৈতিকভাবে তৈরি এক অজ্ঞতা অপনোদনের উদ্দেশ্যে ক্রমাগত এই ঠেলা দেওয়া।
রাজনৈতিক কাজ বলে নিজের সাংবাদিক বৃত্তিকে চিনে নিয়েছিলেন বলেই কি ‘মিসা’য় জেলবন্দি হিসেবে একটি ‘সলিটারি সেল’-এ থাকার সময়ে এই ভাবনাটা তাঁকে পেয়ে বসেছিল? ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করে ‘আমার আজকাল-এর অভিজ্ঞতা এবং আগামী কালের সাংবাদিকতা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে (১৯৮৩) লিখছেন তিনি, ‘চিন্তাগুলো আমাকে ক্রমশ চেপে ধরতে থাকে। সাংবাদিক হিসাবেই হোক, আর লেখক হিসাবেই হোক, আমি আমার বৃত্তিটাকে বেশ গুরুত্ব দিয়েই গ্রহণ করেছি। লেখাটাকে এইভাবে গ্রহণ করেছি বলেই বোধহয় আমার দায়িত্ববোধ আমাকে অস্থির করে তোলে। একক কারাবাসের জীবন আমাকে সেই কারণেই এই বিচারে আসতে বাধ্য করেছিল যে সচেতন সাংবাদিক হিসাবে আমার আরও কিছু করার আছে। তাই জেল থেকে বেরিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় ফিরে এসে আমি প্রাণপণে চেষ্টা করেছি, আমাদের পাঠকগোষ্ঠীর কাছে আজকের বিশ্বের দরজা জানালা একটু একটু করে খুলে দিতে।”
‘আমাকে বলতে দাও’ বাংলা ভাষায় নানা কারণেই উল্লেখযোগ্য একটি বই। তবে উৎসর্গ কত বলিষ্ঠ ও বাঙ্ময় হতে পারে তারও অসামান্য উদাহরণ হল ‘আমাকে বলতে দাও’। বইটির উৎসর্গে তিনি লেখেন: ‘প্রিয় বন্ধু বাবু শ্রীযুক্ত সিদ্ধার্থশংকর রায়/ বিলাতফেরৎ ব্যারিস্টার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীপ্রবরও/ যিনি আমাকে মিসায় আটক করে এক বছর ফাটক খাটান/ কিন্তু কেন তা বলতে যাঁর আজও লজ্জা ভাঙল না/ সেই সব আদর্শবাদী তরুণ বন্ধু/ যাঁরা আমার মুখ বন্ধ করার প্রয়াসে একদিন আমাকে/ প্রাণদণ্ডের ফতোয়া দিয়েছিলেন এবং প্রেসিডেন্সি জেলে আমার কারাবাসকে/ যাঁরা সহনীয় করে তুলেছিলেন/ সহপাঠী ও সুহৃদ শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র পাল/ কলকাতা হাইকোরটের অ্যাডভোকেট্ যিনি আমার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য/ আইনের সংগ্রামে একক ভাবে রত হয়েছিলেন/ দুরন্ত ঝোড়ো পাখি এবং স্নেহাস্পদ জ্যোতির্ময় দত্ত/ মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য যিনি সেনসরকে উপেক্ষা করে/ কলকাতা পত্রিকার রাজনৈতিক সংখ্যা প্রকাশ করে/ নিগ্রহ ভোগ ও কারাবরণ করেন’।
তাঁর এই উৎসর্গ দ্বিতীয় পৃষ্ঠাতে গড়িয়ে গিয়ে কুট্টির আঁকা একটি জিরাফের মুখ ক্রমে গৌরকিশোরের মুখ হয়ে যায়। নির্বাক জিরাফটি একটি স্ট্যাচু, যার স্মৃতিফলকও কম আকর্ষক নয়। সেই ফলকে লেখা হয়েছিল– ‘কোনো এক জিরাফের স্মৃতিফলকের জন্য/ লোকটা বড় আজব ছিল/ লোকটা বড় আজাদ ছিল/ লোকটা বড়ই আজব কথা বলত/ বলত ভাই মানুষকে শিকল পরিয়ো না/ সে ফুল ফোটাবে/ তারপর কি হল/ হাঃ হাঃ সে বড় মজার কথা/ মজার কথা/ লোকে বলল ওটা মানুষ নয় জিরাফ/ লোকে ওটাকে চিড়িয়াখানায় ভরে দিল/ বন্ধুরা মাঝে মাঝে ওটাকে ঘাস জল দিয়ে আসে/ আহা ওটাকে তারা কত ভালবাসে/ ৫ মারচ ১৯৭৬/ রোগশয্যা ৫নং কেবিন হৃদরোগ বিভাগ/ এস এস কে এম হাসপাতাল কলকাতা’।

গৌরদা আর শীলা বউদির বিয়ের ঘটনাটাও একসময় শহরে বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। আমি সেকথা পরে অনেকের মুখে শুনেছি। বিয়ের সময় তাঁদের আর্থিক সংগতি এমন ছিল না যে, অতিথি আপ্যায়নের সুবন্দোবস্ত করতে পারেন। তাই গৌরদা এক অভিনব ব্যবস্থা করেছিলেন। মিত্রালয়ের কর্ণধার ও লেখক গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য আর কবি অরুণকুমার সরকার ছিলেন সেই বিবাহ অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা। শুনেছি বিয়ের কার্ড ছাপানো হয়েছিল এই মর্মে যে, অনুষ্ঠানে কোনওরকম উপহার আনা বাঞ্ছনীয় নয়। বরং অতিথিদের জন্য আড়াই টাকার টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অরুণকুমার সরকারের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে রাজশেখর বসু ১০ টাকা পাঠিয়ে গৌরীশঙ্করকে লিখেছিলেন– ‘অরুণ কুমার সরকার-এর লেখা একটি নিমন্ত্রণ পত্র পেয়েছি– গৌরকিশোর বাবুর বিবাহ, তার বন্ধুরা অভিনন্দনের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করছেন। এই ব্যবস্থাটি খুব ভালো মনে করি এই সঙ্গে দশ টাকা পাঠাচ্ছি, দয়া করে যথাস্থানে পৌঁছে দেবেন।’

বিয়ে উপলক্ষে রাজশেখর বসু গৌরদাকে নাকি লিখেছিলেন– ‘আমি সেই মেয়েটির সঙ্গে পরিচয় করতে চাই যে এইরকম সাহস দেখিয়েছে।’ গৌরদার মুক্তবুদ্ধির মানবতাবাদী জীবনাচরণের পিছনে শীলা বউদির অবদান কম ছিল না। এমনকী জরুরি অবস্থার সময় তিনি কারাবন্দি গৌরদার অধিকার-রক্ষার জন্য আদালতেও লড়াই করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে গৌরদা আরেকটি অসামান্য কাজ করেছিলেন, যা সম্ভবত অনেকেরই অজানা। মণিশংকর মুখোপাধ্যায় তখনও ‘শংকর’ নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠেননি। সবে লিখতে শুরু করেছেন প্রথম উপন্যাস। তখনও নবীন লেখকের কুণ্ঠা ছাড়িয়ে উঠতে পারেননি। এক সহকর্মীর মাধ্যমে তাঁর আলাপ হয় গৌরদার সঙ্গে। মণিশংকরদা লিখেছেন– ‘…কেন্দ্র কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস। আমার লেখার কয়েকটা চ্যাপ্টার ঝটপট পড়ে নিয়ে গৌরকিশোর ঘোষ বললেন, দেশ পত্রিকার কর্তা সাগরময়ের সঙ্গে আমার একটা অলিখিত ব্যবস্থা আছে– ‘তুলে ধরার’ মতো নতুন লেখক দেখলেই তাকে… দ্রুত নিতে যাওয়া। চিৎপুর ফলপট্টিতে বর্মণ স্ট্রিটটা চেনেন? ওইখানেই আপনাকে আসতে হবে, আমি স্ট্রেট আপনাকে সাগরময়ের কাছে নিয়ে যাব।’ বাকিটা তো ইতিহাস। গৌরদা নাকি চেয়েছিলেন বইটির নাম হোক ‘কালো গাউন’। কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের পরামর্শে মণিশংকরদা তার নাম রাখেন– ‘কত অজানারে’।
গৌরদার শতবর্ষের সূচনায় ২০২২-এর জুন মাসে সোহিনী ঘোষের সম্পাদনায় দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়েছে– ‘রূপদর্শী গৌরকিশোর’। গৌরদার অসাধারণ উপন্যাস– ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’, ‘প্রেম নেই’, ‘প্রতিবেশী’ ইত্যাদির সঙ্গে-সঙ্গে তিনি বেশ কিছু লেখায় ‘রূপদর্শী’ ছদ্মনামটিও ব্যবহার করতেন। আমাদের বইটি অবশ্য শুধুমাত্র সেই ছদ্মনামের আড়ালে থাকা মানুষটিকে নিয়ে নয়। বইটির প্রথম ভাগ হল– ‘রূপদর্শী : তাকে জানা’ এবং ‘গৌরকিশোর: তাঁকে চেনা’। প্রথম অংশটা লেখক-সাংবাদিক গৌরদার কাজের বিশ্লেষণ আর দ্বিতীয় অংশে আছে স্মৃতিমূলক রচনা।

এই বইয়ের পরিচিতিতে লেখা হয়েছিল– “গৌরকিশোর ঘোষ ছিলেন একজন নির্ভীক ধর্মযোদ্ধা। মানবতা ছিল তাঁর ধর্ম, স্বাধীনতাপ্রিয়তা ছিল তাঁর পরিচয়, কলম ছিল তাঁর শস্ত্র। জীবন তাঁকে অনেক দেখিয়েছে, অনেক শিখিয়েছে। সেইসব দেখাশোনার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বহুবর্ণী রচনায়। কেমন ছিল তাঁর সেইসব রচনা? বিশ্লেষণে কলম ধরেছেন তাঁর অনুরাগী পাঠকরা। কেমন ছিলেন তিনি? নানাখানা হয়ে সে-সব ছড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত স্মৃতিতে। আর এইসব নিয়ে তৈরি হয়ে উঠেছে এই অনবদ্য সংকলন– ‘রূপদর্শী গৌরকিশোর’।”
গৌরদার শতবর্ষ উদ্যাপনের অঙ্গ হিসেবেই দে’জ থেকে ২০২৩-এর জুন মাসে অভ্র ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘গৌড়ানন্দ সমগ্র’। এই বইটির পরিচিতিতে লেখা হয়েছে– “গৌড়ানন্দ আত্মপ্রকাশ করেন ষাটের দশকে আনন্দবাজার পত্রিকার পাতায়। ‘হিং টিং ছট’ পাঠকের দরবারে হাজির করেছিল নতুন ধরনের সংবাদভাষ্য। অনিয়মিতভাবে কিছুদিন চলার পর গৌড়ানন্দ নিয়মিত হলেন উনিশশ’ তিয়াত্তরের ডিসেম্বর মাস থেকে। উনিশশ’ তিরানব্বই এর জুন মাস পর্যন্ত গৌড়ানন্দর কলম চলেছে। প্রতি বুধবার (সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) পাঠকের অধীর আগ্রহী অপেক্ষা থাকত ‘গৌড়ানন্দ কবি ভনে’র শাণিত ব্যঙ্গের। একবছরের কারাবাস পর্ব ছাড়া (১৯৭৫-১৯৭৬) চুরাশি সাল পর্যন্ত মোটামুটি নিয়মিত জনপ্রিয় কলম ছিল সেটি। পঁচাশি থেকে তিরানব্বই পর্যন্ত সময়কালে খুব অনিয়মিত চলেছিল। গৌড়ানন্দ-কলমের সমস্ত গদ্যরচনা সাজিয়ে দেওয়া হলো এই বইতে।”

১৯৮৯ সালে গৌরদা ‘গৌড়ানন্দ কবি ভনে’ নামে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে ৬৭টা রচনার একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। দে’জ পাবলিশিংয়ের ‘গৌড়ানন্দ সমগ্র’ বইটিতে আছে ১৩৯টি রচনা। সেই সঙ্গে প্রথম পরিশিষ্টে ছাপা হয়েছে ‘গৌড়ানন্দ কবি ভনে’ শীর্ষক রচনাটি, যা ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি। নিষিদ্ধ সেই রচনা ১৯৭৫ সালেই জ্যোতির্ময় দত্ত ‘কলকাতা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। ‘কলকাতা’ পত্রিকার বিশেষ রাজনীতি সংখ্যায় সে-লেখার শিরোনাম ছিল ‘পূর্ণ সমর্থন লাভের সহজ উপায়’।
প্রথম পরিশিষ্টে আরও দুটি রচনা আছে, সে-দু’টি নকশা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ সালে ‘আজকাল’ পত্রিকায়। ওই সময়ে গৌরদা ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ ছেড়ে নতুন খবরের কাগজ ‘আজকাল’ পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। অবশ্য ‘আজকাল’ পত্রিকায় খুব বেশি দিন থাকেননি তিনি, আবার ফিরে গিয়েছিলেন আনন্দবাজারে। এই গ্রন্থের দ্বিতীয় পরিশিষ্ট তৈরি করা হয়েছে আরও ২২টি নকশা দিয়ে। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’তে এই রচনাগুলির শিরোনাম ছিল ‘হিং টিং ছট্’। লিখতেন গৌড়ানন্দ নামে। এই বইয়ের লেখাগুলি বাংলার সমাজ-রাজনৈতিক জীবনের দু’-দশকের প্রামাণ্য দলিল। আর রচনাগুণে সেরা সাহিত্যের সঙ্গেই তুলনীয় বলে আমার মনে হয়।

মানবতাবাদ, গণতন্ত্র, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী গৌরকিশোর ঘোষ সম্পর্কে ‘তলিয়ে যাবার আগে’ নামে রচনায় তাঁর বন্ধু অম্লান দত্ত লিখেছেন– ‘…মৌল মানবতাবাদী নামে পরিচিত রয়েছেন গৌরের যে বন্ধুজনেরা, তাঁদের অনেকের চেয়েই গৌরের যুক্তিনিষ্ঠা ও মানবতাবাদ আরও মৌল। যুক্তির শুদ্ধতার জন্য দরকার হয় হৃদয়ের ব্যাপ্তি ও শুদ্ধতার, সেই সঙ্গে মৃত্যুঞ্জয় সাহস। গৌরের ভিতর এই দুর্লভ গুণের অভাব ছিল না। আমাদের পরিচিত সমাজ তবু যে গৌরকে অস্বস্তির সঙ্গে দূরে ঠেলে রাখেনি তার বিশেষ কারণ ওর আত্মপ্রকাশের ভঙ্গি। ওর নিঃস্বার্থতা ছিল প্রশ্নাতীত, যুক্তি হয়ে ওঠেনি স্বার্থের দাস।’
লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……
পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!
পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু
পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না
পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম
পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না
পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী
পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা
পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা
পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়
পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল
পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি
পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্সা’
পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়
পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’
পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল
পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!
পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই
পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি
পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত
পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী
পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের
পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়
পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!
পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!
পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো
পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন
পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved