
স্যর রিচার্ড সংস্কৃতে কথা বলতে পারেন। এতটাই ভালো সংস্কৃত জানেন, ‘অনঙ্গরঙ্গ’ অনুবাদের সময় তিনি জানতে পারলেন, বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’-এর কথা। এবং বোম্বাই থেকে জোগাড় করলেন সংস্কৃত কামসূত্রের একটি পুরোনো কপি। জয়পুর আর বারাণসী থেকে আরও তিনটি পৃথক পুঁথি জোগাড় করলেন। শুরু হল রিচার্ডের নিপুণ সম্পাদনা এবং অনুবাদ। ইতিমধ্যে তিনি লন্ডনে খুললেন, ‘কামসূত্র সোসাইটি’। সাহেবদের মধ্যে বেশ উৎসাহ দেখা দিল ভারতের সেক্স-দর্শন বিষয়ে। সাহেবরা বুঝলেন, রিচার্ডের অনুবাদের বাৎস্যায়নের কামসূত্র খুলে দেবে ইউরোপে নতুন সেক্সুয়ালিটির দরজা।
৮২.
১৯৬০ সাল। আমি কলেজের ছাত্র। এবং কো এড কলেজ। শুধু সহপাঠীদের সঙ্গে নয়। সহপাঠিনীদের সঙ্গেও এন্তার এবং ঘন বন্ধুত্ব হচ্ছে। তখনও বন্ধুনিকে, এমনকী বউকেও, তুই বলার ‘স্বর্ণযুগ’ শুরু হয়নি। অন্তত ভদ্রলোকের বাড়িতে।
ভদ্রলোকের ফিটফাট ছেলে আমি। বন্ধুনিদের যার পাশে যাই, তারেই লাগে ভালো। তবু তাদের আর আমার মাঝে পার্টিশনের পাঁচিল, বিস্বাদ আপনি! কিছুতেই পাঁচিলটাকে ফেলতে পারি না। আমি দেখতে ভালো নই। বড়লোকের ছেলেও নই। কিন্তু তবু মেয়েরা কেন জানি না আমার কাছে ঘুরঘুর করে। আমার সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসে। শব্দের কথা নয়। বাক্যের কথা নয়। ইশারার অক্ষরে। চাউনির বাক্যে। আচমকা ছোঁয়ার ডাকে। মেয়েরা কথা বলে। আমার সঙ্গে। আমার শরীরের মধ্যে শিউরে ওঠা ইচ্ছে সাপের মতো ফনা তোলে।
তবু ‘আপনি’-র পাঁচিল উড়িয়ে দিতে পারি না কেন? তবে রোমান ক্যাথলিক ক্রিশ্চান, কেরালার কাজল সুন্দরী সুশীলা আর আমার মধ্যে বাংলা ভাষার চরম দুর্বলতা ওই ‘আপনি’-র কোনও বালাই নেই। আমরা কথা বলি ইংরেজিতে। জীবন আমাকে বুঝিয়েছে, সম্পর্ক গড়তে বা ভাঙতে ইংরেজি ভারি আরামের ভাষা।
ইংরেজি ভাষা বুলেট ট্রেনের মতো। দুরন্ত গতিতে পৌঁছে দেয় শরীরে। চলির পিছনে। নাভির নিচে। ত্রিবলিতে। দুটি স্তনের মধ্যবর্তী খাদে ও উপত্যকায়। আবার ইংরেজি ভাষা কী সুপারসনিক গতিতে উপড়ে ফেলে এইসব একঘেয়েমি! তিন-চারটির বেশি শব্দের দরকার হয় না: ইট’স গেটিং ফাকিং ইমপসিবল! যথেষ্ট!

দূর ছাই। হচ্ছেটা কী! আমি কি ভুলে গিয়েছি, আজকের বিষয়– বিশুদ্ধ বাৎস্যায়ন! আজকের বিষয় তাঁর মৃত্যুহীন ক্লাসিক কামসূত্র! কিন্তু ভারতবর্ষের অন্তহীন কামচর্চা, রতিদর্শন, বনিতা-সংস্কৃতি, শৃঙ্গার-স্তুতিতে যাওয়ার আগে একটা স্যালুট আমাকে জানাতেই যে হবে, সুদূর দক্ষিণ ভারতের এক সরোবরময়ীকে। কেননা তার শরীরের আর্দ্রতাকে নিংড়ে নিতেই যে আমাকে জানার চেষ্টা করতে হয়েছিল নারীর মন ও শরীর। আর আমার ১৭ বছর বয়েসে আমি পড়েছিলাম সেই বই। আজও পড়ছি। ডক্টর রিচার্ড বার্টন-এর ইংরেজি অনুবাদে বাৎস্যায়নের কামসূত্র। শৃঙ্গার, রতি, ও যৌন সম্পর্কের ওপর এমন গ্রন্থ জগতে নেই। বলছি না যে, এই বই বারবার পড়েও আমি নারীকে বুঝেছি। কিন্তু এইটুকু বুঝেছি যে, বোঝা যায় না। কিন্তু, এই কথাটিও বুঝেছি, তোমার এক একটি স্তনের মোহাবিষ্ট বীক্ষণে আমি শত শত বছর কাটাতে পারি, অ্যান্ড্রু মার্ভেলের এই কথাটা কতদূর সত্যি। আর বুঝেছি, নারীকে বিন্দুমাত্র বুঝে ওঠার পক্ষেও জীবন কী নির্মম ক্ষুদ্র। তবু বলতেই হবে, জীবনে কাজে লাগার মতো যে ক’টা বই পড়েছি, তার মধ্যে অন্যতম রিচার্ড বার্টন-এর ইংরেজি অনুবাদে কামসূত্র। যার অন্য নাম হতেই পারে, রমণী-অলিগলির সহজ পাঠ। তবু, এই বই না পড়েই অধিকাংশ ভারতবাসী বিয়ে করে। বলিহারি তাদের সাহস ও অর্বাচীনতা! বাৎস্যায়ন পড়তে পড়তে আজও মনে হয়, ভারতের রতিদর্শন এবং শৃঙ্গার-সাধনার কোনও তুলনা নেই জগতে।

বিয়ের কথা উঠল যখন, প্রথমেই ঝেড়ে কাশি। আমি বিপুল বিয়ে-বিরোধী। এবং নিরন্তর নারীপন্থী। বিয়ে করেছ, কী মরেছ। একাধিক বিয়ে করে খাঁটি বুঝেছি। বিয়েহীন প্রণয় ও যৌনতা যা দিতে পারে, তার কাছে আইনে এবং ধর্মে বাঁধা বিয়ে নুনহীন ডিম। বউ কখনও প্রেমিকা হয় না। বর কখনও প্রেমিক হয় না। বিয়ে রোম্যান্টিক প্রেমকে খুন করে। এবং ভাগাড়ে ফেলে দেয়। তবে, ভারত একমাত্র দেশ, যে দেশ বিয়ের ভ্যারাইটি স্টোর আবিষ্কার করেছে: কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র পড়ে ১৬ বছর বয়সে শিখলাম, কতভাবে অর্থ নষ্ট করা যায়। সেই সঙ্গে নিজেকেও। এবং জানলাম, বিয়ের মধ্যেও ভারত আবিষ্কার করেছে নানা রঙের চাতুরি: আর্য বিয়ে, প্রাজাপত্য বিয়ে, দৈব বিয়ে, পৈশাচ বিয়ে, রাক্ষস বিয়ে, অসুর বিয়ে, ব্রাহ্ম বিয়ে, গান্ধর্ব বিয়ে। তবে আমার কাছে গান্ধর্ব বিয়েটাই একমাত্র সহনীয় বলেই মনে হল, পুরুষ এবং নারী, উভয়ের দিক থেকেই। এই বিয়ে হল, পরিবারকে না জানিয়ে, বা সরাসরি পরিবারের বিরোধিতা করে, তোয়াক্কাহীন বিয়ে। এই বিয়ের একমাত্র মন্ত্র, সমাজ-সংসার মিছে সব। আর এই বিয়ের শিকড়ে জল ঢালছে বেপরোয়া তাড়না। মনের ও শরীরের।
আশ্চর্যের ব্যাপার, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র বিয়ের প্রসঙ্গে অনেক কথা বলেছে। যা আজও পুরনো হয়নি। যদি না পড়ে থাকেন, প্লিজ পড়ুন। এবং নিজেদের বিয়েটাকে দু’জনে মিলে মিলিয়ে দেখুন। অন্তত একটা সন্ধে দু’জনেরই মন্দ কাটবে না। পুরনো ভারত কী আধুনিক দৃষ্টিতে দাম্পত্যকে দেখেছিল, তার কিছুটা আন্দাজ পাবেন।

এবার শুনুন, ভারত কীভাবে আমার কান ধরে বেশ্যার প্রেমে পড়তে বাধ্য করল।
না, বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’ পড়ে আমি গণিকার প্রেমে পড়িনি। কামসূত্র পড়ার আগে আমি পড়ি ভারতবর্ষের প্রাচীন নাট্যশাস্ত্র। ৪০ বছর বয়সে মারা যাওয়া দাদামশাইয়ের অনাদৃত গ্রন্থসংগ্রহে মাকড়শার জালবদ্ধ হয়ে আমার অপেক্ষায় ছিল ভরতের নাট্যশাস্ত্র। সেই ক্লাসিক আমাকে দিল গণিকাদীক্ষা! শেখাল গণিকা-মহিমা। তখনও আমি কিন্তু বাৎস্যায়ন পড়িনি। ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে বলছেন, “গণিকা সেই রমণী যে বিভিন্ন কলায় পারদর্শিনী। বিভিন্ন শাস্ত্রের ছায়াপাত ঘটেছে যার মনের মুকুরে। এবং যার সংলাপে ফুটে ওঠে সেই বোধ ও বৈদগ্ধ। যে কাব্যে এবং শয্যায় বিদগ্ধা। যে ভাষায়, আলাপে,আচারে, আলস্যে নিপুণা। যে গান, নাচ, বাজনা, অভিনয়, ছলনায় পারঙ্গমা। যে কটাক্ষে আকর্ষণ করে। মুখের ভাষায় সুমিষ্ট ও অনর্গল। শরীর-সংকেতে অব্যর্থ। মাধুর্য যার ক্লান্তিহীন। যে রমণী সাধারণ নারীর সব ‘দোষ’ থেকে মুক্ত, সেই নারীই বিশুদ্ধ গণিকা। কোনও পুরুষ তার ওপর বিস্তার করতে পারবে না ‘সম্পত্তির’ অধিকার। সে কোনও পুরুষের বদ্ধ হয়ে একমাত্র তারই আনুগত্যে জীবন কাটাবে না। তার মন ও শরীর বিচিত্র ডালপালায় পত্রপুষ্পে আবৃত হয়ে নানা সম্পর্কে প্রসারিত হবে। যে পুরুষ তাকে পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে, তার কাছে সে ধরা দেবে। তবে বেশি দিনের জন্য একই প্রেমে পড়ে থাকা এমন রমণীর স্বভাব সহ্য করবে না। তার শরীর ও মনের প্রবণতা তাকে নিয়ে যাবে বহু পুরুষে। এবং সব পুরুষই এমন রমণীর আকর্ষণ প্রবলভাবে অনুভব করবে।”
চলে আসছি ১৮৮৩ সালে। স্যর রিচার্ড বার্টন শেষ পর্যন্ত ‘কামসূত্র’-এর ইংরেজি অনুবাদ করতে পেরেছেন। কাজটা কিন্তু সহজ ছিল না। স্যর রিচার্ড খাস ইংরেজ। তিনি বেনারসে এসেছেন, পুণ্য অর্জন করতে নয়। এসেছেন কামচর্চা করতে। কাশীতে খুলেছেন প্রাচীন ভারতের কামপুঁথি চর্চার একটি প্রতিষ্ঠান। নাম দিয়েছেন: কামশাস্ত্র সোসাইটি! সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু পণ্ডিতের দল তাঁর পিছনে লেগে গিয়েছে। সাহেব তোয়াক্কা না করে ডুব দিলেন কল্যাণ মল্লোর ‘অনঙ্গরঙ্গ’ অনুবাদে।

স্যর রিচার্ড সংস্কৃতে কথা বলতে পারেন। এতটাই ভালো সংস্কৃত জানেন, ‘অনঙ্গরঙ্গ’ অনুবাদের সময় তিনি জানতে পারলেন, বাৎস্যায়নের ‘কামসূত্র’-এর কথা। এবং বোম্বাই থেকে জোগাড় করলেন সংস্কৃত কামসূত্রের একটি পুরনো কপি। জয়পুর আর বারাণসী থেকে আরও তিনটি পৃথক পুঁথি জোগাড় করলেন। শুরু হল রিচার্ডের নিপুণ সম্পাদনা এবং অনুবাদ। ইতিমধ্যে তিনি লন্ডনে খুললেন, ‘কামসূত্র সোসাইটি’। সাহেবদের মধ্যে বেশ উৎসাহ দেখা দিল ভারতের সেক্স-দর্শন বিষয়ে। সাহেবরা বুঝলেন, রিচার্ডের অনুবাদের বাৎস্যায়নের কামসূত্র খুলে দেবে ইউরোপে নতুন সেক্সুয়ালিটির দরজা। নারী-পুরুষের সম্পর্কে যুক্ত হবে নতুন মাত্রা। উপভোগে আসবে অজানা উত্তেজনা। ১৮৮৩ সালে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হল রিচার্ডের অনুবাদে বাৎস্যায়নের
কামসূত্র। এবং হই হই পড়ে গেল। প্রকাশিত হল কামসূত্রের ফরাসি অনুবাদ। প্যারিসের যৌন জীবনে পড়ল ভারতীয় যৌন দর্শন ও পদ্ধতির আনকোরা প্রভাব। বেরল জার্মান ভাষায় বাৎস্যায়নের মাস্টারপিস। ভারতের যৌন সরণি বিস্তৃত হল ইউরোপের বুকে। এবং শুরু হল কামসূত্র নিয়ে ইউরোপের স্কলারদের গবেষণা। খুঁজে পাওয়া গেল হারানো তথ্য: ১৫৭৭-এ বাঘেলা রাজবংশের রাজা বীরভদ্র লিখলেন, ‘কন্দর্পচূড়ামণি’, যেটিকে সাহেবরা বলল, কামসূত্রের অসামান্য ধারাভাষ্য। ১৯২৬ সালে ভারতে প্রকাশিত হল এই হট বুক! কোথায় জানেন? এখন যে জায়গা পাকিস্থানের অঙ্গ। লাহোরে। পাবলিশ করলেন বনারোসি দাস, লাহোরে তাঁর সংস্কৃত পুস্তকালয় থেকে! কিন্তু প্রশ্ন হল, বাৎস্যায়নের কামসূত্র তার বিপুল যৌন সঞ্চারভূমি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছিল? স্যর রিচার্ডের উত্তর: In the beginning the Lord of Beings (Bramha) created men and women, and in the form of commandments in one hundred thousand chapters laid down rules for regulating their existence with regards to Dharma, Artha, Kama. Some of these commandments, namely, those which treated of Dharma, were separately written by Swayambhu Manu; those that related to Artha were compiled by Brihaspati; and those that referred to Kama were expounded by Nandi, the follower of Mahadeva, in one thousand chapters.

তাহলে জানা গেল, ভারতের কামশাস্ত্রের প্রথম লেখক নন্দী। তিনি লিখেছিলেন ১,০০০ চ্যাপ্টারের অবিশ্বাস্য দীর্ঘ যৌনশাস্ত্র। কোক্করের ‘রতিরহস্যে’ এক নন্দিকেশ্বরের দেখা পাই আমরা। তিনিই হয়তো এই নন্দী, যিনি লিখেছেন ভারতীয় কামসূত্রের প্রথম পুঁথি, যা হারিয়ে গিয়েছে চিরকালের জন্য। সেই বিপুল সেক্সশাস্ত্র-কে এডিট করলেন উদ্দালকের ছেলে শ্বেতাশ্বর। এরপর কামশাস্ত্রকে ১৫০ খণ্ডে সম্পূর্ণ করলেন বভ্রব্য। বাৎস্যায়ন অবশ্যই পড়েছিলেন কামনা বাসনা ও শৃঙ্গারের সেই প্রকাণ্ড পুঁথি। এবং তিনিই সেই লেখাকে আরও সংক্ষিপ্ত, সহজ ও সুখপাঠ্য করে মাত্র সাত অধিকরণ, ৩৬ অধ্যায়, ৬৪ প্রকরণে কামশাস্ত্রের আধুনিক সংস্করণ রচনা করলেন।
এবার যাওয়া যাক, রিচার্ডের অনুবাদে কামসূত্র-তে : সেক্স্যুয়াল ইউনিয়ন চ্যাপ্টারটা খুব জরুরি। এই চ্যাপ্টারের বিষয়: প্রথমেই জড়াজড়ি, জাপটা জাপটি, তারপর চুমু খাওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি এবং শরীরের কোথায় কোথায় চুমু ল্যান্ড করলে সমস্ত শরীর সাড়া দেয়। তারপর স্পর্শ এবং প্রেসিং-এর ওপর আলাদা চ্যাপ্টার।
তারপর মার্কিং উইথ নেলস, নখের আঁচড়। তারপর শরীরের কোথায় কোথায় বাইটিং, কামড়ানো। সেটাও কিন্তু শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন বাৎস্যায়ন, ‘দ্য আর্ট অফ বাইটিং’। তারপর, ‘দ্য ভেরিয়াস ওয়েস অফ লায়িং’, বিভিন্নভাবে শোয়ার ভঙ্গি এবং সঙ্গমের নানা পদ্ধতি। এরপর অর্গ্যাজম, অর্থাৎ, রাগমোচনের চূড়ান্ত আনন্দ কী করে পেতে হবে! এইখানে পুরুষের দায়িত্ব সবথেকে বেশি । লিখছেন রিচার্ড। পুরুষকে মনে রাখতেই হবে: ‘Females do not emit as males do.’ নারীর গলন এবং রসে সিক্ত হওয়া আর পুরুষের বীর্যপাত, এক নয়। আকাশ পাতাল তফাত। এবং এই পার্থক্যের গহন সত্যটুকু উপলব্ধি করে খুব সাবধানে এগতে হবে পুরুষকে। পুরুষকে নারীর বিষয়ে কী জানতে হবেই, মুখস্ত করে ফেলুন: The males simply remove their desire, while the female, from their consciousness of desire, feel a certain kind of pleasure, which gives them satisfaction, but it is impossible for them to tell you what kind of pleasure they feel. The fact from which this becomes evident is that males, when engaged in coition (পুরুষ যখন সঙ্গমরত) cease of themselves (ইংরেজি ভাষার কী চমৎকার ব্যবহার) after emission, and are satisfied, but it is not so with females.

অর্থাৎ, বীর্যপাত হয়ে গেলে পুরুষ আপনা থেকেই থেমে যায়। তার আর কিছু করার নেই। খেল খতম। কারণ পুরুষ তখন তৃপ্ত, বাতাসহীন চুপসে যাওয়া বেলুন। রমণীটি কিন্তু তখনও একেবারেই তৃপ্ত নয়। সে তো সবে নিজের সেক্স-স্বপ্নের মধ্যে ক্রমশ উত্তেজিত হচ্ছে। আর তার পুরুষ খালাস! তাহলে রভসের রস আসবে কী করে? বাৎস্যায়নের কামসূত্র বারবার বলছে পুরুষকে শিখতে হবে নিজেকে ধরে রাখার আর্ট, তবে সে তার পার্টনারের সঙ্গে যুগ্মভাবে পৌঁছতে পারবে রাগমোচনের রভসে! বাৎস্যায়ন এই কথাও বলেছেন, অতৃপ্ত রমণীর পক্ষে সতী হয়ে থাকা সহজে সম্ভব নয়।
একটা প্রশ্ন, কয়শন বা সঙ্গম কখন থামা উচিত?
বাৎস্যায়ন তাকান তাঁর চন্দন কাঠের চৌকির পানে। চৌকির বুকে তাঁর পুঁথি। চৌকিটা যেন হাসছে। কী সুন্দর প্রশ্ন! কখন থামবে সঙ্গম? উত্তরটা লিখে নাও বাৎস্যায়ন, বলে তাঁর লেখার চৌকি:
পুরুষের বীর্যপাত ঘটবে সঙ্গমের আপাত শেষে। কিন্তু তখনও চলছে সঙ্গম। কারণ নারীর আর্দ্রতা তখনও শুকিয়ে যায়নি। চলছে তার আনন্দের গলন। যখন রমণীর গলন শেষ হল, যখন রতিশ্রমের ঘাম মুছে সে হাসল তৃপ্তির হাসি, তখন শেষ হল সঙ্গম।

চৌকি আরও একটা কথা বলল, যা বাৎস্যায়নের লেখায় পড়ে ১৮ বছরের আমি কেঁপে উঠেছিলাম:
মনে রেখো, মিলনের পরেও যারা পরস্পরকে ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে আদর করে, তাদেরই বিয়ে করা উচিত।
আর কিছু বলার নেই বাৎস্যায়নের। তিনি লেখনী রেখে দেন চন্দন কাঠের চৌকির ওপর। চৌকির ওপরে আলপনা দিয়েছে যে রমণী, সে শুয়ে আছে শয়নকক্ষে বাৎস্যায়নের পথ চেয়ে নিরাবরণ প্রতীক্ষায়। বাৎস্যায়ন মনে মনে তাঁর লেখার টেবিলের ওপর রাখেন প্রাণের প্রণাম। তারপর এগিয়ে যান শয়নকক্ষের দিকে।
ভিতরে কম্পমান দীপের আলো। সুন্দরীর শরীররেখা, বক্ষবৃন্ত, বিভাজিকা, গভীর নাভি কেমন দেখাচ্ছে দীপের কম্পিত আভাসে, সব জানেন বাৎস্যায়ন। তরুণীর মনের ও শরীরের সব কুঁড়ি ফোটার অমোঘ মন্ত্র জানেন অভিজ্ঞ, প্রৌঢ়, প্রজ্ঞাবান বাৎস্যায়ন।
…………………….. পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব ……………………
পর্ব ৮১: দেশহীন, ভাষাহীন ঝুম্পা
পর্ব ৮০: সাহসী প্রেমের চিঠি লেখা শিখিয়েছিল যে বাঙালি যুগল
পর্ব ৭৯: সুরানিলয়ের টেবিল থেকেই জন্ম নিয়েছিল উপন্যাসের ভাবনা
পর্ব ৭৮: একবিন্দু আত্মকরুণা নেই অঞ্জনের আত্মজীবনীতে
পর্ব ৭৭: অ্যানির ‘দ্য ইয়ার্স’ শেখায় অন্তহীন ইরোটিসিজম-ই জীবনের পরমপ্রাপ্তি
পর্ব ৭৬: জয় গোস্বামীর সাজেশনে মুগ্ধতা জাগাল ‘সিম্পল প্যাশন’
পর্ব ৭৫: যে নারীর শেষপাতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি লেখক
পর্ব ৭৪: সেই তরুণীর জন্য বেঁচে আছে বোকা মনকেমন!
পর্ব ৭৩: কাফকার ভয়-ধরানো প্রেমপত্র!
পর্ব ৭২: থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, কলকাতা বইমেলায় শ্রেষ্ঠাংশে তবে রবীন্দ্র-ওকাম্পো?
পর্ব ৭১: একশো বছরের নৈরাজ্য ও একটি লেখার টেবিল
পর্ব ৭০: আত্মজীবনী নয়, মার্গারেটের ব্রতভ্রষ্ট স্মৃতিকথা
পর্ব ৬৯: রুশদির ‘দ্য ইলেভেনথ আওয়ার’ শেষ প্রহরের, অনিবার্য অন্তিমের দ্যোতক
পর্ব ৬৮: মাংসও টেবিলের কাছে ঋণী
পর্ব ৬৭: ভ্রমণ-সাহিত্যকে লাজলো নিয়ে গেছেন নতুন পারমিতায়
পর্ব ৬৬: নরম পায়রার জন্ম
পর্ব ৬৫: যে বইয়ের যে কোনও পাতাই প্রথম পাতা
পর্ব ৬৪: খেলা শেষ করার জন্য শেষ শব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন জেফ্রি আর্চার
পর্ব ৬৩: সহজ ভাষার ম্যাজিক ও অবিকল্প মুরাকামি
পর্ব ৬২: জীবন তিক্ত এবং আশা করা ভুল, এই দর্শনই বিশ্বাস করেন ক্রাজনাহরকাই
পর্ব ৬১: লন্ডনে ফিরে এলেন অস্কার ওয়াইল্ড!
পর্ব ৬০: পাপ ও পুণ্যের যৌথ মাস্টারপিস
পর্ব ৫৯: মাতৃভক্তির দেশে, মাকে ছেড়ে যাওয়ার আত্মকথন
পর্ব ৫৮: চিঠিহীন এই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রণয়লিপি
পর্ব ৫৭: লেখার টেবিল কি জানে, কবিতা কার দান– শয়তান না ঈশ্বরের?
পর্ব ৫৬: প্রেমের নিশ্চিত বধ্যভূমি বিয়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখার টেবিল জানে সেই নির্মম সত্য
পর্ব ৫৫: জুলিয়া রবার্টসকে হিন্দুধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল একটি বই, একটি সিনেমা
পর্ব ৫৪: আপনার লেখার টেবিল নেই কেন মানিকদা?
পর্ব ৫৩: পুরুষরা যে কতদূর অপদার্থ, ড্রেসিং টেবিলের দেখানো পথে মেয়েরা প্রমাণ করে দেবে
পর্ব ৫২: একটাও অরিজিনাল গল্প লেখেননি শেক্সপিয়র!
পর্ব ৫১: প্রমথ-ইন্দিরার মতো প্রেমের চিঠি-চালাচালি কি আজও হয়?
পর্ব ৫০: হাজার হাজার বছর আগের পুরুষের ভিক্ষা এখনও থামেনি
পর্ব ৪৯: কুকথার রাজনীতিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছেন জর্জ অরওয়েল
পর্ব ৪৮: টেবিলই ওকাম্পোর স্মৃতি, আত্মজীবনীর ছেঁড়া আদর
পর্ব ৪৭: শেষ বলে কিছু কি থাকতে পারে যদি না থাকে শুরু?
পর্ব ৪৬: যে টেবিলে দেবদূত আসে না, আসে শিল্পের অপূর্ব শয়তান
পর্ব ৪৫: ফ্রেডরিক ফোরসাইথকে ফকির থেকে রাজা করেছিল অপরাধের পৃথিবী
পর্ব ৪৪: আম-বাঙালি যেভাবে আমকে বোঝে, দুই আমেরিকান লেখিকা সেভাবেই বুঝতে চেয়েছেন
পর্ব ৪৩: দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে মা দৌড়ে বেরিয়ে গেল, ইবতিসম্-এর উপন্যাসের শুরু এমনই আকস্মিক
পর্ব ৪২: অন্ধকার ভারতে যে সিঁড়িটেবিলের সান্নিধ্যে রামমোহন রায় মুক্তিসূর্য দেখেছিলেন
পর্ব ৪১: বানু মুশতাকের টেবিল ল্যাম্পটির আলো পড়েছে মুসলমান মেয়েদের একাকিত্বের হৃদয়ে
পর্ব ৪০: গোয়েটের ভালোবাসার চিঠিই বাড়িয়ে দিয়েছিল ইউরোপের সুইসাইড প্রবণতা
পর্ব ৩৯: লেখার টেবিল বাঙালির লাজ ভেঙে পর্নোগ্রাফিও লিখিয়েছে
পর্ব ৩৮: বঙ্গীয় সমাজে বোভেয়ার ‘সেকেন্ড সেক্স’-এর ভাবনার বিচ্ছুরণ কতটুকু?
পর্ব ৩৭: ভক্তদের স্তাবকতাই পাশ্চাত্যে রবীন্দ্র-কীর্তি স্থায়ী হতে দেয়নি, মনে করতেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী
পর্ব ৩৬: একাকিত্বের নিঃসঙ্গ জলসাঘরে মারিও ভার্গাস লোসা যেন ছবি বিশ্বাস!
পর্ব ৩৫: জীবনের বাইশ গজে যে নারী শচীনের পরম প্রাপ্তি
পর্ব ৩৪: যা যা লেখোনি আত্মজীবনীতেও, এইবার লেখো, রাস্কিন বন্ডকে বলেছিল লেখার টেবিল
পর্ব ৩৩: ফিওনার সেই লেখার টেবিল মুছে দিয়েছিল মেয়েদের যৌনতা উপভোগের লজ্জারেখা
পর্ব ৩২: বাঙালি নয়, আন্তর্জাতিক বাঙালির সংজ্ঞায় স্পিভাক এসে পড়বেনই
পর্ব ৩১: প্রতিভাপাগল একটি বই, যাকে দিনলিপি বলে সামান্য করব না
পর্ব ৩০: পতিতালয়ের সেই লেখার টেবিল জাগিয়ে তুলেছিল ইসাবেলের হৃদয়-চেতনা
পর্ব ২৯: পাথরে প্রাণ আনে যে টেবিলের স্পর্শ
পর্ব ২৮: নিজের টেবিলকে কটাক্ষ করি, কেন অ্যানে মাইকেলসের মতো লিখতে পারি না?
পর্ব ২৭: নারীর রাগ-মোচনের কৌশল জানে মিলান কুন্দেরার লেখার টেবিল!
পর্ব ২৬: ভালোবাসা প্রকাশের সমস্ত শব্দ পেরিয়ে গিয়েছিল এলিয়টের লেখার টেবিল
পর্ব ২৫: যে টেবিলে জন্ম নেয় নগ্নতা আর যৌনতার নতুন আলো
পর্ব ২৪: প্রেমের কবিতার ভূত জন ডানকে ধরেছিল তাঁর উন্মাদ টেবিলে, মোমবাতির আলোয়
পর্ব ২৩: যে টেবিল আসলে বৈদগ্ধ আর অশ্লীলতার আব্রুহীন আঁতুড়ঘর!
পর্ব ২২: মহাবিশ্বের রহস্য নেমে এসেছিল যে টেবিলে
পর্ব ২১: গাছ আমাদের পূর্বপুরুষ, লেখার টেবিল বলেছিল হোসে সারামাগোকে
পর্ব ২০: টেবিলের কথায় নিজের ‘হত্যার মঞ্চে’ ফিরেছিলেন সলমন রুশদি
পর্ব ১৯: প্রতিভা প্রশ্রয় দেয় অপরাধকে, দস্তয়েভস্কিকে শেখায় তাঁর লেখার টেবিল
পর্ব ১৮: বিবেকানন্দের মনের কথা বুঝতে পারে যে টেবিল
পর্ব ১৭: ‘গীতাঞ্জলি’ হয়ে উঠুক উভপ্রার্থনা ও উভকামনার গান, অঁদ্রে জিদকে বলেছিল তাঁর টেবিল
পর্ব ১৬: যে লেখার টেবিল ম্যাকিয়াভেলিকে নিয়ে গেছে শয়তানির অতল গভীরে
পর্ব ১৫: যে অপরাধবোধ লেখার টেবিলে টেনে এনেছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে
পর্ব ১৪: লেখার টেবিল গিলে নিচ্ছে ভার্জিনিয়া উলফের লেখা ও ভাবনা, বাঁচার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা
পর্ব ১৩: হ্যামনেট ‘হ্যামলেট’ হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল, জানে সেই লেখার টেবিল
পর্ব ১২: রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিল চিনতে চায় না তাঁর আঁকার টেবিলকে
পর্ব ১১: আর কোনও কাঠের টেবিলের গায়ে ফুটে উঠেছে কি এমন মৃত্যুর ছবি?
পর্ব ১০: অন্ধ বিনোদবিহারীর জীবনে টেবিলের দান অন্ধকারের নতুন রূপ ও বন্ধুত্ব
পর্ব ৯: বুড়ো টেবিল কিয়ের্কেগার্দকে দিয়েছিল নারীর মন জয়ের চাবিকাঠি
পর্ব ৮: অন্ধকারই হয়ে উঠলো মিল্টনের লেখার টেবিল
পর্ব ৭: কুন্দেরার টেবিলে বসে কুন্দেরাকে চিঠি
পর্ব ৬: মানব-মানবীর যৌন সম্পর্কের দাগ লেগে রয়েছে কুন্দেরার লেখার টেবিলে
পর্ব ৫: বিয়ের ও আত্মহত্যার চিঠি– রবীন্দ্রনাথকে যা দান করেছিল লেখার টেবিল
পর্ব ৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের টেবিল আর তারাপদ রায়ের খাট, দুই-ই ছিল থইথই বইভরা
পর্ব ৩: টেবিলের গায়ে খোদাই-করা এক মৃত্যুহীন প্রেমের কবিতা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved