
সুবীরদা দায়িত্ব নেওয়া মানে বইটার সম্পাদনা যে অন্য মাত্রায় পৌঁছবে সেটা আমি জানতাম। এর পরে সে বছরের ৪ মে সুবীরদা আমাকে চিঠিতে লিখলেন⎯ “সুবীর ভট্টাচার্যের কাছে শুনলাম যে ‘সুভাষ মুখাপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ’ হ্যান্ডসেটে ছাপা হবে। আমি আগামী ৯ মে পাণ্ডুলিপি দিতে যাবো। তুমি অবশ্যই থেকো।” কবিতাসংগ্রহ-র প্রথম খণ্ডটি ১৯৯২ সালে বাংলা নববর্ষে প্রকাশিত হল। ভূমিকায় সুবীরদা বিস্তারে জানিয়েছিলেন ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ’ বইটির সম্পাদনায় গৃহীত নীতিগুলি। সুবীরদার লেখা ভূমিকা পড়লে আন্দাজ পাওয়া যাবে কী বিপুল শ্রমে তিনি গড়ে তুলতেন এক-একখানি বই।
৬৮.
‘কাল মধুমাস’-এর পরে, ১৯৮৪-র নভেম্বরে আমি সুভাষদার আরও একটি বই পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম⎯ ‘কথার কথা’। বইটি মেজাজের দিক দিয়ে অনেকটা ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বইটার মতোই। প্রথম বার প্রকাশিতও হয়েছিল ‘অক্ষরে অক্ষরে’র ঠিক পরের বছর⎯ ১৯৫৫ সালে। নতুন দে’জ সংস্করণের ভূমিকায় সুভাষদা লিখেছিলেন⎯
“…‘কথার কথা’ বার হচ্ছে দীর্ঘদিন পর। উচিত ছিল দ্বিতীয়বার একটু কলম বুলোবার। কিন্তু এবার তার সময় পাওয়া গেল না। বই বার করা আজকাল যে কী কঠিন কাজ তা লেখকমাত্রই জানেন। দে’জ-এর সুধাংশু দে রাজি হওয়ামাত্র আমাকে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে। আমার মত অপয়া লেখকের বই আর কে ছাপাত?
ছাপা শেষ হওয়ার পর সুবীর ভট্টাচার্য আমাকে ধরিয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের সংখ্যামূলক তথ্যটি, এখন পুরনো হয়ে গেছে। পরের মুদ্রণে তা কালোপযোগী ক’রে নেব। তবে পুরনো তথ্যেও মোটামুটি চিত্রের খুব একটা হেরফের হবে না ব’লেই মনে হয়।…”

সুবীরদার কথা আগেও বলেছি। পরে বিশদে বলব। দে’জের পক্ষ থেকে সুবীরদাই সেসময় যাবতীয় দায়দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘কথার কথা’ বইটি আমার নিজের পড়তে খুব ভালো লাগে। সুভাষদার জাদুকরি গদ্য তো আছেই সেইসঙ্গে বিষয়ভাবনাও একবারে অন্যরকম। বইটার পাতা ওলটাতে গিয়ে এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। দেখি সুভাষদা লিখেছেন⎯
“আচ্ছা, একশো বছর আগেকার লেখা চিঠি যদি তোমাকে কেউ দেয়, সেটা পড়তে তোমার একটু ইচ্ছে করবে না?
জানতে নিশ্চয় তোমার ইচ্ছে করবে সে সময় লোকে চা খেতো কিনা? লোকে প্রথম রেলগাড়ি দেখে কী বলেছিলো? সে সময়কার লোকের ধ্যানধারণাগুলো কী রকমের ছিলো?⎯ চিঠিটার মধ্যে হয়তো তার খবর আছে।
কিন্তু পাঁচ-ছ হাজার বছর আগেকার লেখা কোনো চিঠি যদি তুমি পেতে?
তুমি বলবে: ওঃ, তাহলে কী মজাই যে হতো। কিন্তু সে কথা ভেবে লাভ কী? অত দিন আগেকার মানুষ হরফ চিনতেই শেখেনি, তার আবার চিঠি লিখবে কেমন করে?
তোমার মা কিন্তু একটু আগে হাজার হাজার বছর আগেকার একটা চিঠি থেকেই একটুখানি পড়ে শোনালেন। চিঠিটা তোমার মা তোমার দিদিমার কাছ থেকে পেয়েছেন। তোমার দিদিমা পেয়েছেন তোমার মার দিদিমার কাছ থেকে। তোমার মার দিদিমা পেয়েছেন আবার তোমার দিদিমার দিদিমার কাছ থেকে। এমনিভাবে ধাপে ধাপে সিঁড়ি উঠে গেছে। ঐ সিঁড়িটি বেয়েই চিঠিটা তোমার কাছে পৌঁচচ্ছে। চিঠিটা লেখা নয়, মুখে মুখে বলা। মুখে মুখে বলতে গিয়ে তার মধ্যে আবার কিছু রদবদল হয়ে গেছে।
চিঠিতে বলা আছে হাজার বছর আগেকার মানুষের পুরনো বিশ্বাসের কথা।
মানুষ তখন মনে করতো হাঁচি হওয়া কিংবা বিষম লাগা খুবই খারাপ লক্ষণ। তার মানে, প্রাণ নিয়ে টানাটানি ব্যাপার। সে সময় লোকে মনে করতো শ্বাস-প্রশ্বাসটাই হলো প্রাণ। আমাদের ভাষায় প্রাণ কথাটার দুটো মানেই পাওয়া যায়। প্রাণ বলতে একদিকে যেমন ‘আত্মা’ বোঝায়, তেমনি ‘শ্বাসপ্রশ্বাস’ও বোঝায়। সংস্কৃতের ‘আত্মন্’ আর গ্রীক ভাষায় ‘অ্যাটমস্’ মূলত এক। ‘অ্যাটমস্’ মানে ‘বায়ু’, যা থেকে আবহাওয়া অর্থে ‘অ্যাট্মস্ফিয়ার’ কথাটা গড়ে উঠেছে।”

পুরোনো চিঠির কথা বলতে-বলতে যে এমন জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যায়, তা সুভাষদাই ভাবতে পারেন।
১৯৯০ সাল নাগাদ দে’জ থেকে সুভাষদার কবিতার বই ছাপা নিয়ে আমি দুটো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রথমত, তাঁর পুরোনো কবিতার বইগুলো আলাদা-আলাদা বই হিসেবে ছাপা হবে এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর কবিতাসংগ্রহ খণ্ডে-খণ্ডে দে’জ থেকে প্রকাশ করা হবে। পুরোনো বই ছাপাটা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল না, বিশেষ করে কবির জীবদ্দশায়। এই সময় সুভাষদার লেখা একটা চিঠিও পাচ্ছি। ১৯৯০-এর ৫ এপ্রিল তিনি আমাকে একটি টাইপ করা চিঠিতে লিখছেন⎯
“সবিনয় নিবেদন,
অনেকদিন আগে আপনি আমার কিছু বই ও পাণ্ডুলিপি অনুগ্রহ ক’রে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রকাশযোগ্য কিনা বিবেচনা করার জন্যে। কথা ছিল এক সপ্তাহ পরে আপনাদের রায় জানাবেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ফেরত পাওয়ার আশায় রইলাম।…”

চিঠির বাঁ-দিকের কোনায় দেখছি, আমি ২২ এপ্রিল চিঠিটা ফাইলে রাখতে বলে তার নীচে লিখে রেখেছি ‘কথা হয়েছে’। আসলে সেসময় সুভাষদার কাছ থেকে অনেকগুলো বই-ই নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সেসব বইয়ের পুনর্মুদ্রণে তো খানিকটা সময় লাগেই। ১৯৯২ সালে দে’জ থেকে পর-পর তাঁর কবিতার বই ছাপা হতে থাকল। ‘পদাতিক’ দিয়ে শুরু করে একে-একে প্রকাশিত হল⎯ ‘চিরকুট’, ‘যত দূরেই যাই’, ‘ফুল ফুটুক’, ‘দিন আসবে’, ‘এই ভাই’। প্রতিটি বই দেবব্রত ঘোষের একধরনের মলাটে, প্রতিটিই ক্রাউন সাইজে ছাপা।

এই বইগুলির মধ্যে ‘দিন আসবে’ বইটি সুভাষদার নিজের কবিতা নয়⎯ অনুবাদ কবিতা, প্রথমবার প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে। ‘দিন আসবে’র কবিতাগুলো নিকোলা ভাপ্ৎসারভের কবিতার অনুবাদ। কবি সম্পর্কে সামান্য পরিচিতিও তিনি দিয়েছিলেন। ১৯৪২-এর ২৩ জুলাই বুলগারিয়ার ফাসিস্ত সরকার কমিউনিস্ট কবি নিকোলা ভাপ্ৎসারভকে ফাঁসি দেয়। এই বইটির অনুবাদ কবিতাগুলো কীভাবে হয়ে উঠল সুভাষদা তারও হদিশ দিয়েছেন। ১৯৫৮-’৫৯ সালে তিনি মস্কোয় গিয়ে সেখানকার প্রাচ্যতত্ত্ব সংস্থার কর্মী মাদাম বিকোভা-র বাড়িতে যান। মাদাম বিকোভা বাংলা ভাষা নিয়েই কাজ করতেন। তাঁর স্বামী ছিলেন বুলগারি ভাষার অধ্যাপক। সুভাষদা লিখছেন⎯
“…কথায় কথায় আমি নিকোলা ভাপ্ৎসারভ প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। ভাপ্ৎসারভের নাম করতেই দেখলাম তাঁর চোখেমুখে ভারি উৎসাহ ফুটে উঠল। বইয়ের তাক থেকে তক্ষুনি টেনে বার করলেন ভাপ্ৎসারভের কবিতার বই। তারপর মূল বুলগারী ভাষায় একটার পর একটা কবিতা পড়ে গেলেন। না বুঝলেও বেশ লাগছিল শুনতে। আমাদের সঙ্গে ছিল বারিস্। বারিস্ও ভালো বাংলা জানে। দু-একটি কবিতা অনুবাদ করতে বলায় মাদাম বীকোভার স্বামী রুশ প্রতিশব্দ বসিয়ে বসিয়ে খুব সাদামাঠাভাবেও যা বললেন, বারিস্ আমাকে তার বাংলা ক’রে শোনাল। শুনে একটু অবাক হলাম। ইংরিজি অনুবাদে যে সব জায়গা খুব জ’লো লেগেছিল, বারিসের মুখে শুনে সে জায়গাগুলো অনেক বেশি সুন্দর লাগল। মাদাম বীকোভার স্বামীকে আমি জিজ্ঞেস করলাম⎯ আচ্ছা, রুশ অনুবাদে ভাপ্ৎসারভ কি আপনি পড়েছেন? উনি বললেন পড়েননি। ব’লেই রুশভাষায় লেখা একটা বই টেনে বার ক’রে বললেন, প’ড়ে দেখা যাক তো। তারপর দেখি পড়তে পড়তে নিজের মনেই তিনি বিরক্তি প্রকাশ করছেন। শেষ পর্যন্ত বইটা সরিয়ে রেখে বললেন⎯ কিচ্ছুই হয় নি। কবিতার না ধরতে পেরেছে মানে, না ফোটাতে পেরেছে রস।”

এরপরই সুভাষদা নিজের অনুবাদ প্রসঙ্গে একবারে নিজস্ব ভঙ্গিতে মন্তব্য করেছেন⎯ ‘বুলগার থেকে হয়েছে ইংরিজি। আর আমি? সেই করেছি ইংরিজির অনুবাদ। কথায় বলে, সাত নকলে আসল খাস্তা। কাজেই এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও কোনো কবিতা কিংবা কোনো কবিতার একাংশও যদি পাঠকের ভালো লাগে, তাহলেও অনুবাদক হিসাবে আমি খানিকটা সান্ত্বনা পাব। সত্যি বলতে কি, নিকোলা ভাপ্ৎসারভের জীবনই আমাকে তাঁর কবিতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।’ অনুবাদকের কথায় নিকোলা ভাপ্ৎসারভের কবিতায়, ‘নীরক্ত পাণ্ডুরতা নেই, প্রগল্ভ চিৎকার নেই। আছে যন্ত্রণার কথা, ভালবাসার কথা। আছে দাঁতে দাঁত দিয়ে সংগ্রামের কথা। আছে মানুষের অনিবার্য জয়ের কথা। অফুরন্ত আশার কথা।’
সুভাষদার ‘কবিতাসংগ্রহ’ কে সম্পাদনা করবেন সেটা নিয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে খুব একটা দেরি হয়নি। সুভাষদার নিজের আগ্রহে এবং যতদূর মনে পড়ছে শঙ্খদাও তা-ই চেয়েছিলেন⎯ আমরা ঠিক করি এই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করব সুবীর রায়চৌধুরীর ওপর। সুবীর রায়চৌধুরী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। অবশ্য এটাই তাঁর একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সম্পাদকদের একজন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর জানাবোঝার পরিধি ছিল অসাধারণ। সুবীরদার সঙ্গে অবশ্য আমার পরিচয় অনেক আগে থেকেই ছিল। দে’জ থেকে আমি ১৯৭৬ সালেই কিশোরদের জন্য সুবীরদার লেখা ‘মেলা থেকে ঝামেলা’ বইটি প্রকাশ করেছিলাম। সুবীরদার অন্য কাজের প্রসঙ্গে পরে আসব। আপাতত তাঁর সম্পাদনায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কবিতাসংগ্রহ’-র কথা বলি।

আমরা চাইলেও নানা কাজে জড়িয়ে থাকা সুবীরদার পক্ষে এই গুরুদায়িত্ব নেওয়া সম্ভব হবে কি না সেটা একটা বড় চিন্তার কারণ ছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল সুভাষদার বইয়ের ব্যাপারে সুবীরদা হয়তো আপত্তি করবেন না। কার্যত তাই হল। তিনি নিজের ব্যস্ততার মধ্যেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কবিতাসংগ্রহ’ সম্পাদনা করতে রাজি হলেন। তবে হাতের কাজগুলো খানিকটা শেষ করে এই কাজে হাত দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। ১৯৯১-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি আমি তাঁকে চিঠিতে লিখেছিলাম⎯
“অধ্যাপক শ্রীসুবীর রায়চৌধুরী
তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
সবিনয় নিবেদন,
‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যসংগ্রহ’ আপনি সম্পাদনা করতে সম্মত হয়েছিলেন। আমি ভালো করেই জানি, আপনি এতদিন ব্যস্ত ছিলেন। তাই আপনার ওপর অভিমান করার কোনো কারণই নেই। সুভাষদা ব্যস্ত হয়েছেন; তাঁকে আপনার ব্যস্ততার কথাও জানিয়েছি।
যাই হোক্, সম্পাদনা আপনাকেই করতে হবে। আমি তার জন্য অপেক্ষা করে রইলাম। নমস্কারান্তে…”

সুবীরদা দায়িত্ব নেওয়া মানে বইটার সম্পাদনা যে অন্য মাত্রায় পৌঁছবে সেটা আমি জানতাম। এর পরে সে বছরের ৪ মে সুবীরদা আমাকে চিঠিতে লিখলেন⎯ “সুবীর ভট্টাচার্যের কাছে শুনলাম যে ‘সুভাষ মুখাপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ’ হ্যান্ডসেটে ছাপা হবে। আমি আগামী ৯ মে পাণ্ডুলিপি দিতে যাবো। তুমি অবশ্যই থেকো।” কবিতাসংগ্রহ-র প্রথম খণ্ডটি ১৯৯২ সালে বাংলা নববর্ষে প্রকাশিত হল। ভূমিকায় সুবীরদা বিস্তারে জানিয়েছিলেন ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ’ বইটির সম্পাদনায় গৃহীত নীতিগুলি। সুবীরদার লেখা ভূমিকা পড়লে আন্দাজ পাওয়া যাবে কী বিপুল শ্রমে তিনি গড়ে তুলতেন এক-একখানি বই। তিনি লিখছেন⎯
“…‘পদাতিক’ থেকে ‘ফুল ফুটুক’ পর্যন্ত পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ’-র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হ’লো। প্রতিটি কবিতার সঙ্গে প্রথম সংস্করণের পাঠ মিলিয়ে দেখা হয়েছে। তাছাড়া যেখানে পত্রিকায় মুদ্রিত রূপের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেখানে গ্রন্থের সঙ্গে তার অমিলও দেখিয়েছি। এই পর্যায়ের কোনো কবিতার পাণ্ডুলিপিই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে নেই। ফলে প্রথম সংস্করণকেই ধ’রে নিতে হবে আদিপাঠ।
সুভাষ মুখোপাধ্যায় বানান বিষয়ে খুঁতখুঁতে, কিন্তু তাঁর নিজের কোনো বানানসাম্য নেই। তিনি ‘ভালবাসা’ আর ‘ভালোবাসা’, ‘মত’ আর ‘মতো’ (একই অর্থে) দুরকম বানানই ব্যবহার করেন। তিনি লেখেন ‘নাত্নি’, অন্যদিকে ‘কুমীর’, ‘গুলী’, ‘রঙীন’, ‘সঙীন’, ‘বুড়ী’-তে দীর্ঘ-ঈ বর্জিত হয়নি। ‘গুণি’, ‘গোণে’, ‘উপোষ’ এসব বানানও লক্ষ করি। তাঁর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হস্-চিহ্নের বাহুল্য। যেমন, ‘আল্সে’, ‘কল্সী’, ‘জ্বল্জ্বল্’, ‘পাখ্না’। আমি প্রাপ্ত বানান অপরিবর্তিত রেখেছি।
এবারে সম্পাদনাপদ্ধতি বিষয়ে দু-একটা কথা বলা দরকার। অনেক সময় নতুন পৃষ্ঠায় নতুন স্তবক শুরু হয়েছে। এরকম ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদের স্বাতন্ত্র্য বোঝাবার জন্য শুরুতে একটু ফাঁক অথবা ইন্ডেন্ট করা হয়েছে। অবশ্য বিভিন্ন সংস্করণে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের স্তবক ও পঙক্তি-বিন্যাসের বদল ঘটেছে। এ-ব্যাপারে আমরা সাধারণত শেষতম মুদ্রিত পাঠের অনুসরণ করেছি।…”

সুবীরদার সম্পাদনা নিয়ে অধ্যাপক অমিয় দেব তাঁর ‘সুবীর রায়চৌধুরী’ প্রবন্ধে লিখেছেন⎯
“কী আদর্শ ছিল তাঁর রচনাসম্পাদনার? রচনা সংগ্রহ, লুপ্তপ্রায় মুদ্রণের পুনরুদ্ধার, পাণ্ডুলিপি সন্নিবেশে পাঠনির্ণয়, পাঠভেদ নিরূপণ ইত্যাদি ইত্যাদি; সেইসঙ্গে রচনা সংকলন, কালানুক্রমিক কিংবা প্রয়োজন হলে বিষয় ও কাল উভয় অনুক্রমে ইত্যাদি ইত্যাদি: না কি আরও কিছু? সুবীর রায়চৌধুরীর সম্পাদনার এক বৈশিষ্ট্য ছিল বিশদ গ্রন্থপরিচয়, আর গ্রন্থপরিচয় মানে কোন গ্রন্থ কবে বেরিয়েছিল, কোন প্রকাশক কর্তৃক, কী মূল্যে, কোন মাপের কী কাগজে, ক-পৃষ্ঠার ভূমিকা ছিল কি ছিল না, গ্রন্থটি নিজেই কোনো সংকলন হলে কোন কোন রচনার সংকলন, ক-টি সংস্করণ গ্রন্থটির এবং সংস্করণ কালে কী কী পরিবর্তন ইত্যাদি ইত্যাদি গ্রন্থপরিচয়ের যে-প্রামাণ্য পদ্ধতি প্রচলিত, শুধু তারই নিখুঁত প্রযোজনা নয়, আরও কিছু। আসলে ওই আরও কিছুতেই ছিল তাঁর প্রধান কৃতিত্ব। লেখা যেমন লেখা তেমনি লেখা পাঠও। সেই পাঠের হদিশ না দিয়ে তাই গ্রন্থপরিচয় যথার্থ হয় না। বিশেষ করে যদি গ্রন্থ হয় বুদ্ধদেব বসুর ‘বন্দীর বন্দনা’ বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পদাতিক’, তাহলে যাঁরা বুদ্ধদেব বসুর ‘রচনাসংগ্রহে’র প্রথম খণ্ড পড়েছেন বা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কবিতাসংগ্রহে’র প্রথম খণ্ড, তাঁরা জানেন সুবীর রায়চৌধুরী পাঠপরিচয়ের কী আদর্শ স্থাপন করে গেছেন।”
সুভাষদার কবিতাসংগ্রহের প্রথম খণ্ডের পর দ্বিতীয় খণ্ডে সুবীরদা আবার সম্পাদনা পদ্ধতিতে সামান্য বদল করেছেন। দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন⎯ “প্রথম খণ্ডে জানিয়েছিলাম যে, কোনো নতুন পৃষ্ঠায় নতুন স্তবক শুরু হ’লো তা নির্দেশের জন্য প্রথম শব্দটি ইনডেন্ট করা হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে ৭৯ পৃষ্ঠা পর্যন্ত এই রীতি অনুসৃত। পরে কবির ইচ্ছানুসারে পুরো স্তবকটিই ডানদিকে সরিয়ে দিয়েছি।”

সুবীরদার কাছে এই কবিতাসংগ্রহ কেবলমাত্র একটা বই নির্মাণের চেয়ে বাড়তি কিছু ছিল। তাঁর কথায়⎯ ‘প্রিয় কবির গ্রন্থসম্পাদনা আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা’। কবির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্কের কারণে কবিতাসংগ্রহ নির্মাণের সময় তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ থেকেছে, মুখোমুখি কথা বলার মতোই চিঠিপত্রেও যোগাযোগ ছিল। তেমনই একটা চিঠি ছাপা হয়েছিল দ্বিতীয় খণ্ডে, ১৯৯১ সালের ১০ ডিসেম্বরের চিঠিতে সুভাষদা লিখছেন⎯
“স্নেহের সুবীর,
তোমার চিঠি।
(১) ১৯৫৭-র বিন্যাসই বোধহয় ভালো। আগের সংস্করণে কেন ও-রকম করা হয়েছিল মনে নেই। একটু বেশি জায়গা নেবার জন্যে কি? নাকি পাঠকদের পড়ার সুবিধের জন্যে?
অবশ্য আমার পছন্দ:
‘স্ট্রাইক! স্ট্রাইক! যেখানেই থাকি, ময়দানে হবো সকলে সামিল আজকে’
অর্থাৎ, টানা এক লাইনে।
অথবা তোমার যেটা ইচ্ছে!
(২) ‘উন্মত্ত বন্যার স্তম্ভ ফাঁপে…’
অবশ্যই ‘ফাঁপে’।
ভালবাসা জেনো
সুভাষদা”

আমি প্রথম খণ্ডের ‘চিরকুট’ বইয়ের ‘উনত্রিশে জুলাই’ কবিতাটা খুলে দেখলাম ‘স্ট্রাইক! স্ট্রাইক! যেখানেই থাকি আজকে…’ লাইনটা সুবীরদা সুভাষদার পছন্দ অনুযায়ী সাজাননি। এখানেই একজন সম্পাদকের নিষ্ঠা প্রমাণিত হয়⎯ প্রিয় কবির অভিপ্রায় জেনেও তিনি কাজের প্রতি নিষ্ঠ থাকতে যে সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সেটিই নিয়েছেন। এবার অমিয়দা প্রথম খণ্ডের যে-গ্রন্থ পরিচিতির কথা লিখেছেন তার কথা বলি। প্রথম খণ্ডে প্রায় ৬০ পাতার গ্রন্থ পরিচয় আছে। অবশ্য প্রথম খণ্ড বেরুবার পরও তাঁর তথ্যসংগ্রহ থামেনি। সেগুলো ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ ১ প্রসঙ্গে সংযোজন’ নাম দিয়ে দ্বিতীয় খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। পরে অবশ্য সবটাই প্রথম খণ্ডে এসে গেছে। আসলে একবছরের ব্যবধানে প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে যখন দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হল, তার অল্পদিনের মধ্যেই প্রথম খণ্ডটি শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় খণ্ডটি ছাপা প্রায় শেষ হয়ে যাবার সময় জানা যায় যে, ‘দিন আসবে’ বইটি দিয়েই এই সংগ্রহের দ্বিতীয় খণ্ড শুরু হওয়া উচিত ছিল। ‘দিন আসবে’র প্রথম সংস্করণ পাওয়া যায়নি। পরের সংস্করণে অবশ্য সেসব ঠিক করে নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডে মুর্শিদাবাদের কাটরা মসজিদে সুভাষদা, শঙ্খদা এবং প্রতিমা-বউদির একসঙ্গে একটি ছবি; আর গঙ্গার ধারে সুভাষদার একার একটি ছবি ছাপা হয়েছে। সুবীরদা লিখেছেন, দু’টি ছবিই ‘প্রতিমা ঘোষের সৌজন্যে প্রাপ্ত।’

প্রতিমা ঘোষের ‘তিনি এলেই বসন্ত’ লেখাটিতে এই ছবিদু’টির ইতিহাস জানা যায়। প্রতিমা-বউদি লিখেছেন⎯
“প্রায় চল্লিশ বছর আগে পরিচয় হয়েছিল। এম. এ. পাশ করে বহরমপুরে মেয়েদের কলেজে পড়াতে যাই, দুজনে মিলে রানীর বাগানে ‘সরলাকুটির’ নামে ছিমছাম একটি বাড়িতে সংসার পাতি। আর, সংসার হবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ইচ্ছে হয় সবাই আসুক এখানে বেড়াতে, সবাই। এইরকম সময়ে এল সুভাষদার একটা চিঠি। জানিয়েছেন কয়েকদিন এসে থাকবেন এখানে।
সুভাষদা আসবেন? আমরা নানা কল্পনায় মশগুল হয়ে উঠি, কী করি, কোথায় যাই, কীভাবে কাটবে কদিন।
এলেন সুভাষদা, শুধু কথার রসে দিনগুলো ভরে উঠল। কবি ও ভক্তের এমন একান্ত দেখা⎯ কথার ফুলঝুরি ঝরতে লাগল। কিন্তু আমার হলো এক মুশকিল। নতুন বাড়িতে নতুন উদ্যমে সত্যিকারের ফুল ফুটিয়ে ফেলেছিলাম সামনের আঙিনায়, নানারকম মরশুমি ফুল। কিন্তু বাড়িতে পা দিয়েই, সুভাষদা বলে উঠলেন⎯ ‘এ করেছ কী প্রতিমা, এতটা জায়গা নষ্ট করেছ।’ ‘নষ্ট? নষ্ট করলাম কীভাবে?’ উনি বললেন: ‘এসব না করে তরকারি লাগাতে পারোনি? কত বেগুন, কত টম্যাটো হতে পারত এতটা জায়গায়।’ এই হলেন সুভাষদা। আমি তো মহা অপ্রস্তুত। ভেবেছিলাম এত সুন্দর ফুল ফোটানো দেখে একজন কবি খুশি হয়ে কতই কী বলবেন। কিন্তু না. ফুলের বদলে সবজিই তাঁর পছন্দ।
…
সুভাষদাকে নিয়ে আমরা বেড়াতে যাই মুর্শিদাবাদ, লালবাগ যার আরেক নাম; যাই মুর্শিদকুলি খাঁর কবরে, নিজের তৈরি কবর-মসজিদ মুর্শিদকুলির, কাটরার মসজিদ নামেই এর খ্যাতি⎯ মুর্শিদাবাদের বুকে বেঁচে-থাকা সবচেয়ে পুরোনো সৌধ। গেলাম জাফরাগঞ্জ, মোতিঝিল, খোসবাগ⎯ সব জায়গায়।
সার-সার রিক্সা চলেছে, আর উনি কেবলই আমাকে খ্যাপাবার জন্য টুকরো টুকরো মজার মন্তব্য করে চলেছেন। একটা উড়ন্ত চড়াই দেখিয়ে বলছেন, ‘দেখো, দেখো, একটা ময়না উড়ে গেল।’ কিংবা, কোনো আমগাছ দেখিয়ে ‘প্রতিমা, এটা কি কাঁটালগাছ?’ কবি বিষয়ে আমার ধারণাটাকে ভেঙে দেবার জন্য প্রাণপণ প্রমাণ করতে চান যে উনি গাছ-পাখি কিছুই চেনেন না। একটা ক্যামেরা ছিল আমাদের। গঙ্গার তীরে অথবা কাটরার মসজিদের মিনারের কাছে ছবি তোলা হলো সদলে, সঙ্গে আমার মাসতুতো ভাইবোনেরা। গঙ্গার ঢালু পাড়ে বসে আছেন সুভাষদা, ওঁর এরকম একটা একলা ছবি তোলা হলো। সেইসব ছবির একটি-দুটি সুবীর⎯ সুবীর রায়চৌধুরী⎯ ব্যবহার করেছিল সুভাষদার কবিতা-সংগ্রহ সম্পাদনার সময়ে।’

সুভাষদার কবিতাসংগ্রহের কাজ প্রায় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে সুবীরদার আকস্মিক প্রয়াণে। ততদিনে কবিতাসংগ্রহের তৃতীয় খণ্ড প্রেসে চলে গেছে। ১৯৯৩ সালের ৮ অক্টোবর সুবীরদা চলে গেলেন। তখন তাঁর ৬০ বছরও বয়স হয়নি।
সুবীরদার পরে এই কবিতাসংগ্রহ সম্পাদনার দায়িত্ব নেন সুবীরদার বন্ধু ও সহকর্মী, বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সৌরীন ভট্টাচার্য। ৩ থেকে ৫ নম্বর খণ্ড তিনিই সম্পাদনা করেছেন। ৩ নম্বর খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৯৯৪-এর বইমেলার সময়ে, ৪ নম্বর খণ্ড সে বছরেরই ডিসেম্বরে। তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় সৌরীনদা লিখেছেন⎯ “…এই ভূমিকা তো আমার লেখার কথা ছিল না। ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ’ তৃতীয় খণ্ডের পাণ্ডুলিপিও সুবীর রায়চৌধুরী প্রেসে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাকি কাজ করবার আর তাঁর সময় হয়নি। সেই অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব আমার অযোগ্য হাতে এসে পড়ে। আমার দ্বিধা সংকোচকে বিন্দুমাত্র আমল না দিয়ে যাঁরা আমাকে এ কাজের ভার দিয়েছিলেন তাঁদের কাছে একটা স্বীকারোক্তি আমাকে করতেই হবে। এসব কবিতার এবং সেই সুবাদে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অন্য কবিতাও নতুন করে আস্বাদ নেবার দুর্লভ সুযোগ তাঁরাই আমাকে দিয়েছেন। প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় সম্পাদকীয় নিবেদনে বলা হয়েছিল প্রিয় কবির গ্রন্থসম্পাদনা আনন্দের কাজ। আমার বেলায় কথাটা এত অমোঘ হয়ে আসবে বুঝতে পারিনি।” তবে সৌরীনদাও ৩ থেকে ৫ নম্বর⎯ এই তিনটি খণ্ড অসামান্য সম্পাদনা করেছেন। তিনিও গভীর অভিনিবেশে গ্রন্থপরিচয় তৈরি করেছেন।
‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতাসংগ্রহ’-র পঞ্চম খণ্ডের কাজ চলাকালীন সৌরীনদা আমাকে কয়েকটা চিঠি লিখেছিলেন। ১৯৯৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর তিনি লিখলেন⎯
“১. Press-এর জন্য যে কাগজটা এর সঙ্গে দিলাম সেটা একটু দেখবেন। সুভাষদার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ‘যা রে কাগজের নৌকো’ থেকে ঐ কটা কবিতা কম্পোজ করানো দরকার। নইলে ঐ বইটা একেবারে বাদ যাচ্ছে। আপনি একটু প্রেসের সঙ্গে কথা বলবেন। অন্য বদল যেগুলো বলেছি, সেগুলো করতে পারলে ভালো হয়। সম্ভব না হলে কিছু করার দরকার নেই।
২. সব শেষে ‘সংযোজন’ অংশে নতুন কবিতার কয়েকটা কি দেওয়া সম্ভব হবে? যদি হয় তাহলে সুভাষদাকে বলতে হবে, উনি বেছে দেবেন।
৩. ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র বিভিন্ন সংস্করণের গ্রহণ-বর্জন পরিবর্তনের একটা ছোট তালিকা করে দিলে ভালো হয়। এটা একেবারে শেষে থাকবে। আমার কাছে প্রথম সংস্করণের বই আছে। দে’জ সংস্করণের বইগুলি কি পাঠানো সম্ভব হবে?
সুভাষদার সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছে। আপনিও কথা বলে নিতে পারেন। সুভাষদার ফোন এখন ভালো আছে। আমার ফোন এখনো খারাপ।”

এই চিঠির সাতদিনের মাথায় তিনি আবার লিখলেন⎯ ‘টাইটেল ফর্মার প্রুফ আমার কাছে রইল। নতুন কবিতা যেগুলো কম্পোজ করা হচ্ছে সেগুলো হয়ে এলে তো পৃষ্ঠাসংখ্যা বদলে যাবে। শেষ পর্যায়ে দেখে ঠিক করে দেব। ১১-১৩ নং ফর্মার প্রুফ দেখে দিয়েছি। নতুন কবিতা জায়গামতো বসিয়ে দেবেন।’ আবার ১৯ সেপ্টেম্বর লিখলেন⎯ ‘প্রুফ সব দেখে পাঠিয়ে দিলাম। টাইটেল ফর্মাতে সূচিপত্র নতুন কবিতার জন্য পৃষ্ঠাসংখ্যা বদলে ঠিক করে দিয়েছি। ভূমিকা অংশে সুভাষদা বা প্রকাশকের তরফেও আপনি যদি কিছু লেখেন তো সেটা কম্পোজ করিয়ে দেবেন।’

পঞ্চম খণ্ডে কেন, কোনও খণ্ডেই সুভাষদা কিছু লেখেননি। ‘প্রকাশকের নিবেদন’ জাতীয় কিছুও আমি প্রথমে লিখিনি। অনেক পরে প্রথম দু’টি খণ্ডের নবতর সংস্করণে ‘প্রকাশকের নিবেদন’ যুক্ত হয়েছে। তবে সৌরীনদা শেষ খণ্ডের ভূমিকায় একটা অত্যন্ত জরুরি কথা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। তিনি লিখছেন⎯ ‘আমাদের অন্য আরো অনেক কবির মতোই, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণেরও কোনো নিয়মিত আয়োজন করা হয়নি। কাজটা জরুরি, বোধ হয় করা উচিত। ব্যক্তিগত অভ্যাসের জোরে বা কখনো কোনো বন্ধুর বা অনুরাগীর আকস্মিক আগ্রহে হয়তো কারো কারো কিছু পাণ্ডুলিপি আমরা পেয়ে যেতে পারি, তার বেশি কিছু না। অথচ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বেলায় তাঁর অসম্ভব আপাত সরল, প্রায় যেন খেলাচ্ছলে লেখা সব পংক্তির পেছনে যে-পরিমাণ কাটাকুটি, পরিবর্তন, পরিমার্জন, এ-লাইনের সঙ্গে ও-লাইন জুড়ে দেওয়া, এ স্তবকের সঙ্গে সে স্তবক মেলানো ইত্যাদি ব্যাপার রয়েছে সে তো পাণ্ডুলিপি পড়তে না পেলে কোনোদিনই আমরা টের পাব না। কবিতার সবটুকু বোধ হয় শুধুমাত্র কবিতার মধ্যেই থাকে না, কবিতা রচনার মধ্যেও কিছু থেকে যায়। সেই পাওনার জন্য চাই পাণ্ডুলিপি।’

একুশ শতকেও কথাগুলো সত্যি বলে আমি মনে করি। কিন্তু আমাদের সংরক্ষণের মানসিকতায় খুব একটা বদল এসেছে বলে আমার অন্তত মনে হয় না।
লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……
পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ
পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!
পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!
পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়
পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়
পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়
পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!
পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু
পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না
পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম
পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না
পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী
পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা
পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা
পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়
পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল
পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি
পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্সা’
পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়
পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’
পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল
পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!
পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই
পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি
পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত
পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী
পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের
পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়
পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!
পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!
পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো
পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন
পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved