Robbar

সাহসী প্রেমের চিঠি লেখা শিখিয়েছিল যে বাঙালি যুগল

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 11, 2026 9:33 pm
  • Updated:February 11, 2026 9:33 pm  

১৪ ফেব্রুয়ারির কথা মনে রেখে চলুন আমরা বরং যাই, এক বাঙালি প্রেমে। এঁরা প্রাচীন কলকাতার পুরনো বাঙালি। এক জোড়া তরুণ-তরুণী। দু’জনেই ফরাসি ভাষায় তুখোড়। প্রাচীন যুগের মানুষ হয়েও এঁরা আমাদের থেকে আধুনিক। অন্তত লেখাপড়ায়, ভাবনায়, ভাষায় ও প্রণয় প্রকাশে। আর এই তরুণ-তরুণীর মাঝখানে যে বাঙালিটি দাঁড়িয়ে অব্যর্থ দাবার চাল দিচ্ছেন, তিনি নায়িকার কাকা!

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

৮০.

‘কাঠখোদাই’-এর ৮০তম পর্বে পৌঁছনোর মুহূর্তকাল আগে আমার লেখার টেবিল কিছুটা বেয়াড়া স্টাইলে আরও একবার মিলান কুন্দেরার ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ উপন্যাসের ভাবনাভূমিতে কিঞ্চিৎ খোঁড়াখুড়ি করতে চেয়েছিল।

প্রথমেই বলি, এই উপন্যাসটা আমি অন্তত ৫-৭ বার পড়েছি। যখন যেখান থেকে খুশি পড়া যায় এই বই। আর ঢুকলেই আটকে যেতে হয়! এই উপন্যাসের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ৩০ বছর আগে। আজও পুরনো হল না কুন্দেরার এই লেখা! তাঁর কোনও লেখাই কি বাসি হয়েছে? আরও একটা কথা, এতবার পড়েও আমি শেষ করতে পারিনি ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’। কেননা এই গল্পের কোনও শেষ নেই। সমাপ্তির দাঁড়ি পড়েছে। শেষ বাক্যও লেখা হয়েছে। ভুলতে পারবেন না কোনও দিন: The man spoke, all the others listened with interet, and their bare genitals stared stupidly and sadly at the yellow sand.
তাদের ন্যাংটো পুরুষাঙ্গগুলো বোকার মতো দুঃখিতভাবে তাকিয়ে রইল হলুদ বালির পানে। শেষ হয়েও শেষ হল কি? আরও একটা কথা, বিশ্বাস করুন, বিশ্বসাহিত্যে তুল্য কোনও উপন্যাস আমার জানা নেই। এই উপন্যাস স্বাদে, গন্ধে, ভাষায়, ভাবনায় আনকোরা অন্যরকম। এবং এত সুখপাঠ্য, কী বলব! অথচ দার্শনিক উপন্যাস! অনেকগুলি বিরোধী ভাবনার খেলার মাঠ এই উত্তর-আধুনিক সৃজন।

মধ্যমণি: মিলান কুন্দেরা

এই উপন্যাসে কুন্দেরা একটা দীর্ঘ বিতর্ক-সভা গড়ে তুলেছেন। কৌতুকবোধ, বিদ্রুপ, শ্লেষ, ঠাট্টা, কলহ, মুখখারাপ– সব কিছুর অবিরল মিশ্রণে জমে উঠেছে এই ইন্টেলেকচুয়াল ঝলক। যাঁরা অংশ গ্রহণ করছেন তাঁদের নাম: জিওভানি বোকাচিও, পেত্রার্ক, উলফগাং গোয়েটে এবং পল ভার্লেন।

এবার আসল মজা। এই বিতর্ক সভার সবাই কবি, লেখক, ইন্টেলেকচুয়াল। এবং সবাই ইউরোপিয়ান। এবং কুন্দেরা ধরে নিচ্ছেন, আমরা এঁদের সম্বন্ধে কিছু খবর অন্তত জানি। একেবারে না জানলে মজাটা পাওয়া যাবে না। বিতর্কটা উপভোগ করতে কতটুকু এঁদের বিষয়ে জানতে হবে? এইটুকু:

বোকাচিও (১৩১৩-১৩৭৫): ইতালিয়ান লেখক, কবি এবং মানব-দরদি চিন্তক। তাঁর ‘ডেকামেরন’ নামের বিখ্যাত বই ১০০টা গল্পের সংগ্রহ। ১০ জন অল্পবয়সি মানুষ, যারা পালাতে চাইছে এক এপিডেমিক থেকে, তারা বলছে এই গল্প। অনেকের মনে পড়তে পারে, ইংরেজ কবি চসারের (১৩৪২-১৪০০) ‘ক্যানটারবেরি টেলস’, যার ওপর যথেষ্টভাবে পড়েছে বোকাচিও এবং পেত্রার্ক-এর প্রভাব।

পেত্রার্ক (১৩০৪-১৩৭৪ ): ইতালিয়ান রোম্যান্টিক কবি, যিনি তাঁর বিখ্যাত সনেটগুচ্ছে ‘লোরা’ নামে এক নারীর স্তুতি করেছেন। তাঁকে নারীর পূজারি বলাই যায়।

উলফগাং গোয়েটে (১৭৪৯-১৮৯৬): জার্মান কবি, নাট্যকার, স্কলার। এবং ইতালিয়ান সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ভক্ত। সেই দেশে কয়েক বছর বসবাস করেন। ‘ফাউস্ট’ তাঁর বিখ্যাত লেখা।

পল ভার্লেন (১৮৪৪-১৮৯৬): বিখ্যাত ফরাসি কবি, সমকামী। তাঁর পুরুষ প্রেমিক আর্থার র‍্যাঁবো আরেক বিখ্যাত ফরাসি কবি। র‍্যাঁবোকে প্রেমের ঈর্ষায় ঠেঙিয়ে জেলে যান ভার্লেন।

বোকাচিও (বাঁ-দিকে), উলফগাং গোয়েটে, পেত্রার্ক ও পল ভার্লেন (ডান দিকে)

সময় ও দেশের ব্যবধান তুড়ি মেরে উড়িয়ে এই চার বিখ্যাত কবিকে এক বিতর্কসভায় হাজির করেছেন কুন্দেরা। এবং আরও মজার ব্যাপার, কুন্দেরার চরিত্রগুলি, ওই চার বিখ্যাত নামে, প্রতীকী মানুষ। তারা একই সঙ্গে বাস্তব এবং প্রতীক। এবং সেখানেই আসল মজা। এবং কুন্দেরার হিউমার।

কুন্দেরার ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’-এ নারীপুরুষের সম্পর্ক এবং প্রেম ও সেক্সুয়ালিটি নিয়ে এন্তার আধুনিক ভাবনার হীরক রৌনক কী অনায়াসে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার হাসতে হাসতে সেগুলোকে তুচ্ছ করে বলা হচ্ছে, ভুলে যাও। তাই, ‘দ্য বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ শুধু তো উপন্যাস নয়, হাসতে হাসতে উপেক্ষা ও ভুলে যাওয়ার দর্শনও বটে। একই বুননে একটি উপন্যাস ও প্রবন্ধকে বুনেছেন কুন্দেরা। যদি এখনও না পড়ে থাকেন এই প্রাবন্ধিক উপন্যাস, একেবারে আচমকা ধাক্কার রতিযাপন নিয়ে এই অচিন লেখা, এক্ষুনি পড়ুন। কেননা সামনেই ১৪ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ভ্যালেন্টাইন’স ডে, ভালোবাসার দিন। কিছু না হোক, বইটা পড়া থাকলে ভালোবাসার মানুষটাকে সম্পর্কের নতুন নতুন ওলিগলির ঠিকানা জানাতে পারবেন। রাঙা ওয়াইনের গ্লাসে ঝিলিক মারবে বোধবুদ্ধির স্ফুলিঙ্গ।

১৪ ফেব্রুয়ারির কথা মনে রেখে চলুন আমরা বরং যাই, এক বাঙালি প্রেমে। এঁরা প্রাচীন কলকাতার পুরনো বাঙালি। এক জোড়া তরুণ-তরুণী। দু’জনেই ফরাসি ভাষায় তুখড়। সুতরাং, প্রাচীন যুগের মানুষ হয়েও এঁরা আমাদের থেকে আধুনিক। অন্তত লেখাপড়ায়, ভাবনায়, ভাষায় ও প্রণয় প্রকাশে। আর এই তরুণ-তরুণীর মাঝখানে যে বাঙালিটি দাঁড়িয়ে অব্যর্থ দাবার চাল দিচ্ছেন, তিনি নায়িকার কাকা! আসুন, সেই গল্পে ঢোকা যাক এবার। তবে এই প্রেমের গল্পে প্রবেশের আগে একটি কথা জানাই। সেই সময়ে বাঙালি তরুণ-তরুণীর জীবনে ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইন্স ডে, ভালোবাসার দিন বলে কিছু ছিল না। আমাদের যৌবনেও ভ্যালেন্টাইন বলতে আমাদের মনে পড়ত শেক্সপিয়রের ‘হামলেট’ নাটকে একটি ভালোবাসার গান।

সেই গানের মতো অশ্লীল প্রেমের গান কম শুনেছি। বা পড়েছি। অধ্যাপক পড়াতে লজ্জা পেতেন। ব্যাখ্যা করতেন না। হ্যামলেটের সব সংস্করণে এই গানের সবটুকু থাকত না। ভেরিটি এডিশনে সবটা নেই। আর্ডেন এডিশনে আছে। আপাত রোম্যান্টিক প্রেমের মধ্যে পুরুষের নিষ্ঠুরতা কীভাবে থাবা লুকিয়ে, নির্মমতা গোপন রেখে, সম্ভোগের আসন পেতে রাখে, সে-কথা বলা আছে এই গানে। এই গানেই বলা আছে, তোমার ভ্যালেন্টাইন আমি, এই রোম্যান্টিক অছিলায় পুরুষ কীভাবে মুহূর্তে হরণ করে নারীর আগলে রাখা কন্যকা! তারপর আর পিছন ফিরে তাকায় না।

এইবার এই কলকাতায় এক প্রাচীন প্রেমিক-প্রেমিকার গল্পে। সেই সময়ে, অর্থাৎ, ১০০ বছরের কিছু আগে, যে সময়ে বাঙালি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মেলামেশার তেমন সুযোগ ছিল না, সেই সময়ে এক বাঙালি ব্রিলিয়ান্ট তরুণ, এক বাঙালি ব্রিলিয়ান্ট তরুণীর প্রেমে পড়ল। এবং তারা পরস্পরকে চিঠি লিখতে লাগল। এখন অবশ্য প্রেম আছে। কিন্তু চিঠি নেই। যা আছে, তাই ওই সেলফোনের সংক্ষিপ্ত বার্তা। এমনকী, আমাদের সময়েও, চিঠি ছাড়া প্রেম ছিল নুন ছাড়া ডিম। আমি তো প্রেমের চিঠি লিখেছি, মাইলের পর মাইল। ভালোবাসা আর ভালোবাসার চিঠির মধ্যে ছিল নাছোড় সর্ম্পক।

প্রথমে এই কাহিনির নায়কের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: জন্ম ১৮৬৮। জন্মস্থান: যশোহর। লেখাপড়া: প্রথমে কৃষ্ণনগরে। পরে, কলকাতার হেয়ার স্কুল। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। বিএ, দর্শনে অনার্স, প্রথম বিভাগে প্রথম। বিষয় পরিবর্তন করে, ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স, প্রথম বিভাগে প্রথম। পাশাপাশি নিয়মিত ফরাসি ও সংস্কৃত চর্চা। এই গল্পের নায়ক বিলেত-ফেরত ব্যারিস্টার। এবং আইনকে পেশা না করে সাহিত্যকে নেশা করল নায়ক।

প্রমথ চৌধুরী

এবার নায়িকার পরিচয়: মায়ের সঙ্গে পাঁচ বছর বয়সে বিলেত। সাত বছর বয়সে সেখান থেকে ফিরে সিমলার অকল্যান্ড হাউসে। পরের বছর কলকাতার লোরেটো কনভেন্ট। ১৮৮৭ এন্ট্রান্স পরীক্ষা: অন্যতম ভাষা ও বিষয়, ফরাসি। ১৮৯২: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিএ, মেয়েদের মধ্যে প্রথম, পদ্মাবতী স্বর্ণপদক। এই নায়িকার পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য সংগীতে সম্যক জ্ঞান। বাজাতে পারে পিয়ানো এবং বেহালা।

নায়িকার কাকার সঙ্গে কিছুটা আলাপ আছে নায়কের। এবং সেই আলাপের সূত্রে নায়ক নায়িকাকে দূর থেকে দেখে তার দুর্ধর্ষ রূপের টানে পড়েছে। নায়িকার কাকার সঙ্গে আরও একদিন আলাপ জমাতে নায়ক গেল কাকার বাড়িতে। কাকা নায়কের সঙ্গে কথা বলেই বুঝতে পারল, এই তরুণ অতি ধীমান ও বিদগ্ধ। এবং তার ভাইঝির মতোই ফরাসি জানে। কাকা বলল, ‘আমার ভাইঝি বাড়িতে থাকলে তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতাম। সেও তোমারই মতো ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করছে। কিন্তু সে এখন সিমলায়। তবে তার ঘরে চলো, তার ফরাসি বইয়ের কালেকশনটা দ্যাখো।’

ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী

নায়ক তো অবাক! আলমারি ভর্তি ফরাসি ক্লাসিক্স। অনুবাদ নয়। মূল ভাষায়। নায়ক আর লোভ সামলাতে পারল না। অতি সুদর্শন কাকাটিকে সে বলল, ‘কয়েকটি বই আমার খুবই প্রয়োজন। কয়েক দিনের জন্য ধার নিতে পারি না?’ কাকা মৃদু হেসে বলল, ‘ধার নিশ্চয়ই নিতে পারো। কিন্তু, যার বই সে তো এখন বহু দূরে। তার অনুমতি ছাড়া তার বই কী করে দিই বলো?’

–বই এখন নিই, পরে না হয় অনুমতি নিয়ে নেব, খুব সহজেই বলল নায়ক।

–এখন বই? আর পরে অনুমতি? বেশ! তাও হতে পারে। আমি তার সিমলার ঠিকানা দিচ্ছি। বই নিয়ে যাও। আর অনুমতিটা চিঠি লিখে আনিয়ে নাও। ভুলে যেওয়া যেন।

সুদর্শন সুভদ্র কাকাটি অব্যর্থ চাল দিয়ে মনে মনে হাসল!

নায়ক নায়িকাকে চিঠি লিখতে ভোলেনি। এই সেই অসামান্য অনন্য বাঙালি ন্যাকামি-বর্জিত আধুনিক প্রেমপত্র। ১৮৯৩-এর ১৬ মে। নায়ক চিঠি লিখল নায়িকাকে। তার প্রথম প্রেমপত্র, ভালোবাসার চিঠির ভাষায় ও ভঙ্গিতে চুরমার ঘটিয়ে:

‘শুনলুম, আমার একটা ভুল হয়ে গিয়েছে। বইগুলির নাকি আসল মালিকের কাছে নিজের জবানিতে চাওয়াই আমার উচিত ছিল। ধন্যবাদ, (ফেরত) দেওয়ার সময় ও রকম ভুল করার ইচ্ছে নেই বলে অন্যের ওপর আমার হয়ে ও কাজটি করার ভার দিলাম না। (এই অন্যটি নায়িকার কাকা, এমনই বোঝাতে চাইছে নায়ক)। আমি প্রথমে আপনার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করার আবশ্যক মনে করিনি। ভেবেছিলুম যে, আগে বইগুলি নিয়ে, তারপর আপনাকে ওই সংবাদটি দিলেই যথেষ্ট হবে। কারণ, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আমাকে কিছুদিনের জন্য খানকতক বই পড়তে দিতে আপনার কোনও আপত্তি হবে না।’

১০০ বছর আগের এক বাঙালি নায়ক তার মনের নায়িকাকে লিখছে এই পত্র, যা তার প্রেমের প্রথম চিঠি! ভাবতে পারেন? শুনুন, কী দুর্ধর্ষ ছিল ১০০ বছর আগের বাঙালি প্রেমিক:

‘যথার্থ কথা বলতে গেলে আমি আপনার কাছে অনুমতি নেওয়াটা দরকার মনে কল্লেও, সে কথা নিঃসংকোচে আপনাকে লিখতে পারতুম কি না সন্দেহ। কারণ আমি বহুসংখ্যক সামাজিক দস্তুর সম্বন্ধে এতটা অনভিজ্ঞ যে প্রার্থনাটা কোন স্থলে মধ্যস্থের সাহায্যে (অর্থাৎ আপনার কাকা!) এবং কোন স্থলে মধ্যস্থের সাহায্য বিনা শিষ্টাচারসম্মত সে বিষয়ে ভালোরূপ ধারণা নেই। পাছে ভুলক্রমে অনধিকার চর্চা করে ফেলি, ফলে অনেক কাজ ইচ্ছা থাকলেও করে উঠতে পারিনে’।

নায়কের এই চিঠিতে প্রকাশ পেয়েছে কিছুটা বাস্তববিরোধী রোম্যান্টিক উদাসীনতা মিশ্রিত ঔদ্ধত্য। যা হয়তো নায়িকার মনে রেখেছিল অনুকূল অভিঘাত!

এর পরে তার প্রথম প্রেমের চিঠিতে নায়ক যা লিখল, সেটা আজও অধিকাংশ বাঙালি পুরুষ লিখে ওঠার মতো নির্ভীক আধুনিকতায় পৌঁছতে পারেনি:

“আপনাকে ভরসা দিচ্ছি যে বইগুলি আমার কাছে বেশ ভালো অবস্থাতেই থাকবে। আমি প্রতিদিন তাদের ধুলি মার্জন করব এবং পুস্তকবাসী কীটজাতি যাতে করে তাদের প্রতি পত্রে প্রতি ছত্র অধিকার করে না নিতে পারে সে বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকব। আর এক হিসেবে Leconte de Lisle, Sully Prudhomme– আমার কাছে যতটা আদৃত হবে, আপনার অন্য কোনও ফরাসিজ্ঞ বন্ধুর নিকট ততটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যাঁরা সংসারের পথে আজ পর্যন্ত শুধু ‘ফুলেরি উপরে চরণ ফেলে আসছেন, কাঁটার উপরে নয়’, তাদের নিকট এ শ্রেণির লেখকরা ততটা প্রীতিকর নয়। আমার শেলফে উক্ত গ্রন্থকারগণ Victory Hugo-র উপরে এবং Leopardi-র দক্ষিণ পার্শ্বে স্থান লাভ করেছেন।”

এই চিঠির উত্তরে নায়িকা: ‘আমার কতকগুলো ফরাসি বই আপনি নিয়েছেন, বেশ করেছেন। তবে পেতে যে এত বিলম্ব হল সে কতকটা আপনার নিজের দোষে। যে সামাজিক নিয়ম সম্বন্ধে আপনি এতটা অজ্ঞ বলে নিজের পরিচয় দিয়েছেন তারই মধ্যে একটা হচ্ছে এই যে, আমরা আর একজনের জিনিস তার বিনা অনুমতিতে নিতে পারিনে, তা মধ্যস্থের সাহায্যেই হোক আর সোজাসুজিই হোক। সুতরাং, আমার কাকা যে আমার মতের অপেক্ষা না করে আমার বই আপনাকে দিতে চাননি, ঠিকই করেছিলেন।’

এই নায়ক প্রমথ চৌধুরী। যিনি ‘বীরবল’ ছদ্মনামে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। যিনি ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা প্রকাশ করে সেই পত্রিকায় বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষা নিয়ে আসার মতো বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটান। যাঁর গল্পের বই ‘চারইয়ারি কথা’ বাংলা সাহিত্যে সরণিচিহ্ন। তাঁর নায়িকাটি হলেন পরমা সুন্দরী ইন্দিরা। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কন্যা। তাঁর কাকা রবীন্দ্রনাথ, যিনি প্রমথকে পরামর্শ দেন, ফরাসি বই ধার চেয়ে তাঁর ভাইঝি ইন্দিরাকে চিঠি লিখতে।

১৮৯৯ সালে ইন্দিরা প্রমথকে বিয়ে করে হলেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী।

নারী-পুরুষের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে এই লেখা, প্যারিস থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত, আসন্ন ভ্যালেন্টাইন্স ডে উপলক্ষে প্রমথ-ইন্দিরাকে উৎসর্গ করলাম। সেই সঙ্গে উৎসবায়িত হল তাঁদের প্রেম ও অভেদ।

…………………….. পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব  ……………………

পর্ব ৭৯: সুরানিলয়ের টেবিল থেকেই জন্ম নিয়েছিল উপন্যাসের ভাবনা

পর্ব ৭৮: একবিন্দু আত্মকরুণা নেই অঞ্জনের আত্মজীবনীতে

পর্ব ৭৭: অ্যানির ‘দ্য ইয়ার্স’ শেখায় অন্তহীন ইরোটিসিজম-ই জীবনের পরমপ্রাপ্তি

পর্ব ৭৬: জয় গোস্বামীর সাজেশনে মুগ্ধতা জাগাল ‘সিম্পল প্যাশন’

পর্ব ৭৫: যে নারীর শেষপাতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি লেখক

পর্ব ৭৪: সেই তরুণীর জন্য বেঁচে আছে বোকা মনকেমন!

পর্ব ৭৩: কাফকার ভয়-ধরানো প্রেমপত্র!

পর্ব ৭২: থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, কলকাতা বইমেলায় শ্রেষ্ঠাংশে তবে রবীন্দ্র-ওকাম্পো?

পর্ব ৭১: একশো বছরের নৈরাজ্য ও একটি লেখার টেবিল

পর্ব ৭০: আত্মজীবনী নয়, মার্গারেটের ব্রতভ্রষ্ট স্মৃতিকথা

পর্ব ৬৯: রুশদির ‘দ্য ইলেভেনথ আওয়ার’ শেষ প্রহরের, অনিবার্য অন্তিমের দ্যোতক

পর্ব ৬৮: মাংসও টেবিলের কাছে ঋণী

পর্ব ৬৭: ভ্রমণ-সাহিত্যকে লাজলো নিয়ে গেছেন নতুন পারমিতায়

পর্ব ৬৬: নরম পায়রার জন্ম

পর্ব ৬৫: যে বইয়ের যে কোনও পাতাই প্রথম পাতা  

পর্ব ৬৪: খেলা শেষ করার জন্য শেষ শব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন জেফ্রি আর্চার

পর্ব ৬৩: সহজ ভাষার ম্যাজিক ও অবিকল্প মুরাকামি

পর্ব ৬২: জীবন তিক্ত এবং আশা করা ভুল, এই দর্শনই বিশ্বাস করেন ক্রাজনাহরকাই

পর্ব ৬১: লন্ডনে ফিরে এলেন অস্কার ওয়াইল্ড!

পর্ব ৬০: পাপ ও পুণ্যের যৌথ মাস্টারপিস

পর্ব ৫৯: মাতৃভক্তির দেশে, মাকে ছেড়ে যাওয়ার আত্মকথন

পর্ব ৫৮: চিঠিহীন এই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রণয়লিপি

পর্ব ৫৭: লেখার টেবিল কি জানে, কবিতা কার দান– শয়তান না ঈশ্বরের?

পর্ব ৫৬: প্রেমের নিশ্চিত বধ্যভূমি বিয়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখার টেবিল জানে সেই নির্মম সত্য

পর্ব ৫৫: জুলিয়া রবার্টসকে হিন্দুধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল একটি বই, একটি সিনেমা

পর্ব ৫৪: আপনার লেখার টেবিল নেই কেন মানিকদা?

পর্ব ৫৩: পুরুষরা যে কতদূর অপদার্থ, ড্রেসিং টেবিলের দেখানো পথে মেয়েরা প্রমাণ করে দেবে

পর্ব ৫২: একটাও অরিজিনাল গল্প লেখেননি শেক্সপিয়র!

পর্ব ৫১: প্রমথ-ইন্দিরার মতো প্রেমের চিঠি-চালাচালি কি আজও হয়?

পর্ব ৫০: হাজার হাজার বছর আগের পুরুষের ভিক্ষা এখনও থামেনি

পর্ব ৪৯: কুকথার রাজনীতিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছেন জর্জ অরওয়েল 

পর্ব ৪৮: টেবিলই ওকাম্পোর স্মৃতি, আত্মজীবনীর ছেঁড়া আদর

পর্ব ৪৭: শেষ বলে কিছু কি থাকতে পারে যদি না থাকে শুরু?

পর্ব ৪৬: যে টেবিলে দেবদূত আসে না, আসে শিল্পের অপূর্ব শয়তান

পর্ব ৪৫: ফ্রেডরিক ফোরসাইথকে ফকির থেকে রাজা করেছিল অপরাধের পৃথিবী

পর্ব ৪৪: আম-বাঙালি যেভাবে আমকে বোঝে, দুই আমেরিকান লেখিকা সেভাবেই বুঝতে চেয়েছেন

পর্ব ৪৩: দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে মা দৌড়ে বেরিয়ে গেল, ইবতিসম্‌-এর উপন্যাসের শুরু এমনই আকস্মিক

পর্ব ৪২: অন্ধকার ভারতে যে সিঁড়িটেবিলের সান্নিধ্যে রামমোহন রায় মুক্তিসূর্য দেখেছিলেন

পর্ব ৪১: বানু মুশতাকের টেবিল ল্যাম্পটির আলো পড়েছে মুসলমান মেয়েদের একাকিত্বের হৃদয়ে

পর্ব ৪০: গোয়েটের ভালোবাসার চিঠিই বাড়িয়ে দিয়েছিল ইউরোপের সুইসাইড প্রবণতা

পর্ব ৩৯: লেখার টেবিল বাঙালির লাজ ভেঙে পর্নোগ্রাফিও লিখিয়েছে

পর্ব ৩৮: বঙ্গীয় সমাজে বোভেয়ার ‘সেকেন্ড সেক্স’-এর ভাবনার বিচ্ছুরণ কতটুকু?

পর্ব ৩৭: ভক্তদের স্তাবকতাই পাশ্চাত্যে রবীন্দ্র-কীর্তি স্থায়ী হতে দেয়নি, মনে করতেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী

পর্ব ৩৬: একাকিত্বের নিঃসঙ্গ জলসাঘরে মারিও ভার্গাস লোসা যেন ছবি বিশ্বাস!

পর্ব ৩৫: জীবনের বাইশ গজে যে নারী শচীনের পরম প্রাপ্তি

পর্ব ৩৪: যা যা লেখোনি আত্মজীবনীতেও, এইবার লেখো, রাস্কিন বন্ডকে বলেছিল লেখার টেবিল

পর্ব ৩৩: ফিওনার সেই লেখার টেবিল মুছে দিয়েছিল মেয়েদের যৌনতা উপভোগের লজ্জারেখা

পর্ব ৩২: বাঙালি নয়, আন্তর্জাতিক বাঙালির সংজ্ঞায় স্পিভাক এসে পড়বেনই

পর্ব ৩১: প্রতিভাপাগল একটি বই, যাকে দিনলিপি বলে সামান্য করব না

পর্ব ৩০: পতিতালয়ের সেই লেখার টেবিল জাগিয়ে তুলেছিল ইসাবেলের হৃদয়-চেতনা

পর্ব ২৯: পাথরে প্রাণ আনে যে টেবিলের স্পর্শ

পর্ব ২৮: নিজের টেবিলকে কটাক্ষ করি, কেন অ্যানে মাইকেলসের মতো লিখতে পারি না?

পর্ব ২৭: নারীর রাগ-মোচনের কৌশল জানে মিলান কুন্দেরার লেখার টেবিল!

পর্ব ২৬: ভালোবাসা প্রকাশের সমস্ত শব্দ পেরিয়ে গিয়েছিল এলিয়টের লেখার টেবিল

পর্ব ২৫: যে টেবিলে জন্ম নেয় নগ্নতা আর যৌনতার নতুন আলো

পর্ব ২৪: প্রেমের কবিতার ভূত জন ডানকে ধরেছিল তাঁর উন্মাদ টেবিলে, মোমবাতির আলোয়

পর্ব ২৩: যে টেবিল আসলে বৈদগ্ধ আর অশ্লীলতার আব্রুহীন আঁতুড়ঘর!

পর্ব ২২: মহাবিশ্বের রহস্য নেমে এসেছিল যে টেবিলে

পর্ব ২১: গাছ আমাদের পূর্বপুরুষ, লেখার টেবিল বলেছিল হোসে সারামাগোকে

পর্ব ২০: টেবিলের কথায় নিজের ‘হত্যার মঞ্চে’ ফিরেছিলেন সলমন রুশদি

পর্ব ১৯: প্রতিভা প্রশ্রয় দেয় অপরাধকে, দস্তয়েভস্কিকে শেখায় তাঁর লেখার টেবিল

পর্ব ১৮: বিবেকানন্দের মনের কথা বুঝতে পারে যে টেবিল

পর্ব ১৭: ‘গীতাঞ্জলি’ হয়ে উঠুক উভপ্রার্থনা ও উভকামনার গান, অঁদ্রে জিদকে বলেছিল তাঁর টেবিল

পর্ব ১৬: যে লেখার টেবিল ম্যাকিয়াভেলিকে নিয়ে গেছে শয়তানির অতল গভীরে

পর্ব ১৫: যে অপরাধবোধ লেখার টেবিলে টেনে এনেছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে

পর্ব ১৪: লেখার টেবিল গিলে নিচ্ছে ভার্জিনিয়া উলফের লেখা ও ভাবনা, বাঁচার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা

পর্ব ১৩: হ্যামনেট ‘হ্যামলেট’ হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল, জানে সেই লেখার টেবিল

পর্ব ১২: রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিল চিনতে চায় না তাঁর আঁকার টেবিলকে

পর্ব ১১: আর কোনও কাঠের টেবিলের গায়ে ফুটে উঠেছে কি এমন মৃত্যুর ছবি?

পর্ব ১০: অন্ধ বিনোদবিহারীর জীবনে টেবিলের দান অন্ধকারের নতুন রূপ ও বন্ধুত্ব

পর্ব ৯: বুড়ো টেবিল কিয়ের্কেগার্দকে দিয়েছিল নারীর মন জয়ের চাবিকাঠি

পর্ব ৮: অন্ধকারই হয়ে উঠলো মিল্টনের লেখার টেবিল

পর্ব ৭: কুন্দেরার টেবিলে বসে কুন্দেরাকে চিঠি

পর্ব ৬: মানব-মানবীর যৌন সম্পর্কের দাগ লেগে রয়েছে কুন্দেরার লেখার টেবিলে

পর্ব ৫: বিয়ের ও আত্মহত্যার চিঠি– রবীন্দ্রনাথকে যা দান করেছিল লেখার টেবিল

পর্ব ৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের টেবিল আর তারাপদ রায়ের খাট, দুই-ই ছিল থইথই বইভরা

পর্ব ৩: টেবিলের গায়ে খোদাই-করা এক মৃত্যুহীন প্রেমের কবিতা

পর্ব ২: লেখার টেবিল ভয় দেখিয়েছিল টি এস এলিয়টকে

পর্ব ১: একটি দুর্গ ও অনেক দিনের পুরনো নির্জন এক টেবিল