
চলচ্চিত্র পরিচালক অঞ্জন নিজের চোখে: ‘হিচকক বা সত্যজিৎ রায়ের পদ্ধতিতে আমি চলি না। আমার কাছে নির্দেশক শেষ কথা নয়। যার কাছে শেষ কথা আমি তাদের সম্মান করি। ঋতুপর্ণ আমাকে বলেছে, ‘তুই অভিনয়টা করিয়ে নিতে পারলি না কেন?’ আমার বিশ্বাস, ‘করিয়ে নেওয়া’ যায় না। অপটুদের নিয়ে ভালো কাজ সম্ভব নয়।
৭৮.
কোনও বাঙালির লেখা এমন আত্মজীবনী, আত্মকথা, স্মৃতিচারণ, অতীতসঞ্চার আগে পড়িনি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে বাংলা ভাষার একটি শাখাকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করেছেন: ‘আড়ালের ভাষা’। এবং আমার মতে, রবীন্দ্রনাথ আড়ালের ভাষাকে খানিকটা রোম্যান্টিক উৎসাহনে উদযাপিত করেছেন। কিন্তু এই তথাকথিত আড়ালের ভাষাকে পশ্চাৎদেশে লাথি মেরেছে আমাদের থিয়েটারের, আমাদের সিনেমার, আমাদের গানের, ভাবনার, মুক্তির, পাগলামির, সততার, যা-ইচ্ছে-তাই-করার, ফাইনালি মরমিয়া ম্যারিনেটেড লেখক, মরিয়া সততার, অঞ্জন। ইয়েস, আমাদের অঞ্জন দত্ত।

দাঁড়াও পথিকবর, দত্তবংশজাত, প্রতি মুহূর্তে সৃজনী, এই পর্যাস প্রতিভার কাছে। ‘পর্যাস’ শব্দটি প্রতিভার প্রেক্ষিতে কবে শেষ ব্যবহার হয়েছিল, বা ‘অ্যাট অল’ ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, আমি জানি না। কিন্তু অঞ্জনের প্রতিভা পর্যাপ্তভাবে ‘পর্যাস’ ডিজার্ভ করে। যাঁরা সন্দেহ করছেন, অভিধান দেখে নিন। আরও সন্দেহ হলে, হরিচরণের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ দেখে নিন। পর্যাস শব্দটার মধ্যে একটা বিনাশ, উল্টেপাল্টে দেওয়া, পরিবর্তন ও হননের অনুষঙ্গ আছেই আছে। এই বিষয়ে আমি সংশয়হীন। অঞ্জনের প্রতিভাতেও ভাঙচুর এবং ব্যাপক বিপর্যয় আছে। মধ্যবিত্ত ভাবনার বিপর্যয়। আটপৌরে মূল্যবোধের বিনাশ। ভগবান ভগবান ভাবমূর্তির ধ্বংস। অঞ্জনের ‘অঞ্জন নিয়ে’ এমন এক আত্মস্মৃতি, যেখানে কিছু এমন ভাঙচুর হয়েছে, যা ঘটানো অঞ্জন ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এই বিনাশ ব্রিলিয়ান্ট, বিদগ্ধ, ব্যাপ্ত! সেখানে আসছি এবার।
চলতি বইমেলার উল্লাসের মধ্যে অঞ্জনের ‘অঞ্জন নিয়ে’ আত্মস্মৃতি প্রকাশিত হল ২৩ জানুয়ারি। এবং তুমুল তোলপাড় সন্দেহ নেই। প্রথম প্রাবল্য অঞ্জনের ভাষায়। সহজতার চিকন চাবুক। পাছায় মারা হচ্ছে। এবং অঞ্জন সেই চাবুক খাচ্ছে নিজের কচি পাছায়। তারপর কী যন্ত্রণা! তবে পাছা বাঁচানোর চেষ্টায় সে তোয়ালে পরে প্যান্টের তলায়। বাকিটা অঞ্জনের লেখায় সরাসরি: “আমার ডরমেটারির মাস্টার, মিস্টার ক্লার্ক আমাকে ডাকে। বেত খাবার জন্য তৈরি ছিলাম বলে প্যান্টের ভেতরে তোয়ালে গুঁজে গেলাম। সে ব্র্যান্ডি খাচ্ছিল। প্রথমেই টেনে তোয়ালে বের করে দেয়। তারপর ঝুঁকে দাঁড়াতে বলে। সপাটে তিনবার চাবুক, আমার পেছনে। আমাদের বলতে হয় ‘ধন্যবাদ’। (অঞ্জনের কৌতুকবোধ লক্ষণীয়। ব্রিটিশ। একটি বাড়তি শব্দ নেই)। কোনও মতে বলে, আমি খাটের পাশে বসে ছটফট করেছি আধঘণ্টা। সে কী অপরিসীম যন্ত্রণা, আমি লিখে বোঝাতে পারব না। সেদিন রাত্রে, আমার পাশের খাটের একটি আইরিশ ছেলে, ডামটি, আমাকে সারারাত জাপটে ধরে শুয়ে ছিল। আমি সব যন্ত্রণা ভুলে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলাম। সেই ডামটি আমার বন্ধু ছিল অনেক দিন। আমরা কয়েকজন মিলে কারুর চুরি করে আনা বিদেশি ম্যাগাজিন খুলে, মেমসাহেবের উলঙ্গ ছবি দেখেছি। লুকিয়ে সিগারেট খেয়েছি, স্কুলের বাউন্ডারির বাইরে রবিবার আমাদের দার্জিলিং শহরে যেতে দেওয়া হত। আমরা নিচের বাজারের কাছে একটা চিনে খাবারের দোকানে, বিয়ার খেয়েছি। লুকিয়ে দাড়ি কামাতাম। দাড়ি গজাত না। মোটমাট, চোদ্দো বছর বয়সে আমি প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে যাই।”

অঞ্জনের ১৪ বছর বয়সে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ হয়ে যাওয়ার সব গল্প বলছি না। অঞ্জনের বাবা (বাপি) পবিত্র দত্তর অবদানে সেই গল্পের শুরুর কথাটা বলি, অতি তাড়িত অঞ্জনফ্যানও যে গল্প জানে না। জানাচ্ছে অঞ্জন: ‘‘১৯৬১ সালে বাবা মার সঙ্গে আমি প্রথম দার্জিলিং যাই। ওখানে বাবা একটা বাড়ি লিজ নিয়ে ছিল। নাম ব্লু হেভেন। গান্ধী রোডে, বেথানি স্কুল ছাড়িয়ে, ডানদিকে। তখন বাবার হাত ধরে সেন্ট পল্স স্কুল বেড়াতে যাই। বাবা জিজ্ঞেস করেছিল, এখানে থাকবে? আমি এক কথায় ‘হ্যাঁ’ বলেছিলাম। কিন্তু যখন এক বছর পর সত্যই আমাকে ওখানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, আমি মায়ের আঁচল ছাড়তে চাইনি। জুনিয়র স্কুলের প্রিন্সিপাল আমাকে প্রায় মার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কাঁধে তুলে বাবা মাকে বলে ছিল চলে যেতে। মিস্টার ম্যাকডনাল্ড। আমি সারারাত কেঁদে ছিলাম, জুনিয়র স্কুলের ডরমিটারিতে আমার স্যাঁতসেঁতে খাটে শুয়ে। ঠিক করে খাইনি। খাওয়ার পর বমি হত। প্যান্টে পেচ্ছাপ করে ফেলতাম। ম্যাকডনাল্ড আমার জামাকাপড় ছাড়িয়ে দিত। (লক্ষ করুন, অঞ্জনের অবাঙালি পরিমিতিবোধ। বাড়তি শব্দ একটাও নেই। আরও একটা জরুরি বিষয়, এই স্মৃতিকথায় ‘আপনি’ শব্দটার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ধৃষ্টতা? না। অঞ্জনের উত্তর, আমার বাংলাটাকে ইংরেজি ভেবে নিলেই আপনি-তুমির ঝামেলা থাকবে না।)
এইবার অঞ্জনের বালক বয়সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার এক টুকরো অব্যর্থ ছবি তার নিজের টাইট ভাষায়: ‘আমাদের ডরমিটরির মেট্রন, মিসেস একলিস্টন, আমার খাটে বসে রাত্তিরে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিত। রবিবার তার ঘরে আমাদের কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে, গ্রামাফোনে ক্লিফ রিচার্ডের গান চালিয়ে আমাদের টুইস্ট নাচ শেখাত। কেক খাওয়াত। আমাকে জোর করে নাচাত। তার নরম হাতের ছোঁয়া। তার নেটের ব্লাউসের কড়া পারফিউমের গন্ধ। কড়া লাল নেল পালিশ… আমার ভালো লাগতে শুরু করল।’
অঞ্জন কেমন স্কুলে লেখাপড়া করে বড় হয়ে আজকের অঞ্জন দত্ত হয়েছে? অঞ্জনের কাছ থেকে সেই সংবাদ:
‘আমাদের স্কুল সবথেকে উঁচুতে। ৭৫০০ ফিট। মিলিটারি ক্যাম্পের কাছে বিশাল বড় জায়গা নিয়ে। অনেকটা মিলিটারি কায়দায়। সম্পূর্ণ সাহেবি পরিবেশ। ৫০ ভাগ সাহেব টিচার। বাকি পঞ্চাশ ভারতীয়। অঙ্কে অবধারিত ভাবে দক্ষিণ ভারতের নায়ার। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, মারাঠি। বাংলা, আঁকা, ক্রিকেট অবধারিত ভাবে বাঙালি। মানে, লাহিড়ি, ভট্টাচার্য, মিত্র। হিন্দি আর পিটি, পাঞ্জাবের যোশী এবং হরদীপ। বাকি সব সাহেব, বিশেষ করে আইরিশ। আমাদের স্কুলের ছাত্রর সংখ্যা ছিল মেরেকেটে দুশো নব্বই। ৩০ ভাগ বিদেশি। ইংলিশ, আইরিশ, অস্ট্রেলিয়ান, থাই, ফিলিপিনো, এবং অ্যাংলো। ৪০ ভাগ মারাঠি, গুজরাটি, তামিল, বিহারি, পাঞ্জাবি। বাকি ৩০ বাঙালি। একসঙ্গে সবাইকে উলঙ্গ হয়ে চান করতে হবে সপ্তাহে দুদিন। একসঙ্গে খেতে হবে। একসঙ্গে খাওয়া মানে সবাইকে বিফ খেতে হবে। যারা ধর্মের কারণে পারবে না, তাদের সেদিনকার জন্য নিরামিষ। সবাইকে বক্সিং করতে হবে। আমি রিংয়ে নেমেই একটা ঘুষি খেয়ে শুয়ে পড়ে দশ গুনতাম। ক্লাস এইট থেকে মিস্টার হল বুঝতে পেরে আমাকে জোর করে তুলে দিত। আমি কোনো মতে মার খেয়ে একটা রাউন্ড পুরো। মিসেস চ্যাটার্জি আমার মিউজিক ক্লাসের টিচার আমাদের বেটহোভেন, মোৎসার্ট, চাইক্ভস্কি শোনাত। আমরা সবাই ঘুমোতাম। মিসেস ব্ল্যাকলি আমাকে চ্যাপেলের দলে নিল। সবাই বলত আমি ভালো গান করি। মিস্টার ক্লার্ক আমাকে সব নাটকে পার্ট করার জন্য বেছে নিত। প্রথম দিকে মেয়েদের পার্ট পাই। তারপর ছেলেদের। কত নাটক। শেক্সপিয়ার, মলিয়ের থেকে বেকেট, হ্যারল্ড পিন্টার। ভাবতে অবাক লাগলেও সত্যি। আমি ক্লাস নাইনে, হ্যারল্ড পিন্টারের ডাম্ব ওয়েটার নাটকে পার্ট করি। শুধু দুজন অভিনেতা। আমার জীবনের প্রথম সব থেকে বড় অভিজ্ঞতা। আমি মেকআপ তুলিনি। সারা রাত জেগে নিজের মুখ হাত দিয়ে ঘষে মেকআপের গন্ধ শুকেছি।… একটা প্রবল আনন্দ আর ব্যথা। কাঞ্চনজঙ্ঘার রং বদলাচ্ছিল আর আমি দেখতে দেখতে কাঁদছিলাম। আমাকে মুখের রিং ধুয়ে ফেলতে হবে। হয়তো ঠিক সেইদিনই, ঠিক সেই সময়, আমি নিজের অজান্তে, অভিনেতা হতে চেয়েছিলাম।’

ভাবছি, বাঙালির লেখা এমন স্মৃতিকথা, সত্য ছাড়া মিথ্যা বলিব না আত্মজীবনী, যেখানে বিন্দুমাত্র আত্মকরুণা পর্যন্ত থাকবে না, পড়েছি কি না! না। আমি নিশ্চিত। পড়িনি। সত্যিই ভাবছি, লেখার টেবিলটা কোনও মন্ত্রে দীক্ষিত হলে এক বাঙালি আত্মজীবনীতে এই কথাগুলো লিখতে পারে, জাস্ট ডাল-ভাতের কথার স্টাইলে:
‘আমার পরিবার, সংসার, ইতিবৃত্তান্ত লিখতে আমি চাইনি কারণ আমার দেখা আমার শৈশব, যৌবন, সবটাই আমার কাছে একটা সার্কাসের মতো। এটা পড়ে আমার আত্মীয়স্বজন যাঁরা বেঁচে আছেন আঁতকে উঠবেন। কিন্তু আমার কাছে আমার জীবন, সার্কাস। ভাল সার্কাস দেখেছেন যাঁরা তাঁরা বুঝতে পারবেন সেটা কতটা আনন্দের। কতটা মজার। কতটা উপভোগ্য। আমার জীবনের সার্কাস বড্ড মিষ্টি। বড্ড মজার। বয়স বাড়তে সেই মজা কমে গেছে। আমি একা একা এখনও মজা খুঁজে চলেছি। আমার বাবার দুবার বিয়ে হয়েছিল। প্রথম মা মারা গিয়েছিল। শুনেছি দারুণ নাচত। ছবিও দেখেছি তার। দারুণ দেখতে ছিল। আমার বড় দিদি প্রথম মায়ের সন্তান। আজও অজন্তা দত্ত আমার সবথেকে কাছের দিদি। আমার ছোটো দিদি আমার দ্বিতীয় মায়ের সন্তান। দেখতে একেবারেই আমার মায়ের মত নয়। বরং যৌবনের ইন্দিরা গান্ধি। তারপর আমি। বংশের একমাত্র ছেলে। সব থেকে ছোটো। সব থেকে বেশি আদর পেয়েছি। সে থেকে বেশি টাকা খরচ হয়েছে আমাকে বড় করার জন্য। মাসে চোদ্দো হাজার টাকা আমার স্কুলের মাইনে ছিল তখনকার দিনে। আদরে বাঁদর হয়। আমি হয়েছি কি? বাবা চেয়েছিল সাহেবি ইস্কুলে পড়ে একটা কেউকেটা ব্যারিস্টার হব। কিন্তু আমি হতে চাইলাম অভিনেতা। এটা সার্কাস নয়? স্বাধীনভাবে বড় হয়েছি দার্জিলিঙে। এতগুলো বছর সেখানে কাটানোর পর আমি বাবার কথা শুনব কেন? আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় থেকে বাবার সামনে সিগারেট এবং মদ খাচ্ছি। বাবা রেগে গেলেও আমাকে মারধর করেনি। সেটা বাবার বদান্যতা নাকি তার ওকালতির ব্যবসা পড়ে যাওয়ার জন্য আমি জানি না। সংসারের অনেকটা অর্থনৈতিক ভার বয়েছিল আমার ছোটো দিদি, অনন্যা, যার ডাক নাম জাপানি। আমার জামাইবাবু পার্থ ঘোষ কিছুটা সাহায্য করেছে। কিছুটা আমার বড়মামা, দেবব্রত বোস।… শীতকালের ছুটিতে কলকাতায় এসে আমাদের উল্টোদিকের বাড়িতে অ্যালিসিনের প্রেমে পড়ে যাই।’

এবার অন্য এক অঞ্জনের দেখা পাই এই বইয়ে। যে অঞ্জন পুরোপুরি বিদেশি পরিবহে বড় হল, সেই অঞ্জন এই কথা লিখেছে:
‘কলকাতার সবথেকে পুরোনো পাড়ার, এঁদো গলি বেনিয়াপুকুর লেনে আমি থাকি। শব্দ দূষণ কাকে বলে আমি জানি। প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো একতলা বিশাল বাড়ির চারপাশে অনেক নতুন উঁচু বাড়ি হয়ে গেছে। আমি সেই পুরোনো বাড়ি ছেড়ে দিলে, ঝকঝকে একটা বহুতল বাড়ির ফ্ল্যাটে দমবন্ধ হয়ে মারা যাব।…আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। আমার পুরোনো বাড়ির নাম ‘মোহন বংশী’। আমাদের একটা বড় ঠাকুর ঘর আছে। বেশ কয়েক বছর ধরে আমি সেখানে ধূপ জ্বালাই। আমার সিনেমা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা, বা নাটকের মহড়ার মধ্যে, বাড়ির পুরুত আরতি করে। আমাদের বাড়িতে পার্টি বা মদ্যপানের মধ্যে, সে এসে শান্তির জল ছিটিয়ে দেয়।’
চলচ্চিত্র পরিচালক অঞ্জন নিজের চোখে: ‘হিচকক বা সত্যজিৎ রায়ের পদ্ধতিতে আমি চলি না। আমার কাছে নির্দেশক শেষ কথা নয়। যার কাছে শেষ কথা আমি তাদের সম্মান করি। ঋতুপর্ণ আমাকে বলেছে, ‘তুই অভিনয়টা করিয়ে নিতে পারলি না কেন?’ আমার বিশ্বাস, ‘করিয়ে নেওয়া’ যায় না। অপটুদের নিয়ে ভালো কাজ সম্ভব নয়। নীলের (পুত্রের) পছন্দ আমার পছন্দ ভিন্ন। আমরা স্বতন্ত্র। অথচ একসাথে কাজ করতে গেলে, ঝগড়াঝাঁটি পেরিয়ে, এক সাথেই কাজ করি। প্রায় বছর খানেক ধরে, ওর বন্ধুদের সঙ্গে নীল একটা সিনেমা করছে। নাম ‘বিয়ে ফিয়ে নিয়ে’। আমার দারুণ লাগছে। সিনেমাটা আমি আর নীল নিজেদের টাকায় বানাচ্ছি। অল্প টাকার বড় ছবি।…আজও এই বাহাত্তর বছর বয়সে, একটা ভালো নির্দেশকের কাছ থেকে ভালো পার্ট পেলে আমি টাকা নিয়ে দরদস্তুর করতে পারি না। পরে জানতে পারি আমার থেকে অনেক বেশি টাকা পেয়েছে আমার সহ-অভিনেতা। আমার হয় না, আমি ঠকে গেছি।’

জীবনটা জেতা-ঠকার খেলা না সার্কাস? লিখছে অঞ্জন, ‘আমার বাপি জুয়া খেলতে ভালবাসতো। বন্ধুদের সঙ্গে, বাড়িতে। বিশাল রান্নাবান্না আর তিনপাত্তি। হঠাৎ বাপি বায়না ধরল আমাকে তার কোলে বসতে হবে। আমি দার্জিলিং থেকে ফিরে এসেছি ছুটিতে। বয়স ১৩। বাপি হারছে। আমি তার কোলে বসলে সে নাকি জিতবে। অথচ এক বছর দার্জিলিঙে কাটিয়ে আমি তখন বড় হতে চাইছি। আমি খোকার মতো তার কোলে বসবো কেন? বাপি হুইস্কি খাচ্ছে আর আমাকে ডাকছে। আমার সকলের সামনে হাফ প্যান্ট পরা বাপির কোলে বসতে অসুবিধে হচ্ছে। বাপি আমাকে ডেকে আমায় কানে কানে বলল যে সে আমার স্কুলের সিনিয়র ছেলেদের মতো নয়। আমি কোলে বসলে, বাপি জিতবে আর আমিও বড় হয়ে যাব। আমি বাপির গা ঘেঁষে বসেছিলাম, কোলে নয়।’
পবিত্র দত্ত (অঞ্জনের বাপি) সেদিন সকলের টাকা জিতে নিয়েছিল। এটা সার্কাস নয়?
অনেক ঘাটের জল খেয়ে অঞ্জন আজ অঞ্জন দত্ত। সাংবাদিকতা দিয়ে শুরু। এরপর মৃণাল সেনের হাত ধরে সিনেমায় অভিনয়। তারপর জার্মানিতে গিয়ে অস্তিত্বের লড়াই এবং থিয়েটার করা। কলকাতায় ফিরে বিজ্ঞাপনের অফিস। কিছু অভিনয়। তাতে পেট চলছে না। তাই গিটার নিয়ে গান। এবং হঠাৎ বেশ নাম। এরপর সিনেমা বানানো। অঞ্জন নিজেই বলেছে, ‘খেয়াল করে দেখবেন, সাংবাদিকতা, নাটক, বিজ্ঞাপন, গান লেখা, সিনেমার চিত্রনাট্য, সবই লেখা দিয়ে শুরু।’ তারপর আত্মজীবনী, যার ধাক্কা অনস্বীকার্য। আমি ভাবছি, অঞ্জনের লেখার টেবিলটা কেমন? নিশ্চয়ই তার বাড়িটার মতোই, অনেক পুরনো। তাকে আটকে রেখেছে পুরনো টানে। এবং তার মায়াবী চুপকথা মিশিয়ে দিচ্ছে অঞ্জনের লেখায়, কল্পনায়, নস্টালজিয়ায় এবং তার আগামীর অজানা বিন্যাসে।
অঞ্জনের এই আত্মজীবনীতে যে আনকোরা নতুনত্ব পেলাম, তেমনটা আগে বাঙালির স্মৃতিকথায় পাইনি। টেবিলটা কিছুই করেনি, এমন কথাও ভাবতে পারছি না।
…………………….. পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব ……………………
পর্ব ৭৭: অ্যানির ‘দ্য ইয়ার্স’ শেখায় অন্তহীন ইরোটিসিজম-ই জীবনের পরমপ্রাপ্তি
পর্ব ৭৬: জয় গোস্বামীর সাজেশনে মুগ্ধতা জাগাল ‘সিম্পল প্যাশন’
পর্ব ৭৫: যে নারীর শেষপাতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি লেখক
পর্ব ৭৪: সেই তরুণীর জন্য বেঁচে আছে বোকা মনকেমন!
পর্ব ৭৩: কাফকার ভয়-ধরানো প্রেমপত্র!
পর্ব ৭২: থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, কলকাতা বইমেলায় শ্রেষ্ঠাংশে তবে রবীন্দ্র-ওকাম্পো?
পর্ব ৭১: একশো বছরের নৈরাজ্য ও একটি লেখার টেবিল
পর্ব ৭০: আত্মজীবনী নয়, মার্গারেটের ব্রতভ্রষ্ট স্মৃতিকথা
পর্ব ৬৯: রুশদির ‘দ্য ইলেভেনথ আওয়ার’ শেষ প্রহরের, অনিবার্য অন্তিমের দ্যোতক
পর্ব ৬৮: মাংসও টেবিলের কাছে ঋণী
পর্ব ৬৭: ভ্রমণ-সাহিত্যকে লাজলো নিয়ে গেছেন নতুন পারমিতায়
পর্ব ৬৬: নরম পায়রার জন্ম
পর্ব ৬৫: যে বইয়ের যে কোনও পাতাই প্রথম পাতা
পর্ব ৬৪: খেলা শেষ করার জন্য শেষ শব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন জেফ্রি আর্চার
পর্ব ৬৩: সহজ ভাষার ম্যাজিক ও অবিকল্প মুরাকামি
পর্ব ৬২: জীবন তিক্ত এবং আশা করা ভুল, এই দর্শনই বিশ্বাস করেন ক্রাজনাহরকাই
পর্ব ৬১: লন্ডনে ফিরে এলেন অস্কার ওয়াইল্ড!
পর্ব ৬০: পাপ ও পুণ্যের যৌথ মাস্টারপিস
পর্ব ৫৯: মাতৃভক্তির দেশে, মাকে ছেড়ে যাওয়ার আত্মকথন
পর্ব ৫৮: চিঠিহীন এই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রণয়লিপি
পর্ব ৫৭: লেখার টেবিল কি জানে, কবিতা কার দান– শয়তান না ঈশ্বরের?
পর্ব ৫৬: প্রেমের নিশ্চিত বধ্যভূমি বিয়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখার টেবিল জানে সেই নির্মম সত্য
পর্ব ৫৫: জুলিয়া রবার্টসকে হিন্দুধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল একটি বই, একটি সিনেমা
পর্ব ৫৪: আপনার লেখার টেবিল নেই কেন মানিকদা?
পর্ব ৫৩: পুরুষরা যে কতদূর অপদার্থ, ড্রেসিং টেবিলের দেখানো পথে মেয়েরা প্রমাণ করে দেবে
পর্ব ৫২: একটাও অরিজিনাল গল্প লেখেননি শেক্সপিয়র!
পর্ব ৫১: প্রমথ-ইন্দিরার মতো প্রেমের চিঠি-চালাচালি কি আজও হয়?
পর্ব ৫০: হাজার হাজার বছর আগের পুরুষের ভিক্ষা এখনও থামেনি
পর্ব ৪৯: কুকথার রাজনীতিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছেন জর্জ অরওয়েল
পর্ব ৪৮: টেবিলই ওকাম্পোর স্মৃতি, আত্মজীবনীর ছেঁড়া আদর
পর্ব ৪৭: শেষ বলে কিছু কি থাকতে পারে যদি না থাকে শুরু?
পর্ব ৪৬: যে টেবিলে দেবদূত আসে না, আসে শিল্পের অপূর্ব শয়তান
পর্ব ৪৫: ফ্রেডরিক ফোরসাইথকে ফকির থেকে রাজা করেছিল অপরাধের পৃথিবী
পর্ব ৪৪: আম-বাঙালি যেভাবে আমকে বোঝে, দুই আমেরিকান লেখিকা সেভাবেই বুঝতে চেয়েছেন
পর্ব ৪৩: দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে মা দৌড়ে বেরিয়ে গেল, ইবতিসম্-এর উপন্যাসের শুরু এমনই আকস্মিক
পর্ব ৪২: অন্ধকার ভারতে যে সিঁড়িটেবিলের সান্নিধ্যে রামমোহন রায় মুক্তিসূর্য দেখেছিলেন
পর্ব ৪১: বানু মুশতাকের টেবিল ল্যাম্পটির আলো পড়েছে মুসলমান মেয়েদের একাকিত্বের হৃদয়ে
পর্ব ৪০: গোয়েটের ভালোবাসার চিঠিই বাড়িয়ে দিয়েছিল ইউরোপের সুইসাইড প্রবণতা
পর্ব ৩৯: লেখার টেবিল বাঙালির লাজ ভেঙে পর্নোগ্রাফিও লিখিয়েছে
পর্ব ৩৮: বঙ্গীয় সমাজে বোভেয়ার ‘সেকেন্ড সেক্স’-এর ভাবনার বিচ্ছুরণ কতটুকু?
পর্ব ৩৭: ভক্তদের স্তাবকতাই পাশ্চাত্যে রবীন্দ্র-কীর্তি স্থায়ী হতে দেয়নি, মনে করতেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী
পর্ব ৩৬: একাকিত্বের নিঃসঙ্গ জলসাঘরে মারিও ভার্গাস লোসা যেন ছবি বিশ্বাস!
পর্ব ৩৫: জীবনের বাইশ গজে যে নারী শচীনের পরম প্রাপ্তি
পর্ব ৩৪: যা যা লেখোনি আত্মজীবনীতেও, এইবার লেখো, রাস্কিন বন্ডকে বলেছিল লেখার টেবিল
পর্ব ৩৩: ফিওনার সেই লেখার টেবিল মুছে দিয়েছিল মেয়েদের যৌনতা উপভোগের লজ্জারেখা
পর্ব ৩২: বাঙালি নয়, আন্তর্জাতিক বাঙালির সংজ্ঞায় স্পিভাক এসে পড়বেনই
পর্ব ৩১: প্রতিভাপাগল একটি বই, যাকে দিনলিপি বলে সামান্য করব না
পর্ব ৩০: পতিতালয়ের সেই লেখার টেবিল জাগিয়ে তুলেছিল ইসাবেলের হৃদয়-চেতনা
পর্ব ২৯: পাথরে প্রাণ আনে যে টেবিলের স্পর্শ
পর্ব ২৮: নিজের টেবিলকে কটাক্ষ করি, কেন অ্যানে মাইকেলসের মতো লিখতে পারি না?
পর্ব ২৭: নারীর রাগ-মোচনের কৌশল জানে মিলান কুন্দেরার লেখার টেবিল!
পর্ব ২৬: ভালোবাসা প্রকাশের সমস্ত শব্দ পেরিয়ে গিয়েছিল এলিয়টের লেখার টেবিল
পর্ব ২৫: যে টেবিলে জন্ম নেয় নগ্নতা আর যৌনতার নতুন আলো
পর্ব ২৪: প্রেমের কবিতার ভূত জন ডানকে ধরেছিল তাঁর উন্মাদ টেবিলে, মোমবাতির আলোয়
পর্ব ২৩: যে টেবিল আসলে বৈদগ্ধ আর অশ্লীলতার আব্রুহীন আঁতুড়ঘর!
পর্ব ২২: মহাবিশ্বের রহস্য নেমে এসেছিল যে টেবিলে
পর্ব ২১: গাছ আমাদের পূর্বপুরুষ, লেখার টেবিল বলেছিল হোসে সারামাগোকে
পর্ব ২০: টেবিলের কথায় নিজের ‘হত্যার মঞ্চে’ ফিরেছিলেন সলমন রুশদি
পর্ব ১৯: প্রতিভা প্রশ্রয় দেয় অপরাধকে, দস্তয়েভস্কিকে শেখায় তাঁর লেখার টেবিল
পর্ব ১৮: বিবেকানন্দের মনের কথা বুঝতে পারে যে টেবিল
পর্ব ১৭: ‘গীতাঞ্জলি’ হয়ে উঠুক উভপ্রার্থনা ও উভকামনার গান, অঁদ্রে জিদকে বলেছিল তাঁর টেবিল
পর্ব ১৬: যে লেখার টেবিল ম্যাকিয়াভেলিকে নিয়ে গেছে শয়তানির অতল গভীরে
পর্ব ১৫: যে অপরাধবোধ লেখার টেবিলে টেনে এনেছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে
পর্ব ১৪: লেখার টেবিল গিলে নিচ্ছে ভার্জিনিয়া উলফের লেখা ও ভাবনা, বাঁচার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা
পর্ব ১৩: হ্যামনেট ‘হ্যামলেট’ হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল, জানে সেই লেখার টেবিল
পর্ব ১২: রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিল চিনতে চায় না তাঁর আঁকার টেবিলকে
পর্ব ১১: আর কোনও কাঠের টেবিলের গায়ে ফুটে উঠেছে কি এমন মৃত্যুর ছবি?
পর্ব ১০: অন্ধ বিনোদবিহারীর জীবনে টেবিলের দান অন্ধকারের নতুন রূপ ও বন্ধুত্ব
পর্ব ৯: বুড়ো টেবিল কিয়ের্কেগার্দকে দিয়েছিল নারীর মন জয়ের চাবিকাঠি
পর্ব ৮: অন্ধকারই হয়ে উঠলো মিল্টনের লেখার টেবিল
পর্ব ৭: কুন্দেরার টেবিলে বসে কুন্দেরাকে চিঠি
পর্ব ৬: মানব-মানবীর যৌন সম্পর্কের দাগ লেগে রয়েছে কুন্দেরার লেখার টেবিলে
পর্ব ৫: বিয়ের ও আত্মহত্যার চিঠি– রবীন্দ্রনাথকে যা দান করেছিল লেখার টেবিল
পর্ব ৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের টেবিল আর তারাপদ রায়ের খাট, দুই-ই ছিল থইথই বইভরা
পর্ব ৩: টেবিলের গায়ে খোদাই-করা এক মৃত্যুহীন প্রেমের কবিতা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved