


বাঁকের জলযাত্রাকে হিন্দিতে বলে ‘কাঁওয়ার’ বা ‘কাঁওড়’। সংস্কৃত শব্দ ‘কান্বরথী’ থেকে এসেছে কাঁওয়ার। দক্ষিণ ভারতে বলে ‘কাভাড়ি’। ‘কাভারি’ থেকেই বাংলায় এসেছে ‘কাবাড়ি’। ‘কাবাড়ি’ মানে বাঁশের চটা। বর্তমানে বাঁশের চটা থেকে থেকেই প্রধানত বাঁক তৈরি হয়। স্কন্দচাপ বা বাঁকে বহনকারীর নাম ‘ভারী’, বাঁকিদার বা বাঁকি।
৪৪.
দু’টি উজ্জ্বল জল-চলচ্ছবি।
শ্রাবণের রিমঝিম বৃষ্টিমুখর রবিবারের ভোর। গঙ্গার ঘাটে ঘাটে ভিড়। কিশোর-কিশোরী যুবক-যুবতী থেকে মধ্যবয়স্ক পুণ্যার্থীর সমাগম। পরনে গেরুয়া বা লাল পোষাক। কপালে ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ ফেটি। কাঁধে সুসজ্জিত বাঁক। দু’ দিকে শিকায় ঝোলানো জলপূর্ণ পবিত্র ঘট। ছন্দোময় চলার গতি। বাঁকে বাঁকে দুলকি চালের ঢেউ।
সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে চলেছেন ভক্তরা। বাঁকের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো ঘুঙুর-ঘণ্টাধ্বনির একটানা রুনুঝুনু আবহ। মাঝে মাঝে সমবেত কণ্ঠে সুরেলা স্লোগান।
‘ভোলে বাবা–
পার করে গা–’
কিংবা
‘হর হর মহাদেব–’

চৈত্রের আমেজময় সকাল। ফুরফুরে হাওয়া। দলবদ্ধ নারী পুরুষ। মাথায় পবিত্র গঙ্গাজলের ঘড়া। ঘড়ার গলায় ঝুলছে পাকা কলার ছড়া। চাঁদমালা। লাল ফুলের মালা। শোভাযাত্রার সামনে একজন ধুনুচি নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। পিছনে ঢাকঢোলের উদ্দাম বাজনা।
গ্রাম্যদেবতার বেদিতে জলের পুজো সম্পন্ন করে নাচের ছন্দে শোভাযাত্রা যাচ্ছে রাঢ়ের শীতলাদেবীর নামান্তর দিদি ঠাকরুনতলায়।
শ্রাবণ-চৈত্রের এই বিশেষ পুজোর নাম ‘জলঢালা’। জলাভিষেক। জলযাত্রা। তবে ধারে-ভারে উজ্জ্বল শ্রাবণমাসের সোমবারে শিবের মাথায় জলঢালার জলছবি। বাঁকে থাকে দু’টি ঘট। শিব-শক্তি বা হরিহরের প্রতীক। পারফেক্ট ব্যালেন্স। আর এ দৃশ্য শুধু বাংলায় নয়, পঞ্জিকা ভেদে ভিন্ন সময়ে ভারতের প্রায় সর্বত্র দৃশ্যমান।

দেবতার মাথায় বা বেদিতে জল ঢালা শুধু ভারতীয় সংস্কৃতি নয়। বিশ্বের প্রাচীন লোকায়ত ধর্ম-সংস্কৃতির অঙ্গ। ইউরোপীয় পরিমণ্ডলে পবিত্র জলাভিষেকের নাম ছিল ‘লিব্যাশন’ ও ‘লাশট্রেশন’।
প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ধর্মে জিউস বা পোসাইডন দেবতার বেদিতে সোনার পাত্র থেকে জল দান করা হত। গ্রিসের ডেলফি মন্দিরেও দেবতার প্রতীক একটি প্রস্তরখণ্ডকে জলাভিষেক ছিল নিত্যকর্ম। প্রাচীন মিশরীয় দেবতা ওসাইরিসের মস্তকে পবিত্র নীলনদের জল দিয়ে অভিষেক হত। ‘অভিষেক’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল আদ্রীর্কৃত বা স্নাত।
প্রাচীনকালে রাজা নরদেবতা হিসাবে মান্যতা পেয়েছিলেন। মিশরের ফ্যারাওদের রাজ্যাভিষেকের সময়ে রাজার মস্তকে জল ঢালা হত। ভারতেও পবিত্র জল ঢেলে যে রাজ্যাভিষেক হতো তার নাম ছিল ইন্দ্রাভিষেক।

‘অভিষেক মূর্তি’ হিন্দু বৌদ্ধ জৈন তিন ধর্মেই দেখা যায়। যেমন গজলক্ষ্মী মূর্তিতে দু’টি হাতি দেবীর মাথায় জল ঢালছে। জৈন মহাবীরের নবজাতক রূপে ইন্দ্রাভিষেকের ভাস্কর্য ও ছবি দুই চমৎকার। বুদ্ধের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই নাগরাজ কর্তৃক শীতল উষ্ণ প্রস্রবন প্রদানের কাহিনি। মূলবাসী সংস্কৃতিতেও পবিত্র বৃক্ষকে জলপ্রদান অত্যাবশক কর্ম।
শ্রীমদ্ভাগবত গীতার নবম অধ্যায়ের ২৬ নম্বর শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ ভক্তির সঙ্গে স্বীয় পূজাপদ্ধতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং’ দানের বিষয়টি। হিন্দুপুজো মাত্রেই জলপূর্ণ ঘট অত্যাবশ্যক উপকরণ। সনাতনীরা বিশ্বাস করেন– জলপূর্ণ ঘটের তলদেশে থাকেন ব্রহ্মা, মধ্যে বিষ্ণু এবং গলদেশে থাকেন স্বয়ং মহাদেব।
হিন্দুদের পারিবারিক দেবপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল নিত্য স্নান। দেবতার ‘চানজল’ (স্নান-জল) ভক্তদের কাছে পবিত্র বারিস্বরূপ। এছাড়া বৈশাখমাসে জলের ঝাড়া দান, ‘সহস্রধারা-অভিষেক’ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। শত ছিদ্রযুক্ত পোড়ামাটির পাত্র বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্র থেকে পাওয়া গেছে। অথর্ববেদে এই ধরনের পাত্রের নাম উল্লিখিত হয়েছে ‘শতধারা’।

শিব যে বহু প্রাচীন দেবতা সিন্ধুসিলে তার স্বাক্ষর আছে। অন্যদিকে শিবের সঙ্গে জলের সম্পর্ক শুধু পুজোর ঘটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতবর্ষের দুই পবিত্র নদী গঙ্গা ও নর্মদার সঙ্গে যুক্ত। রামায়ণের আদি কাণ্ড অনুসারে স্বর্গপ্রবাহিনী গঙ্গাকে মর্তে পতিত অবস্থায় তিনি ধারণ করেছিলেন তাঁর জটাজালের মধ্যে। গঙ্গা তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী। রেবা বা নমর্দা শিবের গাত্রনিঃসৃত ঘর্মরূপ বা কন্যা। তবে শ্রাবণ মাসের শিবের জলাভিষেক প্রসঙ্গে যোগ রয়েছে উমার সঙ্গে।
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের কৃষ্ণ জন্মখণ্ডে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বলা হয়েছে, পতি অপমানে বিধ্বস্ত সতী দেহত্যাগ করে উমা বা পার্বতী রূপে হিমালয় ও মেনকার কন্যারূপে জন্ম নিলেন। পরে শিবকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য শ্রাবণমাস জুড়ে কঠোর ব্রত করেন এবং শিবকে জলাভিষেক করলে সন্তুষ্ট মহাদেব পার্বতীকে বিবাহ করলেন। বিবাহের দিন ছিল সোমবার। লৌকিক মতানুসারে, সমবেতভাবে নারী-পুরুষের এই জলযাত্রা আসলে দেবদম্পতির বিবাহ উপলক্ষে জল সইতে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রথার সনিষ্ঠ অনুকরণ।
সোমবারে কেন জল ঢালা হয়– তার একাধিক ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়। ‘সোম’ শব্দের একাধিক অর্থের মধ্যে অন্যতম হল অমরকোষের টীকা অনুযায়ী উমাসহ শিব। শিবের কন্যা রেবা বা নর্মদা নদী ‘সোমসুতা’ নামে অভিহিত হয়েছেন। শিবলিঙ্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গৌরীপট্টের আধারের জল নির্গমন প্রণালীকে ‘সোমসূত্র’ বলে।

স্কন্দপুরাণে প্রতি সোমবারে সন্ধেবেলায় শিবদুর্গার ব্রত পালনের কথা বলা হয়েছে। ‘সোমনাথ’ বা ‘সোমেশ্বর’ নামে শিবলিঙ্গ রয়েছেন ভারতে। কল্যাণসুন্দর শিবের একাধিক রূপের মধ্যে ‘সোমাস্কন্দ’ নামটিও উল্লেখযোগ্য।
অন্য আরেক কাহিনি অনুসারে চন্দ্র বা সোম ছিলেন পরম শৈবভক্ত। ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হবার পর দুশ্চর শৈব-সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে রোগমুক্ত হন চন্দ্র। শিবের মস্তকেও স্থানলাভ করেন। আবার বৈদিক সোমলতা শুধু সুধা নির্মাণে ব্যবহৃত হত না। রোগহর বিষনাশক লতা। নীলকণ্ঠ শিবের বিষপান কাহিনিতে সোমলতাও যুক্ত হয়েছে।
স্কন্দপুরাণের মাহেশ্বর খণ্ডে শ্রাবণমাসে শিবের মাথায় জল ঢালাটি অতীব পুণ্যকর্ম রূপে বর্ণিত হয়েছে। কেদার খণ্ড ও লোকপুরাণের বিভিন্ন কাহিনি থেকে জানা যায়, শ্রাবণ মাসে সুরাসুর মিলে সমুদ্র মন্থনের ফলে তীব্র কালকূট উত্থিত হয়েছিল। তার ফলে বিপর্যস্ত সৃষ্টিকে বাঁচানোর জন্য মহাদেব সেই বিষ পান করে ‘নীলকণ্ঠ’ নামে পরিচিত হয়েছিলেন।

বিষক্রিয়ায় শিবের মস্তকে তীব্র অগ্নিদাহের মতো প্রদাহ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই তাপ প্রশমনের জন্য ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর নেতৃত্বে দেবতারা হিমালয়ের শীতল পবিত্র নিরবচ্ছিন্ন গঙ্গা জলধারা শিবের মস্তকে ঢেলেছিলেন। শীতল জলপ্রবাহে অভিষিক্ত হবার ফলে ধীরে ধীরে তিনি বিষমুক্ত হয়েছিলেন। শ্রীমদ্ভাগবতের অষ্টম স্কন্দের সপ্তম অধ্যায়, শিবপুরাণের কোটিরুদ্র সংহিতার বিভিন্ন অধ্যায়ে শিবের বিষের জ্বালা প্রশমনে শ্রাবণমাসের গঙ্গাজলধারা ঢালার প্রসঙ্গ রয়েছে। লিঙ্গপুরাণ অনুসারে শিবলিঙ্গ তেজস্ক্রিয় অগ্নিস্তম্ভ স্বরূপ। শিবের রুদ্র বা আগ্নেয় তেজকে প্রশমন করার উদ্দেশ্যে শ্রাবণমাসে জলধারা ঢালার বিষয়টি শৈবভক্তদের কাছে খুবই জনপ্রিয় ছিল।
শিবলিঙ্গ, বিষক্রিয়া এবং শ্রাবণমাসে জল ঢালা– তিনটি ঘটনাকে একটি সরলরেখায় উত্থাপন করলে প্রাচীন আয়ুর্বেদিক শাস্ত্রে জলচিকিৎসা ও অগদতন্ত্র বা বিষচিকিৎসার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আষাঢ় শ্রাবণ ও ভাদ্র– এই তিন মাসে ভারতে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বর্ষাকাল সক্রিয় থাকে। স্বাভাবিকভাবে এই সময় বিষধর সাপের উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। হাসপাতাল ও জনস্বাস্থ্য প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী এই তিন মাসে সাপে-কাটা রোগীর সংখ্যা ৩৪-৪০ শতাংশ।
প্রাচীনকালে সর্পচিকিৎসায় জলের ব্যবহার করা হত। একালের বিচারে এর নাম ‘হাইড্রোথেরাপি’। বিষক্রিয়ার ফলে শরীরের রক্তকণিকা পুড়িয়ে দিয়ে তীব্র দাহের সৃষ্টি করে। ফলে শরীরে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। তাপমাত্রা প্রশমনের জন্য জলের শীতলধারা দেওয়া হত মাথায়। পান করানো হত পর্যাপ্ত শীতল জল। ফলে রক্তে বিষের ঘনত্বকে যেমন কমানো হত, তেমনই পর্যাপ্ত জলপানের ফলে প্রস্রাবের মধ্য দিয়ে বিষ নির্গমন হত। প্রসঙ্গত, সাপে-কাটা রুগীকে এই কারণে দাহ না করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হত।

একইভাবে আয়ুর্বেদ অনুসারে মারণব্যাধি মসূরিকা বা বসন্তরোগের চিকিৎসায় জলের মাধ্যমে শীতলীকরণ থেরাপির ব্যবহার করা হত। শীতলাদেবীর নামকরণটি এই শীতলতা থেকেই এসেছে। দেবীর মূর্তিতে এক হাতে ঝাঁটা যেমন পরিবেশের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতীক, অন্যদিকে রুগিকে শান্ত-শীতল করার জন্য তাঁর হাতে থাকে শীতলজলে পূর্ণ কুম্ভ। লোকায়ত দেবদেবীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল রোগ প্রতিরোধে তাঁদের ভূমিকা। প্রসঙ্গত, শিবের অপর নাম বৈদ্যনাথ। তিনিও রোগহর দেবতা হিসাবে মান্যতা পেয়েছেন।
ভক্তদের বিশ্বাস অবশ্য বহু বিচিত্রগামী। সারা বছর যাতে সুস্থ স্বাভাবিক কর্মক্ষম থাকেন কিংবা পুণ্যলাভের আশায় বিবিধ অনাদি লিঙ্গ বা পাতালফোঁড় শিবকে ভক্তিভরে বাঁকে করে গঙ্গাজল দান করেন। শ্রাবণমাসে কয়েকটি বিখ্যাত শ্রাবণীমেলা ও জলযাত্রা হল বিহারের সুলতানগঞ্জ থেকে দেওঘরের বৈদ্যনাথ ধাম গমন। কাশী-রামেশ্বরম জলযাত্রা অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের মধ্যে হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত শ্রাবণীমেলা তারকশ্বরের জলযাত্রা উপলক্ষে হয়। অসংখ্য ভক্ত জলযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। বর্ধমান জেলার বর্ধমানেশ্বরের উদ্দেশে কাটোয়া থেকে জলযাত্রা হয় শ্রাবণমাসের ২৪ তারিখে। জেলাস্তরে পাতালফোঁড় শিবের জলযাত্রা হয় শ্রাবণমাসের প্রতি সোমবারে।
বাঁকের জলযাত্রাকে হিন্দিতে বলে ‘কাঁওয়ার’ বা ‘কাঁওড়’। সংস্কৃত শব্দ ‘কান্বরথী’ থেকে এসেছে কাঁওয়ার। দক্ষিণ ভারতে বলে ‘কাভাড়ি’। ‘কাভারি’ থেকেই বাংলায় এসেছে ‘কাবাড়ি’। ‘কাবাড়ি’ মানে বাঁশের চটা। বর্তমানে বাঁশের চটা থেকে থেকেই প্রধানত বাঁক তৈরি হয়। স্কন্দচাপ বা বাঁকে বহনকারীর নাম ‘ভারী’, বাঁকিদার বা বাঁকি।

বড়ুচণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ভারখণ্ডের সূচনাপদে বাঁক ও শিকা প্রস্তুতি নিয়ে চমৎকার বর্ণনা আছে।
মাঝ বৃন্দাবন গিঁআ কাহ্নাঞি গোআল।
চামড়গাছের বাছি কাটিলেক ডাল।।
দুঈ পাশে ছুচ করী মাঝে পুষ্ট করী।
বাঁহুক সজাএ ভাল দেব মুরারী।।
চামড়গাছ হল বুনো কাঁঠালগাছ। এর অপর নাম চাপলিশ গাছ। দু’ পাশ সরু করে কেটে মাঝখানে পুষ্ট রাখা হত। দু’ পাশে শিকে ঝোলানোর জন্য রাখা হত খাপ বা গুটি। লোকশিল্পীরা বলেন, খাপুটি। ঝামা দিয়ে মেঝে চিকন করা হত বাঁহুক। শিকা প্রস্তুতির জন্য পাটের গুছি বারো প্রহর ধরে জলে ভিজিয়ে, শুকিয়ে নিয়ে চার গুচি করে সুতলি প্রস্তুত করে শিকা বোনা হত। শিকার নিচে বাঁধা হত সুদৃশ্য বিঁড়ে।
বাঁক ও শিকা হরিহর আত্মা। শিকা আজও পাটের সুতলির তৈরি জালিকা। ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পের দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন ধরনের নান্দনিক নকশি-শিকা থাকলেও শিবের জলযাত্রায় লাগে জালিশিকা বা হাঁড়ি শিকা।
বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের বাঁকে করে জলযাত্রা হয়। মোটামুটি পাঁচ থেকে দশফুট পর্যন্ত বাঁক দেখা যায়। এককভাবে যেমন বাঁক নিয়ে যাওয়া হয়, তেমনই একাধিক ব্যক্তিও একই বাঁকে করে জল নিয়ে যান। সেক্ষেত্রে বড় বাঁক লাগে। মাঝে ভেঙে যাওয়ার জন্য পিতলের পাতি বসানো থাকে।
বাঁকের সজ্জা মোটামুটি তিনশো টাকা শুরু করে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত। দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি– দশফুট মাপের বাঁক সাজাতে প্রায় হাজার টাকা মজুরি। নানা ধরনের কাপড়ের প্যাঁচ-সহ মূর্তি, ঘুঙুর ঘণ্টা, পাতা ফুলের অলংকরণ, পতাকা, এলইডি লাইটের সাজ, শিবমূর্তি ময়ূরের পালক– কী না থাকে! শিবের জলযাত্রায় মানত অনুসারেও বাঁকিদারের শ্রেণি বিভাজন লক্ষ্য করা যায়।

সাধারণ বাঁকিরা জলযাত্রার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করার সময় চটিতে সাময়িক বিশ্রাম করেন। সেক্ষেত্রে কাঁধ থেকে বাঁক নামিয়ে স্ট্যান্ডে বা গাছের ডালে রাখেন। খাড়া বাঁকিদের ক্ষেত্রে কাঁধ থেকে বাঁক নামে না। ডাক-বাঁকিরা গঙ্গা থেকে জল ভরার পর প্রায় দৌড়তে থাকেন। উত্তরদিকে মুখ করে বাঁকের জল শিবলিঙ্গে ঢালেন পরম ভক্তিভরে। শিবভক্তরা জীবনভর অন্তত চারবার এই জলদান করে থাকেন।
শিবের মাথায় জল ঢালার উদ্দেশ্যে বাঁকযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভগবান রামচন্দ্রের নাম। সংস্কৃত ভাষায় রচিত ‘আনন্দরামায়ণ’ থেকে এই তথ্য জানা যায়। লোকমতে, বাল্মীকি বৃদ্ধবয়সে এই রামায়ণ রচনা করেছিলেন। গবেষকদের মতে, এটি মধ্যযুগে রচিত আঞ্চলিক রামায়ণের দৃষ্টান্ত।
নয় কাণ্ডে রচিত আনন্দরামায়ণের দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম যাত্রাকাণ্ড। লঙ্কায় রাবণবধের জন্য রামচন্দ্রের উপর যে ব্রহ্মহত্যার দায় বর্তেছিল তার থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য তিনি বাঁকে করে গঙ্গাজল নিয়ে গিয়ে রামেশ্বরমে শিবলিঙ্গকে প্রদান করে পাপমুক্ত হন। লোকশ্রুতি অনুসারে শুধু রামচন্দ্র নন, রাবণও ছিলেন বাঁকযাত্রী। শিবভক্ত রাবণ বৈদ্যনাথ ধামে শিবলিঙ্গ স্থাপনের পর বাঁকে করে গঙ্গাজল নিয়ে বৈদ্যনাথকে চড়ান।

জল জীবন, উর্বরতা, শীতলতা ও আরোগ্যলাভের প্রতীক। শুধু দেবতাকে প্রসন্ন করার জন্য জলদান হয় না। খরা, মহামারী, দুর্ভিক্ষ প্রশমন, বন্যা প্রতিরোধ এবং চাষের কাজে বৃষ্টির জন্য জলাভিষেকের বিচিত্র লৌকিক অনুষ্ঠান– বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির অন্যতম গৌরব।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ৪২: হরেক রকম হুড়ুম
পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি
পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ
পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য
পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা
পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল
পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর
পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি
পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়
পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার
পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন
পর্ব ৩২: তালবাহার
পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা
পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ
পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়
পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?
পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved