
দীনেশরঞ্জন দাশ আর গোকুলচন্দ্র নাগের সম্পাদনায় ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে ঘিরে বাংলায় যে অভিনব সাহিত্য প্রয়াস শুরু হয়েছিল প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন সেই ‘কল্লোল’-এর অন্যতম সেনানী। আবার মুরলীধর বসুর ‘কালিকলম’ পত্রিকার প্রথম বছরে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনিও সম্পাদক ছিলেন। এক বছর পর তিনি সম্পাদনা থেকে অব্যাহতি নেন, আর শৈলজানন্দ দু-বছরের মাথায়। আবার ১৯৩৫ সালে যখন ‘কবিতা’ পত্রিকা প্রকাশিত হল⎯ তখন তার সম্পাদক ছিলেন বুদ্ধদেব বসু আর প্রেমেন্দ্র মিত্র। সহকারী সম্পাদক সমর সেন।
সুরজিৎ দাশগুপ্তর নিজের লেখা বই আমি প্রকাশ করতে শুরু করেছিলাম ২০০৩ সাল থেকে। ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর, অন্নদাশঙ্কর রায়ের প্রয়াণের পর তিনি অন্নদাশঙ্করকে নিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন ‘কবিতীর্থ’, ‘বাংলা আকাদেমি পত্রিকা’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’, ‘দেশ’ ইত্যাদি পত্রিকায়। অন্নদাশঙ্করের প্রয়াণের পরের দিনই ‘বর্তমান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর লেখা⎯ ‘অন্নদাশঙ্কর: নির্বাণেও এক আলোকস্তম্ভ’ নামে। এইসব প্রবন্ধের সঙ্গে ২০০২ সালে দে’জ থেকে প্রকাশিত ‘পরিকথা’ পত্রিকার সম্পাদক দেবব্রত চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বিংশ শতাব্দীর সমাজ-বিবর্তন: বাংলা উপন্যাস’ বইটিতে অন্নদাশঙ্করের চার খণ্ডের উপন্যাস ‘ক্রান্তদর্শী’ নিয়ে তাঁর লেখা ‘‘মূল ধারার বাইরে একটি ধারা ‘ক্রান্তদর্শী’’’ প্রবন্ধটি যুক্ত করে ২০০৩-এর ডিসেম্বরে আমি প্রকাশ করেছিলাম ‘শতাব্দীর অতন্দ্র প্রহরী অন্নদাশঙ্কর’। রমাপদ চৌধুরীকে উৎসর্গ করা বইটিতে মোনা চৌধুরীর তোলা একটি ফোটোগ্রাফ দিয়ে প্রচ্ছদ তৈরি করা হয়েছিল। অন্নদাশঙ্কর রায়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে ১২টি প্রবন্ধ আছে বইটিতে। এই বইয়ের শেষ লেখা ‘তর্পণ’-এ সুরজিৎদা ব্যক্তিগত জায়গা থেকে অন্নদাশঙ্করকে একেবারে রক্তেমাংসে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন। লেখাটির একেবারে শেষে তিনি একদিন রাতে তাঁর সঙ্গে অন্নদাশঙ্করের কথোপকথনের কথা জানিয়েছেন, যা পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। সেদিন সুরজিৎদা গিয়ে দেখেন অন্নদাশঙ্কর ঘর অন্ধকার করে বিছানায় শুয়ে আছেন, ‘[অন্নদাশঙ্কর] বললেন, ‘ভাবছিলাম কতজনের উপর কত অন্যায় অবিচার করেছি।’ আমি বোকার মতো বললাম, ‘এখন ওসব পুরনো কথা ভাবলে কি আর সেসবের সংশোধন হবে?’ তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘মানুষের জীবনে অতীতকাল বলে কিছু নেই, সবটাই নিত্যকাল, আত্মসমালোচনায় ও আত্মসমর্পণে একপ্রকার আত্মশুদ্ধি হয়।’⎯ আমার মনে হয়, এই অংশটা পড়লে বোঝা যায় কেন সুরজিৎদা বইটার নাম দিয়েছিলেন শতাব্দীর অতন্দ্র প্রহরী।

দে’জ পাবলিশিং থেকে সুরজিৎ দাশগুপ্তর পরের বইটি প্রকাশিত হয় তিন বছর পরে⎯ ২০০৬-এর বইমেলায়। অজয়দার (অজয় গুপ্ত) আঁকা মলাটে প্রকাশিত ‘বাংলা ছোটোগল্পের সূচনা ও প্রেমেন্দ্র মিত্র’ বইটি তিনি দিব্যেন্দু পালিতকে উৎসর্গ করেছিলেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রকে নিয়ে তাঁর লেখা অনেকগুলি প্রবন্ধ এই বইতে আছে। সেই সঙ্গে বইয়ের সূচনায় সংযোজিত হয়েছে ‘বাংলা ছোটোগল্পের সূচনা’ নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধটি নিয়েও একটা বলবার মতো ঘটনা আছে। সুরজিৎদা লিখেছেন⎯ “১৯৬৮-৬৯ সালে ‘জয়শ্রী’ পত্রিকাতে ‘বাংলা ছোটোগল্পের মানচিত্র’ নামে কিস্তিতে-কিস্তিতে লেখা শুরু করেছিলাম। আমরা তখন থাকতাম দার্জিলিংয়ে। প্রাকৃতিক ও পারিবারিক কারণে ‘কল্লোলের দিকে’-র পরে প্রেমেন্দ্র মিত্রর উপর অষ্টম কিস্তিটার পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। বছর কয়েক আগে হঠাৎই সেটা কোথা থেকে যেন বেরিয়ে পড়ল। তখন ‘জয়শ্রী’-র বিজয় নাগ অফিস-ফাইল থেকে প্রকাশিত সাতটা কিস্তি ফোটোকপি করে দিলেন।” ‘বাংলা ছোটোগল্পের মানচিত্র’ই বইয়ে হল ‘বাংলা ছোটোগল্পের সূচনা’।

২০১০ সালে আমি সুরজিৎদার দুটো বই প্রকাশ করেছিলাম⎯ বইমেলার সময় বেরিয়েছিল ‘যুগবদলে বাংলা উপন্যাসের রূপবদল’ এবং সে বছরের সেপ্টেম্বরে ‘রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ’। প্রথম বইটির পরিচিতি দিতে গিয়ে সুরজিৎদা লিখেছিলেন⎯
“দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পর্যন্ত বাংলা উপন্যাসের মূলধারা ছিল গ্রামীণ মধ্যবিত্ত সমাজে বিধৃত বিভিন্ন চরিত্রের অথবা বিভিন্ন পরিবারের মধ্যে বিরোধমিলনের, সম্পর্ক ভাঙাগড়ার বা সুখদুঃখের কাহিনি লিখন। এই ধারার প্রধান লেখক শরৎচন্দ্র।
তিরিশের দশকের গোড়ার দিকে এই মূলধারার বাইরে দুটি উপন্যাসের প্রকাশ। ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ও ‘দিবারাত্রির কাব্য’। একটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কের সুখময় পরিণতিহীনতায়, অন্যটির মর্মান্তিক শূন্যপরিণতিতে। দুটোই চলতি ভাষায় লেখা। দুটোরই চরিত্রগুলি সমাজ-নিরপেক্ষ এবং উপন্যাসের মধ্যে নেহাত ব্যক্তি রূপেই তাদের উপস্থিতি ও বিচরণ। আরও দুটি সাদৃশ্য চোখে পড়ে। দুটিরই ঘটনাস্থল বদলেছে এক স্থানে শুরু, শেষ অন্য স্থানে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালের সূচনায় লেখা ‘কালো হাওয়া’ প্রশ্ন তুলেছে সেই সমাজ সম্বন্ধে, যে সমাজের কাছে বিশ্বাস, ভক্তি, সমর্পণ প্রভৃতি গর্বের বিষয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দাঙ্গা, দেশভাগ ইত্যাদি ঘটনাবলি দ্রুত পাল্টে দিয়েছে বাঙালি সমাজকে। এই পাল্টে যাওয়া দেশ-কাল-পাত্রের কীভাবে ছায়া পড়েছে বাংলা উপন্যাসে তারই পরিচয় নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে ‘যুগবদলে বাংলা উপন্যাসের রূপবদল’ বইটিতে।”

দ্বিতীয় বই ‘রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ’ সম্পর্কে লেখা হয়েছিল⎯ “আধুনিক ভারতের জনককে এক রাজন্যর দেওয়া ‘রাজা’ খেতাবে উল্লেখের রেওয়াজ ভেঙে শুধু রামমোহন নামেই উল্লেখ করেন বর্তমান গ্রন্থকার। রামমোহন হিন্দু সমাজের সংস্কার করেছিলেন, কিন্তু তা ছাড়াও তিনি যে বিশ্বমানব, বিশ্বশান্তি ও অমূর্ত বিশ্বশক্তির প্রবক্তা ছিলেন এই প্রসঙ্গটার উপরেই গ্রন্থকার গুরুত্ব দিয়েছেন। রামমোহনের বিশ্বচিন্তার যোগ্য উত্তরসাধক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু অমূর্ত বিশ্বশক্তি সম্বন্ধে যে চেতনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ জীবন শুরু করেছিলেন সেই চেতনা কি রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ ছিল? Sadhana-র লেখক, এমন কী The Religion of Man-র বক্তা, কি Man-এর বক্তৃতায় স্বাশ্রয়ী ব্যঞ্জনায় বহু-রূপান্তরিত জন? রবীন্দ্রনাথ কি বহুক্ষেত্রে আমাদের কাছে আজও দুর্বোধ্য নন? বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের থেকে তিনি কেন কিছুদিন পরেই সরে দাঁড়ালেন? ‘ঘরে-বাইরে’-তে মূল কাহিনির ভেতর কেন টেনে আনলেন মহাজন-খাতকের ছোট্ট কিন্তু অর্থপূর্ণ গল্প? বাংলায় স্বাদেশিকতার পেছনে তিনি কি সাম্প্রদায়িকতার ছায়া আর সাম্প্রদায়িকতার মূলে আর্থনীতিক কারণ দেখেছিলেন ? তপোবনের আদর্শে ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয় কি অতীতমুখী আর বিশ্বভারতীর আদর্শ কি ভবিষ্যৎমুখী নয়? বিশ্বভারতী সমিতির প্রথম সভায় The Robbery of the Soil ভাষণ, বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠান, ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতা প্রভৃতির মধ্য দিয়ে আমরা কি প্রকৃতিপ্রেমিক থেকে রবীন্দ্রনাথের পরিবেশগুরু হয়ে ওঠার কাহিনি পাই না ? ‘রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ’ নতুন নতুন জিজ্ঞাসায় ও জবাবে আন্দোলিত এক কৌতূহলোদ্দীপক পুস্তক। এবং এক নতুন উত্তেজনা।” এখন বইটা উলটে-পালটে দেখতে গিয়ে এই পরিচিতিটা স্বপনদার (স্বপন মজুমদার) লেখা বলেই মনে হচ্ছে।

সুরজিৎদার কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল, আমার সঙ্গে প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রাথমিক যোগাযোগটা সম্ভবত সুরজিৎদার মাধ্যমেই হয়েছিল। কলকাতার লেখক-কবিদের সঙ্গে তাঁর আকৈশোর সম্পর্কের কথা বলেছি। জীবনানন্দ দাশ, অন্নদাশঙ্করের মতোই প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন তাঁর আরেকজন প্রিয় লেখক। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে অন্নদাশঙ্করের মতোই তিনি পুত্রসম ছিলেন। শুধু তা-ই নয় ১৯৫১ সালে কলকাতায় এসে তিনি সটান উঠেছিলেন প্রেমেনদার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে। ‘স্মৃতির পাখিরা’ বইয়ে সুরজিৎ দাশগুপ্ত লিখছেন⎯
“…কলকাতায় এসে নিত্যানন্দকে নিয়ে সোজা গিয়ে হাজির হলাম প্রেমেন্দ্র মিত্র-র বাড়িতে। তিনি আশ্চর্য হলেন, কিন্তু অপ্রস্তুত হলেন না।
প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন আধুনিক বাঙালি সাহিত্যিকদের সর্বজনীন প্রেমেনদা আর তাঁর স্ত্রী বীণা মিত্র ছিলেন সকলের বৌদি। তাঁদের বাড়িটা ছিল কতকটা ধর্মশালার মতো। সারাক্ষণ দরজা খোলা, ভেতরে কাঠের তক্তপোশ, টিনের চেয়ার, বেতের মোড়া। কিছু জোড়া আছে, কিছু পাতা আছে। সারাক্ষণ চা-ভর্তি কাপ আসছে আর খালি কাপ ফেরত যাচ্ছে আর অবিরাম সাহিত্য-সিনেমা রেস-রেস্তোরাঁ আইনস্টাইন-রাসেল আজটেক-ইনকা ইত্যাদি দুনিয়ার হাজার বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে। বাড়ির বাসিন্দা বলতে প্রেমেনদা ও বৌদি আর এক মেয়ে ও দু-ছেলে, কিন্তু দিনের অন্তত যোলো ঘণ্টা বাড়িতে পনেরো-ষোলোজন অতিথি হাজির।

মিত্র পরিবারের অন্তর্ভুক্ত না হলেও আরও একজনকে অবশ্য সে-বাড়ির আধা-বাসিন্দা বলা যেত। কারণ প্রতিদিন সকালে তাঁকে অবধারিতভাবে এ-বাড়িতে দেখা যেত। তিনি বিখ্যাত অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্য। থাকতেন এই রাস্তারই উত্তর দিকে বলরাম বসু ঘাটের কাছে। এককালে রোমান্টিক হিরোর ভূমিকা তাঁর বাঁধা ছিল। পরে প্রেমেনদার ‘কালোছায়া’ সিনেমায় ভিলেন-এর অভিনয় করে তিনি বাংলা ছবির দর্শক সমাজকে চমকে দেন। একান্ন-বাহান্ন সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার কী-একটা পুরস্কার পান নরেশ মিত্র-র ‘কঙ্কাল’ ছবিতে খল নায়কের অসাধারণ অভিনয়ের জন্য। ‘কল্লোল’-এর যুগে তিনি কবিতা ও গল্প লিখতেন। তখন তাঁর সাধ ছিল সাহিত্যিক হওয়ার। অবস্থার চাপে পুলিশের চাকরি নেন। ঘটনাক্রমে চলে আসেন সিনেমার পর্দায়।

আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল উঠোনের পশ্চিমে রাস্তার দিকের একটা ঘরে। সেটা বোধ হয় ছিল বড় ছেলে মৃন্ময়ের ঘর। ঘরচ্যুত মৃন্ময় আশ্রয় পেলেন ভেতরের কোনও ঘরে। তিনি তখন পড়তেন সম্ভবত উত্তর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে।
দুপুরে প্রেমেনদার সঙ্গে আমরা খেতে বসে গেলাম।…”
প্রখ্যাত অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্যের দুটো বই একসময় খুব জনপ্রিয় ছিল⎯ ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ আর ‘যখন নায়ক ছিলাম’। সম্ভবত প্রথম বইটা ছাপা হয়েছিল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েটেড পাবলিশিং থেকে আর দ্বিতীয়টা নিউ এজ-এর জানকীনাথ সিংহরায়। এখন অবশ্য পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি দুটো বইয়ের একটি একত্র সংস্করণ প্রকাশ করেছে। সুরজিৎ দাশগুপ্ত যখন জলপাইগুড়িতে থাকতেন তখন থেকেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রে পরিচয় এবং সেটা প্রায় বাল্যকাল থেকেই। প্রেমেনদার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে তিনি লিখেছেন⎯ “আমার বইয়ের পোকা দাদা একদিন দেব সাহিত্য কুটীর প্রকাশিত একখানি আধ-ছেঁড়া শারদ বার্ষিকী নিয়ে বাড়ি এলেন। যতদূর মনে পড়ে, বইটির নাম ছিল ‘আজব বই’। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। বড় মাসিমা তোকিয়ো থেকে কী বলছেন তা গোপনে শোনার জন্য মা সবে রেডিয়ো কিনেছেন। আমার বছর দশেক বয়স। বইখানিতে ছিল ‘আকাশের আতঙ্ক’ নামে প্রেমেন্দ্র-র একটি গল্প। আর তাতে ছিল জলপাইগুড়ির তিস্তা নদীতে সারা রাত নৌকো বেয়ে বেয়ে জেলেদের মাছ ধরে বেড়াবার কথা। কিন্তু তিস্তার জেলেরা ওভাবে মাছ ধরে না। ওটা লেখকের বানানো ব্যাপার। দাদার কথাতে আমি দেব সাহিত্য কুটীর-এর ঠিকানায় প্রেমেন্দ্র মিত্রকে চিঠি দিলাম। তার পর ভুলেই গেছলাম। অনেকদিন পরে হঠাৎ তার জবাব এল পোস্টকার্ডে। ‘চিঠি পেলাম।’ ওই দুটি শব্দেই প্রথম লাইন শেষ। তার পরে প্রেমেন্দ্র যা লিখেছিলেন, হুবহু মনে নেই। শুধু মনে আছে যে জানতে চেয়েছিলেন জেলেদের বিষয়ে ওটুকু ভুলের জন্য গল্পটার রস ক্ষুণ্ণ হয়েছে কি না। সব শেষে লিখেছিলেন, কলকাতায় এলে যেন দেখা করি। বোধহয় মোট তিনটে কি চারটা বাক্য। এইটে আমার নামে প্রথম চিঠি। তাই তাঁকে উত্তর দেবার পরেও চিঠিটা খুব যত্নের সঙ্গে রেখেছিলাম উনিশশো পঞ্চাশের বন্যা পর্যন্ত।”

আমি রোববারের সকালগুলোয় একসময় প্রায় নিয়মিত প্রতাপাদিত্য রোডে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি যেতাম সেকথা আগেই বলেছি। অনেক সময় সেই আড্ডা থেকে ফেরার সময় প্রেমেনদার বাড়ি হয়ে ফিরতাম। প্রেমেনদার হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের লাল রঙের বাড়িটা ছিল খানিকটা অদ্ভুত। বাড়ির উঠোন থেকে একটা প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি উঠে যেত সোজা তাঁর ঘরে। যেখানে মানুষের অবারিত দ্বার। আমিও সেখানে গিয়েই তাঁর সঙ্গে কথা বলতাম। তাঁর আর এক একটা স্বভাব ছিল ঘন ঘন নস্যি নেওয়ার।
তখন প্রেমেনদা বাংলা সাহিত্যের প্রবীণ এবং সর্বজনমান্য লেখক। দে’জ পাবলিশিং-এর মতো নতুন প্রতিষ্ঠানে তাঁর বই পাওয়া শক্ত ছিল। কিন্তু তিনি যেকোনও কারণেই হোক আমার প্রতি স্নেহপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন এবং ১৯৭৬ সালেই দে’জ পাবলিশিং থেকে আমি তাঁর বই প্রকাশ করতে পেরেছিলাম।

বাংলায় সাহিত্যিক শব্দটার যে অর্থ, প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন তাঁর মূর্ত প্রতীক⎯ গল্প, উপন্যাস, কবিতা থেকে শুরু করে সব দিকেই তাঁর অবাধ চলাচল। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্র পরিচালনা, চিত্রনাট্য লেখা, গান লেখা⎯ তাঁর হাতে ধুলোমুঠি সোনা হয়েছে। মামাবাবু, পরাশর বর্মা এবং ঘনাদা⎯ এইসব অমর চরিত্রের স্রষ্টা তিনি।
দীনেশরঞ্জন দাশ আর গোকুলচন্দ্র নাগের সম্পাদনায় ‘কল্লোল’ পত্রিকাকে ঘিরে বাংলায় যে অভিনব সাহিত্য প্রয়াস শুরু হয়েছিল প্রেমেনদা সেই ‘কল্লোল’-এর অন্যতম সেনানী। আবার মুরলীধর বসুর ‘কালিকলম’ পত্রিকার প্রথম বছরে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনিও সম্পাদক ছিলেন। এক বছর পর তিনি সম্পাদনা থেকে অব্যাহতি নেন, আর শৈলজানন্দ দু’-বছরের মাথায়। এই দু’টি পত্রিকা সম্পর্কে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বলেছিলেন⎯ ‘কল্লোল ও কালিকলম যেন একই মুক্ত বিহঙ্গের দুটি দীপ্ত পাখা’। ১৯২৩ এবং ১৯২৬ সালে প্রকাশিত এই পত্রিকা দুটি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় তোলপাড় ফেলে দিয়েছিল। আবার ১৯৩৫ সালে যখন ‘কবিতা’ পত্রিকা প্রকাশিত হল⎯ তখন তার সম্পাদক ছিলেন বুদ্ধদেব বসু আর প্রেমেন্দ্র মিত্র। সহকারী সম্পাদক সমর সেন।

‘কল্লোল’ পত্রিকা তাঁদের লেখালিখির আঁতুড়ঘর হলেও প্রেমেনদার প্রথম গল্প দু’টি প্রকাশিত হয় সেকালের অভিজাত পত্রিকা ‘প্রবাসী’তে। তাঁর প্রথম দুটি গল্প⎯ ‘শুধু কেরাণী’ আর ‘গোপনচারিণী’ লেখার নেপথ্যের ঘটনাও কম আশ্চর্যের নয়।
প্রেমেনদা তাঁর ‘নানা রঙে বোনা/ বিচিত্র জীবন-কথা’য় বিস্তারে লিখেছেন এই দু’টি গল্প লেখার ইতিহাস। তখন তিনি কলকাতায় এসে ২৮ নম্বর গোবিন্দ ঘোষাল লেনের মেসবাড়িতে উঠেছেন। মেসবাড়িতে সচরাচর দুপুরবেলাটা ফাঁকাই থাকত, কেননা বোর্ডাররা সকলেই বিভিন্ন দপ্তরে কেরানিগিরি করতেন। আর ছুটির দিনগুলোতে তাঁরা বাড়ি যাওয়ায় রাতগুলোও নির্জন হয়ে যেত। এমনই এক রাতে তিনি শুয়ে-শুয়ে একটা ইংরেজি বই পড়ছিলেন। বইটা পড়তে ভালো না লাগায় শোবার উদ্যোগ করছেন, এমন সময় তাঁর চোখ পড়ে জানলার মাথায় কুলুঙ্গিতে। সেখানে অনেক পুরোনো কাগজপত্র ঠেসে রাখা ছিল। সেই কাগজপত্রের বাণ্ডিল থেকে তাঁর হাতে উঠে এল একখানা পোস্টকার্ড। প্রেমেনদা লিখছেন⎯
“…অদম্য কিছু অবশ্য নয়, কিন্তু ওই পুরনো ধুলো মাখা পোস্টকার্ডটা পড়বার মৃদু যে কৌতূহলটুকু হয়েছিল তার কারণ বোধহয় সে চিঠির হাতের লেখা। আঁকা বাঁকা বড় বড় অক্ষরের বাহার আর বানান ভুলের ঘটা দেখে তখনকার দিনে সেটি যে মেয়েলী হাতের লেখা তা বোঝা যায়।
চিঠির ভাষা এতদিন বাদে অবশ্য মনে পড়ে না কিন্তু এইটুকু মনে আছে যে, চিঠির সম্বোধন আর তার বক্তব্য থেকে সেটি কোন নববিবাহিতা গ্রাম্যবধূর স্বামীর কাছে লেখা বলে অনায়াসে বুঝেছিলাম।
পোস্টকার্ডে লেখা বলেই কি না জানি না, চিঠিতে প্রণয় সম্ভাষণ কিছু ছিল না। যা ছিল তা আগের হপ্তায় স্বামীর গ্রামের বাড়িতে না আসার জন্যে অনুযোগ, সামান্য কিছু সাংসারিক খবর আর দু-একটি নিতান্ত সাধারণ ফরমাস।
হাতের লেখা আর চিঠির ভাষা একটু কৌতুকই মনে জাগিয়েছিল কিন্তু সেই সঙ্গে একটু মাধুর্যের মাদকতা আমার সে রাত্রের ঘুমটাই দিয়েছিল ঘুচিয়ে।
শ্বশুর বাড়িতে নতুন সংসার করতে আসা বড় জোর দ্বিতীয় ভাগ পড়া গ্রামের সেই স্নিগ্ধ সলজ্জ বধূটিকে আমি যেন চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম। মনে রাখতে হবে সেটা উনিশশো বাইশ সাল। আমি যে মেয়েটিকে কল্পনায় দেখেছিলাম তার মাথায় দীর্ঘ অবগুণ্ঠন, চলনে বলনে সব কিছুতে একটা স্নিগ্ধ মধুর লজ্জার জডিমা।
চিঠিটিতে তারিখ-টারিখ কিছু দেওয়া ছিল না। কবে কতদিন আগে সেটি লেখা তা বোঝাবার উপায়ও নেই। তবে এ ঘরে যাঁর সীট তাঁর অনুপস্থিতিতে আমি দখল করেছি এ চিঠির সঙ্গে তাঁর যে কোন সম্পর্ক নেই তা পিছনের নাম ঠিকানা দেখেই বোঝা গেছিল। নাম ঠিকানা মেয়লী কাঁচা হাতের নয়, সম্ভবত যাঁর উদ্দেশ্যে চিঠিটি লেখা তাঁর নিজেরই হস্তাক্ষর। ঠিকানা লেখা অমন খাম পোস্টকার্ড বাড়ির অল্পশিক্ষিত মেয়েদের সুবিধের জন্যে লিখে রেখে আসা তখনকার দপ্তর ছিল।
…
অনেক রাত পর্যন্ত আপনা থেকেই জেগে কাটিয়েছি, তারপর কি রকম যেন একটা অস্থিরতায় কাগজ কলম নিয়ে এক সময়ে হঠাৎ লিখতে বসে গেছি।
যা লিখেছি তার সঙ্গে ও চিঠির সম্পর্ক মাত্র এইটুকু যে আমার সে রাত্রের লেখা গল্পের পাত্র পাত্রী নতুন বিয়ে হওয়া একটি ছেলে আর মেয়ে। একদিকে তারা বিশেষ আবার অন্য দিক দিয়ে এত সাধারণ যে তাদের নিজস্ব নাম পর্যন্ত গল্পে নেই। তারা শুধু ছেলেটি আর মেয়েটি। আর গল্পের নাম হল ‘শুধু কেরাণী’।
সঠিক হোক আর বেঠিক হোক অলস ও দীর্ঘসূত্রী বলে একটা সুনাম আমি অজন করেছি। সেদিন কিন্তু কাজের ভূত আমার ওপর ভর করেছিল। গল্প কবিতা লেখা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। অন্তত চল্লিশ বছর বয়সের আগে কোন কিছু প্রকাশ করবার চেষ্টা করণ না বলে একটা পণ থাকা সত্ত্বেও বছর চোদ্দ বয়স থেকে সমানে গল্প কবিতা লিখে আমি অনেক খাতা ইতিমধ্যে ভরিয়ে তুলেছি। ঢাকায় যাবার পর এ উৎসাহে একটু ভাঁটা পড়লেও লেখা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়নি। সে-রাত্রে কিন্তু আমার পক্ষে অসাধ্য সাধনই কেমন করে সম্ভব হয়ে গেল। শুধু একটি নয়, প্রথম গল্পটির পর আরেকটি গল্পও সম্পূর্ণ লিখে ফেললাম।
দ্বিতীয় গল্পটি যখন শেষ হল তখন ভোর হয়ে গেছে। যতদূর মনে পড়ছে তারপর আর ঘুমোইনি। আর সমস্ত রাত জেগে দু-দুটো গল্প লেখার উত্তেজনাতেই যা করে বসেছি কোনদিন তা কল্পনাতেও ছিল না।…”
তখন তাঁদের ভবানীপুর পাড়ায় ডাকঘর ছিল হরিশ পার্কের উলটোদিকে। তিনি যখন সেখানে হাজির হন তখনও ডাকঘর খোলার সময় হয়নি। পরে ডাকঘর থেকে খাম আর ডাকটিকিট জোগাড় করে গল্প দুটি তিনি পাঠিয়ে দেন ‘প্রবাসী’র ঠিকানায়। তাঁর ভাষায়⎯ ‘হ্যাঁ, অন্য কোথাও নয়, তখনকার সব কাগজের যা সেরা সেই ‘প্রবাসী’তেই পাঠিয়ে দিখেছিলাম। হেঁজিপেজি যার তার কাছ থেকে নয়, লেখা ফেরত পাবার লজ্জাটা যেন সেই কাগজ থেকেই পাই এক শরৎচন্দ্র ছাড়া রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সব পয়লা নম্বরের লেখকের লেখা যে কাগজে বার হয়। সে কাগজে একটা লেখা ছাপা হওয়া মানেই তখনকার দিনে গাযে কৌলিন্যের ছাপ পড়ে যাওয়া।’ সেই গল্প দুটি ‘প্রবাসী’তে সত্যিই প্রকাশিত হয়েছিল পর পর দু-মাসে। আর তারপরই ‘কল্লোল’-‘কালিকলম’ ঘিরে তাঁদের উন্মাদনার দিনগুলোর শুরু।

‘কল্লোল যুগ’ বলে এসময়টাকে চিহ্নিত করার একটা প্রবণতা আছে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ‘কল্লোল যুগ’ নামে একটি বইও লিখেছেন। কিন্তু ‘কল্লোলে’র লেখকদের মধ্যেও বিভিন্নতা ছিল। প্রেমেনদা নিজেই লিখেছেন⎯ ‘বহু বিচিত্র অমিলকে মেলাবার একটি পতাকা ছিল ‘কল্লোল’।’ সেখানে শৈলজানন্দ-অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত-বুদ্ধদেব বসু-মণীশ ঘটক (যুবনাশ্ব)-অজিত দত্ত-প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখনীতে বেশ ফারাক ছিল। তবু পটুয়াটোলা লেনের আট ফুট বাই দশ ফুট ঘরটা ছিল সেকালের উঠতি লেখকদের রাজধানী।

প্রেমেন্দ্র মিত্র বিশেষ প্রেরণায় যেমন এক রাতে দুটো গল্প লিখে ফেলেছিলেন। তেমনই খেয়ালের বশে, অনেক পরে⎯ ১৯৪৫ সালে লিখেছিলেন ‘মশা’ গল্পটা। এই প্রথম বাংলা সাহিত্যে এল অবিস্মরণীয় চরিত্র ঘনাদা। সুরজিৎ দাশগুপ্ত তাঁর ‘বাংলা ছোটোগল্পের সূচনা ও প্রেমেন্দ্র মিত্র’ বইয়ের ‘ঘনাদা’ প্রবন্ধে লিখেছেন⎯ “বস্তুত আকস্মিকভাবেই ঘনাদার গল্পমালার শুরু। … … …কারণ ১৯৪৬-এ তিনি ঘনাদাকে নিয়ে কোনও গল্পই লেখেননি, তবে ১৯৪৭-এ দেব সাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকী ‘রাঙারাখী’-তে লেখেন ‘নুড়ি’ গল্পটি, কিন্তু ১৯৪৮-এ ‘পোকা’ আর ‘ঘড়ি’ দুটি গল্প, ১৯৪৯-এ ‘ছড়ি’ ও ‘মাছ’ দুটি গল্প, ১৯৫২-তে ‘লাট্টু’ ও ‘টুপি’ দুটি গল্প লেখেন, অবশ্য মাঝখানে ১৯৫১-তে একটিও ঘনাদার গল্প লেখেননি। সেজন্য বলতে পারি যে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ঘনাদার মেসটার কোনও ঠিকানা লেখক নির্দেশ করতে পারেননি। দেব সাহিত্য কুটিরের ‘পরশমণি’ নামক পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত ‘টুপি’ গল্পেই প্রথম জানিয়েছেন যে ঘনাদার মেসটা বাহাত্তর নম্বর বনমালী নস্কর লেন-এ অবস্থিত। দ্বিতীয় গল্প ‘পোকা’-তেই প্রথম জানা যায় যে ঘনাদা মেসটার তেতলায় একটি চোর-কুঠরি গোছের ঘরে থাকেন। উত্তম পুরুষেই সবগুলি গল্প লেখা, কিন্তু প্রথম গল্প ‘মশা’-তে ঘনাদার সহবাসীদের মাত্র দু-জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে⎯ একজনের নাম বিপিন, অপরজনের নাম শিশির। দ্বিতীয় গল্প থেকে শিবু ও গৌর হাজির হয়েছে, কিন্তু বিপিন অন্তর্হিত। আর উত্তমপুরুষে ঘনাদার গল্পগুলি যে লিখেছে তার অস্তিত্ব আমরা প্রথম টের পাই ‘ছুঁচ’ নামক গল্পটিতে। এই গল্পটি ‘আবার ঘনাদা’ গ্রন্থে ১৯৬৩ সালে প্রথম সংকলিত হয়,……প্রেমেন্দ্র মিত্র ঘনাদার গল্পগুলি…শুরু করার সময় মেসটার ঠিকানা ঠিক করেননি, মেসটার কোন ঘরটা ঘনাদার জন্য বরাদ্দ করবেন তাও ঠিক করেননি এবং মেসের বাসিন্দাদেরও নামও পাকাপাকিভাবে ঠিক করেননি। ‘মশা’ লেখার পরে এক বছর বাদ দিয়ে যখন তিনি ‘নুড়ি’ গল্পটি লিখলেন তখন প্রথম গল্পে না ভেবে এনে ফেলা বিপিনকে বাদ দিয়ে তাঁর বিশেষ অনুরাগী তিন জনের নামধারীদের মেসবাসী রূপে উপস্থিত করলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। এই তিনজন হলেন শিবরাম চক্রবর্তী, গৌরাঙ্গপ্রসাদ বসু ও শিশির মিত্র। গল্পগুলির উত্তম পুরুষের অস্তিত্ব জানতে পাই ‘ছুঁচ’ গল্পে, কিন্তু উত্তম পুরুষের নামটি যে সুধীর তা প্রথম জানানো হয়েছে ১৯৬৮-তে লেখা ‘ধুলো’ গল্পটিতে আর প্রেমেন্দ্ররই ডাক-নাম ছিল সুধীর।…”

দে’জ পাবলিশিং থেকে আমি প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম যে বইটি ১৯৭৬ সালে প্রকাশ করেছিলাম সেটি ঘনাদার গল্পেরই সংকলন ছিল⎯ ‘দুনিয়ার ঘনাদা’। ১৯৭৬ সালে বাংলা নববর্ষের সময় বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। গৌতম রায়ের প্রচ্ছদ অলংকরণে বইটি ছেপেছিলাম বিবেকানন্দ রোডে গৌর মজুমদারের শঙ্কর প্রিন্টিং ওয়ার্কস থেকে। মোট পাঁচটি গল্পের এই সংকলনটি সেসময় খুবই জনপ্রিয়তা লাভ কয়েছিল। বইয়ের প্রোডাকশন দেখে প্রেমেনদাও খুশি হয়েছিলেন।
লিখন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……
পর্ব ৬৪।মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়
পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়
পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়
পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!
পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু
পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না
পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম
পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না
পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী
পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা
পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা
পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়
পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল
পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি
পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্সা’
পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়
পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’
পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল
পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!
পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই
পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি
পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত
পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী
পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের
পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়
পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!
পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!
পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো
পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন
পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved