Robbar

সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 12, 2026 2:03 pm
  • Updated:August 12, 2026 2:03 pm  

‘ঝাঁকলাই’ নামকরণের মূলে আছে রাঢ় অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক যোগ। রাঢ়বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকায়ত ভাষায় গবাদি পশুর মারণরোগের নাম ‘ঝাঁকা লাগা’ বা ‘ঝাঁকা’। রোগে ধরলে তীব্র ঝিমুনিগ্রস্থ হয়ে পশুটি মারা যায়। যে কোনও নিউরোটক্সিক বিষধর সাপ– গোখরো বা কেউটে কামড়ালে তীব্র ঝিমুনির সঙ্গে মুমূর্ষুর চোখ বুজে আসাকে লোকাভাষায় বিষের ‘ঝাঁকলাগা’ বলে। এই ঝাঁক লাগা থেকে যিনি রোগীকে মুক্ত করেন তিনি ঝাঁকলাই। অর্থাৎ ঝাঁক লাগা নিবারণকারী আই বা মা।

স্বপনকুমার ঠাকুর

৪৫.

সুউচ্চ দেবায়তন। গর্ভগৃহ সংলগ্ন ঝাঁ-চকচকে নাটমন্দির। সিঁদুরচর্চিত নাতিদীর্ঘ দেবীমূর্তি। নিত্য পুজো চলছে। হঠাৎ এক কিশোরী আঙুল তুলে বলে:

–ওই দেখো! মা বেরিয়েছে! 

মুহূর্তে সহকারী ব্রাহ্মণ সক্রিয় হন। হাতে ছোট লাঠি। ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গিয়ে ল্যাজটিকে খপ করে ধরে ফেলেন। লাঠির সাহায্যে আঁকাবাঁকা সর্পিল গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভিড় কেটে এগিয়ে নিয়ে চললেন মন্দির প্রাঙ্গণে।

অপর পুরোহিত তখন এককোষা দুধ-গঙ্গাজল আর ফুল নিয়ে শুরু করলেন মন্ত্রপাঠ আর পুজো। শীতল বারিতে উপুরিচুপুরি ভিজে খাড়া হয়ে হিস হিস শব্দে ফণা বিস্তার করল ‘জ্যান্ত দেবতা’।

‘জ্যান্ত দেবতা’

ভক্তবৃন্দ ইতিমধ্যে সমবেত কণ্ঠে উলুধ্বনির তরঙ্গ তুলে প্রণাম করে বলে:

–জয় মা ঝাঁকলাই! ঝঙ্কেশ্বরী মাতা!

এ দৃশ্য যতই রোমাঞ্চকর হোক না কেন, পূর্ব বর্ধমানের বড়পোষলা ছোটপোষলা মুশারু আর পলসোনা গ্রামবাসীদের কাছে জলভাত। নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। 

বাড়িতে বাড়িতে বিষধর কেউটে সাপ। কোথাও শোওয়ার ঘরে বা মুড়ির টিনে জড়িয়ে। কোন বাড়ির আধ-ভেজানো জানলা থেকে বারবার জিভ বের করছে। দূর বাঁশতলা থেকে থেমে থেমে ভেসে আসছে ব্যাঙের মরণ-আর্তনাদ। 

মাটির ঘরে তক্তায় মশারি খাটিয়ে গৃহকর্তা রাতে আরাম করে ঘুমচ্ছেন। হঠাৎ ঘরের সাঙায় জড়িয়ে থাকা বিশাল ভুজঙ্গ মশারির উপর ধুপ করে পড়ে শুরু করে তর্জন-গর্জন। 

নির্দ্বিধায় বাবুরাম সাপুড়ের মতো গৃহস্বামী লাঠি দিয়ে বের করে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। মহারাষ্ট্রের শোলাপুর জেলার শ্বেতপাল গ্রামেও অনুরূপ দৃশ্য। সাপ নয়, যেন পোষা, লালন-পালন করা গেরস্থালি জীব।

সাপ আর মানুষের চমৎকার সহজিয়া সহাবস্থানের এমন ছবি এসব গ্রামে না গেলে সঠিক বোঝা যায় না।

ঝাঁকলাই সাপ, ছবি: আকাশ গুহ

পূর্ব বর্ধমানের এই চারটি গ্রামে কেউটে সাপের মাহাত্ম্য-পুরাণে মহাদেব তো দূরস্থ, সর্পদেবী মনসাও ব্রাত্য। ঝাঁকলাই বিচরণশীল চারটি গ্রামে মনসাপুজো হয় না। বেদে-সাপুড়েদের প্রবেশাধিকার ও ঝাঁপানগানও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। 

ঐতিহাসিক দিক থেকে ভারতে জীবিত সর্পোপাসনার দৃষ্টান্ত মিলেছে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে। আলেকজান্ডারের সেনাপতি এলিয়েন লিখেছেন, একটি ভয়ঙ্কর, বৃহৎ সাপকে ভারতীয়রা অত্যন্ত পবিত্র জ্ঞান করতেন। কিন্তু সাপটি ছিল গুহাবদ্ধ। মানব-বসতির বাইরে, নিরাপদ ঘেরাটোপে। এদিকে ঝাঁকলাই সাপ অবাধে বিচরণ করে গেরস্থের খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার। পরম সখ্যে সে আবব্ধ। জীববৈচিত্রে এ-ও এক বিস্ময় বইকি!

কেউটে এবং গোখরো সাপকে কেন্দ্র করে এই বিচিত্র জীবিত সর্পোপাসনা গড়ে উঠেছে মান্ধাতার আমল থেকে। উল্লিখিত গ্রামগুলি ছাড়াও আরও চারটি গ্রামে পুজো হয়– শিকড়তোড় মইদান নিগন, কাটোয়া থানার কোশিগ্রামে। তবে এই গ্রামগুলিতে ঝাঁকলাই সাপ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নিকটবর্তী কুঁদা গ্রামে বিষহরি, বাবলাডিহি ও সরগ্রামে দুধখরিস বা ঝাঁকলাই, কন্দনাগ গ্রামে পাণ্ডুনাগ নামে জীবিত সাপের উদ্দেশে পুজো হলেও তাদের অস্তিত্ব কবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

সরগ্রাম, কোশিগ্রাম, কন্দনাগ– তিনটি জনপদ বাদ দিলে বাকি সমস্ত গ্রাম মোটামুটি একই অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। এই অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে প্রাচীন নদী ব্রহ্মাণী। নদী ব্রহ্মাণী নাগদেবী হিসাবে পূজিত হন। সন্দেহ নেই, ব্রহ্মাণীর অববাহিকা অঞ্চলে এই প্রজাতির সাপের আবাস ছিল আদিকাল থেকে। পরে জনবসতি স্থাপন হয়েছে। বিপন্ন থেকে বিপন্নতর হয়েছে বিশেষ সর্প প্রজাতিটি। বর্তমানে চারটি গ্রামবাসীদের সরল ভক্তি বিশ্বাস আর ঝাঁকলাইয়ের বিশেষ ধরনের স্বভাবের জন্য সাপে-মানবের এমন অদ্ভুত সখ্য-বসতি গড়ে উঠেছে।

মাথার পরিবর্তে ঘাড়ে চক্র

ঝাঁকলাই খানিকটা শান্ত প্রকৃতির সাপ। হয়তো মানুষের সঙ্গে বাস করার ফলে তার আদিম প্রবৃত্তিকে খানিকটা সংযত করেছে। মাথার পরিবর্তে ঘাড়ে চক্র। সাধারণ কেউটে সাপের মতো ফণা তোলার সময় অত খাড়া হতে পারে না। কামড়ানোর সময় ছোবল দিয়ে ধরে থাকে। ফলে তীব্র জ্বালা অনুভূত হয়। শিশুদের পক্ষে এই কামড় মারাত্মক। জ্বালা সহ্য করতে না পারার ফলে মারা যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। তবে ক্ষেত্রসমীক্ষায় ঝাঁকলাই-এর কামড়ে শিশুমৃত্যুর কথা শোনা যায়নি, কী অতীত বা বর্তমানে। মূল খাদ্য– ব্যাঙ যা ‘মায়ের নাড়ু’ নামে পরিচিত। অন্য সাপকেও খাবার বানায় ঝাঁকলাই। ফলে তাদের টিকি মেলে না গ্রামগুলিতে। 

ঝাঁকলাই কাউকে দংশন করলে তার নাম ‘মায়ের প্রসাদ’। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঝাঁকলাই সাপ ছোবল মারার সময় কিছুটা বিষ বাইরে ছেটায়। ফলে অনেক সময় ‘শুকনো কামড়’ বসায়। যার জন্য অধিকাংশ রোগী মারা যায় না। ক্ষতস্থানটি ফুলে যায় মাত্র। অনেক সময় রক্ত জমে স্থানটি কালো হয়ে ওঠে। রোগী সুস্থ হয়ে গেলেও পঙ্গুত্ব রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। 

চারটি গ্রামে দেবীর মন্দির রয়েছে। একমাত্র মুশারু গ্রাম ছাড়া বাকি তিনটি গ্রামের মূর্তি অর্বাচীন। গ্রামবাসীদের মতে, মুসারু গ্রামের খুনেডাঙা পুকুরের পাড় থেকে আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে দেবীর ধাতব মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়েছিল।

মূর্তির উচ্চতা নয় ইঞ্চি। চওড়া সাড়ে চার ইঞ্চি। পদ্মাসনা দ্বিভুজা মূর্তি। আপাদমস্তক সিঁদুরের প্রলেপ থাকায় মূর্তির স্বরূপ ঠিক বোঝা যায় না। তবে জাঙ্গুলীর ধ্যানমন্ত্রে তিনি পূজিত হন। দ্বিভুজা মূর্তি প্রধানত ‘জাঙ্গুলী তারা’। তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘বীণা বাদয়ন্তীম’ ও সর্পভূষণা। মুখ্যত বিষবিদ্যার দেবী। ফলে শুধু জাঙ্গুলী নয়, সরস্বতী বা ব্রহ্মাণীর সঙ্গেও গূঢ় মিল আছে। গ্রামবাসীরা বলেন ঝাঁকলাই-চণ্ডী। অনেকে বলেন, ‘ঝাঁকলাই’ শব্দটি জাঙ্গুলী থেকে এসেছে। জীবন্ত সর্প রূপে তিনি টু ইন ওয়ান। অর্থাৎ ঝাঁকলাই সাপ হল জাঙ্গুলীর জীবন্ত স্বরূপ। প্রবাদ আছে, ‘সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো’।

ঝাঁকলাই-চণ্ডী, নবমূর্তি, ছবি: আকাশ গুহ

গবেষকদের দাবি, বৌদ্ধ-তান্ত্রিক দেবী জাঙ্গুলী বাংলায় মনসায় পরিণত হয়েছেন। সুতরাং বিষয়টিকে তলিয়ে দেখা দরকার। পূর্ব ভারতীয় মহাযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পূজিত সুপ্রাচীন সর্পদেবী জাঙ্গু্লী। বৌদ্ধ সাধনমালা থেকে চার ধরনের জাঙ্গুলীদেবীর কথা জানা যায়। প্রথম দু’টি চতুর্ভুজা, একমুখী। দু’হাতে সাপ এবং বীণা ও অভয়হস্ত। অন্য রূপে দেবীর হাতে থাকে ত্রিশূল ময়ূরপুচ্ছ বা লেখনী সাপ ও অভয়মুদ্রা। ত্রিমুখী মূর্তিগুলির ছয়টি হাতে খড়্‌গ বজ্র বাণ পাশ নীলোৎপল ও ধনুক থাকে। 

সাধারণ্যে বিশ্বাস, জঙ্গলের দেবী বলেই তাঁর নাম ‘জাঙ্গুলী’। বিষয়টি একেবারেই ভুল। গুপ্তযোগে রচিত অমরকোষের প্রথম খণ্ডের অষ্টম অধ্যায়ের পাতালভোগী বর্গের ১১ নম্বর শ্লোকে উল্লিখিত হয়েছে পাঁচটি পারিভাষিক শব্দ: জঙ্গুল, বিষবৈদ্য, জাঙ্গুলিক, ব্যালাগ্রাহী, অহিতুণ্ডক। 

জঙ্গুল শব্দের অর্থ– বিষধর সাপ। জঙ্গুলের সঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় যুক্ত করে হয়েছে জাঙ্গুলী। অর্থাৎ যিনি সর্পনিয়ন্ত্রক। বিশিষ্টার্থে সর্পবিদ্যার দেবী। বিষবৈদ্য হলেন যিনি বিষের চিকিৎসা করেন। ‘জাঙ্গুলিক’ শব্দের অর্থ– জাঙ্গুলি বিদ্যা জানেন যিনি। ব্যালাগ্রাহী ও অহিতুণ্ডক হলেন যথাক্রমে সাপুড়ে ও সাপখেলা দেখান যিনি। 

প্রাচীন সাহিত্য ও তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, জাঙ্গল হল শুষ্ক মরুপ্রায় অনুর্বর ভূমি। ‘জাঙ্গুলিক’ শব্দটি যদি জঙ্গল থেকে আসত, তাহলে অমরকোষের ভূমিবর্গে স্থান পেত। জঙ্গুল বা জাঙ্গল সর্পচিকিৎসার পরিভাষা বিশেষ। ভাণভট্টের কাদম্বরীতে সর্পচিকিৎসক হিসাবে ‘জাঙ্গুলিক’ শব্দের প্রয়োগ দেখা যায়।

রাগমালা চিত্র, আশাবরী

আসলে ‘জাঙ্গুলী’ শব্দের মূলে রয়েছে বৈদিক ‘জঙ্গীড়’ শব্দটি। আদি জাঙ্গুলিকরা সাপে-কাটা রোগীর চিকিৎসায় জঙ্গীড় ওষধি ব্যবহার করতেন। অথর্ববেদের দ্বিতীয় কাণ্ডের ৪ নম্বর সূক্তে ও ১৯ কাণ্ডের পঞ্চম অনুবাকের প্রথম ও দ্বিতীয় সূক্তে জঙ্গীড় ওষধির বিস্তারিত মহিমা ব্যক্ত হয়েছে। জঙ্গীড় ওষধিগাছ সর্বব্যাধিনাশক হলেও অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ‘বিষরাৎ’ অর্থাৎ বিষ বা বিষাক্ত ব্যাধি থেকে মুক্তি। ‘বিস্কন্ধাৎ’ অর্থাৎ শরীর অবশ হয়ে যাওয়া থেকে অব্যাহতি। জঙ্গীড়ের টুকরো মাদুলির মতো সেকালের মানুষ পরতেন। 

সমস্ত রোগের মহৌষধ ছিল বলে জঙ্গীড়কে ‘বিশ্বভেষজ’ বলা হয়েছে। সুতরাং জঙ্গীর ওষধিটি সাপের বিষ নাশ করত বলে একে সাপের অধিশ্বরী বা বিষহরি ভাবা মোটেই অসঙ্গত নয়। কালক্রমে ওষধি ও মন্ত্রবিদ্যা দেবীমূর্তিতে রূপান্তরিত হয়।

একথা ঠিক যে পরবর্তীকালে ‘জঙ্গীড়’ নামে কোনও বিষনাশক ওষধির সন্ধান পাওয়া যায়নি। যেমনটি মেলে না রামায়ণে উল্লিখিত ব্যাধিনাশক সঞ্জীবনী ভেষজের। জঙ্গীড় লুপ্ত হয়ে গেছে। অনেকে অশ্বগন্ধা ভেষজকে ‘জঙ্গীড়’ বললেও আধুনিক উদ্ভিদবিদ্যায় প্রমাণিত নয়। তবে সর্পবিষ নাশক জঙ্গীড় জাতীয় ভেষজের আবিষ্কারক মূলত বন্য শবর-কিরাত জনগোষ্ঠীরা।

অথর্ববেদের ১০ কাণ্ডের দ্বিতীয় অনুবাকের দ্বিতীয় সূক্তের ১৪ নম্বর ঋক থেকে জানা যায় এক কুমারী কিরাত কন্যার কথা, যিনি সর্প দংশনের চিকিৎসা করতে হিমালয় বা পর্বতের চূড়ার ঢাল থেকে ভেষজকে খনন করে এনেছেন। শ্লোকে সরাসরি জঙ্গীড়ের নাম উল্লিখিত না হলেও নিশ্চিতরূপে বোঝা যায়, উপজাতিদের আবিষ্কৃত বিষনাশক ভেষজ বা জঙ্গীড় ওষধি ছিল আদি বিষবিদ্যার আকর। 

রাগমালা চিত্র, আশাবরী ২

সুতরাং অথর্ববেদের অন্য সূক্তগুলিতে যে জঙ্গীড় ওষধির গুণগান করা হয়েছে বা দশম কাণ্ডের সেই ভেষজসহ কিরাতকন্যা ক্রমশ জাঙ্গুলী তারা বা জাঙ্গুলী দেবী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। বৌদ্ধ-তান্ত্রিক গ্রন্থ সাধনমালায় দেবী জাঙ্গুলীর রূপের যে ধ্যানমন্ত্র আছে, তাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় জাঙ্গুলীদেবী প্রায়শ শবরী বা কুমারী কিরাতকন্যা নারীর বেশে কল্পিত হয়েছেন। প্রসঙ্গত, কিরাতরা হলেন মূলত হিমালয়-নেপাল ও পূর্ব ভারতের জঙ্গলময় এলাকার প্রাচীন অধিবাসী।

জঙ্গীড় থেকে জাঙ্গুলী হয়েছে ভাষাতত্ত্বের সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করে। এখানে ড়/র ধ্বনি ল-কারে পরিণত হয়েছে। ধ্বনিতত্ত্বের ভাষায় ল-কারীভবন বলে। ল-কারীভবন মাগধী প্রাকৃত ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য (বররুচি, প্রাকৃতপ্রকাশ, ১১.২ এবং হেমচন্দ্র, ৪.২৮৮)। বাংলাভাষাও মাগধী অপভ্রংশ থেকে আগত। বাংলা ভাষায় এর প্রচুর উদাহরণ আছে, যেমন– ‘প্রাচীর’ থেকে ‘পাঁচিল’। হরিদ্রা থেকে হলুদ, তেমন জঙ্গীড় থেকে জাঙ্গুলী। 

অন্যদিকে, ‘জাঙ্গুলী’ থেকে ‘ঝাঁকলাই’ শব্দটি আসেনি।

‘ঝাঁকলাই’ নামকরণের মূলে আছে রাঢ় অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক যোগ। রাঢ়বাংলার লোকসংস্কৃতি ও লোকায়ত ভাষায় গবাদি পশুর মারণরোগের নাম ‘ঝাঁকা লাগা’ বা ‘ঝাঁকা’। রোগে ধরলে তীব্র ঝিমুনিগ্রস্থ হয়ে পশুটি মারা যায়। যে কোনও নিউরোটক্সিক বিষধর সাপ– গোখরো বা কেউটে কামড়ালে তীব্র ঝিমুনির সঙ্গে মুমূর্ষুর চোখ বুজে আসাকে লোকাভাষায় বিষের ‘ঝাঁকলাগা’ বলে। এই ঝাঁক লাগা থেকে যিনি রোগীকে মুক্ত করেন তিনি ঝাঁকলাই। অর্থাৎ ঝাঁক লাগা নিবারণকারী আই বা মা। প্রসঙ্গত, ঝাঁকলাই সাপে কামড়ালে বিধান দেওয়া হয়, রোগীকে হাসপাতালের পরিবর্তে দেবীর নামাঙ্কিত পুকুরে স্নান করিয়ে বাড়িতে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দেওয়া। ২৪ ঘণ্টার কোমা-স্তর পেরিয়ে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

সর্পদেবীর হস্তে ওষধি, ছবি: আকাশ গুহ

দেবীর বাৎসরিক পুজো হয় আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে। পূর্বদিন সন্ধেবেলায় তেলহলুদ দিয়ে দেবীর গাত্রমার্জনা চলে। বিকেল পাঁচটার সময় সুবিখ্যাত ক্ষীরকলস যাত্রা। দু’টি নতুন মাটির কলসিতে ক্ষীর-হলুদ মাখিয়ে ভরা হয়। মুখে বাঁধা থাকে নতুন গামছা। সঙ্গে থাকে দেবীর ভোগ। এই দু’টি কলস– একটি নাগ ও অপরটি সর্পদেবীর উদ্দেশে নিবেদিত।

দুই ব্রাহ্মণ সেই কলস মাথায় চাপিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করেন সাতবার। অপর তিনটি গ্রামে একইভাবে নাগকলস যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। চারটি গ্রামের পুরোহিত পরস্পরের সঙ্গে ঘটগুলিকে ঠেকিয়ে নেন। শেষে নিজেদের মন্দিরে এসে হাজির হন। একটি কলস ভেঙে মন্দিরের ঈশান কোণে পুঁতে দেওয়া হয়। বাকি কুচিগুলি গ্রামবাসীরা সংগ্রহ করেন। এরপর রাতে দেবীর শোভাযাত্রা বের হয়। একে বলে রোয়াপুজো। পুজো উপলক্ষে মেলা বসে। আত্মীয়স্বজনের সমাগম হয়। তৈরি হয় উৎসবের উন্মাদনা।

মহাভারতের সর্পযজ্ঞের রূপকটি যেন একালের ঝাঁকলাই বৃত্তান্তে বাস্তব হয়ে ওঠে। সর্পযজ্ঞের দু’টি দিক আছে। একটি ধ্বংসাত্মক ও অপরটি মিলনান্তক। জনমেজয় যখন পিতৃহত্যার প্রতিশোধে সর্পযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন তখন অনেক সাপ সেই যজ্ঞের আগুনে ভষ্মীভূত হয়েছিল। আস্তিক সর্পযজ্ঞের নিবারণ করেছিলেন সহাবস্থানের বার্তা দিয়ে।

মানুষ এই বিশেষ সর্প-অধ্যুষিত এলাকায় বসতি স্থাপন করায় অনেক স্থানে ঝাঁকলাই সাপ লুপ্ত হয়ে গেছে। শুধু মাত্র চারটি গ্রামে মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানের ভিত্তিতে সম্মিলিত বাস্তুতন্ত্র রচনা করেছে। 

অদ্ভুত! তাই না?

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলি অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা

পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম

পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি

পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ

পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য

পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা

পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল

পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর

পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি

পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়

পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার

পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প