


প্রাচীন স্থাননাম বা গ্রামনামে প্রচুর অষ্ট্রিক দ্রাবিড় শব্দ পাওয়া যায়। যেমন বারেন্দ্রী ‘করঞ্জাই’ গাঞীনামে অষ্ট্রিক করঞ্জাকে অবিকৃতভাবে গ্রহণ করলেও কুলাচার্যদের সংস্কৃতকরণের ছাঁকনিতে অনার্য নামটি রাতারাতি করমুক্ত গাঞী আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে যায়। শব্দার্থের এই শাসনতান্ত্রিক রূপান্তর আসল সংস্কৃতায়নের দৃষ্টান্ত। প্রাচীন তাম্রশাসনে মহত্তর শব্দটি কালক্রমে প্রাকৃত ও লোকমুখে মহান্তে পরিণত হয়। তখন বৈষ্ণবদের আধিপত্য শুরু হয়নি।
৫১.
তাম্রশাসন, কুলুজিগ্রন্থ, মঙ্গলকাব্য ইত্যাদি থেকে জানা যায়, ব্রাহ্মণদের গাঞীনাম (গাঁইনাম) রাঢ় ও বারেন্দ্র মিলিয়ে দেড়শতাধিক। গাঞীনাম আকাশচারী বা কাল্পনিক নয়। একাধিক গাঁইনাম শিলালিপি, সংস্কৃত সাহিত্য ছাড়াও প্রাচীন লোকছড়ায় স্থান পেয়েছে। অনেক গাঁইনামের হদিশ মেলে না। লুপ্ত হয়েছে। অথবা অন্য গ্রামের সঙ্গে মিশে গেছে। কিংবা নাম পরিবর্তিত হয়েছে। একই নামে একাধিক গ্রাম আছে। ব্যাক-ফরমেশনে সৃষ্ট গ্রামনামও আছে যেমন ‘বন্দ্যঘটি’ বা ‘মুখুটি’। তবে গবেষকদের সমবেত প্রচেষ্টায় রাঢ়ের ৫৬-৫৯টি গ্রামের মধ্যে অনেক গ্রাম শনাক্ত করা গেছে। বন্দ্যঘটি গাঞী বীরভূমের ময়ূরেশ্বর দুই নম্বর ব্লকের বন্দিঘাট গ্রাম। মন্তেশ্বর থানার কুসুম ও কুলিগ্রাম থেকে কুসুমকুলি গাঞীর উদ্ভব হয়েছে। কেতুগ্রাম থানার কৌড়ী গ্রাম থেকে কড়িয়াল গাঞী, বর্ধমানের কুশগ্রাম থেকে কুশারীগাঞী, আউশগ্রাম থানার ‘ডিংসা’ গ্রাম থেকে ‘ডিংসাই’, কেতুগ্রামের ‘পালটে’ থেকে ‘পালধি’, মঙ্গলকোটের ‘পোষলা’ থেকে ‘পোষলগাঞী’, মেমারির ‘চোৎখণ্ড’ থেকে ‘চৌৎখণ্ডী’ গাঞীর উদ্ভব হয়েছে। এই গ্রামগুলির অস্তিত্ব আজও বর্তমান।

রাঢ়ের গাঞীনামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘সিদ্ধিল’ ও ‘ভুরিষ্টাল’। সিদ্ধিল বা সিদ্ধলগ্রাম রাঢ়ের প্রাচীন সমৃদ্ধ জনপদ। বীরভূমের অট্টহাসের নিকটবর্তী কাটোয়া মহকুমার শীতলগ্রাম সেকালের ‘সিদ্ধলগ্রাম’। গ্রামের ভূমিপুত্র ছিলেন প্রখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত, ভট্ট ভবদেব। ভবদেবের মা ছিলেন বন্ধ্যঘটীয়। এগারো শতকের রাজা হরিবর্মার মহামন্ত্রী ভট্ট ভবদেবের উপাধি ‘বালবলভীভুজঙ্গ’। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত অনুসারে ‘বালবলভী’ সেকালের উল্লেখযোগ্য বঙ্গ-নগরী। ভবদেব ভট্ট সম্ভবত সেখান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ‘ভুজঙ্গ’ বিশিষ্টার্থে ‘প্রভু’ বা ‘ছাত্র’। বালবলভী লুপ্ত জনপদ। ভবদেব ভুবনেশ্বরে অনন্তবাসুদেবের মন্দির, দিঘি খনন-সহ উদ্যান নির্মাণ করেন। স্বগ্রামেও বিরাট দিঘি খনন করেছিলেন।
বাংলার গাঞী বা গ্রামভিত্তিক আত্মপরিচয়ের প্রথম প্রামাণিক অভিলেখগত নিদর্শন ‘ভুবনেশ্বর প্রশস্তিলিপি’তে সুহৃদ বাচস্পতি মিশ্র ভট্ট ভবদেব ও তাঁর গ্রাম সম্পর্কে লিখেছেন,
ভূষণমিহ খ্যাতস্তু সর্বাগ্রিমো।
গ্রামঃ সিদ্ধল এব কেবলমলঙ্কারোহস্তি রাঢ়াশ্রিয়ঃ।।
ভুরিষ্টাল গাঞী প্রাচীন ভুরিশ্রেষ্ঠ গ্রাম থেকে জাত। এগারো শতকে রচিত কৃষ্ণচন্দ্র মিশ্রের লেখা ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ নাটকে ‘অহংকার’ চরিত্রটি নিজের বংশগৌরব ও গ্রামের কৌলীন্য সম্পর্কে বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, তাঁর বাড়ি ধনাঢ্য ও বণিকদের বসতিগ্রাম ভূরিশ্রেষ্ঠী। দর্পের ভরকেন্দ্র ভূরিশ্রেষ্ঠীর ঘোষণা থেকে বোঝা যায়, কতখানি বিত্তকৌলীন্যে ভরা গ্রাম ছিল। মুসলমান আমলেও তার ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়, কবি ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যে ভুরসুট পরগনার গৌরবদীপ্ত উচ্চারণে। রাজা লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় নবরত্নের অন্যতম রত্ন হলায়ুধ মিশ্রের মা ছিলেন বারেন্দ্রী গচ্ছষণ্ডা গাঞীর অন্তর্ভুক্ত কন্যা।

শ্রীধরদাস সংকলিত ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ গ্রন্থে একাধিক কবির গাঞীনাম উল্লিখিত হয়েছে। বারেন্দ্রী করুঞ্জ, তৈলবাটী, ভট্টশালীর পাশাপাশি সমতট ও হরিকেলের ‘শকটী’ ও ‘রত্নমালী’ গাঁইনাম দেখা যায়। মৎস্যগাঞী গড়ে উঠেছিল উত্তরবঙ্গের মৎস্যাবাস গ্রামকে কেন্দ্র করে। অদ্ভুতসাগর ও দানসাগর রচয়িতা অনিরুদ্ধ ভট্টের গাঁই পদবি ছিল ‘চম্পাহিট্টি’। মদনপালের মনহলি তাম্রশাসনে দানগ্রহীতা বটেশ্বরস্বামী ছিলেন ‘চম্পাহিট্টীয়’। স্মার্ত জীমূতবাহন ছিলেন রাঢ়ের পারিভদ্র বা পারিহাল গাঞীর ব্যক্তিত্ব।
সুতরাং গাঞীনামগুলি কোনও আকস্মিক শব্দ নয়, বরং মাটির অর্থনৈতিক রূপান্তর, রাজানুগ্রহ এবং সহস্র বছরের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের জীবন্ত স্মৃতি বা ফসিল। গাঁইনামগুলি কোনও সরলরৈখিক শব্দও নয়। প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে নানা বিষয়; ভূগোল, বিস্মৃত জনজাতি, অর্থনীতি, লোকদেবতা, লোকশিল্প, স্থানমাহাত্ম্য, স্থাননামের প্রত্যয়সহ ইতিহাসের গূঢ় সংকেত-সমূহ। ভট্টশালী বা মাসচটক গাঞীনামের অন্তরালে রয়েছে যথাক্রমে শালিধানের উর্বরক্ষেত্র কিংবা মাসকলাই ডালচাষের উৎপাদন তথা মেঠো অর্থনীতির চকিত হদিশ। মাসচটক বা মাসচড়ক গ্রামটি স্থান পেয়েছে তেরো শতকের তাম্রশাসনে। ১৯২৪-‘২৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার আদাবাড়ি গ্রাম থেকে আবিষ্কৃত হয় রাজা দশরথদেবের নামাঙ্কিত আদাবাড়ি তাম্রশাসন। শাসনে নয়টি গাঞীনামের উল্লেখ আছে, যথা– দিণ্ডী, পালী, সেউগাঞী, মাসচটক বা মাসচড়ক, মূলগাঞী, সেহণ্ডায়ী, পুতীগাঞী, করঞ্জগাঞী এবং মহান্তয়াড়া। গ্রামগুলি রাঢ়ী ও বরেন্দ্রী গাঞীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। রাঢ়ে যখন তুর্কি আক্রমনে জনপদাবলি বিধ্বস্ত হচ্ছে তখন অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবার জান-মান বাঁচাতে পূর্ববঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাম্রশাসনটির অন্যতম গুরুত্ব এখানে।

বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের সমসাময়িক ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি সুকবিবল্লভ নারায়ণদেবের পূর্বপুরুষ সম্ভবত একই কারণে রাঢ়ের গুণাকর গ্রাম ত্যাগ করে পূর্ববঙ্গের বোরগ্রামে বসতি স্থাপন করেন: ‘রাঢ় ছাড়িয়া বোরগ্রামেতে বসতি’। কবি নারায়ণদেব আত্মপরিচয় অংশে লিখেছেন–
শূদ্রকুলে জন্ম মোর সৎকায়স্থ ঘর।
মৌদগোল্য গোত্র গাঞী গুণাকর।।
কায়স্থদের গাঞীপ্রথা না থাকলেও, নির্দিষ্ট গ্রামবসতিকে এখানে ‘গাঞী’ বলা হয়েছে। ‘গুণাকর’ গ্রামটি মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জের ১ নং ব্লকের অন্তর্গত প্রাচীন জনপদ। বর্তমানে নাম ‘গাঁকর’। এটি উত্তররাঢ়ীয় কায়স্থদের অন্যতম বসতগ্রাম ছিল। গ্রামটি রাঢ়ী গাঞী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অভিঘাতে অনেকে তখন রাঢ় ছেড়ে পূর্ববঙ্গে (কিশোরগঞ্জ জেলার বোরগ্রাম) আশ্রয় নিয়েছিলেন। অঞ্চলটি ছিল রাজা দশরথদেবের অধীনে।
রাজা দশরথদেবের অপর নাম দনুজমাধব। তাঁর সাম্রাজ্য যখন তুর্কি আক্রমণের অভিঘাতে ভেঙে পড়ে তখন রাঢ়অঞ্চল অনেকটা শান্ত হয়েছে। সেই কারণে পূবর্বঙ্গ থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে এপার বাংলায় চলে আসেন অনেকে। যেমন কবি কৃত্তিবাসের পূর্বপুরুষ নরসিংহ ওঝা ছিলেন দনুজমাধবের (বেদানুজ) রাজসভার পাত্র। তিনি পূবর্বঙ্গ ছেড়ে নদীয়ার ফুলিয়াতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কৃত্তিবাস তাঁর আত্মবিবরণীতে লিখেছেন–
পূর্বেতে আছিল বেদানুজ মহারাজ।
তাহার পাত্র আছিল নারসিংহ ওঝা।।
বঙ্গদেশে প্রমাদ হইল সকলে অস্থির।
বঙ্গদেশে ছাড়ি ওঝা আইলা গঙ্গাতীর।।

গাঞীনামের সঙ্গে ব্রাহ্মণ্যদের অন্যতম আরেকটি সম্পর্ক-সূত্র গোত্র। গোত্র হল রক্তের সম্পর্ক। গাঁই ও গোত্র ছিল মধ্যযুগে ব্রাহ্মণদের টিকে থাকার অন্যতম উপাদান বা লাইসেন্স। রাঢ়ে যখন ব্রাহ্মণ উপনিবেশ গড়ে উঠল, তখন বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার ফলে তাঁদের গোত্র চলে যায় অন্তরালে। গাঁই-পদবি মুখ্য হয়ে ওঠে।
১৫-১৬ শতকে রাজনৈতিক অবস্থা বৈগুণ্যে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণদের অনেকে রাঢ়ে এসে বসতি স্থাপন করলেন। তখন তাঁদের গাঁই নয়, গোত্র হয়ে উঠল টিকে থাকার অন্যতম হাতিয়ার। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী এই কারণে লিখেছিলেন:
গাঞি নাই গোত্র আছে বসিল বাঁড়রি কাছে
বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ নয় শত।
প্রাচীন স্থাননাম বা গ্রামনামে প্রচুর অষ্ট্রিক, দ্রাবিড় শব্দ পাওয়া যায়। যেমন বারেন্দ্রী ‘করঞ্জাই’ গাঞীনামে অষ্ট্রিক করঞ্জাকে অবিকৃতভাবে গ্রহণ করলেও কুলাচার্যদের সংস্কৃতকরণের ছাঁকনিতে ‘অনার্য’ নামটি রাতারাতি করমুক্ত গাঞী আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে যায়। শব্দার্থের এই শাসনতান্ত্রিক রূপান্তর আসল সংস্কৃতায়নের দৃষ্টান্ত। প্রাচীন তাম্রশাসনে ‘মহত্তর’ শব্দটি কালক্রমে প্রাকৃত ও লোকমুখে ‘মহান্ত’-তে পরিণত হয়। তখন বৈষ্ণবদের আধিপত্য শুরু হয়নি। মূলত বৌদ্ধবিহারের স্থবির বা আচার্যদের বাস্তুগ্রামের নামকরণ হয়েছিল ‘মহান্তয়াড়া’। তাঁরাই ‘মহান্ত’ নামে অভিহিত হতেন। ১৩ শতকের আদাবাড়ি তাম্রশাসনে গাঁইনামটি থেকে বোঝা যায়।
গাঞীনামগুলির ব্যবচ্ছেদ করলে ভূপ্রকৃতি, গ্রামের আয়তন, কুটীর শিল্প ইত্যাদি সম্পর্কে ‘স্ফুলিঙ্গ তথ্য’ পাওয়া যায়। গঙ্গোপাধ্যায়ের মূলে ‘গঙ্গুল’ অর্থাৎ গঙ্গার তীর। দীঘল গাঞী বলতে বৃহৎ গ্রামকে বোঝায়। মধ্যযুগের যেন স্বয়ংসম্পূর্ণ পল্লিরাষ্ট্র। বাগচড়া যেমন নদীতীরবর্তী বাঘ অধ্যুষিত অরণ্যাঞ্চলকে নির্দেশ করে তেমনই ‘ভাটাতি গাঞি’ আসলে নদীর ভাটী কিংবা কুম্ভকারদের ভাটীর জন্যও গ্রামনামটি আসতে পারে। এর সঙ্গে তুলনা করা যায় বর্ধমানের ভাটাকুল গ্রামটিকে।

কেশরকোনা বা গোড়ে বৃক্ষ যুক্ত স্থাননাম বা গোড়ে পুকুরের স্মৃতিবাহী। এই ধরনের গ্রামনাম বল্লাল সেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে মেলে, ‘আউগড্ডিয়া’ বা ‘আউহাগগড্ডিয়া’। পীততুণ্ডি আসলে ‘ল্যাটেরাইট’ বা লালমাটির গ্রাম। গ্রামনামের অন্তে যে ‘মুণ্ডি’ শব্দ দেখা যায়, তা ‘মুণ্ডা’ জনজাতির আদি বসতিকে নির্দেশ করে। মুণ্ড > মুড়া বা মুড়ো। একালের অনেক গ্রামনামেই আমরা দেখতে পাই, যেমন হাটমুড়গ্রাম, মুড়গ্রাম, বাঁধমুড়ো ইত্যাদি।
পালিগাঞীর ‘পালি’ শব্দের একাধিক অর্থ; বেতের কাঠা বা কুনকি, বিভাজন কিংবা পল্লি। বৌদ্ধ পালিভাষার মূলে রয়েছে ‘পল্লি’ শব্দ। বর্ধমান বীরভূম সীমান্তে পালিগ্রাম ঐতিহ্যপূর্ণ ও পুরাকীর্তি সমৃদ্ধ গ্রাম। এই গ্রাম থেকে ‘পালিগাঞী’র উদ্ভব হয়েছে। ‘কুন্দো’ আরেকটি উল্লেখযোগ্য গাঁইনাম। এর দু’টি অর্থ; খোদাই– যেমন ‘পাথর কোঁদাই’ বা ‘কাঠখোদাই’। লোকশিল্পীদের গ্রাম। আরেকটি লোকশব্দ ‘কোঁদা’। কোঁদার অর্থ হল ‘খানাখন্দ’। পূর্ব বর্ধমানে ব্রহ্মাণী নদী-তীরবর্তী অতি প্রাচীন গ্রাম ‘কুন্দ’। নগেন্দ্রনাথ বসুর মতে এই গ্রাম থেকে ‘কুন্দলাল’ গাঞীর উদ্ভব হয়েছে।
গ্রাম্যদেবী ১২ শতকের সূর্যমূর্তি কুন্দাক্ষী দেবী রূপে পূজিত হন। গ্রামের পুরাসম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল একাধিক ‘নিওলিথ সেল্ট’ যা শিবজ্ঞানে পূজিত হচ্ছে গ্রামে পার্শ্বনাথ ও ঋষভনাথের দু’টি প্রস্তরভাস্কর্য উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। স্থাননামে অন্যতম স্থান দখল করেছে গাছপালা। ‘সান্যাল’ পদবির মূলে ওষধিবৃক্ষ সঞ্জীবনী। ‘পাকড়াশী’ পদবির উৎস ‘পর্কটাবাস’। ‘পর্কট’ বৃক্ষের প্রাচীন নাম ‘প্লক্ষা’। প্লক্ষা প্রস্রবন থেকে একদা সরস্বতী নদীর উদ্ভব হয়েছিল। ‘বেলেড়া’ অর্থ বেলগাছ। বর্ধমানেও বেলেরা গ্রাম রয়েছে। বেলগাছের আধিক্য ও অনাদিলিঙ্গ শিবের অস্তিত্ব-হেতু গ্রামের সংস্কৃতায়িত নাম ‘বিলেশ্বর’। বেলেড়া নামটি মুকুন্দের চণ্ডীমঙ্গল ও জয়ানন্দের চৈতন্যমঙ্গলকাব্যে রয়েছে।

‘লাহিড়ি’ গাঞীনামের মধ্যে লুকিয়ে আছে লাক্ষাচাষের স্মৃতি। রাঢ়বাংলার মতো উত্তরবঙ্গের লাহেড়িয়া গ্রামটি আসলে রাঙামাটির গ্রাম। পলাশ কুসুমগাছের আধিক্য হেতু লাক্ষা চাষ হত। রাঢ়বাংলায় যাঁরা লাক্ষা চাষ করেন তাঁদের পদবি ‘লাহা’। অতীতে লাহাদের বসতি হেতু লাহেড়া গ্রামের নামকরণ। লাহেড়া থেকে ব্রাহ্মণ গাঁইনাম লাহিড়ি পদবির জন্ম। ‘তিয়র’ গাঁইনামের মূলে রয়েছে তীবর বা মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের বসবাসের স্মৃতি। নদীতীরবর্তী এলাকা। কালক্রমে নদী-তীরবর্তী স্থানে খেসাড়ি ডালের চাষ শুরু হয়। তখন ‘তীবর’ থেকে ‘তিয়র’ এবং তার থেকে ডালশস্যটির নাম ত্যাওড়ায় পরিণত হয়।
মঙ্গলকোট থানার অজয় নদীর তীরে প্রাচীন গ্রামের নাম ‘ত্যাওড়া’। শব্দটি যে তীবর থেকে এসেছে, সন্দেহ নেই। ‘ডিঙ্গসাঁই’ গাঁইনাম ও পদবিটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ডিঙি তৈরির গ্রাম। সেই গ্রামের সাঁই অর্থাৎ মালিক হলেন ব্রাহ্মণরা। তখন থেকে স্থাননামটি পরিবর্তিত হয়ে ডিঙ্গসাঁই হল। গাঁইনামগুলির প্রত্যয়গুলিও প্রাচীন, যেমন ‘আড়া’, ‘হাটি’ বা ‘হিট্টি’, ‘মুণ্ডি’, ‘লাল’, ‘খণ্ড’ ইত্যাদি। ‘আড়া’ শব্দের অর্থ হল বাঁধ বা বেড়া। উল্লেখযোগ্য গাঁইনাম ‘মহান্তআড়া’। আড়া প্রত্যন্তায়ন্ত প্রাচীন গ্রাম রাঢ় অঞ্চলে দেখা যায়, যেমন তসর আড়া > টাসোয়াড়া, মালিয়ারা, বেলে আড়া > বেলেড়া।

‘চম্পকহিট্টি’ বা চম্পাহাটি অথবা হিট্টি বা হাট প্রত্যয়ান্ত গ্রামনাম। ‘হিট্টি’ শব্দটি অস্ট্রিক। অর্থ হল উঁচু স্থান বা ডাঙা। নৈহাটি তাম্রশাসনে রাজপ্রদত্ত গ্রামের নাম ‘বাল্লহিট্টা’ থেকে একালের ‘বালুটে’। হিট্টি থেকে এসেছে হেঁটা। লোকখেলার খাপড়া বা পোড়ামাটির টুকরো। লাল প্রত্যয়ান্ত দু’টি গাঞীনাম পাওয়া যায় যথা ‘কাঞ্জিলাল’ ও ‘মিশিলাল’। ‘কাঞ্জী’ শব্দের অর্থ ‘আমানি’ বা ‘কাঞ্জী’। শব্দটি দরিদ্র গ্রামকে চিহ্নিত করে না, বরং ভাতের আধিক্যকে বোঝায়। লোকভাষায় যাতে নজর না-লাগে তার জন্য বিপরীত কথন। যেমন চাল নেই বললে ‘বাড়ন্ত’ তেমনি কাঞ্জীর মধ্য দিয়ে সামাজিক ট্যাবু প্রকাশ পেয়েছে। মিশিলাল আসলে ‘মিশ্র লৌহ’ অর্থাৎ তামা লোহা বা সংকর ধাতুর শিল্পগ্রাম। কাঞ্জীলাল বা মিশিলাল রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণদের গাঁইপদবি।
অন্যতম প্রামাণ্য গাঁইনাম ‘চোতখণ্ডী’। শব্দটি ভাঙলে দু’টি শব্দ বেরিয়ে আসে ‘চোত’ বা ‘চৌথ’ ও ‘খণ্ড’। চৌথ ভূমি রাজস্বের পারিভাষিক শব্দ। গ্রামের মালিক এক চতুর্থাংশ কর বা রাজস্ব পেতেন। খণ্ড রাঢ়ের অন্যতম গ্রাম নির্দেশক প্রত্যয় শ্রীখণ্ড, দক্ষিণখণ্ড, রণখণ্ড ইত্যাদি। ‘খণ্ড’ হল নির্দিষ্ট ভূমি। কবি বলরাম দাস শ্রীখণ্ডের মাহাত্ম্য বোঝাতে লিখেছিলেন, ‘ক্ষিতি নব খণ্ড মাঝে খণ্ড মহাস্থান’। অনুরূপ গাঞীনাম ‘পিশাচখণ্ড’। শ্মশান-সংলগ্ন স্থানের পিশাচদেবতার অধিষ্ঠান। পিশাচ দেবতার নামেই গ্রামটি পরিচিত হয়। বটব্যাল পদবিটিও একই ধরনের। ‘বট’ মানে বটগাছ। ‘ব্যাল’ শব্দের অর্থ সর্প, মনসা বা সর্পদেবতা। সুতরাং গ্রামটির নামকরণ হয়েছিল ‘ব্যাল’– সর্প অধ্যুষিত বটগাছ বা লৌকিক দেবতার থানকে কেন্দ্র করে।

‘ঘণ্টেশ্বরী’ গাঞীনামে লৌকিক দেবী ঘণ্টেশ্বরীকে পাওয়া যায়। ‘ঘণ্টেশ্বর’ এমন এক বিচিত্র দেবতা যার থানে প্রচুর ঘণ্টা মানত হয়। ইনি মূলত ‘ক্ষেত্রপাল’ দেবতা রূপে পানাগড়ের কাছে পূজিত হচ্ছেন। লোকবিশ্বাস অনুসারে তাঁর নিকট ঘণ্টাধ্বনি করলে ‘বালাই’ বা রোগ কিংবা অপশক্তি দূরীভূত হয়। ‘ঘণ্টাকর্ণ’ নামে ভৈরব পূজিত হচ্ছেন পূর্ব বর্ধমানে কাঁদড়া গ্রামে। গ্রাম্যদেবী দুর্গাচণ্ডীর ভৈরব। সুতরাং ঘণ্টেশ্বরী দুর্গারও অপর নাম হতে পারে। ‘ঘণ্টাকর্ণ’ বা ‘ঘেঁটু’ চর্মরোগের দেবতা। পিশাচবর্গের অপদেবতা হিসাবে পূজিত হন। তাঁর শক্তি ঘণ্টেশ্বরী।

প্রথম মহীপালের বানগড় তাম্রশাসনে ‘চিত্র ঘণ্টেশী’ দেবীর সন্ধান পাওয়া যায়। নবদুর্গার এক রূপ বলে ঐতিহাসিকেরা অনুমান করেছেন। ‘চিত্র’ শব্দটির উল্লেখ থাকায় বোঝা যায় ইনি পটে আঁকা দেবী। লোকায়ত পটেশ্বরী চণ্ডী। সামন্ত ‘গাঁই’ পদবিটি রক্তের টান, ভূগোল এবং সামন্ততান্ত্রিক প্রেক্ষাপটকে নির্দেশ করে। রাঢ়ী ব্রাহ্মণদের তালিকার অন্তর্ভুক্ত শাণ্ডিল্য গোত্রের অন্যতম গাঞীনাম ‘সামন্ত’। উগ্রক্ষত্রিয় সমাজে ‘সামন্ত’ পদবিটি সরাসরি ‘সীমান্তরক্ষক’ কিংবা সামন্তরাজাকে নির্দেশ করে। বর্ধমান জেলায় ‘সামন্তি’ নামে গ্রামও আছে। ব্রাহ্মণরা যখন সামন্তরাজা হলেন, তখন গ্রামনামের সঙ্গে তাঁর পদবিও যুক্ত হল। বিলুপ্ত গাঞীনামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ঝিকড়ারি’। কাটোয়া অঞ্চলে ইন্দ্রাণী পরগণার কবি কাশীরাম দাসের জন্মস্থান প্রসঙ্গে সিদ্ধি ও সিঙ্গিগ্রামের নাম উঠে আসে। শোনা যায় কবির আদি জন্মস্থান ছিল ইন্দ্রাণীর ঝিকড়াডাঙায়। ঝিকড়াডাঙার অবস্থান হল গঙ্গার পশ্চিমতীরে কাটোয়ার বিকিহাট-বেড়ার কাছে। স্থানটি থেকে লেখযুক্ত বিষ্ণুমূর্তি এবং নানাবিধ প্রত্নস্মারক উদ্ধার হয়েছে। বিকিহাটের নাম মিলেছে ফ্যানডেন ব্রুকের ম্যাপে ও চৈতন্য-জীবনী সাহিত্যে। লোকছড়ায় বলা হয়েছে,
ঝিকড়াডাঙায় বাস কবি কাশীদাস
তোর বাঁশতলায় বাস তুই হবি কাশীদাস?
অহো! ছি! ছি!
ঝিকড়াডাঙা বর্গিহাঙ্গামা ও গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তনে লুপ্ত জনপদ। ঝিকড়াডাঙা থেকেই ‘ঝিকড়ারি’ গাঞীনামের উদ্ভব হয়েছিল।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ৫০: পদ থেকে পদবি
পর্ব ৪৯: খিস্তি খেউড়ের ছড়া
পর্ব ৪৮: ভাঁজো আমাদের আদি কৃষি-লোকবিজ্ঞান
পর্ব ৪৭: মাঠ মাটি মানুষ
পর্ব ৪৬: গুজব কিংবা হুপুই: সে যুগের ‘ভাইরাল’
পর্ব ৪৫: সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো
পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা
পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম
পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি
পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ
পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য
পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা
পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল
পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর
পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি
পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়
পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার
পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন
পর্ব ৩২: তালবাহার
পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা
পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ
পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়
পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?
পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved