The Buffalo, Goddess Durga and the Aryan Narrative | Robbar
Robbar
  • ৩ কার্তিক ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২১ অক্টোবর ২০২৬

মহিষ কেন অসুর

আজও মহিষ-সংস্কৃতির গৌরব লক্ষ্য করা যায় দাক্ষিণাত্যের টোডা উপজাতির ক্ষেত্রে। টোডাদের পবিত্র মহিষ-সংস্কৃতি দেখে সহজেই উপলব্ধি করা যায়, আর্য-রাষ্ট্র কাঠামো ও আর্যীকরণের বহু পূর্ব থেকে ভারতের পশুপালক সমাজ জল-মহিষকে কেন্দ্র করে এক সংহত সামাজিক অর্থনৈতিক ও ধর্মীয়-পরিবেশ গড়ে তুলেছিল। নর্ডিক আর্যদের বহুপূর্বে মধ্য এশিয়া বা ইরানি মালভূমি হয়ে যে প্রথম আর্য-তরঙ্গ পূর্ব ভারতে এসেছিল তাদের নৃতাত্ত্বিক নাম ‘আলপাইন’। ঐতিহাসিকদের মতে, আলপাইনরাই ‘অসুর’ নামে পুরাণে পরিচিত হয়েছেন। 

প্রচ্ছদের ছবি: তায়েব মেহতা

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ১৮:৪৬   
Facebook WhatsApp Messenger

৫৩.

জোড়া জল-মহিষের উজ্জ্বল আখ্যান তারাশঙ্করের ‘কালাপাহাড়’। মাটির উগ্র শৌর্য, অদম্য পেশীশক্তি, বিশ্বস্ততা, ভালোবাসায়, রঙলাল চাষির কাছে ‘কালাপাহাড়’ যেন জীবন্ত টোটেম। দোসর ‘কুম্ভকর্ণ’-কে হারিয়ে কালাপাহাড় ধ্বংসাত্মক বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। ক্ষমতার ভূ-রাজনীতিতে পরম উপকারী মহিষকে যেমন অসুর সাজিয়ে দেবীর কাছে বলি দেওয়া হয়, কালাপাহাড়ও তেমনই পুলিশ-সাহেবের গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

কালাপাহাড়ের করুণ পরিণতি যেন মহিষাসুর আখ্যানের আরেক মেঠো ভার্সন। পূর্ব ভারতের অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ প্রভৃতি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একদা যে বিশাল অসুর-সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল, তার মূলে ছিল ‘কুম্ভকর্ণ-কালাপাহাড়’দের শক্তি ও দাপট। শুধু পূর্ব ভারত নয়, হরপ্পা-সভ্যতার নগরায়ণে, কৃষি তথা বাণিজ্যের সমৃদ্ধিতে, পরিবহনে মহিষ যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল তার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিলেছে। জিও-আর্কিওলজি গবেষণায় প্রমাণিত, সিন্ধু অববাহিকায় লাঙল চষা হত জলমহিষ দ্বারা। বাণিজ্যের অন্যতম উপাদান ছিল মোষের দুধ। একই কারণে সিন্ধু সিলে মহিষ উল্লেখযোগ্য স্থান পেয়েছে।

zoom
দাইমাবাদের প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত জল-মহিষের ভাস্কর্য

একটি সবল সুস্থ দেশি বলদ যেখানে নিজের শরীরের ওজনের সর্বোচ্চ ১০-১২ শতাংশ বেশি মাল টানতে পারে, মহিষের ক্ষেত্রে তার পরিমাণ ১৫-২০ শতাংশ। মহিষীদের দুধ দেওয়ার ক্ষমতাও গাভীর তুলনায় ২ থেকে ৩ গুণ বেশি। সুতরাং মহিষ-অর্থনীতি প্রাগার্য ভারতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর জেলা থেকে প্রাপ্ত ‘লেট-হরপ্পান’ যুগের দাইমাবাদ-প্রত্নক্ষেত্র থেকে প্রকাণ্ড বুনো মহিষের ব্রোঞ্জ-মূর্তিটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। মূর্তিটি প্রমাণ করে, দাক্ষিণাত্যের মাটিতে মহিষ-সংস্কৃতি বা অর্থনীতি খোদ হরপ্পা সভ্যতার সমৃদ্ধির অন্যতম আকর উপাদান ছিল।

আজও মহিষ-সংস্কৃতির গৌরব লক্ষ করা যায় দাক্ষিণাত্যের টোডা উপজাতির ক্ষেত্রে। টোডাদের পবিত্র মহিষ-সংস্কৃতি দেখে সহজেই উপলব্ধি করা যায়, আর্য-রাষ্ট্র কাঠামো ও আর্যীকরণের বহু পূর্ব থেকে ভারতের পশুপালক সমাজ জল-মহিষকে কেন্দ্র করে এক সংহত সামাজিক অর্থনৈতিক ও ধর্মীয়-পরিবেশ গড়ে তুলেছিল। টোডাদের সমাজে মহিষের দুগ্ধশালা হল মন্দিরতুল্য। অন্ধ্র-তেলেঙ্গানার ‘পোটারাজু’ বা মহারাষ্ট্রের ‘মহসোবা’, বাংলার কালু রায় ইত্যাদি লোকায়ত দেবতাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, মহিষকে তারা দেবতার আসনে বসিয়েছিল। পূর্ব ভারতেও প্রাগার্য মূলবাসীদের ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা বিকাশ এবং ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম উৎস ছিল মহিষ বা কাড়া। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে বুনোমহিষ-দেবতা ‘টাঁড়বারো’র কথা আছে। উপন্যাসের একাদশ পরিচ্ছেদে কথক সত্যচরণ আদিবাসী রাজা বৃদ্ধ দোবরুপান্নাদের পূর্বপুরুষদের সমাধিস্থল দর্শন করেছিলেন।

zoom
মিশরের ‘ভ্যালি অব দ্য কিংস’

পাহাড়ের উপর প্রাচীন বটবৃক্ষের তলায় প্রায় এক বিঘা জায়গা জুড়ে বাটনা-বাটা শিলের মতো অজস্র পাথর ছড়ানো। সেগুলি ছিল যুগ-যুগান্তরের আদিবাসী রাজাদের পূর্বপূরুষদের সমাধি। কথক স্থানটিকে মিশরের ‘ভ্যালি অব দ্য কিংস’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন প্রাচীনত্ব ও গুরুত্ব বোঝাতে। পাহাড় থেকে নামার পথে সিঁদুর চর্চিত একটি পাথরও দেখেছিলেন। ইনি আদিবাসী রাজাদের কুলদেবতা ‘টাঁড়বারো’– বুনো মহিষদেবতা। এই সমস্ত উদাহরণ থেকে স্পষ্ট, প্রাগার্য ভারতে মূলবাসীদের মহিষকেন্দ্রিক অর্থনীতির সমৃদ্ধি ও গৌরব, বহিরাগতদের আকৃষ্ট করেছিল। যেমন আলপাইন আর্যভাষীরা প্রথমে আকৃষ্ট হয়েছিলেন।

আলপাইন আর্যভাষীরা যে পূর্ব ভারতে প্রথম এসেছিলেন এবং তাঁরা যে পুরাণ কথিত অসুর– সবিস্তারে আলোচনা করেন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ড. অতুল সুর (দ্রষ্টব্য: বাংলা ও বাঙালির বিবর্তন, বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, হিস্ট্রি এণ্ড কালচার অব বেঙ্গল, ১৯৬৩)। ড. সুরের নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কট্টর বৈদিক নর্ডিক আর্যদের বহুপূর্বে মধ্য এশিয়া বা ইরানি মালভূমি হয়ে যে প্রথম আর্য-তরঙ্গ পূর্ব ভারতে এসেছিল, তাদের নৃতাত্ত্বিক নাম ‘আলপাইন’। এরা মূলত আর্যভাষী ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, আলপাইনরাই ‘অসুর’ নামে পুরাণে পরিচিত হয়েছেন। এদের মূল লক্ষ্য ছিল সমৃদ্ধ দেশীয় মহিষ অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা।

zoom
টোটেম

আলপাইনরা মূলবাসীদের সঙ্গে সম্ভবত কোনও বড় সংঘাতে জড়ায়নি। ধীরে ধীরে অস্ট্রিক ও দ্রাবিড়দের সঙ্গে তারা মিশে যায়। অস্ট্রিকরা পরম উপকারী পশু কাড়া বা মহিষ ও নিজেদের কৃষিব্যবস্থাকে উন্নত আর্যভাষার ছাঁচে আত্মসাৎ করেন। অস্ট্রিকদের কৌম টোটেম মহিষ বা কাড়াকে নিজেদের আয়ত্তে এনে আলপাইনরা পূর্ব ভারতে এক মহাশক্তিশালী রাজতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলেন। কোনও একসময়ে যার সার্বভৌম প্রতীক ছিল মহিষাসুর। পূর্ব ভারতে যে একদা প্রাগার্য অসুর-সাম্রাজ্য ছিল, তার প্রমাণ রয়েছে মহাভারত-সহ পৌরাণিক সাহিত্যে। পূর্ব ভারতের জনপদ বা দেশের নামকরণগুলি অসুরদের নামেই হয়েছিল।

বলিরাজার পাঁচ পুত্রের নাম অনুসারে অঙ্গ (ঝাড়খণ্ড) বঙ্গ, কলিঙ্গ (উড়িষ্যা) পুণ্ড্র ও সুহ্ম এই পাঁচটি দেশের নামকরণ হয়েছিল। বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ), পুণ্ড্র (উত্তরবঙ্গ), সুহ্ম (পশ্চিমবঙ্গ)। মহাভারতের আদিপর্বের ১০৪ অধ্যায়, হরিবংশপুরাণের প্রথম খণ্ডের ৩১ অধ্যায়, ভাগবতপুরাণের নবম স্কন্দের ২৩ অধ্যায়, বায়ুপুরাণের ৯৯ অধ্যায় প্রভৃতি প্রামাণ্য ধ্রুপদী আকরগ্রন্থগুলি একযোগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়। মহাভারতকার লিখেছেন, অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ-পুণ্ড্র ও সুহ্ম দীর্ঘতমা ঋষির ঔরসে মহিষী সুদেষ্ণার গর্ভে অসুররাজ বলির ক্ষেত্রজ সন্তান ছিলেন।

অঙ্গো বঙ্গঃ কলিঙ্গশ্চ পুণ্ড্র সুহ্মশ্চতে সুতাঃ।
তেষাং দেশাঃ সমাখ্যাতাঃ স্বনামকথিতা ভুবি।। (আদিপর্ব-১০৪/৫০)

খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে রচিত বৌদ্ধ তান্ত্রিক মহাযান গ্রন্থ আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্পে বলা হয়েছে, আর্যীকরণের পূর্বে গৌড়বঙ্গ পুণ্ড্র অঞ্চলের মানুষের ভাষা সংস্কৃতি ছিল আসুরভাষা ও ব্রাত্য সংস্কৃতির। লেখা হয়েছে, ‘অসুরনাম ভবেৎ বাচ গৌড়পুণ্ড্রোদ্ভব সদা’। অসুররা অনার্য নন। তাঁরাও আর্যভাষী ছিলেন। সুতরাং হুদুড়-দুর্গা কল্পিত, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত ন্যারেটিভ। অসুরদের দেবতাদের অন্ত্যনাম ছিল ‘অসুর’। ক্ষেত্রসমীক্ষায় আজও লোকায়ত স্তরে নানা ধরনের অসুরদেবতার সন্ধান পাওয়া যায়।

আখ ও আখশালের দেবতার নাম পণ্ডাসুর। অসুররা এদেশে উন্নত প্রথায় আখচাষ করেন। আখের সঙ্গে অসুরদের যোগ থাকার জন্য আজও আখবলি দেওয়া হয় দেবীপুজোয়। এছাড়া আরও নানা ধরনের অসুরদেবতার পূজা বাংলায় হচ্ছে। যেমন কালসুর, মায়াসুর, জ্বরাসুর, রাহু-কেতু, লোহাসুর, বাণাসুর, গয়াসুর ইত্যদি। জ্বরাসুর জ্বরের দেবতা। ইনি শীতলাদেবীর সহকারী। শীতলার সঙ্গে ইনিও পূজিত হন। বৌদ্ধদের বজ্রযান ঐতিহ্যেও জ্বরাসুর স্থান পেয়েছেন।

zoom
বনদুর্গা বুড়ি সঙ্গে জয়া বিজয়া

জ্বরাসুরের মূর্তি কল্পনা অদ্ভুত। তিন মাথা, নয়টি চোখ এবং তিনটি পায়ের সমাহার। গায়ের রঙ ঘন নীল। পুরুলিয়া, বাঁকুড়, ঝাড়খণ্ডের কুড়মি সমাজে পূজিত গবাদি পশুর রক্ষক হিসাবে ‘মায়াসুর’ বা ‘মোরাসুর’ জনপ্রিয় অসুরদেবতা। কালসুর উত্তরবঙ্গের পূজিত হন বাঁশের প্রতীকে। লোহাসুর উত্তরবঙ্গের আরেক জনপ্রিয় লোকদেবতা। বিশ্বকর্মা পুজোর সময় মৃণ্ময়মূর্তিতে পূজিত হন।

লোহাসুর সম্পর্কে প্রচলিত লোককথা হল– ইনি শিবের বরে অমরত্ব পেয়েছিলেন। দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে অপরাজেয় হন। শেষে দেবতারা মহাদেবের শরণাপন্ন হলে কামার নামক এক বুদ্ধিমান মানুষ সৃজন করলেন মহাদেব। শিখিয়ে দিলেন লোহাসুরকে কীভাবে ফাঁদে ফেলা যাবে। কামার লোহাসুরকে বললেন, ‘তুমি যে অমর তার প্রমাণ দাও দেখি। আমার হাপরে প্রবেশ করে দেখাও।’ ‘তবে দেখো আমার ক্ষমতা’– লোহাসুর ঢুকতেই কামার হাপর চালিয়ে তাকে পুড়িয়ে লাল করে ফেলল। সেই লোহা পিটিয়ে আট প্রকার লোহা প্রস্তুত হল। সেখান থেকে আট প্রকার ধাতুশিল্পীদের উদ্ভব হল। লোকগল্প থেকে বোঝা যায়, লোহাসুর লৌহসংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রাচীন অসুরদেবতা। এই অসুরকুলের দেবতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে মহাদেবের।

নর্ডিক আর্যরা আলপাইনদের পরে ভারতে আসেন। নর্ডিকরাই বেদ রচনা করেছিলেন। এঁরা ছিলেন অসুরদের বিপরীত; দেবপন্থী বা সুর। যাযাবর নর্ডিকদের কাছে মহিষ নয়, ঘোড়া ও গরু ছিল প্রিয় পশু। ভারতের সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে ক্রমশ স্থায়ীভাবে বসবাস করার সূত্রে ক্রমশ তাঁরা কৃষিজীবী হয়ে ওঠেন। ফলে ঘোড়া যেমন পরিবাহনের মাধ্যম হয়, গরু হয়ে উঠল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তথা কারেন্সি। প্রথমদিকে নর্ডিক-আর্যরা পূর্ব ভারত আসত না, জল-জঙ্গলের দেশ বলে। নর্ডিক আর্যদের যদি কেউ আসত, তাদের ব্রাত্য ঘোষণা করত। কিন্তু আলপাইনদের মহিষকেন্দ্রিক সমৃদ্ধি দেখে তাঁরা পূর্বভারতে ক্রমশ অগ্রসর হন। ফলে আলপাইন ও নর্ডিকদের মধ্যে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী এক গৃহযুদ্ধ। 

zoom
জ্বরাসুর

লড়াইটা কিন্তু মূলত ধর্মযুদ্ধ ছিল না। উপমহাদেশের বুকে সংঘটিত আদিমতম জিও-পলিটিক্সের পূর্বরূপ। পুরাণে একেই বলা হয়েছে ‘সুরাসুরের যুদ্ধ’। প্রথমে নর্ডিক আর্যরা মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেরণ করেন কার্তিককে। মহাভারতের বনপর্ব এবং বিভিন্ন পুরাণের আদিম স্তর লক্ষ করলে দেখা যাবে, কার্তিক বা স্কন্দ মূলত আর্যদেবতা ছিলেন না। তিনি পাহাড়, জঙ্গলের, ব্রাত্যদেবতা বা লোকায়ত স্তর থেকে উদ্ভূত অপদেবতা। আর্যরা ক্রমশ কার্তিককে নিজেরদের দেবমণ্ডলীতে অন্তর্ভুক্ত করে দেবসেনাপতিত্বে বরণ করেন।

মহাভারতের বনপর্বের ২৩০ অধ্যায়ে দেখা যায়, কার্তিক মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। যদিও মহাভারতে মহিষাসুর প্রসঙ্গ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়নি। শুধুমাত্র বলা হয়েছে, মহিষাসুরকে কার্তিক যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেছিলেন। কিন্তু মহিষাসুরবধ যদি কার্তিকের মূল অবদান হত, তাহলে পরবর্তীকালে দুর্গা প্রসঙ্গের অবতারণা করা হত না। এই কারণে ভূ-রাজনীতির অঙ্গ হিসাবে নর্ডিকরা অস্ট্রিক কুলের জনপ্রিয় মাতৃকাদেবীর শরণাপন্ন হয়েছিলেন। আর্যপুরাণে যাঁকে বলা হয়েছে দেবী ‘দুর্গা’। আলপাইন অসুররা ঘোর পিতৃতান্ত্রিক ছিলেন। এই কারণে একাধিক অসুরদেবতার সন্ধান পাওয়া গেলেও, অসুরকুলের মাতৃকাদেবীর কোনও নাম বা পূজার অস্তিত্ব দেখা যায় না। পুরাণ অনুসারে তাঁরা মাতৃকাদেবীদের ভোগের সামগ্রী মনে করতেন। অধিকাংশ অস্ট্রিক এই কারণে আলপাইনদের খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। দেবী দুর্গা যে এদেশের মূলবাসীদের আদিমাতৃকা– মহাভারতের বিরাটপর্ব, ভীষ্মপর্বের দুর্গাস্তোত্র এবং হরিবংশে ধৃত আর্যস্তব থেকে জানা যায়।

zoom
মাসোবা

স্তোত্রগুলি থেকে জানা যায়, দুর্গার অপর নাম চণ্ডী। ‘চণ্ডী’ শব্দটি আদি অস্ত্রাল ভাষাগোষ্ঠীর। ওঁরাও উপজাতিদের শিকারদেবী ও যুদ্ধদেবীর নাম ‘চাণ্ডী’। মাঘী পূর্ণিমার দিন চাণ্ডীর বিশেষ পুজো করেন ওঁরাওরা। চণ্ডাল জনজাতির উপাস্য দেবী চণ্ডী। দুর্গার অন্যতম রূপ ‘উচ্ছিষ্টা চণ্ডালিনী’। নারদ পাঞ্চরাত্রের দশম অধ্যায়ে দেবীর উৎপত্তি সংক্রান্ত কাহিনি আছে। উচ্ছিষ্টা চণ্ডালিনীর ধ্যানমন্ত্র অনুসারে দেবী ষোড়শী, শবের উপর উপবিষ্টা। দ্বিভূজা দেবীর হাতে নরকপাল ও খড়গ। গলায় গুঞ্জাফুলের মালা। রক্তবসন পরিহিতা দেবীর সর্বাঙ্গে লালবর্ণের অলংকার। রাঢ়-বাংলায় গ্রামদেবী হিসাবে চণ্ডীর জনপ্রিয়তা বিপুল। তিনি গ্রামের অধীশ্বরী দেবী। গ্রামের রক্ষাকর্ত্রী। জ্বর, ব্যাধি, মহামারী, প্রাকৃতিক বিপদআপদ, গবাদি পশুর রক্ষা, অশুভ শক্তি প্রভৃতি থেকে তিনি যেমন গ্রামবাসীদের রক্ষা করেন, তেমনই বর্ষা বা বৃষ্টি কামনা, সন্তান কামনা, উত্তম ফসল প্রাপ্তি ইত্যাদির জন্য আজও পূজিতা হন।

zoom
বনদেবী দুর্গা

বনদেবী দুর্গা আসলে অরণ্যে বসবাসকারী আদিম উপজাতিতের পূজিত মাতৃদেবী। দেবীর গায়ের রঙ বর্ষাকালীন অরণ্যের মতো সবুজ । ‘বুড়ি বনদুর্গা’ রূপে বাংলার অনেক স্থানে এখনও তিনি পূজিত হন। ‘নিস্তারিণী বনদুর্গা’ নামে আরেকটি পুজো একসময় খুবই জনপ্রিয় ছিল বাংলায়। পুজোর নিয়ম হল মাটির বেদিতে মণ্ডল অঙ্কন করে জলপূর্ণ ঘটস্থাপন। ঘটের উপরে থাকে সিঁদুরচর্চিত আম্রশাখা। তার পাশে একটি কলাপাতার উপরে থাকে পাকা কলা দ্বারা নির্মিত ষণ্ড বা ষাঁড়। এটি মহাদেবের প্রতীক। ঘটটি বনদুর্গা রূপে পূজিত হন।

ধ্যানমন্ত্র অনুসারে নিস্তারিণী বনদুর্গা ত্রিনয়না। তিনি রণচণ্ডিকার মতো ক্রোধান্বিত। ভয়ংকর তাঁর দর্শনাবলি। মাথায় জটা। জটা থেকে বেরিয়ে আসছে বিষধর সাপ। মেখলায় সর্পবন্ধনী। দ্বিভুজা দেবীর হাতে তীর ও ধনুক। তাঁর সঙ্গে পূজিত হন দ্বাদশ দানব বা ভূত। কোকামুখী দুর্গা বলতে বুনো কুক্কুরী কিংবা নেকড়ের মুখমণ্ডল-বিশিষ্ট মানবী আকৃতির দেবীমূর্তি। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি তাঁর পূজা-পার্বণ (বিশ্বভারতী, ১৩৫৮) গ্রন্থে লিখেছেন, বাঁকুড়ার রাইপুরে দুর্গার কোকামুখী প্রস্তরমূর্তি পূজিত হয় (পৃ-৮২)।

zoom
কোকামুখী দুর্গা

এই ধরনের দেবী দুর্গামূর্তি পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। মূর্তিটি উত্তরবঙ্গ থেকে পাওয়া গিয়েছে। উচ্চতা ২০ সেমি এবং চওড়া প্রায় ৪০ সেমি। কালো ব্যাসল্ট পাথরে খোদাই করা অষ্টভুজা কোকামুখী মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি। গবেষকদের মতে একাদশ শতকের মূর্তি। বাংলায় একসময় কান্তার দুর্গার পুজো হত বনের মধ্যে। কান্তার শব্দের অর্থ– গভীর অরণ্য। পশুবলি ছিল প্রধান উপাচার। পুজো উপলক্ষে নারীপুরুষ বাদ্য সহকারে নাচগান করতেন। বেলের খোলায় মদ্যপান করে আনন্দ প্রকাশ করতেন। দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত সদুক্তিকর্ণামৃত সংকলন গ্রন্থের একটি শ্লোকে ‘কান্তার দুর্গা’-র উল্লেখ আছে।

তৈস্তৈর্জীরোপহারৈগিরি কুহরশিলা সংশ্রয়ার্মচয়িত্বা।
দেবীং কান্তারদুর্গাংরুধিরমুপতরু ক্ষেত্রপালায় দ্বতা।।

zoom
গুঁড়িঠাকরুন, বনদুর্গার আরেক রূপ

কান্তার দুর্গাপুজো হত গাছতলায়। পশুবলি ছিল অন্যতম পূজার বৈশিষ্ট্য। কান্তার দুর্গার অন্যতম পরিচিতি হল তিনি অরণ্যানী এবং পশুমাতা। এই সমস্ত উদাহরণ থেকে জানা যায়, দেবী আসলে প্রাগার্য আদিম জনজাতির উপাস্য দেবী ছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছে পুলিন্দ কন্যা। তিনি শবর জাতির আরাধ্য ছিলেন বলে দুর্গাপুজোর অন্যতম অঙ্গ ছিল শাবরোৎসব। এমনকী চোর ডাকাতদের দ্বারা দেবী দুর্গা পূজিত হতেন, একথা প্রাচীন শাস্ত্রেই পাওয়া যায়। হরিবংশের ১২০/১৩ শ্লোকে দেবীর পূজারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে কিরাত চৌরসেনাদের। চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাংয়ের ভারত বিবরণী থেকে জানা যায়, তিনি একবার গঙ্গা নদীপথে ডাকাতদের খপ্পরে পড়েছিলেন। সেই ডাকাতরা ছিল দুর্গা উপাসক।

zoom
হিউয়েন সাং

নর্ডিক-আর্যরা মহিষসাম্রাজ্য ধ্বংস করার জন্য অস্ট্রিকদের মাতৃকাশক্তিকে নিজেদের ভাষায় দুর্গা নামকরণ করে প্রক্সি-যুদ্ধে ব্যবহার করেছিল। আর সেখানেই মহিষাসুরকে হত্যা করা তাদের পক্ষে সহজ হয়েছিল। পূর্ব ভারতে আলপাইনদের সাম্রাজ্য ক্রমশ দখল করেন নর্ডিক আর্যরা। আলপাইন-সংস্কৃতি মুছে গিয়ে ধীরে ধীরে বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে নর্ডিক আর্য সংস্কৃতি। তাঁদের কাছে মহিষ হয়ে ওঠে বলির পশু। আর গরু তাঁদের কাছে প্রধান ভক্তির পাত্র, যা শুধু অবধ্য নয়, স্বয়ং ভগবতী বা আদি মাতৃকার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৫২: মহিষাসুর থেকে মহেশ্বর

পর্ব ৫১: পদবিতর্ক

পর্ব ৫০: পদ থেকে পদবি

পর্ব ৪৯: খিস্তি খেউড়ের ছড়া

পর্ব ৪৮: ভাঁজো আমাদের আদি কৃষি-লোকবিজ্ঞান

পর্ব ৪৭: মাঠ মাটি মানুষ

পর্ব ৪৬: গুজব কিংবা হুপুই: সে যুগের ‘ভাইরাল’

পর্ব ৪৫: সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো

পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা

পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম

পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি

পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ

পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য

পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা

পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল

পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর

পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি

পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়

পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার

পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

Aryans Bengal buffalo sacrifice Deity Durga Puja Indigenous Mahisasura Regional culture Rural Bengal Rural Culture Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on