


পশুপতি সিলে বাঘ হাতি জলহস্তী মহিষ ও হরিণ পরিবেষ্টিত এবং মাথায় মহিষের শিং-যুক্ত শিরস্ত্রাণ পরে ত্রিমুখী দেবতা যোগমুদ্রায় উপবিষ্ট। স্যর জন মার্শাল, সিলে খোদিত দেবতাকে অবৈদিক অন-আর্য সমাজের আদি শিব বা পশুপতি হিসাবে পূর্ণ মান্যতা দিয়েছেন। পশুপতির সঙ্গে অন্যান্য পশুদের উপস্থিতি থাকলেও মহিষের সম্পর্কটি যেন অধিক প্রকট হয়েছে।
প্রচ্ছদের ছবি: তায়েব মেহতা
৫২.
বনেদিবাড়ির দুর্গা-অঙ্গন। নবমীতে মোষবলির সাসপেন্স। দশখানা গাঁয়ের লোক ধেয়ে আসছে। দড়ি-টাঙানো বৃত্তের বাইরে ভিড়ের দাপাদাপি। মোষের সঙ্গে সেলফি তোলার হুজুগ। পুজো প্রায় শেষের দিকে। এক্ষুনি ঠাকুরমশাই নেমে আসবেন।
উন্মুক্ত তশলাই। পাশে বেলপাতার মালা পরে নিশ্চিন্তে জাবর কাটছে কিশোর মোষটি। কুচকুচে কালো রং। কপালে চওড়া করে সিঁদুর লেপা। মোষের পিছনে আঁকিবুঁকির মতো পড়ে আছে চার পায়ের চারটি ফাঁস-লাগানো দড়ি। কয়েকজন দশাসই মরদের অপেক্ষা। সামনে ‘নাকমুড়ো’ দড়া ধরে প্রতীক্ষা করছে পাড়ার মুরুব্বি। সহযোগিতায় বারমুডা পরা ছোকরাবৃন্দ। ঢোল-কাঁসিতে তখন ধীর লয়ে বাজছে:
খা-জিংজিং জিনাক জিজিং
লাগ জিংজিং ঝিনাক ঝাঁই।

জেলের ওয়ার্ড-মাস্টারের মতো পুরুত ঠাকুরের চোখের ইশারার চকিত নির্দেশ। দড়িগুলো তখন জীবন্ত সাপ। মারাত্মক বিপ্রতীপ ফাঁসি-টানে ভূমিস্পর্শ মহিষের সটান সরল অবয়ব। তার অস্ফুট মরণ আর্তনাদ। শেষ ছটফটানির কয়েকটা রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। বিদ্যুৎগতিতে ঘাতকের খড়গের চোখ দুটো ঝলসে ওঠে। গণস্বরে ‘জয় মা’ ধ্বনির সঙ্গে– ‘ঢিস-স!’
‘ধর্মের জয় আর অধর্মের বিনাশ।’ এক মহাজাগতিক আখ্যানের যেন চিরায়ত ক্লাইম্যাক্স।
ঢোলের বোলে তখন দ্রুতলয়ের পাগলামি। গোটা স্থানটি রক্তারক্তি। মোষের কাটামুণ্ডের জিভটি ভেংচি কেটে পড়ে রয়েছে অদূরে। বেলপাতায় কয়েক ফোঁটা রক্ত নিয়ে দেবীর চরণে উৎসর্গ করলেন ঠাকুরমশাই। কাটামুণ্ডটি মাথায় নিয়ে বাউরি পাড়ার যুবকটির তখন উদ্দাম-নৃত্য।

দেবতার সম্মুখে মহিষবলির ঐতিহ্য আজকের নয়। হরপ্পার একটি সিল-চিত্রে দেখা যায় ধ্যানমগ্ন পশুপতির সামনে বুনো-মহিষ হত্যার দৃশ্য। ঋকবেদের পঞ্চম মণ্ডলের ২৯ নং সূক্তের ৭-৮ ঋকে ইন্দ্রের উদ্দেশে ৩০০ মহিষবলির বিবরণ প্রমাণ করে, সিন্ধুসভ্যতার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য মহিষবলি আর্যরা গ্রহণ করেছিলেন। আর্যদের কাছে গরু ছিল ‘অঘ্ন্যা’ অর্থাৎ অবধ্য। আশ্বিন মাসের দুর্গাপুজোয় মহিষবলির যে বাস্তব অভিজ্ঞতা আজও বাংলায় বহমান– তার আদিমতম শিকড় রয়েছে হরপ্পা সংস্কৃতিতে।
মৃন্ময়ী দশভুজা দেবী দুর্গা। বাহন সিংহের উপর পা রেখে মহিষাসুর বধ করছেন। গলাকাটা মোষ থেকে বেরিয়ে এসেছে বীর মহিষাসুর। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। এক হাতে খড়গ। অন্য হাতে ঢাল। বুকে বাঁধা ‘ছন্নবীর’ বেল্ট। দেবীর ডাইনে বামে তাঁর দু’ জোড়া ছেলেমেয়ে। একপাশে লাজুকলতা ‘কলাবউ’। শিল্পীদের ভাষায় ‘সাত-পুতুলে’ প্রতিমা।
মূল প্রতিমা ‘তিনপুতুলে’ অর্থাৎ মহিষ-দুর্গা ও সিংহ। তিন-পুতুল কালক্রমে গ্রহণ-বর্জনের পর বর্তমানে পারিবারিক দুর্গা। কুষাণযুগ থেকে তিন-পুতুলে পাথুরে প্রতিমার দু’টি রূপ। দেবী শুধুমাত্র এক বুনো-মোষকে শূলবিদ্ধ করছেন। এর নাম ‘মহিষমর্দিনী’। নৃতত্ত্বের ভাষায় থেরিওমরফিক। অর্থাৎ মহিষাসুর সেখানে বুনো মোষ রূপে উপস্থাপিত।

পরের ধাপ অর্ধ-পশু ও মানবের সংমিশ্রণে সৃষ্ট অ্যানথ্রোপজুওমরফিক। এই রূপের দুর্গা প্যানেলের সন্ধান পাওয়া যায় মহাবলীপুরমে। গুহার উত্তরদিকের দেওয়ালে খোদিত প্যানেলে দুর্গা ও মহিষাসুরের বিখ্যাত যুদ্ধ দৃশ্যটি খোদিত হয়েছে। মহিষাসুর মানবমূর্তিতে উপস্থাপিত হলেও মুখটি মোষের। মোটামুটি গুপ্তোত্তর পর্ব থেকে এই ধারার মূর্তি দেখা যায়।
পাল-সেনযুগের দুর্গা-ভাস্কর্যে পুরোপুরি মানবাকৃতি মহিষাসুর। মোষের সঙ্গে সংযোগ বলতে তার কাটা গলা থেকে বেরিয়ে আসা কিংবা মোষ বিশ্লিষ্ট অ্যানথ্রোপমর্ফিক। দেবীর নাম ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। আরও এক ধরনের বিবর্তন আছে সেটা শেষে বলব। তার আগে মহিষাসুর-বধের ন্যারেটিভ কত পুরাতন তার হদিশ নেওয়া প্রয়োজন।
ভারতীয় ইতিহাস ধর্ম দর্শনে সাহিত্যে ও লোকায়ত-স্তরে মহিষ ও মহিষাসুর দুর্গার চেয়ে কম আকর্ষণীয় নয়। মহিষাসুর ও তার প্রতীক মহিষের প্রথম নামটি মেলে মহাভারত থেকে। তবে মহিষাসুর যে অথর্ববেদোত্তর যুগে বীর যোদ্ধার মর্যাদা পেয়েছিলেন– তা জানা যায় দেবসেনাপতি ধূর্তের সূত্রে (Ancient Indian Folk-cults, V S Agrawal, p. 69)। ধূর্তদেবতার একাধিক নাম ছিল– স্কন্দ, বিশাখা, উগ্রকুমার ইত্যাদি। বোঝা যায় কার্তিকের অপর নাম অথর্বোত্তরযুগে ছিল ‘ধূর্ত’। এই ‘ধূর্ত’ বা ‘কার্তিক’ প্রথম মহিষাসুর বধ করেন।

মহাভারতের বনপর্বের ২৩০ অধ্যায়ে (কালীপ্রসন্ন সিংহ অনূদিত) মহিষদৈত্য বা মহিষাসুরের প্রথম সাক্ষাৎ মেলে। দেবাসুরের যুদ্ধে মহিষাসুর এমন বিক্রম দেখিয়েছিল যে, যুদ্ধক্ষেত্রে দেবতারা তাঁকে দেখে ভয়ে পলায়ন করেন। দেবতাদের হতশ্রী অবস্থা দেখে স্বয়ং মহাদেবের আদেশে কার্তিক এসে দৈত্য-দানবদের হত্যা করে মহিষদৈত্যের সঙ্গে মহা সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। মহিষাসুরকে হত্যা করে সুরাসুরের যুদ্ধে তিনি জয় লাভ করেন। একইভাবে বামনপুরাণের ৫৯ অধ্যায়ে বা স্কন্দপুরাণে মহিষাসুর-মর্দনকারী হিসাবে খ্যাত হয়েছেন কার্তিক। বামনপুরাণ অনুসারে মহিষাসুরকে কার্তিক ক্রৌঞ্চপর্বতে হত্যা করেছিলেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কার্তিকের পরে দুর্গার প্রয়োজন পড়ল কেন? এর প্রধান কারণ মহিষাসুর বধের সঙ্গে আদি মাতৃকা-উপাসনা ও লৌকিক দেবী-সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্তিকরণ। দেবী দুর্গা আসলে আদিমাতৃকা শক্তি।
দ্বিতীয়ত, বামনপুরাণ প্রধানত শৈব ও বৈষ্ণবধর্মের মেলবন্ধনের ভিত্তিতে রচিত হয়েছিল। শাক্তরা ছিলেন উপেক্ষিত। তৃতীয়ত, মার্কণ্ডেয় পুরাণ মূলত শাক্তদর্শনের মহাগ্রন্থ। যে দর্শনের মূল ভিত আদিমাতৃকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সেই কারণে দুর্গা ন্যারেটিভের প্রয়োজন পড়েছিল। তবে আসল কারণ ভিন্ন।

পুরাণকাররাও সমস্যাটি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। সমস্যার সমাধানে কল্পভেদ-তত্ত্বের অবতারণা করেন। যেমন শ্বেতবরাহ কল্পে দেবতারা যখন অসুরদের কাছে পরাজিত হন, দেবী কাত্যায়ণী এসে মহিষাসুরকে বধ করেন। আবার অন্য এক কল্পে কার্তিক ক্রৌঞ্চগুহার যুদ্ধে মহিষাসুরকে হত্যা করেন।
পুরাণের কল্পভেদ থেকেই জানা যায়, মহিষাসুর-আখ্যান কত প্রাচীন। ঋকবৈদিক যুগে ‘অসুর’-এর অর্থ যেমন আলাদা ছিল, ‘মহিষ’-এর অর্থও বিপরীত ছিল।
বুনো মোষের শক্তি, প্রজনন ক্ষমতা, আক্রমণের মেজাজ, মহিষ-কেন্দ্রিক অর্থনীতির সমৃদ্ধি ইত্যাদির জন্য ক্রমশ রাজকীয় বৈভব ও শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। সেই কারণে বৈদিক ঋষিরা পশুটির নামকরণ করেছিলেন ‘মহিষ’, যার মূলে রয়েছে ‘মহ’ ধাতু– অর্থ: মহান বা ‘মাইটি ওয়ান’।
ঋকবেদে সোমরসকে বুনো মহিষের শিঙের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে; ‘শৃঙ্গং মহিষস্য’। ১০/১৮৯/৩ ঋকে সূর্যদেবতা সম্পর্কে বলা হয়েছে– ‘মহিষোদিবম’। ৯/৪৫/৪ ঋকে পর্বতের উচ্চ স্থানে মহিষের বিচরণের সঙ্গে তুলনা করা সোমরসকে। আর্যভাষার প্রাচীনতম এই নিদর্শনগুলিতে ‘মহিষ’ শব্দটি কোনও আসুরিক শক্তির প্রতীক ছিল না; বরং তেজোময় সূর্য, দেবায়ন সোমরসের রূপক ও উপমায় স্থান পেয়েছিল।

মাদী বুনো মোষ আরও হিংস্র প্রকৃতির। তাদের শারীরিক ক্ষমতা পুরুষ মোষের তুলনায় কম হলেও, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ভীষণ মেজাজি ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মোষের পালকে তারা নেতৃত্ব দেয়। দলের সুরক্ষা ও শিশুর প্রতিরক্ষায় সরাসরি যে কোনও ব্যক্তি বা পশুকে আক্রমণ করে। শক্তির অনুষঙ্গে এই কারণে রাজাদের প্রধান রানিকে ‘মহিষী’ বলা হত।
পুরুষ বুনো মোষ যেমন মহিষাসুরের প্রতীক, তেমনই মাদী বুনো মোষের প্রতিভূ তার বোন মহিষী। একই ধরনের ন্যারেটিভ দেখা যায় দক্ষিণ ভারতের মহিষী আয়াপ্পা পুরাণ-কাহিনিতে। ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ অনুসারে মহিষাসুর বধের পর তাঁর বোন মহিষী দেবতাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কঠিন সাধনায় মগ্ন হন। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মার কাছ থেকে মহিষী বরপ্রাপ্ত হলেন। একমাত্র হরি ও হরের মিলনজাত সন্তান ছাড়া কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারবেন না।
মহিষী নিশ্চিত ছিলেন হরি ও হর উভয়ে পুরুষ। সুতরাং তাঁদের মিলনজাত সন্তানের কোনও প্রশ্নই নেই। মহিষী, মহিষাসুরের থেকেও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে স্বর্গ দখল করতে উদ্যত হলেন। ছলনার মাস্টারমাইন্ড বিষ্ণু মোহিনীরূপ ধারণ করে শিবের সঙ্গে মিলিত হলেন। শিবের ঔরসে মোহিনীর গর্ভে এল সন্তান আয়াপ্পা। আয়াপ্পা, মহিষীর সঙ্গে ঘোর যুদ্ধ করে তাঁকে বিনাশ করলেন।

সংস্কৃত মহিষ ও মহিষী ছাড়াও প্রাগার্য বা কোলমুণ্ডা ভাষাগোষ্ঠীর মহিষের নাম ‘কাড়া’। আর্যদের আসার বহু পূর্ব থেকেই এদেশের মূলনিবাসীদের পরম উপকারী পশু কাড়া। জঙ্গলমহলে বাদনা পরবের গোরুখুটার মতো কাড়াখুটাও মানভূম বা পুরুলিয়ার জনপ্রিয় বিনোদন পশু-লড়াই।
শুধু আদিম পশুপালক গোষ্ঠীর সঙ্গে কাড়ার যোগ নেই, কাড়া দিয়ে জমি চষা বা মই দিয়ে মাটি পরিপাটি করা কৃষিকাজকে ‘কাড়ান’ বলে। পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে কাড়ার জুড়ি নেই। খনার-বচনে ‘কাড়ান’ শব্দটির ব্যবহার তাৎপর্যপূর্ণ–
আষাঢ়ে কাড়ান নামকে
শ্রাবণে কাড়ান ধানকে
ভাদরে কাড়ান শিষকে
আশ্বিনে কাড়ান কিসকে।
অর্থাৎ আষাঢ় শ্রাবণ ভাদ্রমাসে কাড়ার সাহায্যে চাষাবাদ হলেও কাড়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরয় আশ্বিনমাসে। খনার শেষ লাইনটি মোক্ষম টুইস্ট। এর থেকে প্রমাণিত হয়– মহিষাসুর বিজয়ের আখ্যানটি প্রাক-বৈদিক লোকায়ত কাড়া সংস্কৃতির। আশ্বিন মাসে কাড়ার শ্রমের উপযোগিতা ফুরতেই উচ্চবর্ণের বিজয় অভিযানের রাজনীতি। সুতরাং ‘আশ্বিনে কাড়ান কিসকে’র উত্তর লেখা আছে মহিষ-বলির রক্তের আখরে।

হরপ্পার পশুপতি সিলের যে দেবতাকে দেখা যায় তাঁর মাথায় মোষের জোড়া শিঙের এক অদ্ভুত শিরস্ত্রাণ আছে। তিনিও সর্বোচ মহৎ শক্তির আধার হিসাবে সিন্ধুবাসীদের কাছ সুপরিচিত ছিলেন।
অবশ্য এই শিরস্ত্রাণের মোটিফ প্রাক সিন্ধুসভ্যতার কোটডিজি খননে পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির মৃৎপাত্রে। গাঢ় কালো খয়েরি রঙে চিত্রিত বুনো মহিষের মস্তক এবং বাঁকানো শিং। শিংদ্বয়ের মাঝখানে ফ্লোরাল মোটিফ, যা মহেঞ্জোদারোর পশুপতি সিলের অবিকল আদিমতম রূপ।
পরবর্তীকালে এই অবৈদিক পশুপতি আর্যীকরণের মধ্য দিয়ে বৈদিক রূদ্রের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। তবে ‘মহিষ’ শব্দের আদিম অর্থটি (মহান, তেজোময়) ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাই পশুপতির অপর নাম ‘মহেশ’ বা ‘মহেশ্বর’।
মহেশ বা মহেশ্বরের সঙ্গে মহিষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখা গিয়েছে হরপ্পার পশুপতি সিলে। পশুপতি সিলে বাঘ হাতি জলহস্তী মহিষ ও হরিণ পরিবেষ্টিত এবং মাথায় মহিষের শিং-যুক্ত শিরস্ত্রাণ পরে ত্রিমুখী দেবতা যোগমুদ্রায় উপবিষ্ট। স্যর জন মার্শাল, সিলে খোদিত দেবতাকে অবৈদিক অন-আর্য সমাজের আদি শিব বা পশুপতি হিসাবে পূর্ণ মান্যতা দিয়েছেন (Mohenjo-Daro and the Indus Civilization, p. 54-55)। পশুপতির সঙ্গে অন্যান্য পশুদের উপস্থিতি থাকলেও মহিষের সম্পর্কটি যেন অধিক প্রকট হয়েছে।

মার্শালের মতে, পশুপতির মাথায় মহিষের জোড়া শিং থেকে কালক্রমে মহাদেবের আয়ুধ ত্রিশূলের উদ্ভব হয়েছে। একইসঙ্গে শিবের মাথায় অর্ধচন্দ্রের যে সংযোজন হয়েছে তার মূলেও রয়েছে জোড়া শিং। অন্যান্য দেবতাদের হাতে, বিশেষ করে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে শঙ্খ বা শাঁখকে দেখা যায়– কিন্তু শিবের হাতে রয়েছে মোষের শিং দ্বারা নির্মিত লোকবাদ্যটি।
ডি ডি কোসাম্বি তাঁর বিখ্যাত ‘মিথ অ্যান্ড রিয়েলিটি’ (পৃ. ২-৩) গ্রন্থে মহিষাসুর সম্পর্কে এক নতুন চমকপ্রদ ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন: মহারাষ্ট্রে লোকায়ত স্তরে পূজিত ‘মাসোবা’ বা ‘মহসোবা’ অর্থাৎ মহিষদেবতার পরিপ্রেক্ষিতে।
কোসাম্বি মহারাষ্ট্রের ধাংগর ও গাওয়ালিদের গ্রামদেবতা মহসোবা-র কথা এই প্রসঙ্গে লিখেছেন। ‘মহসোবা’ শব্দের অর্থ ‘মহিষ-পিতা’। এর লৌকিক উৎস হিসাবে কোসাম্বি লিখেছেন, মহসোবা হলেন আর্য পুরাণের মহিষাসুর। একইভাবে লোকায়ত স্তরে পূজিত দেবী পার্বতীর আরেক রূপ যোগেশ্বরী বাই বা যোগুবাই। মাসোবা ও যোগুবাই উভয়ে স্বামী-স্ত্রীর বন্ধনে পুজো পাচ্ছেন।

পুরাণসাহিত্যে বা ব্রাহ্মণ্যধর্মে মহিষাসুরকে শত্রু বানিয়ে দিলেও লোকায়ত স্তরে উচ্চবর্ণের আধিপত্যকে অস্বীকার করে প্রাচীন কাড়াদেবতা ও আদিমাতৃকা যোগেশ্বরীর মধ্যে তাঁরা পুনর্মিলন ঘটিয়েছেন। এটি যেন উচ্চবর্ণের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক নীরব দৈব প্রতিবাদ।
কোসাম্বি এই প্রসঙ্গে কালীঘাটের পটচিত্রে অঙ্কিত শিবের বুকে দণ্ডায়মান কালীর চিত্র সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কালীর পদতলে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা জড় শিবের চিত্র। কোসাম্বির বক্তব্য ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়: শিবের এই বিশেষ মূর্তিটি আসলে পুরাণের দেবী দুর্গার চরণে পদদলিত মৃত মহিষাসুরের প্রতীক।
এই ব্যাখ্যা যে কোনও কষ্টকল্পিত নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় পুরাণ ও তন্ত্রসাহিত্যে। কালিকাপুরাণের ৬০ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, মহিষাসুরের পিতা রম্ভাসুর ছিলেন শিবের পরম ভক্ত। তিনি দীর্ঘদিন শৈব-তপস্যা করে মহাদেবের কাছে বরপ্রাপ্ত হয়েছিলেন: শিব তাঁর পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করবেন। সেই বরের সূত্রে রম্ভাসুরের মহিষীর গর্ভে মহাদেবের অংশ মহিষাসুররূপে জন্মগ্রহণ করেন। অর্থাৎ পুরাণের বিচারে মহিষাসুর হলেন শিবের এক রূপ।
‘যোগিনীতন্ত্রম’ গ্রন্থের নবম পটলে শিব, দেবী পার্বতীকে জানিয়েছেন, মহিষাসুর তাঁর শক্তির জড়ীভূত রূপ। কালীবিলাসতন্ত্র মহিষাসুরকে শবরূপী সদাশিব বলেছে। দুর্গাপুজোর সময় মহিষাসুরের ধ্যানমন্ত্রে বলা হয়–
ওঁ মহিষস্তং মহাবীর শবরূপঃ সদাশিব।
অতস্ত্বং পূজয়িষ্যামি ক্ষমস্ব মহিষাসুর।

অন্ত্যমধ্য যুগে অনেক ধাতু ও পাথরের ভাস্কর্যে মহিষাসুরের মাথায় দু’টি শিং দেখা যায়। ক্ষেত্রসমীক্ষায় এই ধরনের একাধিক মূর্তি দেখেছি। এটি যেন মহিষাসুর মূর্তিতত্ত্বের চতুর্থ বা শেষ ধাপ অথবা ক্লাইম্যাক্স। প্রাক ইতিহাসের সেই অবদমিত অনার্য চেতনার মহাকাব্যিক সমাপতন।
কোসাম্বির মহসোবা ও আদিশিবের মেলবন্ধনকে এখানে প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণতা দিয়েছে। বুনো-মহিষ থেকে মানবাকৃতি মহিষাসুর হয়েছিল আর্য চেতনায়। কিন্তু বাংলার শিল্পী তাঁর মস্তকে ফিরিয়ে এনেছেন হরপ্পার পশুপতি সিলের মহিষের আদিম দ্বিশৃঙ্গ মুকুটটি।
[তশলাই– মহিষ বলির হাড়িকাঠ। নাকমুড়ো– মহিষ বা গোরুর নাকে ছিদ্র করে যে দড়ি পরানো হয়। ছন্নবীর– প্রাচীন যোদ্ধাদের ক্রস আকৃতির অলংকার।]
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ৫১: পদবিতর্ক
পর্ব ৫০: পদ থেকে পদবি
পর্ব ৪৯: খিস্তি খেউড়ের ছড়া
পর্ব ৪৮: ভাঁজো আমাদের আদি কৃষি-লোকবিজ্ঞান
পর্ব ৪৭: মাঠ মাটি মানুষ
পর্ব ৪৬: গুজব কিংবা হুপুই: সে যুগের ‘ভাইরাল’
পর্ব ৪৫: সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো
পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা
পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম
পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি
পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ
পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য
পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা
পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল
পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর
পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি
পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়
পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার
পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন
পর্ব ৩২: তালবাহার
পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা
পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ
পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়
পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?
পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved