Robbar

জগন্নাথের শবরযোগ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 15, 2026 1:51 pm
  • Updated:July 15, 2026 2:32 pm  

শবরদের ধর্ম-ভাবনায় ত্রিমূর্তির উপাসনা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ত্রিমূর্তি হলেন তানাপেনু, জাকেরিপেনু এবং মুরভিপেনু। শবর ভাষায় ‘পেনু’ শব্দের অর্থ ঈশ্বর। ওড়িশার শবর-প্রধান গ্রামগুলিতে জগন্নাথের নাম ‘জগনেলো’। শব্দটির অর্থ– কাঠের তৈরি দেবমূর্তি। শবর ভাষায় দেবতার নাম ‘সানাম’ এবং মূর্তিকে বলে ‘কিটুঙ্গা’। সকল কিটুঙ্গাদের মধ্যে জগনেলো হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি বিশ্বের অধিপতি হিসাবে বন্দিত।

স্বপনকুমার ঠাকুর

৪১.

মস্তক-বক্ষ সংলগ্ন। খণ্ডিত বাহু। খানিকটা ত্রিকোণাকার, চ্যাপ্টা, শীর্ষযুক্ত মস্তক। চক্ষুদ্বয় সমকেন্দ্রিক বৃত্ত। গাঢ় রক্তিম রেখায় হাস্যযুক্ত আস্য। ঘাড় ও কোমর অনুপস্থিত। লুপ্ত পদদ্বয়। মুখমণ্ডলে যেন গুপ্ত অঙ্গবিশিষ্ট নৃসিংহের চকিত আভাস।

আদিম লোকশিল্পের চিরায়ত বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর দারুব্রহ্ম জগন্নাথ। 

কৃষ্ণবর্ণের মুখমণ্ডল। অগ্রজ শ্বেতাভ বলরাম এবং হরিদ্রা বর্ণে রঞ্জিত ভগ্নী সুভদ্রা। পরিবার-কেন্দ্রিক দেবভাবনার সমুজ্জ্বল প্রকাশ।

কলিঙ্গের নীলাচল ছাড়িয়ে অঙ্গ-বঙ্গ এমনকী প্রায় সর্বত্র মূর্তিত্রয় জনপ্রিয়। জগন্নাথের রথযাত্রা দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত। আবেগে ভক্তিতে উচ্ছ্বাসে উৎসাহে লোকে লোকারণ্য। মহাধূমধামের চলচ্চিত্র। বাংলায় রথযাত্রা থেকেই আবার দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন শুরু।

জগন্নাথের রথযাত্রায় লোকারণ্য

ভগবান কৃষ্ণের জন্ম মথুরার কারাগারে। বেড়ে ওঠা বৃন্দাবনে। পরবর্তীতে তিনি দ্বারকার রাজা। অতর্কিতে তাঁর মহাপ্রয়াণ হল শবর জরা বা জরা ব্যাধের ভুলবশত তীর নিক্ষেপে। কান্নায় ভেঙে পড়া ব্যাধকে করুণাসিন্ধু কৃষ্ণ কৃপা করেছিলেন। পনেরো শতকে রচিত ওড়িয়া কবি সরলাদাসের আঞ্চলিক মহাভারত থেকে জানা যায় সেই ভক্তিপূত রোমাঞ্চকর আলেখ্য।

শ্রীকৃষ্ণকে চিতায় দাহ করার সময় দৈববাণী হয়েছিল তাঁর নাভি বা হৃদপিণ্ডটি যেন ভাসিয়ে দেওয়া হয় সাগরসলিলে। সেটি স্বর্গীয় নীল প্রস্তরখণ্ডে পরিণত হয়ে পুরীর সাগর-সৈকতে ভেসে আসে। শবররাজা স্বপ্নে দৃষ্ট নীল প্রস্তরখণ্ডকে সংগ্রহ করে ‘নীলমাধব’ নামে পুজো করতে শুরু করেন গভীর অরণ্যে।

স্কন্দপুরাণ ব্রহ্মপুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে জানা যায় আরও এক নাটকীয় ঘটনা। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নীলমাধবের অন্বেষণ করতে মন্ত্রী বিদ্যাপতিকে পাঠালেন নীলাচলে। তিনি অনুসন্ধান করে রাজাকে খবর দিতে যাওয়ার প্রাক্কালে প্রবল ঝড়ে বালিচাপা পড়ে যায় নীলমাধব। পরে স্বপ্নাদিষ্ট রাজা পুরীতে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সমুদ্রে ভাসমান নিমকাঠ থেকে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার বিগ্রহ তৈরি করে তথায় স্থাপন করেন এবং রাজকীয় পূজাপাঠের ব্যবস্থা করেন।

কান্টিলোর নীলমাধব মন্দির

জগন্নাথ কাল্টের অন্যতম প্রাচীন দেববিগ্রহ নীলমাধব। আদিতে এই মূর্তি কেমন ছিল তা জানা যায় না। কিন্তু ওড়িশার মহানদীর ডানতীরে অবস্থিত কান্টিলো জনপদের যুগ্মপাহাড়ে প্রাচীন নীলমাধবের বিগ্রহ ও মন্দির রয়েছে। পুরীর স্থাপত্যশৈলীর আদলে মন্দির গঠিত হলেও নীলমাধব চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি। প্রায় সাড়ে তিন ফুট উচ্চতার কালো কষ্টিপাথরে খোদিত বিষ্ণু সমপাদস্থানিক ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান। দু’পাশে লক্ষ্মী ও সরস্বতী। বিষ্ণুর উপরের হস্তদ্বয়ে শঙ্খ ও চক্র থাকলেও, নিচের দুই হাতে কোন আয়ুধ নেই। নীলমাধবের রথযাত্রা সম্পন্ন হয় রথসপ্তমীতে।

নানা লোককাহিনি তথা পৌরাণিক কাহিনিতে আবৃত নীলমাধব-জগন্নাথ বৃত্তান্ত। অথচ জগন্নাথের সঙ্গে শুধু কৃষ্ণকথা নয়। জড়িয়ে আছে বৈদিক দারুব্রহ্ম উপাসনা, প্রাচীন বিষ্ণুপূজা, রামায়ণ প্রসঙ্গ। শবরদের সঙ্গে অন্তর্লীন যোগ এবং বৌদ্ধসংস্কৃতি, তন্ত্রধর্মের জটিল অনুষঙ্গ। 

বৈদিক দারুব্রহ্ম আসলে প্রাগৈতিহাসিক বৃক্ষপূজার স্মৃতি।

বৃক্ষ আদি দেবতা। আদি মন্দির। আদি ধর্ম। আদি ব্রহ্ম। এমনই এক দারুব্রহ্মের বর্ণনা আছে ঋকবেদের দশম মণ্ডলের ১৫৫ নং সূক্তের তিন সংখ্যক ঋকে। দূর সমুদ্রে ভাসছে অলৌকিক স্বর্গীয় কষ্ঠ-খণ্ড। ঋষি-কবি লিখছেন, ওই অলৌকিক কাঠকে আশ্রয় করে ভবসিন্ধু অতিক্রম করা যায় অনায়াসে। কারণ তিনি ‘অপুরুষম’। 

‘অদো যদ্দারু প্লবতে সিন্ধোঃ পারে অপুরুষম।
তদা রভস্ব দুর্হনো তেন গচ্ছ পরস্তরম।’

বৃক্ষ উপাসনা, বিকানের চিত্র

অথর্ববেদের দশম কাণ্ডের চতুর্থ অনুবাকের প্রথম ও দ্বিতীয় সূক্তের নাম ‘স্কম্ভ’। ‘স্কম্ভ’ কথাটির অর্থ হল গাছের খুঁটি বা খাম। ঋকে বলা হয়েছে স্কম্ভদেবতা বিরাট পুরুষ। সনাতন। ব্রহ্মার পূর্ববর্তী জ্যেষ্ঠ ব্রহ্মা। এমন বিমূর্ত দারুদেবতার স্মৃতি রয়ে গেছে একালের চড়কগাছ কিংবা সেকালের যূপপূজার মধ্যে। প্রসঙ্গত, এই দারুব্রহ্ম নিয়েই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন বিখ্যাত ছোটগল্প ‘খুঁটি দেবতা’।

আদিম বৃক্ষদেবতা বা দারুব্রহ্মের স্বরূপটি উন্মোচিত হয়েছে ঋকবেদের দশম মণ্ডলের ৯০ নম্বর সূক্তে। তাঁকে বলা হয়েছে ‘বিরাট পুরুষ’। তাঁর সহস্র মস্তক, চক্ষু ও চরণ। তিনি বিশ্বজগতের স্রষ্টা। জগন্নাথের নবকলেবর অনুষ্ঠানে আলোচ্য পুরুষসূক্তটি উচ্চারিত হয়। এই বিরাট-পুরুষই হলেন ভাগবত-গীতায় বর্ণিত ‘পুরুষোত্তম’।

শ্রীমদ্‌ভাগবতগীতার ১৫-তম অধ্যায়ের ১৬-১৮ সংখ্যক শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, পুরুষ দু’ প্রকার– ‘ক্ষর’ অর্থাৎ ক্ষয়শীল এবং ‘অক্ষর’ অর্থাৎ অপরিবর্তনশীল। এর ঊর্ধ্বে রয়েছেন, ত্রিলোকব্যাপ্ত অবিনাশী পরমাত্মা ‘পুরুষোত্তম’ এবং সেই পুরুষোত্তম স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। পুরীর শ্রীক্ষেত্র হল পুরুষোত্তমের আবাস। অর্থাৎ প্রাচীন বিষ্ণু বা কৃষ্ণক্ষেত্র। পুরুষোত্তমপুরী হিসাবে নীলাচল-মাহাত্ম্য স্কন্দপুরাণের বৈষ্ণবকাণ্ডের ৫৬ অধ্যায় এবং ব্রহ্মপুরাণের ৪২-৬৯ অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

ওড়িশার চিত্রে কৃষ্ণ ও বলরাম

আদিম বৃক্ষ-উপাসনা বা দারুব্রহ্মের সূত্র ধরেই শবরদের সঙ্গে জগন্নাথের যোগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শবর অরণ্যে বসবাসকারী অতি প্রাচীন জনজাতি। তাঁদের ঐতিহ্যপূর্ণ সংস্কৃতি হিন্দু বা বৌদ্ধধর্মে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। যেমন তাঁদের কাছ থেকে হিন্দু বৌদ্ধরা পর্ণশর্বরী দেবীকে গ্রহণ করেছেন। শবরদের স্মৃতিবাহী শাবরোৎসব একসময় দুর্গাপুজোর অন্যতম পালনীয় আচার-কৃত্য ছিল। 

কিন্তু শবরদের আদি পরিচয় তাঁরা বৃক্ষ-উপাসক। যে বৃক্ষকে তাঁরা পূজা করেন তার অপ্রয়োজনীয় ডালপালা কেটে দু’টি শাখা-সহ কাণ্ডটি হয়ে ওঠে আরাধ্য দেবতা। জগন্নাথের মূর্তিটি যেন গাছের কাণ্ডের মতো। দু’টি শাখা যেন জগন্নাথের অসমাপ্ত হাত। মুখমণ্ডল খোদাই করা নয়, অঙ্কিত। 

শবরদের ধর্ম-ভাবনায় ত্রিমূর্তির উপাসনা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ত্রিমূর্তি হলেন তানাপেনু, জাকেরিপেনু এবং মুরভিপেনু। শবর ভাষায় ‘পেনু’ শব্দের অর্থ ঈশ্বর। ওড়িশার শবর-প্রধান গ্রামগুলিতে জগন্নাথের নাম ‘জগনেলো’। শব্দটির অর্থ– কাঠের তৈরি দেবমূর্তি। শবর ভাষায় দেবতার নাম ‘সানাম’ এবং মূর্তিকে বলে ‘কিটুঙ্গা’। সকল কিটুঙ্গাদের মধ্যে জগনেলো হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি বিশ্বের অধিপতি হিসাবে বন্দিত।

‘জগন্নাথ’ নামটি অর্বাচীন নয়। বাল্মিকীর রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের ১০৮ সর্গের ২৯ সংখ্যক শ্লোক থেকে জানা যায় জগন্নাথ, ইক্ষ্বাকু বংশের কুলদেবতা ছিলেন। শ্রীরামচন্দ্র তাঁর অন্তিমযাত্রার প্রাক্কালে বিভীষণকে বলেছিলেন, ইক্ষ্বাকু বংশের কুলদেবতা জগন্নাথের প্রতি একনিষ্ঠ থাকার কথা।

‘আরাধ্য জগন্নাথম ইক্ষ্বাকু কুলদৈবতম।
আরাধ্যং সর্বলোকস্য তং ত্যজস্ব ন কাঞ্চন।।’

পুরীর জগন্নাথ, আঠেরো শতকের চিত্র

যদিও পুরীর জগন্নাথের সঙ্গে ইক্ষ্বাকু বংশের কুলদেবতা জগন্নাথের কোনও গূঢ় যোগ আছে কি না, তা গবেষণা-সাপেক্ষ বিষয়। তবে পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডের দ্বাদশ অধ্যায় থেকে জানা যায়, রামচন্দ্র অশ্বমেধ যজ্ঞের সময় যে অশ্ব ছেড়েছিলেন– তার দেখভালের দায়িত্ব পড়েছিল ভ্রাতা শত্রুঘ্নর ওপর। শত্রুঘ্ন অযোধ্যার প্রবীণ মন্ত্রী সুমন্ত্র বা সুমতি-সহ সুদীর্ঘ যাত্রাপথে একসময় সমুদ্রের পূর্ব উপকূলে এসে পৌঁছন এবং ‘পুরুষোত্তমের গুপ্ত আবাস’ নীলাচলে দর্শন করে কৃথার্থ হয়েছিলেন। নীলাচল পুরী যে আদিতে বিষ্ণুক্ষেত্র ছিল– এখান থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যায়।

নীলাচল বা নীলাদ্রি পাহাড় বা পর্বতের নাম। কিন্তু পুরীতে কোনও পর্বত নেই। গবেষকদের একাংশের মতে ক্ষয়িত নীলাচল পর্বতের ওপরেই জগন্নাথের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ঠিক যেমন তারাপীঠের আরাধ্যা তারা-মায়ের মন্দির আসলে ক্ষয়প্রাপ্ত পাহাড়ি টিলার উপর প্রতিষ্ঠিত বলে দাবি করেছেন ঐতিহাসিক অতুল সুর। তিনি ‘বাংলা ও বাঙালির বিবর্তন’ গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লিখেছেন– ‘পুরানো রেকর্ড থেকে জানা যায় তারাদেবীর মন্দির একটি ক্ষুদ্র পাহাড়ের উপর অবস্থিত।’ (পৃ. ১২৬)

বৌদ্ধসংস্কৃতিতে জগন্নাথ বিতর্কিত দেবতা। বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের আদিগ্রন্থ ‘জ্ঞানসিদ্ধি’-তে জগন্নাথকে ‘সর্ববুদ্ধময়’ বলে বন্দনা করা হয়েছে। দশাবতারমালায় নবম অবতার বুদ্ধের পরিবর্তে জগন্নাথও আছেন। বৌদ্ধধর্মের মূল লক্ষ্য মোক্ষলাভের জন্য ত্রিরত্ন অর্থাৎ বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘকে অনুসরণ করা। অনেকে বলেন– জগন্নাথ ‘বুদ্ধ’, ‘ধর্ম’ সুভদ্রা আর ‘সঙ্ঘ’ হলেন বলভদ্র। জগন্নাথ সুভদ্রা বলরাম বৌদ্ধ-ত্রিরত্নের প্রতীক।

বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের সঙ্গে জগন্নাথের যোগ আছে বলে মনে করা হয়

হান্টার সাহেব, কানিংহাম প্রমুখ গবেষকদের মতে, চৈনিক পরিব্রাজক ফা-হিয়েন কথিত প্রাচীন দন্তপুর আসলে পুরীধাম। কুশীনগরে বুদ্ধদেবের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়ে একটি দন্তধাতুমূল কলিঙ্গ প্রদেশের এক স্থানে সংরক্ষিত হয়। স্থানটির নামকরণ হয়েছিল দন্তপুর। তৎকালীন রাজা বুদ্ধদেবের পবিত্র দাঁতকে কেন্দ্র করে স্তূপ ও বৌদ্ধমন্দির নির্মাণ করেন। কিন্তু পার্শ্ববর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী রাজাদের আক্রমণের ভয়ে সেই দাঁতটি জগন্নাথের শরীরের অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল সাময়িকভাবে এবং পরে সেটি শ্রীলঙ্কায় স্থানান্তরিত হয়েছিল। যদিও এই মতের অনেকেই বিরোধিতা করেছেন, বিশেষ করে দন্তপুরের সঠিক স্থান নির্ণয়ের প্রেক্ষিতে।

গবেষকদের একাংশের মতে, জগন্নাথের নবকলেবর অনুষ্ঠানে যে ব্রহ্মপদার্থ বিগ্রহের অভ্যন্তরে রাখা হয়– তা বুদ্ধের দন্ত রাখার অনুকরণ মাত্র। একসময় বুদ্ধের দাঁত নিয়ে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হত, যা পরবর্তীকালে জগন্নাথের রথযাত্রায় রূপান্তরিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়। প্রসঙ্গত, কলকাতা জাদুঘরে বুদ্ধদেবের একটি দাঁত সংগৃহীত আছে। 

জগন্নাথের রথযাত্রা বৌদ্ধদের থেকে অনুকৃত নয়, বরং বৌদ্ধরাই হিন্দু দেবদেবীর রথযাত্রাকে অনুকরণ করেছিলেন। প্রাচীন জৈন সাহিত্য থেকে জানা যায়, জৈন তীর্থংকর মহাবীর যখন শ্রাবস্তী নগরীতে অতিবাহিত করছিলেন, তখন আশ্বিন পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত দেবসেনাপতি কার্তিকের জমজমাট রথযাত্রা দেখে তিনি চমৎকৃত হন। (Life in Ancient India, p. 321) মহাবীর ও বুদ্ধদেব প্রায় সমকালীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

ওড়িশার পটচিত্রে জগন্নাথ

জগন্নাথ সংস্কৃতি এতই প্রাচীন যে তার উপর যে নানা ধর্মের প্রভাব পড়বে সন্দেহ নেই। জগন্নাথকে ঘিরে শাক্ত তথা তান্ত্রিক ধর্মের বিকাশ ঘটেছে। পুরীধামের পীঠাধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন মা বিমলা। তাঁর ভৈরব হলেন জগন্নাথ। বিভিন্ন ধর্মের প্রভাব জগন্নাথ-কাল্টের চলমানতা ও ভারতীয় সমাজজীবনে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাকে বাড়িয়ে তুললেও তাঁর উৎস প্রাচীন বৃক্ষ উপাসনার মধ্যে নিহিত আছে।

বাংলায় জগন্নাথের সঙ্গে যোগ যে প্রাক্-চৈতন্যযুগ থেকে তৈরি হয়েছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় দু’টি প্রাচীন জগন্নাথ বিগ্রহ থেকে। একটি হল বহুল প্রচারিত মাহেশের ও অপরটি হল স্বল্প-প্রচারিত শাঁখাই গ্রামের একক জগন্নাথ বিগ্রহ। আকনা মাহেশ এবং শঙ্খধ্বনি ঘাট– দু’টি নাম কৃত্তিবাসের রামায়ণ পাঁচালির আদিখণ্ডে ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন বৃত্তান্ত উপলক্ষে উল্লিখিত হয়েছে। 

মহেশের জগন্নাথ সম্পর্কে জনশ্রুতি হল– ধ্রুবানন্দ নামে পরিব্রাজক সন্ন্যাসী পুরীতে জগন্নাথ দর্শন করে বাংলায় জগন্নাথ বিগ্রহ স্থাপন করেছিলেন। পরে দ্বাদশ গোপালের অন্যতম কমলাকর পিপিলাই জগন্নাথের সেবা পেয়েছিলেন। অভিরামদাসের পাটপর্যটন থেকে জানা যায়, কমলাকর একসময় মাহেশ পরিত্যাগ করে পূর্ব বর্ধমান জেলার জাগেশ্বর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। 

‘আকনা মাহেশে জন্ম জাগেশ্বরে স্থিতি।
কমলাকর পিপিলাই এই সে নিশ্চিতি।।’

রাধামাধবের সঙ্গে থাকেন শাঁখাইয়ের জগন্নাথ

আজও তাঁর বংশধরেরা জাগেশ্বর গ্রামে বসবাস করছেন এবং একক জগন্নাথের সেবা করেন।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে রচিত ওয়ার্ড সাহেবের হিন্দু গ্রন্থ (১৮১৮, পৃ. ১৬৫) থেকে জানা যায়, মাহেশের রথ ছিল ৩০ থেকে ৪০ হাত উঁচু। জগন্নাথের মাসির বাড়ি ছিল রাধাবল্লভমন্দির। মাহেশের জমজমাট মেলার কথা জানা যায় ওয়ার্ড সাহেবের লেখা ও বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারানি’ উপন্যাস থেকে।

শাঁখাই গ্রামটি অজয়-গঙ্গার সম্মিলনস্থলের নিকটবর্তী প্রাচীন জনপদ। এখানে নানা দেবদেবীর মন্দির ছিল– শঙ্খেশ্বর শিব, শঙ্খেশ্বরী দেবী এবং একক জগন্নাথ দারুবিগ্রহের মন্দির ইত্যাদি। নিত্যানন্দের দৌহিত্র প্রেমানন্দ গোস্বামী রাজস্থানের অম্বর থেকে রাধামাধব যুগল-বিগ্রহ লাভ করে শাঁখাইগ্রামের জগন্নাথ মন্দিরে স্থাপন করে সেবাকার্যাদি চালাতে থাকেন। পরে জগন্নাথের মন্দির নদীগর্ভে বিলীন হলে জগন্নাথ-সহ রাধামাধব বিগ্রহ অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। জগন্নাথ বর্তমানে রাধামাধবের সঙ্গেই নিত্য পূজিত হচ্ছেন। তাঁর নিজস্ব কোনও রথযাত্রা বা উৎসবাদি নেই।

বিষ্ণুধর্মোত্তর উপপুরাণের তৃতীয় খণ্ডের ১১৭ অধ্যায়ের দেবযাত্রা বিধি থেকে রথযাত্রা সম্পর্কে আকর তথ্যাদি মেলে। এখান থেকে জানা যায়, প্রতি বছর নির্দিষ্ট দিনে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিবিধ দেবতার রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হত ভারতে। বেশ কয়েকদিন ধরে রথযাত্রা পালিত হত। নির্দিষ্ট দেবতার নির্দিষ্ট তিথি ছিল রথযাত্রার। যে দেবতার তিথি জানা যেত না, তাঁর রথযাত্রা হত পূর্ণিমার দিনে। বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের রথযাত্রা যে কোনও মাসের পূর্ণিমাতে অনুষ্ঠিত হত।

পুরাতন চিত্রে রথযাত্রা, ১৮৫৭

বাংলায় রথযাত্রার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে কোনও তথ্যাদি পাওয়া না গেলেও রথকে কেন্দ্র করে হেমাশ্বরথ মহাদান যজ্ঞের কথা জানা গিয়েছে। রাজা লক্ষ্মণসেনের তর্পণদিঘি তাম্রশাসনে সোনার তৈরি ঘোড়ায় টানা রথের দান-যজ্ঞের কথা উল্লেখ আছে।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলি অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য

পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা

পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল

পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর

পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি

পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়

পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার

পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প