


আমাদের দেশ, ভাষা, জাতীয় পরিচয় সবকিছুর উদ্ভব হয়েছে– মাঠ ও কৃষি সংস্কৃতি থেকে। আবুল ফজলের ‘আইন ই আকবরী’ থেকে জানা যায়, জমির সীমানা জ্ঞাপক ‘আল’ ক্রমশ ব্যাকরণের প্রত্যয় হয়ে বঙ্গীয় শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। ফলে ‘বঙ্গ’ হয়ে ওঠে ‘বঙ্গাল’, ‘বঙ্গালদেশ’। বঙ্গাল নামে এক কবিরও সন্ধান মেলে প্রাচীন সাহিত্যে।
৪৭.
গ্রাম আর মাঠ। একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, অর্ধনারীশ্বর। গ্রাম বসতভূমি। মাঠ অন্নদাতা। চাষি, মুনিশ, রাখাল-বাগালের চিরায়ত কর্মক্ষেত্র।
প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে, ‘কর্ষিত-ভূমি’ শুধু শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়। প্রজনন, উর্বরতা, সৃজনীশক্তি ও নারীগর্ভের প্রতীক। মনুসংহিতার নবম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, নারী– ক্ষেত্র বা জমি; পুরুষ– বীজ স্বরূপ। স্বায়ম্ভূব মনু ১২ প্রকার সন্তানের মধ্যে ক্ষেত্রজ সন্তানকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। সুতরাং মহাভারতের ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডু প্রমুখদের একালের আইনি বা সামাজিক বিচারে ‘বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে’র সন্তান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেকালের বিচারে সমাজ-মান্য, আইন-সম্মত ‘ক্ষেত্রজ-সন্তান’।
নারী যে ক্ষেত্রস্বরূপা তা লোককবিও গেয়েছেন,
নাগর কোথায় রৈলা রে–
জল লেগেছে তোমার বাকুড়িতে।

জমির পারিভাষিক শব্দ ‘বাকুড়ি’ নারী-গর্ভ-মূলের প্রতীক। ‘বাকুড়ি’ শব্দের অর্থ এক লপ্তে দীর্ঘ জমি। প্রসঙ্গত, অনেকের মতে, বাঁকুড়া (জেলা) শব্দের মূলে রয়েছে বাকুড়ি।
খেতিজমি ক্রমশ লোকায়ত চৈতন্যের জীবন্ত আধার হয়ে ওঠে। খেতের শিরা-উপশিরা পথে আলপথে ছড়িয়ে আছে পূর্বপুরুষদের শ্রম-সংস্কৃতির খতিয়ান। কত ‘রক্তে রোয়া ধানে’র ইতিবৃত্ত। অজস্র লোক-ইতিহাস আর লোকগাথার চারণ-ক্ষেত্র। আবার গীতিনিষিক্ত আউল, বাউল, টুসু, ভাদুগান, মেয়েদের ‘মাঠালগান’ রচনা করেছে মেঠো সংস্কৃতির বুনিয়াদ। আষাঢ়ের ধারাস্নাত চাষি যখন জমি চষতে চষতে উদাত্ত গলায় গান করেন তখন মাঠ হয়ে ওঠে ‘সুরের জলসাঘর’।
‘তমালতালবনরাজিনীলা’ আভাসিত ছায়ার ঘোমটা-টানা পল্লি। উপকণ্ঠে সবুজ মেখলার মতো দো-জমি। আউসধান আলু আখ সরষে গমক্ষেত। তারপর আদিগন্ত তরঙ্গায়িত আমন ধানের জমি। কত তার নাম। যেমন– ‘উনিয়ে-মাঠ’, সর্বদাই জলে আর্দ্র। চাষিরা বলেন, ‘মরা নদীর আশীর্বাদ’। ‘জোলের জমি’ অর্থাৎ দু’পাশে উঁচু ভূমির মাঝে নিচু জল-গড়ানো সুবিস্তৃত ভূমণ্ডল। অপর নাম ‘মেটেল-ভুং’। সামান্য পলি আর এঁটেলমাটির অদ্বৈত অবয়ব। তবে আমন-শ্রেষ্ঠ শালিধানের যথার্থ গর্ভক্ষেত্র। সোনা ফলে বলেই সেটেলমেণ্ট রেকর্ডে মেটেলের পরিচিতি ‘শালিসুনো’। বর্ষায় মোম-মসৃণ। প্রখর গ্রীষ্মে কড়া ফাটের মানচিত্র। চাষিরা ছড়া কাটেন–
আষাঢ়ে মেটেল মোম।
চৈত্রে টনকা যম।

‘টনকা’ রাঢ়ের নিজস্ব ভূমি-দর্শন। কর্কশ, অনুর্বর, পাথুরে, কঠিন নীরস মাটি। চূড়ান্ত রূপ ‘টোংরা’ বা ‘ব্রহ্মডাঙা’। ব্রহ্মডাঙার মাটিতে কোদাল চালালে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে চাষিরা হুঁশিয়ার থাকে। এসব মূলত অনাবাদী খেত। অপর নাম খিলভূমি। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চণ্ডীমঙ্গলকাব্যে লিখেছিলেন, ‘খিল ভূমি লিখে নাল’। খিলভূমি অনাবাদী হলেও সাহিত্যে সৃজনশীল। মূল গ্রন্থের পরিশিষ্ট কিংবা অতিরিক্ত বিষয়সজ্জাকে বলে ‘খিল’। যেমন ঋকবেদের শ্রীসূক্ত কিংবা মহাভারতের ‘খিল হরিবংশ’।
লালমাটিতে বন্যার ফলে খাঁজকাটা ক্ষয়ভূমির পরিচিতি ‘খোয়াই’। অনুর্বর, রুখাসুখা যেন ‘হাড় বেরুনো খেজুর’গাছ। বীরভূম বর্ধমান বাঁকুড়া অঞ্চলে খোয়াই মৃত্তিকার দেখা মেলে। বোলপুর শান্তিনিকেতনের আশপাশের খোয়াইয়ের সৌন্দর্য রবীন্দ্রনাথকে মুগ্ধ করেছিল। তাঁর বহু লেখায় খোয়াই স্বমহিমায় ভাস্বর। নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেইজ কিংবা বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের শিল্পকর্মে অন্যতম উপাদান– খোয়াই। রাঢ়ের খিল, টোংরা-ব্রহ্মডাঙা ও ‘খোয়াই’ মাটির বুক চিরে বহমান রবীন্দ্রনাথের প্রিয় নদী কোপাই।

নদীসংলগ্ন পলিমিশ্রিত বেলেমাটির ‘লয় ও বাওড়’ জল-সোহাগী তেপান্তর। কীর্তিনাশা নদী অতীতে গ্রাম গিলে নিয়ে অথবা লয় করে সময়ান্তরে উগলানো বিশেষ উর্বরতার প্রতিদান। লয়ের মাটি কাঁচা সবজির আঁতুরঘর। বাওড়ের জলাভূমিতে আধডোবা পাটখেতের সৌন্দর্য, বিশেষকরে হু-হু গ্রীষ্মে তার যৌবনের মাদকতা যেন সবুজ-বাংলার প্রচ্ছদ। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছিলেন–
কাজলা সবুজ কাজল পরে
পাটের জমি ঝিমায় দূরে।
তবে ‘মাঠের-রাজা’র দিগন্ত জোড়া শাসন। কয়েক কিমি জুড়ে লম্বাটে শরীর। প্রখর গ্রীষ্মে ভয়াল রূপ। চারদিক খাঁ খা করে। শূন্যতার প্রতিমূর্তি। দুপুরে ক্রুদ্ধ কাপালিক। দূর থেকে দেখলে দু’চোখে মরীচীকা। যেন মাঝখানটা বিদীর্ণ করে উত্তাপের চকচকে ঢেউ-তাত উঠছে অনবরত। মাঝে মাঝে খড়কুটোর ঘূর্ণি কোনাকুনি পাক খায়। চাষিরা বলে, ‘বাওরা ভূতের দুপুর মাতানি’, তফাত যাও!

‘ডাইনি’ গল্পে তারাশঙ্কর লিখেছিলেন, এমন নিদাঘক্লিষ্ট ‘ছাতিফাটার মাঠে’র করুণ কাহিনি। এমন ধরনের দীর্ঘ বিস্তারিত মাঠ থেকে যেমন রূপকথার ‘তেপান্তর’ এসেছে, তেমনই রাঢ়ের জাতীয় কাব্য ধর্মমঙ্গল ও শূন্যপুরাণের ‘শূন্যতা’ তথা নিরঞ্জনের দর্শন ভাবনায় কবি-কল্পনাকে জাগ্রত করেছে।
আবার শরতে সেই মাঠ রূপবতী কন্যে। আলপথে কাশফুলের ঢেউ। ভোরের লাল-আভায় লজ্জাবতী বধূ। হেমন্তে শিশির-স্নিগ্ধ হৈমবতী। সোনার সীতা। ধানকাটার পর ধানের আঁটি সাজানো হলে সমগ্র শস্যখেত যেন ছন্দোময় রামায়ণ।
এসব মাঠের আলাদা নাম, আলাদা গল্প। ‘দিকশুনে’ অর্থাৎ দৈর্ঘ্যে এতই বড় যে মেঠো-পথিকের দিক ভ্রম ঘটায়। এক প্রান্তে গ্রাম্য শ্মশান। ভৌতিক আবহের জীবন্ত সত্তা। যকা-যকি, পেত্নিজলা অথবা ভূষণ্ডির মাঠে শুধু ধান ফলে না, জনশ্রুতি ও কিংবদন্তীর ফসলে টইটুম্বুর।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল মেঠো দস্যু-সংস্কৃতির লোকগাথা। তবে ‘রূপকথা শোনা নিভৃত সন্ধ্যাবেলা’র রোমাঞ্চকর স্মৃতি নয়। মাঠের রূঢ় বাস্তবতা। প্রাচীন ও মধ্যযুগে আট-দশ কিমি কিংবা ততোধিক লম্বা-চওড়া প্রান্তরের আলপথ ধরে পথিকেরা যাতায়াত করতেন গ্রামান্তরে, মফস্সলে। অবস্থার সুযোগ নিয়ে সেকালে নানা নামের ডাকাতরা অপেক্ষা করতো। ঠগী, গর্দানমারী, মানসুরে, ঠ্যাঙারে, ভাগিনা, কলকাটা ইত্যাদি। বিস্মৃত অতীতের রোমাঞ্চকর সব দস্যু রত্নাকর।

মাঠপুকুরে বা বিলের প্রান্তে তাদের ঠেক। সরানের পাশে ঝোপঝাড় থেকে কিংবা গাছের মগডালে চড়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর রাখত। অতর্কিতে ‘হা রে রে রে’ করে ঝাঁপিয়ে পড়ত অসহায় পথিকের ওপর। কিংবা দমাদম ফাবড়া লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সর্বস্ব হরণ করত। শেষে গর্দান বা গলা কেটে আরাধ্য কালীমায়ের কাছে পুজো-সহ বলি দিত। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত মাঠকালী বা ডাকাতকালীর বিশেষ নৈশ-পুজোর উপচারে আজও অতীত যেন বর্তমানের সামনে এসে দাঁড়ায়।
উদাহরণও কম নেই।
কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী ডিহিদার মামুদ শরীফের অত্যাচারে জন্মভূমি দামুন্যা গ্রাম পরিত্যাগ করে যখন মেদিনীপুরের দিকে যাচ্ছিলেন তখন ভেলিঞা গ্রামে (মাঠে) ডাকাত রূপ রায় তাঁর সর্বস্ব হরণ করেছিল। কোনওক্রমে তিনি বেঁচে যান। যদু কুণ্ডুর (তিলি জনজাতি) সহৃদয় আপ্যায়নে তাঁর বাড়িতে কবি তিনদিন কাটিয়ে ধাতস্থ হন।
শ্রীশ্রীসারদা মা উনিশ শতকের সাতের দশকে কামারপুকুর তারকেশ্বরের নিকটবর্তী তেলোভেলো মাঠে ভীম ডাকাতের পাল্লায় পড়েছিলেন। মায়ের কৃপায় ভীমের নবজন্ম হয়েছিল। মুকুন্দের কাব্যে উল্লিখিতি তিলি এবং ভেলিঞা অনেকের মতে ‘তেলোভেলোর মাঠ’। কিন্তু দু’টি স্থান ভৌগোলিক দিক থেকে পৃথক হলেও তেলোভেলোর মাঠে ডাকাতকালী বাঁচিয়ে রেখেছে ভীম ডাকাতের স্মৃতিকে।
গলসির চান্না থেকে ভাতার থানার ওড়গ্রামের জঙ্গল অধ্যুষিত নির্জন প্রান্তরে শাক্ত পদকর্তা কমলাকান্ত ভট্টাচার্যকে স্থানীয় বিশে ডাকাত আটক করেছিলেন। সাধকের কণ্ঠ নিঃসৃত মাতৃসংগীত তার পাষাণ হৃদয় ফাটিয়ে মুক্ত করেছিল মানবিকতার মুক্তধারা। নরজার গর্দানমারী মাঠের ডাকাতদের ভয়ানক আড্ডাকে বাঁচিয়ে রেখেছে লোকপ্রবাদ।
যদি পেরুলি নরজা
হাত পা ধুয়ে বাড়ি যা।

অট্টহাসের (কেতুগ্রাম-নিরোল) গর্দানমারীর কুখ্যাত নায়ক রঘুর নরবলির আসক্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, নিজের সন্তানকে বলি দিয়ে দেবীর কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাটোয়ার কুখ্যাত ঠগীদস্যু নিজের জামাইকে পথচারী ভেবে হত্যা করে বসে। একসময় তীব্র অনুশোচনায় পাগল হয়ে সেই রাস্তায় ঘুরত। ‘জামাইমারি সরান’ নামটিতে আজও জীবন্ত হয়ে আছে সেই লৌকিক ট্রাজেডি।
সাড়ে তিন দশকের গ্রামসমীক্ষায় মাঠের যেসব নাম পেয়েছি তার তালিকা করলে কয়েকটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যেতে পারে। দেবদেবীর নামাঙ্কিত– লক্ষ্মীজোল, গৌরাঙ্গবেড়া, রামসীতা; যুদ্ধভিত্তিক বা ঐতিহাসিক– তুড়ুক, ফাঁসিডাঙা, বর্গিডাঙার মাঠ; লৌকিক ট্রাজেডি, নরবলির স্মৃতি সম্বলিত ক্ষীরগ্রামের নরবাঁধা হা-পানিয়া; দস্যু বা বীরত্বগাথা, অলৌকিক, অপদেবতা এমনকী ব্যক্তিনামেও আছে– খাঁ-বাগরার মাঠ।
বাংলা সাহিত্যেও মাঠের গল্প কম নেই। জসীমউদ্দিনের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’, বিভূতিভূষণের কচুচুষি অথবা বউচণ্ডীর মাঠ উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অনেক স্থানে জড়িয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক লোকদেবীর স্মৃতি। লোকমুখে যার পরিচিতি ‘ঢেলামারি মাঠ’। কেতুগ্রামের বহড়ান গ্রামে আজও সেই থান টিকে আছে।

ঢেলামারি দেবতা দু’ ধরনের। স্ত্রী-দেবতা হিসাবে চণ্ডীর সঙ্গে সংযুক্ত। তখন তিনি ঢেলাইচণ্ডী। ঢেলামারি প্রকৃতিগতভাবে ‘বন্য প্রান্তর’। পথিকরা রাহাজানি, বাটপারি বা হিংস্র প্রাণীর আক্রমণের ভয়ে প্রান্তর-দেবতার উদ্দেশে যাওয়া-আসার সময় দু’টি ঢিল নিক্ষেপ করতেন। মূর্তি নেই, ঢিলের স্তূপমাত্র। বছরে একবার ধূমধাম করে পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসীরা আজও পুজো দেন।
চষাজমির ঢেলা নিয়ে ‘মাঠ-পালুনি’ লোকব্রত পালিত হয় রাঢ় অঞ্চলে। অনেক স্থানে ‘গিন্নিপালুনি’ নামেও পরিচিতি। ফাল্গুনমাসের শুক্লপক্ষের শনি বা মঙ্গলবারে গিন্নিরা খাবারদাবার ও কুলো নিয়ে মাঠে যান। চষাজমির ঢেলা একস্থানে সংগ্রহ করে নিজেদের মতো পুজো করেন। পুজোর সময় কুলো বাজান একসঙ্গে। কাঁচামাটির পুতুল তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে অর্পণ করে সন্ধের দিকে বাড়ি ফিরে যান। কর্তা আলো জ্বেলে অপেক্ষা করেন বাড়ির দুয়ারে। কর্তা ও গিন্নি তখন অদ্ভুত ছড়া কাটাকাটি করেন।
গিন্নি। ঘরে কেন আলো?
কর্তা। গিন্নি গেছে মাঠপালুনিতে বাড়ির সবাই ভালো।

মাঠপালুনির মতো মাঠপোষলাও অনেক গ্রামের জাঁকজমকপূর্ণ লোকউৎসব। লৌকিকব্রত প্রাগার্য সংস্কৃতির দান বলেই বিশেষজ্ঞরা অনুমান করেছেন। খেত নিয়ে ব্রতর নাম ক্ষেত্রব্রত বা ক্ষেত্রমোহন। অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লপক্ষের বৃহস্পতিবারে মেয়েরা ক্ষেত্রব্রত পালন করেন। আমন ধানের বিয়েন ছাড়ার সময় ভাদ্র আশ্বিন মাসে জমিকে সাধ খাওয়ান চাষিরা। আশ্বিন সংক্রান্তিতে চাষিরা মাঠলক্ষ্মীর আরাধনায় ‘ডাক দিয়ে’ আসেন ধান ফুলোনোর বার্তা শুনিয়ে।
ব্রত সংস্কৃতিতে যেমন ক্ষেত্রদেবী, তেমনই বৈদিক সাহিত্যে বন্দিত হয়েছেন মাঠের দেবতা হিসাবে ক্ষেত্রপতি বা ক্ষেত্রপাল। ঋকবেদের চতুর্থ মণ্ডলের ৫৭ ঋকে বলা হয়েছে, ‘ক্ষেত্রস্য পতিনা বয়ং হিতনের জয়ামসি’। আমরা যেন ক্ষেত্রপতির কৃপায় শস্যশ্যামল ক্ষেত্র লাভ করি। বৈদিক ক্ষেত্রপতি বর্তমানে ক্ষেত্রপাল দিগদেবতায় পরিণত হয়েছেন।
ক্ষেত্রের দেবী হিসাবে পূজিত শুঙ্গ-কুষাণ যুগের এক ধরনের টেরাকোটা মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে বাংলা-সহ মঙ্গলকোট চন্দ্রকেতুগড় তমলুক অহিচ্ছত্র ইত্যাদি ভারতের বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে। এই ধরনের মাতৃকামূর্তির মস্তক থেকে ধানের শিষ বা লতাপাতা নির্গত হয়েছে। সিন্ধুসিলেও অনুরূপ দেবীর সন্ধান পাওয়া যায়, যার যোনিদেশ থেকে উত্থিত হয়েছে লতাপাতা। এই সকল মাতৃকামূর্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ আছে মার্কণ্ডেয় পুরাণ কথিত শাকম্ভরীদেবীর সঙ্গে। এই সমস্ত উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, মাঠ আমাদের চোখে কোনও জড়বস্তু নয়, শাকম্ভরীর জীবন্ত শরীর।

মাঠ ক্রমশ অলৌকিক জন্ম-মৃত্যুর গর্ভস্থল হয়ে ওঠে। রামায়ণে জনক রাজা যজ্ঞের ভূমিতে লাঙল চষে ভূমিজ কন্যা সীতাকে পেয়েছিলেন। সীতা শেষপর্যন্ত ভূমিতেই লীন হয়ে যান। ঋগ্বেদে ‘সীতা’ শব্দের অর্থ চষা জমির উপরে লাঙলের দাগ বা রেখা। শতপথ ব্রাহ্মণে সীতা হলেন ক্ষেত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। রামায়ণে সীতা লক্ষ্মীর অবতার হিসাবে বন্দিত। সীতাই বিবর্তিত হয়ে বাংলার ‘মাঠলক্ষ্মী’তে পরিণত হয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকও যেন রামায়ণের আধুনিক ভাষ্য। মূল দ্বন্দ্ব ভূমি বনাম খনি। মাটির উপরে শস্যক্ষেত্র এবং মাটির তলায় অন্ধকার খনির মধ্যে এক মহাজাগতিক লড়াইয়ের নাট্যরূপ ‘রক্তকরবী’। নাটকের নায়ক-নায়িকা মুক্ত মাঠের চঞ্চল রোদ এবং সবুজ প্রাণের প্রতিনিধি।
মেঠো লোকসংস্কৃতি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পৃথিবীর প্রান্তিক সভ্যতায় মাঠ অথবা শস্যক্ষেত্র পবিত্র যজ্ঞের মর্যাদা পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বালিদ্বীপের লোকসংস্কৃতিতে মাঠের গুরুত্ব রাঢ় বাংলার মতো। ধান কাটার পর এখানে ধানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী শ্রী-র পুজো হয়। জাপানের শিন্তোধর্মে নতুন শস্যকে আবাহন করার জন্য হোনেন মাৎসুরি নামক লোকউৎসব পালিত হয়। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় মাঠের জাদুকরী উৎসবের নাম ‘নামবুরি’। ইউরোপের জমি-পুজোর নাম ছিল ‘লামাস’।

আমাদের দেশ, ভাষা, জাতীয় পরিচয় সবকিছুর উদ্ভব হয়েছে– মাঠ ও কৃষি সংস্কৃতি থেকে। আবুল ফজলের ‘আইন ই আকবরী’ থেকে জানা যায়, জমির সীমানা জ্ঞাপক ‘আল’ ক্রমশ ব্যাকরণের প্রত্যয় হয়ে বঙ্গীয় শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। ফলে ‘বঙ্গ’ হয়ে ওঠে ‘বঙ্গাল’, ‘বঙ্গালদেশ’। বঙ্গাল নামে এক কবিরও সন্ধান মেলে প্রাচীন সাহিত্যে। যিনি গর্ব করে লিখেছিলেন–
‘অবগাঢ়া চ পুনীতে গঙ্গা বঙ্গালবাণী চ।।’
অর্থাৎ গঙ্গায় ও বঙ্গালবাণীতে অবগাহন করলেই পুণ্য বা স্নিগ্ধতা।
বঙ্গাল থেকে যেমন ‘বঙ্গালী’ উপভাষার নামকরণ হয়েছে, তেমনই বাংলাভাষা কিংবা বাংলা নামটির মধ্যে জমির আলের চিহ্ন আত্মগোপন করে আছে। সুলতানি আমলে বঙ্গাল থেকে হয়েছিল ‘বঙ্গালাহ’ অথবা ‘বাঙ্গলাহ’। পর্তুগিজরা বাঙ্গলাহ-কে ‘বেঙ্গালা’ রূপে উচ্চারণ করতেন। ইংরেজরা বলতেন ‘বেঙ্গল’। উনিশ শতকের গদ্যকারদের লেখায় বাঙ্গালা থেকেই আজকের বাংলা।
…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….
পর্ব ৪৬: গুজব কিংবা হুপুই: সে যুগের ‘ভাইরাল’
পর্ব ৪৫: সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো
পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা
পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম
পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি
পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ
পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য
পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা
পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল
পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর
পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি
পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়
পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার
পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন
পর্ব ৩২: তালবাহার
পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা
পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ
পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়
পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?
পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন
পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?
পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের
পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল
পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?
পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন
পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved