naresh guha edited the works of amiya chakraborty | Robbar
Robbar
  • ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা

আমি নরেশদার কাছে প্রস্তাব নিয়ে যেতেই তিনি সাগ্রহে রাজি হন। এমনকী আমাকে মনে করিয়ে দেন ১৯৮১ সালে অমিয় চক্রবর্তীর ৮০ বছর পূর্ণ হবে⎯ তার আগেই তিনি তাঁর কবিতার সংগ্রহ প্রকাশ করতে চান। সম্পাদক নিজেই যদি এতটা আগ্রহী হন, তাহলে প্রকাশকের কতটা সুবিধে হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’-এর পরিকল্পনা হয় দুই খণ্ডে। প্রথমটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে আর দ্বিতীয়টি তার দু’-বছর পরে। এই বইয়ের মলাট সত্যজিৎ রায়ের আঁকা। আমার যতটা মনে পড়ছে এটাই দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রথম বই যার মলাট এঁকে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়।

শেষ আপডেট: এপ্রিল ১৩, ২০২৬, ১৪:০৬   
Facebook WhatsApp Messenger

৭১.

সম্প্রতি ২০২৫ সালের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে দে’জ পাবলিশিং প্রকাশিত প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইটি। ১৯৭০ সালে দে’জের পথচলা শুরুর সময় থেকেই বহুবার সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে আমাদের প্রকাশিত বই। আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রসঙ্গে বলেছিলাম, ওই বইটি ভারবি থেকে আমাদের কাছে আসার মাঝেই সে-বারের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই অর্থে দে’জ থেকে প্রকাশিত প্রথম যে-বই সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায় সেটি হল সন্তোষদার (সন্তোষকুমার ঘোষ) উপন্যাস⎯ ‘শেষ নমস্কার: শ্রীচরণেষু মাকে’। তবে এতদিনে যেসব বই সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে সেগুলো সবই একক বই। অবশ্য ৩০ বছর আগে, ১৯৯৫ সালে নরেশ গুহ-র ‘কবিতাসংগ্রহ’ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিল। এছাড়া দে’জের কবিতাসংগ্রহ বা সংকলন জাতীয় কোনও বই এই পুরস্কার পায়নি। ১৯৭৬ সালে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ থেকে শুরু করে প্রায় ৫০ বছরে আমি সম্ভবত ৮৮-৮৯টি বই প্রকাশ করেছি ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজে। তার মধ্যে আশিস সান্যালের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ ভুয়ালকা পুরস্কার পেয়েছে। রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আলোক সরকার, মণিভূষণ ভট্টাচার্য, রণজিৎ দাশের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘স্বনির্বাচিত কবিতা’ও রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছে। নজরুল পুরস্কার পেয়েছে বেণু দত্তরায়ের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। তবে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটি ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজের প্রথম বই যা সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেল।

১৯৯৫ সালের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার প্রসঙ্গে নরেশ গুহর ‘কবিতাসংগ্রহ’-র কথা বললাম। দে’জ পাবলিশিং-এর সঙ্গে নরেশদার যোগাযোগ তাঁর ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশের প্রায় দু’-দশক আগে থেকে। যাদবপুরের অন্যান্য অধ্যাপকদের মতো এক্ষেত্রেও স্বপনদাই (স্বপন মজুমদার) ছিলেন যোগাযোগের সেতু। আমি যখন লেক মার্কেটের কাছে ৫ নম্বর সত্যেন দত্ত রোডে নরেশ গুহর বাড়িতে যাই তখন তিনি যেমন বিখ্যাত কবি ও তুলনামূলক সাহিত্যের নামজাদা অধ্যাপক হিসেবে পরিচিত⎯ তেমনই বইপাড়াতেও তাঁর অন্য একটা খ্যাতিও ছিল। সিগনেট প্রেসের এক সময়ের তাক লাগানো উদ্যোগ ‘টুকরো কথা’র তিনিই ছিলেন প্রাণপুরুষ। নরেশদার কাছে আমি প্রথম যাই ১৯৭৬-৭৭ সালে। উদ্দেশ্য ছিল অমিয় চক্রবর্তীর কবিতার একটি সংগ্রহ প্রকাশ করা। এ-ব্যাপারে কয়েকজনের পরামর্শে আমি বুঝেছিলাম নরেশদাই এই কাজের জন্য উপযুক্ত মানুষ। 

zoom
অমিয় চক্রবর্তী

অমিয় চক্রবর্তী ১৯২৬ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসচিব ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণেও গেছেন⎯ ১৯৩০ সালে জার্মানি, ডেনমার্ক, রাশিয়া, আমেরিকা; আবার ১৯৩২ সালে ইরান ও পশ্চিম এশিয়ায়। ১৯২৭ সালে ডেনমার্কের হিওর্ডিস সিগো-র সঙ্গে শান্তিনিকেতনে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপের পর প্রতিমা দেবীর কাছে শান্তিনিকেতনের কথা শুনে সিগো সেখানে চলে আসেন। তিনি এক বছর শ্রীভবনের দায়িত্বেও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘হৈমন্তী’। হৈমন্তী ওরফে সিগো নৃত্যকুশলী ছিলেন। কলকাতায় রবীন্দ্রনাথ যখন ‘নটীর পূজা’ করান তখন সেই অভিনয়ে হৈমন্তীও ছিলেন। 

অমিয় চক্রবর্তী পড়াশোনা করেছেন দেশবিদেশের অনেক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে, পড়িয়েছেনও বিদেশের বহু জায়গায়। তবে ১৯৪০-১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। এদিকে ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত নরেশদা সেই বিভাগেই এমএ পড়েছেন। সে-দিক থেকে অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ সম্পাদনা তাঁর কাছে প্রায় গুরুদক্ষিণা-তুল্য ছিল। আর কবি হিসেবে অমিয় চক্রবর্তী বাংলা কবিতার জগতে যে এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর তা নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই। তাঁর ‘খসড়া’, ‘পারাপার’, ‘পালা-বদল’, ‘ঘরে-ফেরার দিন’ খুবই বিখ্যাত কবিতাবই।

আমি নরেশদার কাছে প্রস্তাব নিয়ে যেতেই তিনি সাগ্রহে রাজি হন। এমনকী আমাকে মনে করিয়ে দেন ১৯৮১ সালে অমিয় চক্রবর্তীর ৮০ বছর পূর্ণ হবে⎯ তার আগেই তিনি তাঁর কবিতার সংগ্রহ প্রকাশ করতে চান। সম্পাদক নিজেই যদি এতটা আগ্রহী হন, তাহলে প্রকাশকের কতটা সুবিধে হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’-এর পরিকল্পনা হয় দুই খণ্ডে। প্রথমটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে আর দ্বিতীয়টি তার দু’-বছর পরে। এই বইয়ের মলাট সত্যজিৎ রায়ের আঁকা। আমার যতটা মনে পড়ছে এটাই দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রথম বই যার মলাট এঁকে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। অবশ্য অমিয় চক্রবর্তীর কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ সত্যজিৎ সেই ১৯৫৩ সাল থেকে করছেন। সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘পারাপার’ বইটির মলাট সত্যজিতেরই আঁকা ছিল। 

zoom

নরেশদার সম্পাদনার একটা বিশেষ রীতি আমি অমিয় চক্রবর্তীর বই থেকেই লক্ষ করেছি। তিনি বই সম্পাদনা করলে সচরাচর বইয়ের শুরুতে নিজে কিছু লিখতেন না। সম্পাদকীয় থেকে শুরু করে যাবতীয় লেখালিখি থাকত বইয়ের শেষে। সম্ভবত তিনি মনে করতেন যাঁর সংগ্রহ বা সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর লেখাই সে-বইয়ের প্রধান পরিচয়। সম্পাদকের কাজ যথাসম্ভব আড়ালে থেকে লেখককে পাঠকের সামনে পেশ করা। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে প্রখ্যাত সম্পাদক পুলিনবিহারী সেনের সঙ্গে তাঁর ভাবনার মিল ছিল। নরেশদা অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’-এর প্রথম খণ্ডের শেষে ‘সম্পাদকের নিবেদন’ অংশে অমিয়বাবু সম্পর্কে লিখেছেন⎯ ‘…প্রায় ত্রিশ বছর যাবৎ তিনি স্বদেশ থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত, বিশ্বের পথে ভ্রাম্যমাণ। মনে হয়, তাঁর প্রিয় পৃথিবীর পরিক্রমা এখনো শেষ হয়নি, এবং ভাবা কঠিন যে আর কখনো শারীরিক ভাবে দেশে ফিরে তিনি স্থিত হবেন। শিল্পী-মনীষীদের মধ্যে প্রবাসীর সংখ্যা দিনে-দিনে সব দেশেই বাড়ছে। তাঁকেও তাঁদেরই একজন ব’লে মনে করা ভুল হবে, কেননা মনের গড়নে তিনি একেবারেই আলাদা। তাঁর কবিতা আন্তর্জাতিকতার সর্বলক্ষণ সম্পন্ন হ’লেও, গূঢ়তর অর্থে আসলে তিনি ঘরের দিকেই ফিরছেন। রচিত কবিতার মধ্যেই তাঁর অনিঃশেষ ঘরে-ফেরা। সে-কবিতার ভাষা বাংলা, এবং তার পরিস্ফীত ধারা এখন পর্যন্ত প্রবহমান।’ তবে দেশের বাইরে থাকলেও অমিয় চক্রবর্তী যে সম্পাদককে এই কাজে সর্বতোভাবে সাহায্য করেছেন সেকথাও নরেশদা জানিয়েছেন। সম্পাদনা পদ্ধতি ও বানান নিয়েও নরেশ গুহর বিশেষ অভিনিবেশ ছিল। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’-এর দ্বিতীয় খণ্ডে ‘সম্পাদকের নিবেদন’ অংশে তিনি সম্পাদনার নানা সমস্যা-সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন⎯ ‘ইতিহাসের যথাযথ দাবি কোনো কবিতাসংগ্রহ মেটাতে পারে না, তা পারে টীকা আর পাঠভেদ সমন্বিত কোনো ভেরিওরাম সংস্করণ।’ তবে তাঁর আক্ষেপ ছিল কবির সব রচনার স্থান-কাল উল্লেখ করতে না-পারা নিয়ে। যদিও তাঁর বিশ্বাস ছিল⎯ ‘কবিতার উপভোগে এইসব তথ্যের মূল্য আছে কিনা, নাকি তা নিতান্তই কবিজীবনীর সম্ভাব্য উপাদান, কাজেই কাব্যগ্রন্থের পক্ষে অপ্রয়োজনীয়…’। এই প্রশ্ন তিনি অমিয় চক্রবর্তীকেও করেছিলেন তার উত্তরে অমিয় চক্রবর্তী নরেশদাকে যা লেখেন সেটিও উদ্ধৃত হয়েছে দ্বিতীয় খণ্ডের ‘সম্পাদকের নিবেদন’-এ। ১৯৭৬ সালে অমিয় চক্রবর্তী নরেশদার প্রশ্নের উত্তরে চিঠিতে লিখেছিলেন⎯

“আমার নিজের বিশ্বাস ছবির ফ্রেমের মতো স্থান, সময় ইত্যাদির প্রসঙ্গ কবিতার একটি বিশিষ্ট আবহাওয়া সৃষ্টি করে: ছোটো জিনিষের সঙ্গে বড়োর তুলনা করলে বলতে পারি রবীন্দ্রনাথ সাংঘাইয়ে ‘খর বায়ু বয় বেগে’ লিখেছিলেন⎯ একটি চীনে সাম্পান উত্তাল ঢেউ, ঝড় অগ্রাহ্য ক’রে মহাসমুদ্রে দূরে চলে গেল⎯ এই ছবিটা মনে আনলে তাঁর ঐ গান বা কবিতার ক্ষতি নেই। আনমনা অথচ বেপরোয়া এবং অনিবার্য একটি ভাবের বৃদ্ধি অনুভব করি। জিনিষটাকে বাড়িয়ে বলতে চাই না,⎯ পারিপার্শ্বিকের প্রতি আসক্তি হয়তো ব্যক্তিগত স্মৃতির খেয়াল, মমতায় ঐতিহাসিক। কিন্তু ‘পূরবী’-র কবিতায় জাহাজের নামগুলিও আমার মনে প্রাসঙ্গিকের ঢেউ তোলে। ‘ও আমার জুঁই’ বুয়েনোস্ আইরেসে লেখা হয়েছিলো⎯ এতে জুঁই ফুল আরো যেন হৃদয়ে ভ’রে আসে। ‘ক্ষত যত ক্ষতি যত’ গানটা গ্রীসের পটভূমির কাছে ব’সে লেখা শাশ্বত অরুণোদয়ের সম্মুখে, অনেক গান জর্মানিতে এবং য়ুরোপের অন্যত্র চলার পথে রচিত, তার ইঙ্গিত পেলে ভালোই লাগে। আবার বলি, আমার কবিতার কোনো আকস্মিক দাম-বাড়ানো আমার উদ্দেশ্য নয়⎯ গ্রেনাডিন দ্বীপে নারকলগাছগুলি [য.] কী ভাবে আমাকে ডাক দিয়েছিলো, ভারতীয় মন নিয়ে সেই পশ্চিম ইন্ডিস দ্বীপে তা চম্‌কিয়ে বুঝেছিলাম। শুধু একদিনের মেয়াদ, তারপরেই বিদায়। সেই দ্বীপ থেকে চিরদিনের মতো চলে আসার ঘটনাকে আশ্রয় ক’রে অসীম বেদনা জাগলো; সমুদ্রঘেরা বিশেষ দ্বীপের স্মারণিক চিহ্ন রাখতে চেয়েছিলাম। অবশ্য সবই ধুয়ে-মুছে উন্‌ত্রিশ পবনে উড়ে হারিয়ে যায়, কবিতাও তথৈবচ। তুমি মায়া প্রকাশ করলে, এতে কী জানি গভীর তৃপ্তি পেয়েছি।… জানি যে অনেকে এই স্থান-সনের উল্লেখকে দাম্ভিকতার পরিচয় মনে করেন। হতে পারে, কিন্তু কবিতা লেখাটাই একদিক থেকে দাম্ভিকতা, ইতিহাসরক্ষার বৃত্তিটাও আত্মম্ভরিতা। কিন্তু শুধু তাই নয়।”

zoom

নরেশ গুহকে নিয়ে চমৎকার একটি সংখ্যা করেছিলেন ‘অহর্নিশ’ পত্রিকার সম্পাদক শুভাশিস চক্রবর্তী। পরে সেটি বইয়ের আকার পায়⎯ ‘নরেশ গুহ: বৈচিত্র্যের পরিসরে’ নাম দিয়ে। বইটিতে প্রভাতকুমার দাসের করা নরেশদার বিস্তারিত জীবনপঞ্জি আছে। সেখানে দেখছি নরেশদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করার পর কিছুদিন ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সাংবাদিকতায় ইস্তফা দেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সিগনেট প্রেসের দিলীপকুমার গুপ্তর। 

শুরুতে একবার সিগনেট প্রেসের ‘টুকরো কথা’র উল্লেখ করেছি। ‘টুকরো কথা’ নিয়ে একটি অসামান্য সংখ্যা করেছিলেন কবি ও ‘বিভাব’ পত্রিকার সম্পাদক সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত। ‘বিভাব’-এর এই সংখ্যার আমন্ত্রিত সম্পাদক ছিলেন নরেশদা নিজেই। সেই সংখ্যার ভূমিকায় তিনি জানিয়েছিলেন ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার আতাউর রহমানের সূত্রে ডিকে-র সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ডিকে-র তখনকার অফিস, প্রখ্যাত বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমারে গিয়ে নরেশদা তাঁর সঙ্গে দেখা করার প্রসঙ্গে লিখেছেন⎯ “জীবিকার জন্য অবিলম্বে একটা কর্মের প্রয়োজন আমার অবশ্যই ছিল, কিন্তু সাংবাদিকতা ছেড়ে এসে তার বিকল্প কর্ম কি জুটবে শেষে বিজ্ঞাপনের অপিসে। গেলাম দেখা করতে, কিন্তু খুব একটা উদ্দীপনা নিয়ে নয়। সাহেব দেখা করলেন, একপাত্র চা-ও খাওয়া গেল, কিন্তু প্রত্যাশিত জীবিকা সংক্রান্ত একটিও বাক্য ব্যয় না ক’রে, তিনি পরের রবিবার এলগিন রোডের যে-ঠিকানায় আমাকে গিয়ে উপস্থিত হ’তে বললেন সেটাই যে সিগনেট প্রেসের খাস অপিস তা আমি জানতুম, শুধু জানতুম না যে নীলিমা দেবী, ডি. কে. গুপ্তদের সেটি ছিল বাসভবনও। সেই পরের রবিবারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সারা দুপুর ধ’রে প্রাণমন ভরা কী যে এক অপূর্ব সাহিত্যিক আড্ডা জমেছিল সে-কথা কদাচ আমি ভুলতে পারিনি। কথার ফাঁকে-ফাঁকে ডি.কে-ও বুঝে নিলেন যে আহারে বিহারে, সদ্যচেনা সেই তরুণটি যে একেবারেই সমজদার নয় তা ঠিক বলা যায় না। অর্থাৎ আমাকে তাঁর এক রকম ভালোই লেগে গেল।” ডিকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় দু’-ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে তখনকার দিনে নরেশদার জন্য দেড়শো টাকা বেতন ধার্য করেন। এভাবেই শুরু হয় বাংলা প্রকাশনার জগতে যুগান্তকারী ‘টুকরো কথা’-র প্রকাশের কাজ। ‘টুকরো কথা’য় যেমন প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য বইয়ের খবর থাকত, তেমনই সাহিত্য-সংক্রান্ত আকর্ষণীয় নানা বিষয় থাকত। শুধু সিগনেটের নয়, অন্য প্রকাশনার খবরও থাকত সেখানে। দূরদর্শী প্রকাশক ডিকে ‘টুকরো কথা’র পরিকল্পনা করেছিলেন সমগ্র বাংলার প্রকাশনা জগৎ ও ভালো বইয়ের পাঠকের জন্য। প্রথম সংখ্যায় তার নাম ছিল ‘নতুন পাণ্ডুলিপি’। ২০ পাতার পুস্তিকা পরের সংখ্যা থেকে ফোল্ডার হয়ে যায়। নরেশ গুহর লেখা আর সত্যজিৎ রায়ের অলংকরণে ‘টুকরো কথা’ বাঙালির অতুলনীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ। ১৯৫০-এর জুলাই মাসে ‘টুকরো কথা’র যাত্রা শুরু। ‘টুকরো কথা’র একমাত্র শেষ সংখ্যাটি ছাড়া বাকি সবই নরেশদার লেখা বলে মনে হয়। শেষ সংখ্যায় লিখেছিলেন নৃপেন্দ্র সান্যাল। 

zoom
নন্দিনী গুপ্ত ও ডি কে গুপ্ত

সিগনেট থেকে ‘টুকরো কথা’ ছাড়াও নরেশদা আরেকটা উল্লেখযোগ্য কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। ১৯৫০ সালে সিগনেট প্রেস প্রকাশ করে⎯ ‘চলচ্চিত্র’ পত্রিকার প্রথম পর্যায়। ‘চলচ্চিত্র’ পত্রিকার কথা বলতে নরেশদা বলেছেন⎯ “রুমার গডেনের লেখা উপন্যাস নিয়ে ‘দি রিভার’ নামের অসামান্য চমৎকার ছবিটি কলকাতায় তার আগেই তোলা শেষ করেছেন জাঁ রেনোয়া। ‘পথের পাঁচালী’ তোলার তোড়জোড় চলছে কলকাতার আশেপাশের গ্রামে। ডি. কে. স্থির করলেন সেই মুহূর্তে চলচ্চিত্র নিয়ে দায়িত্বশীল উৎকৃষ্টমানের একটি পত্রিকা না বার করলেই নয়, নয়তো বাংলা ছায়াছবির আসন্ন কৌলিন্য প্রতিষ্ঠায় যথাযোগ্য সহায়তা করা যাবে না। তৈরি হ’ল সম্পাদকমণ্ডলী, যার ছয় সদস্যের মধ্যে ছিলেন সত্যজিৎ রায়, কমল মজুমদার, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত এবং সুভাষ সেন, আর একজন ছিলুম আমি। চলচ্চিত্র প্রথম পর্যায়ের অতি উৎকৃষ্ট ওই একটি খণ্ডই ছাপা হয়েছিলো সিগনেট প্রেস থেকে। আমাকে বোধ করি নির্বাচিত লেখা থেকে বাংলায় কিছু অনুবাদ করতে হয়েছিলো ওই সংখ্যার জন্য। খুব সম্ভব ‘পথের পাঁচালী’ ছাড়া আর কোনো কর্মে তখন মন দিতে পারছিলেন না সত্যজিৎ রায়। কাজেই চলচ্চিত্রের আর কোনো সংখ্যা তৈরির চেষ্টাও করা যায়নি।”

zoom

এর দু’-বছর পরে সিগনেট প্রেস থেকেই নরেশ গুহর ‘দুরন্ত দুপুর’ প্রকাশিত হয়। আর তার ২৪ বছর পরে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় ‘তাতারসমুদ্র-ঘেরা’। দু’টি বইয়ের মলাটই সত্যজিৎ রায়ের করা। 

zoom

‘দুরন্ত দুপুর’ বেরনোর আগে থেকেই তাঁর সঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তা এতটাই নিবিড় ছিল যে বুদ্ধদেব যখন ১৯৫৬ সালে যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ তৈরি করলেন, তখন তাঁর ডাকে চারুচন্দ্র কলেজের অধ্যাপনায় অব্যাহতি দিয়ে নরেশদা যোগ দিয়েছিলেন যাদবপুরের নতুন বিভাগে। বুদ্ধদেবের ‘কবিতা’ পত্রিকার সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। ১৯৪৬ এবং ১৯৪৭ সালে কবিতাভবন থেকে ছোটগল্প গ্রন্থমালায় তাঁর অনুবাদ বই ‘পার্টির পরে’ এবং গল্পের বই ‘তপতীর মন’ও প্রকাশিত হয়েছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ১৯৫৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট হলে ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি যে বিখ্যাত কবিসম্মেলন হয় তাতে নরেশ গুহও ছিলেন। প্রথম দিন তিনি পাঠ করেন অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা, আর দ্বিতীয় দিনে নিজের কবিতা।

zoom

১৯৭৭ সালে দে’জ থেকে অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রথম খণ্ডের সঙ্গেই নরেশদা সম্পাদনা করেছিলেন আমাদের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজের বুদ্ধদেব বসুর বইটি। বুদ্ধদেব বসুর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রথম বেরিয়েছিল ১৯৫৩ সালে। ১৯৭৭-এর সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত আমাদের সংস্করণের বইটিতে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত কবিতা আছে। দে’জ সংস্করণের ভূমিকায় নরেশদা জানিয়েছিলেন⎯

“প্রকৃত অর্থে সম্পাদনা আমি করিওনি। এ-ধরনের সংকলন গ্রন্থের আলাদা একটা তাৎপর্য এবং মূল্য আছে, সেটা রক্ষা করা দরকার! কারণ সম্পাদক এবং রচয়িতা মূলত এক্ষেত্রে একই ব্যক্তি, যিনি ভেবেচিন্তে এমন ভাবে কবিতাগুলির নির্বাচন করেছিলেন যা থেকে তাঁর পরিণতির ধারা এবং ভাব ও প্রকরণগত বৈচিত্র্যের ছবিটা স্পষ্ট হয়। পাঠক মিলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন, দেখতে হঠাৎ খানিকটা অন্যরকম মনে হ’লেও, গ্রন্থের মূল অংশ আমি অবিকল রেখেছি। বর্ধিত পৃষ্ঠাসংখ্যার সীমা মনে রেখে দশটি মাত্র নতুন কবিতা যোগ করা সম্ভব হয়েছে। শুধু সেই দশটি নির্বাচনের দায়িত্ব নতুন সম্পাদকের।… কবি এবং আদি সম্পাদকের অভিপ্রায় যথাযথ অনুসরণ করতে চেয়েছি ব’লেই কবিতার পরম্পর্য-বিন্যাসেও কিছুটা বদল ঘটাতে হ’লো। পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে আদি রচনা এবং পরিমার্জনার তারিখ বর্তমান সংস্করণে নতুন যোগ করা হয়েছে। ফলে, সব কবিতার পূর্বেকার ক্রম যথাযথ রাখা গেলো না। তবু যে কবিতাগুলি আনুপূর্বিক কালানুক্রম অনুযায়ী সাজানো সম্ভব হয়নি তার কারণ, পরে প্রকাশিত গ্রন্থে পূর্বে রচিত কবিতার অবস্থান। বলা যেতে পারে, প্রতি গ্রন্থ-থেকে-নির্বাচিত কবিতাগুলিকেই আমি রচনার কালক্রম অনুসারে বিন্যস্ত করলাম মাত্র।”

zoom

নরেশদার সঙ্গে আমার চিঠিপত্রে যোগাযোগের প্রমাণ পাচ্ছি ১৯৮৭ থেকে। তখন উনি বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ। আমি কোনও বইয়ে প্রকাশের জন্য হয়তো রবীন্দ্রনাথের একটা ছবির প্রতিলিপি চেয়েছিলাম। উত্তরে ৩ মে ১৯৮৭ তিনি লেখেন⎯

“প্রীতিভাজনেষু,

ছবি ছাপানোর অনুমতি অবশ্যই দেবো। কিন্তু এক্ষেত্রে ট্রাস্টের একটা রয়্যালটি প্রাপ্য হয়, তার পরিমাণ এখন পর্যন্ত ছবিপিছু এক হাজার টাকা। এই পরিমাণ বাড়ানোর কথা হচ্ছে। কিন্তু আপনারা এক হাজার টাকা দিতে সম্মত হলেই অনুমোদন দেওয়া হবে। বইয়ের একটি কপি রবীন্দ্রভবন গ্রন্থাগারের জন্য দেওয়ার নিয়ম, আশা করি আপনারা অনায়াসেই পালন করবেন। আপনার সম্মতি পেলেই ছবির কপি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। ছবিটি এক রঙা হ’লে black and white ফটোকপি যাবে। কিন্তু একাধিক রঙ থাকলে এখানে কোনো ভালো ফোটোগ্রাফার দিয়ে স্লাইড করিয়ে পাঠানোর খরচ পড়বে ত্রিশ টাকা। এটা ভবনের পক্ষে করানো সম্ভব নয়। তবে আমার জানা ফোটোগ্রাফার দিয়ে আমি করিয়ে দেবো। সাদাকালো ছবি হলে আলাদা কোনো টাকা লাগবে না শুধু রয়্যালটি দিলেই চলবে।
বুদ্ধদেব বসুর কবিতাসংগ্রহের প্রুফে একটু খাটতে হবে, কারণ যেভাবে প্রুফ এসেছে তাতে খুঁত আছে। এই মুহূর্তে বিভিন্ন কাজের তাড়নায় আমি সময় করে উঠতে পারছিলাম না। দিন চারেক পর সময় করতে পারলেই কাজটা শেষ করে লোকমারফত আপনাকে পাঠিয়ে দেবো। বিলম্বের জন্য লজ্জিত। প্রীতি নমস্কার জানবেন।…”

zoom
zoom

সেবছরই নরেশদার মেয়ে সুচরিতার বিয়ে উপলক্ষে আমাকে নেমন্তন্ন করে একটা কার্ড পাঠিয়েছিলেন। কার্ডের নীচে লেখা ছিল⎯ ‘শান্তিনিকেতনে আসা সম্ভব না হইলে ৩ অগস্ট কলকাতায় সান্ধ্য অনুষ্ঠানে আসবেন।’ আবার দেখছি চিঠির ওপরে লাল কালিতে নরেশদা আমাকে আলাদা করে লিখে দিয়েছেন⎯ ‘অন্তত কলকাতায় যদি পারেন অবশ্য আসবেন।’

zoom

১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে নরেশদার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল পাঁচ খণ্ডে বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতাসংগ্রহ’ সম্পাদনা করা। এই বই করতে পেরে দে’জ পাবলিশিংও সম্মানিত হয়েছে। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত প্রথম খণ্ডের পিছনে ‘সম্পাদকের নিবেদন’-এ নরেশ গুহ বইটির সম্পাদনা রীতি নিয়ে কয়েকটি কথা লিখেছিলেন⎯

“সম্পাদনাকালে নিচের নিয়মগুলি মেনে চলা হবে ব’লে সম্পাদক স্থির করেছেন:

১. জীবনের শেষ দিকে লেখা এবং গ্রন্থভুক্ত হ’তে পারতো-মনে-হয়– এমন কিছু কবিতা ছাড়া আর কোনো রচনা এখানে সংকলিত হবে না যা তাঁর কোনো প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থে নেই।

২. কবিতার পাঠভেদ বিষয়ে ‘গ্রন্থপরিচয়’ যৎকিঞ্চিৎ উল্লেখ থাকবে মাত্র। পূর্ণাঙ্গ বিবরণের উপযুক্ত স্থান ভেরিওরাম সংস্করণ।

৩. বর্তমানে অপ্রচলিত হ’লেও কখনো প্রকাশিত হয়েছিলো এমন সমস্ত কাব্যগ্রন্থই (যেমন ‘একটি কথা’) কালানুক্রম অনুযায়ী এই সংস্করণের অন্তর্ভুক্ত হবে। কবি পরবর্তীকালে বর্জনীয় মনে ক’রে থাকলেও, একবার গ্রন্থভুক্ত হয়েছিলো ব’লেই বর্জিত কবিতাগুলিও পরিশিষ্টে থাকবে।

৪. কবিতার পাঠ এবং বানান স্থির করা হবে কবির জীবৎকালে প্রস্তুত শেষ মুদ্রণ অনুসরণ ক’রে। দ্রষ্টব্য: ‘নতুন পাতা’। একাধিক সংস্করণ না থাকলেও, এ-বই থেকে কিছু কবিতা পরিশোধনের পরে অন্যত্র ছাপা হয়েছিলো। তারকাচিহ্ন দিয়ে এ-সব রচনার শোধিত পাঠ এখানে ছাপা হ’লেও, বাকি কবিতার পাঠ অপরিবর্তিত থাকলো।

zoom

আপাতত মনে হয় না, বিস্তারিত ‘গ্রন্থপরিচয়’ ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে বাংলা কবিতার এই প্রবাদপুরুষের রচনা অবলম্বনে বর্তমান সংস্করণে কোনো মুখবন্ধের প্রয়োজন আছে। এটি এক বরণীয় বাঙালি কবির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, যাঁর এক জীবনেই শিল্পীর জন্মজন্মান্তর ঘটেছিলো, সাবলীল, উচ্ছ্বসিত এবং বর্ণাঢ্য রচনারীতি থেকে স’রে স’রে ক্রমে যিনি পৌঁছলেন কবিকর্মের সেই বিরল বিশুদ্ধতার স্তরে যেখানে⎯ পাঠকের না হ’লেও কবির পক্ষে স্বীকার্য হয়েছিলো যে⎯

কিছুই সহজ নয়, কিছুই সহজ নেই আর।”

zoom

বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতাসংগ্রহ’র প্রথম আর দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশের মধ্যে ব্যবধান ন-বছরের। স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশক হিসেবে আমি খানিকটা সংকটে পড়েছিলাম। সেই নিয়ে সম্পাদকের সঙ্গে অনেকবারই সামনা-সামনি বা চিঠিপত্রে কথা হয়েছে। ধীরে-ধীরে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, কাজটা ভালো করতে হলে নরেশদাকে সময় দিতে হবে। ১৯৮০ এবং ১৯৮৯-এ দুটো খণ্ড প্রকাশের পর, তৃতীয়টি প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। শেষ দু’টি খণ্ড অবশ্য ১৯৯৪ সালের জুন এবং অক্টোবরে প্রকাশিত হয়। বুদ্ধদেব বসুর নিজের কবিতার বইগুলো নিয়ে পরিকল্পনায় কোনও সংকট ছিল না। আমরা চিন্তা করেছিলাম অনুবাদ কবিতার বইগুলো কীভাবে সাজানো যায়। শান্তিনিকেতনের পূর্বপল্লীতে তাঁর ‘খোয়াই’ বাড়ি থেকে ৩ মে ১৯৯১ নরেশদা আমাকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন⎯ 

“সুধাংশুবাবু, আমি দিন কয়েকের জন্য কলকাতা গিয়েছিলাম, ফিরে এসে জ্বরে পড়েছি। আপনার চিঠির উত্তর দিতে তাই একটু দেরি হচ্ছে।

​সম্পাদনার সম্মানমূল্য নিয়ে আমি আর কথা বাড়াবো না। আপনি যা প্রস্তাব করেছেন তাই দেবেন। অবিলম্বে স্থির করা দরকার বুদ্ধদেব বসুর মৌলিক কবিতা ছাড়াও অনুবাদ কবিতার বইগুলি ‘কবিতাসংগ্রহে’র অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা। যে-পাঁচখানা মৌলিক কবিতার বই আছে তা একত্রে ৩য় খণ্ডে যাবে, পৃষ্ঠাসংখ্যা হবে কমবেশি ৩৫০ পৃষ্ঠা। মুস্কিল হচ্ছে অনুবাদ গ্রন্থগুলি নিয়ে। প্রতিটি গ্রন্থে মূল্যবান ‘ভূমিকা’ এবং আবশ্যক টীকা রয়েছে। এগুলি বাদ দিলে গ্রন্থগুলি খণ্ডিত করা হয়, পাঠকদের পক্ষে কবিতা বুঝতেও অসুবিধা হবে। আমি আগেও মুখোমুখি আলোচনার সময় আপনাকে বলেছি, এখনো বলছি– ভূমিকা এবং টীকা বাদ দেওয়া উচিত হবে না। বাদ দিলে ‘কবিতাসংগ্রহে’-র অন্যতম প্রধান আকর্ষণই বাদ পড়বে। অথচ বাদ না-দিলে সবগুলি বই একখণ্ডে ধরবে না। নীচের তালিকাটিতে চোখ বোলালে বুঝবেন কেন ধরবে না:

বইমূল কবিতার অনুবাদটীকাভূমিকা
কালিদাসের ‘মেঘদূত’ (সঙ্গে মূল সংস্কৃত)25 + 25 পৃষ্ঠা সংস্কৃত61 পৃষ্ঠা71 পৃষ্ঠা
‘শার্ল বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা’148 পৃষ্ঠা24 পৃ74 পৃ
‘হ্যেল্ডারলিনের কবিতা’40 পৃ10 পৃ17 পৃ
‘রিলকের কবিতা’94 পৃ60 পৃ 62 পৃ
‘জিভাগোর কবিতা’40 পৃ (আনুমানিক)⎯নেই3/4 পৃ
322 [য.]155228

এইসঙ্গে থাকবে সূচিপত্র, সম্পাদকের নিবেদন, গ্রন্থপরিচয়, শিরোনাম-সূচি, কবিতার প্রথম পঙ্‌ক্তি ইত্যাদি। একখণ্ডে দিলে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা হবে 322 + 155 + 228 + 24 = 729, হয়তো বা আরো কিছু বেশি। অর্থাৎ এটি হবে অন্যান্য খণ্ডের দ্বিগুণেরও বেশি।

zoom

আরো একটি সমস্যা আছে। ‘জিভাগোর কবিতা’ কখনো বই হ’য়ে ছাপা হয়নি। লেখকের নাম পাস্টেরনাক। কবিতাগুলি ‘ডা: জিভাগো’ নামক উপন্যাসের অঙ্গ, উপন্যাসের পরিশিষ্টে আছে। উপন্যাসটির গদ্যাংশের যুগ্ম-অনুবাদক– মীণাক্ষী দত্ত [য.] ও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, কবিতাগুলির অনুবাদক বুদ্ধদেব বসু। প্রকাশক রূপা কোম্পানী, প্রথম সংস্করণের পরে [য.] থেকে এই অনুবাদ কোনো অজ্ঞাত কারণে ত্যাগ করেন। শুনেছি বুদ্ধদেবের কন্যা মীণাক্ষী [য.] সম্প্রতি রূপা-র অনুমোদন নিয়ে উপন্যাসটি অপর কোনো প্রকাশককে দিয়ে ছাপাবেন। সে-ক্ষেত্রে অনুবাদগুলি ‘কবিতাসংগ্রহে’র অন্তর্ভুক্ত হ’তে পারবে তো? এটি আপনিই ভালো বলতে পারবেন।

এছাড়া ‘বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠকবিতা’য় অনেকগুলি অনূদিত-কবিতা আছে, যা কোনো স্বতন্ত্র গ্রন্থে নেই। ‘কবিতাসংগ্রহে’র পরিশিষ্ট অংশে এই কবিতাগুলি যোগ হবে।

আমার মতে⎯ ৪র্থ খণ্ডে শুধু অনূদিত কবিতা রাখা উচিত (আনুমানিক ৩৫০ পৃষ্ঠা)। এবং ৫ম খণ্ডে রাখা উচিত ‘টীকা’ এবং ‘ভূমিকা’ (বুদ্ধদেব বসুর)⎯ (আনুমানিক ৪০০ পৃষ্ঠা)। কিন্তু প্রকাশক হিসেবে আপনাকেই স্থির করতে হবে⎯ আপনি কী চান। আপনি কি টীকা ও ভূমিকা (বু.ব.) বাদ দিয়ে মোট চার খণ্ডে ‘কবিতাসংগ্রহ’ শেষ করতে চান? আমার পরামর্শ চাইলে আমি বলবো⎯ টীকা ও ভূমিকা বাদ দেবেন না, অর্থাৎ সংগ্রহটি মোট ৫ খণ্ডে শেষ করুন।

zoom

আপনার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে আমাকে জানাবেন। জুন এবং অক্টোবরের সময়সীমাও বদলাতে হবে। আমি অন্য একটি কাজে লিপ্ত আছি। এটা শেষ করে ৩য় খণ্ডের পাণ্ডুলিপি দিতে পারবো September মাসের শেষ নাগাদ। পরে ১ বা ২ খণ্ডের পাণ্ডুলিপি দিতে পারবো ডিসেম্বরের শেষে, ক্রিসমাসের আগে (১৯৯১)। অর্থাৎ ১৯৯১-র মধ্যেই পুরো পাণ্ডুলিপি পেয়ে যাবেন। এ বিষয়েও আপনার সম্মতি প্রয়োজন। আপনার কাজটি শেষ ক’রে অন্য একটি কাজে হাত দিতে চাই। এই জন্যই আপনার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে জানা দরকার।

[এই কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো একটি প্রস্তাব আছে। আপনি জানেন, বুদ্ধদেব বসু ছিলেন দ্বিভাষী কবি। ইংরেজিতে মৌলিক কবিতা লিখতেন না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ও বেশ কিছু আধুনিক বাঙালি কবির রচনা তিনি অনুবাদ করেছিলেন (রবীন্দ্রনাথের ৫/৬টি, জীবনানন্দ, অমিয় চক্রবর্তী ও তরুণতর কবিদের বেশ কিছু কবিতা, এবং নিজের ১৪ খানা কাব্যগ্রন্থ থেকে সাতষট্টিটি)। নিজের কবিতার অনুবাদ নিয়ে স্বতন্ত্র একটি বই করার অভিপ্রায় ছিলো তাঁর। আধুনিক কবিতা অনেকাংশে দুরূহ। অনুবাদের সাহায্যে সেই দুরূহতা অনেক পরিমাণে দূর হবে। কাজেই এ ধরণের বই হ’লে শুধু অবাঙালি পাঠকের নয়, বাঙালি পাঠকেরও উপকার হবে। সামগ্রিক সংগ্রহের দিক থেকেও এবং বোধ করি ব্যবসায়িক দিক থেকেও ভালো হয়, যদি এ-বইটি বার করেন। কিন্তু আপনি ইচ্ছে করলে এ বই নাও ছাপতে পারেন।]

একটি বিশেষ অনুরোধ। আমি গ্রামে থাকি। লেখার জন্য ভালো কাগজের অভাবে কষ্ট পাই। প্রকাশক হিসেবে আপনার খ্যাতি আছে। শহরে ভালো কাগজ কী ভাবে পাওয়া সম্ভব তা নিশ্চয়ই জানেন। Bank Paper-এ ২০০ পৃষ্ঠার ৫ খানি প্যাড আমাকে তৈরি করিয়ে দেবেন?…”

এই চিঠির উত্তরে ১৮ মে আমি লিখেছিলাম⎯

“সবিনয় নিবেদন,
আপনার ৩ ও ৬ তারিখের চিঠি পেয়েছি। আমাদের মনে হয়:
১. অবশিষ্ট মৌলিক বইগুলো দিয়ে বু. ব. কবিতাসংগ্রহের তৃতীয় খণ্ড ক’রে দিন। সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাণ্ডুলিপি আশা করব।
২. অনুবাদ কবিতা ও টীকা আলাদা করতে চাই না, চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ডে অনুবাদগ্রন্থগুলি সংকলিত হোক্‌ পরপর। এই দু-খণ্ডের পাণ্ডুলিপি বড়দিনের মধ্যে আশা করছি, আপনার কথামতো।
৩. ইংরেজি বই তো আমরা ছাপি না। আপনার লেখার কাগজ দু-একদিনের মধ্যে পাঠাচ্ছি।…”

zoom

বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতাসংগ্রহ’র কাজের মধ্যেই ১৯৯১ সালের ৭ মার্চ একটি চিঠিতে নরেশদা আমাকে লিখেছিলেন⎯ “…৩।। আর একটা কথা সসঙ্কোচে বলি। সম্পাদনা করা ছাড়াও আমি অল্পসল্প [য.] কিছু নিজেও লিখেছি। আপনি বড় প্রকাশক, বাংলার সব লেখকের বই আপনি ছেপেছেন। কিন্তু আমার লেখা বিষয়ে নিজে থেকে কখনো কোনো আগ্রহ দেখাননি। কুড়িয়ে বাড়িয়ে একটা কবিতাসংগ্রহ এখনও হয়তো ছাপানো যায়। ছাপার যোগ্য নয় ব’লে মনে করলে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু আপনি কি সত্যি তাই মনে করেন? ছাপা হ’লে আপনিই ছাপবেন এই আমার ইচ্ছা…।” চিঠিটা পেয়ে আমার মনে হয়েছিল সত্যিই তো দে’জ পাবলিশিং থেকে তাঁর কোনও বই আমার ছাপা হয়নি। সব সময়েই তাঁর সম্পাদিত বই প্রকাশ করেছি। তাই পরের চিঠিতেই ভুল সংশোধন করে তাঁর কবিতার সংগ্রহ প্রকাশ করতে রাজি হয়ে যাই। শুধু কবিতাই নয়, ১৯৯৪ সালে তাঁর প্রবন্ধের বই⎯ ‘অন্তরালে ধ্বনি প্রতিধ্বনি’ও দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। 

zoom

তবে ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশের আগেই তাঁর লেখা ছোটদের কবিতার বই⎯ ‘বিদিশার ইনি আর উনি’ দে’জ থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৯৩-এর অক্টোবরে। দেবব্রত ঘোষের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে ‘অবলং’ বইটি দারুণ দেখতে হয়েছিল। বইয়ের উৎসর্গের পাতায় লেখা ছিল⎯ ‘বিদিশা/ সুচরিতা/ আর/ স্বপনকে/ ১১ নবেম্বর [য.] ১৯৯৩’। এই বইটি ছাপার একটা গল্প আছে। তখন নরেশ গুহর ‘কবিতাসংগ্রহ’র কাজ চলছে। নরেশদা তখন এই বইয়ের পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে আমাকে লিখলেন⎯ “…আমার দ্বিতীয় বইটি ছোটোদের কবিতা, নাম : ‘বিদিশার ইনি আর উনি’। আমার দৌহিত্রীর জন্মদিন আগামী নবেম্বর [য.] মাসের প্রথম সপ্তাহে। তার পূর্বেই আমেরিকায় তাঁকে [য.] বইটি পাঠাতে চাই। দয়া করে কি ব্যবস্থা করবেন?” নরেশদার এই কথাটিও রাখতে পেরেছিলাম বলেই মনে হচ্ছে।

zoom

নরেশ গুহর ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশের পর সারস্বত মহলের প্রতিক্রিয়ার খণ্ডাংশ দিয়ে শুরু করেছিলাম। বাংলার পাঠকও এই বইটিকে বরণ করে নিয়েছে। ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশের সময় সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ‘দুরন্ত দুপুর’ আর ‘তাতার সমুদ্র-ঘেরা’ বই দুটির মলাটের প্রতিলিপি ছাপতে চেয়েছিলেন নরেশদা। আমি দ্বিতীয় বইটির প্রচ্ছদের জন্য আনন্দ পাবলিশার্সের বাদলদাকে (বাদল বসু/ দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু) অনুরোধ করলে তিনি তৎক্ষণাৎ মৌখিক অনুমতি দেন। আর অরুণার বিকাশদাকে (বিকাশ বাগচী) বলে সিগনেটের নন্দিনী গুপ্তর কাছে ‘দুরন্ত দুপুর’-এর প্রচ্ছদ ছাপতে চেয়ে চিঠি দিলে নন্দিনী গুপ্ত আমাকে ১৯৯৩-এর ২০ অক্টোবর চিঠিতে লেখেন⎯

‘সবিনয় নিবেদন
আপনার ২২.৯.৯৩ তারিখের চিঠির উত্তরে জানাচ্ছি: আমাদের প্রকাশিত শ্রীনরেশ গুহ মহাশয়ের “দুরন্ত দুপুর” বইটির টাইটেল পেজ ও মলাটের প্রতিলিপি আপনার তাঁর “কবিতাসংগ্রহ” গ্রন্থে ব্যবহার করতে পারেন।…’

zoom

লেখা বাহুল্য, নরেশদা তাঁর ভূমিকায় দুই প্রকাশককেই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান

পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ

পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন

পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ

পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!

পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!

পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়

পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়

পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়

পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!

পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু

পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না

পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম

Amiya Chakraborty Buddhadeb basu D K Gupta Indian Poetry Naresh Guha Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray

Share this article on