Robbar

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 15, 2026 5:38 pm
  • Updated:March 15, 2026 9:06 pm  

দে’জ থেকে ১৯৯২ সালে পুনর্মুদ্রিত ‘পদাতিক’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম বই নয়। সুভাষদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও অন্তত ২০ বছরের পুরনো। কলকাতায় এসে প্রকাশনা শুরু করার পর-পরই তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। হয়তো ‘বিশ্ববাণী’ তাঁর বই ছেপেছিল বলে আমার বাবা কিংবা দাদাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। মনে হয় সেই সূত্রেই ১৯৭৪ সালে আমি দে’জ থেকে সুভাষদার বই ছাপতে পেরেছিলাম।

সুধাংশুশেখর দে

৬৭.

আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘পদ্যসমগ্র’র প্রথম খণ্ডের দ্বিতীয় সংস্করণে ‘মুখবন্ধের মুখোসে’ শিরোনামে ১৯৯৬ সালে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন,

‘আমার এক বন্ধুর ভাগ্নে ছিল আমার কবিতার ভক্ত। একদিন সে কথায় কথায় জিগ্যেস করল– আচ্ছা, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা তোমার কেমন লাগে?
ভালো। কিন্তু সব বুঝতে পারি না। তুই বুঝিস?
নিশ্চয়। খুবই তো সহজ।
আমার এক কাছের লোককে এভাবে ভাঙিয়ে নেওয়ায় শক্তির ওপর আমার হিংসে হয়েছিল। একদিন দেখি, আমার নিজের ভাইপোকেও কবিতার ফুল শুঁকিয়ে শক্তি তার থলিতে পুরেছে।’

অথচ এই লেখার ঠিক ৫০ বছর আগে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের যখন ২১ বছর বয়স, তখন ‘কবিতা’ পত্রিকার পৌষ, ১৩৪৭ সংখ্যায় বুদ্ধদেব বসু ‘পদাতিক’ কবিতা-বইটির সমালোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন,

“দশ বছর আগে বাংলার তরুণতম কবি ছিলাম আমি। কিন্তু ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’ বেরোবার পর থেকে সে-সম্মান হ’লো বিষ্ণু দে-র ভোগ্য, যতদিন না সমর সেন দেখা দিলেন তাঁর ‘কয়েকটি কবিতা’ নিয়ে। সম্প্রতি এই ঈর্ষিতব্য আসন সমর সেনেরও বেদখল হয়েছে, বাংলার তরুণতম কবি এখন সুভাষ মুখোপাধ্যায়।
অবশ্য এ-সম্মান কারও ভাগ্যেই দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় না, হওয়া উচিতও নয়। বাংলাদেশের যুবক কবিরা যে এমন অল্প সময়ে বয়োকনিষ্ঠতার গৌরব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, আমাদের সকলের পক্ষেই এটা অবশ্য আনন্দের কথা।
অভিনন্দন তাঁকে আমরা জানাবো, কিন্তু তা শুধু এই কারণে নয় যে তিনি এখন কবিকনিষ্ঠ। কিংবা নিছক এ-কারণেও নয় যে তাঁর কবিতা অভিনব, যদিও তাঁর অভিনবত্ব পদে-পদেই চমক লাগায়।”

বাংলা কবিতায় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আবির্ভাব চমকপ্রদই ছিল। বুদ্ধদেব এক-এক করে চিনিয়ে দিয়েছিলেন সুভাষের প্রথম কবিতার বইয়ের অভিনবত্বগুলি। তাঁর ধারণায় সুভাষ সম্ভবত প্রথম বাঙালি কবি যিনি প্রেমের কবিতা লিখে কবি-জীবনের সূচনা ঘটাননি। ‘পদাতিক’ বইয়ের প্রথম লাইন হল– ‘কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?’ প্রেমের কবিতার মতোই সুভাষের কবিতায় ছিল না প্রকৃতিগাথা। কোথাও কোনও অস্পষ্টতা ছাড়া এমন সটান বাংলা কবিতায় আর কেউ আসেননি। সেইসঙ্গে ছিল কবিতার কলাকৌশলে আশ্চর্য দক্ষতা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অভিনব উপস্থিতির কথা শুধু বুদ্ধদেব বসুই নন, সেসময় অনেকেই খেয়াল করেছিলেন। সুভাষ ‘পদাতিক’ কবিতার প্রথম খসড়া পাঠ করেছিলেন ল্যান্সডাউন রোডে কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির ছাদে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সমর সেন। কবিতাটি শুনে সমর সেন না কি হেসে বলেছিলেন– ‘তুমি তো আমাদের ভাত মারবে হে।’

কবিতাভবন থেকে ১৯৪০-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ‘পদাতিক’ প্রকাশ করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। এক টাকা দামের ৩২ পৃষ্ঠার সূচিপত্রহীন ২৩-টি কবিতার এই বই ধর্মতলা স্ট্রিটের রংমশাল প্রেসে ছাপা হয়েছিল। প্রচ্ছদশিল্পীর নামের কোনও উল্লেখ প্রথম সংস্করণে ছিল না। তবে পরে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কবিতাসংগ্রহ’-র প্রথম দু’টি খণ্ডের সম্পাদক সুবীর রায়চৌধুরীকে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখে জানিয়েছিলেন যে, ‘পদাতিক’ বইটির কবিতাভবন সংস্করণের মলাট এঁকেছিলেন অনিল ভট্টাচার্য– ‘স্বাক্ষর করতেন আলফা-বিটা।’ সে-মলাটে ছিল কালো রঙে হাঁটার ভঙ্গিতে উদ্যত একজোড়া পায়ের ছবি।

কবিতাভবন থেকে ‘পদাতিক’ প্রকাশের ব্যয়ভার সামলেছিলেন কবির বন্ধু, বিশিষ্ট দার্শনিক ও চিন্তক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। দেবীপ্রসাদের স্কলারশিপের টাকাতেই ‘পদাতিক’ প্রকাশিত হয়েছিল। ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার ১৯৯৩ সালের শারদ সংখ্যায় তপতী চক্রবর্তীর সঙ্গে কথোপকথনে দেবীপ্রসাদ ‘পদাতিক’-এর দিনগুলি নিয়ে আরও চমকপ্রদ কথা শুনিয়েছিলেন– “কীরকম বুদ্ধদেববাবুর বাড়ির আড্ডা ছিল, একটা গল্প বলছি। সুভাষ কেষনগর [য.] থেকে একটা কবিতা লিখে পাঠালো। একটা খাম খুলে খামের ভেতরের যে জায়গাটা হয়, তাতে খুদি খুদি করে লিখে। আমাকে লিখলো ‘তুমি বুদ্ধদেববাবুর ‘কবিতা’ কাগজের জন্যে দিয়ে এসো।’ আমার প্রথমত খুব রাগ ধরলো, ঐরকম একটা চোতা কাগজে কবিতা লিখেছে, বুদ্ধদেববাবুর বাড়ি নিয়ে যাব, সুভাষটা কী ক্যাবলা। এইরকম মনে হলো। যাই হোক, সুভাষ লিখে পাঠিয়েছে আমি নিয়ে গেছি। সুধীন দত্ত বসে আছেন, আবু সৈয়দ [য.] বসে আছেন বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গে। তা কবিতাটা দিয়েছি। বুদ্ধদেববাবু কবিতাটা নিলেন, পড়লেন, কিছু বললেন না। সুধীনবাবুর হাতে দিলেন। সুধীনবাবু পড়ে বললেন, উনি তো আবার ইংরেজিতে ছাড়া কথা বলতেন না ‘My god, this boy is going to beat us.’ তারপর সব ধূমাধূম [য.] ঝগড়া আরম্ভ হলো যে এটা ঠিক পয়ার ছন্দ হয়েছে কি না? আইয়ুব বললেন, পয়ার ছন্দ হয়নি। বুদ্ধদেববাবু বললেন পয়ার ছন্দ হয়নি; তখন সুধীনবাবু একটা বড় কাগজে কবিতাটা লিখে স্ক্যান (scan) করে দেখালেন, ‘পারফেক্ট (perfect) পয়ার ছন্দ হয়েছে। কিন্তু পয়ার ছন্দ যে এরকম করে লেখা যায়, এটা আমরা আগে কেউ জানতুম না।’ এটি ছিল ‘পদাতিক’ বইয়ের ‘অতঃপর’ কবিতাটি, যার অন্তত শুরুর কয়েকটি লাইন আজও পাঠকের মন থেকে মুছে যায়নি– ‘সম্পাদক সমীপেষু,/ মহাশয় ইতস্তত ভূসম্পত্তি আছে নিম্নস্বাক্ষরকারীর। এ-দুর্দৈবে জমিদারি রক্ষা দায়। বংশপরম্পরাগত কিংকর্তব্যবিমূঢ় ভুবনে ঈশ্বর চালান, চলি।’…”

যে ‘পদাতিক’ বইটি নিয়ে এত কথা বললাম, সেটি আমি দে’জ পাবলিশিং থেকে পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম ১৯৯২ সালে। দেবব্রত ঘোষের মলাটে ক্রাউন সাইজের ছোট্ট বই। আবার, ২০১৮-য় সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের অঙ্গ হিসেবে দে’জ থেকে প্রণব বিশ্বাসের সুচারু গ্রন্থনায় বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। হাফ ফুলস্কেপ সাইজের এই বইটির পিছনে চমৎকার ‘পদাতিক পরিচয়’ সংযোজন করেছেন প্রণবদা। বইটির প্রকাশকের কথায় আমি বলেছিলাম–

‘পায়ে পায়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও এসে পৌঁছোলেন শতবর্ষের দোরগোড়ায়।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শতবর্ষ ভাবতেও কেমন যেন বিস্ময় হয়। মনে হয় এই তো সেদিনও তাঁর অমলিন হাসি আর স্নেহের অভ্যর্থনা সবার জন্য অবারিত ছিল। তাঁর প্রয়াণের পর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুরাগী পাঠকদের কয়েকজনের সহযোগিতায় তাঁর বইয়ের নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছি। আমরা কখনো ভুলিনি তাঁর অবর্তমানে আমাদের দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে গেল। তারপরেও যে-সব ভুলত্রুটি থেকে যায় তার দায় মেনে নিতেই হয়, আর মনে হয় কবির অনুসন্ধানী পাঠকেরা সে-সব ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতে নির্ভুল পাঠ তৈরি করতে আমাদের সাহায্য ও সহযোগিতা করবেন।…’

সুভাষ মুখোপাধ্যায়

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ শুরু আর শেষে দে’জের পক্ষ থেকে দু’টি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। শুরুর অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে– শেষেরটি গোর্কি সদনে। দু’টি অনুষ্ঠানেই বহু বিশিষ্টজন এসেছিলেন। আমার বিশেষ করে মনে আছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা। ইনস্টিটিউট হলের অনুষ্ঠানের দিন তাঁর কোথাও একটা শুটিং ছিল। সেখানে থেকে তিনি অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগেই চলে এসছিলেন। তখন অপু গিয়ে তাঁকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসে। সৌমিত্রদা আমাদের বাড়ির একটি ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নেন। অপু যখন জিজ্ঞেস করে– কী খাবেন? উনি বলেছিলেন, কফি হাউসের কফি আর স্যান্ডউইচ আনিয়ে দিতে। নিশ্চয় আমাদের বাড়ি এসে কমবয়সে কফি হাউসের দিনগুলোর কথা মনে পড়েছিল তাঁর। একসময় ওখানে দিনের অনেকটা সময় তাঁর কাটত। কার্যত, ‘এক্ষণ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরও ছিল কফি হাউস। সুভাষদার জন্মশতবর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে গোর্কি সদনে তিনি ‘কাল মধুমাস’ কবিতাটি পাঠ করেছিলেন, সেকথাও মনে আছে। গোর্কি সদনে অনুষ্ঠান হয়েছিল তিনদিন ধরে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে একটা প্রদর্শনীও হয়েছিল। গোটা অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে উপস্থিত থাকার কথা ছিল অপর্ণা সেনের। কিন্তু তিনি অসুস্থতার জন্য সেদিন আসতে পারেননি। অপর্ণা সেন সেদিন নিজে উপস্থিত না থাকতে পারলেও একটি ছোট্ট লেখা অপুকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে শমীকদা সেই লেখাটি পাঠ করেছিলেন। অপর্ণা সেন লিখেছিলেন–

“সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রথম চিনেছি বাবা-মার বন্ধু হিসেবে। ওঁরা ছিলেন আমাদের সুভাষকাকা আর গীতামাসি। এই ডাকের মধ্যে কোনো যৌক্তিকতা ছিল না। কেন যে ওঁদের কাকা-কাকিমা কিংবা মাসি-মেসো না ডেকে কাকা আর মাসি ডাকতাম, সেটা আজকের আমার কাছে অবোধ্য। তবু ভালো যে, ডাকটা ‘মামা-মাসি’ কিম্বা ‘কাকা-পিসি’ ছিল না! তাহলে সম্পর্কটা অহেতুক জটিল হয়ে উঠতো!
ওঁদের মেয়ের নাম ছিল পুপে, সে ছিল আমাদের বন্ধু। মানে আমার আর আমার পরের বোন রত্নার। পুপের পরে আরও বোন ছিল, তবে তারা তখন নেহাতই ছোটো। ছোটোবেলায় জানতাম না, পরে বড়ো হয়ে জেনেছি পুপে আর ওর বোনেরা সকলেই adopted। জেনে গীতামাসি আর সুভাষকাকার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ।

পরিবারের সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায়

আরও একজন সদস্য ছিল ওঁদের বাড়িতে– আপাদমস্তক লোমে ঢাকা একটি ভুটিয়া কুকুর। কোনদিকটা তার মাথা আর কোনদিকটা যে তার ল্যাজ, বোঝার যো ছিল না! নাম ‘এলোমেলো’। এলোমেলো-র মত সার্থকনামা জীব আমি আজ পর্যন্ত আর দুটি দেখিনি। একমাত্র গীতামাসি আর সুভাষকাকার মতো সুরসিক দম্পতির পক্ষেই ওই নামকরণ সম্ভব ছিল।
বড়ো সরল আর ভালো মানুষ ছিলেন ওঁরা। গল্প শুনেছি, এক রাতে চোর এসে নাকি ওঁদের সর্বস্ব চুরি করে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে দেখা গেল সুভাষকাকা আর গীতামাসি খাটের ওপরে বসে আছেন। সে ঘরে ওই খাট ছাড়া আর সবকিছু খোয়া গেছে। মহা খুশি দু-জনে, তোষকের নীচে পরের দিনের বাজার-খরচের টাকা রাখা ছিল, সেটা নিতে পারেনি চোর!
সেসময়ে সুভাষকাকার সঙ্গেই দেখা হত বেশি, যদিও গীতামাসির লেখা ‘ববির বন্ধু’ পড়ে তাঁর বিরাট ফ্যান হয়ে গিয়েছি ততদিনে। আমাদের পাম অ্যাভেনিউয়ের বাড়ির বারান্দায় তখন প্রায় রোজই আড্ডা বসত বিদগ্ধজনেদের। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আশিস বর্মণ, শান্তি চৌধুরী, মৃণাল সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়… এঁদের ছিল সেই আসরে নিত্য আনাগোনা। সুভাষকাকা অত্যন্ত মৃদুভাষী। শান্তি চৌধুরীর গমগমে কণ্ঠস্বরের পাশে তাঁর গলা প্রায় শোনাই যায় না। গুনগুন করে কথা বলেন নীচুস্বরে। যেদিন একলা আসেন, বাবার সঙ্গে গল্প করেন অনেকক্ষণ ধরে। সেরকমই এক সন্ধ্যায় ডাক পড়ল আমার। সবে বারো পুরেছি তখন, এবং অপরাধের মধ্যে ওই বয়সেই ‘রেকারিং ডেসিম্যাল’ নাম দিয়ে একটি অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ বাংলা গদ্য-কবিতা লিখে ফেলেছি। ওই বয়েসে কবিতা লেখার একটা ব্যর্থ চেষ্টা অন্তত না করলে আর কীসের বাঙালি? বাবা বললেন, ‘সুভাষকে শোনা তোর কবিতাটা।’ তখনও পর্যন্ত সুভাষকাকার কোনো কবিতা আমি পড়িনি, পড়লে কিছুতেই রাজি হতাম না! তাই প্রথমে মিনমিন করে কিছুটা আপত্তি করলেও, শেষ পর্যন্ত বাধ্য মেয়ের মতো পড়ে শোনালাম কবিতাটা। চুপ করে শুনলেন সুভাষকাকা। তারপর চুপ করেই রইলেন আরও খানিকক্ষণ। দেখলাম ওঁর ঠোঁটে চাপা হাসি, যেন হাসি চাপবার চেষ্টা করছেন। শেষটায় বাবাকে বললেন, ‘আপনার মেয়ের কবিতায় যেটা রয়েছে তা আজকাল খুব কম কবিতাতেই পাওয়া যায়। সেটা হল সার। তবে…’ এবার আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘…তুমি গদ্য-কবিতা লিখছ কেন এইটুকু বয়েসে? প্রথমে ছন্দ মিলিয়ে লেখার চেষ্টা করো না!’
প্রচণ্ড রাগ হল! পরদিন বাবাকে বললাম, ‘কেন তুমি কাল কবিতা শোনাতে বললে আমাকে? আর কক্ষনো যার-তার সামনে কবিতা পড়তে বলবে না বলে দিলাম!’
বাবা অবাক হয়ে বললেন, ‘যার-তার মানে? তুই জানিস সুভাষ কত বড়ো মাপের কবি? আয় তোকে ওর কবিতা পড়ে শোনাই…’
সেই শুরু। ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,/ চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য/ কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।…’ নেশা লেগে গেল! এমন গভীর মানবিক কথা, এমন প্রখর রাজনৈতিক বক্তব্য এইরকম ছন্দোবদ্ধভাবে বলা যায়! এবার বুঝতে পারি কেন উনি আমাকে বলেছিলেন ছন্দ মিলিয়ে লেখার চেষ্টা করতে! বারো বছরের আমি সুভাষকাকাকে ছাড়িয়ে আবিষ্কার করি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে। কণ্ঠস্থ হয়ে যায় কবিতাগুলো…

‘চিমনির মুখে শোনো সাইরেন-শঙ্খ,
গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে,
তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য
জীবনকে চায় ভালোবাসতে।’

কী বলিষ্ঠ তাঁর রাজনীতি! কী গভীর তাঁর মানবিকতা!
তারপর ‘লাল টুকটুকে দিন’-এর সেই যুগান্তকারী লাইনগুলো, যা আচ্ছন্ন করে ফেলতো আমাদের…?

‘তুমিই আমার মিছিলের সেই মুখ!
এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত যাকে খুঁজে
বেলা গেল।
ফিরে দেখি সেই আগন্তুক
ঘর আলো করে বসে আছে পিলসুজে।…’

অভাবনীয় চিত্রকল্প! যতটা রোম্যান্টিক, ততটাই বৈপ্লবিক! যত বয়েস বাড়ে, ততই ধীরে ধীরে আমার বড়ো হয়ে ওঠার একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা। কলেজের সিঁড়িতে, কফি হাউসের আড্ডায় ফিরে ফিরে আসে পঙ্‌ক্তিগুলো, রক্তে জোয়ার আনে…

‘সারাদিন গেল।
কেন দিলে না কো দেখা–
ফুৎকারে দিক্‌পৃথিবী আঁধার ক’রে?
বুঝি সেই রাগে
ঝঞ্ঝায় একা একা
এখনও বজ্র আকাশকে ছেঁড়ে খোঁড়ে?

দিগন্তে কারা আমাদের সাড়া পেয়ে
সাতটি রঙের
ঘোড়ায় চাপায় জিন
তুমি আলো, আমি আঁধারের আল বেয়ে
আনতে চলেছি
লাল টুকটুকে দিন।’

‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত…’ কী দৃপ্ত, কী প্রত্যয়ী কন্ঠস্বর এই কবির! ‘পদাতিক’-এর কবি। ‘কাল মধুমাস’-এর কবি। ‘যত দূরেই যাই’-এর কবি। আরও কত, কত অসামান্য কবিতার…
চিরকালের মতো হৃদয়ে মুদ্রিত হয়ে যায় তাঁর রচিত পঙ্‌ক্তিগুলো। এই যে এতক্ষণ লিখছি, সবটাই তো মন থেকে লিখলাম, একবারও তো একটা বইয়ের পাতা উলটে দেখলাম না। কিছু ভুল রয়ে গেল হয়তো বা, কিন্তু সেই ভুলগুলোও তো তাঁর সৃষ্টির প্রতি আমার অনুরাগেরই অংশ!

এত দৃপ্ত, এমনকী সময় বিশেষে উদ্ধত তাঁর কণ্ঠ, অথচ রোজকার জীবনে এত বিনয়ী, মানবজাতির প্রতি এমন সরল বিশ্বাসে প্রাণিত মানুষ বড়ো একটা দেখিনি। মানবদরদী এই মানুষটি স্বভাবতই বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন চিরকাল, কিন্তু বামপন্থী দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ অবস্থার কথা যত জানতে পারছিলেন, ততই হতাশায় ভরে উঠছিল তাঁর মন। মনে মুখে এক ছিলেন বলে সেকথা লুকোননি কখনো, যে কারণে সমসাময়িকদের কাছ থেকে আক্রমণও এসেছে তাঁর প্রতি। উৎপল দত্ত একবার Wordsworth সম্পর্কে লেখা Browning-এর বিখ্যাত কবিতা থেকে উদ্ধৃত ক’রে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন, ‘Just for a handful of silver he left us,/ Just for a riband to stick in his coat–’
অথচ সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে যাঁরা চিনতেন, তাঁরা সকলেই জানতেন যে তাঁর মধ্যে সততার কোনো অভাব ছিল না। মন থেকেই বিশ্বাস হারাতে শুরু করেছিলেন। বামপন্থার প্রতি না হোক, বামপন্থী দেশগুলোর প্রতি। মনে আছে ১৯৮৯-এ রাশিয়া থেকে ঘুরে আসার পর হতাশায় ভরে গিয়েছিল আমার মনও। যা দেখেছিলাম, যা বুঝেছিলাম, তার বিবরণ দিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম ‘The Telegraph’ কাগজে। লেখাটা পড়ে সুভাষকাকা ফোন করেছিলেন আমাকে–
‘কতদিন ছিলে তুমি ওখানে রিনা ?’
বললাম, ‘দশদিন। মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জুরি হয়ে গিয়েছিলাম তো…’
‘যা লিখেছো, একদম ঠিক লিখেছ, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি বুঝলে কী করে বলো তো? আমার তো কতদিন লেগেছিল বুঝে উঠতে!’
মনে মনে বলেছিলাম, তাতো লাগবেই। তুমি যে বড় সরল মানুষ সুভাষকাকা! মানুষকে খারাপ ভাবতে পারো না কিছুতেই।
আজ কূটনীতিতে ভরা এই দুনিয়ায়, মনেপ্রাণে খাঁটি সেই মানুষটির জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে আমার অন্তরের শ্রদ্ধা জানাই।”

তবে দে’জ থেকে ১৯৯২ সালে পুনর্মুদ্রিত ‘পদাতিক’ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম বই নয়। সুভাষদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক আরও অন্তত ২০ বছরের পুরনো। কলকাতায় এসে প্রকাশনা শুরু করার পর-পরই তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। হয়তো ‘বিশ্ববাণী’ তাঁর বই ছেপেছিল বলে আমার বাবা কিংবা দাদাদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। মনে হয় সেই সূত্রেই ১৯৭৪ সালে আমি দে’জ থেকে সুভাষদার বই ছাপতে পেরেছিলাম।

দে’জ থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম বই– ‘অক্ষরে অক্ষরে’। রবীন দত্তের প্রচ্ছদ ও অলংকরণে ১৯৭৪-এর ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিনে পুনর্মুদ্রিত বইটি প্রথমবার ছাপা হয়েছিল ১৯৫৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ‘অক্ষরে অক্ষরে’ ছোটদের জন্য ন’টি লেখার সংকলন। বইয়ের একেবারে শুরু থেকে সুভাষদার বুড়ো আঙুলের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। বইটির ভূমিকাতুল্য গদ্যে তিনি লিখেছিলেন–

‘দাঁড়াও। এক মিনিট।–
হয়েছে। আচ্ছা, বলো তো এই এক মিনিট আমি কী ভাবছিলাম? হাজার মাথা খুঁড়লেও বলতে পারবে না।
আমি জানালে পরে তবেই তুমি জানতে পারো। না জানালে কেমন করে জানবে? জানাবার এই উপায়টার নামই ভাষা।
তোমাকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমি যেখানে আছি, সেখান থেকে চিৎকার করলেও তোমার কানে যাবে না।
তাহলে উপায়? উপায় আমার হাতেই আছে। মুখের ভাষাটাকে যদি কোনো কিছুতে ধরে তোমার কাছে পৌঁছে দিতে পারি, তাহলেই আর কোনো মুশকিল থাকে না।
ভাষা পৌঁছে দেবার এই উপায়টার নামই লেখা।
জানবার আর জানাবার কিসের এতো মাথাব্যথা? চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকলেই হয়! চুপচাপ হাত গুটিয়ে বসে থাকলে মানুষ আর মানুষ হতে পারতো না। আজও ল্যাজ উঁচু করে বনেজঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে হতো।
হাতের জোরেই মানুষ পেরেছে জানতে আর জানাতে; শিখেছে কথা বলতে, নাচগান করতে, কবিতা বানাতে। কাজ থেকেই এসেছে তাল-মান-ছন্দ।
শিল্প-সাহিত্য তাহলে আকাশ থেকে পড়েনি। সমাজ থেকেই উঠেছে। তার প্রমাণ? এ বইতে পাওয়া যাবে অজস্র প্রমাণ।
সমাজের ছাপ পড়ে শিল্প-সাহিত্যে। জলে যেমন গাছের ছায়া পড়ে, ঠিক তেমনি?
না। শিল্প-সাহিত্য সমাজের অকর্মণ্য ছায়া নয়।
ভস্মলোচনের গল্প জানো? ভস্মলোচন যা-কিছু দেখতো, তাই পুড়ে যেতো। যেদিন সে ছায়ার মধ্যে নিজেকে দেখলো, সেদিন নিজেই সে পুড়ে গেলো।
ভস্মলোচনের মতো যে সমাজ বেশিরভাগ মানুষকে দগ্ধায়, তার ছায়া ফুটিয়ে তুলে শিল্প-সাহিত্য সেই সমাজকে ধ্বংস করার কাজে হাত লাগাতে পারে।
তেমনি আবার নতুন ভবিষ্যৎ, নতুন জীবন এগিয়ে আনবার কাজে সহায় হতে পারে শিল্প-সাহিত্য।
তার প্রমাণ? এ বইতে তার অজস্র প্রমাণ।
এক কথায়, মানুষের হাত দেখে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের কথা বলা। হাতের মধ্যে কী আছে? আছে কাজ, আছে কথা। মুঠোর মধ্যে? জগৎ।’

কিশোর-কিশোরীদের জন্য লেখা তো কী হয়েছে! সুভাষদা নিজের বিকল্প শিল্প-বিশ্বাসের কথা সবসময়েই বলে এসেছেন।

যদিও কমিউনিস্ট সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে ১৯৫৪ সাল খুব একটা সুখের সময় ছিল না। সেবছর মার্চ মাসে কার্ল মার্কসের ‘ওয়েজ লেবার অ্যান্ড ক্যাপিটাল’ পুস্তিকাটি অবলম্বনে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন– ‘ভূতের বেগার’। প্রকাশক ছিলেন কালিদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবেশক হিসেবে বেঙ্গল পাবলিশার্সের নাম ছিল, আর প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন খালেদদা (খালেদ চৌধুরী)। ‘বন্ধু মহম্মদ ইলিয়াস’কে উৎসর্গ করা বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন–

‘গোড়াতেই বলে রাখা ভালো, এটা ভূতের গল্প নয়। কার্ল মার্কসের মজুরি ও পুঁজি [ওয়েজ, লেবার অ্যান্ড ক্যাপিটাল] বইটি অবলম্বন করে অর্থনীতির কথাগুলো সহজ বাংলায় বলবার চেষ্টা করেছি। কাজটা কঠিন। কিন্তু তা হলেও সাহস করে একাজে এখুনি হাত দেওয়া দরকার। আমাদের দেশে মার্কস-পড়া পণ্ডিতের অভাব নেই। দুঃখের বিষয়, তাঁরা বিদ্যের জাহাজ হয়ে বসে আছেন, কম লেখা-পড়া-জানা মানুষদের কাছে খানিকটা জ্ঞান পৌঁছে দেবার তেমন চাড় তাঁদের তরফ থেকে দেখা যাচ্ছে না।
এ বইতে যে খুঁতগুলো আছে, তেমন কেউ লিখলে হয়তো খুঁতগুলো এড়ানো যেত। কিন্তু যতদিন সে ধরনের নিখুঁত বই না হচ্ছে, ততদিন এ-ধরনের বইও কাজে লাগবে– এই ভরসায় এ-বই পাঠকদের হাতে তুলে দিচ্ছি। সেই সঙ্গে আশা করছি, ছোট ডিঙির আস্পর্ধা দেখে জাহাজদের টনক নড়বে।’

অশোক মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

কিন্তু ১৯৫৫-র ২ জানুয়ারি ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর নামে ‘ভূতের বেগার’-এর বিরূপ সমালোচনা বেরুল। ‘স্বাধীনতা’য় লেখা হল, ‘মার্কসের ‘মজুরি ও পুঁজি’ বিষয়ে সহজ করে লিখতে গিয়ে লেখক ‘বিজ্ঞানের শুদ্ধতা বা যথার্থতা’ ক্ষুণ্ণ করেছেন। পার্টির এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন গোপাল হালদার, চিন্মোহন সেহানবীশ, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়রা। সুভাষদা পরে যখন ‘চিঠির দর্পণে’ লিখলেন তখন এই ঘটনার উল্লেখ করে বলেছেন–

“আমার লেখা ‘ভূতের বেগার’ নিয়ে পার্টি নেতৃত্বের সঙ্গে তখন জোর কাজিয়া চলেছে। ‘বুদ্ধিজীবী’ বলে পার্টিতে যাদের হেলাফেলা করা হয়, ‘ভূতের বেগারে’র পেছনে তারা সবাই এককাট্টা। ফলে নেতারা পড়েছেন ফ্যাসাদে। এখন না পারছেন গিলতে, না পারছেন ওগরাতে।
এদিকে প্রকাশকের মাথায় হাত। পার্টির নিষেধাজ্ঞা থাকায় পার্টির দোকান বইটি রাখেনি। ভয়ে পার্টির কেউ সেই বই কেনেনি। অপছন্দের বই বলে পার্টি আঁতুড়ঘরে নুন দিয়ে মারল। ক্ষমতায় না থেকেই এই।”

হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়

অথচ তার দু’ বছর আগেই সুভাষদা গীতাদিকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন বজবজের ব্যঞ্জনহেড়িয়া গ্রামে। চটকলের মজুরদের মধ্যে পার্টির সংগঠনের কাজ করবেন বলে। গীতাদি ‘ভালোবাসার কথা’ লেখাটিতে জানিয়েছেন সেদিনের কথা–

“১৯৫২ সালের এক ভোরবেলায় শ্বশুরমশাইয়ের চোখের জলের মধ্যে দিয়ে, ‘ফিরে চল মাটির টানে’ বলে একটা ধড়ধড়ে ট্রাকে কিছু নড়বড়ে তক্তোপোষটোস নিয়ে যখন উঠলাম গিয়ে বজবজের ব্যঞ্জনহেড়িয়া গ্রামের এঁদো পুকুরের ধারে এক মুসলমানের কুঁড়ে বাড়িতে, তখন কিন্তু এসব উঁচুনিচু সুর একটা মজাদার লয়ে বাঁধা পড়ে গিয়েছিল। আর বোধ হয় সেই ‘সুরে সুরে সুর মিলায়ে’ সুভাষ আবার অনেকদিন পরে এক ঝুড়ি কবিতাও লিখে ফেলেছিল।
তবে, আজও সুভাষের বাবার সেই একমাত্র ছেলের তাঁকে ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ার শোক আমি ভুলতে পারিনি।
তখনকার দিনের সেইসব চরকিঘোরা কাজকর্মের কথা ভাবলে হতভম্ব হতে হয়। সকালে চটকলের মজুরদের বোনাসের দাবিতে গেট মিটিং-এ সামিল, দুপুরে মেয়েদের নিরক্ষরতা দূর করতে সাজ্জাদদার বাড়িতে দাওয়ায় মাদুরপাতা স্কুলে পড়ানো, বিকেলে পোলট্রি তৈরি করার তোড়জোড়। তার মধ্যে প্রায়ই কলকাতায় এসে সুভাষ ‘বোনাস’ আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে কাগজ বের করার প্ল্যান বানিয়ে ফেলল। এর ওপর ইদের দিনে ঢালাও খাওয়াদাওয়া তো আছেই।”

সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়

পরে অবশ্য গীতাদি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তবু সুভাষদার উদ্দীপনার সীমা ছিল না। কারখানার মজুরদের গঠনমূলক রোজগারের জন্য পোলট্রি ফার্মের কাজে মেতে উঠলেন। গীতাদির কথায়– ‘মুরগি সংগ্রহের কাজে কবিতাটবিতা বিসর্জন দিয়ে সুভাষ উঠে পড়ে লেগে গেল। রোড আইল্যাণ্ডরেড, লেগহর্ন– লাল, শাদা সব দারুণ দারুণ তাগড়াই মুরগি। সরকারি পোলট্রি থেকে কেনা হলো গুঁড়ো গুঁড়ো একশোটা বাচ্চা আর গোটা তিরিশ ধাড়ি মুরগির সন্ধান মিলল লোয়ার সার্কুলার রোডের এক বড়োলোকের বাড়িতে। প্রায় জলের দরে আমাদের হাতে তাঁরা সেগুলোকে তুলে দিয়ে বাঁচলেন। কিন্তু এরা যাবে কী করে বজবজ? অশোক মিত্র (প্রাক্তন মন্ত্রী) না বুঝে গলাটি বাড়িয়ে দিলেন। একে বিলেত-ফেরত, তায় বিরাট বিদেশী মোটরগাড়ি। লেফট-হ্যান্ড ড্রাইভ। রাইট হ্যাণ্ডে, সামনের সিটে, বসে খোদ ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক ব্লণ্ড সায়েব বন্ধু। হাসিখুশি সবাই। শুধু মুরগিগুলো বিক্ষুদ্ধ জনসাধারণের মতো ব্যবহার শুরু করল নিউ আলিপুরের পথে। কিছু মুরগি ঝুড়িতে আটকানো ছিল পেছনের লাগেজ রাখার জায়গায়। কিছু ছিল ভেতরের সিটে এবং পা রাখার জায়গায়। সেখানে কীরকম একটা আওয়াজ উঠতেই তাকিয়ে দেখি– দুটো শাদা মুরগি উঠে ডানা ঝাপটে জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ‘থামাও থামাও।’ ঘ্যাঁচ করে ব্রেক। সুভাষ গ্যাঁট হয়ে বসে রইল। অশোক আর আমি পড়ি-মরি করে অ্যাকসিডেন্ট সামলে মুরগিদুটোকে ধরে এনে দেখি সুভাষ আর সায়েবটি মহানন্দে সিগারেট খাচ্ছে আর হাসছে। আবার যাত্রা শুরু। মাঝেরহাট বরাবর চারটে মুরগি পেছনের ঝুড়ির ফাঁক দিয়ে চম্পট। আবার সেই ছুটোছুটি। এবার সায়েব হাত লাগাতে, তাড়াতাড়ি কাজ হলো। অশোক হাঁপাতে হাঁপাতে খাড়া চুলগুলোকে মাথায় বসাতে বসাতে বলে উঠল– ‘এবার আমি স্ট্রাইক করব।’ যাই হোক, হাসিকান্নার মধ্যে দিয়ে ‘ধর-ধর বাঁধ-বাঁধ’ করতে করতে আমরা গ্রামে পৌঁছে গেলাম। মুরগিগুলো নামাতে নামাতে সাজ্জাদদা হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আরে, গাড়ির সিটে ওরা দুটো ডিম পেড়ে গেছে।’ শুনে যা হল্লা হলো। সায়েব বন্ধুটি ঘাসের ওপর গড়িয়ে গড়িয়ে হোহো করে হাসতে লাগল– ‘ও। হোয়াট্ ফান।’ আর সুভাষ তখনই ‘ওমলেট ভাজো।’ বলে ফতোয়া জারি করে দিল।”

বজবজে দিনগুলোয় কমিউনিস্ট সুভাষ মুখোপাধ্যায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আনখশির ডুবে গেলেও কবিতা তাঁকে ছেড়ে যায়নি। গীতাদি যেমন লিখেছেন– ‘সুভাষ আবার অনেকদিন পরে এক ঝুড়ি কবিতাও লিখে ফেলেছিল।’

দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ‘সালেমন, কবিরণ/ বজবজে সুভাষ মুখোপাধ্যায়’ বইয়ে ‘চিঠির দর্পণে’র সূত্র ধরে দেখিয়েছেন বজবজে সুভাষদার লেখা প্রথম কবিতা– ‘এক অসহ্য রাত্রি’, যার শুরুর লাইনগুলো হল–

‘কী গভীর এক চিন্তায়
কপাল কুঁচকে আছে
চড়িয়ালের রাস্তা।…’

কবিতাটি সামান্য অন্য চেহারায় সুভাষদার ‘ফুল ফুটুক’ বইতে আছে। এই বইয়ে আছে গণস্মৃতিতে থেকে যাওয়া তাঁর অনেকগুলি কবিতা– ‘দিয়েন বিয়েন ফুঃ’, ‘পারাপার’, ‘পুপে’, ‘গাজনের গান’, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’। আর বজবজ পর্বে সুভাষদার সবথেকে বিখ্যাত কবিতা ‘সালেমনের মা’–

‘পাগল বাবরালির চোখের মতো আকাশ।
তার নিচে পাঁচ ইস্টিশান পেরনো মিছিলে
বারবার পিছিয়ে প’ড়ে
বাবরালির মেয়ে সালেমন
খুঁজছে তার মাকে।

এ কলকাতা শহরে
অলিগলির গোলকধাঁধায়
কোথায় লুকিয়ে তুমি,
সালেমনের মা?
বাবরালির চোখের মতো এলোমেলো
এ আকাশের নীচে কোথায়
বেঁধেছো ঘর তুমি, কোথায়
সালেমনের মা?

মিছিলের গলায় গলা মিলিয়ে
পিচুটি-পড়া চোখের দুকোণ জলে ভিজিয়ে
তোমাকে ডাকছে শোনো, সালেমনের মা–

এক আকালের মেয়ে
তোমার আরেক আকালের মুখে দাঁড়িয়ে
তোমাকেই সে খুঁজছে।’

বাংলায় এমন কবিতা খুব বেশি লেখা হয়নি, একথা বললে মনে হয় অত্যুক্তি হবে না।

দে’জ পাবলিশিং থেকে ‘অক্ষরে অক্ষরে’ প্রকাশের ছ’ বছর পর আমি ফের পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম সুভাষদার আরেকটি কবিতাবই– ‘কাল মধুমাস’। ১৯৬৬ সালে পূর্ণেন্দুদার প্রচ্ছদে বইটি প্রথম ছেপেছিলেন ভারবি-র গোপীমোহন সিংহরায়। ‘কাল মধুমাস’-এর উৎসর্গের পাতায় সুভাষদা লিখেছিলেন– ‘আকৈশোর আমার কবিতার অক্লান্ত পাঠক/ রমাকৃষ্ণ মৈত্র/ বন্ধুবরেষু’।

রমাকৃষ্ণ মৈত্র ‘দিগ্বিজয়ী পদাতিক’ নামে একটি লেখায় বলেছেন– “আমি পড়তাম ভবানীপুর মিত্র স্কুলে। ক্লাস থ্রি থেকে। কাঁসারিপাড়ার নাসিরুদ্দিন স্কুল থেকে হেমন্ত এসেছিল ক্লাস ফোর-এ। দু-একদিনের মধ্যে আমাদের দুজনের ভাব-ভালোবাসা চিটে-গুড়ের মতো আঠালো হয়ে গিয়েছিল। ক্লাস সেভেন কি এইট-এ ১৯৩৪ কি ১৯৩৫-এ সত্যভামা থেকে সুভাষ এসে গেল মিত্র-তে। আসা মাত্রই অদৃশ্য চুম্বকের টানে সে হেমন্ত আর আমার জুড়িতে আটকে গেল। আমরা হয়ে উঠলাম অভিন্ন-হৃদয় তিন বন্ধু– সুভাষের ভাষায় ‘ত্রি-মূর্তি’। দেখতে দেখতে আমাদের চিটেগুড়ের ভালোবাসা মিছরির মতো মিষ্টিমধুর দানা বেঁধে গেল।” এখানে হেমন্ত মানে যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘অক্ষরে অক্ষরে’ আর ‘কাল মধুমাস’-এর মধ্যে ১৯৭৬ সালে দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল সুভাষদার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। এটিও পুনর্মুদ্রণ ছিল, কিন্তু নতুন দে’জ সংস্করণে তা অনেকটা পরিবর্ধিত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ দিয়েই দে’জ পাবলিশিং-এর শ্রেষ্ঠ কবিতা সিরিজটি শুরু হয়, মলাট করেছিলেন পূর্ণেন্দুদা। এর পরের বছর বেরিয়েছিল শক্তিদা আর বুদ্ধদেব বসুর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, আর ১৯৭৮-এ সুনীলদা, নীরেনদা এবং শঙ্খদার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। ১৯৭০ সংস্করণের ভূমিকায় সুভাষদা লিখেছিলেন–

‘পাঠকদের জানিয়ে রাখা ভালো, এ বইয়ের নামকরণে আমার কোনো হাত নেই। বাছাইয়ের ভারও আমি নিই নি। কারণ, আমি সে ভার নিলে ঠগ বাছতে হয়তো গাঁ উজাড় হয়ে যেত।
শুধু একটা কথা নিবেদন করে রাখি। কবিতা লেখায় মাঝে মাঝে ছেদ পড়লেও এখনও যেহেতু পূর্ণচ্ছেদ পড়েনি, সেইজন্যে ভবিষ্যতে এ বইতে যোগবিয়োগ ঘটবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা আছে।
এ নির্বাচন কারো ভালো লাগলে, সেটা হবে বন্ধু রমাকৃষ্ণ মৈত্র আর শঙ্খ ঘোষের হাতযশ।’

আবার দেখছি ১৯৮৬ সালে দে’জের পঞ্চম পরিবর্ধিত সংস্করণে লিখছেন–

“এ ধরনের সংকলনে বার বার ঝাড়াই-বাছাই করতে হয়। দুটো কারণে: প্রথমত, নতুন লেখাকে ঠাঁই দেবার জন্যে পুরনো কিছুকে সরাবার দরকার পড়ে– যাতে বই ভারী হয়ে পাঠকের ট্যাঁকে টান না পড়ে; দ্বিতীয়ত, লেখক যদি দীর্ঘায়ু হয়ে আরও কবিতার জন্ম দেন।
যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণই আশ। একবার যবনিকা পড়ে গেলে তবেই এই খেল খতম হয়।
‘শ্রেষ্ঠ’ কথাটা নিয়ে বেশি ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। জ্ঞানপাপীদের মুখে বেশি কথা শোভা পায় না।
শঙ্খ ঘোষের ওপর প্রুফের বোঝা চাপিয়ে ভুলের বোঝা থেকে পাঠকদের নিষ্কৃতি দিতে চেয়েছি– নিজে নেহাৎ অপারগ হয়ে। শঙ্খকে ধন্যবাদ দিয়ে আমার ঋণ শোধ হবার নয়।
সুধাংশু দে-কেও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ছোট করব না।”

সুভাষদার জন্মশতবর্ষে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশের কথা আমরা ভেবেছিলাম। প্রস্তুতি সম্পূর্ণও হয়েছিল, কিন্তু গোটা পৃথিবী জুড়ে কোভিড-১৯-এর ধাক্কায়, নানা বাধাবিপত্তিতে থমকে যাওয়া সময়ে সেই পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত জন্মশতবার্ষিক ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ আমি প্রকাশ করতে পারিনি। ২০২২-এর ডিসেম্বরে সে-বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এই সংস্করণেও প্রণব বিশ্বাসের সহায়তা ভোলার নয়। প্রকাশকের নিবেদনে আমি লিখেছিলাম– “…‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র প্রতিটি সংস্করণ যাঁর তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত, এই বই প্রকাশের লগ্নে সেই শঙ্খ ঘোষও আর আমাদের মধ্যে থাকলেন না।” শঙ্খদার সঙ্গে সুভাষদার সম্পর্কের কথা বলতে গেলে তা সহজে শেষ হবার নয়।

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!

পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!

পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়

পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়

পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়

পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!

পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু

পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না

পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম