Robbar

চণ্ডীমঙ্গল না পড়লে সে কীসের বাঙালি!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 31, 2026 11:27 am
  • Updated:March 31, 2026 11:31 am  

আজকের বাঙালি আপনি জানেন না, ১৫৪৭-এ বর্ধমানের নাম দামুন্যা! দামুন্যা কি তখনও ফেমাস ছিল মিহিদানার জন্যে? বর্ধমানে আটকে থেকে লাভ নেই। কেননা এই বাঙালি কবি ৪৭ বছর বয়েসে মেদিনীপুরের আরড়ায়। সেখানেই সেই বাঙালি মহাকবি তৈরি করেছে তার নতুন কাব্য লেখার চৌকি। এই বাঙালি কবির পদবি চক্রবর্তী। নাম মুকুন্দরাম। আর ১৫৯৪-এ এই কবি যে নতুন কাব্য রচনা করে বাঙালি মহাকবি পরিচয়ে ‘অমরত্ব’ অর্জন করতে চলেছে, অন্তত এই বঙ্গ সন্তানের ‘ধৃষ্ট’ প্রত্যয় সেটাই, সেই মহাকাব্যের নাম ‘চণ্ডীমঙ্গল’। তখনও সে অবিশ্যি জানে না চণ্ডীমঙ্গল রচনা করতে তার ১২ বছর লাগবে, ১৫৯৪ থেকে ১৬০৬। ভাগ্যিস তখনও বাংলা সাহিত্যে পুজোসংখ্যার হুড়োতাড়া, যুদ্ধদ্রুতি শুরু হয়নি!

প্রচ্ছদের চিত্র: অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

৮৭.

আমরা, মানে বাঙালিরা, বাঙালি বলতে অজ্ঞান। এতে কোনও অন্যায় নেই। কিন্তু ইদানিং আমার মনে একটি দুঃস্বপ্ন জাগ্রত হয়েছে। এবং এই দুঃস্বপ্নে স্বপ্ননেশাগ্রস্ত ফ্রয়েডের কিঞ্চিৎ ষড়যন্ত্র আছে বলেই মনে হয়। আমি মাঝেমধ্যে একটি বহু পুরনো আরশির সামনে দাঁড়াই। সেখানে আমার ধোঁয়াটে রিফ্লেকশন আমার সামনে ফেস টু ফেস। আর তখুনি কাণ্ডটা ঘটে। ওই ধোঁয়াটে ভৌতিক বাঙালির সামনে আজকের বাঙালি ‘আমি’-কে বহিরাগত মনে হয়। আর এক হিমপ্রবাহ সাপের মতো লিকলিক চলনে নামতে থাকে আমার বাঙালি শিরদাঁড়া বেয়ে। আমি ওই মাকড়শার জাল ঢাকা আবছা আরশিতে একটা বাঙালিকে দেখতে পাই। তাকে আমি চিনি। কিন্তু কতটুকু? তার বেশিটুকুই চিনি না। চিনতে চাইও না। কী সার্থক আমার বাঙালি অহং!

ওই যে আবছা, মাকড়শার জালঢাকা আয়নায় জ্যান্ত হয়ে ওঠা বাঙালি, সে এইমাত্র নিজের হাতে বানিয়েছে তার কাব্য লেখার একটা নতুন রতনচৌকি। এবং সে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে সেই চন্দনকাঠের রতনচৌকির পানে। এই চৌকিতে ভূর্জপত্র রেখে সেই বাঙালি লিখবে এমন এক কাব্য, যা হয়ে থাকবে বিকল্পহীন, বাংলা ভাষায়। এবং এই বোকা বাঙালি কবি, যার বয়স এখন ৪৭, কেননা সে যতদূর জানে তার জন্ম ১৫৪৭-এ আর সে তার নতুন কাব্য লেখার চৌকিটা তৈরি করল ১৫৯৪-তে। তাহলে তার বয়েস এখন ৪৭ হল কি না? এবার আসল কথাটা বলি। এই খাঁটি বাঙালি কবির জন্ম দামুন্যায়।

দামুন্যায়! জানি, আজকের বাঙালি আপনি জানেন না, ১৫৪৭-এ বর্ধমানের নাম দামুন্যা! দামুন্যা কি তখনও ফেমাস ছিল মিহিদানার জন্যে?

বর্ধমানে আটকে থেকে লাভ নেই। কেননা এই বাঙালি কবি ৪৭ বছর বয়েসে মেদিনীপুরের আরড়ায়। সেখানেই সেই বাঙালি মহাকবি তৈরি করেছে তার নতুন কাব্য লেখার চৌকি। এই বাঙালি কবির পদবি চক্রবর্তী। নাম মুকুন্দরাম। আর ১৫৯৪-এ এই কবি যে নতুন কাব্য রচনা করে বাঙালি মহাকবি পরিচয়ে ‘অমরত্ব’ অর্জন করতে চলেছে, অন্তত এই বঙ্গ সন্তানের ‘ধৃষ্ট’ প্রত্যয় সেটাই, সেই মহাকাব্যের নাম ‘চণ্ডীমঙ্গল’। তখনও সে অবিশ্যি জানে না চণ্ডীমঙ্গল রচনা করতে তার ১২ বছর লাগবে, ১৫৯৪ থেকে ১৬০৬। ভাগ্যিস তখনও বাংলা সাহিত্যে পুজোসংখ্যার হুড়োতাড়া, যুদ্ধদ্রুতি শুরু হয়নি!

এখানে একটু র‍্যাম্বলিং করতে ইচ্ছে করছে। যত বয়েস বাড়ছে, তত আমার মূল লেখার মধ্যে ভিন্ন ভাবনার পায়চারি এসে পড়ছে। কন্ট্রোল করতে পারছি না। হয়তো চাইছিও না। কথাটা কিন্তু না বললেও নয়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, এই নামের গোড়ায় একটি রোচক বিশেষণ আছে। সেটি হল, ‘কবিকঙ্কণ’। ওটা নাকি উপাধি, মহাকাব্য লেখার জন্য। পুরো নাম সেই কারণে, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী।

এইবার বলি আসল কথা: কবিকঙ্কণ চণ্ডীমঙ্গল লেখার জন্য সম্মানসূচক উপাধি, এই মিথমিথ্যা পাণ্ডিত্যের তোপ দেগে উড়িয়ে দিয়েছেন মহাপণ্ডিত সুকুমার সেন। তিনি বলেছেন, ওসব উপাধিটুপাধি কিছু নয়। মুকুন্দ যখন চণ্ডীমঙ্গল গাইত বা পাঠ করত, তখন হাতে বালা পরত। তাই কবিকঙ্কণ। ঠিক কী লিখছেন সুকুমার সেন: ‘কবিকঙ্কণ উপাধি নয়। উপাধি হইলে দাতার উল্লেখ কোনও না কোনও ভনিতায় থাকিত। এটি স্বয়ংগৃহীত উপনাম। চণ্ডীমঙ্গল-এর মূল গায়েন অদ্যাপী হাতে এমনি কঙ্কণ পরিয়া থাকেন, মন্দিরার মত ভালো তাল দিবার জন্য। মুকুন্দ তাঁহার চণ্ডীগানের দলের অধিকারী ছিলেন। তাই এই উপনাম গ্রহণ করিয়াছিলেন।’ 

কোথায় উপাধি? আর কোথায় নিজেই নিজের নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া উপনাম! এক ধাক্কায় সুকুমার সেন মুকুন্দর মূর্তি ভাঙলেন। আরও এক ধাক্কা: তাঁর লেখায় সুকুমার সারাক্ষণ মুকুন্দরামকে ‘মুকুন্দ’ ডেকেছেন! না, কোনও অশ্রদ্ধা থেকে নয়। তাঁর যুক্তি: ‘রাম’-সংযুক্ত মুকুন্দর কোনও প্রমাণ নেই। কোনও পুঁথিতে মুকুন্দরাম নাম একবারও দেখা গিয়েছে বলে জানা যায়নি। তবু এই নাম চালু হয়ে গেল। কারণ রামগতি রায়রত্ন লিখেছিলেন, কবির প্রকৃত নাম মুকুন্দরাম।

সুকুমার সেন

সুকুমার তাঁর লেখায় এই কারণে রাম বাদ দিয়েছিলেন। এঁরাই, এহেন বাঙালি স্কলাররাই ছিলেন শিক্ষার এক প্রাগৈতিহাসিক যুগে বাঙালির মাস্টারমশাই। এবার এই মুকুন্দর জন্মকাল এবং সিগনিফিকেন্স নিয়ে এমন কিছু নতুন কথা লিখেছেন সুকুমার, যা না জানলে বাঙালি হয়েও বাঙালি সমাজে ও পরিসরে আমরা বহিরাগত। এই সেই অমৃতবার্তা:

মুকুন্দর বাবা হৃদয়। মা দৈবকী। মুকুন্দর দুই ছেলে, দুই মেয়ে । দু’টি মেয়ের নাম ভারি মনোরম: চিত্রলেখা, যশোদা। বোঝা যায় কবির কল্পনা ও ভালোবাসার টাচ। ছেলেদের নাম নিয়ে তেমন ভাবেননি মুকুন্দ: শিবরাম, মহেশ।

আগেই বলেছি, চণ্ডীমঙ্গল লেখার সময় মুকুন্দ জন্মস্থান বর্ধমান ছেড়ে আরড়ায়। কিন্তু জায়গাটা ঠিক কোথায়? খোঁজ দিলেন সুকুমার: ঘাটালের শালবনী স্টেশনের একটু দূরে, পূর্বদক্ষিণে। মুকুন্দকে কে স্পনসর করছেন? কে তৈরি করছেন তাঁর ব্র্যান্ড? ব্রাহ্মণ রাজা, পালাধিগাই বীর বাঁকুড়া দেব। এই রাজার ছেলেকে মুকুন্দ পড়ায়। অর্থাৎ মুকুন্দ একইসঙ্গে কবি ও রাজবাড়ির গৃহশিক্ষক। রাজবাড়ির কাছেই একটা বিল। বিলের নাম তেপান্তর। একদিন রাজার ছেলেকে পড়াতে পড়াতে মুকুন্দ তাকে বলল, তেপান্তরের কিনারে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যে সে পেয়েছে দেবীর আদেশ: সে যেন দেবীকে নিয়ে মহাকাব্য লেখে। কে এই দেবী? রাজার কানে উঠল কথাটা। এল অমোঘ আদেশ। কবি, দেবীর আদেশ পালন করো। তোমার সব দায়িত্ব আমার। শুরু করে দাও মহাকাব্য লেখা। মুকুন্দ লিখতে শুরু করল চণ্ডীমঙ্গল। এবার সুকুমার চুরমার করলেন প্রচলিত ধারণা। বললেন, ৩০ বছর ধরে মুকুন্দ লিখেছিলেন চণ্ডীমঙ্গল। চণ্ডীমঙ্গল মুকুন্দ শেষ করল যে বছর ছাত্র রঘুনাথ রাজা হল। মুকুন্দ ধনী ছাত্রের সমর্থন পেল পাশে। 

এইখানে আবার এই মূল বিষয় থেকে বেরিয়ে আটপৌরে আড্ডার পায়চারি। না-হলে কবে মরে যাব, আমার আর এক বিপুল ক্যারিশম্যাটিক মাস্টারমশাইয়ের ছোট্ট একটা গপ্পো বলা হবে না। তিনি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। শুনেছি ৩০-৩২টা ভাষা জানতেন। একদিন তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন আরবি, গ্রিক, ইটালিয়ান আর ফরাসি বলে। একটি ভাষাও জানি না। তাতে তাক লাগার কোনও কমতি হয়নি। কিন্তু আরও বড় তাক লাগিয়েছিলেন অন্য একদিন। 

তখন আমি স্কটিশ চার্চে ইন্টারমিডিয়েট-এর ছাত্র। কলেজ পিকনিক জমে উঠেছে। শীতকাল। সুনীতিবাবু শাল গায়ে হাজির। আমার বুক ধড়াস ধড়াস। পরিবেশনের ভার আমার ওপর। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার কিন্তু আরও দুটো গেলাস লাগবে। একটা মাটির গেলাসে তো জল দেওয়া হয়েছে। আরও দুটো গেলাস কেন? দৌড়ে গিয়ে গেলাস নিয়ে এলাম। 

খাসির মাংস তো?– সুনীতিবাবুর প্রশ্ন। 

হ্যাঁ স্যার, আমার উত্তরে সুনীতিবাবুর মুখে হাসি। 

তিনি বললেন সিরিয়াসলি, একটা গেলাসে মাংসের কারি দেবে। পাশে থেকো। কারি ফুরিয়ে গেলে আবার ঢালবে। আর একটা গেলাসে মাংস। বেছে বেছে হাড়ের গায়ের মাংস দেবে। আমি দু’বার মাংস, দু’বার কারি দিয়েছিলাম। পাতে নয়। গেলাসে। পিকনিকে রান্না মাংসের কারি– বেলা তিনটে নাগাদ, সুনীতিবাবু, বাংলার প্রবল পণ্ডিতদের একজন, চুমুক দিয়ে খেয়েছিলেন। আমার জীবনে এর চেয়ে বিরল চুমুকে চমক আর আসেনি। তখন স্যারের বয়েস অন্তত ৭০। খেতে খেতে আমার দিকে তাকিয়ে একটি উপদেশ: কবজি ডুবিয়ে খাবে আর মন ডুবিয়ে লেখাপড়া করবে। 

স্যর বেলা চারটের কাছাকাছি সময়ে খাওয়া সেরে পিকনিক থেকে বিদায় নিলেন। আমার মনের মধ্যে আশঙ্কা, এটাই স্যরের শেষ খাওয়া নয় তো? কাল সকালে বাংলার সমস্ত খবরের কাগজে প্রথম পাতায় সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ের ছবি থাকবেই থাকবে।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়

সেটাই হল। দি স্টেটসম্যান খুলতেই সুনীতিবাবুর ছবি। তিনি পিকনিক থেকে সোজা চলে গেছেন অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। সেখানে লেডি রাণুকে পাশে নিয়ে তারিয়ে তারিয়ে ছবির প্রদর্শনী দেখছেন। আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার জীবনটা সত্যিই গালিভার্স ট্রাভেলস-এর মতো। দৈত্য এবং লিলিপুট, দুটোই দেখা তো হল! 

এবার আবার দলছুট ভাবনার পায়চারি থেকে মূল বিষয়ে। এবং প্রথমেই একটি প্রশ্ন: নিজেদের বাঙালি ভাবতে কত না গর্ব আপনাদের। কিন্তু শুধু রবীন্দ্রনাথের গান গাইলে, রবীন্দ্রনাথের দু’-চারটে লেখা পড়লে, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কবিগুরু, তিনি বিশ্বকবি, তিনি ভগবান, এই সব অলীক অহংকার নিয়ে বাস করলেই বাঙালি হয়ে ওঠা যায় না। সত্যি বলতে, চণ্ডীমঙ্গল না পড়ে বাঙালি হতে পারা যায় কি? কেন যায় না, সেটা জানতে পড়ুন চণ্ডীমঙ্গল আর কবি মুকুন্দ বিষয়ে সুকুমার সেনের লেখা: রবীন্দ্রনাথের আগে এমন দক্ষতায় আমাদের ভাষা আর কোনও লেখক বিশুদ্ধ সাহিত্য রচনায় ব্যবহার করেন নাই। 

আমার একটি অনুরোধ। যে বাঙালিরা চণ্ডীমঙ্গল না পড়েও নিজেদের বহিরাগত না ভেবে বাঙালি অহংয়ে মাটিতে পা রাখেন না, তাঁরা প্লিজ চণ্ডীমঙ্গল পড়ুন। এবং খাঁটি বাঙালি রসবোধের আনন্দ পান। গল্পটা এ যুগে সুপারহিট সিনেমা হতেই পারে, যদি প্রোডাকশন খরচ সামলাতে পারেন। ভরপুর অ্যাকশন। নাটকীয় ঘটনার ছড়াছড়ি। সুপারসনিক গতি। কোথাও গল্প ঝুলে পড়ছে না। কী টাইট প্লট। গল্পের শুরু সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে মানুষ ও অসুর। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে গেল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শ্বশুর-জামাই দ্বন্দ্ব। দক্ষ ভার্সাস শিব। বিনা আমন্ত্রণে বাবা দক্ষের যজ্ঞে মেয়ে সতী। সতীর দেহত্যাগ। এবং শিবের দলবল এসে দক্ষযজ্ঞ লণ্ডভণ্ড। 

বাংলার পটে চণ্ডীমঙ্গল, মীনা চিত্রকরের আঁকা

এরপর দারুণ মজা। ঘরজামাই রূপে শিবের আবির্ভাব। জমজমাট প্রেম, শিব আর পার্বতীর। গণেশ-কার্তিকের জন্ম। কিন্তু সাধারণ সংসারে যা হয় তাই হল। মা আর মেয়ের ঝগড়া হল। পার্বতী বাপের বাড়ি ছেড়ে শিবকে নিয়ে কৈলাসে ফিরে গেল। ধনী শ্বশুরের বাড়িতে শিবের দিব্যি চলছিল। কৈলাশে ফিরে শিব আর পার্বতী বুঝতে পারল, অর্থ না থাকলে কী অবস্থা হয়। এই দারিদ্র থেকে মুক্তির উপায় একটাই। পার্বতী যদি মর্তলোকে পূজা পায়, তবেই ঘুচবে তার অর্থকষ্ট। কতদিন আগে বাঙালি কবি মুকুন্দ বুঝেছিল চাঁদা তুলে বারোয়ারি পুজো করে পার্বতী আর শিবের অর্থকষ্ট দূর করার কথা। এইভাবে শেষ হচ্ছে চণ্ডীমঙ্গল-এর দেবখণ্ড।

পরের খণ্ডের নাম আক্ষটি। এই খণ্ডে আরও ঘটনা, আরও স্রোত। পার্বতীর পাশাপাশি এক দারুণ আধুনিক, সুন্দরী, স্মার্ট মেয়ে। পার্বতীর বন্ধু। পদ্মা। পদ্মা পার্বতীকে পরামর্শ দিল, দুষ্টুমি করতে হবে যদি নিত্যদিনের দারিদ্র থেকে বাঁচতে চাও। ধড়াস করে ওঠে পার্বতীর বুক! কেমন দুষ্টুমির পরামর্শ দিচ্ছে পদ্মা? পদ্মা হেসে বলে, তুমি যা ভাবছ, অতটা নয় পার্বতী। এই কাজটা তুমি তুড়ি মেরে পারবে। কোনওরকমে তুমি ইন্দ্রের ছেলে নীলাম্বরকে শিবের কোপে ফেলে দাও। শীতের অভিসম্পাতে যাতে নীলাম্বর মর্তে মানুষ হয়ে জন্মায়।
তারপর? জানতে চায় পার্বতী।
তারপর তো কেল্লা ফতে, বলে পদ্মা।
কী করে? প্রশ্ন পার্বতীর।
তখন পদ্মা এই স্ক্রিপ্ট শোনায় পার্বতীকে:.
ধরো, কলিঙ্গ জনপদে নীলাম্বর জন্মাল এক ব্যাধের ঘরে। নাম কালকেতু। কালকেতু মিটস ফুল্লরা। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট। রাজজোটক মিল। কালকেতু জন্তুজানোয়ার শিকার করে। আর ফুল্লরা মাংস বিক্রি করে। সংসার বেশ চলছে। কিন্তু লোভ বেড়ে গেল কালকেতুর। বেশি টাকার জন্যে সে সারাদিন জন্তুজানোয়ার মারতে লাগল। ফুল্লরার লোভও কম নয়। কালকেতু আর ফুল্লরা ক্রমে বড়লোক হচ্ছে। এইবার দেবী, তোমার কাছে সাধারণ মানুষের প্রার্থনা। এই দুই লোভী কর্তাগিন্নির কাছ থেকে আমাদের রক্ষা করো। পার্বতী, তুমি তখন কালকেতুর শিকারের দৃষ্টি দেবে ঝাপসা করে। কালকেতু ইজ শর্টসাইটেড। ব্যস, সমস্যা সল্‌ভ্‌ড। কালকেতু একদিন শিকার করতে না পেরে ধরে আনল একটা গোসাপ। পার্বতী তুমি এলে গোসাপ রূপে কালকেতুর ঘরে। এবং ধারণ করলে মোহিনী মূর্তি।
তারপর?– পার্বতীর প্রশ্নে উৎকণ্ঠা।
–তার পরের গল্প তো গুজরাটে!
হঠাৎ এত দেশ থাকতে গুজরাট? কেন? জানতে চায় পার্বতী।
উত্তর দেয় পদ্মা: মুকুন্দ এক অসামান্য বাঙালি লেখক যে আজ থেকে হাজার হাজার বছর পরে কলিযুগে বুঝতে পারবে পৃথিবীর ভাড়ু দত্তরা সব গুজরাটেই জন্মাবে! ভাঁড়ের দল। তারা কলিঙ্গ রাজার কান ভারী করবে কালকেতুর বিরুদ্ধে।
তারপর?– আবার পার্বতীর প্রশ্ন। এবং পদ্মার উত্তর: তার পরই তো চণ্ডীমঙ্গল-এর শেষ পর্ব, যার নাম ‘বণিক’: এখানে গুজরাটের একটা ভূমিকা আছেই। এবং আছে মুকুন্দর দেশের মানুষ, খাঁটি বাঙালিরা। এরা বুঝছে সারকথা: স্পনসরশিপ ছাড়া বাঁচা যায় না। পার্বতী, মর্তভূমিতে তোমার প্রচার-সচিব হচ্ছে নীলাম্বর, যে কালকেতু হয়ে জন্মাচ্ছে। তোমার প্রচারে কিন্তু এক সেক্সি নারীর কথাও ভাববে বাঙালি কবি। তার নাম রত্নমালা।

মীনা চিত্রকরের আঁকা চণ্ডীমঙ্গলের পট

আর কোনও হিম্যান থাকবে না? পার্বতী উদ্‌গ্রীব।

অবশ্যই থাকবে। তার নাম দেবনট। এছাড়া থাকবে আরও অনেক ম্যাজিক রিয়েলিটি। সবটা তোমাকে বলছি না, পার্বতী। মনে রেখো, স্ক্রিপ্টটা আমার। আর এই চিত্রনাট্যের ধারক এক অসামান্য বাঙালি কবি, মুকুন্দ। আমি তার মাথায় ঢুকিয়ে দেব এই গল্প। তার মহাকাব্য চণ্ডীমঙ্গল শেষ হবে কৈলাসের বর্ণনায়, যে কৈলাসে পার্বতী দারিদ্রের কোনও চিহ্ন থাকবে না। তবে সন্দেহ থেকেই যাবে! 

–কীসের সন্দেহ, পদ্মা?

কৈলাসের সেই রূপ স্বপ্ন না বাস্তব? শুধু এইটুকু জানা যাবে না কোনওদিন। এই জাদুবাস্তবই তো চণ্ডীমঙ্গল-এর অনন্য বিউটি।

…………………….. পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব  ……………………

পর্ব ৮৫: সাধারণের জীবন রাজনীতির বিষয়, শিখিয়েছে মনুর সংহিতা

পর্ব ৮৫: চিঠির মোড়কে নষ্ট প্রেমের গোপন অভিসার

পর্ব ৮৪: চা নয়, চায়ের বই যখন প্রেমের অনুঘটক

পর্ব ৮৩: আধ্যাত্মিক বিরহ দিয়ে গড়া প্রেমের মহাকাব্য

পর্ব ৮২: এক মৃত্যুহীন ক্লাসিক কিংবা যৌনতার সহজপাঠ

পর্ব ৮১: দেশহীন, ভাষাহীন ঝুম্পা

পর্ব ৮০: সাহসী প্রেমের চিঠি লেখা শিখিয়েছিল যে বাঙালি যুগল

পর্ব ৭৯: সুরানিলয়ের টেবিল থেকেই জন্ম নিয়েছিল উপন্যাসের ভাবনা

পর্ব ৭৮: একবিন্দু আত্মকরুণা নেই অঞ্জনের আত্মজীবনীতে

পর্ব ৭৭: অ্যানির ‘দ্য ইয়ার্স’ শেখায় অন্তহীন ইরোটিসিজম-ই জীবনের পরমপ্রাপ্তি

পর্ব ৭৬: জয় গোস্বামীর সাজেশনে মুগ্ধতা জাগাল ‘সিম্পল প্যাশন’

পর্ব ৭৫: যে নারীর শেষপাতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি লেখক

পর্ব ৭৪: সেই তরুণীর জন্য বেঁচে আছে বোকা মনকেমন!

পর্ব ৭৩: কাফকার ভয়-ধরানো প্রেমপত্র!

পর্ব ৭২: থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, কলকাতা বইমেলায় শ্রেষ্ঠাংশে তবে রবীন্দ্র-ওকাম্পো?

পর্ব ৭১: একশো বছরের নৈরাজ্য ও একটি লেখার টেবিল

পর্ব ৭০: আত্মজীবনী নয়, মার্গারেটের ব্রতভ্রষ্ট স্মৃতিকথা

পর্ব ৬৯: রুশদির ‘দ্য ইলেভেনথ আওয়ার’ শেষ প্রহরের, অনিবার্য অন্তিমের দ্যোতক

পর্ব ৬৮: মাংসও টেবিলের কাছে ঋণী

পর্ব ৬৭: ভ্রমণ-সাহিত্যকে লাজলো নিয়ে গেছেন নতুন পারমিতায়

পর্ব ৬৬: নরম পায়রার জন্ম

পর্ব ৬৫: যে বইয়ের যে কোনও পাতাই প্রথম পাতা  

পর্ব ৬৪: খেলা শেষ করার জন্য শেষ শব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন জেফ্রি আর্চার

পর্ব ৬৩: সহজ ভাষার ম্যাজিক ও অবিকল্প মুরাকামি

পর্ব ৬২: জীবন তিক্ত এবং আশা করা ভুল, এই দর্শনই বিশ্বাস করেন ক্রাজনাহরকাই

পর্ব ৬১: লন্ডনে ফিরে এলেন অস্কার ওয়াইল্ড!

পর্ব ৬০: পাপ ও পুণ্যের যৌথ মাস্টারপিস

পর্ব ৫৯: মাতৃভক্তির দেশে, মাকে ছেড়ে যাওয়ার আত্মকথন

পর্ব ৫৮: চিঠিহীন এই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রণয়লিপি

পর্ব ৫৭: লেখার টেবিল কি জানে, কবিতা কার দান– শয়তান না ঈশ্বরের?

পর্ব ৫৬: প্রেমের নিশ্চিত বধ্যভূমি বিয়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখার টেবিল জানে সেই নির্মম সত্য

পর্ব ৫৫: জুলিয়া রবার্টসকে হিন্দুধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল একটি বই, একটি সিনেমা

পর্ব ৫৪: আপনার লেখার টেবিল নেই কেন মানিকদা?

পর্ব ৫৩: পুরুষরা যে কতদূর অপদার্থ, ড্রেসিং টেবিলের দেখানো পথে মেয়েরা প্রমাণ করে দেবে

পর্ব ৫২: একটাও অরিজিনাল গল্প লেখেননি শেক্সপিয়র!

পর্ব ৫১: প্রমথ-ইন্দিরার মতো প্রেমের চিঠি-চালাচালি কি আজও হয়?

পর্ব ৫০: হাজার হাজার বছর আগের পুরুষের ভিক্ষা এখনও থামেনি

পর্ব ৪৯: কুকথার রাজনীতিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছেন জর্জ অরওয়েল 

পর্ব ৪৮: টেবিলই ওকাম্পোর স্মৃতি, আত্মজীবনীর ছেঁড়া আদর

পর্ব ৪৭: শেষ বলে কিছু কি থাকতে পারে যদি না থাকে শুরু?

পর্ব ৪৬: যে টেবিলে দেবদূত আসে না, আসে শিল্পের অপূর্ব শয়তান

পর্ব ৪৫: ফ্রেডরিক ফোরসাইথকে ফকির থেকে রাজা করেছিল অপরাধের পৃথিবী

পর্ব ৪৪: আম-বাঙালি যেভাবে আমকে বোঝে, দুই আমেরিকান লেখিকা সেভাবেই বুঝতে চেয়েছেন

পর্ব ৪৩: দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে মা দৌড়ে বেরিয়ে গেল, ইবতিসম্‌-এর উপন্যাসের শুরু এমনই আকস্মিক

পর্ব ৪২: অন্ধকার ভারতে যে সিঁড়িটেবিলের সান্নিধ্যে রামমোহন রায় মুক্তিসূর্য দেখেছিলেন

পর্ব ৪১: বানু মুশতাকের টেবিল ল্যাম্পটির আলো পড়েছে মুসলমান মেয়েদের একাকিত্বের হৃদয়ে

পর্ব ৪০: গোয়েটের ভালোবাসার চিঠিই বাড়িয়ে দিয়েছিল ইউরোপের সুইসাইড প্রবণতা

পর্ব ৩৯: লেখার টেবিল বাঙালির লাজ ভেঙে পর্নোগ্রাফিও লিখিয়েছে

পর্ব ৩৮: বঙ্গীয় সমাজে বোভেয়ার ‘সেকেন্ড সেক্স’-এর ভাবনার বিচ্ছুরণ কতটুকু?

পর্ব ৩৭: ভক্তদের স্তাবকতাই পাশ্চাত্যে রবীন্দ্র-কীর্তি স্থায়ী হতে দেয়নি, মনে করতেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী

পর্ব ৩৬: একাকিত্বের নিঃসঙ্গ জলসাঘরে মারিও ভার্গাস লোসা যেন ছবি বিশ্বাস!

পর্ব ৩৫: জীবনের বাইশ গজে যে নারী শচীনের পরম প্রাপ্তি

পর্ব ৩৪: যা যা লেখোনি আত্মজীবনীতেও, এইবার লেখো, রাস্কিন বন্ডকে বলেছিল লেখার টেবিল

পর্ব ৩৩: ফিওনার সেই লেখার টেবিল মুছে দিয়েছিল মেয়েদের যৌনতা উপভোগের লজ্জারেখা

পর্ব ৩২: বাঙালি নয়, আন্তর্জাতিক বাঙালির সংজ্ঞায় স্পিভাক এসে পড়বেনই

পর্ব ৩১: প্রতিভাপাগল একটি বই, যাকে দিনলিপি বলে সামান্য করব না

পর্ব ৩০: পতিতালয়ের সেই লেখার টেবিল জাগিয়ে তুলেছিল ইসাবেলের হৃদয়-চেতনা

পর্ব ২৯: পাথরে প্রাণ আনে যে টেবিলের স্পর্শ

পর্ব ২৮: নিজের টেবিলকে কটাক্ষ করি, কেন অ্যানে মাইকেলসের মতো লিখতে পারি না?

পর্ব ২৭: নারীর রাগ-মোচনের কৌশল জানে মিলান কুন্দেরার লেখার টেবিল!

পর্ব ২৬: ভালোবাসা প্রকাশের সমস্ত শব্দ পেরিয়ে গিয়েছিল এলিয়টের লেখার টেবিল

পর্ব ২৫: যে টেবিলে জন্ম নেয় নগ্নতা আর যৌনতার নতুন আলো

পর্ব ২৪: প্রেমের কবিতার ভূত জন ডানকে ধরেছিল তাঁর উন্মাদ টেবিলে, মোমবাতির আলোয়

পর্ব ২৩: যে টেবিল আসলে বৈদগ্ধ আর অশ্লীলতার আব্রুহীন আঁতুড়ঘর!

পর্ব ২২: মহাবিশ্বের রহস্য নেমে এসেছিল যে টেবিলে

পর্ব ২১: গাছ আমাদের পূর্বপুরুষ, লেখার টেবিল বলেছিল হোসে সারামাগোকে

পর্ব ২০: টেবিলের কথায় নিজের ‘হত্যার মঞ্চে’ ফিরেছিলেন সলমন রুশদি

পর্ব ১৯: প্রতিভা প্রশ্রয় দেয় অপরাধকে, দস্তয়েভস্কিকে শেখায় তাঁর লেখার টেবিল

পর্ব ১৮: বিবেকানন্দের মনের কথা বুঝতে পারে যে টেবিল

পর্ব ১৭: ‘গীতাঞ্জলি’ হয়ে উঠুক উভপ্রার্থনা ও উভকামনার গান, অঁদ্রে জিদকে বলেছিল তাঁর টেবিল

পর্ব ১৬: যে লেখার টেবিল ম্যাকিয়াভেলিকে নিয়ে গেছে শয়তানির অতল গভীরে

পর্ব ১৫: যে অপরাধবোধ লেখার টেবিলে টেনে এনেছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে

পর্ব ১৪: লেখার টেবিল গিলে নিচ্ছে ভার্জিনিয়া উলফের লেখা ও ভাবনা, বাঁচার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা

পর্ব ১৩: হ্যামনেট ‘হ্যামলেট’ হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল, জানে সেই লেখার টেবিল

পর্ব ১২: রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিল চিনতে চায় না তাঁর আঁকার টেবিলকে

পর্ব ১১: আর কোনও কাঠের টেবিলের গায়ে ফুটে উঠেছে কি এমন মৃত্যুর ছবি?

পর্ব ১০: অন্ধ বিনোদবিহারীর জীবনে টেবিলের দান অন্ধকারের নতুন রূপ ও বন্ধুত্ব

পর্ব ৯: বুড়ো টেবিল কিয়ের্কেগার্দকে দিয়েছিল নারীর মন জয়ের চাবিকাঠি

পর্ব ৮: অন্ধকারই হয়ে উঠলো মিল্টনের লেখার টেবিল

পর্ব ৭: কুন্দেরার টেবিলে বসে কুন্দেরাকে চিঠি

পর্ব ৬: মানব-মানবীর যৌন সম্পর্কের দাগ লেগে রয়েছে কুন্দেরার লেখার টেবিলে

পর্ব ৫: বিয়ের ও আত্মহত্যার চিঠি– রবীন্দ্রনাথকে যা দান করেছিল লেখার টেবিল

পর্ব ৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের টেবিল আর তারাপদ রায়ের খাট, দুই-ই ছিল থইথই বইভরা

পর্ব ৩: টেবিলের গায়ে খোদাই-করা এক মৃত্যুহীন প্রেমের কবিতা

পর্ব ২: লেখার টেবিল ভয় দেখিয়েছিল টি এস এলিয়টকে

পর্ব ১: একটি দুর্গ ও অনেক দিনের পুরনো নির্জন এক টেবিল