


দে’জ পাবলিশিং থেকে সুবীরদার যে-বইটি বহুল প্রশংসিত, সেই ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’ আমি ছেপেছিলাম ১৯৮৩ সালেই। বইটি প্রথম বেরিয়েছিল অয়ন প্রকাশনী থেকে ১৯৭৭ সালে। অয়ন প্রকাশনী ছিল অমল গুপ্তের। অমলবাবু অজয়দার (অজয় গুপ্ত) দাদা, তিনি অনেক দিন কাজ করেছেন ইন্দ্রদার (ইন্দ্রনাথ মজুমদার) সুবর্ণরেখাতেও। তবে অয়নের প্রকাশনা-সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ অজয়দা নিজেই দেখতেন। প্রসঙ্গত অজয়দা, সুবীর ভট্টাচার্য এবং সুবীর রায়চৌধুরী ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
৭৩.
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কবিতাসংগ্রহ’ সম্পাদনা প্রসঙ্গে সুবীর রায়চৌধুরীর কথা উঠেছিল। তখনই বলেছিলাম সুবীরদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক পুরনো। ১৯৭৬ সালে প্রথম সুবীরদার লেখা বই দে’জ থেকে ছেপেছিলাম। সম্পাদনা-সংকলনে সুবীরদার কাজ নিয়ে যারা খবর রাখেন, তাঁদের অনেকেই হয়তো খেয়াল করেন না এই মানুষটাই আবার কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী বেশ কয়েকটি বই লিখেছিলেন, যা সেসময়ের কিশোর-পাঠক মহলের একাংশের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। দে’জ থেকে সুবীরদার প্রথম বইটি ছিল⎯ ‘মেলা থেকে ঝামেলা’। ইন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ এবং ভেতরে আরেকটি ছবি-সহ বইটি সেসময় আমি ছেপেছিলাম বলাই সিংহ লেনের বীণাপাণি প্রেস থেকে। সুবীরদা সম্ভবত বুদ্ধদেব বসুর ঘরানাকে মান্যতা দিয়ে ভূমিকা ইত্যাদির নিচে নাম লিখতেন সু.রা.চৌ. বলে। এই বইতেও সু.রা.চৌ. ছোট্ট ভূমিকায় লিখেছিলেন⎯ “পল বার্না-র একটি উপন্যাসকে আমি ঢেলে সাজিয়েছি ‘মেলা থেকে ঝামেলা’-য়। এর মধ্যে আমার কল্পনাও অনেকটা আছে। প্রুফ দেখার ব্যাপারে সাহায্য করেছেন অশোক চক্রবর্তী। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্বপন মজুমদারের কাছেও আমি নানা কারণে ঋণী।” দে’জ থেকে এই কিশোর কাহিনিটি সুবীরদার প্রথম প্রকাশিত বই হলেও, এর আগে তিনি আরেকটি বইও লিখেছিলেন⎯ ‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’। সেই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল গৌরাঙ্গপ্রসাদ বসুর ‘ওরে তোরা জয়ধ্বনি কর’ পত্রিকায় ১৩৭৩-এর পৌষ-মাঘ সংখ্যায়। আর শরৎ বুক হাউস থেকে সেটি বই হয়েছিল ১৯৬৭ সালে।

‘মেলা থেকে ঝামেলা’র শুরুতেই লেখক পাঠকের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়েছেন⎯ “তোমাদের কি আমাদের অর্থাৎ বিস্কুট বাহিনীকে মনে আছে? সেই যারা গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা হয়েছিল? কথায় বলে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। বিস্কুট বোস আর গণপতি সরদারের দল সেই যে একবার দায়ে প’ড়ে গোয়েন্দা হয়েছিলো, তারপর আরো নানা বিচিত্র ঘটনা⎯ তোমাদের ভাষায় অ্যাডভেঞ্চার⎯ তাদের জীবনে ঘ’টে গেছে। প্রতিটি ঘটনাই মনে হয় আগের ঘটনার চেয়ে সহস্র-লক্ষ গুণ রোমাঞ্চকর। আমাদের দেখে তোমাদের হিংসে হবারই কথা। তোমাদের মতোই পুঁই শাকের চচ্চড়ি আর পোনা মাছের ঝোল, শিবাজীবাবু স্যারের বকুনি আর হেড স্যারের বেত খেয়েও আমাদের জীবন কীরকম আলাদা। কিন্তু জানোই তো, উপায় না থাকলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয়। তাই তোমরা যারা সুযোগের অভাবে গোয়েন্দা হ’তে পারলে না, তাদের কথা ভেবেই আমি আরেকটি রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনী তোমাদের শোনাবো। ঘটনাটা শুরু হয়েছিলো মেলায় যাওয়াকে কেন্দ্র ক’রে এবং সেখান থেকেই হাঙ্গামার শুরু। সেজন্য বিস্কুট এর নামকরণ করেছে ‘মেলা থেকে ঝামেলা’।”
প্রসঙ্গত একটা মজার কথা বলে রাখি, সুবীরদা যখন এই লেখা লিখছেন তার অন্তত বছর চারেক পর ছাত্র হিসেবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে আসেন পরবর্তীকালের প্রথিতযশা অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের মাস্টারমশাইকে নিয়ে লেখা ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ প্রবন্ধে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন⎯ “…‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’⎯ বই-প্রকাশের সালতামামি অনুযায়ী আমি তখন ক্লাস সেভেনের বিদ্যার্থী⎯ পড়ে, আমি যারে কয়, হতবাক। স্নাতক-পরবর্তী বেকার-জীবনে পারিবারিক ভরণপোষণের প্রয়োজনে আমার যা উপায়পাতি তার গোটাটাই ছিল অঙ্কের টিউশনি-নির্ভর। সুবীরবাবুর ঋষিপ্রতিভায় স্তম্ভিত, ‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’-য় আবিষ্কার করি, হাজির তাতে জনৈক অঙ্কের মাস্টার, পোড়ো ছোঁড়াদের ডাকবোলে খেতাব যার, ‘শিবাজীবাবু স্যার’! কোন জাদুবলে এই সমাপতন শুধোলে, মুচকি হেসে, সুবীরবাবু জ্ঞাপন করেন গোপ্য এ বার্তা : ‘আমার সব চরিত্রই পরে ছাত্র হয়ে ফিরে আসে’। অস্বস্তি বাড়ে যখন দেখি, নামসাম্যে ক্ষান্তি নেই, চারিত্রসাম্যেও দুই শিবাজী বেশ কাছাকাছি।”

সুবীরদার জন্ম ১৯৩৪ সালের ৬ মে রেঙ্গুনে, যদিও আদিতে তাঁরা খুলনার মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় চলে আসেন এবং ১৯৫৪ সালে বাংলায় অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। সুবীরদার কলেজের দিনগুলোর কথা জানিয়েছিলেন শঙ্খদা (শঙ্খ ঘোষ) তাঁর একটি লেখায়⎯ সুবীরদার প্রয়াণের পর ‘পরিচয়’ পত্রিকার ১৯৯৩ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর সংখ্যায়। শঙ্খদা সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে লিখছেন⎯
“উনিশশো পঞ্চাশ সালের প্রেসিডেন্সি কলেজ। সাম্মানিক বাংলা বিভাগে একটা কবিতাসভার আয়োজন হয়েছে একদিন। চর্যাগানের ‘সোনে ভরিতী করুণা নাবী’ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ পর্যন্ত প্রবহমান বাংলা কবিতার একটা নির্বাচন: কালপরম্পরায় সেটা পড়ে শোনাবে ছেলেমেয়েরা। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ‘বিশেষ বাংলা’ পড়ে যারা, তাদেরও দু-একজনকে খুঁজে নেওয়া হল এই আসরের জন্য। প্রথম বর্ষে এসে পৌঁছেছে শীর্ণকায় একটি ছেলে, তারও নাম রইল তালিকায়। বুঝিয়ে দেওয়া হল কোন কবিতা পড়তে হবে তাকে।
অনুষ্ঠানের দিনে দেখে নেওয়া হচ্ছে, এসে গেছে কি না সবাই। হ্যাঁ, সবই ঠিক আছে, ফিটফাট সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা পাজামায় সেই ছেলেটিকেও কিছু আগেই দেখা গেছে করিডরে। ছোটো একফালি ঘরে সমবেত সবাই। যারা পড়বে, টেবিলের ধারে গুছিয়ে দাঁড়াচ্ছে তারা। কিন্তু সেই ছেলেটি কোথায়? নতুন ছেলেটি? এদিক-ওদিক খুঁজে শেষ মুহূর্তে কোথাও আর পাওয়া গেল না তাকে। সভাসূচনার আগেই, ত্রস্ত লাজুকতায় পালিয়ে গেছে সে কলেজ ছেড়ে।”

সুবীরদার লাজুকতার চরম একটি উদাহরণ দিয়েছেন মীনাক্ষী দত্ত, তাঁর ‘অ্যালবাম থেকে কয়েকজন’ বইয়ে। প্রসঙ্গত বলে রাখি সুবীরদা আর জ্যোতির্ময় দত্ত ছিলেন নিকট বন্ধু, কলেজেও তাঁরা একই বছরের ছাত্র ছিলেন। বিএ পাশ করার পর সুবীরদা তখনই এমএ ক্লাসে ভরতি না হয়ে চাকরি নিয়েছিলেন এজি বেঙ্গলে। মীনাক্ষিদি লিখেছেন⎯ ‘বোধহয় তখনও কাগজ দেখে আবেদন করে চাকরি জুটত, কিংবা তারা দু-জনেই ছিল আপার ডিভিশন ক্লার্কের অতিরিক্ত যোগ্য। সুবীর পেল এ.জি. বেঙ্গলে, জ্যোতি পোস্টস অ্যান্ড টেলিগ্রাফে। সুবীর খুব ডিসিপ্লিনড, জ্যোতির চাইতে নিয়মভাঙা লোক আমি আর দেখিনি। সুবীর নিয়মিত অফিস যেত, সুন্দরভাবে কাজ করত, জ্যোতি যা-তা ভাবে কামাই করত। একদিন মজা হয়েছিল। আমার জ্যোতির সঙ্গে দেখার করার কথা, কোথায় সঠিক মনে নেই, ধরা যাক এসপ্ল্যানেড। সাধারণত জ্যোতি অনেক আগে এসে দাঁড়িয়ে থাকে, সেদিন আসেই না, আসেই না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমার চিন্তা হল, এমন তো কোনোমতেই স্বাভাবিকভাবে হবার কথা নয়। জ্যোতি তার অফিসে থাকবে না ধরে নিয়ে আমি চলে গেলাম সুবীরের অফিসে। সরকারি দপ্তরের ধুলোয় ঝাপসা হলঘরে কেরানিকুলের মধ্যে হঠাৎ আমার আবির্ভাবে সবাই সচকিত হয়ে তাকাল⎯ এ আবার কে? এবং কার কাছে এসেছে? অন্য কোনো যুবক হলে তড়াক করে উঠে দাঁড়াত, কিন্তু সুবীর ভয়ানক নার্ভাস হয়ে পড়ল। মুখে কথা জোগায় না, ক্যাবলার মতো জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি গিয়ে ওর হাত টেনে যখন বললাম⎯ চলুন তো, এক্ষুনি জ্যোতির খোঁজে যেতে হবে, তখন সে অসহায় ভাবে এদিক ওদিক চাইল। আমার হাত থেকে রক্ষা করার মতো বীর পাওয়া না যাওয়ায় তাকে আমার সঙ্গে বেরিয়ে আসতে হল দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মতো।’
সুবীরদার চাকরি যাওয়াটা অবশ্য জ্যোতিদার মতো নয়। আমি যতদূর শুনেছি রাজনৈতিক কারণেই সুবীরদার এজি বেঙ্গলের চাকরি যায়। এদিকে ১৯৬০ সালে তিনি বাংলায় এমএ পাশ করেছেন এবং এজি বেঙ্গল পর্ব চুকিয়ে শিক্ষকতায় এসেছেন। কিছুদিন স্কুলে পড়ানোর পরে থিতু হয়েছিলেন হাওড়ার আমতা রামসদয় কলেজে। সেখান থেকেই ১৯৭০-এ তিনি আসেন যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে। অধ্যাপনা এবং প্রশাসনিক নানা দায়দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিঃস্বার্থ সাহিত্যসাধনা প্রসঙ্গে শঙ্খদা লিখেছেন⎯ “সাহিত্যজগতেও ওই একই হিতাকাঙ্ক্ষায় সারাজীবন কাজ করে গেছে সে। বুদ্ধদেব বসু থেকে শুরু করে নিতান্ত তরুণ লেখক পর্যন্ত অনেকেই জানতেন যে তাঁদের কাজের কোনো পুঁথিপত্রগত সহায়তার জন্য হাতের কাছেই পাওয়া যাবে সুবীর রায়চৌধুরীকে, পাওয়া যাবে তাকে কোনো সুপরামর্শের জন্য। জীবিকাজীবনের বাইরে, ওই একই হিতাকাঙ্ক্ষা নিয়ে একসময়ে সে শ্রম দিয়েছে অনিলকুমার সিংহের ‘নতুন সাহিত্য’ পত্রিকায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরিচয়’ পত্রিকায়, জ্যোতির্ময় দত্তের ‘কলকাতা’ বা অমরেন্দ্র চক্রবর্তীর ‘সারস্বত প্রকাশ’ পত্রিকায়। এসব কাজ করবার সময়ে তাকে আর সহায়ক বলে মনে হত না, এসব পত্রিকার ভালো-মন্দের সঙ্গে লক্ষ্য-উপায়ের সঙ্গে আদ্যন্ত জড়িয়ে যেত সে, তারপর একসময়ে ফুরিয়ে যেত কাজ, হয়তো তাকে আর মনেও রাখত না সবাই, অন্য কারও দায় নিয়ে তখন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সে।”

তবে আমি যখন থেকে সুবীরদাকে চিনি ততদিনে তিনি নিজের কাজের জন্য বিখ্যাত। আর কাজের ব্যাপারে প্রচণ্ড খুঁতখুঁতে। যে কোনও বিষয়ের গভীরে না গিয়ে, কোনও লেখার মূল পাঠ না দেখে কাজ করতেন না। তাঁর সম্পাদনা-কুশলতা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু থেকে সুভাষ মুখোপাধ্যায়⎯ সকলেই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কম বয়েসে দেখা শঙ্খদা বা মীনাক্ষীদির মতো সুবীরদাকে আমি ততটা ‘লাজুক’ তো দেখিইনি, উলটে আমাদের তরফে প্রেস ইত্যাদি ক্ষেত্রে কারুর কাজের গাফিলতি দেখলে তিনি মাঝে-মাঝে রেগেও চিঠি লিখতেন। তাঁর চিঠিগুলির বেশ কয়েকটিকে মিঠকড়া বলাই যায়।
‘মেলা থেকে ঝামেলা’র পরে দে’জ থেকে ১৯৮৩-র সেপ্টেম্বরে আমি তাঁর ‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’ বইটি পুনর্মুদ্রণ করি। এই বইয়ের প্রসঙ্গে ১৬ অগাস্ট ১৯৮৩ একটি ছোট্ট চিঠিতে তিনি আমাকে লিখেছেন⎯
“সুধাংশু,
‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’র প্রুফ পাঠালাম। ‘বু. ব.র শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র প্রুফ পরে পাঠাবো।
গোলন্দাজ-এর কভার আমার পছন্দ হয়েছে, কিন্তু রঙ নয়। সবুজটা একেবারেই যাচ্ছে না। আর্টিস্টকে একটু বলবেন রঙের scheme টা পালটাতে?
সুবীরদা”
বুদ্ধদেব বসুর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ যে নরেশ গুহ-র সম্পাদনায় দে’জ থেকে ১৯৭৭ সালে নতুন পরিবর্ধিত সংস্করণে আত্মপ্রকাশ করেছিল, তা তো আগেই লিখেছি। সুবীরদা নিশ্চয়ই ১৯৮৩ সালে ওই বইয়ের ষষ্ঠ সংস্করণের প্রুফটা দেখে দিয়েছিলেন। তবে ধীরেন শাসমলের আঁকা ‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’র মলাটের সবুজ রং আর পালটানো যায়নি। কেননা পরের মাসেই বইটা প্রকাশিত হয়। তবে সুবীরদা সেটা নিয়ে আমাকে আর কিছু বলেননি। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এবং হিমানী বন্দ্যোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করা বইটি আমি ছেপেছিলাম বিধান সরণিতে তাপস হাটই-এর নিউ তুষার প্রিন্টিং ওয়ার্কস থেকে। এই বইয়ের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় সুবীরদা লিখেছিলেন⎯ “একটি ফরাশি চলচ্চিত্র অবলম্বনে ইংরেজিতে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন সিসিল ডে লুইস। আমি সেই উপন্যাসের কাহিনী অনুসরণে ‘গোলন্দাজ থেকে গোয়েন্দা’ লিখেছি। এখন সাত নকলে খাস্তা। তার ওপর আমি খোল-নল্চে দুই-ই পাল্টেছি।” এই বইয়ের হাফ টাইটেল পেজে গণেশ পাইনের আঁকা একটি মোটরগাড়ির ছবি ছাপা হয়েছিল। দে’জ সংস্করণেও তা রাখা হয়েছে।

তবে আগের চিঠিতে উল্লিখিত বই দু’টি নিয়ে সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ তিনি ফের একটি চিঠি লেখেন আমাকে। এবার চিঠির বয়ান খানিকটা কড়া ছিল। সুবীরদা লিখেছিলেন⎯
“…বারবার এক কথা বলতে খুব খারাপ লাগে। আমি বহুবার বলেছি আমার প্রুফে যেন কেউ না কলম চান [চালান]। অথচ প্রতি প্রুফে দেখছি আমার বানান, মাঝেমাঝে শব্দও পালটে দেওয়া হচ্ছে। এটা কীভাবে এবং, কেন ঘটছে? এর আগে ‘বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা’র কয়েক ফর্মার শুধু কাটা প্রুফই পাঠানো হয়েছিল। এবারে ‘গোয়েন্দা থেকে গোলন্দাজ’ কীরকম প্রুফ পাঠানো হয়েছে, তার নমুনা স্বরূপ একটা ফর্মা পাঠালাম। এটা কোন্ ফর্মার প্রুফ?⎯ ২, ৩, ৪, ১০, ১২, ১৮, ৩৬, ৪২, ৫৩, ৫৭ পৃষ্ঠা সেঁটে দিয়ে একটা ফর্মা বানানো হয়েছে। ৩, ৪, ৫ ফর্মার প্রিন্ট অর্ডার দিলাম। ১-২ ফর্মার প্রুফ এত অপরিচ্ছন্ন এবং কাটাকুটিতে ভরা যে দেখা সম্ভব নয়। আমার নতুন প্রুফ চাই।…”

এ সেই সময়ের কথা যখন আমাদের নিজেদের প্রেস নেই, কম্পোজ ইউনিট নেই। বাইরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ করাতে হত। ফলে কাজে অনেক সময় বিভ্রান্তি ঘটত। সুবীরদা এমন মানুষ ছিলেন যিনি কাজে গাফিলতি দেখলে বিরক্ত হতেন। তবে তাঁর স্বাভাবিক সৌজন্যে কখনও ঘাটতি থাকত না। দে’জ পাবলিশিং এবং আমাদের দুই ভাইয়ের ওপর তাঁর অগাধ স্নেহ ছিল। বাবু মাঝে-মাঝে তাঁর কাছে বই বা প্রুফ নিয়ে যেত। তাঁর লেখা চিঠিতেও বাবুর উল্লেখ আছে একাধিকবার।
দে’জ থেকে সুবীরদার পরের বইটি অনুবাদ, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেশবিদেশের শিশুসাহিত্য’ সিরিজের আট নম্বর বই⎯ রনাল্ড সেগালের ‘টোকোলোশ’। ‘টোকোলোশ’ বইটির একটি সমাজ-রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। বইয়ের শুরুতে ভূমিকা-তুল্য গদ্যে মানবদা লিখেছিলেন⎯
“১৯৩২ খ্রীষ্টাব্দে [য.] দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে ইহুদি পরিবারে [রনাল্ড সেগালের] জন্ম। শিক্ষালাভ করেছেন কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কেম্ব্রিজে। লেখাপড়া শেষ করে তিনি ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে আসেন। প্রত্যাবর্তনের পর বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ‘আফ্রিকা সাউথ’ নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। এই পত্রিকায় [পত্রিকার] জন্য তিনি নানাভাবে নিগৃহীত হন। ১৯৫৯ খ্রীষ্টাব্দে কেপটাউন ছাত্রসমাবেশে অর্থনৈতিক অসহযোগিতার বিরুদ্ধে বক্তৃতার অপরাধে সেগালকে পাঁচ বছর কোনো রাজনৈতিক ভাষণ দিতে নিষেধ করা হয়। এছাড়া তাঁর পাশপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, তাঁর বিষয়-সম্পত্তির ওপর হামলা হয় এবং কুখ্যাত বর্ণদ্বেষী ‘কিউ-ক্লাক্স-ক্ল্যান’ জাতীয় সংগঠন তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ভয় দেখাতে শুরু করে।
১৯৬০ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় ‘টোকোলোশ’। বইটি বেরোবার সঙ্গে-সঙ্গে বর্ণবিদ্বেষের বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। গ্রেপ্তার এড়াবার জন্য সেগাল বেচুয়ানাল্যান্ডে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরে ভারত সরকারের সহায়তায় তিনি নিয়াসাল্যান্ড এবং ট্যাঙ্গানিয়াকা হয়ে ইংল্যান্ডে চলে আসেন।”
আর হাফ টাইটেল পেজে লেখা হয়েছিল⎯
“পিটার⎯ সে এক ছোটো ছেলে, সে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো ছেলে। তার সঙ্গে টোকোলোশের দেখা হয় তার তেরো বছরের জন্মদিনে⎯ আর দেখা হওয়া মাত্র দুজনের মধ্যে গলাগলি ভাব জমে যায়। কিন্তু পিটার বারে বারে বললে কী হবে, বড়োদের অনেকেই তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চায় টোকোলোশকে, তারা বলে, ‘উঁহু, না, টোকোলোশ ব’লে কেউ নেই।’
কিন্তু সত্যি কি নেই? সে কি শুধুই একটি বাচ্চা ছেলের খেয়ালি কল্পনা? সে কি শুধুই নদীর ধারের পাথরের কাছে মোটা ধোবানিদের খিলখিল হাসি? তবে কেন টোকোলোশের আবির্ভাবের সঙ্গেসঙ্গে হুলুস্থূল পড়ে গিয়েছিল চারধারে? তবে কেন কিছুই আর আগের মতো নেই, পিটারের সঙ্গে তার চেনা হবার পরে? তবে কেন সময়ে-সময়ে ঐ হাসি বেজে ওঠে হাওয়ায়⎯ মনখারাপের সময়ে, আনন্দের হুল্লোড়ে? কেন তার হাসি তাহলে কাউকে কাউকে ভরে তোলে আতঙ্কে, আর অন্যদের, অসীম প্রত্যাশায়?
মনমাতানো ভাষায় এ-সব হেঁয়ালির জট খুলেই সত্যি কথাটি খুলে বলবে বর্ণবৈষম্যবাদী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিতাড়িত লেখক।
রনাল্ড সেগালের
চমকপ্রদ উপন্যাস
টোকোলোশ
যেমন বই লেখা হয় ক্বচিৎ, দৈবাৎ, প্রেরণার বলে।”

সুবীরদার পরের বই ‘জজ থেকে জল্লাদ’ আমি প্রকাশ করেছিলাম ১৯৯৩ সালের বাংলা নববর্ষের সময়। এই বইয়ের শুরুতেও তিনি ছোট্ট ভূমিকা সংযোজন করেছিলেন। সেই ভূমিকায় তিনি লেখেন⎯
“…‘জজ থেকে জল্লাদ’-এর কাহিনীর জন্য ফ্রীডরিশ ডুরেনমাট-এর ‘দ্য জাজ অ্যান্ড হিজ হ্যাঙম্যান’-এর কাছে আমি ঋণী। বাঙলা রূপান্তরটি শ্রীঅশোক সেন সম্পাদিত ‘বারোমাস’ পত্রিকার তৃতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যা (নভেম্বর ১৯৮০) থেকে একাদশ-দ্বাদশ সংখ্যা (জুলাই-আগস্ট ১৯৮০) পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। আদিতে সম্পাদকের উৎসাহ এবং শেষে তাগাদা আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। শ্রীমানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীসুবীর ভট্টাচার্য ও শ্রীসৌরীন ভট্টাচার্য আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছেন।
অবস্থাভেদে পাঠকেরাই জজ কিংবা জল্লাদ। তাঁদের চূড়ান্ত রায়ের প্রত্যাশায় এই নিবেদন শেষ করছি।”
১৯৯৩-এর ৮ অক্টোবরে সুবীরদার প্রয়াণের পরে ১৯৯৫-এর ডিসেম্বরে দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে⎯ ‘হাবু কেন বই-রাগী’। এই বইটির প্রকাশক হিসেবে নাম ছিল আমার ভাই বাবু-র (সুভাষচন্দ্র দে)। প্রকাশকের নিবেদনে বাবু লিখেছে⎯ “সুবীর রায়চৌধুরীর এই গল্পগুলো-যার সব ক-টিরই নায়ক হাবু⎯ বেরিয়েছিলো প্রধানত ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র ‘আনন্দমেলা’য়, শুধু ক-টি গল্প বেরিয়েছিলো ‘সত্যযুগ’ ও ‘লোকসেবক’ পত্রিকার ছোটোদের পাতায়। আমরা এমন কথা বলতে পারবো না যে হাবুকে নিয়ে লেখা সবগুলো গল্পই আমরা জোগাড় করতে পেরেছি⎯ কেননা গল্পগুলো বেরিয়েছিলো ১৯৫২ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে, এবং আমরা এখনও ‘সত্যযুগ’ বা ‘লোকসেবক’-এর সমস্ত সংখ্যা দেখে উঠতে পারিনি। যে-গল্পগুলো এখানে গ্রথিত হ’লো তার অনেকগুলো পাওয়া গেছে শ্রীনিখিল সরকারের সৌজন্যে; আর শ্রীশাশ্বত ভট্টাচার্য গল্পগুলোর প্রেসকপি তৈরি ক’রে দিয়েছেন। এঁদের আমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই। হাবুকে নিয়ে লেখা সুবীর রায়চৌধুরীর অন্য গল্পগুলো কেউ সংগ্রহ ক’রে দিতে পারলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো⎯ কেননা সেগুলো পরবর্তী সংস্করণে সংযোজিত হবে।”

সুবীরদার মৃত্যুর পর স্বপন মজুমদারকে সহযোগী সম্পাদক করে প্রকাশিত ‘বিলাতি যাত্রা থেকে স্বদেশী থিয়েটার’ বইটার প্রসঙ্গ উঠেছিল স্বপনদার কথা বলতে গিয়ে। এই বইটির সম্পাদক ছিলেন সুবীর রায়চৌধুরী। বাংলা রঙ্গমঞ্চের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ ১৯৭২ সালে এটি প্রকাশ করে। বইটা প্রায় পঁচিশ বছর অমুদ্রিত থাকার পর দে’জ থেকে ১৯৯৯ সালের বইমেলার সময় প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশের ভূমিকায় নরেশ গুহ লিখেছিলেন⎯ “বাঙলা দেশে সাধারণ রঙ্গালয় প্রতিষ্ঠার একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রস্তুত এই পুস্তিকায় গেরাসিম লেবেডেফ-এর সময় থেকে গত একশো বছরে বাঙলা নাটক এবং নাট্যশালার বিবর্তনের ইতিহাস সংক্ষেপে অথচ তথ্যনির্ভর ক’রে বিবৃত হয়েছে। জাতীয় নাট্যশালা প্রতিষ্ঠার পূর্বে যে-সব জটিল প্রশ্ন আমাদের মনকে নাড়া দিতে বাধ্য তার সঙ্গে মোটামুটি পরিচয় হবে এই পুস্তিকায়। এবং আমাদের স্বীকৃতিপত্র থেকে এ-কথাও হয়তো অনুমান করা যাবে যে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজবিচ্ছিন্ন, অলীক দেয়ালঘেরা দুর্গম বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র ব’লে আদৌ বিশ্বাস করি না। নাটক আমাদের মতে গ্রন্থভুক্ত, প্রশ্নপত্রের ভীতি উদ্রেককারী পাঠ্যবস্তু নয়। আবহমান কাল ধ’রে স্বাভাবিক মানুষ যে-ভাবে নাটক দেখতে অভ্যস্ত আমরা মূলত সেই মনোভাবেরই পক্ষপাতী।…” ‘বিলাতি যাত্রা থেকে স্বদেশী থিয়েটার’ বইটিতে আবার আর্ট পেপারে ছাপা একটি মানচিত্র ভাঁজ করে দেওয়া থাকে। মানচিত্রটি ইংরেজিতে তৈরি করা। তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের নির্দেশে এটি তৈরি করেছিলেন ননীগোপাল দাশ। ১৭৫৬ থেকে কলকাতার পঞ্চাশটি রঙ্গালয় চিহ্নিত হয়েছে এই মানচিত্রটিতে। মূলত চারটি জিনিস দেখানো হয়েছে⎯ কলকাতার বিলুপ্ত, সচল, অনিয়মিত এবং রূপান্তরিত নাট্যালয়।

তবে দে’জ পাবলিশিং থেকে সুবীরদার যে-বইটি বহুল প্রশংসিত, সেই ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’ আমি ছেপেছিলাম ১৯৮৩ সালেই। বইটি প্রথম বেরিয়েছিল অয়ন প্রকাশনী থেকে ১৯৭৭ সালে। অয়ন প্রকাশনী ছিল অমল গুপ্তের। অমলবাবু অজয়দার (অজয় গুপ্ত) দাদা, তিনি অনেক দিন কাজ করেছেন ইন্দ্রদার (ইন্দ্রনাথ মজুমদার) সুবর্ণরেখাতেও। তবে অয়নের প্রকাশনা-সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ অজয়দা নিজেই দেখতেন। প্রসঙ্গত অজয়দা, সুবীর ভট্টাচার্য এবং সুবীর রায়চৌধুরী ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। অয়ন থেকে বারোটি গল্প নিয়ে অজয়দার করা মলাটে প্রকাশিত হয়েছিল ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’। ‘নাকের বদলে নরুন’ নামের একটি লেখায় অজয়দা অয়ন প্রসঙ্গে জানিয়েছেন⎯
“…কাজের সঙ্গে সঙ্গে কলেজ স্ট্রিটেও এত বছরে চেনা-পরিচয়ের গোষ্ঠী বেশ স্ফীতকায় হয়ে উঠেছে। সবার আগে নাম করতে হয় প্রয়াত বন্ধু সুবীর ভট্টাচার্যের। সুবীর সরকারি চাকুরে। কিন্তু ও অফিস করত না। ওর নালিশ⎯ ‘আমার কাজের টেবিল নেই, চেয়ার নেই’⎯ তাই ও হাজিরার খাতায় সই করে বেরিয়ে পড়ে। সারাদিন বইপাড়ায় থেকে বইপত্রের কাজের মধ্যেই ডুবে থাকে। প্রচুর মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ। একদিন বলল, ‘আপনি একটা প্রকাশন সংস্থা খুলুন⎯ বইপত্রের সন্ধান আমি দেব। আপনাকে সব রকমের সাহায্য করব।’
মনে মনে আমারও ইচ্ছে ছিল⎯ সুবীরের উৎসাহে এবার সেটার বাস্তব রূপ দেবার পালা। আমার মেজদা (আসলে আমার দাদা। কিন্তু আমাদের যৌথ পরিবারে জেঠতুতো দাদাকে ‘দাদা’ বলেই ডাকি; তাই নিজের দাদা মেজদা।) দীর্ঘদিন বেকার বসে আছে। ওকে বলতে ও রাজি হল। সুবীরের চেষ্টায় ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোডে⎯ ‘সুবর্ণরেখা’র ওপরে একটা ঘর পাওয়া গেল। ১৯৭৭ সালে ‘অয়ন’ (নামটাও সুবীরের দেওয়া) নামে একটি প্রকাশনালয় খোলা হল। মালিকানা আমার মেজদা অমল গুপ্তর। অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি বই বেরিয়ে গেল: সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’, বিনয় ঘোষের ‘অটোমেটিক জীবন’ এবং ‘মেহনত ও প্রতিভা’। গোপাল হালদারের ‘সতীনাথ ভাদুড়ীর জীবন ও সাহিত্য’। অংশু মিত্র ছদ্মনামে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ‘মোল্লা নাসিরুদ্দীনের গল্প’, অভিজিৎ সেনগুপ্তর ‘সুন্দরবনের ডায়েরি’, প্রদ্যোৎ গুহর ‘কোম্পানি আমলে বিদেশী চিত্রকর’, অমল দাশগুপ্তের ‘আইনস্টাইন : আলোর দিশারী’।…”

তবে মাটির মানুষ অমল গুপ্তের পক্ষে পুস্তক-ব্যাবসার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি, ফলে অয়ন বেশিদিন চলেনি। তখন অজয়দা এবং সুবীর ভট্টাচার্যের ইচ্ছেতে সুবীর রায়চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’ দে’জ পাবলিশিং-এ আসে। সেসময় বইটিতে তিনটি নতুন গল্প সংযোজিত হয়। বইয়ের শুরুতেই ছিল মানবদার ‘অর্ধেক শিকারী’ বইয়ের কবিতা ‘জগদীশ গুপ্ত’⎯
“দেয়ালে কপাল ঠুকে নিজেকেই জন্মাবে আবার কোনোক্রমে
তোমারই এ-ইচ্ছা ছিলো। পাওনি কোথাও অভ্যর্থনা।
ঠাণ্ডা ক’রে রাখোনি অথচ কুঁজো ভীষণ গরমে;
সব জল গন্ধ ক’রে দেবে, তোমার তা বাঞ্ছিত ছিলো না।
কে মরে, কে বেঁচে থাকে⎯ কিছুই বোঝোনি। অভিধানে
সমস্ত শব্দের মানে চিরন্তন নির্দিষ্ট দ্যাখোনি।
গলি ছেড়ে কোথাও যাওনি তুমি। যারা সব জানে,
যাওনি তাদের মতো আন্তর্জাতিক গলিতে কখনো।
শুধু জ্বলেছিলে। চেয়েছিলে বস্তু, প্রাণ, জন্মান্তর।
বিপন্ন তোমার জন্য বোলপুরে ওঠেনি দিব্যগাছ।
রোজ পালটাতে পারোনি জামা। জানতে যে উত্তর
কোথাও পাবে না⎯ তবু থামাতে পারোনি তুমি নাচ
জমাতে পারোনি কিছু কুলুঙ্গিতে। সটান শুয়েছো
গবেষণাপুস্তকের আলো ছাড়া।
না কি বেঁচে আছো?”
মানবদা যেমন বলতেন অনুবাদের কাজ কখনও শেষ হতে পারে না, নিরন্তর চলতে থাকে। আমার মনে হয়, সুবীরদাও বিশ্বাস করতেন সম্পাদনা-সংকলনের কাজও কখনও শেষ হয় না, চলতেই থাকে। ১৯৯১ সালে ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’র ‘নতুন সংস্করণ প্রসঙ্গে’ নামে গদ্যটিতে সুবীরদা লেখেন⎯ “এই সংস্করণে ‘অপহৃতা আকাশকুসুম’, ‘তরঙ্গ হইতে তরঙ্গে’, ‘গুরুদয়ালের অপরাধ বর্জিত’ হ’লো। পরিবর্তে সংযোজিত হয়েছে ‘বিধবা রতিমঞ্জরী’, ‘বোনঝি গুঞ্জমালা’, ‘রসাভাস’। প্রথম দুটি গল্প আদৌ কোনো গ্রন্থভুক্ত হয়েছে কিনা জানি না।…” ওই একই লেখাতে তিনি জানিয়েছেন⎯ “কোনো সংকলন বা সম্পাদনাই অন্যের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। জগদীশ গুপ্তর প্রতি অনুরাগবশত এবারেও অযাচিতভাবে অনেকের সহায়তা পেয়েছি। তার মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় আমার প্রাক্তন ছাত্র শ্রীমান অভিজিৎ সেনের। এই সংস্করণে সংযোজিত গল্পগুলির পুনরাবিষ্কারের কৃতিত্ব তাঁর। সাময়িকপত্রে প্রকাশিত জগদীশ গুপ্তর রচনাসংগ্রহের তালিকাটিও তাঁর সংকলিত।…” সম্পাদক ও গ্রন্থরসিক অভিজিৎ সেন আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন। তাঁর কথা পরে আবার বলতে হবে।

সুবীরদার সঙ্গে দে’জ পাবলিশিংয়ের কাজ অন্য একটা মাত্রা পায় ১৯৯০-এর দশকে, যখন দে’জ পাবলিশিং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথভাবে বই প্রকাশের কাজ শুরু করে।
লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……
পর্ব ৭২। করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ
পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা
পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান
পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ
পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন
পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ
পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!
পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!
পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়
পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়
পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়
পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!
পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু
পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না
পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম
পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না
পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী
পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা
পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা
পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়
পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল
পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি
পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্সা’
পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়
পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’
পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল
পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!
পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই
পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি
পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত
পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী
পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের
পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়
পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!
পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!
পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো
পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন
পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved