deys published all collections of poet sudhindranath dutta | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ

‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ’-এর প্রথম দে’জ সংস্করণ প্রকাশের আয়োজন হয় কবিপত্নী রাজেশ্বরী দত্তের মৃত্যুর অল্পদিন আগে। প্রাথমিকভাবে তাঁর সহায়তায় ও তাঁর তিরোধানের পর কবিভ্রাতা শ্রী হরীন্দ্রনাথ দত্ত ও শ্রী শৌরীন্দ্রনাথ দত্তের সহযোগিতায় বহু কবিতার রচনাকাল উদ্ধার ক’রে দিয়েছেন শ্রী স্বপন মজুমদার। তাঁরই সংকলিত সংযোজন অংশে মুদ্রিত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ পাঠভেদ, কবিতার নাম ও প্রথম পঙ্‌ক্তির সূচি, এবং সুধীন্দ্রনাথের লেখা ‘অর্কেস্ট্রা’ ও ‘ক্রন্দসী’র বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন সংস্করণের প্রচ্ছদচিত্রও তাঁর সংগ্রহ থেকে পাওয়া।

Published by: Robbar Digital

Posted:May 10, 2026 2:44 pm | Updated:May 10, 2026 6:03 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৭২.

বহুদিন পরে গত ২৩ মার্চ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম ‘বহমান বাঙালির মন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় যোগ দিতে। এই অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ছিলেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন শীর্ষেন্দুদা (শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়)। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ২০২৬-এর বইমেলায় দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধের বই⎯ ‘বাঙালির মন’। সেদিন অনুষ্ঠান শেষের পর আয়োজকদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাদবপুরের ঝিলপাড়ের পাশ দিয়ে এসে যখন আর্টস বিল্ডিং পেরিয়ে চার নম্বর গেট দিয়ে বাইরে আসছি, তখন খুবই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ছিলাম। একসময় দিনের পর দিন, মূলত বিকেলের পর আমি এখানে এসেছি⎯ কখনও নতুন বইয়ের পরিকল্পনা করতে, কখনও-বা প্রুফ আদান-প্রদান করতে। স্বপনদা (স্বপন মজুমদার), শঙ্খদা (শঙ্খ ঘোষ), মানবদা (মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়), সুবীরদা (সুবীর রায়চৌধুরী), অমিয়দা (অমিয় দেব), সৌরীনদা (সৌরীন ভট্টাচার্য), নবনীতাদি (নবনীতা দেবসেন), যশোধরাদি (যশোধরা বাগচী), মালিনীদি (মালিনী ভট্টাচার্য)⎯ কত চেনা মানুষের কথা মনে পড়ছিল। তাঁদের কাছে আমি তো নেহাত প্রকাশক হিসেবে যেতাম না, যেতাম শিক্ষার্থীর মন নিয়েও। তাঁরা সকলেই যেমন অধ্যাপনার পাশাপাশি সৃজনশীল লেখক ছিলেন, তেমনই একটা ভালো বই কীভাবে তৈরি করা যায় সে-ব্যাপারেও তাঁদের স্বচ্ছ ধারণা ছিল। তাঁদের কাছে যে স্নেহ আর প্রশ্রয় আমি পেয়েছি, তা আমাদের প্রকাশনাকে সমৃদ্ধ করেছে। আজ এই মানুষগুলোর মধ্যে অনেকেই আর নেই। কিন্তু সেই সন্ধেয় যখন চার নম্বর গেট দিয়ে বেরিয়ে আসছি, স্বাভাবিকভাবেই আমার মনের বয়স যে অনেকটা কমে গিয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

যাদবপুরের লেখক-সম্পাদকদের সঙ্গে আমার প্রাথমিক যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন স্বপন মজুমদার, সেকথা আগেও অনেকবার বলেছি। তবে স্বপনদা নিজে খুব একটা লিখতে চাইতেন না। আমাদের বহু বইয়ের নেপথ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান কারিগর। অনেক বই তিনিই বেনামে সম্পাদনা করেছেন। খুব সামান্য কয়েকটি ক্ষেত্রে নিজের নাম দিয়েছেন। আমার শুরুতেই মনে পড়ছে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কাব্যসংগ্রহ’ পুনর্মুদ্রণের কথা। এই বইটা স্বপনদার স্বপ্নের বই ছিল। দে’জ সংস্করণের জন্য তিনি বিপুল পরিশ্রম করেছিলেন। বই ছাপার অনুমতি জোগাড় করা থেকে শুরু করে বইয়ের প্রুফ দেখা এবং যাবতীয় সম্পাদকীয় খুঁটিনাটি⎯ আমাকে কোনও কিছু নিয়েই ভাবতে হয়নি। সুধীন্দ্রনাথের ‘কাব্যসংগ্রহ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬২-র মে মাসে, নাভানা থেকে, বিরাম মুখোপাধ্যায়ের অভিভাবকত্বে। সে-বইয়ে সম্পাদক হিসেবে বুদ্ধদেব বসুর নাম না থাকলেও কবিতার পাঠ ও বানানের সমতাবিধান তাঁর পরামর্শ অনুযায়ীই করা হয়েছিল। বইয়ের ভূমিকায় বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন⎯ 

“এই বইয়ের কবিতাগুলি যাঁর রচনা, তিনি বিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তাঁর মতো নানাগুণসমন্বিত পুরুষ রবীন্দ্রনাথের পরে আমি অন্য কাউকে দেখিনি। বহুকাল ধ’রে তাঁকে প্রত্যক্ষ দেখেছিলুম ব’লে, তাঁর মৃত্যুর পর থেকে একটি প্রশ্ন মাঝে-মাঝে আমার মনে জাগছে: যাকে আমরা প্রতিভা বলি, সে-বস্তুটি কী? তা কি বুদ্ধিরই কোনো উচ্চতর স্তর, না কি বুদ্ধির সীমাতিক্রান্ত কোনো বিশেষ ক্ষমতা, যার প্রয়োগের ক্ষেত্র এক ও অনন্য? ইংরেজি ‘genius’ শব্দে অলৌকিকের যে-আভাস আছে, সেটা স্বীকার্য হ’লে প্রতিভাকে এক ধরনের আবেশ বলতে হয়, আর সংস্কৃত ‘প্রতিভা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ অনুসারে তা হ’য়ে ওঠে বুদ্ধির দীপ্তি, মেধার নামান্তর। যদি প্রতিভাকে অলৌকিক ব’লে মানি, তা হ’লে বলতে হয় যে সহজাত বিশেষ একটি শক্তির প্রভাবেই উত্তম কবিতা রচনা সম্ভব, রচয়িতা অন্যান্য বিষয়ে হীনবুদ্ধি হ’তে পারেন এবং হ’লে কিছু এসে যায় না, উপরন্তু ঐ বিশেষ ক্ষমতাটি শুধু দৈবক্রমে সহজাতভাবেই প্রাপণীয়। পক্ষান্তরে, প্রতিভাকে উন্নত বুদ্ধি ব’লে ভাবলে কবি হ’য়ে ওঠেন এমন এক ব্যক্তি যাঁর ধীশক্তি কোনো-কোনো ব্যক্তিগত বা ঐতিহাসিক কারণে কাব্যরচনায় নিয়োজিত হয়েছিলো, কিন্তু সেই কারণসমূহ ভিন্ন হ’লে যিনি বণিক বা বিজ্ঞানী বা কূটনীতিজ্ঞরূপে বিখ্যাত হ’তে পারতেন। এই দুই বিকল্পের মধ্যে কোনটা গ্রহণীয়?
বলা বাহুল্য, এই প্রশ্ন আমরা শুধু উত্থাপন করতে পারি, এর উত্তর দেয়া সকলেরই সাধ্যাতীত। কেননা ইতিহাস থেকে দুই পক্ষেই বহু সাক্ষী দাঁড় করানো যায়, তাঁরা অনেকে আবার স্ববিরোধে দোলায়মান। বহুমুখী গ্যেটে ও রবীন্দ্রনাথের ‘বিরুদ্ধে’ আছেন একান্ত হ্যেল্ডার্লিন ও জীবনানন্দ, মনীষী শেলি ও কোলরিজের পাশে উন্মাদ ব্লেক ও অশিক্ষিত কীটস, উৎসাহী বোদলেয়ারের পরে শীতল ও নিরঞ্জন মালার্মে। জগতের কবিদের মধ্যে এত বিভিন্ন ও বিরোধী ধরনের চরিত্র দেখা যায়, এত বিচিত্র প্রকার কৌতূহলে বা অনীহায় তাঁরা আক্রান্ত, এত বিভিন্নভাবে তাঁরা কর্মিষ্ঠ ও নিষ্ক্রিয়, এবং উৎসুক ও উদাসীন ছিলেন, যে ঠিক কোন লক্ষণটির প্রভাবে তাঁরা সকলেই অমোঘভাবে কবি হয়েছিলেন, তা আবিষ্কার করার আশা শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে হয়। এবং কবিত্বের সেই সামান্য লক্ষণ⎯ যদি বা কিছু থাকে⎯ তা আমার বর্তমান নিবন্ধের বিষয়ও নয়; এখানে আমি বলতে চাচ্ছি যে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এমন একজন কবি যাঁর প্রতিভার প্রাচুর্যের কথা ভাবলে প্রায় অবাকই লাগে যে কবিতা লেখার মতো একটি নিরীহ, আসীন, ও সামাজিক অর্থে নিষ্ফল কর্মে তিনি গভীরতম নিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন।…”

সুধীন্দ্রনাথের ‘কবিতাসংগ্রহ’ নাভানার পর ভারবি হয়ে আমাদের কাছে এসেছিল। ভারবি সংস্করণ অবশ্য নাভানারই প্রতিরূপ ছিল। ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশের আগে আমরা প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী রাজেশ্বরী দত্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু দে’জ সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬-এর জুলাই মাসে, আর রাজেশ্বরী প্রয়াত হন সেই বছরের ১০ এপ্রিল। আমাদের বইটিতে বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকার পরেই সংক্ষিপ্ত প্রকাশকের নিবেদনে আমি উল্লেখ করেছিলাম⎯ “…‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ’-এর প্রথম দে’জ সংস্করণ প্রকাশের আয়োজন হয় কবিপত্নী রাজেশ্বরী দত্তের মৃত্যুর অল্পদিন আগে। প্রাথমিকভাবে তাঁর সহায়তায় ও তাঁর তিরোধানের পর কবিভ্রাতা শ্রী হরীন্দ্রনাথ দত্ত ও শ্রী শৌরীন্দ্রনাথ দত্তের সহযোগিতায় বহু কবিতার রচনাকাল উদ্ধার ক’রে দিয়েছেন শ্রী স্বপন মজুমদার। তাঁরই সংকলিত সংযোজন অংশে মুদ্রিত হয়েছে পূর্ণাঙ্গ পাঠভেদ, কবিতার নাম ও প্রথম পঙ্‌ক্তির সূচি, এবং সুধীন্দ্রনাথের লেখা ‘অর্কেস্ট্রা’ ও ‘ক্রন্দসী’র বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন সংস্করণের প্রচ্ছদচিত্রও তাঁর সংগ্রহ থেকে পাওয়া। বর্তমান পুনর্মুদ্রণের অনুমতির জন্য হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ফাউন্ডেশন ও সংশ্লিষ্ট সকলকে সকৃতজ্ঞ নমস্কার জানাই।”

zoom
সুধীন্দ্রনাথের লেখা ‘অর্কেস্ট্রা’র বিজ্ঞাপন

zoom
সুধীন্দ্রনাথের লেখা ‘ক্রন্দসী’র বিজ্ঞাপন

স্বপনদা বইয়ের পরিশিষ্ট যে ‘সংযোজন’ অংশটি তৈরি করেছিলেন, তাতে জানিয়েছেন, নাভানা সংস্করণে উল্লেখ করা ছিল⎯ “বইয়ের প্রেস-কপি তৈরি ক’রে দিয়েছেন প্রধানত শ্রী মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও শ্রী অমিয় দেব; শ্রী অমিয় দেব প্রুফ সংশোধনের আংশিক দায়িত্বও নিয়ে-ছিলেন, এবং পাঠান্তরসমূহের নির্দেশ তিনি রচনা ক’রে না-দিলে বইখানি অসম্পূর্ণ থেকে যেতো।…” তবে এই বইটা প্রকাশের সময় আমি বইয়ের ডাস্ট জ্যাকেটের কাগজ জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছিলাম। নাভানা সংস্করণের বইয়ে ডাস্ট জ্যাকেটে এক ধরনের করোগেটেড অফ-হোয়াইট কাগজ ব্যবহার করা হয়েছিল। সেটা আবার স্বপনদার খুবই পছন্দ ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, আমাদের সংস্করণেও ওইরকম কাগজ ব্যবহার করা হোক। কিন্তু সে-কাগজ পাওয়া বেশ শক্ত ছিল। আমি যাদের কাছ থেকে কাগজ নিতাম, তাদের সকলকেই বলে রেখেছিলাম করোগেটেড কাগজের জন্য। কিন্তু সেইরকম কাগজ জোগাড় করতে গিয়ে বই-প্রকাশ প্রায় মাস খানেক-মাস দেড়েক পিছিয়েও যায়। অবশেষে একজন আমাকে ওইরকম কাগজ জোগাড় করে দিলেন। তবে অফ-হোয়াইট নয়, আমি পেলাম করোগেটেড সাদা কাগজ। তাই দিয়েই তৈরি হল আমাদের সংস্করণের ডাস্ট জ্যাকেট। আমার বেশ মনে আছে, সেসময় আমাদের এই বইটির অঙ্গসৌষ্ঠবেরও প্রশংসা হয়েছিল। আর স্বপনদার পরিমিত সম্পাদনার কাজও খুবই প্রশংসিত হয়েছিল। তিনি কেবল পুরোনো বইটির সঙ্গে মিলিয়েই আমাদের সংস্করণ তৈরি করেননি। সুধীন্দ্রনাথের প্রতিটি বইয়ের সবগুলি সংস্করণ আবু সয়ীদ আইয়ুবের সংগ্রহ থেকে মিলিয়ে দেখেছিলেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি, সুধীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সংবর্ত’ কবিতাবইটি উৎসর্গ করে লিখেছিলেন ‘আবু সয়ীদ আইয়ুব/ বন্ধুবরের করকমলে’।

zoom
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

সুধীন্দ্রনাথের ‘কাব্যসংগ্রহ’-এর সংযোজন অংশ ছাড়া অন্য কোথাও স্বপনদার নাম না-থাকলেও ২০০৭ সালে দে’জ থেকে প্রকাশিত সুধীন্দ্রনাথের ‘গল্পসমগ্র’ বইটিতে সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম আছে। কবি সুধীন্দ্রনাথের মৌলিক এবং অনুবাদ গল্প মিলিয়ে ‘গল্পসমগ্র’ বেশ বড় বই। আমার ধারণা ছিল না বইটা এত বড় হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখলাম রয়্যাল সাইজে ৪০০ পাতা ছাড়িয়ে গেছে। এই বইয়ের সম্পাদকীয় ‘আভাষ’-এ স্বপনদা লিখেছেন⎯ “সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০০-৬০) গল্প লিখেছিলেন, তথ্য হিশেবে সম্পূর্ণ অজানা ছিল না আমাদের। কিন্তু জানা ছিল না তার পরিমাণ বা গুণমান। তাঁর দশটি খশড়া-খাতার প্রথমটিতেই (১৯২৩-২৪) তিনটি গল্পের মুসাবিদা ছিল। স্বাক্ষরহীন দুটি অনুবাদ-গল্প ও স্বনামে ‘উপন্যাসের উপক্রমণিকা’ নামে একটি অসমাপ্ত আখ্যান প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর জীবনকালে। সম্প্রতি তাঁর রক্ষিত কাগজপত্রের মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে সম্পূর্ণ-অসম্পূর্ণ চোদ্দটি মৌলিক ও তেরোটি অনুবাদ-গল্পের খশড়া থেকে তোলা, প্রয়াসী থেকে পরিণত⎯ কোনও-কোনওটির একাধিক⎯ পাঠ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সূত্র মিলিয়ে মনে হয়, মৌলিক গল্পগুলি রচনার সময় এক দশকের⎯ ১৯২৩ থেকে ১৯৩২ মধ্যে। অর্থাৎ তন্বী-র সমকালেই এই গল্প লেখার শুরু, শেষ অর্কেস্ট্রা-পর্বে এসে। স্নাতকোত্তর শিক্ষাকাল থেকে অ্যাটর্নিশিপের শিক্ষানবিশি চলছে তখন। বিবাহ (২২ জুলাই ১৯২৪) -পূর্ব ও -পরবর্তী জীবনে ব্যাপ্ত এই গল্প লেখার পরিসর। মধ্যে বিরতি ঘটেছে জাপান, আমেরিকা ও ইউরোপ সফরের ফলে। বিদেশ থেকে ফেরার পরেও অন্তত একটি উপন্যাস-অভিলাষী বড়ো গল্প লেখার নিশ্চিত সন-তারিখ পাই আমরা, পরিচয় পত্রিকাও প্রকাশিত (১৩৩৮ শ্রাবণ) হয়ে গেছে ততদিনে। বিদেশী গল্পের অনুবাদ শুরু হয় গল্প লেখার প্রথম যুগেই, যদিও প্রকাশ ১৯৩৬-এ পরিচয় পত্রিকা ত্রৈমাসিক থেকে মাসিকে রূপান্তরের পর্বে, পত্রিকার ক্ষিদে মেটাতে।” প্রসঙ্গত স্বপনদা জানিয়েছেন⎯ ‘সুধীন্দ্রনাথের এই পাণ্ডুলেখগুলি রাজেশ্বরী দত্তের কাগজপত্রের সঙ্গে গচ্ছিত ছিল কবির কনিষ্ঠ ভ্রাতা শৌরীন্দ্রনাথ দত্তের কাছে, প্রথমে রিজেন্ট পার্কের ও পরে বিধাননগরের বাড়িতে। কবির ভাগিনেয় শ্রীঅরবিন্দ ঘোষের উৎসাহে এই অমূল্য সম্ভার তাঁরা তুলে দিয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অছিত্বে ‘স্কুল অফ্ কালচারাল্ টেক্সট্স্‌ অ্যান্ড রেকর্ডস্’কে।”

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘কাব্যসংগ্রহ’ প্রসঙ্গে আবার অমিয়দার নাম এল। অমিয়দা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’ সম্পাদনা করেছেন। যতদূর মনে পড়ছে, বইটি ১৯৮৩ সালে প্রথমে হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ফাউন্ডেশন ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল। ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে আমি অমিয়দাকে একটি চিঠি লিখে জানিয়েছিলাম⎯

“অধ্যাপক ড. অমিয় দেব
হীরেন্দ্রনাথ দত্ত ফাউন্ডেশন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
কলকাতা ৭০০০৩২

সবিনয় নিবেদন,

১. ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধসংগ্রহ’ আপনারাই ছাপবেন, জানলাম। বইটি দীর্ঘদিন ছাপা নেই, তাই অনুরোধ, পুনর্মুদ্রণ তাড়াতাড়ি করলে ভালো হয়। 

২. সুধীন্দ্রনাথ দত্তের গ্রন্থাকারে অসংকলিত প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত অন্যান্য গদ্যরচনা আমরা প্রকাশ করতে চাই। আনুমানিক ২০০/২৫০ পৃষ্ঠার এই সংকলনটি আপনাদের তুলনামূলক সাহিত্যবিভাগের শ্রীস্বপন মজুমদার করতে সম্মত হয়েছেন। 

৩. ‘সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহে’র পরবর্তী সংস্করণে আমরা কাব্যনাটক ‘পুনরুজ্জীবন’ অন্তর্ভুক্ত করতে চাই। শ্রীস্বপন মজুমদার এই সংযোজনটিও সম্পাদন করবেন। 

উপর্যুক্ত দুটি প্রসঙ্গে আপনাদের অনুমতির অপেক্ষায় রইলাম।…” 

স্বপনদার কাজ দু’টির কথা তো আগেই বলেছি। তবে সুধীন্দ্রনাথের কাব্যনাটকটি ‘কাব্যসংগ্রহ’-এ এখনও সংকলিত হয়নি। আর তাঁর ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’ অমিয়দার সম্পাদনায় ১৯৯৫-এর বইমেলায় দে’জ থেকে নতুন করে প্রকাশিত হয়। সুধীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের বই দু’খানি⎯ ‘স্বগত’ এবং ‘কুলায় ও কালপুরুষ’। ‘স্বগত’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ইন্দুভূষণ ভাদুড়ীর ভারতী ভবন থেকে। পরে এর দ্বিতীয় সংস্করণ এবং ‘কুলায় ও কালপুরুষ’ সিগনেট থেকে দিলীপকুমার গুপ্ত প্রকাশ করেন। ভারতী ভবন সংস্করণের মলাটে যামিনী রায়ের একটি স্কেচ ব্যবহার করা হয়েছিল। আর সিগনেট সংস্করণের বইদু’টির জন্য সত্যজিৎ রায়ের করা মলাট বাংলা প্রচ্ছদের ইতিহাসে খুবই উল্লেখযোগ্য কাজ। ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’-এ সুধীন্দ্রনাথের দু’টি বইয়ের বাইরে অমিয়দা ১৩৬৭-র সাহিত্যসংখ্যা ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বুড়োর চোখে রাগী ছোকরার দল’ লেখাটিও সংযোজন করেছিলেন। 

অমিয়দার সম্পাদনায় বেশ কয়েকটি বইয়ের কথা ইতিমধ্যেই বলেছি। তবে তাঁর লেখা বই আমি বিশেষ পাইনি। অনেক পরে, ২০২৩ সালে বাংলা নববর্ষের সময় অপুর চেষ্টায় দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে অমিয় দেবের ‘গদ্য সংকলন’। ‘গদ্য সংকলন’-এর ‘নিবেদন’ অংশে অমিয়দা লিখেছেন⎯ “কিছু নানা সময়ে ছড়ানো ও কিছু হালের, বাস্তবিকই ছিটোনো, লেখা নিয়ে এই অতিকায় সংকলন। নাম হতে পারত ‘ছড়িয়ে ছিটিয়ে’; কিন্তু এখন ক্লাসিক হিরণকুমার সান্যালের ওই সুখপাঠ্যের নকল হবারও এর সাধ্য নেই। অগত্যা ‘গদ্য সংকলন’, যদিও এর শেষ লেখা এক কবিতা-অনুবাদ। এর প্রাথমিক প্রস্তাব কুর্চি দাশগুপ্তের, উদ্যোগ প্রণব বিশ্বাসের, ও নির্মাণ শুভংকর দে-র। তাঁদের কাছে আমি ঋণী।” 

‘গদ্য সংকলন’-এর দ্বিতীয় লেখাটির শিরোনাম⎯ ‘এক ব্যাগ শংকর’⎯ দেখে আমার অনেক পুরনো দিনের একটা কথা মনে পড়ে গেল। ১৯৮৭ সালে সুরজিৎ ঘোষের ‘প্রমা’ পত্রিকায় অমিয়দার এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এর প্রায় দু’বছর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের লেটারহেডে আমাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ২৯ মে ১৯৮৫ সালের সেই চিঠিতে অমিয়দা লিখেছিলেন⎯ 

‘প্রীতিভাজনেষু,
আমার একটা উপকার করতে হবে। শংকর-এর যাবতীয় বই আমার দরকার। আপনাদের প্রকাশিত তো অনেকগুলোই আছে, অন্যদের প্রকাশিতও কয়েকটা আছে। গগণের হাত দিয়ে যদি পাঠিয়ে দিতে পারেন উপকৃত হই।…’ 

যতটা মনে পড়ে, অমিয়দার জন্য শংকরের অনেকগুলি বই পাঠাতে পেরেছিলাম।

সুধীন্দ্রনাথের ‘প্রবন্ধসংগ্রহ’-এর আগেই অবশ্য ১৯৮৮ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এবং কবি জগন্নাথ চক্রবর্তীর সম্পাদনায় দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’। জগন্নাথ চক্রবর্তীর অনুবাদে সাহিত্য অকাদেমি থেকে প্রকাশিত টি এস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ এবং ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর যুগ্ম অনুবাদ বই⎯ ‘পোড়ো জমি ও চৌতাল’ অত্যন্ত পাঠকপ্রিয় বই। এমনকী, বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ পরিকল্পিত ও সংকলিত এখনও পর্যন্ত অসম্পূর্ণ প্রকল্প ‘জাতীয় অভিধান’-এর আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত প্রথম খণ্ডের প্রধান সম্পাদকও ছিলেন জগন্নাথ চক্রবর্তী। ‘নগরসন্ধ্যা’, ‘পার্ক স্ট্রিটের স্ট্যাচু’র মতো কবিতাবই থেকে শুরু করে ‘মেঘনাদবধ কাব্যে চিত্রকল্প’, ‘গীতাঞ্জলি/অস্তিত্ব বিরহ’ ইত্যাদি বইয়ের লেখক জগন্নাথ চক্রবর্তীর সম্পাদনায় সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বইটি আমাদের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বিশেষ করে জগন্নাথ চক্রবর্তীর লেখা ভূমিকাটি এই বইয়ের সম্পদ। 

দে’জ পাবলিশিং-এর জন্য স্বপনদার সম্পাদিত আরেকটি বই আমার নিজের খুব প্রিয়⎯ অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘গিরিশচন্দ্র’। বাংলা নাটক-থিয়েটার নিয়ে স্বপনদার আগ্রহ ছিল বহুদিন। তিনি ‘বহুরূপী’ নাট্যদলের ইতিহাস (১৯৪৮-১৯৮৮) যেমন লিখেছেন, তেমনই অপরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ‘রঙ্গালয়ে ত্রিশ বৎসর’ বইটিও সম্পাদনা করেছেন। অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘গিরিশচন্দ্র’ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে। এই বইয়ের উৎসর্গের পাতাটি আমাদের সংস্কৃতির সেকালের ইতিহাসেরও সাক্ষ্য বহন করে। উৎসর্গে অবিনাশচন্দ্র লিখেছিলেন⎯

কাশিমবাজারাধিপতি মহারাজা স্যার মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী
কে.সি.আই.ই. মহোদয় সমীপেষু⎯
মহারাজ,
গিরিশচন্দ্রের রচনার আপনি চিরদিন পক্ষপাতী। গিরিশচন্দ্রও চিরজীবন মহারাজের
প্রতি শ্রদ্ধাবান ছিলেন। এই ভরসায় ‘গিরিশচন্দ্র’ রাজ-করে সমর্পণ করিতে সাহসী
হইলাম। গ্রন্থপাঠে মহারাজ কিঞ্চিন্মাত্র আনন্দলাভ করিলে আমার সমস্ত শ্রম সার্থক
হইবে। নিবেদন ইতি।
অনুগত
শ্রীঅবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়।

স্বপনদা যথারীতি মূল বইয়ের পাঠকে টীকায় কণ্টকিত না করে বইয়ের শেষে ‘সম্পূরণ’ অংশে যাবতীয় তথ্যের সমাবেশ করেছেন। এই অংশে গিরিশচন্দ্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে স্বপন মজুমদার লিখেছেন⎯ 

“কর্মীর জীবনী প্রধানত তাঁর কর্মজীবনের ইতিহাস। গিরিশচন্দ্রের জীবনী সেই অর্থে বাঙলা সাধারণ নাট্যশালার প্রথম চল্লিশ বছরের ইতিহাস। উন্মেষ পর্বের বাঙলা মঞ্চের আলো-আঁধার তাঁর জীবনকেও বর্ণিল ক’রে তুলেছিলো। গিরিশচন্দ্র ও তাঁর সহযোগীদের চেষ্টায় যে-নাট্যশালা গ’ড়ে উঠেছিলো বাঙলাদেশে, একমাত্র ভারতীয় রঙ্গমঞ্চেরই ঐতিহ্যবাহী ব’লে তাকে দাবী করা যায় না, অথচ যাত্রার সঙ্গে তার যোগ নাড়ীর।… কিন্তু গিরিশচন্দ্রকে অনিকেত বলা যায় না কিছুতেই। তিনিই প্রথম, যিনি দর্শকের অভিরুচি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং তাকে অবজ্ঞা করেননি। প্রথম জীবনে যিনি সচেতনভাবে যাত্রার মণ্ডপ ছেড়ে মঞ্চের পাদপ্রদীপের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, জীবনের মধ্য পর্বে এসে সেই যাত্রার বৈশিষ্ট্যগুলিই তিনি প্রয়োগ করলেন নাট্যের প্রয়োজনে⎯ চমক সৃষ্টির কোনো আশু অভিসন্ধিতে নয়, যাত্রার পরিবেশনরীতিতে দর্শকের সহানুভব কল্পনা আশ্রয় ক’রে নাট্যের অধিকারকে অনেক দূর বাড়িয়ে নেওয়া যায়, এই আন্তরিক বিশ্বাস থেকেই। জাতীয় ভাবের মধ্যেই যে নাটকের মূল অনুসন্ধেয়⎯ এ-বিষয়ে কোনো দ্বিধা বা সংশয় ছিলো না তাঁর। এবং তাঁর স্বকালের সঙ্গে যোগ রেখে সমীচীন কারণেই তিনি ধর্মের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন জাতীয় ভাবের মর্মমূল। যুগের এই বিশ্বাসের সঙ্গে যোগ ছিলো ব’লেই তাঁর কালের নাট্যশালা জাতীয় জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হ’তে পেরেছিলো। গিরিশচন্দ্র খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর অধিক্ষেত্রের সন্ধান, বাঙলা নাটক পেয়েছিলো স্বস্থ হওয়ার মতো অবলম্বন। শুধু তা-ই নয়, বাঙলাদেশে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিকালীন দুটি দশক জুড়ে উগ্র ধার্মিকতা থেকে উদগ্র স্বাদেশিকতায় যে-দীক্ষা চলছিলো, গিরিশচন্দ্রের নাট্যজীবনও তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিবর্তিত হচ্ছিলো। পৌরাণিক নাটক দিয়ে শুরু ক’রে পরবর্তী পর্বেই তিনি নিয়েছিলেন নাম-ভক্তি প্রচারকের ভূমিকা, প্রচলিত লৌকিক আখ্যান পর্যন্ত তখন তাঁর নাটকের উৎস বিস্তৃত। দেব ও দেবোপম মানুষে ভক্তি থেকে দেশ ও দেশপ্রেমীর প্রতি ভক্তির পথে পৌঁছতে বেশি বিলম্ব হয়নি তাঁর। কারণ, এর সবটাই ঘটেছিলো তাঁর অভিজ্ঞতার ও বিশ্বাসের পরিধির মধ্যে। কিন্তু সামাজিক সমস্যা নিয়ে তিনি যখনই নাটক লিখতে গেছেন, তাঁর বেদনার সঙ্গে বিশ্বাসের অমিল ঘটেছে পদে-পদে। তাই সে-নাটকে কারুণ্য প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু করুণাঘন সত্যের বনিয়াদ পায়নি। আর এই অন্তরের অসহযোগের ফলেই সামাজিক বিষয় নিয়ে নাটক রচনাকে তাঁর মনে হয়েছে নর্দমা ঘাঁটার সমতুল্য।…”

১৯৯৮-এর বাংলা নববর্ষে আমি প্রায় জোর করেই স্বপনদার একটা ছোট্ট বই প্রকাশ করেছিলাম⎯ ‘সাত দশকের থিয়েটার ও অন্যান্য’। ১৯৯৩ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় সাত কিস্তিতে তিনি লিখেছিলেন⎯ ‘সাত দশকের থিয়েটার’। এই সাতটি লেখার সঙ্গে আরও চারটি লেখা যুক্ত করে প্রকাশিত হয়⎯ ‘সাত দশকের থিয়েটার ও অন্যান্য’। এই বইয়ে ভূমিকার বদলে ‘স্বীকৃতি’তে স্বপনদা লিখেছিলেন⎯ 

“কোন বই লেখার তাগিদ থেকে এ-লেখাগুলোর জন্ম নয়। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র সত্তর বৎসরপূর্তি উপলক্ষে দশকওয়ারি সাতটি ক্রোড়পত্র প্রকাশের পরিকল্পনা করেন কাগজটির সম্পাদকমণ্ডলি। তাঁদের অনুরোধে যে-লেখাগুলো কিস্তিবন্দী প্রকাশিত হয়েছিল সাত সপ্তাহে, তা-ই এ-বইয়ের নাম-প্রবন্ধ। এর অনুসঙ্গী আরও চারটি লেখা গেঁথে তৈরি হ’ল এই বই।
এই কিঞ্চিৎকর লেখাগুলো মলাটবন্দী করতে হ’ল শেষ পর্যন্ত শ্রীসুধাংশুশেখর দে-র অভিমানের দাবিতে। যে-সম্পাদকদের অনুরোধে লেখার অলসতা ত্যাগ করতে হয়েছিল, তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাই।”

দে’জ পাবলিশিং থেকে আরেকটি বইয়ে স্বপনদার নাম সহযোগী সম্পাদক হিসেবে আছে⎯ ‘বিলাতি যাত্রা থেকে স্বদেশী থিয়েটার’⎯ কিন্তু এ-বইয়ের কথা বলার আগে সুবীরদার (সুবীর রায়চৌধুরীর) কথা আরেকবার বলতে হবে।

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা

পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান

পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ

পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন

পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ

পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!

পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!

পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়

পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়

পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়

পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!

পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু

পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না

পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম

Amiya Deb Buddhadeb basu Dey's Publishing Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sudhindranath Dutta Swapan Majumdar

Share this article on