an article on taherpur sara art and laxmi sara | Robbar
Robbar
  • ৬ কার্তিক ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ২৪ অক্টোবর ২০২৬

সরার শ্রী সরার লক্ষ্মী

আধুনিক শিল্পীরা যখন ক্যানভাসে কোনও অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন, তখন প্রথমে স্কেচ করেন। কাটাকুটি করে ভুল সংশোধন করেন স্কেচ পর্যায়ে। তাহেরপুরের শিল্পীরা যেন অলৌকিক গতিতে রং বা রেখার এক টানে জীবন্ত করে তোলেন। এখান থেকে বোঝা যায় ছবিটির মূল নকশা শিল্পীর মস্তিষ্কের চেয়েও হাতের স্নায়ুকোষে বেশি সক্রিয় থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও কগনিটিভ নৃতত্ত্বের ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে ‘মাসল মেমোরি’র প্রয়োগ।

শেষ আপডেট: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১৯:০৩   
Facebook WhatsApp Messenger

৫৪.

মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা। দু’পাশে জয়া বিজয়া। কার্তিক গণেশ। নিচের খোপে শান্ত প্রসন্নময়ী দেবী লক্ষ্মী। বাহন প্যাঁচা। লক্ষ্মীর সাজ; আয়না, গাছকৌটো, নৌকা, কড়ি ইত্যাদির রৈখিক অবয়ব। অর্ধবৃত্তকার দুর্গার ফাঁকা চালচিত্রের উপর ধ্যানমগ্ন মহাদেবের মুখমণ্ডল।

প্রধান দুই দেবী অর্থাৎ দুর্গা ও লক্ষ্মীর সম্মুখবর্তী দু’ চোখের শান্ত দৃষ্টি এবং অন্যান্যদের এক চোখের পার্শ্বচিত্রের যুগপৎ ব্যবহার চমৎকার। যেন প্রাচীন মিশরীয় ফন্টালিজম ও ভারতীয় জৈন পটচিত্রের মিশ্র ধ্রুপদী চরিত্রের এক অপূর্ব লোকায়ত সংস্করণ।

zoom
একচোখের দুর্গাসরা

ছবির উপরিভাগে আলোর প্রতিফলন। কিনারায় গোলাকার ঢাল– স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয়, পোড়ামাটির সরার অবতল অংশটিকে নিচে রেখে কচ্ছপের পিঠের মতো উত্তল অংশটি হয়েছে ক্যানভাস। মাঝখানটা উঁচু। চারপাশে ঢালু। এই রূপতাত্ত্বিক নেপথ্যে লুকিয়ে আছে বাংলার কূর্মডাঙার আদর্শ ‘গ্রাম-বাস্তু’র ভৌগোলিক প্রভাব। এই ধরনের গ্রামের ভৌগোলিক গঠনকে বলে ‘কূর্মডাঙা’ এবং এই নামে ও গঠনে বাংলায় একাধিক গ্রামও আছে।

দ্বিস্তরীয় জ্যামিতিক খোপ। লালসাদার সিধে বা বক্র বর্ডার-রেখায় মহিষাসুরমর্দিনী ও লক্ষ্মীর আসন নির্দিষ্ট হয়েছে যা সাধারণত দুর্গা-ভাস্কর্যে থাকে না। এটি সরাসরি বাংলার টেরাকোটা মন্দিরের গায়ে চতুষ্কোণ ফলক-সজ্জার লৌকিক চিত্রল রূপান্তর। 

এই হল তাহেরপুরের লক্ষ্মীসরা। যেন বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন। যেন সরায় আঁকা ছোটগল্প।

আর এখানেই সাধারণ পটুয়াদের পটচিত্রের সঙ্গে কুম্ভকারদের সরাচিত্রের পার্থক্য প্রকট করে। পটুয়াদের জড়ানো বা দীঘল পটচিত্র বিশুদ্ধ দ্বিমাত্রিক হলেও গতিশীল আখ্যান ও সমতল রেখার গীতিময় চিত্রকলা। কুম্ভকারদের সরাপট সেখানে স্থির উপাসনা, ভাস্কর্য-সুলভ টেরাকোটা প্যানেলিং এবং সূক্ষ্ম জ্যামিতিক অঙ্কনশৈলীর যুগলবন্দি।

zoom
এক চোখ ও দু’ চোখের মিশ্র লক্ষ্মীসরা

আমি আছি এখন তাহেরপুর পালপাড়ার প্রবীণ শিল্পী রতন পালের (৬৫) স্টুডিওতে। তিনি তখন ‘ভোট’ বা ঘটের মতো সিমেন্টের তৈরি শঙ্কু আকৃতির সূচালো মাথায় সরা চাপিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে ‘এক টানের’ কালো ‘চিত্তির’ কাটছিলেন। 

দু’পাশে সাজানো লাল ব্যাক-গ্রাউন্ডের উপরে চকচকে দুর্গাসরা। পুতুল বিন্যাসে ধ্রুপদী সুরেশ্বরী সরার সঙ্গে বেশ খানিকটা মিল থাকলেও বললেন, ‘একেই আমরা বলি গণকাসরা।’

‘গণকা’ মানে গণক অর্থাৎ আচার্য ব্রাহ্মণ। প্রাচীন যজ্ঞবেদীর জ্যামিতি ও শুল্ব-শাস্ত্রের বাহক জ্যোতির্বিজ্ঞানী। যাঁদের মহাজাগতিক গণনা ও রেখাচিত্রের শস্ত্রীয় জ্ঞান সরাচিত্রের নিঁখুত জ্যামিতিক বিন্যাসের মূল ভিত্তি।

পেশাগতভাবে গ্রহাচার্য হবার কারণে তেজ ও মাঙ্গলিক কল্যাণের কারক লাল মঙ্গলগ্রহ ও পবিত্র যজ্ঞাগ্নি-শিখার দৈব-দর্শন সরার রক্তিম পটভূমি নির্মাণের সিগনেচার। 

সরা লোকশিল্প হলেও তার নেপথ্যে আছে অভিজাত দর্শন ও অঙ্কন শৈলীর ধ্রুপদী স্টাইল। 

zoom
সরা আঁকায় ব্যস্ত শিল্পীরা

–তাহলে বলছেন, আপনাদের সরাশিল্পের মূলে রয়েছে ক্রেতাদের চাহিদা। খরিদ্দার যেমন চাইছেন তেমনভাবে আপনারা সরা প্রস্তুত করছেন?

পালগিন্নি তখনও একমনে লক্ষ্মীর দু’পাশে অবস্থিত জোড়া কার্তিক লক্ষ্মীসরায় ‘সাদা’ কাটছিলেন। অর্থাৎ সূক্ষ্ম তুলিতে সাদারঙের ঘন ডট দিচ্ছিলেন। 

–যেমন চাইছেন নয়, বংশ পরম্পরায় যা নির্দিষ্ট আছে তেমনই তৈরি করি আমরা। এক এক বংশের এক এক রকম নিয়ম। তাঁদের ফরমাশ মতোই আমরা সরা আঁকি। তবে রুচিও বদলাচ্ছে। সুতরাং অভিনবত্ব আসছে বইকি।

সরা থেকে চোখ সরিয়ে জানালেন শিল্পী রতন পাল। 

আরও বললেন, ‘ওই যে গিন্নি এখন জোড়া কার্তিক সরায় সাদা কাটছেন– ওর ১০০ পিস অর্ডার আছে।’ 

zoom
লক্ষ্মীসরা

শুধু রতনবাবু নন, তাহেরপুরের অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শিল্পটিকে আসলে বাঁচিয়ে রেখেছে ভোক্তা বা ক্রেতার ধর্মীয় অনুশাসন। সংরক্ষণ বলতে আমরা সাধারণত মিউজিয়ামে থাকা লুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় বস্তুকে বুঝি। কিন্তু তাহেরপুরের সরাশিল্প কাচের বাক্সে আটকে নেই। প্রতি বছর হাজার হাজার সরা তৈরি হচ্ছে। চিরাচরিত প্রথা মেনে পুজোর পর বিসর্জনও হচ্ছে। 

বস্তুটি ধ্বংস হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অঙ্কনশৈলী, রেখার জ্যামেতি এবং সংস্কৃতির রূপটি সংরক্ষিত হচ্ছে। যাকে জীবন্ত-ঐতিহ্যের সংরক্ষণ বলাই ভালো। সংরক্ষণের এই জীবন্ত ধারাটি রাষ্ট্রের বা কোন এনজিওর অনুদানে বাঁচেনি। ক্রেতাই হয়ে উঠেছেন সংস্কৃতির অভিভাবক।

ভাষা ও সংস্কৃতি একটা ছিন্নমূল জাতিকে কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে– এখানে না এলে ঠিক বুঝতে পারতাম না।

•

সরাচিত্রের স্রষ্টা ও ক্রেতা উভয়ে ওপার বাংলার একদা ছিন্নমূল মানুষ। দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়ে উভয়ে একবস্ত্রে দেশ ছেড়েছিলেন। হারিয়েছিলেন সামাজিক প্রতিপত্তি। এপারে এসে সম্পূর্ণ নতুন প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশে বসতি স্থাপন করেছেন। প্রথমদিকে তৈরি হয়েছিল আত্মপরিচয়ের সংকট। কিন্তু চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের অবচেতন মন আঁকড়ে ধরেছিল নিজস্ব পারিবারিক ধর্মীয় কুলাচার বা অনুশাসনকে।

zoom

মনে করা হয়, স্থানান্তরের সঙ্গে মানুষের সংস্কৃতি ও নান্দনিক রুচি পারিপার্শ্বিকের চাপে বদলে যায়। দেশভাগের আট দশক পরেও সরাশিল্পের বাহ্যিক কিছু পরিবর্তন হলেও তুলির সেই এক-টানের সাবলীলতা, গতিময়তা, চিত্রণ-সৌকর্যের বদল ঘটেনি একটুকুও। যেমনটি বদলায়নি ক্রেতাদের ধর্মীয় মানসিকতার প্রবণতাটি। 

তুলির টানেই বেঁচে আছে হারিয়ে যাওয়া দেশের শেষ মায়াময় স্মৃতিটুকু।

তবে রুচি-বদলও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেই কারণে মূল ধারার বিশুদ্ধ ঘরানা থেকে জন্ম নিয়েছে মিশ্র চিত্রশৈলীর সরাপট। তাহেরপুরের সরায় যুক্ত হয়েছে জোড়া কার্তিকের মতো লৌকিক মোটিফ। এখান থেকে বোঝা যায়, ‘জীবন্ত-সংরক্ষণ’ কোনও অচলায়তন নয়– এক গতিশীল নান্দনিক ধারাবাহিকতার শিল্প-স্রোত।

মূল রাস্তার ধারে একটু নেমে গেলেই ডান হাতে সুকুমার পালের (৬৮) কারখানা। পালপাড়ার প্রবীণতম শিল্পী। দেশভাগের পরই সরাশিল্পী বাবা হরিদাস পাল এক বস্ত্রে দেশ ছেড়ে এখানে কোনওরকমে মাথা গুঁজেছিলেন। প্রথম দিকে বিশুদ্ধ ঢাকাই সরা তৈরি করতেন। পুত্র সুকুমার বাবার কাছেই কাজ শিখেছেন। বছরে প্রায় দশ হাজার সরা তৈরি করেন। তিনি জানালেন– ঢাকাই সরা এখনও তৈরি করি, তবে মুটকি ছাড়া। কানা উঁচু নান্দনিক বর্ডার যুক্ত (মুটকি) ঢাকাই সরাতে সুরেশ্বরীর মতো শিবদুর্গা নেই। লক্ষ্মী নারায়ণ বা বৈষ্ণবীয় আধিপত্য অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয় প্যানেলে একক লক্ষ্মী বা লক্ষ্মীর সঙ্গে জয়া-বিজয়া, সঙ্গে ময়ূরপঙ্খী নৌকা।

zoom
সরাশিল্পী দিলীপকুমার পাল

সুরেশ্বরী সরার আদি রূপের কিছুটা ছাঁটকাট করে ত্রিমাত্রিক প্যানেল রাখছেন ঠিকই, কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে। উপর প্যানেলে শিবের ছবি খুবই ছোট বা বর্ডারে রাখছেন। মাঝে মহিষাসুরমর্দিনী। নিচের প্যানেলে একক লক্ষ্মী স্থান পাচ্ছেন। ফরিদপুরী সরারও দু’টি প্যানেল। প্রথম খোপে রাধাকৃষ্ণ বা লক্ষ্মী নারায়ণ বা মহিষাসুরমর্দিনী। নিচের খোপে লক্ষ্মী-সহ জয়া-বিজয়া। কিন্তু তাহেরপুরের শিল্পীরা নিচের খোপে শুধুমাত্র লক্ষ্মীকে আঁকছেন। 

সুকুমারবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘অর্ডার পেলে ওটাই-বা আঁকতে কতক্ষণ!’

আসলে তাহেরপুরের সরাশিল্পের সঙ্গে সুরেশ্বরী ঢাকাই গণকী কিংবা ফরিদপুরী সরার যেমন মিল আছে, তেমনই অমিল বা স্বাধীনতাও আছে। বিশুদ্ধ ধ্রুপদী শৈলীতে এ সরার স্বরূপ সঠিক বোঝা যাবে না। কারণ সব মিলেমিশে এক মিশ্রশৈলী গড়ে উঠেছে। মূলে আছে ক্রেতা বা উপভোক্তাদের চাহিদা বা সংরক্ষণশীলতা বা স্বাধীনতা। কিন্তু রেখার টান অঙ্কনশৈলী এখনও অবিকৃত রয়ে গেছে। 

•

লক্ষ্মীসরা একান্তভাবে পূর্ববঙ্গীয়রা পুজো করেন। রাঢ়ের লক্ষ্মী আরাধনায় সরার কোনও যোগ নেই। তবে সরার উদ্ভব হয়েছিল লক্ষ্মীর হাঁড়া থেকে। ‘হাঁড়া’ শব্দটি রাঢ় অঞ্চলে বড় হাঁড়িকে নির্দেশ করে। রাঢ়ীদের ধানকেন্দ্রিক ‘লক্ষ্মীর হাঁড়া’ যেন প্রত্ন-মিউজিয়াম। 

হাঁড়ার ভিতরে থাকে ধান-সহ কাঠের পেঁচা এবং ‘লক্ষ্মীর-সাজ’; কড়ি ঝিনুক কাজললতা গাছকোটো বা সিঁদুরদানি চেলি ইত্যাদি। হাঁড়ার উপরের ঢাকনি সরা। সরা দিয়ে মুখ আটকে কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকে। বছরে তিনবার লক্ষ্মীর হাঁড়া থেকে ধান ও সাজগুলি বের করে বিশেষ পুজো করা হয়। যেমন চৈত্রলক্ষ্মী, ভাদ্রলক্ষ্মী এবং পৌষলক্ষ্মী রূপে। অনেক বনেদী রাঢ়ী পরিবারে দুর্গাপুজোর সময় লক্ষ্মীর-হাঁড়ার বিশেষ পুজো হয়। যেমন বাঁকুড়ার রাজগ্রামের মুণ্ডমূর্তিতে লক্ষ্মীর হাঁড়া পুজো বিশেষ বৈচিত্রময়।

zoom
সরা আঁকায় ব্যস্ত রতন পাল

আদিম কৃষিজীবী সমাজে শস্য বা ধান্য সংরক্ষণের পাত্র ‘হাঁড়া’ ক্রমশ পবিত্র বস্তু ওঠে। সরা সংস্কৃত ‘সরাব’ থেকে এসেছে। প্রথম দিকে হাঁড়ার ভেতরে সংরক্ষিত ধন-ধান্যের সুরক্ষার্থে তার ঢাকনা বা সরার ওপর মা লক্ষ্মীর ছবি বা মাঙ্গলিক চিহ্ন আঁকা শুরু হয়েছিল। কালক্রমে মানুষের শিল্পচেতনা ও ধর্মীয় বিবর্তনে ভেতরের মূল পাত্র অর্থাৎ ‘লক্ষ্মীর হাঁড়া’টি গৌণ হয়ে যায়। 

পাত্রের পরিবর্তে চিত্রিত সরাটিই হয়ে ওঠে আরাধনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। পূর্ববঙ্গে, বিশেষ করে ঢাকা, ফরিদপুর, সুরেশ্বর অঞ্চলে চিত্রিত সরাটিই সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে এবং মৃৎপ্রতিমার এক শক্তিশালী দ্বিমাত্রিক (2D) বিকল্প হিসেবে পুজো ও বিসর্জনের চল শুরু হয়। যদিও পূর্ববঙ্গে লক্ষ্মী আরাধনায় সরার পাশাপাশি নবপত্রিকা, মূর্তি ইত্যাদি পূজার রীতি রয়েছে। পূর্ববঙ্গীয় অনেক পরিবারে লক্ষ্মীর হাঁড়ার বিকল্প ‘সুলোচনা হাঁড়ি’ নামে বিশেষ ধরনের নান্দনিক মৃৎপাত্রটিতে মিষ্টান্ন মঠ ইত্যাদি দ্বারা সজ্জিত থাকে প্রতিমা-পুজোয়।

সরা তৈরিতে এঁটেল মাটি-সহ পলিমাটিরও পরিপাটি থাকে। মাটির বাছাই পর্ব শেষ হলে জলে ভিজিয়ে নরম করে মেসিনে বা হাতে পায়ে ছানা শুরু করেন শিল্পীরা। প্রস্তুত মাটিকে ডাব করে কেটে নিয়ে ‘চরা’ বা ছোট রুটির আকার দেন। ডাইস ঘুরিয়ে ও আঙুলের কেরামতি এবং পিটনির সাহায্যে পিটিয়ে কাঙ্ক্ষিত আকার দিয়ে, শুকিয়ে নিয়ে, ৪০-৫০টি সরা আয়তন সঠিক করার জন্য পর পর চাপিয়ে ‘গাদা’ করেন। ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে ভাটিতে পোড়ানোর পালা। 

zoom
ঢাকাই সরা

এ কাজ মূলত মহিলা-শিল্পীরা করেন। কাজ শুরু চৈত্র-বৈশাখ মাস থেকে। এ সময়ে পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থান থেকে মহাজনরা আসেন এবং অগ্রিম ৩০ শতাংশ বায়না দিয়ে অর্ডার দেন কোন টাইপের সরা লাগবে। শ’ হিসাবে পাইকারি রেট। এবার (২০২৬) সর্বাধিক বড় মাপের ১৫ ইঞ্চি মহিষাসুরমর্দিনী সরার পাইকারি রেট ১০০ থেকে ১১০ টাকা।

কথা হচ্ছিল আরেক প্রবীণ শিল্পী দিলীপকুমার পালের সঙ্গে (৬৮)। তিনি জানালেন, তাহেরপুরে পূর্বে ২৫-৩০ ঘর পরিবার সরার কাজে যুক্ত ছিলেন। এখন কমে ১৬ ঘর কাজ করেন। প্রচুর খাটনি বলে বিকল্প রুজি রোজগারের ধান্দায় অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। তিনি পূর্বে বছরে ১২ হাজার সরা করতেন, এখন ৫-৬ হাজারে ঠেকেছে। মাটির দর আকাশছোঁয়া। নতুন সরকারের আমলে মাটি প্রায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। তবে সরকার আশ্বস্ত করেছেন– অচিরে এ সমস্যা মিটে যাবে। এখন ট্রাকটর প্রতি দাম লাগে ২২০০ টাকা।

•

পোড়া মাটির সরার উপর খড়ি বা লাল রং দিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড করার পর রং ভরাট ও আঁকার কাজ শুরু। তাঁদের পরিভাষা অনুযায়ী কয়েকটি ধাপ হল:

১. টেঙনাই– রঙের প্রাথমিক ও মসৃণ টান বা জমি ভরাট

২. চিত্তির– চিত্রণ বা আউটলাইন রেখার টান। কালো রঙের প্রয়োগ

৩. সাদা কাটা– সাদা রং দিয়ে নানা ধরনের লাইন লুপ ডট ইত্যাদির জ্যামিতিক অলংকরণ

৪. খোঁপা– চুলের রং ভরাট

zoom
দুর্গাসরা গণকা

কাজগুলি ধাপে ধাপে সম্পন্ন ও শুকিয়ে নেওয়ার পর তরল এরারুট মাখিয়ে বার্নিশের কাজ হলে ফিনিশিং হয়। 

সাধারণ ছবির সঙ্গে সরাচিত্রের মূল পার্থক্য হল– ‘টেঙনাই’ আগে, ‘চিত্তির’ পরে। সাধারণ চিত্রকলায় পেনসিল দিয়ে আগে স্কেচ করার পর রং ভরাট করেন শিল্পীরা। সরাপটে অঙ্কনশৈলী ভিন্ন ধরনের। প্রাথমিকভাবে স্কেচ ছাড়াই বড় তুলির টানে ক্যানভাসের জমি ভরাট করেন। অতি সূক্ষ্ম তুলি দিয়ে ‘এক টানে’ লাইন ড্রয়িং করেন কালো রঙে। চিত্তিরের সমান্তরালে শাড়ির পাড়, বর্ডার, কিনারার ‘কাট’ চলে। এরই নাম সাদা বা লাল কাট। কালো রেখার গুণে দেবদেবীর এক চোখ বা দু’ চোখের প্রাচীন জ্যামিতি নিমেষেই জীবন্ত হয়ে ওঠে।

রতন পাল বললেন, ‘এক টানের জাদু। এখানে দুটো টান দেওয়ার কোনও অবকাশ নেই। এটাই সরাশিল্প।’ 

আধুনিক শিল্পীরা যখন ক্যানভাসে কোনও অবয়ব ফুটিয়ে তোলেন, তখন প্রথমে স্কেচ করেন। কাটাকুটি করে ভুল সংশোধন করেন স্কেচ পর্যায়ে। তাহেরপুরের শিল্পীরা যেন অলৌকিক গতিতে রং বা রেখার এক টানে জীবন্ত করে তোলেন। এখান থেকে বোঝা যায় ছবিটির মূল নকশা শিল্পীর মস্তিষ্কের চেয়েও হাতের স্নায়ুকোষে বেশি সক্রিয় থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও কগনিটিভ নৃতত্ত্বের ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে ‘মাসল মেমোরি’র প্রয়োগ। এই রীতি বংশানুক্রমিক কোনও পুঁথিগত বিদ্যা নয়। লোকশিল্পের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে মাসল মেমোরির জন্য। এই কারণে রেখার বিশুদ্ধতা প্রজন্মে প্রজন্মে চলে আসছে।

zoom

তাহেরপুরের সরাশিল্পের শৈলী এখনও পর্যন্ত মোটামুটি তিনটি ঘরানার। দ্বিমাত্রিক বা এক চোখের সরা। দ্বিতীয়ত, ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ দু’ চোখের সরা। তৃতীয়ত, দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সরা অর্থাৎ একই সরাপটে এক চোখ ও দু’ চোখের ব্যবহার। ক্রেতার চাহিদাই এর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। 

আরও একটি বৈশিষ্ট্য হল খোপ বা প্যানেলের ব্যবহার। সরাতে অনুভূমিক বা বক্ররেখা বা জ্যামিতিক বিন্যাসে খোপ বা প্যানেল তৈরি হয়। খোপের ব্যবহারে একই আধারে একাধিক শক্তির সহাবস্থান সুনির্দিষ্ট মহাজাগতিক অনুক্রম তৈরি করেছে। এটি এসেছে মূলত কুম্ভকারদের টেরাকোটা মন্দির শৈলীর বিন্যাস থেকে।

একইভাবে কুম্ভকারদের পারিভাষিক শব্দ ‘পুতুল’ও অনুপ্রবেশ করেছে। শিল্পীদের ভাষায় ‘এক পুতুলে’ হল এক লক্ষ্মী, ‘দু-পুতুলে’ লক্ষ্মী-সরস্বতী, ‘তিন পুতুলে’ লক্ষ্মী আর জয়া-বিজয়া ইত্যাদি। এইভাবে সর্বাধিক পুতুলের উপস্থিতি দেখা যায় দুর্গাসরার মধ্যে। ক্রেতার পারিবারিক আচারের বাজেট বা কুলাচার অনুসারে নির্ভর করে শিল্পীরা পুতুলের সংখ্যা বা খোপের বৃদ্ধি করেন। বৈষ্ণবভাবাপন্ন পরিবারে যুগল সরা বা ঢাকাই সরার যেমন চাহিদা থাকে, তেমনই দুর্গাসরার পুজো করেন শাক্তপরিবার। ধ্রুপদী সরাশিল্প থেকে এই যে বিচ্যুতি, এটি শিল্পের অবক্ষয় নয়, বরং ধারাবাহিকতার সঙ্গে বৈচিত্রের লক্ষণ।

কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে পূর্ববঙ্গীয়দের ঘরের লক্ষ্মীসরার এই অবয়বটি শুধুমাত্র ধর্মীয় কোনও প্রতিমা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া জনপদ, তার সুখী গৃহকোণ, তুলসীতলা, নিজস্ব সমাজ ও বংশ পরম্পরার সংযোগ। পূজিত সরার মধ্যে জেগে ওঠে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির ভূগোল। যা দেশকালের কাঁটাতার বা মানচিত্রের ব্যবধানকে পিছনে ফেলে জাগিয়ে তোলে নস্টালজিয়ার জীবন্ত কোলাজ।

…………. পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব ………….

পর্ব ৫৩: মহিষ কেন অসুর

পর্ব ৫২: মহিষাসুর থেকে মহেশ্বর

পর্ব ৫১: পদবিতর্ক

পর্ব ৫০: পদ থেকে পদবি

পর্ব ৪৯: খিস্তি খেউড়ের ছড়া

পর্ব ৪৮: ভাঁজো আমাদের আদি কৃষি-লোকবিজ্ঞান

পর্ব ৪৭: মাঠ মাটি মানুষ

পর্ব ৪৬: গুজব কিংবা হুপুই: সে যুগের ‘ভাইরাল’

পর্ব ৪৫: সর্প হয়ে দংশন করো, ওঝা হয়ে ঝাড়ো

পর্ব ৪৪: অলৌকিক জলযাত্রা

পর্ব ৪৩: হরেক রকম হুড়ুম

পর্ব ৪২: মাহেশের রথের সারথি

পর্ব ৪১: জগন্নাথের শবরযোগ

পর্ব ৪০: ভিটের ভাস্কর্য

পর্ব ৩৯: হারানো নদীপথ, হারানো জলরেখা

পর্ব ৩৮: বর্ষামঙ্গল

পর্ব ৩৭: তরুর ঠাকুরঘর

পর্ব ৩৬: জাল রাজার রাজনীতি

পর্ব ৩৫: ঢেঁকি মোটেই অকম্মার নয়

পর্ব ৩৪: বহুরূপে সম্মুখে তোমার

পর্ব ৩৩: আলকাপ: বিরল মায়ার স্মৃতিচিহ্ন

পর্ব ৩২: তালবাহার

পর্ব ৩১: পোড়ামাটির শিল্পকে জনপ্রিয় করেছে কাঁঠালিয়ার শিল্পীরা

পর্ব ৩০: মৎস্য দেবতা মৎস্য ভোগ

পর্ব ২৯: কুবের পুজোর আচার থেকেই সোনা কেনা হয় অক্ষয় তৃতীয়ায়

পর্ব ২৮: বৈশাখ বিষ্ণুর প্রিয়, পুরাণের শ্রেষ্ঠ মাস?

পর্ব ২৭: গর্জন থেকেই গাজন

পর্ব ২৬: অসুরদের ফসল বলেই কি আখ বলিপ্রদত্ত?

পর্ব ২৫: যুদ্ধবাজ নয়, বাঙালির রাম করুণরসের

পর্ব ২৪: অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ নিয়ে কৃষ্ণচন্দ্র-নবকৃষ্ণের মামলা লন্ডন অবধি গড়িয়েছিল

পর্ব ২৩: কিম্ভূত-কিমাকার মূর্তির নাম কেন ‘কাকতাড়ুয়া’?

পর্ব ২২: দেড় ফুটের ল্যাংচাভোগ ছাড়া রং খেলেন না মদনমোহন

পর্ব ২১: মায়া মমতায় গড়া বাংলা বিয়ের ছড়া

পর্ব ২০: মাদারি কা খেল

পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়

পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর

পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা

পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে

পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম

পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন

পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান

পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি

পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল

পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই

পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?

পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব

পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!

পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই

পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা

পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত

পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস

পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর

পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প

Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar তাহেরপুর দুর্গাসরা লক্ষ্মীপুজো লক্ষ্মীসরা সরা সরাশিল্প

Share this article on