Robbar

বই-মানবী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 24, 2026 5:38 pm
  • Updated:May 24, 2026 5:38 pm  

‘রায়বাড়ি’ প্রকাশিত হওয়ার সময়েই যাদবপুরে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ উইমেনস স্টাডিজের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন আয়োজিত হয়। এই সম্মেলন উপলক্ষে সেখানে ২০টি ছোট স্টল নিয়ে নারী বিষয়ক বা নারী লেখকের বইপত্রের একটি প্রদর্শনী ও বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল ১৯৯১-এর ৯-১২ ফেব্রুয়ারি। এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন বুক স্টল সাব-কমিটির প্রধান, দর্শন বিভাগের শেফালী মৈত্র। আমরা সেই মেলায় যোগ দিয়েছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত ‘রায়বাড়ি’ও নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। 

সুধাংশুশেখর দে

৭৪.

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের লেখা বা সম্পাদনা করা বইপত্র প্রকাশ করতে-করতে, খানিকটা আকস্মিকভাবেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সদ্য গঠিত কেন্দ্রের সঙ্গে দে’জ পাবলিশিং-এর একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে যাদবপুরে মানবীচর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে এই কেন্দ্র ইউজিসি-র অনুমোদন পায়। যাদবপুর স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজ শুরু থেকেই কিছু-কিছু বই প্রকাশ করার কথা ভেবেছিল। এই কেন্দ্রের প্রথম ডিরেক্টর ছিলেন ইংরেজি বিভাগের যশোধরা বাগচী, আর স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের পরিকল্পনা করা গ্রন্থমালার প্রথম দিকের ‘সাধারণ সম্পাদক’ ছিলেন সুবীর রায়চৌধুরী। মানবীচর্চা কেন্দ্রের প্রকাশনার পুরো দায়িত্বটাই সুবীরদার কাঁধে ছিল, এবং আমার যতদূর মনে পড়ছে তিনিই আমাকে এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষায় লেখা মহিলাদের হারিয়ে যাওয়া লেখা পুনরুদ্ধার করা এবং সেগুলি সুসম্পাদিত আকারে প্রকাশ করা। মহিলা লেখকদের সেইসব লেখাগুলিই তাঁরা নির্বাচন করতেন যার একটা সামাজিক এবং সাহিত্যিক মূল্য আছে। আমার মনে পড়ছে, একসময় নির্মাল্য আচার্যর ‘এক্ষণ’ পত্রিকাতেও মহিলা লেখকদের এইরকম উল্লেখযোগ্য লেখা পুনরুদ্ধার করে ছাপা হত। তবে যাদবপুরের স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজ যেহেতু এই বিষয়টা নিয়েই কাজ করা শুরু করেছিল, তাঁদের কাজের অভিমুখও অন্যরকম ছিল। 

যশোধরা বাগচী

পুরনো কাগজপত্রের মধ্যে মানবীচর্চা কেন্দ্রের শুরুর দিকের একটি ফোল্ডার হাতে এল। তার প্রথম পাতায় লেখা ‘ডেয়ার টু নো’, সেই ফোল্ডারের দ্বিতীয় ভাঁজে তাঁরা নিজেদের কাজের প্রসঙ্গে লিখেছিলেন– ‘ইট এইমস অ্যাট ডিজলভিং দ্য আর্টিফিশিয়াল ব্যারিয়ারস বিটুইন ডিসিপ্লিনস ক্রিয়েটেড বাই দ্য ট্র্যাডিশনাল অ্যাকাডেমিক সেট আপ। ইট ইজ আ ট্রুলি ইন্টারডিসিপ্লিনারি সেন্টার, হুইচ ডাজ নট এইম টু সেগ্রিগেট উইমেনস স্টাডিজ অ্যান্ড ক্রিয়েট আ ফিমেল কাউন্টার ক্যানন। র‍্যাদার ইটস অবজেকটিভস আর টু ইনকর্পোরেট কোয়েশ্চেন্স অ্যারাইজিং আউট অফ দিস নিউ পারস্পেক্টিভ ইনটু এভরি ডিসিপ্লিন অ্যান্ড টু আন্ডারটেক টিচিং অ্যান্ড রিসার্চ ইন আ হলিস্টিক ওয়ে অ্যান্ড দেয়ারবাই টু অগমেন্ট পসিবিলিটিজ অফ সোশাল জাস্টিস।’ তবে আমার কাছে সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা ছিল প্রথমদিকে এই গ্রন্থমালা প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে সুবীরদার থাকাটা। সম্ভবত ১৯৯০ সাল থেকেই স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের প্রথম বই প্রকাশের তোড়জোড় শুরু হয়। এক্ষেত্রে ঠিক হয়েছিল তাঁরা বই নির্বাচন, সম্পাদনা, প্রুফ দেখার কাজ সেরে একেবারে তৈরি বই আমাকে দিলে আমি সে-বই দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশ করে বিক্রি করব। সমস্ত বইয়ে প্রকাশক হিসেবে লেখা থাকবে দে’জ পাবলিশিং এবং স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, আর বই বিক্রির পরে আমি যথাবিধি রয়্যালটির টাকা দিয়ে দেব। কেবলমাত্র প্রথম বইটি প্রকাশের সময় সামান্য কিছু ভর্তুকির ব্যবস্থা তাঁরা করেছিলেন। যদিও স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সব বই দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হয়নি। স্ত্রী, নয়া উদ্যোগ, বিকল্প প্রকাশনী, থীমা থেকেও কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। তবে এই গ্রন্থমালার বেশিটাই আমি ছেপেছি। 

স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের সঙ্গে দে’জ পাবলিশিং-এর প্রথম বই গিরিবালা দেবীর ‘রায়বাড়ি’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯১-এর ফেব্রুয়ারিতে। ‘রায়বাড়ি’র সম্পাদক ছিলেন সুবীর রায়চৌধুরী এবং সহ-সম্পাদক অভিজিৎ সেন। ‘রায়বাড়ি’তে অভিজিৎ সেনের নাম সহ-সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা থাকলেও, সুবীরদা বইয়ের শুরুতে ‘সম্পাদকদ্বয়ের নিবেদন’-এ লিখেছিলেন–

“…‘স্কুল অব উইমেন্স স্টাডিজ’, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনবিভাগের প্রথম বই গিরিবালা দেবীর (১৮৯০-১৯৮৩ খ্রি) ‘রায়বাড়ি’ দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত হ’লো। গ্রন্থনির্বাচন বিষয়ে কিছু বলার আগে এদেশে ‘মানবীচর্চা’র পটভূমি সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা দরকার। স্ত্রীশিক্ষার প্রসার, সতীদাহ প্রথার রদ, বিধবা বিবাহ, বহুবিবাহ এবং বাল্যবিবাহ বিরোধী চেতনা, সহবাস সম্মতি বিষয়ক বিবাহ আইন প্রভৃতি আন্দোলন থেকে বোঝা যায় যে, নারীর স্বাধিকারের লড়াই বহুদিন শুরু হয়েছে। বিধবাবিবাহ আইন (১৮৫৬ খ্রি) থেকে হিন্দু কোড বিল (১৯৫৫ খ্রি) এই একশো বছরে গঙ্গায় অনেক জল ব’য়ে গেছে। কিন্তু সমাজমনের কতটা বদল ঘটেছে তা নির্ণয়ের কোনো সামগ্রিক প্রচেষ্টা হয়নি। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, যোগেশচন্দ্র বাগল, প্রভাতচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ এদেশে নারীজাগরণ এবং আন্দোলনের বিভিন্ন পর্বের এবং দিকের ইতিহাস সংকলন করেছেন। কিন্তু এগুলি সবই ব্যক্তিগত গবেষণার ফল। এদের ঐতিহাসিক মূল্য অসাধারণ হ’লেও এই গবেষণাকর্মগুলি একক প্রচেষ্টায় রচিত। অন্যদিকে ‘স্কুল অব উইমেন্স স্টাডিজ’-এর লক্ষ্য নির্দিষ্ট ও উদ্যোগ যৌথ। … বলা বাহুল্য, পাশ্চাত্য দেশে এবং এশিয়ার অন্য দু-একটি দেশে এই চর্চা বহু আগে শুরু হ’লেও ভারতে এর সূচনা মাত্র কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে। সেজন্য ফেমিনিজম, উইমেন্স স্টাডিজ ইত্যাদি শব্দের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য পরিভাষাও তৈরি হয়নি। সব আন্দোলন বা বিদ্যার জন্য পরিভাষা তৈরি করতে হবেই, এরকম কোনো শুচিবাই আমাদের নেই। তবে পরিচিত শব্দ থেকে পরিভাষা তৈরি হ’লে অনেক তাড়াতাড়ি দেশের লোকের কাছে পৌঁছনো যায়। ‘মানবী’ শব্দটি সারা ভারতে পরিচিত এবং বহু ব্যবহৃত। ‘উইমেন্স স্টাডিজ’-এর প্রতিশব্দরূপে আমরা অর্থাৎ সম্পাদকদ্বয় ‘মানবীচর্চা’ ব্যবহার করেছি। এর গ্রহণযোগ্যতা বিচার করবেন পাঠকসমাজ। অনুরূপভাবে ফেমিনিজম-এর বিকল্প মানবীচেতনা। আমাদের প্রথম প্রকাশ একজন ‘মহিলা’ লেখকের একটি ‘উপন্যাস’। দুটি শব্দই আমরা উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে ব্যবহার করছি। কেননা শোনা যায় যে সাধারণভাবে বাঙলা সাহিত্য, বিশেষভাবে গল্প-উপন্যাসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক পাঠিকাকুল। তা সত্ত্বেও বাঙলা সাহিত্যে সবচেয়ে উপেক্ষিত হলেন ‘মহিলা’ লেখক। উপন্যাস এবং ছোটগল্প বিষয়ক মোটা মোটা আলোচনাগ্রন্থে তাঁরা কেউ কেউ স্থান পেলেও পুরুষ লেখকদের সঙ্গে সাধারণত একত্রে ঠাঁই পান না। তাঁরা স্বতন্ত্রভাবে আলোচিত হন। এই অসঙ্গতি বিষয়ে আমরা কয়জনে সচেতন? গিরিবালা দেবী তাঁর স্বকালে বিশেষ স্বীকৃতি পাননি। যেমন পাননি জ্যোতির্ময়ী দেবী (১৮৯৪-১৯৮৯)। আশা করি ‘রায়বাড়ি’-র মধ্য দিয়ে আমাদের পাঠক সমাজের কূপমণ্ডূকতা দূর হবে।…” 

প্রচ্ছদ: রঘুনাথ গোস্বামী

গিরিবালা দেবীর মেয়ে প্রখ্যাত সাহিত্যিক বাণী রায় এই বইয়ে ‘স্মৃতি-সঞ্চয়’ নামে একটি লেখায় জানিয়েছিলেন–

“শৈশবস্মৃতি বলে দেয় মাতার লেখিকারূপে অভ্যুত্থান আমার জীবনের সঙ্গে কতটা বিজড়িত। তাঁর লেখিকাজন্ম আমার জন্মের পূর্বে। তাঁর লেখিকামূর্তিটি আজও আমার চক্ষে ভাসমান। নিজস্ব টেবল চেয়ার বরাদ্দ থাকলেও তিনি মাদুর সতরঞ্চ এমনকি শোবার ঘরের মসৃণ মেজেতে পা ছড়িয়ে বসে কাগজে ধরে ধরে লিখতেন, ক্রমাগত লিখে যেতেন। পরবর্তী জীবনে বিশেষভাবে নির্মিত ডেস্ক বিছানার উপর রেখে বসে লিখতেন।
তারুণ্যে গিরিবালা দেবী ছিলেন কৃশাঙ্গী, মাঝারি সাইজ ছিল। যৌবনের প্রত্যন্তদেশে তিনি কিঞ্চিৎ স্থূলাঙ্গী হন। আবার স্বামীবিয়োগের পরে আহারাদির কৃচ্ছসাধন হেতু তিনি আবার তন্বীদেহ ফিরে পান। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, পূর্ণচন্দ্রের মতো মুখ স্নিগ্ধ, করুণ মাধুর্যবিমণ্ডিত। নয়ন আয়ত না হলেও উজ্জ্বল। নব্বই বর্ষ অতিক্রান্ত হলেও চুলে কালোর ভাগই বেশী ছিল। গঠন অনবদ্য। শিথিলতা কোথাও ছিল না। তাঁকে জীবনে আমি রূপচর্চা করতে দেখিনি, প্রসাধন দেখিনি। তিনি জানতেন না। এ তথ্য ‘রায়বাড়ি’ গ্রন্থদ্বয়ের মধ্যে সম্যক পরিলক্ষিত। ‘রায়বাড়ি’-তে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভোগবাসনা বিরহিতা বালিকাবধূ অনায়াসে নিজের সৌখিন বস্ত্রাদি বিলিয়ে দিচ্ছে। নিজের দেবর-ননদ নয় শুধু প্রতিবেশিনী চতুরা লাবণ্য, পিত্রালয়ে বাল্যসখী আকাশী প্রভৃতিকে তাঁর অজস্র দান। সমগ্র জীবনে এ অভ্যাস তাঁর ছিল। অগাধ স্নেহ গিরিবালার সর্বত্র যে যোগ্যক্ষেত্রে বর্ষিত হত বলা চলে না। যে কেউ চাওয়ামাত্র প্রার্থনা মঞ্জুর হত।
মাতার অসাধারণ সাহিত্যবোধ আমাকে সাহায্য করেছে। নিজের রচনায় সন্দেহ হ’লে তাঁকে শোনাতাম। তিনি সানন্দে শুনতেন। অতি শৈশবে তিনি আমার রচনা সংশোধন করে দিতেন। তাঁর অনুপ্রেরণা আমাকে সাহিত্যসৃষ্টিতে উৎসাহিত করেছে। বাড়িতে সমবয়স্ক কেউ ছিল না আমার। মাকে অবিরত লিখতে ও পড়তে দেখতাম। সারাজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে মাতৃঋণ স্মরণ করি।
মাতার চতুষ্পার্শ্বে একটি ঘরোয়া সাহিত্যজগৎ গড়ে উঠেছিল। ‘রায়বাড়ি’-তে আমার স্বর্গীয় পিতা পূর্ণচন্দ্র রায় (উপন্যাসে ‘প্রসাদ’ নামে অভিহিত) অশেষ ধৈর্যসহকারে পত্নীকে যে সাহিত্যদীক্ষা দিয়েছিলেন সমগ্র জীবন পত্নী সেই সেই পথে চলেছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ তাঁর অতি প্রিয় ছিল। তিনি উচ্চকণ্ঠে সেই কাব্য সকলকে পড়ে শোনাতেন। সেই কাব্যপাঠ আমাকে ‘মধুজীবনীর নূতন ব্যাখ্যা’ রচনায় প্রবৃত্ত করে। ‘বৃত্রসংহার কাব্য’, ‘অন্নদামঙ্গল’, ‘বিদ্যাসুন্দর’, ঈশ্বরগুপ্তের কবিতা, ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘ভাগবত’, রঙ্গলাল গ্রন্থাবলী, সঞ্জীব গ্রন্থাবলী, রমেশ গ্রন্থাবলী প্রভৃতি যাবতীয় গ্রন্থাবলী ছিল মাতার গ্রন্থাগারে। তৎসহ ‘উদভ্রান্ত প্রেম’, ‘শ্রীশ্রীরাজলক্ষ্মী’, অক্ষয় সরকারের প্রবন্ধ পুস্তক, অক্ষয়কুমার বড়ালের ‘এষা’, রজনীকান্ত, নানাবিধ পুস্তকসম্ভার। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শিরোমণি। এছাড়া নানাজাতীয় মাসিক, সাপ্তাহিক, দৈনিকের পূজাসংখ্যা সংরক্ষিত ছিল বাঁধাই হয়ে। বইগুলি রোদে দেওয়া হত। সেটি আমার আনন্দের দিন। অধিকাংশ পুস্তকই বাবার উপহার। পরবর্তী যুগে বড়কাকা ক্ষীরোদচন্দ্র রায় (‘ক্ষিতি’ নামে ‘রায়বাড়ি’তে উল্লেখিত) শরৎচন্দ্রের পুস্তকাদি ক্রয় করে আনতেন। পুরাতন দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থরাজি পাওয়া যেত। মাতার সুবিশাল গ্রন্থসংগ্রহ আমাকে সর্বতোভাবে আজীবন সাহায্য করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী দেবী, রমেশ দত্ত, সঞ্জীবচন্দ্র, শরৎচন্দ্র প্রভৃতি সকল লেখকের গ্রন্থাবলী ছিল।
বাড়ির আবহাওয়া সাহিত্যের সুরে প্রবাহিত হত। বাবা বীণাপাণি বুক ক্লাব নামে এক প্রকাশালয় স্থাপিত করেন। ‘স্বাস্থ্য ও শক্তি’ নামে তাঁর প্রথম বাংলায় শরীরতত্ত্বের বই সেখানে প্রকাশিত হয়। বীণাপাণি ছিল আমার পিতামহদত্ত নাম। সেটি ছোটকাকা সুরেশচন্দ্র রায় (‘সুমন্ত’ নামে ‘রায়বাড়ি’-তে উক্ত) বাণী রূপে পরিবর্তিত করেন। ছোটকাকা ছাত্রজীবনে ‘বাণী’ নামে একটি মাসিকপত্রিকা প্রকাশে পুরোধা হয়েছিলেন। পরবর্তী জীবনে আমার দাদা অনিলচন্দ্র রায়, কবি সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় ও পিতার পরিচালনায় ‘অভ্যুদয়’ নামে একখানি মাসিক পত্রিকা কিছুদিন চালান। নামটি রবীন্দ্রনাথের দেওয়া, একটি চমৎকার কবিতাও তিনি নামের ওপরে লিখে দেন।…”

জ্যোতির্ময়ী দেবী

‘রায়বাড়ি’র কথা বলতে গিয়ে বাণী রায়ের ‘গ্রন্থদ্বয়’ বলার কারণ হল, এই উপন্যাসটি দু’-খণ্ডে রচিত। আমাদের বইটিতে দু’টি খণ্ডই একসঙ্গে ছাপা হয়েছিল। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ১৯৭৫ সালকে রাষ্ট্র সংঘ আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ ঘোষণা করলে, সে-বছর বাণী রায়ের সম্পাদনায় রামায়ণী প্রকাশ ভবন থেকে তিনজন নারী লেখকের রচনাবলি প্রকাশিত হয়– গিরিবালা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবী এবং স্বর্ণকুমারী দেবী। বাণী রায় (১৯২০? – ১৯৯২) নিজেও উপন্যাস কবিতা প্রবন্ধ নানারকম লেখায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘জুপিটার’ একসময় বেশ সাড়া ফেলেছিল। তাঁর ‘পুনরাবৃত্তি’, ‘রঞ্জনরশ্মি’ এবং ‘প্রেম’, ‘কনে দেখা আলো’-র মতো গল্প-উপন্যাস এক সময় বইপাড়ায় বেশ চালু ছিল। নারী লেখকদের নিয়ে তাঁর কাজ কিন্তু ১৯৭৫ সালেই শুরু হয়নি, বাণী রায় সাহিত্যায়ন প্রকাশন সংস্থা থেকে ১৯৬৩ সালে ‘লেখিকা মন’ বলে কুড়িটি গল্পের একটি সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন। তাঁর নিজের একটি গল্প-সহ সেই সংকলনে ছিল স্বর্ণকুমারী দেবী, অনুরূপা দেবী, নিরুপমা দেবী, কাঞ্চনমালা দেবী, হেমনলিনী দেবী, শৈলবালা ঘোষজায়া, সরসীবালা বসু, প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, শান্তা দেবী, গিরিবালা দেবী, সীতা দেবী, জ্যোতির্মালা দেবী, আশালতা সিংহ, আশাপূর্ণা দেবী, প্রতিভা বসু, লীলা মজুমদার, মহাশ্বেতা ভট্টাচার্য, সুলেখা সান্যাল, কবিতা সিংহ-র একটি করে গল্প। বইটির শুরুতে লেখা ছিল–

“যে লেখিকারা অতীতে, বর্তমানে, কখনও কলম ধরেছেন, যাঁরা ব্যথাদৈন্যের মধ্যে অচলানিষ্ঠায় বাণীর আরতি করেছেন, যাঁরা সর্বদা স্বীকৃতি না-পাওয়ার গ্লানি নীরবে বহন করেছেন, অকালমৃত্যু যাঁদের কাউকে নিশ্চিহ্ন করেছে, অতৃপ্তির জ্বালাবিহ্বল সেই সকল সত্তা যাঁদের মধ্যে অধুনাবিগতা সুলেখা সান্যালের চির-অতৃপ্ত সত্তা আছেন তাঁদের উদ্দেশে অপার মমতায়, অপার শ্রদ্ধায় ‘লেখিকা মন’ উৎসর্গ করলাম।
আর
ভবিষ্যতে যে লেখিকারা আসবেন, তাঁদের জন্য রেখে গেলাম আমাদের অর্ঘ্য; তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিলাম-অতীতকে অস্বীকার করে ভবিষ্যতে পদক্ষেপ করা চলে না।”   

‘লেখিকা মন’ বইটা নিয়ে এত কথা বলার একটা কারণ যেমন এটা বোঝানো যে, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাণী রায় নারী লেখকদের নিয়ে অনেকদিন ধরেই কাজ করেছেন, তেমনই আমার একটা ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তিও করার আছে। যশোধরা বাগচী ‘রায়বাড়ি’-র কাজ চলাকালীন আমাকে বলেছিলেন ‘লেখিকা মন’ বইটি বাণী রায় পুনর্মুদ্রণ করতে চান এবং সে দায়িত্বটা তিনি আমাকেই দিতে চেয়েছিলেন। ১৯৯১-এর ডিসেম্বরে লেখা একটা চিঠিতে অন্য নানা বিষয়ের সঙ্গে যশোধরাদি আমাকে লিখেছিলেন– “…শ্রীযুক্তা বাণী রায়ের ‘লেখিকা মন’ পুনর্মুদ্রণ করার ব্যাপারে কি ঠিক করলেন? উনি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।…” বইটা আমি তখনই করে ওঠার মতো অবস্থায় ছিলাম না। আর ঠিক পরের বছরই বাণী রায় প্রয়াত হওয়ায় বইটা দে’জ পাবলিশিং থেকে করা যায়নি। 

প্রকাশের পর সুবীরদা গিরিবালা দেবীর ‘রায়বাড়ি’ হাতে পেয়ে খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু যথারীতি এই বইটাকে প্রকাশোপযোগী করে তুলতেও তিনি বিপুল পরিশ্রম করেছিলেন, আর তাঁকে যোগ্য সঙ্গত করেছিলেন অভিজিৎ। ১৫ জানুয়ারি ১৯৯১-এ লেখা একটি চিঠিতে সুবীরদা আমাকে লিখছেন–

“…‘রায়বাড়ি’র প্রচ্ছদ নিয়ে কাল দশটা নাগাদ যাবো। কিন্তু শ্রীরঘুনাথ গোস্বামী যেতে পারবেন না, তাঁর বদলে তিনি শ্রীদিলীপ ভৌমিককে পাঠাবেন। শ্রীরঘুনাথ গোস্বামীর নির্দেশ অনুযায়ী কভারটি অফ সেটে ছাপা হবে এবং সেই ব্যাপারে কথা বলবেন শ্রীদিলীপ ভৌমিক। অফ সেটে মুদ্রণের কোন অসুবিধা নেই তো?”

‘রায়বাড়ি’ প্রচ্ছদটা রঘুনাথ গোস্বামী হাতে বোনা আসনের ডিজাইনে তৈরি করেছিলেন। এই চিঠির নিচে দেখছি, আমি লিখে রেখেছি– ‘সোম/ মঙ্গলবার সন্ধেবেলা/ দিলীপ ভৌমিক ও সুবীর রায়চৌধুরী আসবেন। রাজাকে থাকতে বলো।’ তার মানে হয়তো চিঠির পর টেলিফোনে বা অন্য কারওর মাধ্যমে সুবীরদা আসার সময়টা বদলেছিলেন। আর এখানে ‘রাজাকে থাকতে বলো’ মানে নিশ্চয়ই আমি রাজা প্রিন্টার্সের বিদ্যুৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বাবুদা) কথা বলতে চেয়েছি। আগেই বলেছি, দে’জ পাবলিশিং-এর প্রচ্ছদ ছাপার ব্যাপারে বহুকাল থেকেই আমার প্রধান সহায় ছিলেন বাবুদা। এই চিঠির নীচে সুবীরদা লিখে দিয়েছেন ‘অরিজিৎ/শিবনাথ’। আসলে, স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের সঙ্গে আমাদের বইগুলো কম্পোজ ও ছাপার কাজ আমি সেসময় করাতাম অরিজিৎ কুমারের টেকনোপ্রিন্ট থেকে। অরিজিৎদার জামাইবাবু শিবনাথ পাল এবং প্রিন্টেক প্রেসের কথাও আগে বলেছি। ১৪ ফেব্রুয়ারি আরেকটি চিঠিতে সুবীরদা আমাদের প্রকাশনারই কাউকে (সম্ভবত সুবীর ভট্টাচার্যকে) লিখেছেন– “একটু আগেই সুভাষ এসেছিল দশ কপি ‘রায়বাড়ি’ নিয়ে। প্রচ্ছদ মুদ্রণ খুব ভালো হয়েছে। আমি সুভাষের হাতেই সুধাংশুকে একটা চিঠি পাঠিয়েছি। তাতে দশ কপির বদলে ১৫ কপি ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’ চেয়েছি।” এখানে সুভাষ মানে আমার ভাই বাবু। সে যে মাঝে-মাঝে সুবীরদার কাছে যেত তা-ও আগে বলেছি। আর সুবীরদার কথামতো ১৫ কপি ‘জগদীশ গুপ্তর গল্প’ও আমি নিশ্চয়ই পাঠিয়েছি। 

‘রায়বাড়ি’ প্রকাশিত হওয়ার সময়েই যাদবপুরে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ উইমেনস স্টাডিজের পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন আয়োজিত হয়। এই সম্মেলন উপলক্ষে সেখানে ২০টি ছোট স্টল নিয়ে নারী বিষয়ক বা নারী লেখকের বইপত্রের একটি প্রদর্শনী ও বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল ১৯৯১-এর ৯-১২ ফেব্রুয়ারি। এই অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন বুক স্টল সাব-কমিটির প্রধান, দর্শন বিভাগের শেফালী মৈত্র। আমরা সেই মেলায় যোগ দিয়েছিলাম এবং শেষ পর্যন্ত ‘রায়বাড়ি’ও নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। 

তবে চিন্তায় পড়েছিলাম বাণী রায়ের প্রয়াণের পর এই বইয়ের রয়্যালটি দেওয়া নিয়ে। বাণী রায়ের দুই দাদাও ততদিনে প্রয়াত। শেষে খোঁজখবর নিয়ে আমাদের দপ্তরে গিরিবালা দেবী ও তাঁর সন্তানদের একটি বংশলতিকা বানানো হয়। দেখা গেল অন্তত পাঁচ জন ওয়ারিশনকে পাওয়া যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে বাণী রায়ের ভাইপো, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক অনিরুদ্ধ রায়ের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করি। অনিরুদ্ধ রায় নিজেও ইতিহাস বিষয়ে একাধিক বই লিখেছেন। আনন্দ পাবলিশার্সের ইতিহাস গ্রন্থমালার সপ্তম বই ‘মধ্যযুগের ভারতীয় শহর’ তাঁরই লেখা। ‘রায়বাড়ি’ পুনর্মুদ্রণের উদ্যোগ নেওয়ার সময় অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে কথা বলার পর, তিনি আমাকে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০১ একটি চিঠিতে জানান–

‘সবিনয় নিবেদন,

গিরিবালা দেবীর “রায়বাড়ি”র পুনঃমুদ্রণ এর ইচ্ছা প্রকাশ করে আপনি যে চিঠি লিখেছেন (১০.০৯.০১) এর জন্য ধন্যবাদ। আপনি লিখিত মূল্যের উপর শতকরা দশ টাকা হারে রয়ালটির পুরোটাই আমাদের দেবেন বলেছেন।
আমি বাকি উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের কারুর এ প্রস্তাবে আপত্তি নেই।…’

অনিরুদ্ধবাবুর কথা অনুযায়ীই তার পর থেকে কাজ হয়েছে। যদিও বইটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে অনেক পরে, ২০২৪ সালে।

যাদবপুরের স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের সঙ্গে দে’জ পাবলিশিং-এর প্রথম বইয়ের সাফল্যের পর দ্বিতীয় বইটি ছিল ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’। ১৯৯১-এর নভেম্বরে এই বইটি আমরা প্রকাশ করতে পেরেছিলাম। ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’-এরও সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক ছিলেন সুবীর রায়চৌধুরী এবং অভিজিৎ সেন। 

শৈবাল কুমার গুপ্ত

এই বইটি স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের পরিকল্পনায় আসার পিছনে সুবীরদার একটা ভূমিকা আছে। জ্যোতির্ময়ী দেবীর কন্যা আশোকা গুপ্ত এবং জামাতা শৈবাল গুপ্তর ছেলে পার্থসারথি গুপ্ত ছিলেন সুবীরদার বন্ধু। পার্থসারথি গুপ্ত সুবীরদার সময়েই প্রেসিডেন্সি কলেজে ইতিহাসের ছাত্র ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঈশান স্কলারও হন। পরে বিদেশে পড়াশোনা এবং প্রথমে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় আর তারপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক হন। ইংরেজিতে তাঁর লেখা বেশ কিছু বইও আছে। অশোকা গুপ্ত ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা সংকলন’-এর ২০০১ সালে দ্বিতীয় মুদ্রণের সময় জানিয়েছিলেন–

“দশ-বারো বছর আগের কথা। বাংলা ছোটগল্প নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল; বক্তা সুবীর রায়চৌধুরি [য.], শ্রোতা পার্থসারথি গুপ্ত আমার পুত্র এবং আমি। এখন সুবীরও নেই, পার্থসারথিও দু’বছর হল প্রয়াত। বাংলা ছোটগল্পের সুবীরের মতো এমন একজন পাঠক থাকতে পারেন, যিনি আমাদের কালের ছোটগল্প-লেখকদের সকলের লেখা পড়েছেন ও তা নিয়ে চর্চা করেছেন, জানা ছিল না। শুনতে শুনতে পার্থ (সুবীরেরই সহপাঠী) বলে উঠল, ‘আমার দিদিমার ছোটগল্প পড়েছেন?’ যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ের ১৭/১৮ বছর আগে, ১৯৭৩ সালে, আমার মা জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘সোনা রূপা নয়’ গল্পসংগ্রহ রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮৮ সালে তিনি প্রয়াত হন। আমাদের এই আলোচনার সময়ে তিনি জীবিত ছিলেন না।
সুবীর বললেন, ‘হয়ত পড়েছি, কিন্তু মনে পড়ছে না।’ পার্থ গল্পসংগ্রহের একটি কপি তাঁকে দেয়। তিনি তারপরে যে-কটি বই আমার কাছে ছিল, উপন্যাস ও অন্যান্য গল্পসংকলন, সবই নিয়ে পড়লেন, আর এমনভাবে পড়লেন যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব উইমেনস স্টাডিজ (মানবীবিদ্যাচর্চা কেন্দ্র)-এর উদ্যোগে তাঁদের দ্বিতীয় গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হল ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা সঙ্কলন’।”

অশোকা গুপ্ত

অশোকা গুপ্ত নিজেও একজন লেখক ও সমাজকর্মী ছিলেন। দে’জ পাবলিশিং থেকে আমি ২০০৩-এ তাঁর লেখা ‘নোয়াখালির দুর্যোগের দিনে’ বইটি পুনর্মুদ্রণ করেছি। ১৯৪৬-এর নোয়াখালির দাঙ্গার পরে গান্ধিজির নোয়াখালি যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন অশোকা গুপ্ত। এই বইয়ের শুরুতে তিনি লিখেছেন– 

“গান্ধিজির নোয়াখালি আসার খবরে উৎসাহিত হয়ে চাঁদপুর গিয়ে পৌঁছলাম। এর আগে আমরা ২০শে অক্টোবর থেকে রিলিফের কাজ করে যাচ্ছিলাম। চাঁদপুর স্টেশনে খবর পাওয়া গেল ৭ই নভেম্বর স্পেশাল স্টিমারে গান্ধিজি পৌঁছেছেন। কিন্তু স্টিমার ঘাটে ভিড়বে না, মাঝনদীতে থাকবে। সঙ্গে আমার পুত্রকন্যা ও আরও ২-৩ জন সহকর্মী। এখনও ভাবি কিসের আকর্ষণে সেদিন নৌকায় করে স্টিমারের কাছে পৌঁছে রেলিং-এ পরিচিত মুখ অরুণাংশুবাবুকে দেখতে পেয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে প্রার্থনাসভায় যোগ দিতে চেয়েছিলাম। অরুণাংশুবাবু সতীশ দাশগুপ্ত মশায়ের অনুমতি নিয়ে আমায় স্টিমারে ওঠার ব্যবস্থা করে দিলেন। পুত্র পার্থ-সহ প্রার্থনাসভায় যোগ দিলাম। নিঃশব্দে ফিরে এসে স্পেশাল ট্রেন যেটা গান্ধিজিকে নিয়ে চৌমুহনি যাবে অন্যান্য মহিলাকর্মী (AIWC-র) যাঁরা চাঁদপুর থেকে সঙ্গে যাবেন তাঁদের সঙ্গে ছেলেমেয়ে ও সহকর্মীদের নিয়ে উঠে বসলাম।
যাওয়ার পথে প্রতি স্টেশনে লোকারণ্য তারা গান্ধিজিকে দেখতে চায়। দুর্গতদের মনে বোধহয় ভরসা হচ্ছে, কিন্তু স্টেশনে যারা গ্রাম ছেড়ে এসেছে তাদের মধ্যে গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য একটুও ব্যাকুলতা নেই। শুধু ২-১ জন এক এক গ্রামের গান্ধিজি নোয়াখালির গ্রামের ভিতরে গেলে ‘অবস্থা’ দেখে আসতে চায়। আমরাও ‘অবস্থা’ দেখতে চলেছি।…”

অশোকা গুপ্তের সঙ্গে শৈবালকুমার গুপ্তের প্রণয়ের সূচনায় ছিল জ্যোতির্ময়ী দেবীর লেখা একটি ছোটগল্প, যেটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। শৈবালবাবুও প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র এবং নিজের সময়ের ঈশান স্কলার। তবে তাঁর বিষয় ছিল অর্থনীতি। ১৯২৩ সালে আইসিএস হয়ে তিনি নানা বিভাগে কাজ করেছেন। কলকাতায় রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়াম নির্মাণের সময় তিনি ক্যালকাটা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন। বহু আবাসন প্রকল্পের তিনি রূপকার। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ দেশভাগের পর বাঙালি ছিন্নমূল মানুষদের জন্য সরকারি পুনর্বাসন প্রকল্প দণ্ডকারণ্য ডেভেলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান হিসেবে (১৯৬১-১৯৬৪) কাজ করা। বিভাসা থেকে তাঁর ইংরেজিতে লেখা ‘দণ্ডকারণ্য/ আ সার্ভে অফ রিহ্যাবিলিটেশন’ এবং বাংলায় ‘কিছু স্মৃতি কিছু কথা’ বলে দু’খানি বই প্রকাশিত হয়েছে। 

জ্যোতির্ময়ী দেবীর জন্ম হয়েছিল ১৮৯৪ সালে, সেকালের রাজপুতানার জয়পুর শহরে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ‘আকাদেমি পত্রিকা’য় যশোধারাদি ‘নারীমুক্তিবাদী জ্যোতির্ময়ী দেবী’ লেখাটিতে বলেছেন– ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর ব্যক্তিগত জীবনে লেখনী ধরাটাই ছিল হাতিয়ার। বাংলার নবজীবনের বা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আলো তাঁর জীবনে খুব সহজ সরল রেখায় এসে পৌঁছায়নি। উনিশ শতকের শেষ দশকে জন্মেও তিনি অন্তঃপুরের গণ্ডি সহজে পেরোতে পারেননি। মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হবার পর বাংলা দেশে হুগলি জেলায় তিনি শ্বশুরঘর করতে আসেন। পঁচিশ বছর বয়সে ছটি ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি ফিরে যান পিতৃগৃহে। তারপরে শুরু হয় তাঁর আত্মসমীক্ষা এবং স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গির সাধনা।… হিন্দু ঘরের বিধবার সব আচার মেনে নিলেও মননজগতে এই শুদ্ধান্তঃপুরকে তিনি কখনও মেনে নেননি। স্বাধীনতা সংগ্রামে গান্ধীজীর অনুগামী এই সর্বভারতীয় দৃষ্টিসম্পন্না মহিলা লেখক কলম ধরেছেন সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য, মেয়েরা যার মধ্যে অন্যতম। বাঙালি মধ্যবিত্ত মেয়েদের স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টা, বাঙালি হিন্দুসমাজের প্রত্যন্ত-প্রদেশে থাকে যে অসংখ্য নারী, বারাণসীর হিন্দু বিধবা, অথবা পতিতালয়ের বেশ্যা, রাজস্থানে নির্যাতিত নারী, হরিজন সম্প্রদায়, সংরক্ষণে ভাঁওতা দিয়ে যেখানে দারিদ্র্যের প্রতি অবমাননা করা হয়। কথাসাহিত্য এবং ব্যক্তিগত ভ্রমণকাহিনী মিলিয়ে উত্তর ভারতের অনেকখানিই ফুটে উঠেছে জ্যোতির্ময়ী দেবীর কলমের আগায়। সতীনাথ ভাদুড়ীর মতো তিনিও ভাঙ্গীদের কথা লিখেছেন। দেশবিভাগের ট্র্যাজেডি, পাঞ্জাবে এবং বাংলাদেশে দেশভাগের যে মানসিক ক্ষয়ক্ষতি, প্রধানত মেয়েদের চোখ দিয়ে জ্যোতির্ময়ী দেবী দেখিয়েছেন। তীর্থে গেছেন তিনি নানারকম দেশের লোকের সন্ধানে। যে লেখককে অন্তঃপুরের চার দেওয়ালের মধ্যে জীবন শুরু করতে হয়েছিল, উত্তর ভারতের জীবনযাত্রার অনেকখানিই তিনি বাঙালি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। তাঁর উপন্যাসগুলিতে নায়ক নায়িকারা সামাজিক অবমাননার গ্লানি কাটিয়ে উঠতে চলে যায় ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে। মেয়েদের স্বনির্ভরতার চেষ্টা তাঁর উপন্যাসের এবং বড় গল্পের একটি প্রধান উপজীব্য বিষয়।’

‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’-এ ‘বৈশাখের নিরুদ্দেশ মেঘ’ ও ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’ উপন্যাস দু’টি ছাড়াও ছ’টি গল্প, আটটি প্রবন্ধ, এছাড়া ‘স্মৃতিচিত্র ও সেকালের কথা’ শিরোনামে কয়েকটি লেখা সংযোজিত হয়েছিল। প্রসঙ্গত বলে রাখি, রাজশেখর বসু একসময় জোতির্ময়ী দেবীর লেখা পড়ে মন্তব্য করেছিলেন– ‘বাঙলা সাহিত্যে একজন অসাধারণ শক্তিমতী লেখিকার আবির্ভাব হয়েছে। টমাস হার্ডির পল্লীচিত্র, আরব্য উপন্যাসের রহস্য আর ক্ষুধিত পাষাণের বেদনা আপনি একত্র সমাবেশিত করেছেন।’

‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’ প্রকাশের পরই যশোধরাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেটার হেডে ১৬ জানুয়ারি ১৯৯২ সালে একটি চিঠিতে আমাকে লিখেছেন–

‘সুধাংশুবাবু,

এই রবিবারে সকালে Contract গুলো নিয়ে কি আপনি আমার বাড়িতে আসবেন? আমাদের জন্য সুভাষের হাত দিয়ে ২০ কপি complimentary বই পাঠিয়ে দিলে বিশেষ উপকৃত হবো।
আপনার সঙ্গে ভবিষ্যতের Plans কিছু আলোচনা করবার আছে। এলে খুব ভালো হয়, জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা সংকলনও রামমোহন রায় লাইব্রেরি ফাউন্ডেশনকে পাঠাবেন Salt Lake এর ঠিকানায়।…’ 

যশোধরাদির বাড়িতে পরের পরিকল্পনা নিশ্চয়ই হয়েছিল। আর সেটা অবশ্যই দে’জ আর স্কুল অফ উইমেনস স্টাডিজের যৌথ উদ্যোগে পরের বই ‘হেমন্তবালা দেবীর রচনা-সংকলন’ নিয়ে। আমি ভাবার চেষ্টা করছিলাম যশোধরাদির বাড়িটা ঠিক কোথায় ছিল, তখনই দেখলাম জ্যোতির্ময়ী দেবী সংক্রান্ত ফাইলের প্রথম ফ্ল্যাপের উলটো দিকে বড় করে লেখা আছে– ‘যশোধরা বাগচী/ 428 যোধপুর পার্ক/ কলকাতা 68/ Phone 46-9796’।

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৭৩। প্রেসের কাজে গাফিলতি দেখলে কড়া চিঠি লিখতেন সুবীরদা

পর্ব ৭২। করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ

পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা

পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান

পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ

পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন

পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ

পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!

পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!

পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়

পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়

পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়

পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!

পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু

পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না

পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম