Robbar

নারীকলম: দিনগুলি রাতগুলি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 31, 2026 6:18 pm
  • Updated:May 31, 2026 6:25 pm  

‘ছবি বসুর রচনা-সংকলন’। যশোধরা বাগচীর সম্পাদনা ও অভিজিৎ সেনের সহায়তায় বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৫-এর বাংলা নববর্ষের সময়। এই বই প্রকাশের সময় গ্রন্থমালার সাধারণ সম্পাদক সুবীরদা এবং প্রথম তিনটি বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী রঘুনাথ গোস্বামী⎯ দু’জনেই প্রয়াত হয়েছেন। ‘ছবি বসুর রচনা-সংকলন’-এর প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেন অভিজিৎ গুপ্ত। ছবি বসুর বই যখন প্রকাশিত হয় তখনও তিনি জীবিত এবং এই বইয়ের পরিকল্পনা ও নির্মাণের সময় তিনি যথেষ্ট সহায়তা করেছিলেন।

সুধাংশুশেখর দে

৭৫.

১৯৯১-এর নভেম্বরে ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’ বেরনোর পর যাদবপুর স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গে পরের বইটি প্রকাশের কথায় যাওয়ার আগে আমাকে আবার ‘জ্যোতির্ময়ী দেবী রচনা-সংকলন’ প্রসঙ্গেই কিছু কথা বলতে হবে। ১৯৯৪ সালে জ্যোতির্ময়ী দেবীর জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে একটি কমিটি তৈরি হয়েছিল। জ্যোতির্ময়ী দেবী জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি ছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ। সহ-সভাপতি রেণুকা রায় এবং আহ্বায়ক ছিলেন অশোকা গুপ্ত এবং মঞ্জুশ্রী সিন্‌হা। এছাড়া সদস্যদের মধ্যে শঙ্খদা, মহাশ্বেতাদি, সুকুমারী ভট্টাচার্য, কল্যাণী দত্ত, চিত্রা দেব প্রমুখরা তো ছিলেনই⎯ যশোধরা বাগচী, অভিজিৎ সেনও ছিলেন। জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটি অন্যান্য নানা কাজের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা জ্যোতির্ময়ী দেবীর যাবতীয় লেখা খণ্ডে-খণ্ডে প্রকাশ করবেন। 

যাদবপুর স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গে যখন আমরা ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’ প্রকাশ করি তখন সুবীরদা ঠিক করেছিলেন সব লেখা না-ছেপে একটা প্রতিনিধিত্বমূলক সংকলন করতে। সেইমতোই খণ্ডটি পরিকল্পিত হয়েছিল, এমনকী অভিজিৎ সেনের তৈরি করা জ্যোতির্ময়ী দেবীর বিস্তৃত গ্রন্থপঞ্জিও সেই খণ্ডেই দেওয়া হয়েছিল এবং সেটা নির্বাচিত লেখাগুলির নয়⎯ সামগ্রিক গ্রন্থপঞ্জি।

জ্যোতির্ময়ী দেবীর যাবতীয় লেখালিখি নিয়ে সংকলন যেহেতু স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের প্রকল্পের মধ্যে ছিল না, তাই এই বইগুলি জ্যোতির্ময়ী দেবী জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটির সঙ্গে দে’জ পাবলিশিং যৌথভাবে করবে এমনটাই স্থির হয়। সেসময় অশোকা গুপ্তর ‘পি ৪০৪/৫’ গড়িয়াহাট রোডের বাড়িতে একটা মিটিং করে যাবতীয় আলোচনা হয়। আশোকাদি ১৯৯৩-এর ২৯ সেপ্টেম্বর আমাকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন⎯

‘…সবিনয় নিবেদন,

বিগত ১৩। ৯। ৯৩ তারিখে উপরোক্ত ঠিকানায় যশোধরা বাগচী, অভিজিৎ সেন, অমিতাভ সেন, অশোকা গুপ্ত এবং আপনার উপস্থিতিতে যে আলোচনা হয়, তার সারাংশ নিম্নে লেখা হল:⎯

(১) জ্যোতির্ময়ী দেবীর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর সমগ্র রচনা একত্রিত করে তিনটি খণ্ড প্রকাশ করা বাঞ্ছনীয়। প্রতিটি খণ্ড ৫০০ শত [য.] পাতার মত হবে এবং তার আনুমানিক মূল্য ১০০ টাকা প্রতি খণ্ড ধার্য হওয়া উচিত। প্রতি খণ্ড ১১০০ কপি করে ছাপার কথা প্রস্তাবিত হয় এবং এও স্থির হয় যে প্রথম খণ্ড সেপ্টেম্বর মাসেই প্রেসে যাবে এবং জানুয়ারীর [য.] মধ্যেই প্রকাশিত হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি ও শেষ ভাগে প্রকাশিত হবে। এই সব কাজের জন্য যথাসময়ে প্রেস কপি ও অন্যান্য কাজ সময় মতো করার জন্য এই কমিটি সচেষ্ট থাকবে এবং শ্রীমতী মধুমিতা দেব আহ্বায়িকাদ্বয়ের, অমিতাভ সেন ও যশোধরা বাগচী ও অভিজিৎ সেনের সহযোগিতায় কাজটি সুসম্পন্ন করবে।
এই বিষয়ে আপনি আপনার সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশ করেন ও জানান যে পাঠক সমাজে বিজ্ঞপ্তির জন্য অবশ্যই একটি ফোল্ডার প্রস্তুত করতে হবে তাতে লেখিকার তিনখণ্ডে প্রকাশিতব্য রচনা সূচী ও গ্রাহক সংগ্রহ সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি থাকবে…’ 

এর আগে ১৯৯১ সালে দে’জ পাবলিশিং থেকে একটি বইয়ের জন্য অগ্রিম গ্রাহক সংগ্রহ (বইপাড়ার চলতি ভাষায় এখন যাকে ‘প্রি-বুকিং’ বলে) করার অভিজ্ঞতা আমার ছিল। সেবার শংকর-এর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়) সম্পাদনায় আরপিজি গ্রুপের সঙ্গে আমি যৌথভাবে প্রকাশ করেছিলাম ‘ঠাকুরবাড়ির চিত্রকলা’ নামে একটি বই। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সমরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুনয়নী দেবী এবং রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা এই বইটির গ্রাহক মূল্য স্থির হয়েছিল ১০০ টাকা। বইটি পাঠক মহলে বিপুল সাড়া ফেলেছিল। আমার এখনও মনে আছে গ্রাহক হবার লম্বা লাইন আমাদের দোকান থেকে প্রায় কফিহাউস পর্যন্ত চলে গিয়েছিল।

জ্যোতির্ময়ী দেবীর তিনটি বইয়ের জন্য তাঁর ছবি-সহ রচনা-সংকলনের জন্মশতবার্ষিকী সংস্করণের অগ্রিম গ্রাহক পেতে আমরা একটি ফোল্ডার প্রকাশ করেছিলাম। সেই গ্রাহক নিয়মাবলিতে লেখা হয়েছিল⎯ 

“জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন চারখণ্ডে প্রকাশিত হবে। প্রতিটি খণ্ডের আনুমানিক মূল্য ১০০ টাকা। স্কুল অফ উইমেন’স স্টাডিজ-এর সহযোগিতায় সুবীর রায়চৌধুরী-অভিজিৎ সেনের সম্পাদনায় প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে⎯ মূল্য ১০০ টাকা। ৭৫ টাকা দিয়ে গ্রাহকেরা এটি সংগ্রহ করতে পারবেন।
পরবর্তী তিনটি খণ্ড জ্যোতির্ময়ী দেবী জন্মশতবর্ষ কমিটির সহযোগিতায় প্রকাশিত হবে যথাক্রমে ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও এপ্রিল মাসে। এই তিন খণ্ডের আনুমানিক মূল্য ৩০০ টাকা⎯ গ্রাহক মূল্য ২২৫ টাকা। এককালীন ১২৫ টাকা দিয়ে গ্রাহক হতে হবে। তৃতীয় খণ্ড নেবার সময় বাকি ১০০ টাকা দিতে হবে। ডাকযোগে বই নিতে হলে প্রতিটি খণ্ডের জন্য অতিরিক্ত ২৫ টাকা ডাকমাশুল দিতে হবে।…”

জ্যোতির্ময়ী দেবীর বইয়ের জন্য অগ্রিম গ্রাহক সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আমরা খানিকটা সাড়া পেয়েছিলাম। ‘বর্তমান’ পত্রিকায় আমি জ্যোতির্ময়ী দেবীর শততম জন্মদিন⎯ ১৯৯৪-এর ২৩ জানুয়ারি একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে গোটা বিষয়টা বৃহত্তর পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছিলাম।

‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’-এর দ্বিতীয় খণ্ডটি যথাসময়ে ১৯৯৪-র জানুয়ারিতেই প্রকাশিত হয়। তবে এই বিপুল কাজ সবসময় ঘড়ির কাঁটা ধরে এগয় না। তাই আপ্রাণ চেষ্টা করেও পরের খণ্ড দুটো নির্দিষ্ট মাসে প্রকাশ করা যায়নি। তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হল এপ্রিলে, আর চতুর্থটি সে বছরের নভেম্বরে। দ্বিতীয় খণ্ড থেকে বইয়ের সম্পাদক হিসেবে গৌরদার (গৌরকিশোর ঘোষ) নাম যেতে শুরু করে, আর সহায়ক হিসেবে প্রথমে অশোকা গুপ্ত আর মঞ্জুশ্রী সিংহ-র নাম থাকলেও, তৃতীয় খণ্ডে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয় অঞ্জলি চট্টোপাধ্যায়ের নাম। তবে আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম গোটা কাজটায় অভিজিৎ সেন জড়িয়ে থাকায়।

এর আগে ১৯৯৩-এর ৩০ নভেম্বর অশোকাদি আমাকে লিখেছিলেন⎯

“1. আপনার কথা মত draft Brochure যা ছাপিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করা হবে, তার খসড়া final হলে গিয়ে থাকলে মধুমিতার হাতে পাঠাবেন। কি [য.] estimate হবে, কত ছাপা হবে তা জানাবেন।

2. প্রথম খণ্ডের খসড়া আপনি পেয়েছেন, এবং প্রেসে পাঠাচ্ছেন। দ্বিতীয় খণ্ডের সূচী ও material মধুমিতা কবে নিয়ে যাবে জানাবেন। সম্পূর্ণ material তৈরী হয়ে গেলে ৮ই ডিসেম্বরের মধ্যে মধুমিতা দিয়ে আসবে। 

3. Proof প্রথম সংশোধন আপনারা করবেন। ২য় প্রুফ কে দেখবেন বা final করে দেবেন? কেননা সুবিমলবাবুকে তো এখনও পর্যন্ত কোন কথা বলা হয়নি। আপনি যদি কথা বলে একটা term তৈরি করে দিয়তে পারেন তা হ’লে ভাল হয়। তিনি না করলে অন্য কে করবে? অভিজিৎ সেনকে কি জিজ্ঞাসা করব?…”

এখানে সুবিমলবাবু হলেন সুবিমল লাহিড়ী⎯ গ্রন্থনির্মাণ শিল্পী, রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ, সুরসিক সুবিমলদা পুলিনবিহারী সেনের সার্থক উত্তরসূরি ছিলেন। তবে এই রচনা-সংকলনে সুবিমলদা নন, তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের গ্রন্থনির্মাণ শিল্পী অভিজিৎ-ই যাবতীয় কাজ করেছিলেন। 

দ্বিতীয় খণ্ডে মহাশ্বেতাদি ‘জ্যোতির্ময়ী দেবী: শতবর্ষের আলোতে’ নামে একটা চমৎকার লেখায় বলেছিলেন⎯ “সাহিত্যসৃষ্টিক্ষেত্রে তিনি বাঙালী লেখিকা নন, ভারতীয় সাহিত্যিক এজন্য, যে তাঁর ভারতবোধ ছিল। ‘ভারতবোধ’ শব্দটি আমি কেন ব্যবহার করলাম? শুধু এ-জন্য নয়, যে তিনি অন্য রাজ্যের পটভূমিতে গল্প লিখেছেন বলে। জ্যোতির্ময়ী দেবী তার চেয়েও দায়িত্বের কাজ করেছেন। প্রথমত, অন্য রাজ্য, অন্য সমাজ নিয়ে লিখেছেন। এমনই তার বিষয়বস্তু, যে তা ওই রাজ্য বা সমাজের যথার্থ চিত্রও বটে। আবার একইসঙ্গে তার সীমাবদ্ধতা ভেঙে ছড়িয়েও যায়। “সেই মেয়েটি” গল্পের ভক্তন বা কীর্তনী সমাজের মেয়েটির কাহিনী যেমন। “বেটি কা বাপ” গল্প তো বর্তমান সময়ের এক প্রজ্বলন্ত ইস্যুর দিকে নির্দেশক। শিশুকন্যা-হত্যা নিয়ে এঁর আরো একটি গল্প আছে। আজ ভারতে সর্বত্র কন্যাভ্রূণ-বিনাশ ও শিশুকন্যা-হত্যা সমাজসত্য। ‘আরাবল্লীর আড়ালে’ কেন, ভারতে কোথায় বালিকা-কন্যা বিক্রি হয় না? আরবে মুসলিম বালিকাকে বিবাহের নামে বিক্রি ‘সংবাদ’ হয়, কিন্তু এমন ঘটনা সর্বত্র ঘটে। মেয়ে-চুরি, বা অপহরণ হয়। আবার বিয়ের নামেও বিক্রি হয়। নচেৎ দেশে অগণিত গণিকালয়ে পণ্য চালান হয় কি করে? রাজস্থান-পটভূমির গল্পগুলি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এজন্য যে ভারতীয় সমাজ আজও সামন্ত মূল্যবোধের বিষে নীল এবং তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিকার শোষিতসমাজ। মেয়েদের আর যা হোক, মানবিক সম্মান দিতে পারে না ভারতীয় সমাজ। এরপরেও তিনি স্বীয় সীমারেখা বারবার ভাঙেন, লক্ষ্মণের গণ্ডী ভেঙে বেরিয়ে যান। “সেই ছেলেটা” গল্পে রাজের মা একই সঙ্গে বিভক্ত পাঞ্জাবের এক ধর্ষিতা নারী এবং অনুরূপ অসংখ্য নারীর প্রতীক। … ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’ উপন্যাসেও একই কথা। মুসলমানে ছুঁয়েছিল বলে সুতারা এক জীবন্ত কলঙ্ক হয়ে যায়। মুসলমান যে তাকে বাঁচিয়েছিল সেকথা কেউ বলে না। তাঁর বহু লেখায় বারবার যে-কথা ফিরে ফিরে আসে, যুদ্ধ-দেশভাগ ইত্যাদি কালে তো বটেই, অন্য সময়েও, সমাজ দণ্ড দেয় নারীকেই। … আমি নিজে সীমিতবুদ্ধির গোঁয়ার পাঠক। সাহিত্যের কাছে আমি অনেক কিছু প্রত্যাশা করি। চাই, যে লেখক আমাকে দিয়ে ভাবিয়ে নেবেন, বক্তব্য বিষয়ে আমাকে আগ্রহী হতে বাধ্য করবেন। উনি তেমন লেখকই ছিলেন।…” 

[ডানদিক থেকে] পুণ্যলতা চক্রবর্তী, গিরিবালা দেবী, সীতা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবী, শান্তা দেবী ও শৈলবালা ঘোষজায়া, রবীন্দ্রসদন, নভেম্বর ১৯৭২

দ্বিতীয় খণ্ডে মহাশ্বেতাদির মতো তৃতীয় খণ্ডে ছিল অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটি লেখা। চতুর্থ খণ্ডে আশাপূর্ণা দেবী লিখেছিলেন⎯ “…‘নারীমুক্তির ঝাণ্ডাবাহী পাণ্ডা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি তিনি, তাঁর ঋজু সহজ সরল ভাষণে সচেতন করে তুলতে চেয়ছেন নারী সমাজকে। পৌঁছতে চেয়েছেন আমাদের অতিবিতর্কিত সমাজের একেবারে মর্মস্থলে।…” 

তবে জ্যোতির্ময়ী দেবীর যাবতীয় লেখালিখি আমরা চারটি খণ্ডেও ধরাতে পারিনি। তাই অবশিষ্ট লেখা নিয়ে ‘জ্যোতির্ময়ী দেবীর রচনা-সংকলন’ পঞ্চম খণ্ডও প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালের অগাস্ট মাসে। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি চতুর্থ খণ্ডটি প্রকাশের সময় জ্যোতির্ময়ী দেবী জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটির চেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আমাদের কিছু অর্থসাহায্য করেছিল।

রচনা-সংকলন ছাড়াও ২০০২-এর বইমেলার সময় দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘সোনা রূপা নয়’। এই বইয়ের দে’জ সংস্করণের ভূমিকা হিসেবে অশোকা গুপ্ত লিখেছিলেন⎯

“জ্যোতির্ময়ী দেবীর রবীন্দ্রপুরস্কার-প্রাপ্ত বই ‘সোনা রূপা নয়’ গল্পসংগ্রহের এটি পঞ্চম মুদ্রণ। প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় মহাশ্বেতা দেবীর উৎসাহে ও সহায়তায়⎯ সংকলনপর্বে কল্যাণী দত্ত’র পরিশ্রম ও পরামর্শ ব্যতিরেকে এই কাজ সম্পন্ন হতো না। গণশক্তি প্রেস মুদ্রণে, রিপ্রোডাকশান সিন্ডিকেট অঙ্গসজ্জায়, প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় গৌতম রায়ের শ্রম ও সহায়তা এবং সর্বোপরি ‘রূপা’-র প্রয়াত কর্ণধার ডি. মেহেরার উৎসাহ এবং লেখিকার পুত্রকন্যাদের ও নাতির আনুকূল্য না পেলে বইখানি প্রকাশিত হতো কিনা সন্দেহ। তারপর ১৯৬৯-এ প্রকাশ, ১৯৭৩ সালে রবীন্দ্রপুরস্কার প্রাপ্তির পর চারবার নানা প্রকাশন সংস্থার মাধ্যমে বইটি মুদ্রিত হয়েছে ও পাঠকের কাছে সমাদর লাভ করেছে।
এবার দে’জ পাবলিশিংয়ের উদ্যোগে প্রকাশিত নতুন সংস্করণেও পাঠক-পাঠিকারা আগের মতোই ছোটগল্পের ক্ষেত্রে লেখিকার অসামান্য দক্ষতার পরিচয় পাবেন। কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন এই গল্পগুলি পড়ে বলেছিলেন: ‘বাংলাদেশ ছোটগল্পে আজ বোধহয় কোনও দেশের চেয়ে ছোট নয়।’…”

এই বইয়ের জন্য তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যে ভূমিকাটি লিখেছিলেন সেটির সঙ্গে মহাশ্বেতাদির ‘প্রিয় লেখিকা: প্রিয় বই’ লেখাটিও সংযোজিত হয়েছিল।

জ্যোতির্ময়ী দেবীর বইয়ের কাজ করতে করতে আশোকাদির সঙ্গে একটা আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তিনি আমাকে ভরসা করতেন। এরই মধ্যে ১৯৯৯ সালে প্রয়াত হন তাঁর ছেলে পার্থসারথি গুপ্ত। পার্থবাবুর স্মরণে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল বিড়লা অ্যাকাডেমিতে। ১৯৯৯-এর ২৮ আগস্ট সকাল দশটায় আয়োজিত সেই স্মরণসভার কথা আমি সেসময় জানতে পারিনি। তবে অশোকাদি তার ঠিক এক মাস পরে আমাকে যে চিঠি লেখেন, তার সঙ্গে সেই স্মরণসভার একটি আমন্ত্রণপত্রও পাঠিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণপত্রের এক পৃষ্ঠায় ‘পার্থদা’ শিরোনামে উমা দাশগুপ্ত লিখেছিলেন⎯ 

‘পার্থসারথি গুপ্ত, আমাদের কাছে পার্থ বা পার্থদা, দিল্লীতে থাকতেন এবং দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। ৫ই অগাস্ট ৬৫ বছর পূর্ণ করে অবসর নেন, তার পাঁচ দিনের মাথায় ভোর বেলায় হেঁটে বাড়ি ফিরে হঠাৎ চলে যান।
দিল্লীতে থেকেও পার্থদা কলকাতার একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি নামকরা ছাত্র ছিলেন। বালীগঞ্জ গবর্নমেন্ট হাই স্কুলের পাঠ শেষ করে প্রেসিডেন্সী কলেজে ইতিহাস পড়েন। বি.এ. পরীক্ষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সম্মানিত ঈশান স্কলার্শিপ [য.] পান। এরকম ছাত্রকে কলকাতা কখনও ভোলে না।
পার্থদাও কলকাতায় আসতে ভালবাসতেন। এখানে তাঁর অনেক বন্ধু ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, সুযোগ হলে তাঁদের নিয়ে আড্ডায় বসতেন। পার্থদা বিদ্বান ও দৃঢ় চরিত্রের ব্যক্তিত্ব ছিলেন, একই সঙ্গে তিনি সহজ স্বভাবের উৎসাহী মানুষ ছিলেন।
জীবনের শেষ দশটি বছর কঠিন শারীরিক অসুস্থতার ফলে তাঁর জীবনে সংগ্রাম এসে পড়ে। তাতে তিনি ভেঙ্গে [য.] পড়েননি। ইতিহাস চর্চায় মনকে নিবিষ্ট রেখেছিলেন। এই সময়েই প্রকাশিত হয় তাঁর অনেক পরিশ্রমের ফসল তিন খণ্ডে সম্পাদিত বিশাল পরিধির Towards Freedom গ্রন্থটি। আমরা জানি তাঁর আরও অনেক কাজ করবার ইচ্ছা ছিল। কম বয়সের মৃত্যুতে তা সম্ভব হল না। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করে যে তিনি কাজ করে গেলেন সেটাই তাঁর জীবনকে আমাদের মনে আদর্শ করে রাখবে।’

২৮ আগস্টের একমাস পরের সেই চিঠিতে অশোকাদি লিখেছিলেন⎯

‘…অনেক ভাবে মনকে শক্ত করে এই পত্র দিচ্ছি। আমার পারিবারিক বিপর্যয়ের কথা হয়ত [য.] জানেন না বা শোনেন নি। এখন সব কাজ গুটিয়ে আনতে চাই। সম্ভব হলে সংলগ্ন পত্রে যা যা লিখেছি তার একটা উত্তর আমাকে এই সপ্তাহের মধ্যেই পাঠাবেন। সংলগ্ন স্মরণ সভার বিজ্ঞপ্তি থেকে জানতে পারবেন। আমি কি ভাবে আমার দৈনন্দিন কাজ সমাধা করবার জন্য গত দেড় মাস ধরে চেষ্টা করে চলেছি।

                         আপনার সহযোগিতা প্রার্থনায়
                                                            ইতি
                                                      অশোকা গুপ্ত’ 

স্মরণসভার খবর না পেলেও অশোকাদির চিঠি পাওয়ার পর আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। খুবই ভেঙে পড়েছিলেন, তবে ধীরে ধীরে পরের কাজগুলি⎯ জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘সোনা রূপা নয়’ এবং তাঁর লেখা ‘নোয়াখালির দুর্যোগের দিনে’ আমি প্রকাশ করেছি।

যাদবপুরের স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গে আমাদের যৌথ উদ্যোগে তৃতীয় বই হল ‘হেমন্তবালা দেবীর রচনা-সংকলন’। ‘হেমন্তবালা দেবীর রচনা-সংকলন’-এর হাফ টাইটেল পেজে লেখা হয়েছিল ‘মানবীবিদ্যাচর্চা গ্রন্থমালা ৩’ এবং ‘সাধারণ সম্পাদক সুবীর রায়চৌধুরী’। তবে বইটি যশোধরাদি এবং অভিজিতের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯২-এর নভেম্বরে। 

হেমন্তবালা দেবী ময়মনসিংহের গৌরীপুর জমিদারবাড়ির মেয়ে এবং নাটোর রাজ-পরিবারের দৌহিত্রবধূ। তাঁর বাবা ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী দেশপ্রেমিক এবং শিল্প-সংস্কৃতি জগতে একজন অগ্রণী মানুষ ছিলেন। বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলনের যুগে তিনি জাতীয় শিক্ষা পরিষদকে ৫ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়েও অর্থ সাহায্য করেছেন। যুগান্তর দল-সহ বিভিন্ন বিপ্লবী দলের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। মৃদঙ্গাচার্য মুরারি গুপ্তর কাছে শিখে পাখোয়াজ শিল্পী হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ইংরেজ সরকার তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিতে চাইলে সেই প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। 

হেমন্তবালা দেবী

‘হেমন্তবালা দেবীর রচনা-সংকলন’-এর ভূমিকায় যশোধরাদি লিখেছেন⎯ 

“…হেমন্তবালা জীবনকে যাচাই করেছিলেন দুই মূল কষ্টিপাথরে। এক, বৈষ্ণবধর্ম ও অন্যটি রবীন্দ্রনাথের লেখা। হিন্দু অভিজাত ঘরের গার্হস্থ্যজীবন তাঁকে অবরোধ-বাসিনী করে রাখতে পারেনি। তাঁর দীক্ষাগুরু শ্রীশ্রীমা ও শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁকে আধ্যাত্মিক জীবনরসে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। মেয়েদের জীবন যে ছোট গৃহকর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে আত্মতুষ্টি লাভ করে এবং স্বামী-পুত্র-কন্যার রক্ষণাবেক্ষণই যাঁদের স্বাতন্ত্র্যবোধের সীমারেখা নির্ধারণ করে, হেমন্তবালা দেবী সে শ্রেণীর লেখিকা ছিলেন না।

উনিশ এবং বিশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের মানসিকতা বিচারের কতকগুলি প্রচলিত মাপকাঠি তৈরি হয়েছে। প্রায়শই সেগুলি কিছু বাঁধা-গৎ-এর বৈপরীত্যবোধের সংকেতের ওপরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। আধুনিকতা বনাম সনাতনপন্থী তার মধ্যে অন্যতম।
হেমন্তবালা দেবীর লেখা পড়তে গিয়ে বোঝা যায় যে ওই বৈপরীত্য কত অগভীর। ‘দাশুরায়ের সমসাময়িক’ বলে রবীন্দ্রনাথ যাঁকে সাবেকিয়ানা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন, সেই হেমন্তবালা কিন্তু মৌলিক অর্থে বিদ্রোহী। উচ্চবিত্ত সমাজের সাংসারিক বন্ধনকে পুরোপুরি অস্বীকার করেও তিনি সংসারবিমুখিনী সন্ন্যাসিনী নন। তাঁর দৌহিত্রীর লেখাতে জানা যায় যে ভারতবর্ষের প্রথম মহিলা-পক্ষীবিশারদ হলেও হতে পারতেন তিনি⎯ পাখি সম্পর্কে তাঁর কৌতূহল ও জানার পরিধি এতই বিস্তৃত ছিল। রবীন্দ্রনাথকে যিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস, ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা নিয়ে সমানে সমানে তর্ক করেছেন তিনিই শেষ পর্যন্ত বলেছেন ‘ঈশ্বর নেই’। এ কোন ধরনের চিন্তাবিদ? এঁর সঙ্গে আমাদের পরিচিতিই বা এত কম কেন?

হেমন্তবালার মধ্যে ছিল এক সৌন্দর্যপিপাসু মন। নিজের চারপাশে যেখানে সৌন্দর্যকে জেনেছেন সমস্ত অন্তর দিয়ে তাকে স্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাঁর ভক্তি-রসের সম্ভবত এইটিই প্রধান উৎস। কিন্তু ভক্তিরস তাঁর চোখে কোনো বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারেনি। তাঁর অন্যতম জীবনদেবতা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তর্ক করেছেন সমানে সমানে। আমাদের মানবীবিদ্যাচর্চাতে হেমন্তবালার তাই এত কদর। সাবেকিয়ানাকে তিনি প্রতি পদে যাচাই করে নিচ্ছেন, নিজের করে নেওয়ার আগে তাকে কেন্দ্রচ্যুত করতেও পিছপা হননি। যে বইদুটি তাঁকে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকৃষ্ট করে তা হলো ‘গীতবিতান’ ও ‘যোগাযোগ’।
আমরা যে লেখিকাদের লেখা নতুন করে উপস্থাপিত করছি তার মধ্যে হেমন্তবালা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে মৌলিক। পরম্পরাপ্রাপ্ত ঐতিহ্যকে ভেঙেচুরে নতুন করে গ্রহণ না করে তিনি আপনার বলে চালাতে কুণ্ঠাবোধ করেন, তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ, আবার জীবনদেবতাও বটে।…”

প্রসঙ্গত বলে রাখি, রবীন্দ্রনাথের ‘চিঠিপত্র’-র নবম খণ্ডটি ‘হেমন্তবালা দেবী ও তাঁর পুত্র, কন্যা, জামাতা, ভ্রাতা ও দৌহিত্রকে লিখিত’ চিঠিপত্রের সংকলন। হেমন্তবালা দেবীর ভাই বীরেন্দ্রকিশোর রায়চোধুরী ছিলেন বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ ও রবাব, বীণ ও সুরশৃঙ্গার বাদ্যের জন্য বিখ্যাত। তানসেন-বংশীয় মহম্মদ আলি খাঁ ছিলেন তাঁর সংগীত গুরু। বীরেন্দ্রকিশোর বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলির মধ্যে আছে⎯ ‘হিন্দুস্থানি সঙ্গীতে তানসেনের স্থান’, ‘রাগ সঙ্গীত’, ‘উত্তর ভারতীয় সংগীত কলা’, ‘তন্ত্র ও শ্রীঅরবিন্দ’ ইত্যাদি।

হেমন্তবালার আত্মকথা ‘পুরানোদিনের কথা’ দিয়ে আমরা তাঁর রচনা-সংকলন শুরু করেছিলাম। তাঁর আত্মস্মৃতির খণ্ডাংশ ১৩৮৯-এর শারদীয় ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। কিন্তু রচনা সংকলনে তা অনেকটাই পূর্ণতা পেয়েছিল। যদিও যশোধরাদি জানিয়েছিলেন⎯ ‘যদিও বিক্ষিপ্ত আকারে “পুরানো দিনের কথা” কিছু অংশ অপ্রকাশিত থাকতেই পারে।’ এছাড়াও রচনা সংকলনে তাঁর অনেকগুলি প্রবন্ধ, রবীন্দ্রস্মৃতি শীর্ষক অনেকগুলি লেখা এবং প্রচুর চিঠিপত্র ছাপা হয়েছিল। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে লেখা ৮টি চিঠি আছে। হাতের কাছে ‘চিঠিপত্র’র যে সংস্করণটি আছে, তাতে কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে হেমন্তবালার লেখা তিনটি মাত্র চিঠি সেই সংকলনে আছে। প্রসঙ্গত বলে রাখি, রবীন্দ্রনাথকে হেমন্তবালা ‘দাদা’ সম্বোধনে চিঠি লিখতেন। হেমন্তবালা রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লেখার সময় প্রথম দিকে তাঁর উপনাম ‘জোনাকি’ ও রাশিনাম ‘দক্ষবালা’⎯ এই দুটি নামের আড়াল ব্যবহার করেছিলেন।

যাদবপুরের স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গে আমাদের যৌথ উদ্যোগে চতুর্থ বই হল ‘ছবি বসুর রচনা-সংকলন’। যশোধরা বাগচীর সম্পাদনা ও অভিজিৎ সেনের সহায়তায় বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৯৫-এর বাংলা নববর্ষের সময়। এই বই প্রকাশের সময় গ্রন্থমালার সাধারণ সম্পাদক সুবীরদা এবং প্রথম তিনটি বইয়ের প্রচ্ছদ শিল্পী রঘুনাথ গোস্বামী⎯ দু’জনেই প্রয়াত হয়েছেন। ‘ছবি বসুর রচনা-সংকলন’-এর প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেন অভিজিৎ গুপ্ত। ছবি বসুর বই যখন প্রকাশিত হয় তখনও তিনি জীবিত এবং এই বইয়ের পরিকল্পনা ও নির্মাণের সময় তিনি যথেষ্ট সহায়তা করেছিলেন। ছবি বসুর আরেকটি পরিচয় তিনি সুনীল বসুর (কাটু বসু) স্ত্রী। একথা আলাদা করে বলার কারণ, কাটুদার সঙ্গে আমার অনেকদিনের সুসম্পর্ক ছিল। কাটুদা বইপাড়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল বুক এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত। আপাদমস্তক বামপন্থী মানুষ। একসময় তাঁর সঙ্গে বইপাড়ার অনেক সভাসমিতিতে আমিও উপস্থিত থেকেছি। বঙ্গীয় প্রকাশক ও পুস্তকবিক্রেতা সভার প্রসঙ্গে তাঁর কথা আগেও বলেছি। ছবি বসু এবং কাটুদার ছেলে কুণাল বসুর কথাও আগে বলেছি।

‘ছবি বসুর রচনা-সংকলন’-এ তাঁর লেখা গল্প ও প্রবন্ধ ছাড়াও গবেষণা গ্রন্থ ‘বাঙলার নারী-আন্দোলন’ বইটিও ছাপা হয়েছিল। এই বইয়ে সুকুমারী ভট্টাচার্য ‘প্রিয়বান্ধবী ছবি বসু’ লেখাটিতে জানিয়েছেন⎯ 

“ছবি বসুকে ১৯৩৮ সালে প্রথম দেখি, ওর তখনকার নাম আরতি রায়। না, ‘ছবি’ ওর ডাকনামও নয়, ছদ্মনাম। কলেজের সেদিনের সেই ধনীর কন্যা ছবিকে মনে পড়ে প্রাণবন্ত, বুদ্ধিদীপ্ত, সমাজসচেতন, সাহিত্য-শিল্প-সঙ্গীত-অভিনয়ে আগ্রহী। ছাত্রী হিসেবে ভাল ছিল, ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিল, ইন্টারমিডিয়েট পড়তে এল ভিক্টোরিয়া কলেজে। লেখাপড়ায়, বিশেষত সাহিত্য ও ইতিহাসে ওর উৎসাহ বেশি ছিল। বি.এ. পড়বার সময়ে ও চলে গেল আশুতোষ কলেজে। শুধু বাড়ির খানিকটা কাছে বলে নয়, ওখানে পঠনপাঠন হতো সকালে, ফলে দুপুর-বিকেলগুলো ওর হাতে থাকত। গান শিখত, সেতার শিখত এবং প্রধানত রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল বলে ওর নিজস্ব সময়ের প্রয়োজন ছিল। কংগ্রেস থেকে ধীরে ধীরে বামপন্থায় সরে এল। বি.এ. পড়বার সময় থেকে কিছুকাল ওর সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতো না, হঠাৎ হঠাৎ এখানে-ওখানে দেখা হয়ে যেত। এম.এ. ও শেষ করল না, রাজনীতি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকেই ওর সময় কাটত।
রাজনীতির কাজে বস্তিতে বস্তিতে ঘুরে নিতান্ত দীনহীন পরিবেশের ক্লেদ, দৈন্য, গ্লানি প্রত্যক্ষ দেখেছে বেশ ক’বছর ধরে। এ অভিজ্ঞতা ওর বেশ কিছু গল্পের উপজীব্য। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সুখদুঃখের অংশভাক হয়েছে; তাদের জীবনযাত্রা, বাগভঙ্গী, চিন্তা ও অনুভবের গতিপ্রকৃতি ধীরে-ধীরে ওর মনে সঞ্চিত হয়ে উঠেছে, পরে ওর রচনায় সেগুলি রূপ-পরিগ্রহ করেছে। শুধু চক্ষুষ্মতীর দেখা এ নয়, হৃদয়বতীর দেখা-ও, রাজনীতি-সচেতন কর্মীর দেখা, যে-কর্মী সমাজকে শুধু দেখেই ক্ষান্ত নয়, সমাজকে পরিবর্তন করাও যার লক্ষ্য।

ছবি এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আজ পাশ্চাত্য পরিবেশেই কাটে ওর বছরের অধিকাংশ মাস। পৃথিবীর অপরার্ধের জীবনযাত্রা, চিন্তামনন, তাদের স্বতন্ত্র সমস্যা ও তার সমাধানের চেষ্টা⎯ এ সবই ও প্রণিধান করে বুঝতে চেষ্টা করে, সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশের পটভূমিকায় গল্পরচনাও অব্যাহত আছে।…”

সুকুমারীদির লেখায় ছবি বসুর পাশ্চাত্য পরিবেশের যে উল্লেখ আছে– তা নিশ্চয়ই কুণাল বসুর সঙ্গে থাকা তাঁর প্রবাসের দিনগুলির দিকে ইঙ্গিত করছে। রচনা-সংকলনের চুক্তিপত্রের সঙ্গে রাখা কাগজপত্রে দেখছি কুণাল তখন কানাডার মন্ট্রিয়লে থাকেন। ১৯৮৪ সালে কাটুদার মৃত্যুর পর হয়তো তিনি ছেলের কাছেই থাকতেন।

সুনীল বসু ওরফে কাটু বসু

এই বইয়ের ‘কৃতজ্ঞতা স্বীকার’-এ যশোধরা বাগচী আর অভিজিৎ সেন লিখেছেন⎯ “এই সংকলনটির অন্যতম আকর্ষণ ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার [য.] নারী-আন্দোলন’ বইটির পুনঃপ্রকাশ। উনিশ শতকে সমাজসংস্কার আন্দোলন থেকে তেভাগা আন্দোলন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় দেড়শ’ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ছবি রায় (পরে তিনি বিবাহসূত্রে ‘বসু’ উপাধি নিয়েছিলেন) ‘ইতিহাসে উপেক্ষিতা’ বাঙালি মেয়েদের অবদানের যে মূল্যায়ন করেছিলেন, ‘মানবীবিদ্যাচর্চা’র ক্ষেত্রে তা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর ঐতিহাসিক উপস্থাপনার তাত্ত্বিক দিক নিয়ে যাঁরা তাঁর সঙ্গে একমত নন তাঁরাও চমৎকৃত হবেন যে আজ থেকে সাতচল্লিশ বছর আগে এরকম একটি স্ব-পরিকল্পিত গবেষণার কাজ তিনি করেছিলেন যার মূল সুরটি ছিল সংঘবদ্ধ নারীশক্তি সম্পর্কে তাঁর গভীর আস্থা। অথচ বিভিন্ন মতাদর্শী সংগঠনগুলির প্রতি তাঁর সহানুভূতিপূর্ণ সমদৃষ্টি সকলকে মুগ্ধ করবে। … ছবি বসুর লেখাতে নারী-আন্দোলনের সংজ্ঞা কোনো নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাসের নিয়মরক্ষা নয়। মানুষের সম্পর্কে মানুষের সহানুভূতি ও দরদ তাঁর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান। মন্বন্তরের সময়ে রিলিফের কর্মী-মেয়েরা, নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তার মেয়েরা, লেনিনের মা⎯ এঁদের সকলের ক্ষেত্রেই যে মানবিক সহানুভূতি এবং সাহসের সংমিশ্রণ তিনি দেখিয়েছেন, নারীর সংগঠিত শক্তির মূল এখানেই।”

প্রসঙ্গত বলে রাখি, ছবি বসুর ভাই হলেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও কবি অসীম রায়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে আমি দে’জ পাবলিশিং থেকে দু’টি খণ্ডে ‘অসীম রায়ের গল্পসমগ্র’ প্রকাশ করেছিলাম। ২০২১-এ খণ্ড দু’টি একত্রে নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে।