Robbar

অপরাজিতা দেবীকে ছদ্মনামে পুরুষ কবি ভেবেছিলেন পাঠক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 14, 2026 7:01 pm
  • Updated:June 14, 2026 7:01 pm  

সরলাদেবী চৌধুরাণীর প্রথম যে-বইটি দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়, সেটি যাদবপুর স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গেই যৌথভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে⎯ ‘সরলাদেবী চৌধুরাণীর নির্বাচিত প্রবন্ধ-সংকলন’ নামে বইটি নির্মাণ করেছিলেন অভিজিৎ সেন ও অনিন্দিতা ভাদুড়ী। ‘সরলাদেবী চৌধুরাণীর নির্বাচিত প্রবন্ধ-সংকলন’ মালিনীদি (মালিনী ভট্টাচার্য) অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে প্রকাশিত হলেও তার ভূমিকা লিখেছিলেন যশোধরাদি। ‘সর্বঋতুর মানবী সরলাদেবী চৌধুরাণী’ শিরোনামে লেখা ভূমিকায় তিনি এই বইটি কেন স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজ করল– তার একটা চমৎকার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন।

সুধাংশুশেখর দে

৭৭.

স্বর্ণকুমারী দেবীর বইয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই সরলাদেবী চৌধুরাণী-র কথা এসে পড়ে। স্বর্ণকুমারী সরলাদেবী চৌধুরাণীর মা। সরলার বাবা জানকীনাথ ঘোষাল যখন বিলেতে যান, সেসময় তাঁর শৈশবের কিছুদিন কাটে মাতুলালয় জোড়াসাঁকোয়। ভর্তি হয়েছিলেন বেথুন স্কুলে। সেখানে তাঁর বন্ধু ছিলেন কামিনী রায়, অবলা বসু প্রমুখ। সরলা ফারসি, সংস্কৃত ছাড়া ফরাসি ভাষাও শিখেছিলেন। তাঁর চরিত্রে একটা অন্য রকমের দৃঢ়তা ছিল। একসময় সুদূর মহীশূরের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। আবার ১৯০৩ সালে কলকাতায় প্রতাপাদিত্য উৎসব এবং বীরাষ্টমী ব্রত উৎসব পালন করেছেন। জাতীয়তাবাদী ভাবধারাতেই তাঁর কাজকর্ম চলেছে আজীবন। যোগাযোগ থেকেছে লালা লাজপত রায়, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, বাল গঙ্গাধর তিলক এবং মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে। ১৯০৪ সালে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহারের প্রচার ও প্রসারের জন্য স্থাপন করেছিলেন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। ১৯০৫-এ তাঁর বিয়ে হয় লাহোর থেকে প্রকাশিত উর্দু পত্রিকা ‘হিন্দুস্থান’-এর সম্পাদক রামভুজ দত্তচৌধুরীর সঙ্গে। ব্রিটিশের কোপে স্বামী বন্দি হলে সরলা সেই পত্রিকা সম্পাদনার কাজ চালিয়ে যান, এমনকী পত্রিকার একটি ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশ করতে থাকেন। ‘ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল’, ‘ভারত স্ত্রী শিক্ষা সদন’ তৈরি করা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিছুদিন ‘ভারতী’ পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। তবে সমসময়ে তাঁর গানের প্রভূত খ্যাতি ছিল। বিশেষ করে স্বদেশপ্রেমের গানে।

সরলাদেবী চৌধুরাণী তাঁর আত্মকথা ‘জীবনের ঝরাপাতা’য় নিজের গান গাওয়া, বিশেষ করে ‘বন্দে মাতরম্‌’ গাওয়া প্রসঙ্গে লিখেছেন⎯ 

‘বঙ্কিমের স্মৃতি প্রসঙ্গে “বন্দে মাতরম্” গান ও মন্ত্রের স্মৃতি ভেসে না উঠে যায় না। সে গান বঙ্কিম-ভক্তিতে ডোবা আমার প্রাণে প্রথম ফোটেনি। তার ফোটানতে ছিল রবীন্দ্রের হাত। জীবনের প্রথম দিকে কাব্য বা সঙ্গীতের রসগ্রাহিতায় রবীন্দ্রের আত্মপর বিচার ছিল না। যে কবির যেটি ভাল লাগত সেটিতে নিজের সুর বসিয়ে গেয়ে ও গাইয়ে তার প্রচার করতেন। কোন কোন বৈষ্ণবপদাবলীতে, যেমন, “ভরা বাদর, মাহ ভাদর” এবং বিহারী চক্রবর্তীর দু-চারটি গানেও তাঁরই সুর দেওয়া “গাছে ফুল শোভা যেমন”, “পাগল মানুষ চেনা যায়”, “বুঝতে নারি নারী কী চায়” ইত্যাদি, এমন কি “বাল্মীকি প্রতিভায়” বিহারী চক্রবর্তী রচিত একটি গান একেবারে সশরীরে সন্নিবিষ্ট।
রবীন্দ্রনাথই “বন্দে মাতরম্”-এর প্রথম সুর বসিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া সুরে ঐ দুটি পদে গানটি সর্বত্র চলিত হল। একদিন মাতুল আমায় ডেকে বললেন⎯ “তুই বাকিটুকুতে সুর দিয়ে ফেল্ না।” ওরকম ভার মাঝে মাঝে আমায় দিতেন। তাঁর আদেশে “সপ্তকোটিকণ্ঠ কলকলনিনাদ করালে” থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবের সঙ্গে ও গোড়ার সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুর দিয়ে ফুটিয়ে নিলুম। দুই একটা জাতীয় উৎসবে সমস্বরে বহুকণ্ঠে বহুজনকে গাইতেও শেখালুম। সেই থেকে সভাসমিতিতে সমস্তটাই গাওয়া হতে থাকল।
“বন্দে মাতরম্” শব্দটি মন্ত্র হল সব প্রথম যখন মৈমনসিংহের সুহৃদ সমিতি আমাকে স্টেশন থেকে তাদের সভায় প্রোসেশন করে নিয়ে যাবার সময় ঐ শব্দ দুটি হুংকার করে করে যেতে থাকল। সেই থেকে সারা বাঙলায় এবং ক্রমে ক্রমে সারা ভারতবর্ষে ঐ মন্ত্রটি ছড়িয়ে পড়ল⎯ বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যখন গবর্নর সাহেবের অত্যাচার আরম্ভ হল আহিমালয়কুমারিকা পর্যন্ত ঐ বোলটি ধরে নিলে।
আমার বিয়ের পর গোখলের সভাপতিত্বে বেনারস কংগ্রেসে প্যান্ডালের দোতলায় মেয়েদের মঞ্চে আমি উপবিষ্ট ছিলুম। আমার পাশে ছিলেন লেডি অবলা বসু। হঠাৎ সভা থেকে গোখলের কাছে অনুরোধ গেল আমাকে দিয়ে “বন্দে মাতরম্” গাওয়ানোর জন্যে। গোখলে পড়লেন বিপদে। তার কিছু আগে বাঙলাদেশে কোথাও কোথাও ম্যাজিস্ট্রেটদের দ্বারা “বন্দে মাতরম্” সভাসমিতিতে গাওয়া নিষিদ্ধ হয়েছে। তিনি সাবধানপন্থী। গবর্নমেন্টের সঙ্গে ভাব রেখে কাজ করতে চান, গবর্নমেন্টের আদেশের বিরুদ্ধে কিছু করতে চান না। কিন্তু কি করবেন? ভারতের সর্বপ্রদেশ থেকে সমাগত প্রতিনিধিদের “বন্দে মাতরম্” শোনার তীব্র ইচ্ছা কিছুতেই নিরোধ করতে পারলেন না। তখন গোখলে আমার কাছে একটি ক্ষুদ্র লিপি পাঠালেন গাইতে অনুরোধ করে⎯ সঙ্গে সঙ্গে লিখলেন,⎯ সময় সংক্ষেপ, সুতরাং দীর্ঘ গানের সবটা না গেয়ে ছেঁটে গাই যেন। কোন্ অংশটা ছাঁটা তাঁর অভিপ্রেত ছিল জানি নে, আমি মাঝখানে একটুখানি ছেঁটে চট করে “সপ্ত কোটির” স্থলে “ত্রিংশ কোটি” বলে সমগ্রটা গাওয়ারই ফল শ্রোতাদের কাছে ধরে দিলুম, তাঁদের প্রাণ আলোড়িত হয়ে উঠল। ভারতের প্রান্ত প্রান্ত থেকে সমাসীন দেশভক্তদের মধ্যে আজও যাঁরা জীবিত আছেন⎯ সেদিনকার গান ভুলতে পারেননি।
আজ কংগ্রেস “High Command” থেকে কাটাছাঁটা “বন্দে মাতরম্” গাওয়ার হুকুম বেরিয়েছে। তা হোক্। হালফ্যাশনের ছাঁটা কুন্তলেও “বন্দে মাতরম্” তার তেজ ও দীপ্তিরসে ঢল ঢল করছে।…’

‘বন্দে মাতরম্‌’ প্রসঙ্গে বলি, আমি দে’জ থেকে বিভিন্ন সময়ে আমাদের জাতীয় সংগীত নিয়ে তিনখানি বই করেছি। চিন্ময় চৌধুরীর ‘মুক্তিমন্ত্রে বন্দেমাতরম’, জগদীশ ভট্টাচার্যের ‘বন্দে মাতরম্‌’ এবং পুলক চন্দের ‘ভিন্নপাঠে বন্দে মাতরম্‌ ও একটি দুষ্প্রাপ্য কাব্যগ্রন্থ’। 

সরলাদেবী চৌধুরাণীর প্রথম যে-বইটি দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়, সেটি যাদবপুর স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গেই যৌথভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে⎯ ‘সরলাদেবী চৌধুরাণীর নির্বাচিত প্রবন্ধ-সংকলন’ নামে বইটি নির্মাণ করেছিলেন অভিজিৎ সেন ও অনিন্দিতা ভাদুড়ী। ‘সরলাদেবী চৌধুরাণীর নির্বাচিত প্রবন্ধ-সংকলন’ মালিনীদি (মালিনী ভট্টাচার্য) অধ্যক্ষ থাকাকালীন সময়ে প্রকাশিত হলেও তার ভূমিকা লিখেছিলেন যশোধরাদি। ‘সর্বঋতুর মানবী সরলাদেবী চৌধুরাণী’ শিরোনামে লেখা ভূমিকায় তিনি এই বইটি কেন স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজ করল– তার একটা চমৎকার ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন⎯ “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকলনটি কিন্তু সরলাদেবীর যে প্রতিষ্ঠিত চিত্রণ, সেখান থেকে পাঠকদের খানিকটা হটে আসতে বাধ্য করবে, সরলাদেবীকে নতুন করে পড়তে শেখাবে। এইখানে আপনাদের অনুমতি নিয়ে আমি একটি সাধারণ প্রসঙ্গের অবতারণা করছি। আমরা যখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যার হাতিয়ার খোঁজার জন্য প্রতিষ্ঠাপর্বে মহিলা-লেখকদের লুপ্তপ্রায় কণ্ঠস্বরগুলিকে আবার সর্বসমক্ষে টেনে আনবার দুঃসাহসিক কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম, তখন অনেকে মনে করেছিলেন বিস্মৃত লেখিকাদের মধ্যেই আমরা সীমাবদ্ধ থাকব। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে আমরা কিন্তু ‘হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশে’র তকমা খুলে বসবার কোনও সদিচ্ছা থেকে এ-কাজে নামিনি। সুপরিচিত নামধারী লেখিকার লেখাকে পাঠকদের কাছে নতুন করে পৌঁছে দেবার, নতুন পাঠক তৈরি করবার একটি মানবী-কেন্দ্রিক তাগিদও আমাদের মনে ছিল। এবং রাধারাণী দেবী থেকে শুরু করে আমরা যে ক’জন সুপরিচিত লেখিকার রচনা-সংকলন প্রকাশ করেছি, তখন দেখেছি যে তাঁদের কারও খ্যাতি কিন্তু কয়েকটি সুপরিচিত লেখার বাইরে পাঠককে টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়নি। সেইখানেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীবিদ্যাচর্চা কেন্দ্রের পুনর্মুদ্রণ সিরিজটির সার্থকতা। অচেনা-অজানা লেখকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টার পাশাপাশি চেনা লেখিকার অপরিচিত, অগ্রন্থিত লেখাগুলির সঙ্গে পাঠকের পরিচিতি ঘটিয়ে নতুন ধরনের পাঠ এবং পাঠক তৈরি করবার কাজও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।…” এই সংকলনের প্রথম লেখাটি⎯ ‘প্রেমিক সভা’, ১২৯৮-এর আষাঢ় সংখ্যা ‘ভারতী ও বালক’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এটি অবশ্য তাঁর প্রথম লেখা নয়। তাঁর প্রথম লেখা সম্ভবত ‘সখা’য় প্রকাশিত একটি কবিতা। তবে অস্বাক্ষরিত এই লেখাটির জন্য তাঁর ‘রবিমামা’ সরলার ভূয়সী প্রশংসা করেন। আমাদের ‘সরলাদেবী চৌধুরাণীর নির্বাচিত প্রবন্ধ-সংকলন’-এ সরলাদেবীর প্রথম লেখাটি নেওয়ার উপায় না থাকলেও সংকলকরা তাঁর শেষ লেখাটি বইয়ে যুক্ত করতে পেরেছেন⎯ ‘মেয়েতে মেয়েতে ভাব’ লেখাটি তিনি ‘সওগাত’ পত্রিকার মহিলা সংখ্যায় প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়। ‘সওগাত’-এ ছাপা এই লেখাটি সম্ভবত তাঁর জীবনের শেষ লেখা।

সরলাদেবী চৌধুরাণীর ‘জীবনের ঝরাপাতা’ বইটিও দে’জ থেকে ২০০৭-এর বইমেলার সময় আমি যাদবপুর স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশ করেছি। ‘জীবনের ঝরাপাতা’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল ‘দেশ’ পত্রিকার ১৩৫১-র ২৪ কার্তিক সংখ্যা থেকে ১৩৫২-র ২৬ জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত। বইটির প্রথম সংস্করণের (শিশু সাহিত্য সংসদ, ১৮৭৯ শকাব্দ) সময় ‘সংযোজন, টীকা ও সম্পাদনা’র কাজ করেছিলেন যোগেশচন্দ্র বাগল। আমাদের সংস্করণের ভূমিকায় আমি লিখেছিলাম⎯

‘দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরলাদেবী চৌধুরাণীর আত্মজীবনী জীবনের ঝরাপাতা প্রকাশ করতে পেরে আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে রূপা সংস্করণ প্রকাশিত হবার পর বইটির আর কোনো সংস্করণ বেরোয়নি। পাঠকের ক্রমাগত চাহিদা ও বইটির দুষ্প্রাপ্যতা যুগপৎ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ-সব কথা মনে রেখেই এই নতুন সংস্করণ প্রকাশের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। নতুন এই সংস্করণটিতে আমরা প্রয়াত যোগেশচন্দ্র বাগল-কৃত মূল পাঠের অসমাপ্ত অংশের পর সংযোজন, তাঁরই লিখিত টীকা-অংশ ও সামগ্রিক সম্পাদনার পুরো ছকটাই প্রথম দুটি সংস্করণ থেকে নিয়েছি। প্রয়াত যোগেশচন্দ্রের পুত্র শ্রীপ্রশান্ত বাগল এই অংশগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে বাধিত করেছেন।…’ 

সরলাদেবী চৌধুরাণীর একটি ‘রচনা সংকলন’ও আমরা প্রকাশ করেছি ২০১১-র বইমেলায়। এই বইটির সংকলন ও সম্পাদনা ড. শঙ্কর প্রসাদ চক্রবর্তীর। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাটক, গান ও স্বরলিপি, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র নিয়ে রয়্যাল সাইজের বড় বই সরলাদেবী চৌধুরাণীর এই ‘রচনা সংকলন’।

২০০১ সালের জুন মাসে মানবীচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত হয়েছিল⎯ জ্যোতির্মালা দেবীর ‘বিলেত দেশটা মাটির’। জ্যোতির্মালা ছিলেন চট্টগ্রামের বৌদ্ধ পরিবারের মেয়ে। জীবনের বিভিন্ন পর্বে বৌদ্ধদর্শন, কমিউনিস্ট ভাবধারা-র পর্যায় পেরিয়ে তিনি শ্রীঅরবিন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পণ্ডিচেরির আশ্রমিক হয়েছিলেন। পরে লেখার তাগিদে আশ্রমজীবন ত্যাগ করেন। ছাত্রী হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯২৪ সালে একা বিলেতে যান। দেশে ফিরে কিছুদিন ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করার পর কলকাতার একটি ইনসিয়োরেন্স কোম্পানিতেও কাজ করেন। ‘বিলেত দেশটা মাটির’ বইটি প্রথম বেরিয়েছিল গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্স থেকে। তাতে ‘বিলাতী’ ও ‘দেশী’ দুই পর্যায়ে মোট ছ’টি গল্প ছিল। আমাদের সংস্করণে এই গল্পগুলি ছাড়াও ‘পরিচয়’ ও ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর দু’টি গল্প এবং জ্যোতির্মালা-রবীন্দ্রনাথের পত্রালাপও ছাপা হয়েছে।

২০০৫-এ আমরা ফের মানবীচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে প্রকাশ করেছি রাজলক্ষ্মী দেব্যার ‘কেদার বদ্‌রী ভ্রমণ-কাহিনী ও অন্যান্য স্মৃতিচিত্র’ এবং ২০০৭-এর বইমেলায় বিমলা দাসগুপ্তার ‘নরওয়ে-ভ্রমণ এবং কাশ্মীরে ক’দিন’ আর দুর্গাবতী ঘোষের ‘পশ্চিমযাত্রিকী’। সাহিত্যের আঙিনায় যখন মহিলাদের পদচারণা নেহাতই হাতে গোনা তখন মহিলাদের লেখা ভ্রমণকাহিনির সামাজিক-সাহিত্যিক গুরুত্ব অনেকখানি। দুর্গাবতী ঘোষের ‘পশ্চিমযাত্রিকী’ বইটির পরিচিতিতে লেখা হয়েছিল⎯ “নারীর ভ্রমণসাহিত্য মেলে ধরে এক বিশেষ লিঙ্গ-প্রেক্ষিত থেকে অন্য এক সংস্কৃতিতে মথিত লিঙ্গ-প্রেক্ষিতের আখ্যান। নারীরচিত ভ্রমণসাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘ভ্রমণ’ যুক্ত হয়ে যায় ‘স্বাভাবিক’ জীবন থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে, যা আবার হয়ে ওঠে তার ‘স্বাভাবিক’ জীবনের প্রতিস্পর্ধী বয়ানও।”

দুর্গাবতী ও তাঁর স্বামী রবীন্দ্রচন্দ্র ঘোষ

মানবীচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে আমাদের বইগুলোর মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বই হল ২০১১-র বইমেলায় প্রকাশিত গিরীন্দ্রনন্দিনী দেবীর⎯ ‘ধোলপুর [রাজপুত জাতির সমাজ-চিত্র]’। অভিজিৎ সেন ও অনিন্দিতা ভাদুড়ীর সহযোগিতায় ক্রাউন সাইজের এই বইটি সম্পাদনা করেছেন অনুরাধা রায়। গিরীন্দ্রনন্দিনীর স্বামী উমাচরণ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের এমএ এবং অনেকগুলি ভাষায় পারদর্শী। কুইন্স কলেজ ও আগ্রা কলেজে অধ্যাপনার পর আগ্রা কলেজের অধ্যক্ষের সুপারিশে উমাচরণ ধোলপুরের নাবালক ‘রাণা’ নিহাল সিং-এর শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। পরে তিনি রাণা-র প্রাইভেট সেক্রেটারি ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আমলা হয়ে ওঠেন। দেশীয় রাজ্যটির বহু পদের দায়িত্ব সামলেছেন বিভিন্ন সময়। সেই কারণে ওই এলাকার উচ্চবর্গীয় সমাজের রীতিনীতির সঙ্গে গিরীন্দ্রনন্দিনীর পরিচয় হয়েছিল। ‘ধোলপুর [রাজপুত জাতির সমাজ-চিত্র]’ বইটির পিছনের মলাটে লেখা হয়েছিল⎯ ‘পূর্ব রাজস্থানের একটি ছোট দেশীয় রাজ্য ধোলপুর। সেখানকার উচ্চপদস্থ ও সম্ভ্রান্ত রাজকর্মচারী ছিলেন গিরীন্দ্রনন্দিনীর স্বামী। সেই সুবাদে লেখিকা রাজপরিবারস্থ স্থানীয় অভিজাত সমাজ ও তার অন্তঃপুরের অনেক কথা জানার সুযোগ পান, বিচিত্র উৎসব-অনুষ্ঠানে আবর্তিত সমাজ-জীবনে অংশগ্রহণ করে সামাজিক রীতিনীতির বিশদ পরিচয় লাভ করেন। সেসব কথাই বলেছেন উনিশ শতকের উপান্তে প্রকাশিত বইতে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তির সঙ্গে সাবলীল ভাষাও তাঁকে সাহায্য করেছে। বেশ কয়েকটি উৎসব-সঙ্গীতের উদ্ধৃতি বইটির বড় সম্পদ। বাঙালি নারীর লেখালিখির আদি-আধুনিক উন্মেষ-পর্বের একটি দুষ্প্রাপ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নমুনা এই বই।’ 

যাদবপুর স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গে যৌথভাবে বই প্রকাশ করার সঙ্গে-সঙ্গে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য দু’টি কেন্দ্রের সঙ্গেও আমাদের যৌথ উদ্যোগে বই হয়েছে। ২০০৭-এর আগস্টে একইসঙ্গে দু’টি বই প্রকাশিত হয়। প্রথমটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র-অধ্যয়ন-কেন্দ্রের উদ্যোগে ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী আয়োগের সহায়তায় প্রকাশিত হয়েছিল। বইটি ছিল শিশিরকুমার দাসের আত্মজীবনী: জীবনী ও রবীন্দ্রনাথ। সেসময় রবীন্দ্র-অধ্যয়ন-কেন্দ্রের পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী। আর দ্বিতীয় বইটি হল ‘কিশোরপাঠ্য পত্রিকা পঞ্চক সূচি সংকলন’। অমল পাল সংকলিত বইটিতে ‘সখা’, ‘সাথী’, ‘সখা ও সাথী’, ‘মুকুল’ এবং ‘বালক’ পত্রিকার সংক্ষিপ্ত পরিচয় এবং সূচি চাপা হয়েছে। এই বইটি আমরা প্রকাশ করেছিলাম স্কুল অফ্‌ কালচারাল্‌ টেক্সটস্‌ অ্যান্ড রেকর্ডস্‌-এর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী আয়োগের সহায়তায়। 

২০০৯-এ শুভা চক্রবর্তী দাশগুপ্ত, শম্পা চৌধুরী ও স্মিতা খাটোর-এর সম্পাদনায় রবীন্দ্র-অধ্যয়ন-কেন্দ্র এবং স্কুল অফ্‌ কালচারাল্‌ টেক্সটস্‌ অ্যান্ড রেকর্ডস্‌-এর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী আয়োগের সহায়তায় দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘সাহিত্য পত্রিকার রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ’। ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সুরেশচন্দ্র সমাজপতি। ‘সাহিত্য পত্রিকার রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ’ বইটি ৩০ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে সরাসরি রবীন্দ্র-রচনাকে কেন্দ্র করে ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় যে ‘আলোচনা সমালোচনা ও বাদ প্রতিবাদ’ প্রকাশিত হয়েছিল– তার সংকলন।

তবে এই পর্বে ‘রাধারাণী দেবীর রচনা-সংকলন’-এর কথা বলতেই হয়। মানবীচর্চা কেন্দ্রের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে দু’টি খণ্ডে প্রকাশিত ‘রাধারাণী দেবীর রচনা-সংকলন’-এর প্রথমটি বেরিয়েছিল ১৯৯৯ সালে আর দ্বিতীয়টি তার পরের বছর। অভিজিৎ সেনের একটা চিঠি থেকে জানতে পারছি– এই বইয়ের কাজ কিন্তু বছর দুয়েক আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। ১৯৯৭-এর ১৮ আগস্ট অভিজিৎ আমাকে লিখেছিলেন⎯

‘শ্রদ্ধেয় সুধাংশুদা, 

টেলিফোন-মারফত জানলাম যে অনিন্দিতা দেবীর রচনা-সংকলন এ-মাসেই প্রকাশিত হবে। খুবই আনন্দের কথা। গত ১৯৯১ সাল থেকে আপনার আনুকূল্যে এ পর্যন্ত আমাদের স্কুল অব উইমেন্‌স্‌ স্টাডিজ থেকে ৬ খানা সুবৃহৎ সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, এ ব্যাপারে আমরা সকলে আপনার প্রতি যে কতটা কৃতজ্ঞ তা লিখে বোঝাতে পারবো না। আমাদের পরবর্তী এবং সম্ভবত শেষ বই⎯ রাধারাণী দেবীর রচনা-সংকলন (নবনীতাদির মা)। পুরো প্রেসকপি শ্রদ্ধেয়া নবনীতাদির বাড়িতে রেখে এসেছি। ওখান থেকেই কার্তিকদা অথবা প্যাপিরাসের লোচন বা অসিতদা প্রেসে নিয়ে যেতে পারে, দিদির সঙ্গে সে-রকমই কথা হয়েছে।…’

অভিজিৎ চিঠিতে আমাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন, কিন্তু আমারও তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। যাদবপুরের স্কুল অফ উইমেন্‌স স্টাডিজের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত বইগুলি আমাদের প্রকাশনার সম্পদ বলেই আমি বিশ্বাস করি। প্রসঙ্গত বলে রাখি, প্যাপিরাসের যে দুই কর্মীর কথা এখানে অভিজিৎ লিখেছেন তাঁরা হলেন⎯ লোচন পাণিগ্রাহী আর অসিত মিশ্র। 

‘রাধারাণী দেবীর রচনা-সংকলন’-এর প্রথম খণ্ডে ভূমিকা লিখেছিলেন নবনীতা দেবসেন এবং যশোধারা বাগচী। আর দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকা লিখেছিলেন শর্মিলা বসু-দত্ত। ‘রাধারাণী দত্ত ও রাধারাণী দেবী এবং আমরা’ শিরোনামে লেখা ভূমিকায় নবনীতাদি লিখেছিলেন⎯ 

“রাধারাণী দেবীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি অর্ধশতাব্দীরও বেশিদিন। তীক্ষ্ণ মেধার এত কাছাকাছি থাকাটা নিজের আত্মবিশ্বাসের পক্ষে কতটা ভালো জানি না, সর্বদাই মায়ের অসাধারণত্ব আমাকে মোহিত করে রাখতো। মায়ের ধীমত্তা, তাঁর সাহস, তাঁর সততা, তাঁর স্পষ্টভাষণ, তাঁর শব্দচয়ন, চিন্তার স্বচ্ছতা ও ভাষার তীক্ষ্ণতা, বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ওপরে তাঁর অসামান্য দখল⎯ আমাকে তাঁর পদতলে মুগ্ধ ভক্ত করে রেখেছিল। মা যা-ই বলতেন, যা-ই লিখতেন, তা হতো অন্যদের চেয়ে আলাদা, গভীর ও বিশিষ্ট চিন্তার আলোতে উজ্জ্বল। নিজস্ব ভাষার গুণে মৌলিক। … আমাদের পরিচিতজনেরা এখনও বলে থাকেন, রাধারাণী দেবীর কাছে কিছুক্ষণ বসা মানেই ছিল নতুন কিছু শেখা, মনের মধ্যে নতুন একটি বাতায়ন খুলে যাওয়া। … জীবনের শেষ পনেরো বছর তিনি প্রায় ঘরের বাইরে বের হননি⎯ ১৯৭৫-৭৬-এ শরৎ শতবার্ষিকীর⎯ ঐ একটা বছরে মা যেন নতুন করে জেগে উঠেছিলেন। তারপর একেবারেই অন্তরীণ জীবন। বাবার মৃত্যুর পরে থেকেই মা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী থাকতে পছন্দ করতেন। সভাসমিতি কোনওকালেই তাঁর মনের মতো ছিল না, বাবা ছিলেন সভাসুন্দর স্বভাবের মানুষ। কিন্তু শরৎ শতবর্ষে মায়ের নানা জায়গা থেকে ডাক এসেছিল, তিনি সানন্দে সেই ডাকে সাড়াও দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ বছরটা বিশ্বের নারীবর্ষ ছিল, মা তাতে উদ্বুদ্ধ বোধ করেছিলেন। শরৎচন্দ্র বিষয়ে এবং নারীমুক্তি বিষয়ে বিভিন্ন সভাসমিতিতে মূল্যবান বক্তৃতা দিয়ে বেড়িয়েছিলেন সেই বছর, ১৯৭৫-৭৬-এ।

রাধারাণী দেবী


যে-মাকে আমি দেখেছি, সেই রাধারাণী দেবীর গদ্য বলতে ছিল প্রবন্ধ, বক্তৃতা। আর পুজোসংখ্যাতে দুটি-একটি মনমাতানো রূপকথা, যা আমার শৈশবকে স্বপ্নাচ্ছন্ন করে রাখতো। মার বড়দের গল্প সবই আমার জন্মের আগে লেখা, বাবার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হওয়ারও আগে।
আমি মা বলে জেনেছি কবি রাধারাণী দেবীকেই, যিনি একদা অপরাজিতা ছদ্মনামেও লিখেছেন এবং সার্থকনাম্নী হয়েছেন। গল্পকার রাধারাণীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি, গল্পকার হিসেবে তার খ্যাতি আমি শুনিনি, জ্যোতির্ময়ী দেবী, আশাপূর্ণা দেবীর মতো। কখনো নিজের গল্প নিয়ে কথা কইতেও শুনিনি তাঁকে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরে একবারও না। কিন্তু মাকে তাঁর কবিতার বইগুলি নিয়ে মাঝে মাঝে বসতে দেখেছি⎯ ‘আজ লিখলে এমনি করে লিখতুম’⎯ বলে নেহাৎ খেলাচ্ছলেই পুরনো কবিতার ভাষার অদলবদল করতেন। কিন্তু ‘অপরাজিতা’র কবিতায় হাত দিতে দেখিনি। ‘ও-কবিতা তো অপরাজিতা লিখেছিল, রাধারাণী কেমন করে সংশোধন করবে?’⎯ ঠিক সেইভাবেই কি রাধারাণী দত্তের লেখা গল্পগুলিকে তিনি পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে আর পাত্তাই দেননি? গল্পগুলিকে ভুলে থাকতেই যে তিনি পছন্দ করেছিলেন, সেটা এখন আমার কাছে স্পষ্ট। তবে কি তাঁর মনে কোনোও সংশয় ছিল, ‘রাধারাণী দত্তের লেখাগুলি দিয়ে রাধারাণী দেবী কী করবেন?’ নেহাৎ অল্পবয়সের হাত-পাকানোর লেখা⎯ সেইসব তরুণ ভাবনাগুলিকে মা কি পরিণত বয়সে অস্বীকার করতেই চেয়েছিলেন? সার্ত্র যেমন পরবর্তী জীবনে, বামপন্থী মননের সময়ে, ‘বিইং অ্যাণ্ড নাথিংনেসে’র দায় আর বহন করতে চাননি। মায়েরও চিন্তা পরিণতি পাবার পরে, কলমের এবং জীবনের মোড় ঘুরে যাবার পরে, সেই অল্পবয়সের লেখাগুলিকে মা কি তবে মূল্য দিতে চাননি? ভাবলেই মনে খুব যন্ত্রণা হয় যে মা ৮৬ বছর পর্যন্ত সজ্ঞানে আমাদের মধ্যেই ছিলেন, অথচ মননশীল, বাকপটু, সহযোগী মানুষটির কাছে আমরা কেউ কোনো প্রশ্ন নিয়েই উপস্থিত হইনি। অতি-নৈকট্যের দোষ? সন্তান বলেই কি দূরদৃষ্টিহীন ছিলুম? গল্প সংগ্রহের প্রশ্নটি মার জীবৎকালে ওঠেনি। আমার ভয়, বেঁচে থাকলে মা হয়তো এগুলি প্রকাশের অনুমতি দিতেন না।”

‘রাধারাণী দেবীর রচনা-সংকলন’-এর যাবতীয় লেখা অনেক যত্নে ও শ্রমে এক জায়গায় করে বইয়ের দু’টি খণ্ড গড়েছিলেন অভিজিৎ⎯ নবনীতাদি নিজেও সেকথা লিখে গিয়েছেন। 

‘রাধারাণী দেবীর রচনা-সংকলন’-এর অনেক পরে, ২০১২ সালে আমি দে’জ থেকে ‘অপরাজিতা রচনাবলী’ও পুনর্মুদ্রণ করেছি। ‘অপরাজিতা রচনাবলী’তে অপরাজিতা দেবীর যাবতীয় কবিতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপও ছাপা হয়েছে। অপরাজিতা দেবীর ছদ্মনামটির আড়ালের মানুষটিকে দীর্ঘদিন বাংলার পাঠক চিনতে পারেননি। অনেকের ধারণা ছিল কোনও পুরুষ বুঝি মহিলার লেখনী নকল করে কবিতা লিখছেন। এমনকী অ-প-রা-জি-তা পাঁচজন পৃথক পুরুষ– এমন উদ্ভট চিন্তাও করতেন কেউ কেউ।

তবে রবীন্দ্রনাথ অপরাজিতা দেবীর কবিতার স্বকীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। অপরাজিতা দেবী যখন তাঁর ‘আঙিনার ফুল’ বইটি রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করতে চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন, প্রত্যুত্তরে শান্তিনিকেতন থেকে ১৩৪০-এর ১ শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথ লেখেন⎯ 

‘কল্যাণীয়াসু

বাংলাদেশে আমাকে গাল দিতে কেউ সঙ্কোচ করে না আর আমাকে তোমার বই উৎসর্গ করতে এত সঙ্কোচ কেন? খুসি [য.] হব তাতে সন্দেহ কোরো না। তোমার লেখা অর্ঘ্য রূপে ব্যবহার করা চলে, তাকে অনাদর করব এত বড় গোঁয়ার আমি নই। বয়স হয়েছে কিন্তু অহঙ্কার জয় করতে পারিনি, আমার প্রতি কোনো ব্যবহারে তোমার যদি শ্রদ্ধা প্রকাশ পায় সেটাতে আমার মন প্রফুল্ল হবে, একথা তুমি ধরে নিতে পারো। সমাদর যতই পাই তৃপ্তির শেষ হয় না, এর থেকেই বুঝতে পারবে শেষ বয়সে ঋষি-তপস্বী হয়ে ওঠবার কোনো আশঙ্কা নেই, কবিজনোচিত অকৃত্রিম দাম্ভিকতা নিয়েই রঙ্গমঞ্চ থেকে প্রস্থান করব। অতএব বইটা উৎসর্গ করতে ভুলো না।

                                            স্নেহাশীর্বাদক
                                                রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৭৬। বিদেশেও সমাদৃত হয়েছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর উপন্যাস

পর্ব ৭৫। নারীকলম: দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৭৪। বই-মানবী

পর্ব ৭৩। প্রেসের কাজে গাফিলতি দেখলে কড়া চিঠি লিখতেন সুবীরদা

পর্ব ৭২। করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ

পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা

পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান

পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ

পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন

পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ

পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!

পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!

পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়

পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়

পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়

পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!

পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু

পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না

পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম