সুবীরদা আমাদের প্রকাশনা থেকে অসংখ্য বইয়ের কাজ করেছেন⎯ কেবল একটি বই ছাড়া আর কোথাও টাইটেল পেজে নিজের নাম দেননি। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত সে-বইটি একটি কবিতার সংকলন⎯ ‘জেলখানার কবিতা’⎯ এখানেও সুবীরদা সে-ই সংকলকই। যতদূর মনে পড়ে এই বইয়ে সিদ্ধেশ্বর সেন, সুভাষদা, শঙ্খদা, মানবদা, জয়ন্ত সেনের কবিতা ছিল। সুবীরদার ছেলে⎯ সুমন ভট্টাচার্য ব্রেখট-এর কবিতা অনুবাদ করেছিল।
৮৪.
সুবীর ভট্টাচার্যের কথা সহজে ফুরবে না। মানুষটা যেমন গুণী ছিলেন, তেমনই অভিমানীও। আমার যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৮ সালেই তিনি ইএসআই থেকে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নেন। প্রথমে আশা প্রকাশনী, তারপর দে’জ পাবলিশিং-এ ততদিনে তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বই তৈরি করে ফেলেছেন। তবে চাকরি ছাড়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল, এতদিন পরে সুযোগ যখন এসেছে তখন তার সদ্ব্যবহার করে নিজের ইচ্ছেমতো– এতদিনের সংগ্রহ করে রাখা বইপত্রের মধ্যে পড়াশোনা করে দিন কাটাবেন। তাই ১৯৮৮-র ৫ ডিসেম্বর একটি তিন পাতার চিঠি লিখে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন⎯ ‘আগের মতো দে’জ পাবলিশিং-এ আমি যুক্ত থাকতে পারব না।’ তবে সেই সঙ্গে জানিয়েছিলেন⎯ ‘চাকরি তো নেই। পেন্সনই ভরসা। যদি কিছু কিছু প্রুফ দেখবার সুযোগ দাও কৃতজ্ঞ থাকব।’ আমি চিঠি পেয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো লেখাপড়া করতে চাওয়ার কথাই জানিয়েছিলেন। এই চিঠির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লাইনটা তিনি আমার স্ত্রী-র উদ্দেশে লিখেছিলেন। চিঠির একবারে শেষে তিনি লেখেন⎯ ‘টুকুদিদিভাই, আমার ওপর রাগ করিস না।’ তবে এই চিঠি লিখেই তিনি আমার সঙ্গে সব সম্পর্ক ত্যাগ করেননি। আমিও কখনও চাইনি এমন গুণী মানুষকে হারাতে। সুবীরদাও কিছুদিন পরে আবারও আমাদের প্রকাশিত বইপত্রের বিপুল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। আমাদের বাড়িতে বসেও কাজ করেছেন। একটা চিঠিতে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
১৯৯১ সালে লেখা একটি চিঠির শুরুতে তিনি আমার প্রতি খানিকটা অনুযোগের সুরে জানিয়েছিলেন, আমি তাঁকে সময় দিতে পারছি না বলে। আসলে সেসময় আমার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান নতুন-নতুন বই বের করা। আমার ভাই বাবু দোকানটা একা-হাতে চমৎকার সামলাত, আর আমি প্রায় সারাদিনই বাইরে-বাইরে ঘুরতাম। তাই হয়তো তাঁকে সময় দিয়ে উঠতে পারিনি। সুবীরদা লিখেছেন⎯
‘তিন মাস ধরে বলছি তুমি দশ মিনিট সময় দিলে না। যাহোক, আমার কাছে যেসব পাণ্ডুলিপি আছে⎯ তার তালিকা দিলাম।
১. সাধন ভট্টাচার্য নাট্য-সাহিত্য বিচার (চুক্তি হয়ে গেছে। সম্পাদনা আমার। কিন্তু কীভাবে প্রকাশ করবে জানি না।)
২. কালীপ্রসন্ন ঘোষ: সমাজ-চিন্তা ও গদ্যরীতি বিচার ব্রজগোপাল রায় 01.06.91-এ দেবো⎯ Correction sheet সহ।
৩. আঁধার মহিষ: অভিজিৎ সেন (উপন্যাস হাতে লেখা)
৪. বন্দর (প্রতিক্ষণ-এ প্রকাশিত) ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়
৫. রামপদর অসন [অশন]-ব্যসন (‘পরিচয়’-এ প্রকাশিত) ঝড়েশ্বর চট্টোপাধ্যায়
৬. শেষ রাতের ঘোড়াগুলি: (১১টি গল্প) ভগীরথ মিশ্র
৭. দিনযাপন শূন্য থেকে: প্রকাশ কর্মকার (কবিতা)
৮. নানারকম: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (বারিদবরণ ঘোষ)
৯. নবনীতা দেবসেন (হাসির গল্প) 15.05.91-এ দেবো বাছাই করে Yes বলেছ: আমার জিম্মায় আছে…’
চিঠিতে ৯-এর পরে ১০ নম্বর পয়েন্টের বদলে ১ এবং ২ নম্বর দিয়ে লিখেছেন ‘ক্ষুদিরাম দাস: বাংলা কাব্যে রূপ ও রীতি (B.A, M.A-র জন্য )’ এবং ‘ডেভিড হেয়ার: জীবন-চরিত: রণতোষ চক্রবর্তী’। এরপর আবার পুরোনো অংশের রেশ ধরে লিখেছেন⎯
‘১০. সাময়িকী: মণীন্দ্রকুমার ঘোষ (শঙ্খ ঘোষ ref) লেখবার জন্য দে’জ-এর পক্ষে অনুরোধ করেছি⎯ আগের আলোচনার রেশ ধরে কমিশনড্ লেখানো।
১. দেব্জ্যোতি [দেব্জিত?] বন্দ্যোপাধ্যায় দাশু রায়ের পাঁচালি
২. কল্যাণবন্ধু ভট্টাচার্য সুরকার কমল দাশগুপ্ত জীবন ও সংগীত সাধনা
৩. অরুণ সেন বিষ্ণু দের ওপর বই
৪. নিত্যপ্রিয় ঘোষ
৫. শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়
৬. প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য…’

চিঠিতে শুরুর ৩ থেকে ৮ নম্বর পর্যন্ত বই সম্পর্কে চিঠির বাঁ-দিকে লিখেছেন⎯ ‘03.05.91-এ ফেরত দিলাম। খামে মন্তব্য আছে। ছাপলে ক্ষতি হবে না। বরং ভবিষ্যতে লাভবান হবে। অমলদা, দেবেশবাবু, কিন্নরবাবু এঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারো। না-ছাপলে অবিলম্বে ফেরৎ দিও।’ এই বইগুলোর মধ্যে অনেকগুলো বই-ই আমি প্রকাশ করেছিলাম। সাধন ভট্টাচার্য, ব্রজগোপাল রায়ের বই হয়েছে। নবনীতাদির বই করা নিয়ে কোনও সংশয়ই ছিল না। অভিজিৎ সেনের অন্তত দশটি বই আমি প্রকাশ করেছি। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘আঁধার মহিষ’ দে’জ থেকে তাঁর প্রথম উপন্যাস। অভিজিৎ সেন তখনও সম্ভবত উত্তরবঙ্গে থাকতেন। উপন্যাস ছাড়াও তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ এবং ‘সেরা পঞ্চাশটি গল্প’ও আমরা প্রকাশ করেছি। প্রথিতযশা শিক্ষক এবং বাংলা ভাষার জটিল ও তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে আগ্রহী মণীন্দ্রকুমার ঘোষ আবার শঙ্খদার বাবা। আমি ১৯৮১ সালেই তাঁর ‘বাংলা বানান’ বইটি পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম। সুবীরদার উদ্যোগে বইটি প্রথমে আশা প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল। প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় মণীন্দ্রকুমার লিখেছিলেন⎯ ‘এইসব লেখা একত্রে গ্রথিত হয়ে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাবে এমন কল্পনা কোন কালেই লেখকের মনে আসে নি। শ্রীযুক্ত সুবীর ভট্টাচার্যের আগ্রহে বানান-ব্যাকরণ-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রবন্ধ পুনর্মুদ্রিত হল।’ ১৯৯৩ সালে এই বইয়ের নতুন একটি সংস্করণ প্রকাশের সময় আমি লিখেছিলাম⎯ “এ বইয়ের ‘বাংলা বানান’ নামে প্রথম প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি ব্যবহৃত হয়েছে (দ্রষ্টব্য পৃ. ২১)। লেখকের যে চিঠিটির উত্তরে ওই চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিছুদিন আগে সেটা মুদ্রিত হয়েছে ‘অনুষ্টুপ’ পত্রিকার ১৯৯২ বর্ষা সংখ্যায়। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায়, লেখকের অবর্তমানে তাঁর এই বইটির পুনঃপ্রকাশ করতে গিয়ে সেই চিঠিটি আমরা যুক্ত করছি এর ‘সংযোজন’ অংশে। চিঠিটি সংগ্রহ করা গিয়েছিল প্রয়াত শুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায়ের সাহায্যে।”

সুবীরদা আমাকে মাঝেমাঝেই একটা আশ্চর্য সম্বোধনে ডাকতেন⎯ তাঁর ডাকটি ছিল ‘বস্’। চিঠিতে হামেশাই ‘বস্’ লিখতেন। তাঁর একটি তারিখবিহীন চিঠি পড়তে গিয়ে ফের মনে পড়ল, প্রকাশক হিসেবে আরও একটা ভালো বই আমি হয়তো কোনও কারণবশত সেসময় ছাপতে পারিনি। চিঠিটিতে তারিখ না থাকলেও চিঠির বক্তব্য থেকে বুঝতে পারছি এটা নয়ের দশকের শুরু দিকের চিঠিই হওয়া উচিত। তিনি লিখেছেন⎯
‘বস্,
উত্তাল চল্লিশ⎯ অসমাপ্ত বিপ্লব অমলেন্দু সেনগুপ্ত খাতা সংখ্যা⎯ ১৯টি
১. যারা পড়েছেন প্রত্যেকেই প্রশংসা করেছেন।
২. এ ধরনের বই এর আগে আমি অন্তত পড়িনি।
৩. বুর্জোয়া সংবাদপত্রের উদ্ধৃতি কোনো-কোনো প্রসঙ্গে আরো ব্যবহার করলে ভালো হয়।
৪. I. W. [Illustrated Weekly] অরুণ শৌরির প্রবন্ধের উল্লেখ ও আলোচনা প্রয়োজন।
৫. কোনো জায়গায় ভাষা উচ্ছ্বাসময় হয়েছে।
৬. কোটেশন চেক্ করা দরকার। বিনয় ঘোষ ও সুশোভন সরকারের উদ্ধৃতি এ-প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
৭. বইটির ব্যবসায়িক দিক ভালো।
৮. ছাপা হবে কি হবে না লেখককে জানাতে হবে।
সুবীর ভট্টাচার্য

পু: ১. বানানের সমতা রক্ষা করা প্রয়োজন।
২. উদ্ধৃতির সপক্ষে কয়েকটি ফটোকপি প্রয়োজন।
৩. কিছু আলোকচিত্র প্রয়োজন।
৪. কোনো বিশেষজ্ঞের দ্বারা রচিত একটি ভূমিকা থাকলে ভালো হয়।
৫. বইটি সম্পর্কে শ্রীশুভেন্দুশেখর মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের সুপারিশ আছে।
সু. ভ.’

অমলেন্দু সেনগুপ্ত ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিল ‘মনীষা গ্রন্থালয়’ থেকে। প্যারি কমিউনের ১১০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত সে-বইয়েরও নাম ছিল⎯ ‘প্যারী কমিউন’। ‘কমরেড নৃপেন চক্রবর্তী’কে উৎসর্গ করা বইটির জন্য একটি ভূমিকা লিখেছিলেন অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, নৃপেন চক্রবর্তী তখন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। আমি অমলেন্দুবাবুর বই করে উঠতে না পারলেও সে-বইটি পার্ল পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর পরের বই ‘জোয়ারভাটায় ষাট-সত্তর’ও পার্ল থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৯৭-এর মে মাসে। পার্ল-এর প্রকাশক ছিলেন মদন ভট্টাচার্য। তাঁদের প্রকাশনার ঠিকানা ছিল ২০৬ বিধান সরণী। কলেজ স্ট্রিট বাটা থেকে বিধান সরণি ধরে সুকিয়া স্ট্রিট মোড়ের দিকে এগলে, সুকিয়া স্ট্রিট মোড়ের বাঁ-হাতে যে বাজার আছে তার দোতলায় ছিল পার্ল পাবলিশার্স। এখন সে-প্রকাশনা আর নেই। সে-বাড়ির ওই তলাতেই আছে নয়া উদ্যোগের দোকান।

সুবীরদা আমাদের প্রকাশনা থেকে অসংখ্য বইয়ের কাজ করেছেন⎯ কেবল একটি বই ছাড়া আর কোথাও টাইটেল পেজে নিজের নাম দেননি। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত সে-বইটি একটি কবিতার সংকলন⎯ ‘জেলখানার কবিতা’⎯ এখানেও সুবীরদা সে-ই সংকলকই। যতদূর মনে পড়ে এই বইয়ে সিদ্ধেশ্বর সেন, সুভাষদা, শঙ্খদা, মানবদা, জয়ন্ত সেনের কবিতা ছিল। সুবীরদার ছেলে⎯ সুমন ভট্টাচার্য ব্রেখট-এর কবিতা অনুবাদ করেছিল। সুমন খুব কম বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে বইপাড়ায় আসত। সে নিজেও ছোট থেকেই বইপত্রে অত্যন্ত আগ্রহী। বিবিধ বিষয়ে সুপণ্ডিত শ্রীমান সুমন অধ্যাপনার পাশাপাশি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করে। আমি দে’জ পাবলিশিং থেকে তার দু’টি উপন্যাস ছেপেছি⎯ ‘দশকুমারচরিত’ এবং ‘গাথাসপ্তসতী’। তার সম্পাদিত কয়েকটি বইও দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
সুবীরদার হাত ধরে দে’জে আরেকজন সম্পাদক আসেন⎯ তরুণ পাইন। তরুণদা চাকরি করতেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স-এ। কিন্তু তিনি আসলে গ্রন্থপাগল একজন মানুষ। দুই বাংলার অসংখ্য লেখক-শিল্পীর সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এরকম সুশিক্ষিত ও রুচিমান মানুষের হাতে যে কোনও বই দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। তরুণদা আমাদের জন্য প্রথম যে-কাজে হাত লাগিয়েছিলেন সেটা একটা বড় কাজ ছিল⎯ নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস/ আদি পর্ব’। বইটি সম্পর্কে প্রবোধচন্দ্র সেন লিখেছিলেন⎯ “এটি বাংলার প্রাচীন ইতিবৃত্ত বিষয়ক শেষ বই এবং বাঙালির ইতিবৃত্ত সাধনার চরম পরিণতিও ঘটেছে এটিতেই।… বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য, আলোচনার বিস্তারে এবং দৃষ্টির গভীরতায় আর কোনো বই-এর সঙ্গে তুলনীয় নয়। উইলকিনস্-জোন্স-কোলব্রুক-প্রমুখ বিদেশী মনস্বীদের জ্ঞানাভিযান, বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা, রাজেন্দ্রলাল-হরপ্রসাদের গবেষণা এবং অক্ষয়কুমার-রাখালদাস-রমেশচন্দ্র প্রভৃতির সাধনার ফল পরিণতি লাভ করেছে নীহাররঞ্জনের ‘বাঙ্গালীর ইতিহাসে’। বস্তুত, এই মহাগ্রন্থখানি বাংলার পুরাবৃত্তচর্চার ইতিহাসে একটি মহাযুগের অবসান এবং আর-একটি মহাযুগের আবির্ভাবের সূচনাস্থান।…” তরুণদার সঙ্গে সুবীরদাও এই বইয়ের কাজ করেছেন। তবে আমি দেখেছি কী বিপুল পরিশ্রমে তরুণদা এই বইয়ের জন্য প্রতিটি তথ্যসূত্র মিলিয়েছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে গিয়ে প্রতিটি তথ্য যাচাই করে তবেই এ-বই নতুন করে ছাপা হয়েছিল। ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস/ আদি পর্ব’ দে’জ সংস্করণের আগে শেষবার বেরিয়েছিল সাক্ষরতা প্রকাশনী থেকে।

নীহাররঞ্জনের ছেলে প্রণবদার কথা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রসঙ্গে বলেছিলাম। আমাদের এই বইটির ‘নিবেদন’ অংশে তিনি লিখেছেন⎯
“শোভন সংস্করণ বলতে যা বোঝায় নীহাররঞ্জন রায়-এর বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব-এর তেমন কোনো সংস্করণ আগে কখনও প্রকাশ হয়নি। দে’জ পাবলিশিং-এর একান্ত আগ্রহে এই প্রথম তেমনই একটি সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে।
১৯৪৯-এ প্রথম প্রকাশের পর, ১৯৮০-তে ‘সাক্ষরতা’ সংস্করণের আগে পর্যন্ত বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব-এর কোনো পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ হয়নি। আদি সংস্করণের প্রকাশক দি বুক এম্পোরিঅম, ১৯৫১-তে যা করেন তা’হল ঐ আদি সংস্করণেরই পুনর্মুদ্রণ। লেখক-সমবায়-সমিতি প্রকাশিত বাঙালীর ইতিহাস ছিল লেখক অনুমোদিত ও শ্রীজ্যোৎস্না সিংহরায়কৃত সংক্ষেপিত সংস্করণ। কিন্তু ‘সাক্ষরতা’ সংস্করণে লক্ষ্য করি রচয়িতা তাঁর মুখবন্ধকে ‘তৃতীয় সংস্করণে গ্রন্থকারের নিবেদন’ বলছেন। হওয়া উচিৎ ছিল ‘দ্বিতীয় সংস্করণ…’
… … …
বর্তমান সংস্করণের ভিত্তি রচয়িতার জীবদ্দশায় প্রকাশিত সাক্ষরতা প্রকাশনের উল্লেখিত দু’খণ্ড। সাক্ষরতা প্রকাশনের বইতে যতই মুদ্রণ-প্রমাদ ও অপরাপর অসঙ্গতি থাকুক না কেন, এই সংস্করণটিকে প্রামাণ্য বলে মানতেই হবে। তবু, অধিকতর যুক্তিসম্মত বলে মনে হওয়াতে, বর্তমান সংস্করণে, পূর্বতন ‘সংযোজন’কে বিভক্ত করে প্রাসঙ্গিক অধ্যায়ের শেষেই বিন্যস্ত করা হল।…”
এই বইয়ের জন্য পূর্ণেন্দুদাকে মলাট করতে অনুরোধ করেছিলেন প্রণবদা। পূর্ণেন্দুদা বাংলার মন্দিরের গায়ের কারুকাজের (সম্ভবত বিষ্ণুপুরের) তিনটি ফটোগ্রাফ তরুণদাকে দিয়ে বলেছিলেন, বাঙালি জনজীবনের ছবি দিয়েই মলাট সাজিয়ে নিতে। পূর্ণেন্দুদা বইয়ের নামের ক্যালিগ্রাফিতে পুরনো বাংলা হরফের কোনও বদল করেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল বাঙালির ইতিহাসের ওটাও একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ওটা বদল করা যায় না। দে’জ থেকে নীহাররঞ্জনের আরও দু’টি বই তরুণদার হাতেই তৈরি হয়েছে⎯ ‘ভারতেতিহাস জিজ্ঞাসা’ এবং ‘ভারতীয় ঐতিহ্য ও রবীন্দ্রনাথ’। ২০০৩ সালে নীহাররঞ্জনের জন্মশতবর্ষে এই বইদু’টি শতবর্ষপূর্তি গ্রন্থমালা ১ ও ২ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।

তরুণদা আমাদের আরেকটি বড় ইতিহাস বইয়ের কাজ করেছেন⎯ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’। প্রথমে দু’টি খণ্ডে বেরলেও এখন আমরা বইটির অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশ করেছি। এ-বই নিয়েও নানা অসঙ্গতি তরুণদা দূর করেছেন। সবচেয়ে বড় কাজ ছিল বইয়ের ছবি নিয়ে। বইয়ের নিবেদনে লেখা হয়েছে⎯ ‘প্রথম দুই সংস্করণে ছবি ছিল, পরবর্তী সংস্করণেও আছে কিন্তু ছবির তফাৎ লক্ষ করা যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করার, প্রথম সংস্করণের ছবি মুদ্রণের ও ব্লকের দায়িত্বে ছিলেন সুকুমার রায়, ছাপা হয়েছিল ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স থেকেই। বর্তমান সংস্করণে সে ছবিগুলো ফিরিয়ে আনা হল শুধুমাত্র স্মৃতিস্মারক হিসেবে, কেননা বর্তমান সংস্করণের ছবি মুদ্রিত হল সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে।’

তরুণদার আরেকটি কাজ হল শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘আত্মচরিত’। এই বইয়ের গুরুত্ব অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে এর সংযোজন অংশগুলোর জন্য। শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘আত্মচরিত’ বইটির সঙ্গে দে’জ সংস্করণে সংযোজিত হয়েছে তাঁরই লেখা ‘ইংলন্ডের ডায়েরি’ এবং ‘Men I have Seen’, আর বইয়ের শুরুতে দেওয়া হয়েছে ‘প্রসঙ্গ: শিবনাথ শাস্ত্রী’ নামে একটি অংশ। সেখানে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী, বিপিনচন্দ্র পাল, প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর লেখা।

২০০১ সালে তরুণদা হাত দেন ‘অমিয়ভূষণ রচনাসমগ্র’র কাজে। আমার ধারণা তরুণ পাইনের জীবনের সবচেয়ে বড় কাজগুলোর একটা হল এই বইয়ের পরিকল্পনা এবং প্রথম তিনটি খণ্ড সম্পাদনা করা। অমিয়ভূষণের রচনাসমগ্রের কাজ করার জন্য তিনি অন্তত দু’বার কোচবিহারে অমিয়ভূষণের বাড়ি গিয়েছেন। একবার অপুও গিয়েছিল তরুণদার সঙ্গে। নানা কারণে এই রচনাসমগ্রের সবটা তরুণদা করেননি। তবে যতটুকু করেছেন, তাঁর পরিকল্পনা ও বিস্তৃত গ্রন্থপরিচয় এই গ্রন্থাবলির মর্যাদা বাড়িয়েছে। তরুণদা সাহিত্যের নিবিড় পাঠক হওয়ায় কোন লেখার প্রসঙ্গে কোন লেখা আসতে পারে সে বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট ধারণা আছে। তাই প্রথম খণ্ডে ‘গড় শ্রীখণ্ড’-র গ্রন্থপরিচয়ে তিনি ‘উদ্বাস্তু’ উপন্যাসটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করেছেন। এইরকম সিদ্ধান্ত পাঠকের কাছে লেখকের মনোজগতকে অনেকটা স্পষ্ট করে। তবে তরুণদা দীর্ঘদিন কোনও কাজ করছেন না⎯ এই আক্ষেপ আমার আছে।

এই সময়ের আরেকজন উল্লেখযোগ্য সম্পাদক, যিনি আমাদের জন্য অনেকগুলো উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন এবং এখনও করে চলেছেন তিনি হলেন পুলক চন্দ। ‘জাগরণের চারণ মুকুন্দদাস ও তাঁর রচনাসমগ্র’, ‘নীল বিদ্রোহ’, ‘গণকবিয়াল রমেশ শীল ও তাঁর গান’⎯ এসমস্ত বই দে’জ পাবলিশিং-এর মর্যাদা বাড়িয়েছে।
তবে পুলকদার সবচেয়ে বেশি পরিচিতি সমর সেন বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আমাদের প্রকাশনা থেকে তাঁর সম্পাদনায় ‘বাবুবৃত্তান্ত ও প্রাসঙ্গিক’, ‘অপ্রকাশিত/ সমর সেন/ দিনলিপি ও জুজুকে’, দু’ খণ্ডে ‘অপ্রকাশিত অগ্রন্থিত সমর সেন’ এবং ‘কালের দর্পণে সমর সেন: তথ্যে ও স্মৃতিতে’, ‘পাণ্ডুলিপি থেকে সমর সেনের কবিতা’ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সম্পাদনায় দু’ খণ্ডে ‘অপ্রকাশিত অগ্রন্থিত সমর সেন’ প্রকাশ উপলক্ষ্যে শিশির মঞ্চে যে অনুষ্ঠান হয়েছিল, তাতে শঙ্খদা বলেছিলেন⎯ আমি কারুর-কারুর কাছে শুনেছিলাম গুগলে সমর সেন সার্চ করলে পুলকের ছবি দেখায়! একদিন নিজেই পরখ করে দেখলাম কথাটা মিথ্যে নয়। তবে এটা পুলক নিজের কাজের মাধ্যমে অর্জন করেছে।


পেশাগত জীবনে বর্ধমানের শ্যামসুন্দর কলেজে একসময়ের ইংরেজির অধ্যাপক পুলকদার আরেকটি বড় কাজ হল⎯ ‘জসীউমদ্দীন/ স্মৃতিকথাসমগ্র’। এই বইয়ের প্রকাশকের কথায় আমি লিখেছিলাম⎯
‘জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) বাংলা কবিতায় পল্লীজীবনের রূপকার, নক্সী-কাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট-এর স্রষ্টা, আজও দুই বাংলার সাহিত্যরসিক মানুষের অতি প্রিয় একটি নাম।
জসীমউদ্দীনের উল্লেখযোগ্য অবদান, কবিতার পাশাপাশি, গদ্য রচনাতেও। বিশেষত, বাংলা সাহিত্যের আত্মজীবনী/ স্মৃতিকথার সমৃদ্ধ সমাবেশে তাঁর স্মৃতিচিত্রণগুলি বিরল মর্যাদার অধিকারী। দুই মলাটের ভিতরে সেই সব রচনা সংকলিত করে, আমাদের আত্মকথা গ্রন্থমালার নবতম সংযোজন হিসেবে পাঠকের হাতে তা তুলে দেবার দুর্লভ এক সুযোগ আমরা লাভ করেছি। তার জন্য কবিপুত্র জামাল আনোয়ার-এর কাছে আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। তাঁর সর্বতো সহযোগিতা এবং অদম্য আগ্রহ এই কাজে আমাদের নিরন্তর অনুপ্রাণিত করেছে।
কৃতজ্ঞতা সম্পাদক পুলক চন্দ-র কাছেও। তাঁর পরিশ্রমী সম্পাদনার গুণে গ্রন্থটি যে-বিশিষ্টতা অর্জন করল, এরপর তার যোগ্য স্বীকৃতি রসজ্ঞ পাঠকের কাছ থেকেও মিলবে, এমত আশা পোষণ করতে ইচ্ছে হয় আমাদের।’

প্রসঙ্গত বলে রাখি জসীমউদ্দীনের বই করার কাজে অপু পুলকদার সঙ্গে বাংলাদেশে জসীমউদ্দীনের ফরিদপুরের বাড়িও ঘুরে এসেছিল।
এর আগে একবার তপনমোহন চট্টোপাধ্যায় প্রসঙ্গে লিখেছি। এখানে বলে রাখি ২০২০ সালে পুলক চন্দের সম্পাদনায় দে’জ থেকে দু’ খণ্ডে তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের ‘রচনাসমগ্র’ও প্রকাশিত হয়েছে।


নয়ের দশকের শেষের দিকে একদিন অজয়দা আমাকে বললেন তাঁর বন্ধু শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সঙ্গে কিছু কাজ করতে আগ্রহী। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় কেবলমাত্র একজন সম্পাদক নন, তিনি গ্রন্থনির্মাতা। প্রকাশকও। তাঁর হাত দিয়ে একের পর এক চমৎকার সব বইও বেরিয়েছে থীমা থেকে। তার আগে তিনি অক্সফোর্ড, সীগালের মতো প্রকাশনাতেও গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। শমীকদার হাতে নাটক-থিয়েটার, সিনেমা বা সাহিত্য যে কোনওরকম বই থাকলে সে-বই যে অসাধারণ বই হয়ে উঠবে– এটা প্রায় চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়। এমনকী দে’জ পাবলিশিং-এর এমন বইও আছে যাতে হয়তো শমীকদার নাম নেই, কিন্তু তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। অনেক বইয়ের অসঙ্গতি শেষ মুহূর্তে তিনি ধরিয়ে দিয়ে সংশোধন করিয়েছেন। বাংলার এই অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী সারাজীবন বইপত্রের সঙ্গেই কাটিয়েছেন। তাঁর নিজস্ব সংগ্রহের লাইব্রেরিটিও খুবই সমৃদ্ধ।

দে’জ থেকে শমীকদার প্রথম বই উৎপল দত্ত-র ‘গদ্যসংগ্রহ’র প্রথম খণ্ড। ১৯৯৮ সালে সে-বই প্রকাশের পর দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১১ সালে। শমীকদার সঙ্গে এখন অপুর যোগাযোগটাই বেশি। অজয়জেঠুর মতোই শমীকজেঠুও অপুর খুবই ভরসার মানুষ। দে’জ থেকে ধীরে-ধীরে শমীকদার সম্পাদনায় নভেন্দু সেনের ‘নাট্যসংগ্রহ’ প্রথম খণ্ড, বিজন ভট্টাচার্যের ‘রচনাসংগ্রহ’র প্রথম খণ্ড, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘গদ্যসংগ্রহ’র দু’টি খণ্ড, চিদানন্দ দাশগুপ্তের ‘গদ্যসংগ্রহ’র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। তারও আগে শমীকদার সম্পাদনায় দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তপন সিংহের ‘চলচ্চিত্র আজীবন’। ‘চলচ্চিত্র আজীবন’ বইটি হয়তো শমীকদার কাজের তালিকায় অন্যরকমের কাজ। কিন্তু বইটি যেমন চমৎকার হয়েছিল, সম্পাদকও তেমনই কথাপ্রসঙ্গে একবার অপুকে বলেছিলেন⎯ এই বইটার কাজ করতে গিয়ে বাংলা সিনেমার একটা দিক তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়েছে। এই বইটি যখন হচ্ছে, শমীকদা সেসময় দিনের পর দিন দুপুরে আমাদের বাড়ির দোতলার একটা ঘরে বসে কাজ করেছেন।

২০২২-এ আমি প্রকাশ করেছি সুধীর কাকরের ‘ইয়ং টেগোর/ দ্য মেকিং অফ আ জিনিয়াস’-এর শমীকদার অনুবাদ ‘তরুণ রবি এক প্রতিভার নির্মাণ’।
শমীকদা যে কোনও বইয়ের কাজ একটু সময় নিয়েই করেন, কিন্তু কাজ শুরু হয়ে গেলে তার জন্য সবরকম পরিশ্রম করতে তিনি এই অশীতিপর বয়সেও পিছপা হন না। এটা নতুন বিষয় না, সেই ১৯৯৭ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি আমাকে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন⎯
‘…উৎপল দত্ত গদ্যসংগ্রহের proof ও index কিছুতেই শেষ করতে পারলাম না। আগামী সোমবার সকালে সবটা দিতে পারব। আজ কলকাতার বাইরে যাচ্ছি⎯ সঙ্গে নিয়ে গিয়ে শেষ করে আনব। তারপরও দায় [দয়া] করে একটি চেষ্টা করবেন যাতে বইমেলা শেষ হবার আগে অন্তত বার করা যায়? আপনারা বললে তখন অন্য কোথাও গিয়েও তখন proof দেখে দিতে পারব।
শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়’


উৎপল দত্তের ‘গদ্যসংগ্রহ’ বইমেলার মধ্যেই বেরিয়েছিল বলেই মনে হয়। শমীকদার চিঠিতে এই যে অন্য জায়গায় গিয়ে প্রুফ দেখার প্রসঙ্গ আছে সেটা তিনি এখনও করেন। প্রয়োজনে প্রেসে বসেও তিনি প্রুফ দেখা বা অন্য কোনও কাজ করতে পারেন। একটা বইয়ের জন্য নিজের সবটা দেওয়ার মানসিকতার জন্যই শমীকদার মতো মানুষকে বাংলা বইয়ের সেরা সম্পাদকদের মধ্যে গণ্য করা হয়।

আমার মনে আছে, ২০২১-এ চিদানন্দ দাশগুপ্তের ‘গদ্যসংগ্রহ’ প্রকাশের সামান্য কয়েকদিন আগে তিনি সকালের দিকে আমাদের বিদ্যাসাগর টাওয়ারের নতুন দোকানে এসে বসেন। তখনও খানিকটা ফাইনাল প্রুফ দেখা বাকি ছিল⎯ এদিকে গ্রন্থপ্রকাশের অনুষ্ঠান দিন তিনেকের মধ্যেই। দুপুর-বিকেল পর্যন্ত প্রুফ দেখে তিনি বাংলা আকাদেমি বা কোথাও একটা অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে যাবেন⎯ সেকথা আগেই অপুকে জানিয়ে রেখেছিলেন। অপু সেইমতো অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা রাখে। সেই বক্তৃতা শেষে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় ফের বিদ্যাসাগর টাওয়ারে আসেন এবং মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করে বইটির প্রিন্ট অর্ডার দিতে বলেন।
লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……
পর্ব ৮৩। বই-চিত্রের বৈচিত্র
পর্ব ৮২। পূর্ণ ইন্দু পরকাশে
পর্ব ৮১। পাঠকদের উন্মাদ দাবি: চাই কথোপকথনের নতুন খণ্ড!
পর্ব ৮০। কলকাতা: পূর্ণেন্দু সংস্করণ
পর্ব ৭৯। নানা রঙের নবনীতা
পর্ব ৭৮। প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই এঁকেছিলেন নবনীতা দেবসেন
পর্ব ৭৭। অপরাজিতা দেবীকে ছদ্মনামে পুরুষ কবি ভেবেছিলেন পাঠক
পর্ব ৭৬। বিদেশেও সমাদৃত হয়েছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর উপন্যাস
পর্ব ৭৫। নারীকলম: দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৭৪। বই-মানবী
পর্ব ৭৩। প্রেসের কাজে গাফিলতি দেখলে কড়া চিঠি লিখতেন সুবীরদা
পর্ব ৭২। করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ
পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা
পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান
পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ
পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন
পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ
পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!
পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!
পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়
পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়
পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়
পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!
পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু
পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না
পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম
পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না
পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী
পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা
পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা
পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়
পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল
পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি
পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্সা’
পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়
পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’
পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল
পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!
পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই
পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি
পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত
পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী
পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের
পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়
পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!
পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!
পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো
পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন
পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved