


অনুষ্ঠানে গুলজারজি তাঁর কথায় রবীন্দ্রনাথের যেসব কবিতার কথা তুলেছিলেন, পরে একদিন অপুকে শঙ্খদা বলেছিলেন ওই সব কবিতার কথা গুলজারের মুখে শুনে তিনি খানিকটা অবাকই হয়েছিলেন। কারণ অনেক বাঙালির মতে ওগুলো রবীন্দ্রনাথের প্রতিনিধিত্বমূলক কবিতা নয়। শঙ্খদা পাশের ঘর থেকে তাঁর সম্পাদিত ‘সূর্যাবর্ত’ বইখানির একটি কপি হাতে করে এনে অপুকে দেখিয়েছিলেন যে, গুলজারের উল্লেখ করা কিছু কবিতা তিনি ‘সূর্যাবর্ত’ বইতে রেখেছিলেন।
৮৭.
দে’জ পাবলিশিং থেকে সিনেমার বইপত্র প্রকাশে নতুন জোয়ার আসে অপু প্রকাশনায় আসার পর। আমার যেমন ছেলেবেলা থেকেই যাত্রার ওপর টান– অপুর তেমনই সিনেমায় আকর্ষণ। যখন কলেজে পড়ত, তখন থেকেই দেখেছি কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সে নিয়মিত দর্শক। নতুন শতকে পাঠকের রুচি যেমন বদলেছে– তেমনই সিনেমা-গান-নাটকের মুখ ও বিষয় বদলেছে। অপু প্রথম থেকেই চেষ্টা করে গেছে সিনেমা-কেন্দ্রিক ভালো বই করতে। আগেই আমি শমীকদার (শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়) সম্পাদনায় প্রকাশিত তপন সিংহের ‘চলচ্চিত্র আজীবন’ বইটার কথা বলেছি। ২০০৮ সালে বইমেলার সময় দে’জ থেকে অপুর উদ্যোগে প্রকাশিত হয় নবেন্দু ঘোষের স্মৃতিকথা– ‘একা নৌকার যাত্রী’। এর আগে একবার অজয়দা (অজয় গুপ্ত) চেয়েছিলেন নবেন্দু ঘোষের রচনাসমগ্র দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশ করতে। তিনি নবেন্দুবাবুর সঙ্গে কথা বলে কাজ শুরুও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু নানা কারণে সেই কাজটা আর হয়ে ওঠেনি। আমি অবশ্য ১৯৯৭ সালের বইমেলার সময় সুব্রত চৌধুরীর প্রচ্ছদে দে’জ থেকে ‘নবেন্দু ঘোষের শ্রেষ্ঠ গল্প’ প্রকাশ করেছিলাম। নবেন্দু ঘোষ ২০০২-এর ৩১ মার্চ থেকে ২০০৩-এর ২৫ মে পর্যন্ত ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর রবিবারের পাতায় ‘একা নৌকার যাত্রী’ নামে ধারাবাহিকভাবে একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলেন। সেই লেখাটিকেই অজয়দার সম্পাদনায় ২০০৮-এর বইমেলায় প্রকাশ করা হয়। তবে পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত অংশের বাইরে– আত্মচরিতের বাকি অংশটার পাণ্ডুলিপি– যা আয়তনে পত্রিকায় প্রকাশিত অংশের প্রায় সমান– ২০০৭-এর ১২ অক্টোবর তিনি আমাদের দেন। অজয়দা দ্রুত সঙ্গে কাজ শুরু করেন, কিন্তু নবেন্দু ঘোষ বইটি দেখে যেতে পারেননি। কেননা সে বছরের ১৫ ডিসেম্বর তিনি প্রয়াত হন।

নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে নবেন্দু ঘোষ নামটা তেমন পরিচিত নাও লাগতে পারে। নবেন্দুবাবু সম্পর্কে অজয়দা তাঁর ‘ভূমিকার পরিবর্তে’ শিরোনামের লেখাটিতে লিখেছেন– “…‘একা নৌকার যাত্রী’-র গন্তব্য কিন্তু দ্বিমুখী। পালাক্রমে দুই ঘাটে এই নৌকার যাত্রা-বিরতি। এক, সাহিত্য। দুই, সিনেমা। এক ঘাটে জীবনের ‘প্রথম প্রেমের’ অমলিন স্বপ্নিল হাতছানি। অন্য ঘাটে জীবিকার অমোঘ আহ্বান। সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে যেটা আমরা লক্ষ করি, তা হল, দু’টি ক্ষেত্রেই তাঁর অবিস্মরণীয় উত্তরণ। সাহিত্যের ভাণ্ডার যেমন তাঁর লেখা ‘ডাক দিয়ে যাই’, ‘ফিয়ার্স লেন’, ‘আজব নগরের কাহিনী’র মতো উপন্যাস; ‘পোস্টমর্টেম’, ‘এই সীমান্ত’, ‘কান্না’র মতো গল্পসংকলনের কালজয়ী সম্ভারে সমৃদ্ধ, অন্যদিকে তেমনি ‘পরিণীতা’, ‘বন্দিনী’, ‘সুজাতা’, ‘দেবদাস’, ‘মঝ্লি দিদি’, ‘তিসরি কসম’, ‘অভিমান’-এর মতো চিরস্মরণীয় চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার, তথা ‘তৃষাগ্নি’র মতো ব্যতিক্রমী ছবির পরিচালক হিসেবে তাঁর কিংবদন্তিতুল্য সাফল্য। এদিক থেকে দেখলে, শ্যাম ও কূল একইসঙ্গে বজায় রাখার এক অনন্য নজির এই জীবনকাহিনী।”

প্রথম জীবনে লেখক নবেন্দু ঘোষ সফল হলেও হিন্দি ছবির চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। তাঁর চিত্রনাট্যে হওয়া ছবিগুলির মধ্যে বিমল রায়ের পরিচলনায় ১৯৫৫ সালের ‘দেবদাস’ ছবির নায়ক ছিলেন দিলীপকুমার। ছবিতে চন্দ্রমুখী আর পার্বতীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বৈজয়ন্তী মালা আর সুচিত্রা সেন। সুচিত্রা সেনের এটিই প্রথম হিন্দি ছবি। ‘তিসরি কসম’ আমার নিজের খুব পছন্দের সিনেমা। রাজ কাপুর আর ওয়াহিদা রহমানের জুটিতে ১৯৬৬ সালে এই ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন বাসু ভট্টাচার্য। নবেন্দুবাবু এই ছবির চিত্রনাট্যের কাজ করেছিলেন মূল গল্পটির লেখক ফণীশ্বরনাথ রেণুর সঙ্গে যৌথভাবে। আর হৃষীকেশ মুখার্জির ১৯৭৩ সালে অমিতাভ বচ্চন আর জয়া ভাদুড়ীকে নিয়ে করা ‘অভিমান’ ছবিটি যৌবনে দেখার স্মৃতি আমার আছে। এই ছবিতেও রাজিন্দর সিং বেদী-সহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে নবেন্দু ঘোষ চিত্রনাট্য লেখেন। অথচ নবেন্দু ঘোষ কিন্তু শচীন ভৌমিকের মতোই ঘটনাচক্রে সিনেমা জগতে ঢুকে পড়েন। সিনেমার কাজে যুক্ত হওয়ার আগে লেখক হিসেবে তাঁর খ্যাতির কথা তো বললাম, ইংরেজ আমলে ‘ডাক দিয়ে যাই’ উপন্যাসটি লিখে নবেন্দুবাবু ‘রাজদ্রোহমূলক রচনা’র অপরাধে সরকারি চাকরি খুইয়েছিলেন। লেখক হিসেবে তিনি প্রগতি শিবিরের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাঁর বম্বে যাওয়ার কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন ‘একা নৌকার যাত্রী’তে–

‘ইংরেজি ১৯৫১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। ধাবমান ট্রেনের চারদিকে সূর্য অস্তগামী। বম্বে মেল ভায়া নাগপুরের একটা ফার্স্ট ক্লাস কামরায় আমরা চারজন বসে আছি। যাচ্ছি বোম্বাই, ‘উদয়ের পথে’র যশস্বী চিত্রপরিচালক বিমল রায়ের সঙ্গে। তিনি যাচ্ছেন বম্বে টকিজের হয়ে একটি ছবি করতে। ভারত-বিখ্যাত অভিনেতা অশোককুমার, যিনি এখন বম্বে টকিজের মেজর শেয়ারহোল্ডার এবং চিফ প্রোডিউসার, তাঁর আমন্ত্রণে।
আমরা চারজন মানে বিমল রায়ের ইউনিট-এর একাংশ। অসিত সেন, তাঁর প্রধান সহকারী (যে পরে বিখ্যাত হাস্যাভিনেতায় রূপান্তরিত হয়), দলের এডিটর হৃষীকেশ মুখার্জি (যে পরে হিন্দি চলচ্চিত্রের এক বড় চিত্রপরিচালক ও বড় নাম হয়ে ওঠে), পল মহেন্দ্র (নিউ থিয়েটার্সের মাইনে করা এক ভালো অভিনেতা, যে সেই কাজ ছেড়ে দিয়ে বম্বে যাচ্ছে বিমল রায়ের এক সহকারী হিসেবে কাজ করার জন্য) এবং আমি, নবেন্দু ঘোষ, দলের চিত্রনাট্যকার এবং আর একজন সহকারী।’
বিমল রায় চার সহযোগী নিয়ে সপরিবার বম্বে যাচ্ছিলেন ‘মা’ ছবির কাজ করতে। ১৯৫২ সালে মুক্তি পাওয়া সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন লীলা চিটনিস এবং ভারতভূষণ। মুম্বই গিয়ে প্রথমবার অশোককুমারের ওরলির বাড়িতে বিমল রায় যখন নবেন্দুবাবুর পরিচয় করিয়ে দেন অশোককুমারের সঙ্গে, তখন নবেন্দুবাবুর ‘প্রোগ্রেসিভ’ লেখক পরিচয় শুনে অশোককুমার বলেছিলেন– ‘বটে!’ … ‘প্রোগ্রেসিভ লেখক, কথাটা তো ভাল শুনতে, বেশ বেশ, আপনার লেখা পড়ব। ওয়েলকাম টু বম্বে টকিজ। আমাদের ভাল লেখক অনেক চাই।’” নবেন্দুবাবু সারাজীবনে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। সেরা চিত্রনাট্যের জন্য ‘ফিল্ম ফেয়ার’ প্রথম যেবার পুরস্কার দেয় (১৯৬৯)– সেবার তিনিই সে পুরস্কার পেয়েছিলেন ‘মঝ্লি দিদি’ ছবির চিত্রনাট্যের জন্য। আর সাহিত্যের জন্য ২০০৬ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বঙ্কিম পুরস্কারে ভূষিত করে। সেই অনুষ্ঠানে রাজ্যের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিজে এসে নবেন্দুবাবুর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন। ‘একা নৌকার যাত্রী’ বইটার কাজ শুরুর সময় নবেন্দু ঘোষ অজয়দার কাছে তিনটি দাবি করেছিলেন– প্রথমত, বইয়ের মলাটে যেন একটা নৌকার ছবি থাকে; দ্বিতীয়ত, বইটা তিনি নিজের মেয়ে রত্নোত্তমাকে উৎসর্গ করতে চান; তৃতীয়ত, বইয়ের শেষ পাতায় ছাপার জন্য তিনি নিজের একটি বিশেষ ছবি তিনি বেছে দিয়েছিলেন– আমাদের বইতে তাঁর সবগুলি ইচ্ছেই পূরণ করা হয়েছে।

এরপর অপু ২০১০-এর বইমেলায় দে’জ থেকে প্রকাশ করে একালের বিশিষ্ট সুরকার শান্তনু মৈত্রের বই ‘ফেরারি মন’। এর আগের বছরই বাংলা ‘অন্তহীন’ আর হিন্দি ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবি দু’টির সুরে শান্তনু গোটা দেশে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। অপুকে এই বইটি করার প্রস্তাব দেন বাংলা ব্যান্ড ‘চন্দ্রবিন্দু’-র অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় অবশ্য নিজে ছবি পরিচালনাও করেছেন, সর্বোপরি তিনি এই মুহূর্তে প্রতি রবিবার ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর সঙ্গে দেওয়া ‘রোববার’ পত্রিকার সম্পাদক। ২০১২-র বইমেলায় দে’জ পাবলিশিং থেকে অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম বই প্রকাশিত হয়– ‘নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা’। তারপর একে একে প্রকাশিত হয়েছে– ‘একদিনব্যাপী’, ‘চিরিখানা’, ‘বকলস’, ‘জাম্বু’। ‘রোববার’ পত্রিকায় তাঁর সম্পাদকীয় কলাম ‘অকিঞ্চিৎ’-এর তিনটি সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে। শান্তনু মৈত্রর ‘ফেরারি মন’ বইটির কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজারে, আর কিছু লেখা হিন্দুস্থান টাইমসের মুম্বই সংস্করণে। গোটা বইটি নির্মাণ ও রূপান্তরের কাজ করেছিলেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়। প্রবাসী বাঙালি শান্তনু মৈত্র এই বই লেখার উদ্দেশ্য নিজেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন–

‘কেন বাংলা বই? কারণ আমি বাঙালি, আর পৃথিবীর সব আনাচেকানাচে বাঙালি থাকে। কেনিয়ায় যদি বাঙালি হাতির দাঁতের ব্যবসা করতে পারে, তা হলে সাহারায় উটের দুধ বেচতে পারে না? সব জায়গায় পুজোর শেষের শান্তিজলের মতো ছিটিয়ে থাকে বাঙালি। বাঙালি বেড়ায় আর শীতের রোদ পিঠ দিয়ে আরাম নেওয়ার মতো করে উপভোগ করে জীবন।
…
আরও একটা কথা। বলিউডের মিউজিক ডিরেক্টর বাংলায় বই লিখে সাহিত্যিক হতে চাইছে– এ নাম বা বদনাম কোনওটাই চাই না। বইটা সাহিত্যমূল্য দিয়ে বিচার করবেন না, লেখকের এই আর্জি। আমি মাঝে মাঝেই হুটহাট বেরিয়ে গিয়েছি জীবনটাকে চিনব, চেখে দেখব বলে। সেই অজানা-অচেনা রাস্তাগুলোয় কখনও কুড়িয়ে পেয়েছি চকমকি পাথর, কখনও আলোর বল, কখনও সাতরঙা ভিবজিয়োর– সেগুলোই শব্দের আঁকিবুকিতে এই বইয়ের পাতায়।
আমার কথা পড়ে যদি এক জনও জীবনকে জড়িয়ে ধরে, এক জনও তরতরে সবুজ পাতা কিংবা রাস্তার ধারে অচেনা রামপেয়ারের সঙ্গে গল্পো জুড়ে দেয়, জানব আমি এক জন হ্যাপি অথর।’

শান্তনু মৈত্রর বইটির একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল বইমেলার মাঠেই। এসবিআই অডিটোরিয়ামের অনুষ্ঠানে সেদিন লেখক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরী, গায়ক বাবুল সুপ্রিয় প্রমুখ বিশিষ্টরা। ২০১২-য় দে’জ থেকে প্রকাশিত হয় আমার আরেকটি পছন্দের বই– পরিচালক অসিত সেনের স্মৃতিকথা ‘সোনালি স্মৃতির রেখা’। এই বইয়ে প্রকাশকের নিবেদনে আমি লিখেছিলাম–
‘স্মৃতির সোনালি রেখা প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক প্রয়াত অসিত সেনের চলচ্চিত্রজীবনাশ্রিত স্মৃতিকথন। এই পর্যায়ে এটি আমাদের তৃতীয় প্রকাশনা। এর আগে আমরা চলচ্চিত্রশিল্পের দুই অগ্রগণ্য ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব প্রয়াত নবেন্দু ঘোষ-এর একা নৌকার যাত্রী এবং প্রয়াত তপন সিংহ-র চলচ্চিত্র আজীবন গ্রন্থ দু’টি প্রকাশ করেছি– যা ইতিমধ্যে সুধী পাঠকসমাজ সাদরে গ্রহণ করেছেন।

বর্তমান গ্রন্থে বিশিষ্ট চিত্রপরিচালক অসিত সেন কথকতার ভঙ্গিতে, অত্যন্ত ঘরোয়া ভাষায় যে-ভাবে তাঁর প্রায় চার-দশকব্যাপী বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রজগৎ থেকে আহরিত বিপুল ও বিচিত্র, আনন্দ ও বেদনামাখা অভিজ্ঞতার ঝুলি উজাড় করে দিয়েছেন, তা প্রায় নিকট-অতীত-দৃশ্যের চলচ্চিত্ররূপেই পাঠকের কাছে প্রতিভাত হবে। নিতান্ত নির্মোহ ভঙ্গিতে চলচ্চিত্রজগতের এ-যাবৎ অজ্ঞাত অনেক তথ্যই যে তিনি অবারিত করেছেন, তা নয়, পড়তে পড়তে পাঠক ফেলে-আসা-সময়ের অনেকগুলো ভুলে-যাওয়া কণ্ঠস্বর নতুন করে শুনতে পাবেন, যা তাঁকে তাঁর অজ্ঞাতসারেই স্মৃতিমেদুর করে তুলবে।…’

‘স্মৃতির সোনালি রেখা’ বইটি অনুলিখনের কাজ করেছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র সাংবাদিক নির্মল ধর। এই লেখাটিও ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর পাতায় প্রথম প্রকাশিত। নির্মলবাবু তাঁর ‘নিবেদন’ অংশে জানিয়েছেন– “আমি তখন ‘সংবাদ-প্রতিদিন’-এর সঙ্গে যুক্ত। অগ্রজ প্রবীণ সাহিত্যিক প্রফুল্ল রায়– একদিন ডেকে বললেন– ‘একবার অসিত সেনের সঙ্গে দেখা কর তো! ওঁর কী প্ল্যান আছে বলবেন।’ এর আগে একাধিকবার তাঁর কাছে গিয়েছি– কোনও ফল হয়নি। কিঞ্চিৎ হতাশায় ও অভিমান নিয়েই বলতেন– ‘আমার কথা কে আর শুনবে? কত বড় বড় ডিরেক্টররা রয়েছে তোমাদের! আমি তো আর বিদেশ থেকে পুরস্কার আনিনি!’ প্রফুল্লবাবুর নির্দেশ অনুযায়ী গেলাম একদিন বাঁশদ্রোণীতে ওঁর ফ্ল্যাটে। দিদি তখন তাঁর সঙ্গী। ভাই-বোনের সুন্দর সংসার। দেখা করার উদ্দেশ্য বলতেই অসিতবাবু বললেন– ‘আমি তো প্রফুল্লবাবুকে বলেইছি শুধু একটি ইন্টারভিউ নয়, নিজের কথা নিজের মতো করে লিখব। তুমি শুধু আমায় সাহায্য করো।’ প্রায় এক বছর ধরে তারপর থেকে সপ্তাহে এক-দু’দিন করে তাঁর কাছে যাওয়া– টেপ-এ ধরে রাখা তাঁর জীবন, ইতিহাস, গল্প সবই। ধারাবাহিকভাবে শনিবারের ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ সেই লেখা বেরিয়েছিলও প্রায় পঞ্চাশ সপ্তাহ।” ‘পঞ্চতপা’, ‘জীবনতৃষ্ণা’, ‘দীপ জ্বেলে যাই’, ‘আগুন’, ‘স্বরলিপি’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’র মতো বাংলা আর ‘খামোশী’র মতো হিন্দি ছবির পরিচালককে আমরা বাঙালিরা হয়তো যথাযথ সম্মান জানাতে পারিনি। তা নিয়ে অসিত সেনের মনে একটা ক্ষোভ ছিল। কিন্তু নির্মল ধর এই বইটির মাধ্যমে গত প্রজন্মের সেরা এক চিত্র পরিচালককে যথাযথ শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েছেন বলেই আমার মনে হয়। এই বইয়ের শেষে নির্মলবাবু অসিত সেনের কয়েকটি সাক্ষাৎকার সংযোজন করেছেন। তার মধ্যে একটা অপু উদ্ধার করেছিল কলকাতা দূরদর্শন থেকে– এই কথাটা আমার মনে আছে।

দে’জ থেকে এরপরের বইটি এমন একজনের লেখা যাঁকে গোটা ভারত একডাকে চেনে– তিনি এক এবং অদ্বিতীয় গুলজারজি। গুলজারজি বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন মানুষ। তিনি একাধারে কবি, লেখক, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সংলাপ লেখক। বিমল রায়ের সহকারী হিসেবে সিনেমা জগতে তাঁর কর্মজীবন শুরু। গীতিকার হিসেবে প্রথম গান লেখেন বিমল রায়ের ছবি ‘বন্দিনী’ (১৯৬৩)-তে। পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম ছবি ‘মেরে আপনে’ মুক্তি পায় ১৯৭১ সালে। তারপর পরিচালক গুলজারের একের পর এক বিখ্যাত ছবি মুক্তি পায়– ‘আঁধি’, ‘পরিচয়’, ‘মৌসম’, ‘ইজাজত’, ‘মাচিস’ ইত্যাদি। তিনি উর্দু-হিন্দুস্তানি ভাষার এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, যাঁর কাব্য সংকলনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘পোখরাজ’, ‘রাত পসমিনে কি’ ইত্যাদি। তাছাড়া তাঁর ছোটগল্পের সংকলন ‘রাবি পার’, ‘ধুয়া’-ও বহু আলোচিত। গুলজার অন্তত ২০বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পেয়েছেন, সাতবার পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, পদ্মভূষণ সম্মানও। ২০০৮-এ তাঁর গান ‘জয় হো’র (‘স্লাম ডগ মিলিওনেয়ার’) জন্য গুলজারকে অস্কার পুরস্কার দেওয়া হয় এবং ২০১০ সালে তিনি পান গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। ভারত সরকার ২০১৪ সালে তাঁকে চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে প্রদান করেছে।

গুলজারজির প্রথম যে বইটা আমরা প্রকাশ করি সেটি ধারাবাহিকভাবে আনন্দবাজারে প্রকাশিত হয়েছিল– ‘পান্তাভাতে’। ‘পান্তাভাতে’ গুলজারজির সংক্ষিপ্ত স্মৃতিকথা। শান্তনু মৈত্রর ‘ফেরারি মন’-এর মতো এই বইটিও নির্মাণ করেছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়। সঞ্চারী একজন নামী সাংবাদিক, তিনি একসময় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় কাজ করেছেন, এখন ‘ডাকবাংলা.কম’ অনলাইন ম্যাগাজিনের সম্পাদক তিনি। সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়ের লেখার হাত অসামান্য। দে’জ পাবলিশিং থেকে তাঁর দুটি বইও প্রকাশিত হয়েছে– ‘একটা কষ্ট লজ্জা ভয়’ এবং ‘কিছু সিরিয়াস কিছু ঝিকমিক’। ‘পান্তাভাতে’র ভূমিকায় লেখক জানিয়েছেন–

“আমার বই বাংলা ভাষায় দেখতে খুব ভাল লাগে। উর্দু ছাড়া বাংলাই আমার সবচেয়ে প্রিয় ভাষা কিনা। হিন্দির টানে ‘গরম চায়ে’ বলার চেয়ে গোল গোল মিষ্টি বাংলায় আমি ‘গরোম চা’ বলতেই বেশি পছন্দ করি।
আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি, যাঁর কবিতা বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতিতে আমায় আকৃষ্ট করেছিল। এবং অবশ্যই আমার গুরু বিমল রায়ের প্রতি, যাঁর ছায়ায় আমার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বোধ সমৃদ্ধ হয়েছিল। আমার স্ত্রী’র অবদানও অনেক, যাঁর জন্য আমি বাংলা ঝরঝরিয়ে লিখতে পড়তে শিখে গিয়েছিলাম– প্রেমপত্র লেখার সুবাদে।
ভবিষ্যতে কখনও আমি বাংলায় কবিতা লিখব। উর্দু থেকে বাংলায় অনুবাদ করা কবিতা হবে না সেগুলো।
সঞ্চারীকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ও ধৈর্য ধরে তিনটে ভাষায়, মানে বাংলা, ইংরেজি আর হিন্দিতে মেশানো আমার অনর্গল স্মৃতিচারণ শুনে সে-কথা সুন্দর বাংলায় অপূর্ব করে গুছিয়ে লিখেছে।
এইসব লেখা জীবনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মেদুর স্মৃতিমন্থন। এঁদের অনেকের কাছে আমি অনেক কিছু শিখেছি, অনেকে আমায় পথ দেখিয়েছেন, অনেকে আমার সাথী ছিলেন, সহকর্মী ছিলেন, কমরেড ছিলেন, এবং অনেকে শিক্ষকও ছিলেন।…’
প্রসঙ্গত, গুলজারজির স্ত্রী– যাঁর কারণে তাঁর ‘ঝরঝরিয়ে’ বাংলা লিখতে ও পড়তে শেখা বলে তিনি উল্লেখ করেছেন– তিনি হলেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী রাখী গুলজার।

গুলজারজির ‘পান্তাভাতে’ আর তাঁর কবিতার বই ‘প্লুটো’র শেখ সদর নইমের করা বাংলা অনুবাদ– দুটোই প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৭-র আগস্টে। ‘প্লুটো’ বইটির ভূমিকায় চোখ রাখলে গুলজারজির কবিসত্তার খানিকটা চেনা যায়। শেখ সদর নইমের অনুবাদে ‘প্লুটো’র ভূমিকায় লেখা হয়েছে–
“গ্রহ হিসেবে প্লুটো সম্প্রতি তার মর্যাদা হারিয়েছে। বৈজ্ঞানিকরা বলেন, ‘দূরে থাকো তুমি, আমরা তোমায় নয়টি গ্রহের পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি না।’
বহুকাল আগে আমার পরিবারে আমার জায়গা আমি হারিয়েছিলাম। আমার পরিবারের তরফে বলা হয়েছিল, ‘ব্যবসায়ীদের পরিবারে মিরাসি’র প্রয়োজন কী?’ নিঃশব্দে উচ্চারিত হয়েছিল, তুমি আমাদের কেউ নও। প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্লুটোর দুঃখে আমার মন ভারাক্রান্ত। কত দূরে… কত ছোট… তাই আমার ক্ষুদ্র কবিতাগুলি তাকে উপহার দিলাম।
কিছু কিছু মুহূর্ত খুবই ছোট হয়, হারিয়েও যায়। কিন্তু এগুলি সযত্নে জমিয়ে রাখার শখ আমার। বিষয়ের দিক থেকে এই কাব্যের বহু কবিতা প্রথাগত নয়। তবে সেটাই বা মন্দ কী?”

গুলজারজির আরও দুটো কবিতার বাংলা অনুবাদের বই পরে দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি– ‘সন্দেহজনক কবিতা’, অনুবাদ করেছেন সন্দীপন চক্রবর্তী। ২০১৯-এ প্রকাশিত এই বইটির দু’টি বিশিষ্টতা আছে– প্রথমত, কবির ইচ্ছা অনুযায়ী এই বইয়ের ভূমিকাটি শঙ্খ ঘোষের; দ্বিতীয়ত, এই বইয়ের এক পাতায় নাগরি লিপিতে মূল উর্দু কবিতাটি ছাপা হয়েছে, আর পাশের পাতায় আছে সেই কবিতার অনুবাদ। অন্য বইটি– ‘চাঁদের চিবুক ছুঁয়ে’ অর্ঘ্য দত্তের অনুবাদ। ‘চাঁদের চিবুক ছুঁয়ে’ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৩ সালে। এই বইতে মূল কবিতাটি আর নাগরি লিপিতে নয়, ছাপা হয়েছে বাংলা হরফেরই এবং পাশের পাতাতে যথারীতি বাংলা অনুবাদটি আছে। এই বইয়ের জন্য গুলজারজি একটি ছোট্ট ‘Poet’s note’-এ লিখেছেন–
‘I have been writing poems of my passion and experiences of life.
But then I have written a lot of poetry for films too as commissioned.
Thus I have mixed a lot of water into the milk.
Arghya Dutta, is like the proverbial Swan for me.
He could separate milk from the water… He selected some of my poems of real passion, and translated them in Bengali.’

প্রসঙ্গত বলে রাখি ‘চাঁদের চিবুক ছুঁয়ে’ নামটি গুলজারজির অনুমোদন নিয়েই রাখা হয়েছে। মুম্বইয়ের একটি ক্যাফেতে এই বইটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হয়েছিল। আমি সে অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি, কিন্তু অপু গিয়েছিল। সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো ব্যাপার হল সেই অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে সঞ্চালনার কাজ করেছিল আমার ভাই বাবুর মেয়ে গুড্ডি (সুহৃতা)। আমাদের আদরের মেয়ে গুড্ডি আর তার স্বামী কাজের সূত্রে এখন মুম্বই প্রবাসী।


বই উদ্বোধনের সূত্রে মনে পড়ে গেল ‘পান্তাভাতে’ আর ‘প্লুটো’ বই দু’টির উদ্বোধন উপলক্ষে নন্দন-১ প্রেক্ষাগৃহে একটা বিশেষ অনুষ্ঠান হয়েছিল ‘গুফতগু উইথ গুলজার’। গুলজারজির জন্মদিন ১৮ আগস্ট, কিন্তু আমরা তাঁর জন্মদিনে সেই অনুষ্ঠান করতে পারিনি, অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ২০১৭-র ২৬ আগস্ট। আমার এত বছরের অভিজ্ঞতায় বইয়ের উদ্বোধনে এমন বিপুল সংখ্যক মানুষকে উপস্থিত হতে দেখিনি। সেদিন প্রেক্ষাগৃহে তিলধারণের জায়গা ছিল না। মানুষ বসার জন্য খালি চেয়ার না পেয়ে মেঝেতেও বসে পড়েছিলেন। অনুষ্ঠানে পৌঁছে গুলজারজি নিজেও এত মানুষ দেখে অবাক হয়েছিলেন। কলকাতায় আসার আগেই গুলজারজি অপুকে জানিয়েছিলেন পরিচালক তরুণ মজুমদার, পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, অভিনেতা-পরিচালক অর্জুন চক্রবর্তী, পরিচালক সন্দীপ রায় এবং অভিনেত্রী রাইমা সেনকে যেন অবশ্যই আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদের সকলকেই আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম, সকলেই এসেছিলেন সেদিনের অনুষ্ঠানে।

মুম্বই থেকে সেদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন শান্তনু মৈত্র। কবি শ্রীজাতও ছিলেন। গুলজারজির বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার গড়ে ওঠার বড় কারণ যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, তা তো তিনি নিজেই লিখেছেন– রবীন্দ্রনাথের কবিতা উনি অনুবাদও করেছেন। আমি শুনেছি তাঁর মুম্বইয়ের বাড়িতে বসার ঘরে বিভিন্ন ভাষায় রবীন্দ্রনাথের বই রাখা আছে। সেদিনের অনুষ্ঠানে বই উদ্বোধন ছাড়া ছিল দু’টি অংশ– একটি অংশে তিনি সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বসে ‘পান্তাভাতে’ নিয়ে কথা বলেন, আর দ্বিতীয় ভাগে শান্তনু মৈত্রর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে কথা বলেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমরা শঙ্খদাকে (শঙ্খ ঘোষ) আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। আমার এখনও মনে আছে বিপুল জনতার কলরবে যখন ভালো করে অনুষ্ঠান শুরু করা যাচ্ছে না, তখন শঙ্খদা উঠে মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে বলেন– আমরা বোধহয় আরেকটু ধৈর্য দেখাতে পারি। তাঁর এই কথাতেই ম্যাজিকের মতো কাজ হয়। বিপুল সংখ্যক দর্শক-শ্রোতা মুহূর্তে চুপ করে যান, অনুষ্ঠানও শুরু হয় নিজের ছন্দে। সেদিনের অনুষ্ঠানে শঙ্খদা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সারাক্ষণ উপস্থিত ছিলেন। সেদিনের অনুষ্ঠানে গুলজারজি তাঁর কথায় রবীন্দ্রনাথের যেসব কবিতার কথা তুলেছিলেন, পরে একদিন অপুকে শঙ্খদা বলেছিলেন ওই সব কবিতার কথা গুলজারের মুখে শুনে তিনি খানিকটা অবাকই হয়েছিলেন। কারণ অনেক বাঙালির মতে ওগুলো রবীন্দ্রনাথের প্রতিনিধিত্বমূলক কবিতা নয়। শঙ্খদা পাশের ঘর থেকে তাঁর সম্পাদিত ‘সূর্যাবর্ত’ বইখানির একটি কপি হাতে করে এনে অপুকে দেখিয়েছিলেন যে, গুলজারের উল্লেখ করা কিছু কবিতা তিনি ‘সূর্যাবর্ত’ বইতে রেখেছিলেন। যদিও ‘সূর্যাবর্ত’ প্রকাশের পর সেই কবিতাগুলো রাখার জন্য কেউ-কেউ তাঁর সমালোচনাও করেছিলেন। গুলজারজির বই প্রকাশ উপলক্ষে ‘সংবাদ প্রতিদিন’ এবং দে’জ পাবলিশিং-এর উদ্যোগে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। সেই সঙ্গে আমার শ্যালক বিশ্বজিৎ চন্দের পরিকল্পনায় নন্দন-২ প্রেক্ষাগৃহের সামনে গুলজারজির জীবন ও কাজ নিয়ে একটি এগজিবিশনও করা হয়েছিল। সেই এগজিবিশন ঘুরে দেখে গুলজারজি বলেছিলেন তাঁকে নিয়ে এমন কাজ আগে কখনও হয়নি।

গুলজারজির বই উদ্বোধন উপলক্ষে তৈরি করা পুস্তিকাটির নামকরণ করেছিলেন শ্রীজাত– ‘গুলজারিশ’। কিন্তু বই ছাপার পাঁচ-সাতদিন আগেও তার মলাট ঠিক করা যায়নি। শেষে অপু মুম্বইতে ফোন করে বিশিষ্ট শিল্পী সমীর মণ্ডলকে। সমীর মণ্ডল অনেকদিন আগে দে’জের বইয়ের মলাট করেছেন– সেকথা আমি বলেছি। অপু সমীরদাকে বলে আপনি তো অনেকের পোর্ট্রেট এঁকেছেন, গুলজারের কোনও পোর্ট্রেট কি আছে? উত্তরে সমীরদা জানান গুলজারের পোর্ট্রেট তাঁর করা হয়নি কখনও। অপু তখন তাঁর কাছে আবদার করে একটা গুলজারজির পোর্ট্রেট করে দিতে হবে এবং তাও দু’-তিন দিনের মধ্যে। সমীরদা জলরঙে কাজ করতে পছন্দ করেন। মুম্বইয়ের বর্ষায় জলরঙে কাজ করা প্রায় অসম্ভব। তবু তিনি অসাধ্য সাধন করে গুলজারজির পোর্ট্রেট করে পাঠালেন। সেটিই ওই পুস্তিকার মলাট হল। ‘গুলজারিশ’-এ তরুণ মজুমদার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, লিলি চক্রবর্তী, শান্তনু মৈত্র, কল্যাণ সেন বরাট, অর্জুন চক্রবর্তীর গদ্যলেখা এবং শ্রীজাতর দু’টি কবিতা আর গুলজারের লেখা দু’টি বাংলা গান ছিল।

সেই সঙ্গে গুলজারজির চলচ্চিত্রপঞ্জি, সংক্ষিপ্ত গ্রন্থপঞ্জি এবং সেই প্রদর্শনীটির অনেক ছবিও ছাপা হয়েছিল। গ্রন্থপঞ্জি আর চলচ্চিত্রপঞ্জি তৈরি করে দিয়েছিলেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র গবেষক চন্দন গোস্বামী। এই অনুষ্ঠানের কথা জানতে পেরে মুম্বই থেকে নাসিরুদ্দিন শাহ একটি ছোট্ট লেখা পাঠিয়েছিলেন। নাসিরজির সেই লেখাটিই ‘গুলজারিশ’-এর প্রথম লেখা, তিনি লিখেছিলেন– ‘Gulzarbhai was the only filmmaker whose office I ever went to, to ask for work. Even though he didn’t promise me anything, at that very first meeting the comfort level I experienced was truly unusual and I think it reflects in ‘Mirza Ghalib’ which is the work I am most proud of in my entire career. If he hadn’t cast me, I think the whole trajectory of my growth as an actor would have been different. I have no words to express my gratitude for what Gulzarbhai has done for me as an actor and for the affection I have received from him as a person. And since I tried my hand at writing (and found it tough going!) I have nothing but the purest admiration for his prolific and exquisite writing. Gulzarbhai is a treasure.’
লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……
পর্ব ৮৬। শচীন ভৌমিকের চিত্রনাট্য মানেই ফিল্ম হিট!
পর্ব ৮৫। উত্তম নিশ্চিন্তে চললেন অধমের সাথে
পর্ব ৮৪। বই সম্পাদনা: নেপথ্যের সংলাপ
পর্ব ৮৩। বই-চিত্রের বৈচিত্র
পর্ব ৮২। পূর্ণ ইন্দু পরকাশে
পর্ব ৮১। পাঠকদের উন্মাদ দাবি: চাই কথোপকথনের নতুন খণ্ড!
পর্ব ৮০। কলকাতা: পূর্ণেন্দু সংস্করণ
পর্ব ৭৯। নানা রঙের নবনীতা
পর্ব ৭৮। প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই এঁকেছিলেন নবনীতা দেবসেন
পর্ব ৭৭। অপরাজিতা দেবীকে ছদ্মনামে পুরুষ কবি ভেবেছিলেন পাঠক
পর্ব ৭৬। বিদেশেও সমাদৃত হয়েছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর উপন্যাস
পর্ব ৭৫। নারীকলম: দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৭৪। বই-মানবী
পর্ব ৭৩। প্রেসের কাজে গাফিলতি দেখলে কড়া চিঠি লিখতেন সুবীরদা
পর্ব ৭২। করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ
পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা
পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান
পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ
পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন
পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ
পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!
পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!
পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়
পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়
পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়
পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!
পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু
পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না
পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম
পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না
পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী
পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা
পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা
পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়
পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল
পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি
পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্সা’
পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়
পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’
পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল
পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!
পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই
পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি
পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত
পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী
পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের
পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়
পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!
পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!
পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো
পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন
পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved