Robbar

নানা রঙের নবনীতা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 5, 2026 8:47 pm
  • Updated:July 5, 2026 9:40 pm  

২০০৬-এর ২৪ ডিসেম্বর ‘সংবাদ প্রতিদিন’ প্রতি রবিবার পাঠকদের বিনামূল্যে ঋতুপর্ণ সম্পাদিত ‘রোববার’ পত্রিকা দিতে শুরু করে। সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই নবনীতাদির এই কলাম চালু হয়েছিল। ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ বই করবে বলে অপু তিন বছর ধরে প্রতিটি লেখা জমিয়ে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত নবনীতাদি অপুর আগ্রহ দেখে অন্য প্রকাশকদের না দিয়ে দে’জ পাবলিশিংকেই এই বই ছাপার অনুমতি দেন।

সুধাংশুশেখর দে

৭৯.

নরেন্দ্র দেবের ‘রোবাইয়াৎ ই ওমর খৈয়াম’ প্রকাশ করার ১৪ বছর আগে ১৯৮৩ সালেই কিন্তু আমি কান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদে ‘রোবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম’ প্রকাশ করেছিলাম। পরে ১৯৯৯ সালে দে’জ থেকে কান্তিচন্দ্রের অনুবাদে ‘রোবাইয়াত-ই-হাফিজ’-ও প্রকাশিত হয়েছে। কান্তিচন্দ্র একসময় ‘কল্লোল’, ‘সবুজপত্র’, ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’ ইত্যাদি পত্রিকায় লেখালিখি করেছেন। তিনি বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার উচ্চপদস্থ কর্মী ছিলেন। আইন সংক্রান্ত কয়েকটি বইও সংকলন করেছেন। এই অনুবাদ দু’টি ছাড়া তিনি সন্ত কবীরের দোহা ‘কবীর বাণী’, গল্পের বই ‘ধূমকেতু’, গদ্যকবিতার বই ‘সেবিকা’, ‘মোগলবধূ’ নামে আকবর ও যোধাবাইয়ের প্রণয়মূলক নাটকও লিখেছেন। তাঁর ‘রোবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম’ সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল কমলা বুক ডিপো লিমিটেড থেকে। ১৫ নম্বর কলেজ স্কোয়ার ঠিকানায় ছিল কমলা বুক ডিপো। আগেও একবার লিখেছি, ‘রোবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম’-এর কমলা বুক ডিপো সংস্করণে ভূমিকা লিখেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ‘বীরবল’ কান্তিচন্দ্র ঘোষের বইয়ের সেই ভূমিকায় লিখেছিলেন “ফার্সি আমরা জানিনে, কিন্তু ও ভাষার বড় বড় কবিদের নাম আমাদের সকলেরই নিকট সুপরিচিত। হাফিজ ও সাদীর নাম ভদ্রসমাজে কে না জানে? ওমার খৈয়ামের নাম কিন্তু দু’দিন আগে এদেশে কেউ শোনে নি, এমন কি ফার্সিনবিশেরাও নয়। যদিচ এ যুগের সমজদারদের মতে তিনিই হচ্ছেন ইরান-দেশের সব চাইতে বড় কবি।” দে’জ থেকে ১৯৮৩-র আগস্টে প্রকাশিত ‘রোবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম’ বইটির মলাট যে প্রখ্যাত শিল্পী হিরণ মিত্র এঁকেছিলেন সেকথাও আগে লিখেছি। কান্তিচন্দ্রের অনুবাদে ‘রোবাইয়াত-ই-হাফিজ’ বইটির মলাট এঁকেছিলেন গৌতম রায়।

প্রচ্ছদ: পূর্ণেন্দু পত্রী

নবনীতা দেবসেনের কথা বলতে গিয়ে অনেকদূর চলে গিয়েছি। দে’জ থেকে নবনীতাদির তৃতীয় বই ছিল তাঁর নতুন গল্পের বই ‘ভালোবাসা কারে কয়’। পূর্ণেন্দুদার করা মলাটে এই বইটি আমি ছেপেছিলাম গোয়াবাগানে সুদর্শন গাঁতাইতের দ্য বি. জি. প্রিন্টার্স থেকে। মোট আটটি গল্পের এই বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন সপরিবার স্বপনদাকে। উৎসর্গের পাতায় লেখা হয়েছিল ‘স্বপন, নমিতা, মিলিন্দকে’।

নবনীতা দেবসেনের ‘গল্পসমগ্র’

সম্ভবত ১৯৯৫ সাল থেকে নবনীতাদির ‘গল্পসমগ্র’র কাজ শুরু হয়। প্রথমটি ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হলেও মোট চার খণ্ডে প্রকাশিত নবনীতাদির ‘গল্পসমগ্র’র শেষ খণ্ডটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৫ সালে। প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় নবনীতাদি লিখেছিলেন “প্রথমে আমি শুধু কবিতাই লিখতুম, আর যাঁরা অনায়াসে গল্প লেখেন, অবাক বিস্ময়ে ভাবতুম তাঁরা নিশ্চয় ম্যাজিক জানেন। কেমন করে সাজিয়ে তোলেন কাহিনীর পরম্পরা? একসময়ে টের পেলাম গল্প নিজেই নিজেকে তৈরি করে, আমার কাজ কেবল থেমে যাওয়া। যে কোনো লেখাই আমি বারবার লিখি। লিখে ফেলে রাখি, আবার লিখি, আবার কাটি। কখনো এমন হয়েছে, লেখা আর প্রকাশের মধ্যে কয়েক বছরের ফারাক। আবার প্রকাশ হওয়া আর গ্রন্থে সংকলিত হওয়ার মধ্যেও দূরত্ব অনেক থেকে যায়। এ আমার দীর্ঘসূত্রিতা এবং অলস স্বভাবের জন্যেই। এই আলস্যজনিত কারণেই এখানে গল্পগুলির প্রথম প্রকাশের তারিখ দেওয়া গেল না। গ্রন্থের প্রকাশকাল অনুযায়ী প্রথম খণ্ডে সাজানো হলো ২৫টি গল্প, ১৩৮৭, ১৩৮৯ ও ১৩৮৯-তে প্রকাশিত তিনটি বই থেকে। এখানে থাকছে ১৯৭৪-এর পর থেকে লেখা গল্পগুলি, যদিও আমার প্রথম গল্প বেরিয়েছিল বোধহয় ১৯৫৬ বা ৫৭-তে ‘রবিবাসরীয় আনন্দবাজার’ পত্রিকায়। আমি তখন ছাত্রী। সে গল্প হারিয়ে গেছে, এবং পরবর্তী গল্পগুলিও। এ বইয়ের অনেক গল্প ‘আকাশবাণী’তে শ্রুতিনাটক হয়ে প্রচারিত হয়েছে।” নবনীতাদির ‘গল্পসমগ্র’ আমি করতে পেরেছিলাম স্বপনদার সৌজন্যেই। আর প্রতিটি খণ্ডের প্রুফ অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে দেখে দিয়েছিলেন অভিজিৎ সেন। অভিজিৎ অবশ্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে নবনীতাদির প্রত্যক্ষ ছাত্রও।

দে’জ থেকে প্রকাশিত নবনীতা দেবসেনের গল্প সংকলন ও প্রথম উপন্যাস ‘ঠিকানা’

এই সময় প্রায় প্রতি বছরই আমি নবনীতাদির কোনও-না-কোনও বই প্রকাশ করেছি। কখনও গল্পের বই, কখনও কোনও উপন্যাস।  ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে দু’টি বই প্রথমটি ১৫-টা গল্পের সংকলন ‘খগেনবাবুর পৃথিবী এবং অন্যান্য’ এবং দ্বিতীয়টি ‘আনন্দমেলা’, ‘সন্দেশ’, ‘পক্ষীরাজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ১৩-টি ছোট আর দু’টি বড়গল্পের সংকলন। 

১৯৯৯ সালে দে’জ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস ‘ঠিকানা’। নবনীতাদির ছোট্ট উপন্যাস ‘ঠিকানা’ আমার নিজের খুব প্রিয় একটি লেখা। বইটির উৎসর্গের পাতায় তিনি লিখেছেন ‘নিউইয়র্কের আমার সমস্ত/ বাংলাদেশী প্রিয়জনদের/ এবং/ সঙ্ঘমিত্রা বসু, প্রমিতা ঘোষ, সঙ্ঘমিত্রা সেন/ তিন বোনকে/ যাদের সহায়তা ছাড়া এ লেখা হতো না।’ ‘ঠিকানা’ উপন্যাসের বাঙালি কিন্তু আন্তর্জাতিক বাঙালি। উপন্যাসের পটভূমি আমেরিকার ম্যানহাটন। ২০০৩ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছর বইমেলায় দে’জ থেকে তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে ‘রাগ-অনুরাগ এবং অন্যান্য গল্প’, ‘অ্যালবাট্রস’, ‘একটি ইতিবাচক প্রেমকাহিনী’, ‘অভিজ্ঞান’, ‘ফিনিক্স’, ‘ঘূর্ণি’।

দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে নবনীতা দেবসেনের অসংখ্য বই

নবনীতাদির পাঠকদের কাছে তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় ভ্রমণকাহিনি– লেখক হিসেবে। সেই ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’ থেকে শুরু হয়েছে তাঁর এই ধরনের লেখা। সারাজীবনে বেশ কয়েকটি ভ্রমণকাহিনি তিনি লিখেছেন। তাঁর নিজের কথায় ‘ভ্রমণের নেশা এক তীব্র নেশা, প্রায় কৃষ্ণপ্রেমের মতো, সে মাদকের সুখ যে একবার আস্বাদন করেছে, সে বারবার সেই স্বাদ ফিরে পেতে চায়। আমিও ব্যতিক্রম নই। আমার বাবা নরেন্দ্র দেব ছিলেন ভ্রমণ পাগল মানুষ। তাঁর ভ্রমণ কাহিনি এক সময়ে মানুষের মর্ম স্পর্শ করেছিল। অল্পবয়সে একা ও লেখক-শিল্পী বন্ধুদের সঙ্গে সারা ভারত, শ্রীলংকা ঘুরে বেড়িয়েছেন। সংসারী হয়েও বাবার পথের অমোঘ টানে ছেদ পড়ল না, এবারে সাড়া দিলেন সংসার সমেত। বাবা মানব সভ্যতাকে স্পর্শ করতে চাইতেন প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে। আশৈশব আমি মা বাবার সঙ্গে সারা ভারত, এবং ইউরোপের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছি। আমার রক্তের মধ্যে বাবার এই মারাত্মক নেশাটি স্বতঃই সঞ্চারিত হয়েছে। কোনো দেশে গিয়ে আমার নিজেকে বাইরের লোক বলে মনে হয় না, মনে হয় না এখানে আমি একা, নিঃসঙ্গ। সর্বত্রই ঈশ্বর আমার জন্যে ভালোবাসার পাইক পেয়াদা মজুত করে রেখে দেন, কোথাও তারা আমাকে পাকড়াও করতে ব্যর্থ হয়নি। এত অচেনা মানুষ এত অজানা জায়গায় ছোটো বড়ো সংকটের মুহূর্তে পাখির মায়ের মতো ডানার আড়াল দিয়ে আমাকে আগলেছেন, যে আমি সর্বত্রই স্বস্তি বোধ করি। মনে হয়, মানুষের কাছাকাছি যতক্ষণ আছি, সব ঠিকঠাক আছে। যে কোনো সমস্যাই আসুক, একটা সুরাহা হয়ে যাবে। মানুষ আসলে সব বোঝে। তাই আমার নতুন দেশে, নতুন পরিস্থিতিতে, অচেনা মানুষদের মাঝখানে, অনভ্যস্ত আবহাওয়ায় চলে যেতে একটুও ভয় করে না। মানুষের স্বভাবের মূল উষ্ণতায় আমার গভীর বিশ্বাস। জগতের সব শিল্পীর মতোই আমিও হয়তো বুকের মধ্যে এক ভবঘুরে প্রাণী, কিন্তু কপালগুণে জীবনেই বা ভবঘুরঘুরেপনায় কম গেলুম কোথায়০?’ আক্ষরিক অর্থেই নবনীতাদির পায়ের তলায় সর্ষে ছিল। দেশে-বিদেশে তাঁর বেড়ানো এবং সরস ভাষায় সেই ঘুরে বেড়ানোর গল্প বাংলা ভাষার পাঠককে মাতিয়ে রেখেছিল। করুণা প্রকাশনী থেকে বামাদা (বামাচরণ মুখোপাধ্যায়) ১৯৭৯ সালের বাংলা নববর্ষে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন কুম্ভমেলা ভ্রমণ নিয়ে নবনীতাদির অনবদ্য লেখা ‘করুণা তোমার কোন পথ দিয়ে’। সেই থেকে শুরু। তারপর ১৯৮৩ সালে আনন্দ থেকে প্রকাশিত হয় সম্ভবত নবনীতাদির এই ধরনের লেখার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বই ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমাহনে’।

নবনীতা দেবসেন ও তাঁর জনপ্রিয় দুই ভ্রমণ কাহিনির প্রচ্ছদ

অপু প্রকাশনায় আশার পর থেকেই ভাবছিল কীভাবে তার নবনীতা-পিসির ভ্রমণকাহিনিগুলো একত্রে  প্রকাশ করা যায়। নবনীতাদি এমনিতে নিজের লেখা খুব গুছিয়ে রাখতেন না। অপু ধীরে-ধীরে নবনীতাদির ভ্রমণকাহিনিগুলো একজায়গায় করে ‘ভ্রমণ সমগ্র’ প্রকাশ করার প্রস্তাব নিয়ে যায়। নবনীতাদি তাতে সাগ্রহে রাজি হন। প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন ‘বেশ কিছুকাল ধরেই আমার ‘ভ্রমণ সমগ্র’ প্রকাশে আগ্রহ হয়েছে শ্রীমান অপুর, তিনি নিজেই প্রায় সব লেখাপত্তর সংগ্রহ করেছেন, আমার কাজ অল্পই, একটি মুখবন্ধ লেখা। আপাতত দুটি খণ্ড প্রস্তুত হচ্ছে। প্রথমে অপু ভেবেছিলেন একটিতে দেশ আর একটিতে বিদেশ, এমন দুটি পর্বে ভাগ করবেন হাতে আসা লেখাগুলো। কিন্তু আমার এই দেশ-আর বিদেশের মধ্যে দাঁড়ি টানা মনের মতো হল না। তাই ভাগ হচ্ছে মেলামেশার মধ্যে, যাতে দুটি খণ্ডেই দেশ আর বিদেশের ছোঁয়া লাগে।’ নিজের ভ্রমণ-লেখা নিয়ে নবনীতাদি স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে লিখেছিলেন

‘আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, কুঁড়ে মানুষদের পক্ষে, নিজের ঘরের আরামকেদারাতে আধশোয়া হয়ে চায়ের কাপটি হাতে, নিরাপদে বিশ্ব জুড়ে মানসভ্রমণের সুখ আস্বাদন করতে চাইলে, এই সব খামখেয়ালের গল্প কাজে দেবে।

আমার ভ্রমণের কাহিনি এক দিক থেকে কিন্তু পঙ্গুর গিরিলংঘনের কাহিনি। আশাতীত ইচ্ছাপূরণের কাহিনি। চিরকেলে রুগ্ন মেয়ে আমি, সূচীপত্র দেখে আমার নিজেরই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না, এসব আমিই গিয়েছি? এতখানি আহ্লাদ পেয়ে গেছি মা ধরিত্রীর কাছে? কপাল করে এসেছি বটে! তাও তো বহু ভ্রমণ গল্প এই দু খণ্ডে নেই, এক এক ঝলক মনে পড়ে, এমন কত লেখা অযত্নে সূত্রহীন হয়ে জন্মের মতো হারিয়ে গিয়েছে।’

‘ভ্রমণ সমগ্র’ বইয়ের প্রচ্ছদ

২০০৯ সালে দে’জ থেকে প্রকাশিত হল নবনীতা দেবসেনের ‘ভ্রমণ সমগ্র’র প্রথম খণ্ড আর পরের বছর দ্বিতীয় খণ্ডটি। এই সংকলনের কয়েকটি বই অন্য প্রকাশকের চালু বই। তাই ‘ভ্রমণ সমগ্র’ করার সময় আমাদের সেইসব প্রকাশকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়েছে। নবনীতাদি নিজেই প্রকাশকদের চিঠি দিয়ে অনুমতি আনিয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয় খণ্ডের প্রথম লেখা ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমাহনে’র জন্যে আনন্দ পাবলিশার্সের কাছে আবেদন করার পর আনন্দ-র পক্ষে সেসময়ের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুবীরদা (সুবীর মিত্র) ১৭ ডিসেম্বর ২০০৭ সালে আনন্দ পাবলিশার্সের প্যাডে লিখেছিলেন 

“শ্রীমতী নবনীতা দেবসেন
‘ভালো-বাসা’
৭২ হিন্দুস্থান রোড
কলকাতা ৭০০০২৯

সবিনয় নিবেদন,

আপনার ১২. ১২. ২০০৭ তারিখের চিঠি পেয়েছি। দে’জ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিতব্য আপনার ‘ভ্রমণ সমগ্র’ গ্রন্থে আমাদের প্রকাশিত ‘ট্রাকবাহনে ম্যাকমাহনে’ গ্রন্থটি অন্তর্ভুক্তিতে আমাদের সম্মতি জানাচ্ছি। এই অনুমতি শুধুমাত্র দে’জ পাবলিশিং প্রকাশিত নবনীতা দেবসেন-এর ‘ভ্রমণ সমগ্র’-র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে অন্য কোনও সংস্করণের জন্য নয়।…”

সুবীর মিত্রের লেখা চিঠি

অপুর উদ্যোগে নবনীতাদির আরও একটি জনপ্রিয় গ্রন্থমালা দে’জ থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে ২০১০-এর বইমেলায় ‘ভালো-বাসার বারান্দা’। এর আগেও ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে বলেছি ২০০৬-এর ২৪ ডিসেম্বর ‘সংবাদ প্রতিদিন’ প্রতি রবিবার পাঠকদের বিনামূল্যে ঋতুপর্ণ সম্পাদিত ‘রোববার’ পত্রিকা দিতে শুরু করে। সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যা থেকেই নবনীতাদির এই কলাম চালু হয়েছিল। ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ বই করবে বলে অপু তিন বছর ধরে প্রতিটি লেখা জমিয়ে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত নবনীতাদি অপুর আগ্রহ দেখে অন্য প্রকাশকদের না দিয়ে দে’জ পাবলিশিংকেই এই বই ছাপার অনুমতি দেন। ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ প্রসঙ্গে তিনি নিজে জানিয়েছেন

শৈশব থেকে কৈশোরে, নানা সময়ের নবনীতা

“একদিন ঋতুপর্ণ ঘোষ হঠাৎ আমাকে ফোন করে বললেন ‘প্রতিদিন’ পত্রিকার সঙ্গে রোববার রোববার এক বিনামূল্যের ক্রোড়পত্র বেরুবে ছোটো একটা সাপ্তাহিক পত্রিকার মতো করে, তাতে আমাকে প্রতি সপ্তাহে কিছু না কিছু লিখতেই হবে। যা খুশি বিষয়বস্তু, যেমন খুশি পরিসর, কম হোক বেশি হোক, কেউ কিছু বলবে না। এরকম আহ্লাদে অফার তো জীবনে পাইনি, রাজি হয়ে গেলুম। ‘প্রতিদিন’ পত্রিকার শৈশবে আমি রবিবারের পাতাতে একটা ছোটো কলম লিখতুম, ‘ঘুলঘুলি’ নাম দিয়েছিলুম তার। সাপ্তাহিক কলম সেই আমার প্রথম। আর মাসে দুবার করে কলম লিখতুম বাংলা লাইভের ই-পত্রিকাতে। অনেক ভাবনা-চিন্তা চলল ঋতুতে-আমাতে মিলে, কী নাম হবে লেখাটার। ঋতুপর্ণ বললেন, ‘নোটবই’ নামটা কেমন? আমার ‘বাংলা লাইভে’র পাক্ষিক কলমটার নাম ছিলো ‘নবনীতার নোটবই’, পাঁচ বছর লিখেছি। বই হয়ে বেরোয়নি। শেষ অবধি এই নাম, ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ তৈরি হোলো দুজনের যৌথ প্রচেষ্টায়, পছন্দ হোলো দুজনেরই।


তখন টের পাইনি হপ্তায় হপ্তায় লেখা কত কঠিন কর্ম। তার মানে আমার সাতদিনই রোববার হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু, ইচ্ছে করুক না করুক, এই অলস মেয়েরও ঘরে বাইরে নানানখানা কাজ-অকাজ থাকে। একে আলসে তায় ভুলোমন, তাই মাঝে মাঝে কলম লিখতে দেরি হয়ে যায়। শিরে সংক্রান্তি নিয়ে কলম লিখতে বসে বুকের মধ্যে ছমছম। অমনি সব সামঞ্জস্য নষ্ট, সব রুটিনের পাতা ফাঁকা। এক একটা লেখাতে হয়তো বেশি তাহাহুড়ো হয়ে যায়। মনের মতো করে সময় দিয়ে উঠতে পারি না। প্রত্যেকবার মনে করি এর পরের বারে আরও একটু সময় নিয়ে লিখবো, কিন্তু নিজের কাছে নিজের কথা রাখা হয়ে ওঠে কৈ? আমার বাজে স্বভাব, কিছুতেই লেখা পছন্দ হয় না। বার বার লিখে বার বার কেটে কুটে খেটে খুটে লেখা তৈরি করি। সাপ্তাহিক কলমে এটা সব সময়ে সম্ভব হয় না। মনে খুঁতখুঁতুনি রয়েই যায়। কী যেন কম থেকে গেল। কোনখানটাতে যেন বেশি বেশি হয়ে গেল। এটা অন্যভাবে বলা যেতো। এই বাক্যটি অবাঞ্ছিত। এখানে অন্য একটা শব্দ চাই। তাই আমি চেয়েছিলুম বই হয়ে বেরুনোর আগে লেখাগুলিকে ঝেড়ে বেছে ঘষে মেজে ঝকঝকে করে দিতে। কিন্তু দৃষ্টিশক্তির প্রতিকূলতায় আর সময়াভাবে সম্পাদনা সম্ভবপর হোলো না। শেষ অবধি য্যায়সাকে ত্যায়সা, যেমন বেরিয়েছে, তেমনই গেল, অপ্রসাধিত চেহারা নিয়ে।”

‘নবনীতার নোটবই’-এর অভিনব প্রচ্ছদ

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি নবনীতাদির অন্য পাক্ষিক ধারাবাহিক কলাম ‘নবনীতার নোটবই’-ও আমরা দে’জ থেকে ২০১১ সালে প্রকাশ করেছি। সে বইয়ের ‘সাফাই গাওয়া’ শিরোনামের ভূমিকা তুল্য গদ্যে নবনীতাদি লিখেছেন 

“এই লেখাগুলো যে কোনোদিন বই হয়ে বেরুবে, ভাবিনি। টুকরো লেখা, কিছু হাতে লিখেছি, কিছু এই যন্ত্রে, কিছু ঐ যন্ত্রে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কে জানে কোনটা কোথায়। ক’টা বেরিয়েছিল তাও মনে নেই। কে খুঁজবে? পাঁচ বছর ধরে বেরিয়েছে বাংলা লাইভের ই-পত্রিকায়। রোববারে ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ শুরু হবার পরে বেশিদিন একসঙ্গে দুটো কলম লিখতে পারিনি, অপারগ হয়ে পুরোনোটা বন্ধ করলুম।

অপু দে এবং তার নবনীতা পিসি

কিছুদিন আগে অপু এটিকে বই করার কথা বলল যখন, সিধে ‘না’ বলে দিলুম। এক তো আমার দ্বারা সম্ভব নয় খুঁজেপেতে পাণ্ডুলিপি তৈরি করা, আর দুই, ওসব টুকরো লেখা, ও ছেপেই বা কী হবে? কিন্তু অপু বলল, বইটা করা খুব দরকার, দিল্লি বইমেলাতে গেলে বহির্বঙ্গের পাঠকরা ওকে এই নোটবইটা বের করতে বার বার অনুরোধ করেন। আরো অবাক করে দিয়ে অপু ঘোষণা করল, পাণ্ডুলিপিও তৈরি আছে।

পুরনো সাময়িকপত্রে নবনীতা দেবসেন

বেশ তো, তা হলে যা খুশি তাই করো। আমার বাপু কোনো দায় নেই। ঠিক তাই হয়েছে। আমি প্রুফও দেখিনি। যে অন্তর্জালের পাঠকদের আগ্রহে এ বই বেরুলো তাঁদের কাছে আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ। বই যেমনই হোক, তাঁদের ভালোবাসায় ভেজাল নেই। ৮৬টা টুকরো ম্যাজিক করে পরপর সাজিয়ে দিয়েছেন অমিতাভ রায় মশাই। মানছি, অনেক কপাল করলে এমন সব দূরদেশী পাঠক মেলে। এখন ভাবনা, শেষ অবধি তাঁদের মুখ রক্ষে হবে তো!”

একটি অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায় ও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে নবনীতা দেবসেন

আমার বন্ধু অমিতাভ রায় নিজেও একজন লেখক। তাঁর অনুবাদে ‘গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের গল্পসমগ্র’ দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তাঁর তিনটি বই আমি করেছি ‘বিলিতি বৃত্তান্ত’, ‘জোয়াই’, ‘অন্য পথ ভিন্ন কথা’।  

‘নবনীতার নোটবই’ বইটির গঠন খানিকটা অন্যরকম করা হয়েছিল। অপু চাইছিল বইটা যাতে আক্ষরিক অর্থেই একটা ডায়েরির মতো দেখতে হয়। সেইমতো প্রথম সংস্করণে মলাটের ভেতরে প্যাডিং দিয়ে এবং চারকোণে ছোট্ট ছোট্ট সোনালি ক্লিপ লাগিয়ে ‘নবনীতার নোটবই’ একেবারে ডায়েরির মতোই দেখতে করা হয়েছিল।  

‘ভালো-বাসার বারান্দা’ এখনও পর্যন্ত পাঁচ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি নতুন খণ্ডেরও প্রস্তুতি চলছে। তবে ২০১০-এ প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করতে অনেকটাই সময় লেগে গিয়েছিল। সেই সময় নবনীতাদি রেগে গিয়ে আমাকে একটা চিঠি লিখে ওই বই ছাপতে নিষেধ করেছিলেন। ২০১৪-র ৩ অগাস্ট তিনি আমাকে লেখেন

‘স্নেহের সুধাংশু,

“ভালো-বাসার বারান্দা” ২০১০ এ বেরিয়েছিল। তার কোনো সংস্করণও হয়নি, আর পরবর্তী খণ্ডটিও তিনবছর ধরে পড়ে আছে, অপ্রকাশিত। আমি চাই না পরবর্তী খণ্ডগুলি দে’জ থেকে বের হয়। নিশ্চয় বইয়ের তেমন চাহিদা নেই। তাই বের করছো না। তাই, আমি তোমাদের কাছ থেকে ‘ভালো-বাসার বারান্দা’ পরবর্তী খণ্ডগুলি বের করবো না, অন্যত্র দিয়ে দিয়েছি। তুমি আর ওটা নিয়ে ভাবনা কোরো না। প্রথম খণ্ডটি তোমাদের আছে, থাকুক।

নিত্য শুভার্থী দিদি
নবনীতা দেব সেন’

নবনীতা দেবসেনের লেখা মূল চিঠি

তবে নবনীতাদি রেগে গেলেও তাঁর রাগ জল হয়ে যেতে সময় লাগেনি। ২০১৫-য় যখন ‘ভালো-বাসার বারান্দা’র দ্বিতীয় খণ্ডটি বেরুল তখন তিনি লিখলেন ‘… প্রথম খণ্ডে গিয়েছে শুরু থেকে ২০০৮-এর ৮ মার্চ পর্যন্ত। আর দ্বিতীয় খণ্ডে যাচ্ছে ১৬ মার্চ ২০০৮ থেকে শুরু করে ২০০৯-এর ২৮ জুন অবধি ভালো-বাসার আড্ডা। এই বিলম্বিত লয়ের জন্য দায় কিন্তু আমার নয়। প্রকাশকের। আমি তো খেটেখুটে মহানন্দে ফি-হপ্তায় লিখে চলেছি রোববার-এর গপ্পোসপ্পো। জানিয়ে রাখি, ২০০৯ জুলাই থেকে অদ্যাবধি আড্ডার রসদ সবই সযত্নে বৈয়ামে ভরা আছে কল্যাণীয় অপুবাবুর ভাঁড়ার ঘরে। আশা করছি এবার একে একে উঁকি দেবে।’ 

প্রচ্ছদ: দেবব্রত ঘোষ

২০১৬-য় আমি ছেপেছি নবনীতা দেবসেনের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রবন্ধের বই ‘চন্দ্র-মল্লিকা এবং প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ’। দেবব্রত ঘোষের করা চমৎকার মলাটে ছাপা বইটির উৎসর্গের পাতায় নবনীতাদি লিখেছেন ‘আমার দুই আচার্য/ বীণা মজুমদার/ সুকুমারী ভট্টাচার্য/ শ্রীচরণেষু/ এই বই যাঁদের হাতে তুলে দিতে পারিনি’। বইয়ের ভূমিকার ‘পুনশ্চ’ অংশে নবনীতাদি জানিয়েছেন “বিশ্বাসযোগ্য নয়, কিন্তু আমার বিশ্বাস ক্রমেই অটল হচ্ছে, যে যখন যা প্রকাশ পাওয়ার কথা, শুধু তখনই তা ঘটে। এই বইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৮৯-এ। অনেক ওঠাপড়ার পরে ২০১২তে পাণ্ডুলিপি তৈরি হলো, ভূমিকা লিখিত, প্রুফ দেখে দেওয়ার পরে হঠাৎ কাজ বন্ধ হয়ে গেল, প্রেসের এবং আমার যৌথ আলসেমিতে। ২০১৫-তে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তুলনামূলক সাহিত্যের দু’টি ছাত্র নিজেরা এসে আমার চন্দ্রাবতী সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলি প্রকাশ করার প্রসঙ্গ তোলেন। শুনলুম চন্দ্রাবতী এখন তুলনামূলক সাহিত্যে পাঠ্য হয়েছে আমারই লেখার সূত্র ধরে। চন্দ্রাবতীর ওপরে গ্রন্থ নেই। তখন মনে পড়ে গেল এই বিষয়ে আমার একটি বই তৈরি হয়ে পড়ে আছে। সেই বই শেষ অবধি প্রকাশ পাচ্ছে…।”

২০১৮-র ১৩ জানুয়ারি ছিল নবনীতাদির ৮০-তম জন্মদিন। সেই উপলক্ষে আমরা একটা বড় অনুষ্ঠান করার কথা ভাবছিলাম। ইতোমধ্যে ২০১৭ থেকে শুরু হয়ে গেছে ‘নবনীতা দেব সেন রচনাবলি’র কাজও। তাই স্থির হয় নবনীতাদির ৮০-তম জন্মদিনে ‘রচনাবলি’র প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ করা হবে। অপু চেয়েছিল এই অনুষ্ঠানটি একটু জাঁকজমকপূর্ণ করতে। সেজন্য রবীন্দ্রসদন ভাড়া করা হয়। কিন্তু ১৩ জানুয়ারি প্রেক্ষাগৃহ পাওয়া যায়নি বলে অনুষ্ঠান হল ১২ জানুয়ারি সন্ধেয়। সেদিন অনেকের সঙ্গে শঙ্খদা এবং বুদ্ধদেব গুহও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের হাতেই আনুষ্ঠানিক প্রকাশ হয় ‘রচনাবলি’র প্রথম খণ্ডটির। সেদিনের অনুষ্ঠানে দর্শক সমাগম দেখে স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল নবনীতাদির জনপ্রিয়তা। বুদ্ধদেবদা সেই সন্ধেটা একাই মাতিয়ে দিয়েছিলেন। এদিকে লেখক রংগন চক্রবর্তী নবনীতাদির ৮০-তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি গান লিখে পাঠিয়েছিলেন মুম্বই থেকে। অপুর অনুরোধে সেই গানটি রাতারাতি ‘দোহার’ গানের দল গেয়ে রেকর্ড করে দেন। রবীন্দ্রসদনে বেজেছিল সেই গান। প্রসঙ্গত বলে রাখি, সংবাদ প্রতিদিনের ‘রোববার’ পত্রিকা ১৪ জানুয়ারি ২০১৮ সংখ্যাটি করেছিল নবনীতাদিকে নিয়েই। নাম দিয়েছিল ‘আশিয়ানা’। তাতে রংগন চক্রবর্তীর ‘নব-কীর্তন’ গানটিও ছাপা হয়েছিল। গানটির কথাগুলো এমন চমৎকার ছিল যে সহজে ভোলা যায় না।

নবনীতা দেবসেনের স্মরণ অনুষ্ঠানের কার্ড


নবনীতাদির ৮১ বছরের জন্মদিনের সময় তার শরীর বেশ খারাপ হয়ে পড়ে। আমরা তাই দূরে কোথাও না করে তাঁর বাড়ির পাশেই ‘আকার প্রকার’ আর্ট গ্যালারিতে সেই জন্মদিন উদ্‌যাপন করেছিলাম। নবনীতাদিকে সেখানে হুইল চেয়ারে করে নিয়ে আসা হয়েছিল।
২০১৯-এর ৭ নভেম্বর নবনীতাদি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। অপু তখন বাংলাদেশে ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যালে। সংবাদ পেয়ে ও কলকাতায় চলে আসে। এর ঠিক আগের বছর সেই ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যালেই সে যখন গিয়েছিল, তখন নবনীতাদি তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন তাঁর শরীরে কঠিন রোগ বাসা বেধেছে। কিন্তু এত দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়বে সেটা আমরা কেউই ভাবতে পারিনি।

শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং শঙ্খ ঘোষ

নবনীতাদি চলে যাওয়ার পর দে’জ পাবলিশিং ও তাঁর পরিবারের পক্ষে রবীন্দ্রসদনেই ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ অনুষ্ঠিত হয় ২০ নভেম্বর। সেই অনুষ্ঠানে আমরা নবনীতাদিকে নিয়ে একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করেছিলাম। সে-পুস্তিকার প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পী শুভাপ্রসন্ন।

নবনীতা দেবসেন রচনাবলির প্রচ্ছদ ও শিল্পী শুভাপ্রসন্ন-র আঁকা পুস্তিকা-প্রচ্ছদ

আর নবনীতাদি চলে যাওয়ার পরে তাঁর প্রথম যে জন্মদিনটি এল সেই দিন আমরা ফের রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান করে তাঁর ‘রচনাবলি’র দ্বিতীয় খণ্ডটি প্রকাশ করি। সেই অনুষ্ঠানে প্রথম নবনীতা দেবসেন স্মারক বক্তৃতা করেন অমর্ত্য সেন। অমর্ত্য সেনের বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘স্বদেশ ও বিদেশ’। অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং প্রধান অতিথি ছিলেন শঙ্খদা।  

বিয়ের দিন অমর্ত্য সেন ও নবনীতা দেব সেন

নবনীতাদি শেষের দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাঁর প্রাণশক্তিতে ঘাটতি ছিল না কখনও। ২৭ অক্টোবর ২০১৯ ‘রোববার’ পত্রিকায় নবনীতাদি ‘ভালো-বাসার বারান্দা’য় ‘অল্‌রাইট কামেন্‌ ফাইট্‌! কামেন্‌ ফাইট্‌’ নামে লিখেছিলেন “ঠিক আছে। না হয় ক্যানসার-ই হয়েছে। ক্যানসার তো এখন অলক্ষ্মীর ঝাঁপির মতো ঘরে ঘরে গুছিয়ে বসেছে। আমিই বা বাদ যাই কেন? আমার ছোট্ট ভাইঝিটা গিনুমা, ছোটো বোনটা মুন্নু, ছোটো ভাইটা অভীক, ছোটো দেওরটা শিব, প্রিয় দাদা অশোকদা, ছাত্রবেলার বন্ধু শ্যামল, কবিবেলার বন্ধু সুনীল আর সন্তোষকুমার ঘোষ, আরও কত আপনজনকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। হঠাৎ অশীতিপর নবনীতার জন্য এত শোক কীসের? তার তো যাওয়ার সময় এমনিতেই হয়েছে। কিন্তু বন্ধুবান্ধবের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, কচি বাচ্চার মহাপ্রয়াণ হতে চলেছে। তার জীবন যেন ভরেইনি। আরে ! আমি তো এখনও মরিনি, মরব কি না, তার ঠিকও নেই। এখন থেকে এত শোক কীসের?… এই কর্কটকমলের এত মাতব্বরি কীসের? লাঠিসোঁটা একটু বেশি আছে বলে? দ্যাখো বাপু, এই বিশাল পৃথিবীতে কতরকম বড়ো বড়ো লড়াই-যুদ্ধ চলছে, সেখানে তোমার ওই লাঠিসোঁটায় ভয় পাব ভেবেছ? ওসব তো তুশ্চু! ‘আই ডোন্ট কেয়ার কানাকড়ি জানিস্, আমি স্যান্ডো করি?’” নবনীতাদির এই প্রাণবন্ত ছবিটাই আমার মনে চিরকাল গেঁথে থাকবে।

লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়

…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……

পর্ব ৭৮। প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই এঁকেছিলেন নবনীতা দেবসেন

পর্ব ৭৭। অপরাজিতা দেবীকে ছদ্মনামে পুরুষ কবি ভেবেছিলেন পাঠক

পর্ব ৭৬। বিদেশেও সমাদৃত হয়েছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর উপন্যাস

পর্ব ৭৫। নারীকলম: দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৭৪। বই-মানবী

পর্ব ৭৩। প্রেসের কাজে গাফিলতি দেখলে কড়া চিঠি লিখতেন সুবীরদা

পর্ব ৭২। করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ

পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা

পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান

পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ

পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন

পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ

পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!

পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!

পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়

পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি

পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়

পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়

পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!

পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু

পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না

পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম

পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না

পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী

পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা

পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা

পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়

পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল

পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি

পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্‌সা’

পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়

পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায় 

পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়

পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’

পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল

পর্ব ৪১। রাস্কেল, পাষণ্ড পণ্ডিত, প্রবঞ্চক, বিশ্বাসঘাতক– নারায়ণ সান্যালের বইয়ের নাম নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল আমার!

পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!

পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই

পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি

পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত

পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী

পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের

পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়

পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়

পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!

পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!

পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো

পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন

পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!

পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন

পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি

পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম

পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর

পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও

পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!

পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই

পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে

পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী

পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে

পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি

পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে

পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ

পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা

পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প

পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার

পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা

পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল

পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত

পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না

পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট

পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’

পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!

পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’

পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’

পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম