


১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তমকুমার প্রয়াত হন। গোটা বাংলা তাঁর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিল। মহানায়কের অকালপ্রয়াণের সেই দিনটি আজও আমি ভুলিনি। আমার কাছে তাঁর প্রয়াণ আরেকটি কারণেও খুবই মর্মান্তিক ছিল। কেননা ততদিনে ‘আমার আমি’র ‘পরিবর্ধিত তৃতীয় রাজকীয় সংস্করণ’ প্রকাশের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশের পর আমাদের বাড়ির উঠোনে রীতিমতো লাইন পড়ে গিয়েছিল। শহর-মফস্সলের বাঙালি এই বইটিকে মহানায়কের অন্যতম প্রধান স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
৮৫.
মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষ ঘিরে নানা অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে কলকাতায়। এইসব অনুষ্ঠানের নানা বিজ্ঞাপন দেখছি আর আমার মন চলে যাচ্ছে আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে। তখনও উত্তমকুমার আমাদের মধ্যে আছেন এবং নিয়মিত তাঁর ছবি মুক্তি পাচ্ছে। একদিন সকালে গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষের সঙ্গে আমি গিয়েছিলাম উত্তমকুমারের ১৩ নম্বর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে। সালটা ১৯৭৪। সদ্য দে’জ থেকে উত্তমকুমারের ‘আমার আমি’ বইটির পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে বইটি সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল মিত্র ও ঘোষ সংস্থার অমর সাহিত্য প্রকাশন থেকে। ‘আমার আমি’র অনুলেখক গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ প্রথম প্রকাশের কিছুদিন পরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বইটির নতুন সংস্করণ প্রসঙ্গে। উত্তমকুমারের আত্মজীবনী শুধু সেসময় নয়, কোনওদিনই কোনও বাঙালি প্রকাশক ছাপতে অরাজি হবেন বলে মনে হয় না। আর আমার কাছে বিশেষ আকর্ষণ ছিল বাংলা সিনেমার এই মহীরুহ যখন খ্যাতির মধ্যগগনে⎯ সেই সময়েই বইটি পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার ইচ্ছে। ‘আমার আমি’র দে’জ সংস্করণ প্রকাশের পর উত্তমকুমারের হাতে বই তুলে দিতেই গৌরাঙ্গদার সঙ্গে আমার ময়রা স্ট্রিটে যাওয়া। সেদিন অল্প সময়ই ছিলাম, কিন্তু একেবারে সামনে থেকে উত্তমকুমারকে দেখার রোমাঞ্চ আমি সারাজীবন ভুলব না। তিনি ঘরে এসে তাঁর বিশিষ্ট ভঙ্গিতে হাতদুটো বুকের কাছে এনে নমস্কার করে বইটি নিলেন, একবার উলটে-পালটে দেখে সেই ভুবন ভোলানো হাসি⎯ আমার জীবনে সে একটা বিরাট পুরস্কার।

‘আমার আমি’র দে’জ সংস্করণ সব দিক থেকেই অন্যরকম হয়েছিল। দে’জের সম্ভবত সেটাই প্রথম পেপারব্যাক বই। এমনিতে বাংলা প্রকাশনায় পেপারব্যাক খুব একটা হয় না। অল্প কয়েকটি ক্ষেত্রে আমিও করেছি। ‘আমার আমি’ বইটা নিশিকান্ত হাটই-এর তুষার প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ থেকে ছেপেছিলাম। তখনও পারফেক্ট বাইন্ডিং কথাটা আমাদের বইপাড়ায় খুব প্রচলিত ছিল না। আমরা মুখে বলতাম পেপারব্যাক বই। ‘আমার আমি’ বইটা সেসময় আমাদের বাঁধাইকরেরা সেলাই করে তারপর চমৎকার পেপারব্যাক তৈরি করেছিলেন। এখন আর ঠিক মনে নেই, তবে আমার বাঁধাইয়ের কাজ যে জলিলদা বা দীনেশবাবুরা করতেন সেকথা আগেও বলেছি। ‘আমার আমি’র শুরুতে উত্তমকুমার ‘আমার কথা’য় লিখেছিলেন⎯
‘শ্রীমান গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ যখন আমার আত্মজীবনী আমার ভাষায় লিখবার জন্য অনুরোধ জানাল তখন তার আব্দার উপেক্ষা করতে পারলাম না।
শ্রীমান গৌরাঙ্গের এই রচনার পাণ্ডুলিপি আমি পড়েছি এবং কিছু রদবদলও করেছি, তবু এ আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই বোধকরি গোটা পাণ্ডুলিপির ভাষায় এবং রচনাকুশলতায় আমি সন্তুষ্ট হলেও, কোথায় যেন কিছুটা ত্রুটি রয়ে গিয়েছে। সে ত্রুটি অবশ্যই অনুলেখকের নয়। আসলে, ঠিক এই সময়ে আমার আত্মজীবনী প্রকাশিত হোক আমি চাইনি। চাইনি তার কারণ, আত্মজীবনীতে কিছুমাত্র বাদ থাকা অনুচিত। অথচ শ্রীমান গৌরাঙ্গের আব্দার রক্ষার্থে আমি অনেক কথাই বলতে পারলাম না। অবশ্য ঠিক এখনই সব কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভবও নয়।
ইতিপূর্বে অনেকেরই এই আত্মজীবনী প্রকাশে অসীম আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রত্যাখ্যান করেছি, এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলাম এই তরুণ সাহিত্যিক-সাংবাদিকের আগ্রহে।
প্রথম খণ্ড হিসেবে এটি প্রকাশিত হলে মন্দ হবে না। তবে দ্বিতীয় খণ্ড আপনারাই ভবিষ্যতে প্রকাশ করবেন আশা রাখি, সেই সংগে [য.] আমার জীবনের অনেক না বলা কাহিনী উদ্ঘাটন করব।…’

বই হওয়ার আগে ‘আমার আমি’ ধারাবাহিকভাবে ‘প্রসাদ’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। লেখাটি যখন বই হল, তখন সেই বইয়ের শেষে গৌরাঙ্গদা উত্তমকুমারের ‘শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি’, ‘উত্তমকুমার অভিনীত ছবি’ নামে দু’টি তালিকা এবং ‘উত্তমকুমার প্রসঙ্গে’ নামে অংশে বিখ্যাত লেখক-শিল্পীদের মন্তব্য সংকলন করেছিলেন। সেখানে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন⎯ ‘উত্তমকুমার কোন পরিচালকের ব্যক্তিগত সার্টিফিকেটের অপেক্ষা রাখেন না। তিনি যে বিশ বছর ধরে একশোরও বেশী ছবিতে নায়কের ভূমিকার অভিনয় করে আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থান অধিকার করে আছেন এটাই তাঁর কৃতিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ জিনিস যে কেবল বরাতজোরে হয় না। এ বিশ্বাস আমার আগেই ছিল। আমি আশা করি তিনি আজ যে জায়গা দখল করে আছেন, সেখানে ঠিক এইভাবেই আরও বহুদিন থাকবেন।’
সত্যজিৎ রায়ের কথা ভুল ছিল না। কিন্তু হঠাৎই⎯ ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই উত্তমকুমার প্রয়াত হন। গোটা বাংলা তাঁর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিল। মহানায়কের অকালপ্রয়াণের সেই দিনটি আজও আমি ভুলিনি। আমার কাছে তাঁর প্রয়াণ আরেকটি কারণেও খুবই মর্মান্তিক ছিল। কেননা ততদিনে ‘আমার আমি’র ‘পরিবর্ধিত তৃতীয় রাজকীয় সংস্করণ’ প্রকাশের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। গৌরাঙ্গদা জুলাই মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত মহানায়কের কাছে গিয়েছেন নতুন সংস্করণে তাঁর না-বলা পর্বের কথার খোঁজে। শেষ পর্যন্ত যতদূর কথা হয়েছিল তার ভিত্তিতে মহানায়কের প্রয়াণের পর প্রথম জন্মদিন⎯ ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়। এবার আর পেপারব্যাক নয়। ডিমাই ১/৮ সাইজে⎯ অনেক বড় আকারের বই। সেই সঙ্গে সেসময়ের রেওয়াজ অনুযায়ী বইটিকে একটি প্লাস্টিক জ্যাকেটে মুড়ে দিয়েছিলাম। বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশের পর আমাদের বাড়ির উঠোনে রীতিমতো লাইন পড়ে গিয়েছিল। শহর-মফস্সলের বাঙালি এই বইটিকে মহানায়কের অন্যতম প্রধান স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।

এখানে গৌরাঙ্গদা সম্পর্কে দু’-চার কথা না বললেই নয়। গৌরাঙ্গদা নিজে একজন লেখক ছিলেন। আমি দে’জ পাবলিশিং থেকে ১৯৭৬ সালে ‘নায়ক একাকী’ নামে তাঁর একটা উপন্যাস প্রকাশ করেছিলাম। গৌরাঙ্গদা কাজ করেছেন ‘উল্টোরথ’ পত্রিকায়। পুষ্প প্রকাশনী থেকে বেরনো ‘যাত্রা শিল্পের ইতিহাস’ নামে তাঁর অসাধারণ বইটিতে নিজের সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন⎯
“চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে কত লোকই তো কত জীবিকা বেছে নেয়, আমি কেন যে সাহিত্যের দুর্গম পথ বেছে নিয়েছিলাম জানি না। হঠাৎ একদিন একটা কাজ জুটে গিয়েছিল কলেজ স্ট্রীটে। ভারত ফটোটাইপ স্টুডিওতে। বড় প্রেস। এর মালিকও ছিলেন যথেষ্ট খ্যাতিমান। স্বনামখ্যাত ললিতমোহন গুপ্তের ছেলে অজিতমোহন গুপ্ত আমাকে কাজ দিয়েছিলেন একটা। এখান থেকেই প্রকাশিত হতো নিছক সাহিত্যের পত্রিকা ‘তরুণের স্বপ্ন’। এরপর প্রকাশিত হয় ‘চিত্রাঙ্গদা’। ‘তরুণের স্বপ্ন’-এর অন্তিম আর ‘চিত্রাঙ্গদা’ সিনেমা বিষয়ক পত্রিকার সূচনাকালে আমার ফটোটাইপের পরিমণ্ডলে গুটি গুটি প্রবেশ। … এই সময়ে ‘উল্টোরথ’ পত্রিকার খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অকল্পনীয়। ষাটের দশককে সবাই বলতো উল্টোরথের যুগ। এই সময়ে ‘উল্টোরথ’ পরিমণ্ডলটি ছিল সাহিত্য ক্ষেত্রের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কদের মহামিলনের এক বিস্ময়কর রঙ্গিন চিত্রের মত। বুঝেছিলাম, এই পত্রিকার কর্ণধার প্রসাদ সিংহ এবং প্রসাদ সিংহের বন্ধু গিরীন্দ্র সিংহের যৌথ ভাব ও ভাবনা, অক্লান্ত পরিশ্রম আর সাধনায়, সমকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতির একমাত্র দর্পণ হিসেবে ‘উল্টোরথ’ প্রতি ঘর আর প্রতি মনে যতটা প্রিয় হয়ে উঠেছিল, তার চাইতে ঢের বেশি একটি ‘প্রতিষ্ঠান’-এর মর্যাদা পেয়েছিল। … প্রথমে কিছু কিছু নিয়মিত লেখার কাজ পেয়েছিলাম আমি। অল্পদিনের মধ্যে কেরানিও বনে গেলাম। আমার দারিদ্র্যের ছাপ চোখে, মুখে, পোষাকে এতই প্রকট ছিল যে প্রসাদদা স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, উল্টোরথের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হলে বাপ ঠাকুর্দার দেওয়া নামটি বদল করতে হবে।
হলো তাই। মায়ের মলিন মুখ, বাবার শীর্ণ শরীর, মামা বাড়ির আশ্রয়ে থাকার যন্ত্রণা, পরাধীনতার বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে মাস মাইনের লোভই সেই শর্ত মেনে নিল। মরে গেল গোরাচাঁদ। জন্ম নিল গৌরাঙ্গ। প্রসাদদা আমার নাম পাল্টে নাম রাখলেন⎯ গৌরাঙ্গপ্রসাদ ঘোষ। … উল্টোরথে নিয়মিত লিখি আবার সার্কুলেশন বিভাগে কেরানি বৃত্তিও চালিয়ে যাই। অবসর যখন থাকে তখনই নতুন কিছু করার চেষ্টা চলে। সেই চেষ্টার ফলশ্রুতি হলো, আমার লেখা একাধিক নাটক। ‘জোনাকীর কান্না’, ‘নাটকীয়’ ইত্যাদি একাঙ্ক নাটক অতি অল্প সময়ের মধ্যে নাট্যচর্চার রমরমা কালে অতি দ্রুত সমাদর পেল। ইতিমধ্যে একবার ‘উল্টোরথ’ পুজো সংখ্যার জন্য প্রসাদদা একটা গুরুদায়িত্ব দিলেন আমাকে। যাত্রাদলে বা যাত্রা পার্টিতে যে পুরুষেরা স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করতে করতে প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ে পৌঁছেছেন তাঁদের সাক্ষাৎকার নিতে হলো আমাকে। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সূচনা। সে এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। আমি সেবার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম উপেন রাণী, কমল রাণী, ছবি রাণী আর শতদল রাণীর। আসলে এঁরা হলেন– উপেন অধিকারী, কমলকৃষ্ণ খাঁ, ছবি রায়, শতদল মাইতি। আমার ভাগ্য আমাকে যে রশিতে চিরকালের জন্য বাঁধবে দূরদর্শী প্রসাদ সিংহের নির্দেশে আমি সেই রশি দর্শন করে এলাম। এ সব ১৯৫৯ সালের কথা। … এরপর থেকেই ‘যাত্রা’-কে জানার তীব্র আকাঙ্খা আমাকে যেন প্রতি মুহূর্তের জন্য ভরিয়ে রাখল। এরই মধ্যে ললাট লিখনে এল নতুন সুযোগ। … ঐ সময়েই, ঐ বয়সেই আমার মনে হয়েছিল, উল্টোরথের মত ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি নাটকের কাগজ করা যায় মন্দ কি। সেই খেলা নিয়ে মেতে গেলাম। উল্টোরথের মাস মাইনের কিছুটা অংশ বাবা-মায়ের হাতে দিয়ে বাকি অংশে কাগজ করা। কয়েকটি সংখ্যা নিয়মিত বার করতে পারলে নিশ্চয়ই এখানকার নাট্যপ্রেমীরা পৃষ্ঠপোষকতা করবেন এই ছিল বিশ্বাস। তখনকার বাজারে কাগজ করা খুব একটা কষ্টসাধ্য ছিল না। না ছিল রঙের খেলা, না ছিল পি.টি.এস. বা অফসেট। এক রীম নিউজ প্রিন্ট বড় জোর ১৯ টাকা। পাইকা ড. ডি ১/১৬ সাইজ ফর্মা ছাপতে বড় জোর ২০ টাকা। আমি বৈঠকখানা থেকে ছাঁট কাগজ কিনে ছাপতে আরম্ভ করলাম ‘মঞ্চজগৎ’। এর চিরস্থায়ী প্রচ্ছদ এঁকে দিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী। নান্দীকারের প্রাণপুরুষ অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু ছোট ছোট বিজ্ঞাপনই দিতেন না, মনোজ্ঞ কিছু লেখাও লিখতেন।…”

গৌরাঙ্গদার যে বইটি আমি দে’জ থেকে ছেপেছিলাম⎯ সেই ‘নায়ক একাকী’ও কিন্তু নাটকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এর ভূমিকায় তিনি জানিয়েছিলেন⎯
“…‘ক্ষ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশ পাথর’-এর মত আমি এই মানুষটির সব কথা খুঁজে খুঁজে বার করে, আমি আমার একান্ত নিজের ভাষায়-সাহিত্যের আবরণ দিয়ে সাজিয়েছি মাত্র। নায়কের নাম অমর। অমরেন্দ্রনাথ দত্ত।
বাংলা নাট্য সাহিত্যের বা শিল্পের শাখা-প্রশাখা, লতা আর পাতায় অমর দত্তের গোটা জীবনের বিচিত্র কাহিনী ছড়ানো। আমি অমর দত্তের কর্মময় জীবনটাকে যদি একরাশ ফুল ভাবি, তবে সে ফুল কুড়িয়ে এ আমার মালা গাঁথার চেষ্টা।
অমর দত্তের জীবন নিয়ে উপন্যাস, একে জীবনী হিসেবে আখ্যায়িত করার দুঃসাহস আমার নেই। বরং বলা ভাল, একটি সদা জাগ্রত কর্মীর অশ্রুস্নাত জীবন-কাব্য এই নায়ক একাকী।…”
গৌরাঙ্গদা পরে নিজেই যোগমায়া প্রকাশনী নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা তৈরি করেছিলেন। তিনি থাকতেন নারকেলডাঙা মেন রোডে, কিন্তু যোগমায়ার দপ্তর ছিল আমাদের বাড়ির কাছেই⎯ ৬০ নম্বর পটুয়াটোলা লেনে। এই যোগমায়া থেকেই ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর আরেকটি বড় কাজ⎯ ‘সোনার দাগ’। ‘সোনার দাগ’-এ শতবর্ষের আলোয় বাংলা চলচ্চিত্রকে ধরতে চেয়েছিলেন তিনি।

দে’জ পাবলিশিং থেকে সিনেমা বিষয়ক বই কিন্তু কম নেই। এমনকী উত্তমকুমারকে নিয়েও আমাদের আরও দু’খানি বই আছে। প্রথম বইটি আমি প্রকাশ করেছিলাম ২০০৬-এর বইমেলার সময়⎯ আশিসতরু মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘অজানা উত্তম’। আশিসতরু মুখোপাধ্যায় দীর্ঘকাল চলচ্চিত্র সাংবাদিকতা করেছেন। মহানায়কের ৮০-তম জন্মবার্ষিকী মাথায় রেখে তাঁর প্রয়াণের ২৫ বছর পর এই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইয়ের ভূমিকায় আশিসতরু লিখেছেন⎯ ‘আমার সাংবাদিক জীবনে কোনো শিল্পীকে এমনভাবে নিজেকে তিল তিল করে তৈরি করতে দেখিনি। জিরো থেকে হিরো হওয়ার এমন বিরল নজির ভারতে কেন, বিশ্ব চলচ্চিত্রে আছে কি না জানা নেই।’ আবার ২০১৫ সালে দে’জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে উত্তমকুমারকে নিয়ে আরেকটি বই⎯ জয়ন্তকুমার ঘোষের ‘ম্যাটিনি আইডল উত্তমকুমার’।

ম্যাটিনি আইডল উত্তমকুমারের পাশাপাশি আমি কিন্তু সুচিত্রা সেনকে নিয়েও দু’টি বই ছেপেছি। এর আগে অমিতাভ চৌধুরীকে নিয়ে লেখার সময়েই বলেছিলাম তাঁর একটি বইয়ের কথা যথাসময়ে বলব। সেই বইটি হল⎯ ‘আমার বন্ধু সুচিত্রা সেন’। পাঁচটি ছোট লেখা নিয়ে ১৯৯৬ সালের বাংলা নববর্ষে প্রকাশিত হওয়া অমিতদার বইটির শুরুর লেখাটির নাম ছিল ‘রহস্যময়ী’। সেখানেই সুচিত্রা সেনের সঙ্গে নিজের পরিচয়ের কথা প্রসঙ্গে অমিতদা লিখেছিলেন⎯
“আমি ভিন জগতের মানুষ। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের আগে তাঁর অভিনীত কোনও সিনেমা আমি দেখিনি। না, একটি মাত্র দেখেছিলাম⎯ সাড়ে চুয়াত্তর⎯ তাঁর আদি ছবি। তবু আলাপ হয়েছিল, অন্তরঙ্গতা হয়েছিল আশির দশকে। পরে একদিন ‘আঁধি’ ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অসাধারণ অভিনয়।
এমন বন্ধুবৎসল মানুষ আমি কদাচিৎ দেখেছি। সে বলে, ‘জানো, আমি জেদি, আমি একরোখা। জীবনে কারও কাছে হাত পাতিনি। “ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য” ছবি আমার জীবন পালটে দেয়। আমি “বিষ্ণুপ্রিয়া” চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। তারপর থেকেই আমি নির্ভয়, ভেতরে থেকে কে যেন আমাকে চালায়।’
কত অজস্র কথা। দিনের পর দিন। আমি ওকে ‘রমা’ বলেই ডাকি। বেশ কিছুদিন হল দেখাসাক্ষাৎ নেই। না হোক, তবু সে আমার মনের মধ্যে আছে। শুধু অসাধারণ অভিনেত্রী বলে নয়, একজন অসাধারণ মানুষ বলে আমি এত ভালোবাসি।…”

এই বইয়ের শেষে সংযোজিত সুচিত্রা সেনের ছবির তালিকাটি নির্মাণ করেছিলেন দেবাশিস মুখোপাধ্যায়।
সুচিত্রা সেনকে নিয়ে আমাদের দ্বিতীয় বইটি হল আশিসতরু মুখোপাধ্যায়ের ‘মহানায়িকা সুচিত্রা’। ২০০০ সালে পুজোর সময় প্রকাশিত এই বইটির জন্য লেখা ছোট্ট ভূমিকায় সুচিত্রা-তনয়া মুনমুন সেন লিখেছিলেন⎯
‘আশিসতরু মুখোপাধ্যায় আমার মায়ের সময়ের সাংবাদিক। মায়ের অভিনয়-জীবন ও তাঁর সম্পর্কে চলচ্চিত্র এবং সঙ্গীতের বহু ব্যক্তিত্ব ও সাংবাদিকরা তাঁদের মতামত জানিয়েছিলেন বিভিন্ন সময়ে নানা পত্র-পত্রিকায়। সেইসব লেখা আশিসবাবু প্রকাশ করেছেন এই গ্রন্থে।
আশা করি, আমার মায়ের ওপর লেখা এই বইটি পড়ে ভাল লাগবে পাঠকদের। আর তাতে আমিও খুশি হব খুব।’

১৯৯৮ সালের বইমেলার সময় দে’জ থেকে দু’ খণ্ডে আমি প্রকাশ করেছিলাম রবি বসুর ‘সাতরঙ’, পরের সংস্করণে সেই বই রয়্যাল সাইজে আরও সমৃদ্ধ চেহারায় প্রকাশিত হয়েছে। রবিদার কথা আমি আগে ‘কলেজ স্ট্রীট’ পত্রিকা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছি। কিন্তু রবিদার কাজের সামগ্রিক চেহারার পরিচয় পেতে গেলে ‘সাতরঙ’-এর দু’ খণ্ডে চোখ রাখতেই হবে। এই বইয়ের জন্য শ্যামলদা (শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়) একটা ভূমিকা লিখেছিলেন⎯ ‘ও বনের পাখি!’ নাম দিয়ে। সেই লেখায় আছে রবিদার জীবনের বিস্তৃত কাহিনি। শ্যামলদা লিখেছিলেন⎯
‘১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ঢেউ এসে পড়ল তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুলে। সেই ঢেউয়ে স্কুলের উঁচু ক্লাসের একটি ছেলে ভেসে গিয়ে কলকাতায় এসে উঠল। তমলুকে থাকতে সে মাঠে মাঠে তাঁবু খাটিয়ে দেখানো সিনেমার দর্শক ছিল। এবার কলকাতায় সে সিনেমা দেখতে লাগল। রঙমহলে গিয়ে উইংসের পাশে দাঁড়িয়ে বাঘা বাঘা অভিনেতার অভিনয়ও দেখতে লাগল।
কলকাতায় থাকতে গেলে তো পয়সা চাই। ছেলেটি খিদিরপুরে অরফ্যানগঞ্জ মার্কেটে চায়ের দোকানে কাপ ডিশ ধোয় আর ডায়মন্ডহারবার রোডে ইলেকট্রিক খুঁটির গায়ে কাননদেবী, রবীন মজুমদারের নতুন ছবির পোস্টার দেখতে দেখতে স্বপ্নলোকে ডুবে যায়।
খিদিরপুরেই এক গেঞ্জির কলে কাজ হল তার। তখন কলকাতায় পথে পথে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মিলিটারি। রাতে ব্ল্যাকআউট। ছেলেটি তার ভেতরেই খিদিরপুরের সেকেন্ডক্লাস ট্রামে চড়ে ধর্মতলায়। সারাদিন খাটাখাটুনির পর সন্ধেবেলায় সে নিউ সিনেমায় ঢুকে পড়ে যোগাযোগ দেখতে। হিরো জহর গাঙ্গুলী।
চোখে তার অভিনয় জগতের মায়া কাজল। সিনেমা থিয়েটারের অভিনেতা-অভিনেত্রী তার স্বপ্নের লবকুশ। তাদের অভিনয়, একান্ত ব্যক্তিজীবন, টানাপোড়েন তাকে টানে। এবার সে খিদিরপুর ডাক ঠিকাদারের টালিক্লার্ক। তারপর মাইকেল মধুসূদন লাইব্রেরিতে এ-বেলা ও-বেলা বই দেয় মেম্বারদের। আর ভাবে কাশীনাথ ছায়াছবিতে নায়িকা সুনন্দা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নায়ক অসিতবরণের নিজের গলায় গানটি⎯ ও বনের পাখি⎯
আমাদের এই বনের পাখির নাম রবি বসু। এবার তিনি কলকাতার দিকে একটু এগোলেন। হেস্টিংসে একটি চ্যারিটেবল হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারখানায় বিনে পয়সার রুগীদের হাঁ করতে বলে গলায় হোমিওপ্যাথির গ্লোবিউল ঢেলে দেন তিনি খুব সাবধানে। পাছে ওষুধ পড়ে যায়।
রবি বসু মানিকতলায় দীপালি প্রেসে কম্পোজের কাজে ঢুকলেন। সেখান থেকে সেকালের রূপাঞ্জলি কাগজে এলেন। এইবার তিনি মলিনা দাসী⎯ পরে মলিনা দেবী, কাননবালা⎯ পরে কানন দেবী, সুলালবাবু ওরফে জহর গাঙ্গুলীদের কাছের থেকে দেখতে লাগলেন। তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। বুঝতে শিখলেন– একজন অভিনেতা, অভিনেত্রী কীভাবে তৈরি হয়ে ওঠেন, স্টার প্রেজেন্স কাকে বলে, অভিনয়ের সময় দুই শিল্পীর ভেতরকার রেষারেষি কেমন হতে পারে।
স্বয়ংসিদ্ধা উপন্যাসের ছায়াছবি বাঙালিকে মাতিয়ে দিয়েছিল একসময়। এই উপন্যাসের লেখক মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। সেখানে রবি বসু যোগ দিলেন। মণিলাল এই তরুণের ওপর সব কাজের ভার চাপিয়ে দিলেন। রবি বসু সম্পাদক হয়ে উঠতে লাগলেন।
চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের কাগজ উল্টোরথ একদিন রবি বসুকে ডেকে নিল। তখন ১৯৫৪। সেখানে প্রায় দশটি বছর। … বনের পাখির পক্ষে উল্টোরথ হয়ে উঠল মনোমতো বন। চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নাটক, নায়ক, নায়িকা, গায়ক, লেখক, পরিচালক, সম্পাদক, নাট্যকার– সবার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মিলে মিশে বনের পাখি একাকার হয়ে গেল।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা। কাগজের নাম সাতরঙ। সম্পাদক রবি বসু। তাও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর হতে চলল। একদিন দুপুরে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আর আমি কলেজ রোয়ে সাতরঙ অফিসে বনের পাখির মুখোমুখি বসলাম। কত স্বপ্ন। কত ভাবনা।
ফের উল্টোরথ তারপর উল্টোরথের প্রিয় সম্পাদক প্রসাদ সিংহের নাম দিয়ে কাগজ বেরোলো– প্রসাদ। তখন প্রসাদবাবু প্রয়াত। সম্পাদক আমাদের সেই বনের পাখি। …
ছায়াছবির পেছনে যিনি নায়ক, যিনি পরিচালক, যিনি নায়িকা তাঁরা কেমন মানুষ– কী করে অমন করেন– তাই নিয়েই রবিবাবু মাথা ঘামাতেন– উল্টোরথ, প্রসাদে লিখতেন। যে জন্যে ওই দুই কাগজ সিনেমা, থিয়েটার, সাহিত্য, যাত্রা জগতের খবরাখবর দিয়ে– মনোরম উপহার সাজিয়ে বাঙলা সাহিত্য চলচ্চিত্র জগতে সাংবাদিকতায় একনম্বর হয়ে উঠেছিল।…’

শ্যামলদা রবিদার কথা মাথায় রেখেই লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গল্প⎯ ‘রাজরাজেশ্বর’⎯ দে’জ থেকে প্রকাশিত ‘শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্পসমগ্র’র দ্বিতীয় খণ্ডে গল্পটি আছে। রবিদা ‘সাতরঙ’ বইটিকে তাঁর স্মৃতিতে ধরে রাখা বাংলা সিনেমার ৫০ বছরের সফর হিসেবে গড়েছিলেন। এই বইয়ের লেখাগুলো তিনি টানা চার বছর ধরে ‘বর্তমান’ পত্রিকার রবিবারের পাতায় লিখেছিলেন। আমাকে ‘সাতরঙ’ করার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছিলেন মণিশংকরদা (শংকর)। তাছাড়া যতদূর মনে পড়ছে এই বইটি করার ব্যাপারে কিন্নর রায়ও খুব সাহায্য করেছিলেন।
বাংলা সিনেমা জগতের এনসাইক্লোপিডিয়া-তুল্য এ-বইও উত্তমকুমার বর্জিত নয়। প্রথম খণ্ডের শেষ লেখাটি ‘ম্যাডাম সুচিত্রা সেন’, আর ঠিক তার আগের লেখাটি অবধারিতভাবেই মহানায়ককে নিয়ে। ‘উত্তমকুমার’ লেখাটিতে রবিদা জানিয়েছেন ‘প্রসাদ’ পত্রিকার উত্তমকুমার সংখ্যার কথা। ‘প্রসাদ’-এর উত্তম সংখ্যা করার সময় সোফিয়া লোরেনকে নিয়ে আলবেয়ার কামুর একটা লেখা পড়ে রবিদা চেয়েছিলেন উত্তমকুমারকে নিয়ে কোনও বাঙালি সাহিত্যিক যদি একটি বই লেখেন। তাঁর প্রথম পছন্দ ছিলেন সমরেশ বসু। সমরেশদার লেখা থেকেই ১৯৬০ সালে অগ্রদূত-এর ‘কুহক’ ছবিটি হয়েছিল যাতে প্রধান অভিনেতা ছিলেন উত্তমকুমার স্বয়ং। কিন্তু সমরেশদা প্রাথমিকভাবে আগ্রহী হলেও শেষমেশ কাজটি হয়ে ওঠেনি। তখন রবিদা ঠিক করেন সহ-লেখক হিসেবে উত্তমকুমারের আত্মজীবনী লিখবেন। তিনি লিখেছেন⎯
‘কথাটা উত্তমবাবুর সামনে পাড়তে ওঁকে খুব খুশি খুশি দেখাল। কিন্তু মুখে উনি আমতা আমতা করতে লাগলেন। বললেন, আমার জীবনী কে পড়বে মশাই! ভারি তো একটা জীবন, তার আবার জীবনী। দেখবেন আপনাকে নিয়ে লোকে হাসাহাসি করবে।
তার উত্তরে আমি বললাম, উত্তমকুমার সংখ্যা প্রকাশের প্রস্তাব যখন দিয়েছিলাম তখনও তো আপনি এই কথাই বলেছিলেন। কই, লোকে তো হাসাহাসি করল না। উল্টে পাঠকরা বরং হইচই বাধিয়ে দিল। ম্যাগাজিনের কোনও সংখ্যা সেকেন্ড এডিশন ছাপতে হয় শুনেছেন কখনও! উত্তমকুমার সংখ্যা প্রসাদ আমাদের সেকেন্ড এডিশন ছাপতে হয়েছিল। দেখবেন, আপনার জীবনী বেরুলে ঠিক সেইরকম হবে।
উত্তমবাবুর সঙ্গে আমার এইসব কথা হয়েছিল ১৯৭০-৭১ সাল নাগাদ। সেই সময়ে আমার কথার উত্তরে উত্তমবাবু বলেছিলেন, তাহলে আর কয়েকটা বছর অপেক্ষা করুন। বছর পনেরো পরে আমি অ্যাকটিং থেকে রিটায়ার করব। ঠিক রিটায়ার নয়, অভিনয়ের ব্যাপারটা কমিয়ে দেব। ইচ্ছে আছে পুরোপুরি ডাইরেকশানে কনসেনট্রেট করবার। তখন এই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা যাবে।
আমি বললাম, এই ভাবনার সঙ্গে আমার নামটা যুক্ত থাকবে তো?
উত্তমবাবু বললেন, নিশ্চয়। আমার জীবন, আমার ভাবনা। আর আপনার লেখা। ব্যাপারটা জমে যাবে না?
আমি বললাম, তা যাবে কিনা বলতে পারছি না। তবে একটা চেষ্টা তো হবে। আপনাকে কেন্দ্র করে বাংলা সিনেমার প্রায় আধখানা শতাব্দীর একটা দলিল তো হয়ে থাকবে।…’

অবশ্য সেটা রবিদার লেখা হয়নি। লেখেন গৌরাঙ্গদা⎯ ‘আমার আমি’। তবে উত্তমকুমার রবিদাকে বলেছিলেন⎯
‘আমাদের তো কথাই আছে, নাইনটিন এইট্টিসিক্সে আমরা বসব। তখন সবকিছু উজাড় করে দেব।
সেই নাইনটিন এইট্টিসিক্স আর এল না।…’
লিখন: শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
…… ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব ……
পর্ব ৮৪। বই সম্পাদনা: নেপথ্যের সংলাপ
পর্ব ৮৩। বই-চিত্রের বৈচিত্র
পর্ব ৮২। পূর্ণ ইন্দু পরকাশে
পর্ব ৮১। পাঠকদের উন্মাদ দাবি: চাই কথোপকথনের নতুন খণ্ড!
পর্ব ৮০। কলকাতা: পূর্ণেন্দু সংস্করণ
পর্ব ৭৯। নানা রঙের নবনীতা
পর্ব ৭৮। প্রথম বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই এঁকেছিলেন নবনীতা দেবসেন
পর্ব ৭৭। অপরাজিতা দেবীকে ছদ্মনামে পুরুষ কবি ভেবেছিলেন পাঠক
পর্ব ৭৬। বিদেশেও সমাদৃত হয়েছিল স্বর্ণকুমারী দেবীর উপন্যাস
পর্ব ৭৫। নারীকলম: দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৭৪। বই-মানবী
পর্ব ৭৩। প্রেসের কাজে গাফিলতি দেখলে কড়া চিঠি লিখতেন সুবীরদা
পর্ব ৭২। করোগেটেড কাগজের অভাবে আটকে ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্যসংগ্রহ
পর্ব ৭১। অমিয় চক্রবর্তীর ‘কবিতাসংগ্রহ’ ছিল নরেশ গুহ-র গুরুদক্ষিণা
পর্ব ৭০। এক মুখে কবিতা, অন্য মুখে মিছিলের স্লোগান
পর্ব ৬৯। সুভাষিত অনুবাদ
পর্ব ৬৮। শঙ্খদাই চেয়েছিলেন, সুভাষদার কবিতাসংগ্রহ সুবীর রায়চৌধুরী সম্পাদনা করুন
পর্ব ৬৭। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দিয়েই শুরু হয়েছিল দে’জের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ সিরিজ
পর্ব ৬৬। প্রেমেনদার উৎসর্গ করা বই বেচে দিয়েছিলেন বন্ধু ‘শিব্রাম’!
পর্ব ৬৫। প্যাঁচানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রর অবারিত দ্বার!
পর্ব ৬৪। মুজিব হত্যার পর অন্নদাশঙ্করের শোকলিপি ছাপা হয়নি সরকারি নিষেধাজ্ঞায়
পর্ব ৬৩। ভাবনার ভাস্কর্যের দিনগুলি রাতগুলি
পর্ব ৬২। কাদের লিটল ম্যাগাজিন বলা যাবে না, তার তালিকা তৈরি করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়
পর্ব ৬১। গৌরদা বিশ্বাস করতেন, কলমের স্বাধীনতা হরণ মাতৃবিয়োগের চেয়ে কম কিছু নয়
পর্ব ৬০। সমরেশ বসু যখন ‘বিশ্বাসঘাতক’!
পর্ব ৫৯। সারাজীবন নিজেকে জানার জন্যেই লিখে গিয়েছেন সমরেশ বসু
পর্ব ৫৮। নবারুণ চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজে তিনিও থাকুন, কিন্তু হল না
পর্ব ৫৭। সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক ত্রয়ীর মধ্যে ঋত্বিকের লেখাই আমরা প্রথম ছেপেছিলাম
পর্ব ৫৬। অজয় গুপ্তর নিরন্তর শ্রম আর খুঁতখুঁতে সম্পাদনা ছাড়া মহাশ্বেতা দেবীর রচনাসমগ্র হত না
পর্ব ৫৫। দলকল্যাণের জন্য রাজনীতি সমাজকে নরকে পরিণত করবে, বিশ্বাস করতেন মহাশ্বেতা দেবী
পর্ব ৫৪। যা লিখেছেন, না লিখে পারেননি বলেই লিখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পর্ব ৫৩। ‘অলীক মানুষ’ তাঁকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে, মনে করতেন সিরাজদা
পর্ব ৫২। নিজের লেখা শহরের গল্পকে লেখা বলে মনে করতেন না সিরাজদা
পর্ব ৫১। কর্নেল পড়ে সিরাজদাকে চিঠি লিখেছিলেন অভিভূত সত্যজিৎ রায়
পর্ব ৫০। সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা থেকে বাঁচতে দিব্যেন্দুদার জীবনের দ্বিতীয় গল্পই বদলাতে হয়েছিল
পর্ব ৪৯। রবিশংকর বলের মতো উর্দু সাহিত্যের এত নিবিষ্ট পাঠক খুব কমই দেখেছি
পর্ব ৪৮। দেবেশ রায়ের যেমন ‘বৃত্তান্ত’, আফসার আমেদের তেমন ‘কিস্সা’
পর্ব ৪৭। বই বাঁধানো সম্পূর্ণ হয়নি, তাই ‘মহাভুল’ শুধরে নিয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৬। গান্ধীনগরে রাত্রির কবিই প্রথম বিদ্রুপাত্মক তেতো হাসি এনেছিলেন বাংলা কবিতায়
পর্ব ৪৫। নাটকের মহলা পছন্দ হলে তবেই তিস্তাপারের বৃত্তান্তর অনুমতি দেবেন, বলেছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৪। নিজের বইপত্র বিক্রির বিবরণ দেখে হতাশ হয়েছিলেন দেবেশ রায়
পর্ব ৪৩। থ্রিলার, রহস্য-রোমাঞ্চ কিংবা ক্রাইম স্টোরি অনেক দিন ধরেই বইপাড়ায় ‘সুপারহিট’
পর্ব ৪২। অলংকরণ বা প্রচ্ছদশিল্পীদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, সখেদে চিঠি লিখেছিলেন নারায়ণ সান্যাল
পর্ব ৪০। সিগারেট ঠোঁটে রথীন্দ্রনাথের ছবি প্রচ্ছদে যাওয়া নিয়ে উঠেছিল প্রবল আপত্তি!
পর্ব ৩৯। শান্তিনিকেতন থেকে কলেজ স্ট্রিট, প্রুফ আদান-প্রদানে সহায়ক ছিলেন বই ব্যবসায়ীরাই
পর্ব ৩৮। পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে সোমেনদা বলেছিলেন, রামকিঙ্করকে নিয়ে এ জাতীয় বই আগে লেখা হয়নি
পর্ব ৩৭। ‘কীর্তির্যস্য’র নাম বদলাতে চেয়েছিলেন ভবতোষ দত্ত
পর্ব ৩৬। কবি-দার্শনিকের বাইরে আরেক রবীন্দ্রনাথকে খুঁড়ে বের করেছিলেন অমিতাভ চৌধুরী
পর্ব ৩৫। ‘শাহজাদা দারাশুকো’ আরও বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে ছিল শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের
পর্ব ৩৪। একজন লেখক হিসেবে আমি কি তোমার মনোযোগের যোগ্য নই, অভিমান ভরা চিঠি লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
পর্ব ৩৩। আমাকে ভাবায়, তারাপদ রায়
পর্ব ৩২। নববর্ষের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ: লেখকদের মন্তব্যের খাতা!
পর্ব ৩১। পরিব্রাজক সন্ন্যাসী তারাপ্রণব ব্রহ্মচারী ভাগ্যিস থিতু হয়েছিলেন সাহিত্যে!
পর্ব ৩০। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনও বই আমাকে চাপিয়ে দেননি, লিখেছেন: বিবেচনা করে দেখো
পর্ব ২৯। কবিতাকে শক্তিদা বলতেন ‘জলজ দর্পণ’, তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন
পর্ব ২৮। পিঁপড়ে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছাড়া হয়েছে, এমন পাণ্ডুলিপি ছিল বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের!
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved